সঙ্গ নিরুদ্ধের ফিসফিসানি

শুভদীপ মৈত্র


‘Old pond

Frog jumps in

Plonk’

রোজ সকালে উঠে দেখি ছাদ থেকে বাড়ির পিছনের ডোবাটায় পানকৌড়ি ডুব দিচ্ছে আর ভেসে উঠছে। তার সাথে কতগুলো বক বিজ্ঞ প্রফেসরদের মতো একটা ভাসমান কাঠের টুকরোয় বসে। কলিকাতা শহরে জলাশয় বিরল, তার একটি আমার বাড়ির পিছনে। অথচ এতকিছু খেয়াল করিনি তো। একদিন রাতে দেখলাম একটা পেঁচা সাঁ করে নেমে এসে কী একটা ধরল। ছুঁচো-টুচো হবে। আমি কোনো দিন তার জন্য বসে থাকিনি। কবিতার জন্যও কি এভাবে বসে থাকি?

সঙ্গনিরোধ। তুলতুলে একটা শব্দ কবিতার মতো। শব্দটাকে মাথার মধ্যে নিয়ে খেলি একটা পশমের বল যেন। বা উলের গোলা। মানুষ কাছে এলে প্রকৃত সারস উড়ে যায় না কি? কিন্তু প্রকৃত মানুষ? প্রকৃত কবিতা? আমরা কি পারব আর ঘাস ফড়িঙের কবিতায় – এত কথা বলা হয়ে গেছে – অভ্যাসে শব্দ স্রোত – সামাজিক। আমাদের সঙ্গনিরোধ ছিল ‘বহু জনতার মাঝে আমি অপূর্ব একা’। অর্থাৎ ফ্ল্যানুর। বিগত শীতে সদর স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিটে অনেকগুলো দুপুর কাটিয়েছি। একা। কাঁচের দরজা টানা কফির দোকানে, কালো ভাল কফি, সামনে রাস্তায় মানুষের স্রোত। পেইন্টার অফ মডার্ন টাইম-এর অংশ অনুবাদ করতে করতে এবারের মতো বসন্ত হল গত। কিন্তু ঘাস ফড়িঙের কবিতা হল না। না হলে না হল ক্ষতি নেই যদি রসটুকু মেলে। এক বন্ধুর কাছে শোনা – প্যারিসে জার্মান অকুপেশন প্রায় এক হপ্তা হল, মাতিস বেরিয়েছেন রাস্তায়, দেখছেন স্বাভাবিকের তুলনায় রাস্তায় ভিড় কম, সেই প্রাণ নেই। তিনি তা খেয়াল করেও করলেন না। একটু দূরে পিকাসোর সঙ্গে দৈবাৎ দেখা। পিকাসো অবাক হয়ে শুধালে আপনি এখানে, প্যারিসে এখনো? জানেন না জার্মান অকুপেশন চলছে? বিব্রত গলায় মাতিস বলেন না মানে আমি তো কয়েক দিন ধরে ঘরে বসে আঁকছি, রুটি নেই তাই বেরোতে হল।

হয়তো মিথ। গালগল্প। তবু মাতিস সত্যি যতটা সত্যি পিকাসোর গেরনিকা। কেউ তন্ময় তো কেউ রেজিসস্ট্যান্স। আমার দুই-ই চাই। কবিতায় থাক তুমুল উদযাপন আর গভীর নিভৃতি। আসলে ফ্ল্যানুর জানে প্রকৃত সঙ্গ নিরোধ।

লক ডাউন। তালা মারার দুটো দিক হয় – একটা বাইরে আরেকটা ভিতরে। ভিতরে একা অগুনন চিন্তার ভিড়; বাইরে অগুনন মানুষ, খিদে, রোগ, গ্লানি। সেমি কোলনে এই দুইকে আলাদা করলাম, দাঁড়ি নয়, কখন কীভাবে জায়গা বদলাবদলি হয়ে যায় একমাত্র গ্রেগর সামসা হয়তো জানতে পারে। তার অভিজ্ঞতা আছে। আমাদের নেই। এই সময়ের কবিতা হওয়া উচিত ম্যুরাল-এর মতো। দিয়েগো রিভেরা-র, কে.জি সুব্রক্ষ্মণিয়ম-এর। প্রত্যেক জানলা থেকেই যা স্পষ্ট। কিয়দংশ দৃশ্যমান বা পুরোটা – যাই হোক না কেন যে যতটুকুই দেখুক – বোধে থাক একটা বড় সমগ্র। লিভ্‌স অফ গ্রাস থেকে কান্তো হেনেরাল। একটা বইয়ের মধ্যে বেঁধে ফেলার চেষ্টা কবিতাকে, কবিতা উইথ ক্যাপিটাল লেটার্স। নেরুদার মিসোজিনি, ধর্ষণের স্বীকারোক্তি ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে ইজাবেল আয়েন্দেকে প্যাঁচে ফেলতে গেলে সাংবাদিকরা সরাসরি তিনি বলে দেন কান্তো হেনেরালে বাদ দিয়ে লাতিন আমেরিকার আধুনিক কবিতা বা ইতিহাস কোনোটাই সম্ভব নয়। অর্থাৎ কবিতা তার স্রষ্টাকে ছাপিয়ে গেছে। এমন সম্ভাবনাময় কবিতা শহরের দেওয়ালে দেওয়ালে ফুটে উঠুক। অথবা ট্র্যাপেস্ট্রির মতো দীর্ঘ বুননের কবিতা।

আলনায় রাখা শার্ট ও ট্রাউজার-এর দিকে তাকিয়ে থাকি। অফুরান সম্ভাবনা। এখন অব্যবহারে উজ্জ্বল। কবিতাও তাই শুধুমাত্র অসীম সম্ভাবনা আর অব্যবহার্যতা তাকে টিঁকিয়ে রাখে।

মাঝে মধ্যেই এখন মেলায় কেনা তালপাতার সেপাইটাকে নিয়ে খেলা করি। তার একটা হাত নেই। দুটো পা, অবশিষ্ট হাতখানা হাওয়ায় ফরফর শব্দে ওঠে নামে। আমি মালার্মের ‘পাখা’র কথা ভাবি। আর ভাবি আবহমানের শ্রমিকদের কথা। এই সামান্য নড়াচড়াটুকু ওদের সবকিছু। অস্তিত্ব।

‘Beauty is the beginning of terror’ কিন্তু সব আতঙ্ক কবিতায় পৌঁছয় না। মাস্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি দিয়ে আমরা আটকে রাখি মারী, মৃত্যু। কবিতাও আটকে যায় তাতে। অথচ প্রকৃতি নিষ্ঠুর উদাসীন এবং উদাসীন নিষ্ঠুর – জীবনানন্দের শালিকের শরীর ভেসে যায় জলে। কবিতাও একইভাবে তাই হতে পারে। তাই ব্যোদলেয়রকে ছবিতে দেখায় মুর্চ্ছোত্থিত। এই বোধ কবির যা শুধুমাত্র ক্রাফ্‌ট ধরতে পারেনি কোনওদিন। রেনোয়া মার্লামের প্রতিকৃতি এঁকেছেন মোটাসোটা পানাহার পুষ্ট এক ব্যক্তির, বিখ্যাত, সামাজিক যেন সাঁলোয় আড্ডা দিয়ে ফিরছেন – তাতে ক্রাফট আছে কবিতা নেই। গঁগা এঁকেছেন সেই একই মানুষটিকে যার চুলের বিন্যাস দেখলে মনে হবে বইয়ের খোলা পাতা – যেন আধুনিক কবিতা জন্ম নিচ্ছে তাঁর মাথায় আর একটা পাখির হিংস্র ঠোঁট তার কাঁধের উপর থেকে মাথার দিকে। এ আর শুধুমাত্র ক্রাফট নয় গঁগা পৌঁছে গেছেন মার্লামের কবিতার ভিতরে – আধুনিক কবিতার ভিতরে, যেখানে সৌন্দর্যের সঙ্গেই অপেক্ষায় আছে স্ক্যাভেঞ্জার বার্ড।

পিছনের পুকুরে রোজ আসা পানকৌড়িকে বন্ধু ভেবে নিয়েছিলাম, সে আসলে শিকারি পাখি, তার ঠোঁটে ধরা রূপালি মাছ দেখে তবু আমি আশ্চর্য হই। আমরা দু’জনে দু’জনকে দেখলেও সে আসে মাছের সন্ধানে। আজ পঁচিশে বৈশাখ। আজ চারিদিকে হিংস্র মৃত্যুর খবর।

সারা সকাল ধরে ছাদের দিকের দরজা আধো বন্ধ করে, আধো অন্ধকারে সারা ঘর ভরিয়ে তুলি সুজাত খানের গান ও বাজনায়। গ্বালিব শুনি। ফিরে যাই গ্বালিবের কবিতায় –

               চাহা হ্যায় ফির কিসি কো মুকাবিল মে আরজু

             সুর্মে সে তেজ দশা-এ-মিজঘাঁ কিয়ে হুয়ে।

ভ্রূ-পল্লবের ছুরি তার কাজলের কালোয় শান দেওয়া, কখন লিখছিলেন এই লাইন – যখন দিল্লি জ্বলছে, ইংরেজদের তোপের মুখে উড়ে যাচ্ছে সেপাইরা? এই ছুরি সুর্মা এগুলো কী পালিয়ে যাওয়া, না কবির একমাত্র প্রতিরোধ? প্রায় একই সময়ে সুদূর ফ্রান্সে বসে এক কবিও লিখছেন –

       ‘I will taste the make-up cried by your eyelids,

          To see if he can give to the heart you hit

          The insensitivity of azure and stones.’

একই তো – কী আশ্চর্য না। মালার্ম যখন এই লাইনগুলো লিখছেন ভেঙে পড়ছে রিপাবলিক, প্যারিসের রাস্তায় হয়তো ব্যারিকেড। তাই ওই insensitivity of azure and stones -এর মধ্যেও ধরা পড়ে সময়। কবিতায় তা এড়ানো যায় না। গ্বালিব বা মালার্মের প্রিয়তমার প্রতি সম্ভাষণেও থেকে যায় সময়ের দাগ।

পঁচিশে বৈশাখের কবি আশি বছর বয়সে এসে ছড়া লিখছেন ‘শ্রাদ্ধ’। একটা ছড়া কীভাবে হাড় হিম করে দিতে পারে তা না পড়লে বিশ্বাস হয় না। তার মৃত্যু বর্ণনা যেন আজকে আমার পৃথিবী –

             আপনি এল ব্যাকটেরিয়া তাকে ডাকা হয় নাই

             হাঁসপাতালের মাখন ঘোষাল বলেছিল ‘ভয় নাই’।

             সে বলে, ‘সব বাজে কথা, খাবার জিনিস খাদ্য’।

             দশ দিনেতেই ঘটিয়ে দিল দশ জনারই শ্রাদ্ধ।

সারা কবিতার জুড়ে দৃশ্যকল্পের পর দৃশ্যকল্প যেন পচা, ভেপসে ওঠা একটা পৃথিবী, আর তার  মধ্যে –

             ওই শোনা যায় রেডিওতে বোঁচা গোঁফের হুমকি-

             দেশ বিদেশে শহর-গ্রামে গলা কাটার ধুম কী!

সময় কবিতাকে এভাবে সংক্রমিত করে। আমি এই কবিতার পাতা উলটে চলে যেতে পারি না।

খেলাঘর অথবা বাটি হারানোর গল্প

অভিমন্যু মাহাত


মাইকের আওয়াজে গোলাকৃতি আঁকা চলছে ক্রমশ। বিরতি নেই। গোলদাগে আমি, তুমি, আস্ত মানচিত্র। কিন্তু, এই গোলাকৃতির পরিধি কবে বাড়বে? যেখানে একাকীত্ব নয়, কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়াবে প্রতিবেশী। ওইসব কথা কাটাকাটি, নিশ্চিন্ত আলুরদম, ছাতাময় আকাশের আয়োজন, আবার ফিরে পাব?

…………

 

একটা সাদা পৃষ্ঠা তিনটে রঙে ভরে উঠল। লাল, কমলা, সবুজের স্পর্শকাতরতা। শাসনে ঢাকা বাতাসের জরিপ। কেবল তিনটে রঙ ডানা ঝাপটায়।

লাল রঙ ধরে হেঁটে যায় সহস্র খালি পা। চামড়া উঠলেও সাংসারিক সন্ধে হয় না। যতদূর চোখ যায়, নিজেকে জাগিয়ে রাখতে হবে। দীর্ঘশ্বাস যখন রেললাইনে, তখন শতাব্দীর রাত্রি নেমে আসে। ভাগাভাগি পড়ে রয় শুকনো রুটি। যে রুটি জটলা চেয়েছিল ১৬টি ক্লান্ত পেটের। রাষ্ট্রের রেললাইন বন্ধু হয় না। আত্মহত্যা সহায়ক তবে? চিৎকার ওড়ে ১৬টি জিভের লালারস থেকে। আড়ালে লুকিয়ে দৃশ্য দেখে গেছে রাতচরা পাখিটি।

সকালে, সংবাদ পৃষ্ঠায় রুটি দেখে কবিতা লিখলেন বাবুকবি! স্যানিটাইজার মাখা হাততালি পড়লদেওয়ালজুড়ে।

………

 

ভাঙা আয়নার শাপ যেন। নিজের মুখই দেখতে চাইছি না। চুলের মিশকালো ঢেউ, দাড়ির আখড়াভয় হয় না, ক্লীব এক বিকেল এল উঠোনে। গেরস্থালি জুড়ে আড়াল থাকার অভ্যেস। ভাঙা আয়নায় আমি শুধু একা নই, নলকূপে জল নিতে আসা বধূটিও অপরিচিত। তাকেও আমি দেখতে পাচ্ছি না! খেলা ভেঙে যাচ্ছে। বিহানবেলার প্রাতরাশ মাড়ভাত বিষণ্ণ হয়ে উঠছে। কাঁকর পাচ্ছি ভাতে। থালায় রেশনের আলু সেদ্ধ। কাঁচালঙ্কার অপেক্ষা করতে করতে জারমনি থালা শেষ। বেলা বাড়লে সবার অলক্ষ্যে, আইন ভেঙে ছোটরা কানামাছি খেলছে!

…………

 

তখন সূর্য ডুবুডবুবু, কাকিমা বন থেকে ফিরেছে। এসেই এক ডুভা মাড়ভাত গিলল। কুঁচফল রঙ দিয়ে যায় সংসারে। আজও কাঠ এনেছে। শস্যের খবর খুঁটে নেয়, কাঠের বোঝা। কাল হাটবার। কাকিমা হাটে যাবে। আমার জন্য ছোলাভাজা, গরম চপ নিয়ে আসবে। হাট থেকে আসবে একঝুড়ি সব্জি, লাল গামছা। তারপর, সন্ধায় একপাট মহুলা হবেক।

এইসব দৃশ্যকল্প নাটকের যে কোনো অঙ্কের চেয়ে জ্ঞানী। গত দুই মাস কাকিমা মুছে দিয়েছে বনপথ। হাটবার আজকাল মনে থাকে না। কাকু কাকিমার ঝগড়াও আর হয় না। জেগে আছে সবাই। সামান্য ভোরের ঘেঁটু ফুল ছেঁড়ার মোহ নেই। প্রতিবেশী ঘর থেকে এখন তরকারি বাটি আসে না। কুটু রান্নার মহক আসে না। তাই শরবেড়িয়া গ্রামে, বাটি হারানোর গল্পও আর কেউ জুড়ে না!

রাক্ষসের গান

বিকাশ গণ চৌধুরী


একলা থাকার নিয়তি বহুদিনের সঙ্গী হলেও এরকম বাধ্যতামূলক ঘরে থাকার, প্রকৃতি থেকে দূরে থাকার গল্প জীবনে কখনও হয়নি; ব্যক্তিজীবনে পরিবহন সংস্থার গদীতে খাতা লিখে দিন গুজরান হয়, সেকাজের থেকে ছুটি পাওয়ার জন্য সর্বদাই মন হাঁকপাঁক করে, কিন্তু সেকাজ থেকেও যে এরকম ছুটি পাওয়া যাবে তা ভাবিনি কখনো, আর ছুটি যখন পাওয়া গেল তখন সে ছুটি হ’ল বন্দীজীবনের সমান, সশ্রম, বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে যাওয়ার হুকুম নেই, চারিদিকে এক ত্রাসের আবহ, কারও বাড়ি যাওয়া যাচ্ছে না, পাশের বাড়ির মানুষজন ফোন করে কুশলসংবাদ জানতে চাইছেন, এরপর তো আর তাদের বাড়িও যাওয়া যাচ্ছে না, বিকেলে ছাদে উঠেও দেখেছি, আশেপাশের ছাদও জনমানবশুন্য। এরকম এক সময় সবাই দেখি এক অজানা আতঙ্কে গ্রস্ত; প্রথম প্রথম কী খাব, মুদিখানায় জিনিষপত্র পাওয়া যাবে কিনা এই আতঙ্কে মানুষজনকে ছোটাছুটি করে খাওয়ার জিনিষ মজুত করতে দেখেছি, কিন্তু কিছুদিন পর থেকে অবস্থা একটু সয়ে যেতেই শুরু হ’ল অন্যচিন্তা, এই বন্দীদশার পর কাজকর্ম থাকবে কি থাকবে না এই চিন্তা : আশেপাশের দৈনিক রোজগারের ওপর নির্ভর মানুষজন, অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করা মানুষজন, এমনকি সংগঠিত ক্ষেত্রে কাজকরা মানুষজনও দেখলাম এই আতঙ্কে একে একে ডুবতে শুরু করেছেন, কোথায় অবসরে বসে একাকী মানুষের সৌন্দর্য উপভোগের পরিসর, চতুর্দিকে তো শুধু রাক্ষসেরই গান…

সমাজের যে আর্থসামাজিক স্তরে আমার আবস্থান সেই স্তরের মানুষজন অর্থনৈতিকভাবে একটু ভালো অবস্থায় থাকার দরুন এই মহামারীর কালে দেখেছি তাদের সাংস্কৃতিক (?) উল্লাস; কিছুদিন আগে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নববর্ষবরণকালে রবীন্দ্রবাণীর যে অপলৌকিক সংসর্গদোষ ঘটেছিল সেটা যে আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের প্রকাশ এটা আমার পরিচিত যারা মেনে নিতে পারছিলেন না সেইসব সুধী ভ্রাতারা এই করোনাকালে “সামাজিক নেটওয়ার্ক” জুড়ে আদিরসালাপের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন, আমোদগেঁড়ে হয়ে মহিলাদের সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য করেছেন, জাতিগত বা ধর্মগত বিদ্বেষও বাদ যায়নি, সময়বিশেষে সেটাও মাথা চাড়া দিয়েছে, আমাদের সাংস্কৃতিক-উল্লাস তার দাঁত-নখ বার করে দেখিয়ে দিয়েছে যে একটা মেকি, লোকদেখানো মূ্ল্যবোধ নিয়ে আমরা চলেছি, আমাদের সমাজের অধিকাংশই ঐ আমোদগেঁড়ে জনতা, যারা আকাশ থেকে নেমে আসেনি, তারা আমার আপনারই ভাই-বোন, আমার আপনারই পুত্র-কন্যা, তাদের চিন্তাভাবনা যদি অবক্ষয়ী হয় তো সে দায় প্রাথমিকভাবে আমাদের, আমাদের নিজেদের মধ্যকার অবক্ষয়টাকে না দেখে আমরা অন্যের মধ্যে সেটা দেখানোর চেষ্টা করছি। প্রসঙ্গ ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছি কিনা জানিনা, একটা ভাবনার কথা বলি : প্রতি বছর এখন দেখি ১০ লক্ষ ছাত্রছাত্রী মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, ১৯৬০ থেকে ২০১৯ এই ৬০ বছরে এই উত্তীর্ণের গড়সংখ্যা যদি ৫ লক্ষও ধরা যায় তো তবে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ২কোটি, এর মধ্যে যদি বাংলা মাধ্যমে পরা ছেলেমেয়ের সংখ্যা ৭০%-ও হয় তো সংখ্যাটা হবে ১.৪ কোটি, আর এর ২০% মানুষজন যদি বাংলা সাহিত্য কিনে পড়েন তো তাদের সংখ্যাটা হয় ২৮ লক্ষ, আর এরা যদি বছরে গড়ে ২০০ টাকা দামের ৫টি বইও কেনেন তো বিক্রিত বইয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ১.৪ কোটি আর তার বাজারমূল্য হয় ২৮০ কোটি টাকা; আর বাজারমূল্যের ৭%-ও যদি রয়্যালটি হিসেবে লেখকরা পান তো সেটা দাঁড়ায় ১৯.৬, প্রায় ২০ কোটির কাছাকাছি, সহজ অঙ্কের নিয়মেই এই লেখকদের মধ্যে যাদের বই সবচে’ জনপ্রিয় এরকম প্রায় জনা পঞ্চাশেকের (বেশি মনে হলে পাঠক সংখ্যাটা দশ-এ নামিয়ে আনতে পারেন) তো এই রোজগারেই বহাল তবিয়তে থাকা উচিৎ, কিন্তু বাস্ততবে আমরা কী দেখি, বাংলায় লিখে একজনও, হ্যাঁ একজনও সাহিত্যিকেরও দিন গুজরান হয় না, লেখার পাশাপাশি অন্যকাজ করে তাঁকে জীবন নির্বাহ করতে হয় (বাংলা বাজারে দু’একজন বলে থাকেন বটে তারা লিখে খান, তো তারাও প্রুফ দেখে বা প্রকাশনার অন্য কোন কাজ করেই দু’পয়সা রোজগার করেন, আর তারা কেউই বেস্টসেলার বইয়ের লেখকও নন)। এত কথা বলার কারণ বাংলা ভাষার লেখকদের রোজগারের করুণ আবস্থাটা দেখানো নয়, আমি দেখাতে চাইছে যে গড়পরতা বাঙালির বই পড়ার রুচিটাই নেই, তাই সে বই কেনে না, পড়েও না; আগে সামাজিক অনুষ্ঠানে বই উপহার দেবার রেওয়াজ ছিল, সেটা প্রায় এক লুপ্ত পূজাবিধিতে পর্যবসিত; কিন্তু এর পরেও আমাদের সাহিত্য নিয়ে বড়ফাট্টাই একটুকুও কমেনি, যে সারা বছর, সারা বছর কেন সারা জীবনেও স্কুলপাঠ্যের বাইরে রবিঠাকুরের কোন লেখা পড়েনি সেরকম লোকজনও সাহিত্যের ব্যাপার নিয়ে অহরহ নানান চটুল এবং অযৌক্তিক মন্তব্য করতে দেখেছি, আসলে কোন বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে যে সে বিষয়ের ‘অধিকারী’ হবার একটা ব্যাপার থাকে সেটা আমরা ধর্তব্যের মধ্যেই আনিনা। বিভিন্ন বিনোদনের মাধ্যম, খবরের কাগজ সবাই এই ‘অধিকারী’-র ব্যাপারে ভয়ঙ্কর নীরব, পকেটে পয়সা বা হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকলেই সব বিষয়ে কথা বলার ক্ষমতা জন্মায়, পণ্যনির্ভর সভ্যতা আমাদের এটা শিখিয়েছে…

একলা ঘরে বসে এসব ভাবনার পাশাপাশি দেখি দুনিয়া জুড়ে মানুষের এই বন্দীদশার কালে প্রকৃতি আমাদের অনেক আশ্চর্য দেখিয়েছে, দেখিয়েছে সারা পৃথিবীতে দূষণ উল্লেখযোগ্যরকম কমে গেছে, সুমেরু এলাকায় ওজোনস্তরের ফুটো নিজে থেকে ভরাট হয়ে যাচ্ছে, যে বিপুল প্রাণীজগতকে আমরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিলাম তারা আজ আমাদের কাছাকাছি ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু আমরা তো জানি লক ডাউন শেষ হলেই এইসব স্বপ্নের মতো উবে যাবে, আমাদের লোভ, আমাদের চাহিদা এসবকে স্থির হতে দেবে না, সেটা আর সম্ভবও নয়, তাই এসব সাময়িক খুশি আমার হৃদয়ে আগামীর রাক্ষসের গানে চাপা পড়ে যাচ্ছে, এই লক ডাঊনের কাল শেষ হলে আমি তো আর প্রকৃতির এই সৌন্দর্য্যসুষমা দেখতে পাবোনা, জিপসীদের তাঁবুর মতো সে হারিয়ে যাবে।

কবি স্রষ্টা। আর সর্বদাই একলা। সবসময়ই একলা মানুষের সৌন্দর্য্যে সে নিমজ্জিত। এই বন্দীদশায় তার নতুন করে একলা হবার কিছু নেই; তবে সামাজিকভাবে বাধ্যতামূলক এই একলাদশা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে সৌন্দর্য্যের থেকে বেশি দেখিয়েছে রূঢ় বাস্তব আর বাড়ির ভিতর থেকে দেখা টুকরো আকাশের নীল রঙের সুরের থেকে বেশি শুনিয়েছে রাক্ষসের গান।

 

 

 

তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়

অভীক ভট্টাচার্য


ভাবিয়াছিলাম, ভোরের নরম আলোয় অনন্তের দিকে বিছাইয়া থাকা রেলের দুই পট্‌রির মাঝখানে প্রস্ফুটিত পূর্ণিমার চাঁদের মতো গোল, তেমনই উজ্জ্বল, রুটিগুলির কথা কিছু লিখিব। কিন্তু যেহেতু সেই ছবি খবরের – যেহেতু তাহা ডিএসএলআর-এর মায়ায় তাহার প্রেক্ষাপটকে আবছায়া ও যথেষ্ট শিল্পোত্তীর্ণ করিয়া তুলে না – অতএব লিখিতে বসিয়া ড্যান্ডেলিয়ন ফুলের ন্যায় হলুদ রুটিগুলির পাশে অনবধানে জড়ো হইতে থাকে টায়ারের শতচ্ছিন্ন চটি, কাপড়ের ইতস্তত ছড়াইয়া থাকা পুঁটুলি, টাকার ব্যাগ, ভাঙা চশমার কাচ, এমনকী ভগ্ন একটি ডাঁটিও। ভোরের আলোয় আনুষঙ্গিক এইপ্রকার জিনিসপত্রের প্রতিটিকেই অতীব মায়াময় বলিয়া ভ্রম হয় – এবং চরিত্রগুণে ইহাদের প্রতিটিই যেহেতু কোনও না-কোনও সময়ে কোনও না-কোনও মানুষের সহিত লগ্ন হইয়া থাকার স্মৃতির কথা বলে – অতএব, তাহাদের সংস্পর্শে আসিয়া রুটিগুলির মধ্যেও একপ্রকার স্মৃতিলগ্নতা সংক্রামিত হতে থাকে। হইতে-হইতে, এইপ্রকারে, কিছুক্ষণের মধ্যে ঔরঙ্গাবাদ স্টেশনের কাছে ওই তন্দ্রালু রেললাইন বরাবর একটি অলৌকিক রাগমালার প্রস্তাবনা রচিত হয় – ভৈরবের মধ্য সপ্তকের শুদ্ধ ও খাড়া নিষাদের অন্তর্বর্তী তীক্ষ্ণতা ও একাকিত্বটিকে রামকেলির কোমল নিষাদ আসিয়া সুশ্রূষা দিতে থাকে… চশমার ভাঙা পরকলাটির উপর সকালের রৌদ্র পড়িয়া তাহাকে একটি সাতরঙা কাহিনির অবয়ব দেয়… এবং রেললাইনের ধারের মুচকুন্দ ঝোপের পাতাগুলি হাওয়ায় ঈষৎ দুলিয়া উঠিয়া সেই কাহিনিকে একটি কাব্যিকতার প্রেক্ষিৎ দান করে। সময় এইখানে আসিয়া কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকিয়া দাঁড়ায় – যেন বুঝিতে চাহে, অতঃপর তাহার ঠিক কী করা উচিত হইবে… এবং, তাহার পর, ঝাঁকুনি দিয়া দিন শুরু হইয়া যায়…

তাহার পর আসে রামপুকার পণ্ডিত। তাহাকে কোনও একদিন খর দ্বিপ্রহরে কোনও এক দিল্লির রাস্তায় বসিয়া হাপুশ নয়নে কাঁদিতে দেখা যায়, আর রৌদ্র আসিয়া তাহার মস্তকে, গালে ও চিবুকে কথাচিত্র লিখিয়া যায়। ভাঙা-ভাঙা হরফে লিখা এই কথাচিত্র পাঠ করিয়া জানা যায়, কোনও এক বিহারে তাহার সন্তানটি দুরারোগ্য ব্যাধিতে মৃত্যুশয্যায় – মানবকটিকে একবার চোখের দেখা দেখিতে সে পদব্রজে যাত্রা করিয়াছিল। ভারতবর্ষের এক আশ্চর্য বৃত্তান্ত এই যে, কোনও এক স্থান হইতে অন্য কোনও স্থানে পঁহুছিতে অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়। ইতিহাস বলে, দূরকে নিকটে আনিয়া অবাধ্যকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যেই পথ ও পরিবহনের নির্মাণ; কিন্তু পুত্রশোকে অধীর রামপুকার সে কথা স্মরণে না-রাখিয়াই দিল্লি হইতে বিহার পয়দল চলিয়াছিল। পথশ্রমে কাহিল হইয়া সে যখন একটু ছায়া খুঁজিতেছে তখন পুলিশ আসিয়া তাহাকে বলে, “তুমি ঘরে পহুঁছিলেই কি মৃত সন্তান ফিরিয়া আসিবে?” পুলিশের এই প্রজ্ঞা ও স্বান্তনামিশ্রিত বাক্যে তাহার হৃদয় দ্রব হইয়া আসে, ও সে আর কোনও বাক্য বলিতে না-পারিয়া ক্রন্দন করিতে থাকে। তাহার চক্ষের জলের কোনও ভারতবর্ষ আছে কি না তাহা জানিতে পারা যায় না, কিন্তু ক্রন্দনবেগ খানিক স্তিমিত হইয়া আসিলে রামপুকার জানায়, তাহারা দিনমজুর (আসলে সে ‘কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার’, কিন্তু অজ্ঞতার কারণে কিংবা সচেতনভাবে সে উক্ত শব্দবন্ধটি এড়াইয়া যায়) তাই তাহাদের জীবনের কোনও দাম নাই… তাহারা উন্নয়নের চাকার পাখিতে লাগিয়া থাকা ধূলিকণার অধিক নহে – যতক্ষণ ঝরিয়া না-পড়ে ততক্ষণ চাকার সহিত অনন্ত চংক্রমণই তাহাদের একমাত্র ভবিতব্য ইত্যাদি। এই কথা বলিতে-বলিতে রামপুকারের মুখে একপ্রকার ভাবান্তর ঘটে ও তাহাকে দেখিয়া মুহূর্তের জন্য পথের পাঁচালি ছবিতে দুর্গার মৃত্যুসংবাদ পাওয়া হরিহরের মুখখানি মনে পড়িয়া যায়। এইখানে, শাস্ত্রমতে আমি একটি তারসানাইয়ের আয়োজন করিয়া পটদীপ রাগিনীতে যথোপযুক্ত একটি হাহাকার বাজাইয়া তুলি এবং রামপুকারের বিহ্বলতা তাহাতে একখানি রসোত্তীর্ণ স্থিরচিত্রের মর্যাদা পায়।

বেলা পড়িয়া আসিলে রামপুকারের মুখখানি ছায়ার মধ্যে অন্তর্হিত হয়, কিন্তু তাহার অগ্রে-পশ্চতে আরও নানা স্থিরচিত্র ভিড় করিয়া আসে। তেলঙ্গানার লঙ্কাক্ষেতে কাজ করিতে যাওয়া ছত্তিশগঢ়ের জামলো মকদমের মুখখানি মনে পড়ে, অনেক দূর আকাশের নীচে মহাবীর কর্ণ যেইখানে মাটি হইতে রথের চাকা আজও টানিয়া তুলিতেছেন তাহার পাশ দিয়া সেই বালিকা যুগ-যুগ ধরিয়া হাঁটিয়া আসিতেছে বাড়ি পঁহুছিবে বলিয়া… তাহার পাশ দিয়া, খানাখন্দ পার করিয়া, নদীনালা পার করিয়া, জলজঙ্গল পার করিয়া, গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-বসন্ত পার করিয়া সার দিয়া গোটা ভারতবর্ষ হাঁটিয়া আসিতেছে… সুটকেসের উপরে নিদ্রাচ্ছন্ন শিশুসন্তানকে টানিয়া লইয়া হাঁটিয়া আসিতেছে… চাকা-লাগানো ঠেলায় আসন্নপ্রসবা পরিবারকে বসাইয়া হাঁটিয়া আসিতেছে… বৃদ্ধা মাকে পিঠে করিয়া হাঁটিয়া আসিতেছে… মাথায় পুটুলি, ক্রোড়ে সন্তান, পিঠে সাইকেল লইয়া যমুনাপার হইতে হাঁটিয়া আসিতেছে সুমিত্রা ঘোড়ুই, সরস্বতী জানা, সুদূর রঙ্গারেড্ডি জেলা হইতে, গুন্টুর-কুড্ডালোর-বিজয়নগর হইতে এক কাপড়ে হাঁটিয়া আসিতেছে জানকিবাঈ… হাঁটিয়া আসিতেছে ইন্দ্রপ্রস্থ হইতে, মছলন্দপুর হইতে, মেহেন্দিপট্টম হইতে, ভবানিপটনা হইতে, জগদলপুর হইতে, অবুঝমাড়, দান্তেওয়াড়া, রাইপুর, ঝাঁসি, ওরছা হইতে… দিবস অতিক্রম করিয়া অনন্ত রাত্রির মধ্য দিয়া যুগ-যুগান্ত পথ হাঁটিয়া আসিতেছে…

তাহাদের সেই সম্মিলিত পদযাত্রার মার্গশীর্ষে, রেললাইনে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত রোটিকাখণ্ডসমূহ সূর্য-চন্দ্রের মতো দিবসরাত্রি আলো ছড়াইতেছে – আমরা শহরে বসিয়া কায়ক্লেশে দেখিতে পাই। কিন্তু, এমন এক অন্তহীন পথ হাঁটার মহাকাব্যের পাশে বসাইবার মতো নাটকীয় কোনও আবহসঙ্গীত খুঁজিয়া পাই না।

অথবা মানুষ এক ঝুলত ঝুলনে …

দীপান্বিতা সরকার


চামড়ার নীচে দৈত্য থাকে, আমি টের পাই। চামড়ার তলা থেকে এক একটা সুর বিঁধিয়ে সে রক্ত তুলে আনে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ভেসে যায় ঘরময়। ক্রমশঃ গান হয়ে উঠি। কফি ফোটার শব্দে বেজে ওঠে ঘর। ঘরের আকাঙ্ক্ষা, প্রতিশ্রুতিময় ধ্বস্ত বাসনাকাম। যাকে আমি, আমাকে যা, তাই কি আসলেই চেয়েছিলাম আমি? থাক। আপাততঃ বাহারি ট্রে বের করি। ধুয়ে মুছে দু’টো কাপ পাশাপাশি রাখি। শৌখিন সাদা কাপ, কোনও দিন কোনও ঠোঁট ছোঁবে না যাদের। কী ভীষণ একা চরাচর ! কী ভীষণ একা তুমি আটকে পড়েছ সবুজের সীমানায়। বন্ধ ট্রেন বাস, তবু কে পাঠালো গাছের গাছের ওই ঘনঘোর আনন্দ? তরুমূলে বাঁশি রাখা, ওপরে আকাশ ঘূর্ণায়মান। মানুষের ছায়া নেই কোনও। অথবা মানুষ এক ‘ঝুলত ঝুলনে…’।

ইত্যাবধি প্রসবের ধারণা নেই কোনও। খালি প্রিয় নারীদের মরে যাবার আগের যন্ত্রনানীল মুখগুলি মনে পড়ে। বড়পিসি হঠাত ছাদ থেকে পড়ে, ক্যানসারের শেষ কয়দিন শ্বাসকষ্টে ছটফট করতে করতে মা, শিরদাঁড়া ভেঙে গিয়ে আম্মা, আমাদের বাড়ির নারীদের বড় তাড়া, আগে আগে যায়। প্রতি রাত্রে এই যাত্রাগুলি দেখি। সারারাত ধরে ঘুমোতে পারি না।

তোমার একলা আঙুলখানি যা কেবল পুড়তে পারত আমার ভেতরে এসে, ভাবি কত সুন্দর তারা ! দূরের কুয়াশা পেরিয়ে একলা তোমার চোখের জল যদি এসে দাঁড়ায় আমার মৃত্যুর থানে, কী অপরূপ হতে পারে সে, তুমিও কি মানো? আসলে তুমি সত্যি হলে তো আমি মিথ্যে। আমি সত্যি হলে তুমি মিথ্যে। দু’জনেরই সত্যি হবার কোনও জো নেই আর। যদি আমার ত্বক, হাড় মজ্জা উপড়ে হৃদয় সমেত তুমিই বেরিয়ে এলে, সেই নগ্ন ভাস্কর্য কি সত্যি তুমিই হও? নাকি সে আমি হয়ে যায়। বসন্তবায়ে… ‘প্রাণ মিশায়ব বাঁশিক সুমধুর গানে’। নিজেকে মেশানোর মত সেই গান হয়ে যাই আমি।

আমি আর কত সহজ হলে একেবারে বিচ্ছিন্ন হবে তুমি? একেবারে ছেড়ে যাবে আমার শরীর? আরও কত গুহায় লুকোনোর গুপ্তবিদ্যা শিখতে হবে আমায়? সেই সে হৃদয় যার লাস্যময় ভঙ্গিতে কত মানুষেরা এসে ভিড় করে। নতজানু হয়। সেই ভিড় থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করতে হবে নিজেকে। চাপা দিতে হবে ছাই আর তিল তুলসীর নীচে। ‘তব দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে’। শুধু কি জীবন বলো? ঘরদোর, বাথরুম ঝাঁট দিতে দিতে, বাসন মাজতে মাজতে, কাপড় কাচতে কাচতে, কাঁসার থালায় ভাত আর কলমি শাক বেড়ে দিতে দিতে এইসব ভাবি। তুমি কী ভাবছ অনেকদিন খবর পাই নি।

খবর এসেছে ঝড়ের। ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়েছে বহুদিনের জং ধরা মন, কাচেরও মন। শুধু সার সার গাছের আর মন নেই কোনও । শরীর কেটে কেটে কারা নিয়ে গেল? কারা পেল জল, আলো? কারা পেল না? জলে ডুবে ডুবে শোক পাথর হয়ে গেল, কার? পাথরে বোসো হে প্রতিমা৷ তোমাকে সাজাই। তোমাকে সাজাই ও সুন্দরী ও গরান আবার আবার, আমার কান্নার নোনা ঢেলে দিলে তোমারই আঁচলে, বদলে আমিও তো ফিরে পাব শাকান্ন দু’ মুঠি? আমন ধানের জমি?

ঘুমের আগে আগে বাজে তাঁর গলা। ঘুমের ভেতরও বাজে। ঘুম ভেঙে ভেঙে গিয়ে বাজে। সবচেয়ে ক্রুদ্ধ, পৃথিবীতে সবচেয়ে নিষ্ঠুর আমার প্রতি যে, তাঁর বিষণ্ণতার ছায়ার মধ্যে আলতো করে ঘুমোই আমি। সে জানে না। আর কিছু না হোক, ঘুমের সময় একটা হালকা মত চাদর আমার গায়ের ওপর চাপা লাগবেই। ওই চাদরখানা সরিয়ে যা ইচ্ছে দেখার কোনও লোক চাই নি আর বহুদিন। কেবল ওই তাঁর তাঁর তাঁর অদৃশ্য বিষাদ আসে চুপিচুপি একা একা কোনও কোনও রাতে, এমনকী সমস্ত নিষেধ পেরিয়ে, ঝড় জল মারীর ভয় নেই।

প্রিয় শৃঙ্গারগুলি একে একে পাতা হয় মৃত্যুসূচিমুখে। যাবার আগে আগে পায়ে বিঁধে যায় আনন্দ। আমার শরীর জুড়ে কখনও আকাশ, কখনও সমুদ্র, কখনও পাহাড়। এই কি তাহলে বিষণ্ণ ব্রহ্মের সঘন আনন্দরস ?  আমার কোনও কথা নেই আর। কথা নিজেই আমাকে বলে আজকাল।

প্রিয় আয়না, তুমি পুড়ে গেলে কী দীপ্তিময় রোদ ঠিকরে বের হয়! আর চরাচরে ফুটে ওঠে আলো। পাহাড়তলি বেয়ে ওই ছোট্ট ছেলেটা একা একা পাড়ি দেয়, চড়াই উতরাই ভেঙ্গে ওঠে। কোথায় তার বন্ধুর বাড়ি? সারাদিন রোদে তেঁতে, বৃষ্টি ভিজে ক্লান্ত হতোদ্যম, লেখার খাতা কি ফিরিয়ে দিতে পেরেছিল প্রিয় বন্ধুকে তার? নাকি একা একা ফিরে আসতে হয়েছিল আবার পাহাড় ভেঙ্গে? বাহারি নকসার কাঠের দরজার ওপারে নেই কোনও বন্ধুর মুখ, এ কথা জানতো না বুঝি সে?

নিঠুর এপ্রিলে

স্বপন রায়


…..

এইতো সমুদ্র। আমি নেই, আমি নেই গাইছি। অনেকেই তখন। কে যেন বলল এই গানটা মন খারাপ করে দেয় আর তোর গলায় সুর নেই, বন্ধ কর।হাসাহাসি।তো রাতে আমি একাই, আমি নেই আমি নেই, সেই সমুদ্রের ধারে, পুরীতে।আর তখনই আছড়ে পড়া ঢেউসমগ্রে কিছু একটা হল।আমি ওই গান গাইতে গাইতে দেখি জল মাথার ওপরে।আমি ক্রমশই নিচের দিকে নেমে যাচ্ছি।অন্ধকার তীব্র হচ্ছে।আমি কী সত্যিই নেই? ভয় পেলাম।জলের সুড়ঙ্গে আমি, অভাবনীয় জোরে ভেসে যাচ্ছি,একা।আমি কী মরে গেলাম?

 

মৃত্যু এত দ্রুত, এত চলমান, এত শরীরি!আমি যাচ্ছি কোথায়? আজ পঁচিশে এপ্রিল। ‘এপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মান্থ’। ভাবলাম আর জলে উজ্জ্বলতা এল।ফ্লুরোসেন্ট।জল জমাট হচ্ছে, না বরফ নয়, জল জমে যাচ্ছে, বরফ হচ্ছে না।উত্তাপ পাচ্ছি আবার, ওই আলোই কী উৎস? মাথার ওপরে জলের ছাদ।আমার গতিও শ্লথ হয়ে এসেছে।সামনে কী কোনও হলঘর? বেশ বড়। হঠাতই আমায় কে যেন হাওয়ায় ভাসিয়ে দিল। জলছাদের নিচে আমি।গড়ুরাবোলোকন করছি এখন। আরে এতো হিউম্যান ব্রেন। মস্তিষ্ক। আমি হলঘর ভাবছিলাম! ওই তো ‘সেরেব্রাম’,’ব্রেনস্টেম’ আর ‘সেরেবেলাম’।শরীরের নিয়ন্ত্রক।অথচ এখন কেমন যেন স্তব্ধ।একবার মনে পড়ল, ‘ব্রেনস্টেম’কে ইচ্ছে করে ‘ব্রানস্টেম’ লিখে অপাবৃতাকে জিগগেস করেছিলাম, বল ভুল কোথায়? ও একবার দেখে বলেছিল, হারামি!আজ সবই আমি দেখতে পাচ্ছি।ওই যে চোদ্দ থেকে ষোলো বিলিয়ন ‘নিউরন’-এর মালিক ‘সেরেব্রাল কোর্টেক্স’ আর পঞ্চান্ন থেকে সত্তর বিলিয়ন ‘নিউরন’ ধরে রাখা ‘সেরেবেলাম’।আমি ওই গোলকধাঁধায় না গিয়ে খোঁজ নিলাম ‘ভার্টেব্রেট’-এর সেইসব লম্বা ‘প্রোটোপ্লাজমিক’ ‘এক্সন’গুলোর যারা মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্থানে সংকেত পাঠায়। কাছে গিয়ে দেখলাম পথহারা আতঙ্কগ্রস্ত একটি স্নায়ু-ফাইবার চোখ বিস্ফারিত করে দাঁড়িয়ে আছে। কোন সংকেত পাঠাচ্ছিল কে জানে!আরেকটি চুপ। মাথানিচু।আরেকটি,অসহায়।ভয় আর আতঙ্ক ওই মস্তিষ্ক জুড়ে,আমি মাথায় হাত দিলাম।হাল্কা মনে হল।ওটা কী আমারই তবে? চারদিকে জলের গন্ধ।ডুবে যাওয়ার এই সামুদ্রিক খাতে আমি, মৃত আমিই হয়ত এক অনন্ত যাত্রায় চলেছি।যে কথা আমি মুখ ফুটে বলতে পারিনি সেই অস্ফূট কথাটিও জড়িয়ে আছে আরেকটি ‘এক্সন’-এ।তাহলে কী সংকেতেই লকডাউন? এই নির্জন মস্তিষ্কে আমি নিজের অবরোধী মানসিকতার হাহাকার শুনতে পেলাম।তাতে হয়ত আরো একটু নোনতা হয়ে গেল সমুদ্রের জল।শুনেছিলাম বাল্টিক সমুদ্রের ‘গালফ অফ ফিনল্যান্ড’-এ সবচেয়ে কম নোনতা জল পাওয়া যায় আর সবচেয়ে বেশি নোনতা ‘রেড-সী’র জল। চোখের জলের হিসেবটা এর ভেতরে নেই। সারা দুনিয়ার ৭.৮ বিলিয়ন মানুষের চোখের জলে কী আট নম্বর সমুদ্রটা হয়ে উঠত না?

আমি তো কিশোর কুমারের গান ‘আমি নেই আমি নেই’ গাইছিলাম।কে সহ্য করতে পারল না আমার গান? ইয়ে আমার মাথা নয়তো? ‘চল তোকে দিয়ে আসি সাগরের জলে’ বলে মাথাই কী প্ররোচিত করল আমায় ঝাঁপ দিতে?নাকি রাজনৈতিক কারণে খুন হলাম? আমি, ফেসবুকে নিয়মিত পোস্ট দিতাম মানুষের সমস্যা নিয়ে।শেষ পোস্ট ছিল, ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান’ এটা পড়ে অনেকেই খেপে গেল।কিছু মন্তব্য এরকমঃ

১. মোল্লার কবিতা আউড়াচ্ছিস?দাঁড়া তোর ব্যবস্থা হচ্ছে

২. বাংলাদেশে ভাগ শালা রিফুউজি!

৩.বৃন্ত মারাচ্ছিস বাঞ্চোত, তোরাই দেশের দুষমন

এরকম আরো।আমি ওদের কমেন্টের নিচে লিখেছিলাম,হাম্বা!তাহলে কী ওরাই?কিন্তু আমায় ফেসবুক থেকে ‘লোকেট’ করে আমার সলিল সমাধি করাবে এটা কেমন বাড়াবাড়ি মনে হল!আমি আমার মস্তিষ্ককেই জিগগেস করলাম, ‘মাজরা’ কেয়া হ্যায় ভাই?                                                                           মস্তিষ্ক চুপ।মস্তিষ্ক ‘খোয়া খোয়া চাঁদ’।সেই কবেকার কথা।আমি তখন সত্যিই নেই।একটা জ্বর এল।১৯৫৭।‘এশিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা’।বাবারই তখন এক বছর।প্রায় পঁয়তাল্লিশ লক্ষ আক্রান্ত। এগারোশোর মত মৃত। আতঙ্কের গ্রাসে ভারত।এর মধ্যেই দেবানন্দ। এর মধ্যেই খোয়া খোয়া চাঁদ, তাইতো মস্তিষ্ক?বাবার বাবা, ঠাকুর্দা’র কাছে সেই আতঙ্কের গল্প। ওষুধ নেই, ভ্যাক্সিন নেই। প্যান্ডেমিক।ধীরে ধীরে সব শান্ত হয়েছিল।সেই সূত্রে আমিও এলাম একটি পরিবারে। ছিলাম তিরিশ বছর। নাকি আছি এখনো? আমি আবার সেই জলের টানেলে একাকার হতে থাকি।সমুদ্র,মনে পড়ে আমি বসে আছি, বালুকাবেলায়?গান গাইছি, আমি নেই, আমি নেই, তারপর?মাথা আবার কিছুটা ভারী।স্বস্থানে ফিরে এল? হাত দিলাম, ফাঁপা মনে হচ্ছে না। মনে হলেই বা কী?এই যে জলান্তরীণ অবস্থা, এখানে স্মৃতি সচল ওই সমুদ্র অবধি। এমনটাও তো হতে পারে যে আমি সমুদ্র ভ্রমণ শেষ করে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।হতেই পারে।ভাবনাটা বাড়তে দিয়ে লাভ নেই। আমি বেঁচে আছি কিনা, জানিনা। না বেঁচে থাকলে বাড়িতে বাবা,মা,বোন,হায়!আমি ভয় পেতে শুরু করি। আতঙ্ক গ্রাস করতে থাকে আমায়।মৃত্যুর পরেও কী ভয় আর আতঙ্ক থাকে, অনুভূতি হারায় না? নাকি আমি বেঁচে আছি?

সেই হলঘর, যা আমার মস্তিষ্ক ছিল হয়ত, আমি পেরিয়ে এসেছি।আবার জলের টানে ভাসছি এখন। কিন্তু ভিজছি না।অশরীরি ভেজে না।তাহলে? ঘামতে থাকি। ভিজছি না কিন্তু ঘামছি। এতো, ‘খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না’ কেস।হাসি পায়।কান্না দলা পাকায়।এইসব মানবিক অনুভূতি তো এখনো। মাথার ভেতরটা একটু আগে দেখলাম, কোনও উত্তরই ছিলনা সেখানে। শুধু নীরবতা।নীড়হারা, নীরহারা, নীরবতার তা শুধু মস্তিষ্ক জুড়ে। কোনও আঘাতের চিহ্ণ নেই।কী যে অহেতুক একটা মাথা, তাও আমার, হায় আমারই!জল বয়ে যাচ্ছে, নিয়ে যাচ্ছে আমাকে।আমি বঙ্গ সন্তান।এতক্ষণ এই অফুরন্ত মাছেদের গাদা গাদা সাঁতার দেখিনি কেন? কত রঙ, কত যে বিচিত্র শরীর আর নাথামা সাঁতারের আঁকিবুকি এই অকাতরে হয়ে চলা মাৎসন্যায়ের ভেতরে।আমি ওদের জলকেলি দেখি আর নিজের ভাসন্ত শব বা শরীরের দিকে তাকিয়ে ভাবি এই যে জলের ‘টানেল’ এর শেষে কী আছে? যদি মরেই গিয়ে থাকি তাহলে কী আমি ধীরে ধীরে কোনও সামুদ্রিক মাছ হয়ে যাবো? হলে, যেন ডলফিন হই।এই হতচ্ছাড়া ভেসে যাওয়ার সময়েও আমার মনে পড়ল সুন্দরী মেয়েরা ডলফিন পছন্দ করে, মাঝে মাঝে চুমুও খায়!

হঠাৎ আমার গতি কমে এল।কী হতে চলেছে আমার?কিছুটা এগোতেই দেখলাম জলের সুড়ঙ্গ দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে আলো, অন্যদিকে অন্ধকার।আর একজন দাঁড়িয়ে আছে সেই বিভাজিকায়।আলো আর ছায়ার জলজ তরঙ্গ তারা শরীরে খেলছে, যেন আচ্ছাদন!এতক্ষণ পরে একজন মানুষ। আমি কথা হারিয়ে ফেললাম।এখন আমি আর সে মুখোমুখি।

সে-স্বাগত জলীক!

আমি-জলীক কী স্যার?

সে-ভাসমান জলের অলীক প্রাণ,জলীক

আমি-প্রাণ?আমি তাহলে বেঁচে আছি?

সে-প্রাণ মরেনা।বেঁচেই আছ।এবার সিদ্ধান্ত নাও কোনদিকে যাবে।ডানদিকে অন্ধকার, যদি যেতে চাও তো অনন্ত যাত্রায় ভেসে যেতে পারবে।মৃত্যুহীন।আর বাঁদিকে, যে দিকে আলো, যদি যাও পৌঁছে যাবে তোমার ফেলে আসা দুনিয়ায়।পৃথিবীতে।

হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে, ময়ূরের মত নাচেরে,ওফ্‌ রবি ঠাকুর!গুনগুন করতে করতে বললাম, স্যার আমি বাঁদিকেই যাবো।

সে হাসল।জোব্বা পরা।দাড়িগোঁফে আচ্ছাদিত তার মুখে আলো পড়তেই মনে হল রবীন্দ্রনাথ, অনেকটাই। বলল, তাহলে যাও। তবে ফিরে গিয়ে তুমি কিন্তু তোমার পরিচিত মানুষ আর পৃথিবীকে পাবে না।

আমি- কী বলছেন স্যার, পাবোনা কেন?

সে- তুমি ইতিমধ্যে এক হাজার বছর পেরিয়ে এসেছ। ওই যে আলোর পৃথিবী ওখানে সব পাল্টে গেছে।তুমি কিছুই চিনতে পারবে না, বুঝতে পারবে না।কী হবে ওখানে গিয়ে? তুমি বরং ডানদিকে যাও।একটা ডিঙি আছে দেখো।ভেসে পড়ো।আর মায়ায় জড়িও না।বাঁধন টাধন ছাড়ো।চলে যাও অনন্তযাত্রায়।

আমি মনে মনে হাসলাম। বুড়ো লোভ দেখাচ্ছে।যতই দেখাক, আমি বাঁদিকেই যাবো। পৃথিবীতে।বললাম, আমি বাঁদিকেই যাবো স্যার।

বুড়ো স্মিত হাসি হেসে বলল,যাও।

 

আলো ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে।আমি যাচ্ছি পৃথিবীর দিকে।মাথায় হাত দিয়ে দেখলাম, মগজের ভার নিয়েই সে স্বাভাবিক।বাইরে এসে দাঁড়ালাম,আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল।আর আমায় কারা যেন ঘিরে ফেলল।ধাতস্থ হতেই দেখি আমি কিছু ইউনিফর্ম পরা মানুষের হাতে বন্দী।সবাইকে একরকম দেখতে।সমুদ্রবুড়ো বলেছিল আমি আমি এক হাজার বছর পার করে ফেলেছি সমুদ্রের টানেলে।এরা নিশ্চয়ই বাংলা জানে। জিগগেস করলাম, আমি কোথায়? কেউ একজন যান্ত্রিক উচ্চারণে কিছু একটা বলল।ওর কথা বা আদেশ শুনে ছোট্ট একটা মোবাইল ধরণের কিছু এনে ধরা হল আমার সামনে আর আমায় ঈশারা করল কথা বলার জন্য। বললাম,আমি কোথায়?

-বাংলা!সামনের লোকটি ওই মোবাইলসাদৃশ্য যন্ত্রের দিকে তাকিয়ে হাসল।যাক, এরা হাসে তাহলে। সেই লোকটিই বলল, আপনি আমার সঙ্গে চলুন, আমি বাংলা জানি।আমার নাম আয়ুধ।

হাজার বছর ধরেই তাহলে আমি হেঁটেছি,থুড়ি সাঁতরেছি হে জীবনানন্দ।এখন আমি এই একইরকম দেখতে মানুষদের হাতে বন্দী।আমায় বেশ আপ্যায়ন করছে ওরা।খাওয়া দাওয়া পুরো বাঙালি মতে।দেখলাম, হাজার বছর পরেও ভাপা ইলিশ আর গলদা চিংড়ির প্রতি আমার দুর্বলতা একই রকম রয়ে গেছে।আমার হোস্ট সেই লোকটি এবার বলল, চলুন আমরা কথা বলি।তো শুরু হল কথা আমার আর আয়ুধের মধ্যে।

-এটা কী কলকাতা?

-না। এখন সারা পৃথিবীতে কোনও দেশ নেই। আপনি ‘গ্যাঞ্জেস জোন’ বা গঙ্গা বিভাগে আছেন।

-এখানকার ভাষা বাংলা নয়?

-বাংলাই। তবে আপনি দুনিয়াসেনাদের হাতে এখন। এখানে বহু ভাষাভাষীর সেনারা কর্মরত।আমিও তাই।

-আপনাদের সবাইকে এক দেখতে, মহিলারাও কী এরকম, মানে একইরকম দেখতে?

-হ্যাঁ

-সবাই একরকম, আপনাদের অসুবিধে হয়না?

-না

-নিজের প্রেমিকা বা বৌকে আলাদা করেন কীভাবে?

-গন্ধ আর শব্দতরঙ্গ দিয়ে

-মানে?

-প্রত্যেকের আলাদা গন্ধ আর শব্দতরঙ্গ আছে ।গন্ধটা আর শব্দটা কোডেড।প্রয়োজনমত সক্রিয় হয়ে ওঠে।

-কিন্তু এটা করতে হল কেন?

-ভাইরাসের জন্য!

-ভাইরাস?

-হ্যাঁ, একটা ভাইরাস প্রায় তিনশো বছর আগে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল।ভাইরাসের আক্রমণ তো বারেবারেই হয়েছে, আপনি যে সময়ের তখনো করোনা ভাইরাস সারা দুনিয়াকে তছনছ করে দিয়েছিল।মনে পড়ছে?

-হাল্কা মত। আমি পুরীতে তখন। লকডাউন শুরু হল।আমি সমুদ্রের ধারে বসে গান গাইছিলাম,হঠাৎ..

-আমরাই একটা সময়ঘূর্ণি তৈরি করে সময়সুড়ংগ দিয়ে আপনাকে আমাদের কাছে নিয়ে আসি

-ইয়ার্কি নাকি, কেন আনবেন আমায়, আমার বাবা,মা,বোন..তারা কী অবস্থায় আছে আমি জানিনা,কেন করলেন এরকম?

-আমরা জানাতে চাইছি যে দুনিয়াতে কী কী হতে পারে ভবিষ্যতে।আপনি আমাদের সার্চ টিমের কাছেই ছিলেন, আমাদের তাড়া ছিল স্যাম্পল যোগাড়ের।তো আমাদের টাইম ডিটেক্টরে আপনি যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন।আপনি অবিবাহিত, এটাই আপনাকে যোগ্য প্রতিনিধি করে করে তুলেছিল।

-আমি জেনে কী করবো?আমি তো এক হাজার বছর পেরিয়ে এসেছি, তাছাড়া প্রতিনিধি মানে, কিসের প্রতিনিধি?

– আমরা বিভিন্ন ভাইরাসকালীন সময়ের স্তর থেকে প্রতিনিধি যোগাড় করছি।আপনি করোনা ভাইরাসের সময়ের প্রতিনিধি।আপনাকে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় আমরা এখনকার মানুষ করে তুলবো, এই ‘এক্সপেরিমেন্টে’র জন্য আমাদের জ্যান্ত শরীরের প্রয়োজন ছিল। একইভাবে স্প্যানিশ ফ্লু, এশিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা্র সময়ের প্রতিনিধিও এখানে আছে।

আমার মাথা ঘুরছিল।হায়, কেন যে দক্ষিণপন্থী হয়ে ডানদিকের রাস্তাটা নিলাম না। আমার তো সবই গেল দেখছি।এমনকি মুখটাও।

-আমায় আপনাদের মত করে দেবেন মানে? আমার মুখ আর শরীরও আপনাদের মত হয়ে যাবে?

-হ্যাঁ।এছাড়া অন্যকোনও উপায় নেই, আমরা প্রোগ্রামিং-এর সাহায্যে আপনাদের এই সময়ের জন্য ‘আপডেট’ করে দেবো,নইলে বাঁচবেন না আপনারা।

-বাঁচবো না মানে, আমি কী এখন বেঁচে আছি? আর থাকলে মরবোই বা কেন?

-আজ থেকে প্রায় তিনশো বছর আগে ‘ডি ভাইরাস’-এর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে সারা দুনিয়ায়। ‘ডি’ ফর ‘ডেমন’।কিছুতেই এর মোকাবিলা করা যায়নি। ‘এয়ারবোর্ণ’ ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তিনদিনের মধ্যেই ‘মাল্টি অর্গান ফেলিওর’ হয়ে যাচ্ছিল। মানুষ মারা যাচ্ছিল কাতারে কাতারে। প্রায় একশো কোটি মানুষ মারা যায় ওই সময়ে।এরকম অদ্ভুত পরিস্থিতিতে সব দেশ একজোট হয়ে একটা কেন্দ্রীভূত সরকার তৈরি করে। শুরু হয় এই ভাইরাসকে আটকানোর জন্য নানাধরণের পরীক্ষা নিরীক্ষা। বছরখানেকের মধ্যে বিজ্ঞানীরা সফল হয়, না ওষুধ বা ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করে নয়, তারা মানুষের প্রটোটাইপ তৈরি করার জেনেটিক কোড তৈরি করে ফেলে।

আমি অবাক হয়েই শুনছিলাম।একশো কোটি লোক মারা গিয়েছিল!আমি যে সময়ের তার থেকে সাতশো বছর পরে, ‘মাই গুডনেস’!কিন্তু এই ‘জেনেটিক কোড’ ব্যাপারটা কী?

আয়ুধ কী ‘থটরিডিং’ জানে? বলল, বিজ্ঞানীদের কাছে তখন একটাই বিচার্য বিষয় ছিল ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া আটকানো।কিন্তু কিভাবে?ভাইরাস মানুষের শরীর চায় বেঁচে থাকার জন্য। আবার যে শরীরকে সে আক্রমণ করে সেই শরীরেই সে ‘অ্যান্টিবডি’ তৈরি করে দেয়। আপনাদের ‘করোনা ভাইরাসে’র সময়েও রক্ত থেকে ‘প্লাজমা’ আলাদা করে আক্রান্তদের দেওয়া হয়েছিল ‘অ্যান্টিবডি’ তৈরি করার জন্য।তো, বিজ্ঞানীরা দেখলো যদি এই পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে একটা ‘জেনেটিক কোডে’র আওতায় এনে একই রকম করে ফেলা যায় তাহলে একটা উপায় বের করা যেতে পারে।আবার ‘এক্সপেরিমেন্ট’ চলল। রাতদিন।তারপর ওই ‘জেনেটিক কোড’ আবিষ্কার করে ফেলল বিজ্ঞানীরা। দশ বছরের মধ্যে সমস্ত মানুষকে একটাই ‘জেনেটিক কোড’-এ নিয়ে আসা হল।এটা করার সময় তাদের নিজস্ব ‘জিন’ আলাদা করে সুরক্ষিত ‘লকার’-এ রাখা হল ভবিষ্যতের জন্য, যাতে ভবিষ্যতের কোনও আজানা রোগে কাজে লাগানো যেতে পারে।

-কিন্তু সংক্রমণ আটকালো কিভাবে?

-খুব সহজে। ধরুন ভাইরাস আমায় আক্রমণ করল, আক্রান্ত আমার ভেতরে ‘অ্যান্টিবডি’ও তৈরি হতে শুরু করল। একইসঙ্গে আমার ‘প্রোটোটাইপ; সবার মধ্যেও ‘অ্যান্টিবডি’ তৈরি হতে শুরু করল, নিজে থেকেই।ভাইরাস আর নতুন শরীর পেলো না।পেলেও বিশেষ ক্ষতি করতে পারল না এবং ধীরে ধীরে মুছে গেল দুনিয়া থেকে।তবে এখানে ‘জিনপ্রযুক্তি’র কিছু খেলা আছে যা আমাদের সবাইকে আলাদা করেও বিভিন্ন আক্রমণ থেকে রক্ষা করে, ধরুন আমার ‘স্টমাক প্রব্লেম’ হলে বাকি সবারও হবে, এমনটা নয়।যাইহোক,আমি যা বললাম তার চেয়েও অনেক জটিল ব্যাপার আছে, প্রক্রিয়া আছে, বিজ্ঞানীরা সেসব জানে।আমাদের অত জেনেই বা কী হবে? এবার আমার সঙ্গে চলুন।তিনদিন লাগবে আপনাকে এই সময়ের উপযোগী করে তুলতে।আপনার চেহারা আমাদের মত হয়ে যাবে।আপনার একটি বিশেষ গন্ধ আর শারিরীক তরঙ্গের কোড থাকবে যা দিয়ে আপনাকে আলাদা করা যাবে।আমাদের এই সমাজে দেখার ক্ষেত্রে এ খারাপ আর ও ভাল’র কোনও ব্যাপার নেই।মেধার ক্ষেত্রে আছে আর এটা লটারি করে ঠিক করা হয়।যে যা হবে তাকে সেই অনুযায়ি ‘প্রোগ্রাম’ করে দেওয়া হবে। আমায় দেওয়া হয়েছিল সৈনিক হওয়ার প্রোগ্রাম।একনাগাড়ে এতটা বলে আয়ুধ হাসল।হাসিটা বেশ নির্মল।আমার হঠাতই মনে হল, এই নতুন দুনিয়ায় মানুষ অনেকটাই ভাল হতে পেরেছে।চুরি চামারি নেই। দুর্ণীতি নেই। রেপ নেই। শোষণ নেই। যুদ্ধ নেই।সারা পৃথিবী এখন একটাই দেশ।একটাই সরকার।একটাই সেনাবাহিনি।স্বপ্ন মনে হচ্ছে, তাইনা?

 

আমি এখন আমার নতুন জন্মের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।আমি আর আমি থাকবো না। মনে পড়ল একহাজার বছর আগে পুরীর সমুদ্র। আমি রাতের ঢেউ দেখতে দেখতে গাইছি, আমি নেই আমি নেই, ভাবতেই ব্যথায় ব্যথায় মন ভরে যায়…

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

কোন্‌ নটিনীর ঘূর্ণি-আঁচল

গৌতম বসু


‘তোমার নিজের এবং বিশ্বপ্রকৃতির গভীরে কত-কি যে চাপা প’ড়ে আছে এতকাল, তার কোনও হদিস তোমার কাছে নেই; জীবনপ্রবাহের বহির্ভাগে, পরিতৃপ্ত মনে তুমি দিন কাটাচ্ছিলে, ঠিক যখন, ওই যাতনা, যা স্বয়ং মরণদশার অতিনিকটস্থ, অকস্মাৎ তোমায় আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে, সত্বর পাঠিয়ে দিল নিঃসীম,জটিল এক অঞ্চলে, যেখানকার উত্তাল ঘূর্ণাবর্তে তোমার অন্তর্মুখী সত্তা আজ সম্পূর্ণ দিশাহারা।’

এমিল চোরান (১৯১১-১৯৯৫)

*

‘পদ্যচর্চা’র বন্ধুরা,

 

একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বাঙলার কোনও-কোনও গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের বিক্রয়কেন্দ্রগুলিকে ভুষিমালের দোকান নাম দেওয়া হলেও, মনিহারি দোকান বললেই যেন ঝপ্‌ ক’রে একটা পরিচিত ছবি ভেসে ওঠে। এখানে দাঁড়িয়ে থেকেও, নিজেকে আমি চিনুদা-র দোকানে দেখতে পাই, দশ নয়া পয়সা মুঠোয় নিয়ে সারি-সারি কাচের বয়ামের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে রেখেছি, অপেক্ষা করছি, কখন পয়সাটা তুলে নেওয়া হবে এবং তার জায়গায় আমি পেয়ে যাব পুরানো খবরের কাগজে মোড়া আধ মুঠো মৌরী লজেন্স। চটিজুতোর ঘষ্টানিতে ঈষৎ ঝাপসা হয়ে-আসা খড়ির গণ্ডিতে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে অনুভব করি, এতগুলি দশক পার হয়ে এলেও মূল অবস্থার এতটুকু পরিবর্তন হয় নি। বিষয়টি সূক্ষ্ম ; নিজেকে বোঝাই, এখনই অতসব না ভাবলেও চলবে। তার চেয়ে বরং মুদির দোকানের এই নবার্জিত উচ্চাসনের বিষয়টি নিয়ে ভাবা যেতে পারে। পাড়ায়-পাড়ায় মুদির দোকানের মালিকদের এখন সম্পূর্ণ অন্য চোখে দেখা হচ্ছে। দশ বিশজন পাইকারি বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তাঁরা কয়েক শো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমাদের জন্য এতদিন ধ’রে নীরবে সংগ্রহ ক’রে এনে, পসরা সাজিয়েছেন আমাদেরই জন্য, সে-কথা কি একবারও ভেবে দেখার অবসর হয়েছে? স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমি ধ’রেই নিয়েছিলাম দোকানে গিয়ে দাঁড়ালে, এক টিউব দাঁতের মাজন পেয়ে-যাওয়া আমার জন্মগত অধিকারের মধ্যে পড়ে। প্রকৃত অবস্থা যে তা নয়, সে-বিষয়ে আমি যে অবহিত ছিলাম না এমন নয়, বরং বলা ভাল, সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছিলাম। সাহিত্যও এক সমান্তরাল অবস্থা। অকস্মাৎ, কান ধ’রে শিখিয়ে দেওয়া হল, কোন্‌ লেখা দাঁতের মাজনের মতো অনিবার্য, আর কোন্‌টা তা নয়। কোন্‌ নটিনীর ঘূর্ণি-আঁচল লাগল আমার গায়ে!

আমার নোটবইখানা তার চরিত্র পাল্টে ফেলে কীভাবে কোভ়িডের-১৯এর হিসেবের খাতা হয়ে উঠল, তা আমাকে অবাক করে না। মাস দেড়েক আগে যখন শুরু করেছিলাম তখনই সারা পৃথিবীতে আক্রান্তের সংখ্যা সদ্য ৫ লক্ষ পেরিয়েছে, প্রয়াত মানুষদের সংখ্যা ২৩ হাজার। আজ সেই সংখ্যা যথাক্রমে সাড়ে ৩৭ লক্ষ ও ২ লক্ষ ৬৩ হাজার। আমি ভাবি, সেই ২ লক্ষ ৬৩ হাজার মানুষ, আরও কয়েক লক্ষ মাইগ্রেন্ট শ্রমিক পরিবারকে ডেকে নিয়ে, সকলে মিলে একটা মাঠে জড়ো হয়ে, শিল্পসাহিত্য ও কৃষ্টি বিষয়ে একটিও প্রশ্ন যদি তোলেন, তার কী জবাব আছে আমার কাছে ?

নমস্কার। ইতি বুদ্ধপূর্ণিমা ১৪২৭।

নিভৃতবাসের কড়চা

গৌতম চৌধুরী


এক-কা দোক-কা

স্বভাবদোষে বা গুণে, কিছু কিছু কিছু মানুষ একটু একলসেঁড়ে হন। একলসেঁড়ে, না একলাপন? একটু লাজুক, মুখচোরা, দলছুট, ভিড়ের ভিতর মানাইয়া লইতে না-পারা – এমন বহু জনকেই আমরা সমাজের নানা এলাকায় কমবেশি দেখিতে পাই। শুধু কবিরাই যে একাকী মানুষ, তাহা বোধহয় নয়। কবিদের ভিতরেও অনেকেই দিব্য সামাজিক। অজানা জায়গায় অচেনা মানুষের সাথে অনেক কবিই এন্তার আলাপ জমাইয়া লইতে পারেন। বড় বড় সভাসমিতিতে মন্ত্রী-সান্ত্রীদের সাথে মঞ্চভাগ করিতেও বেশ সড়গড়।

   হ্যাঁ, কবিদের ভিতরেও অনেকে একটু একটেরে ধরনের হন বটে। উল্টাদিকে চেনা মানুষ দেখিলে, অভিমুখ পাল্টাইয়া অন্যদিক বরাবর হাঁটা দেন। আপনমনে বিড়বিড় করেন। কিন্তু, এমনটি তো শুধু জীবনানন্দ নন, আমাদের ইস্কুলের ইতিহাস-মাস্টারমশাই মিহিরবাবুও আপন মনে বিড়বিড় করিতেন। একদিন খালি টিচার্স রুমে হঠাৎ ঢুকিয়া পড়িয়া শুনি, বিড়বিড়, তবু বেশ খানিক স্পষ্ট স্বরেই, মিহিরবাবু বলিতেছেন – সিরাজ জিতেছে সিরাজ জিতেছে, মোহনলাল ক্লাইভকে পিছমোড়া ক’রে বেঁধে নিয়ে গেছে। তখন নিতান্ত বালক, ভাবিলাম স্যার বুঝি কোনও থিয়েটারের পাঠ মুখস্থ করিতেছেন!কানমলার ভয়ে ঝটপট কাটিয়া পড়িলাম।

   কেহ বলিতে পারেন, মিশুক অমিশুক যেমনই হউন, লিখিবার সময় তো কবি একেবারেই একা। বিলকুল নিঃসঙ্গ! কথা সহি। কিন্তু, কেহ যখন অঙ্ক কষেন বা অণুবীক্ষণে একটি ভাইরাসের চেহারা-সুরত ঠাহর করেন বা পায়ের অজানা কারসাজিতে প্রতিপক্ষের জালে বলটি ঢুকাইয়া দেন – সেইসব মুহূর্তে সেই সেই মানুষগুলিও কি একা নন? তাহা হইলে স্রেফ কবিদের কপালে একাকিত্বের বরমাল্য কেন!

   আমার তো বরং মনে হয়,এমনিতে যদিবা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কোনও কবি একা সময় কাটানও, কবিতা রচনার মুহূর্তে তাঁহার একা থাকিবার জো-টি নাই। সেইসব সময় তাঁহার তো সেই অন্য-আমিটিকে চাইই,যে-আমি কোথায় যেন ঘাপটি মারিয়া থাকে,শুধু মাঝে মাঝে দেখা দেয়। মাঝে মাঝে, যখন রচিত হয় কবিতারচনার মুহূর্ত। যখন, সেই অপর-আমিই কবিকে উস্কানি দেয় এক হইতে বহু হইবার জন্য। একভাবে সে-ই যেন কবির অব্যবহিতের পরিমিতকে অ-পরিমিত, লৌকিককে অ-লৌকিক করিয়া তুলে, শেষ তক এই সবকিছু যাহাতে ‘সকলসহৃদয়হৃদয়সংবাদী’ হইয়া উঠে।

   এতসব কাণ্ডকারখানা কাহার? সে কি তবে কবির মনের গহনে তলাইয়া-থাকা নিজেরই চির-অচেনা আত্মরূপ? অর্থাৎ কি না, তাঁহারই মনের মানুষ! যে-নামেই তাহাকে ডাকা হউক,পিদিমে ঘষা লাগিবা মাত্র সে হাজির। কবি ভালোই টের পান, আর তিনি একা নাই। নহিলে কাহার সহিত সংকেত বিনিময় হয় তখন, এমন কি দু’একটি অস্ফুট কথাবার্তাও চলে। একটি থিতু দশা হইতে কে সহসা সুতা বাড়াইয়া উড়াইয়া দেয় ঘুড়ি, সহসা ঘষ করিয়া কাটিয়ে দিতে বলে শব্দ, এধার ওধার করিয়া দেয় লাইন? কবিতা শেষ হইল তো সেও হাওয়া। হ্যাঁ, তখন খানিক ক্ষণের জন্য কবি একা বটে। সাততলা আসমানে যে-বন্ধুর বাস, তাহাকে কি যখন তখন পাওয়া যায়!

নৌকা না কি সাঁতার

আচ্ছা, আসমানে চড়িবার কি কোনও শর্টকাট আছে? না, আকাশপ্রসূন রচনার কথা বলিতেছি না। সে তো শুইয়া বসিয়া নাক ঝাড়িয়া যেমনভাবে খুশি রচা যায়। বলিতেছি সেই সাততলা আসমানের কথা, যেখানে আমাদের দোস্ত মহাশয় লুকাইয়া থাকেন, আমাদের না-লেখা কবিতাটির ভবিতব্য লইয়া। আসমান না-হইয়া সে-জায়গা গহন অটবীও হইতে পারে। বা দরিয়ার অতল। কে বলিতে পারে!শুধু টের পাওয়া যায়, আমাদের এই তুচ্ছ শরীরেরই, যাহার অংশ আবার মনও,গোপন ফাঁকফোকরে কোথাও সেই আসমান বা অটবী বা দরিয়া। শরীর না-বলিয়া অস্তত্ব বলিলে বুঝি কেউ কেউ বেশি খুশি হইবেন।

   মনে পড়িল, এ-বাবদে শক্তি চট্টোপাধ্যায় একটি জনপ্রিয় প্রবচন চাউর করিয়াছিলেন। মাঝে প্রায় আধা শতক কাটিয়া গেলেও, এখনও লোকস্মৃতিতে সেই সদুক্তিকর্ণামৃত ভালোমতোই ধরা আছে – মদ্যই আমাকে পদ্যের কাছাকাছি লইয়া যায়। আমার তো জবরদার ধারণা, ইহা ছিল স্রেফ একটি অনুপ্রাস-ঝংকৃত ‘শাক্ত’ রসিকতা মাত্র। লোকায়ত সাধকের চোখে যেমন ‘তোমার পথ’ মন্দিরে-মসজিদে ঢাকিয়া দেয়, মদ্যপানে পাওয়া তুরীয়তা কি সেইভাবেই কবিতার নিরিবিলি রাস্তাটিকে আচ্ছন্ন করিয়া দেয় না? নাজুক পতঙ্গেরা তবু দলে দলে মহাজন-পন্থা ঠাওরাইয়া পাত্রস্থ তরলে জম্পেশ সাঁতার কাটিলেন। অবশ্য শেষ তক পাড়ের অপাত্রে গিয়া ভিড়িতে পারিলেন কি না, তাহা ঠাহর করিবার জন্য টেমার লেনের ছোটকাগজের মহাফেজখানায় গিয়া আতশ কাচ লইয়া বসিতে হইবে।

   রসিকতা বাদ। আদত প্রশ্নটি তবু উটের মতো মুখ বাড়ায়। বাহিরের কোনও উপকরণ বা প্রকরণ এস্তেমাল করিয়া কি সেই পরানবন্ধুর দেখা পাওয়া যায়? ফিলহাল প্রশ্নটি আবার করিয়া জাগিল, স্নেহভাজন এক তরুণ কবির সহিত আলাপচারিতার সূত্রে। দিনকয় আগে তিনি জানাইলেন,ঘরবন্দি দশার মওকায় তিনি চুটাইয়া ধ্যান করিতেছেন। একটু অবাকই হইলাম। অক্ষরের পিছু-ধাওয়া না-করিয়া কবি ধ্যান করিতেছেন!পরে ভাবিয়া দেখিলাম, ধ্যান করিয়া যদি তিনি আনন্দ পান শান্তি পান, ধ্যান তো তিনি করিতেই পারেন। ইহা লইয়া খামোখা অবাক হইবার কী আছে!মানুষ তো শারীরিক সুস্থতা বহাল রাখিবার জন্য কতরকম কসরত করে ব্যায়াম করে। তাহা হইলে ধ্যান করিয়া যদি কেহ ভালো থাকেন,আপত্তি কিসের!ভালো থাকিতে-চাওয়া তো অনৈতিক কিছু নয়। কিন্তু খটকা এই যে,কবির যে-নিরাময়-অযোগ্য বিস্ফোরণ-উন্মুখ মনোভার,তাহা কি ধ্যানে প্রশমিত হয়? আর যদি প্রশমিতই হইল, তাহা হইলে আর কবিতা হয় কেমনে!

   ইহা সত্য যে, ভালো থাকিতে হইবে, এই আকাঙ্ক্ষাই মানব স্বভাব। কিন্তু,সেই স্বভাবের বাহিরে গিয়া, অর্থাৎ ভালো থাকিতে চাহিবার যে সহজাত মানব প্রবৃত্তি, হয়তো বা তাহাকে ব্যাহত করিয়াও, কবিতা মনে হয় নিজেই অন্য আর এক রকম ভালো থাকিবার পথ দেখায়। কবিতা রচনাতেই কবির চিরবেদনার ক্ষণিক উপশম। কবিতাই কবির ধ্যান ও জ্ঞান। নদী পার হইবার জন্য যদি কেউ নৌকায় চড়িতে চান, চড়িতেই পারেন, কিন্তু জটিল-কোমল অতলবিথারি জলে সাঁতার কাটা আর তাঁহার হইবে কেমনে!

   ধ্যানে বা পানে,নিজ নিজ তরিকায় শান্তি পাইবার অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু কবিদের জন্য কি এ-ভবসংসারে কোনও শান্তি বরাদ্দ আছে!

মহাজন পদ

 

দুঃস্বপ্ন! কী? না, তুমি বুঝি পাশে নাই। মনে হয়, দুনিয়া জুড়িয়া কী এক গভীর ফিসফাস চলিতেছে। বুঝি বা পায়ের তলা হইতে মাটি সরিয়া যাইবে। ভয়ে, আকাশকেই আঁকড়াইয়া ধরিবার জন্য দুই হাত বাড়াইয়া দেই। কিন্তু আকাশ তো শূন্য। চমকাইয়া ঘুম ভাঙিয়া যায়। দেখি, আমার পাশেই দিব্য বসিয়া আছ তুমি। মাথা নিচু করিয়া পশম বুনিতেছ – ‘সৃষ্টির অমোঘ শান্তি সমর্থন করি’। রোগশয্যায় কবিতাবহির ৩৯ নং এই কবিতা কি তবে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত শান্তির জন্য আর্তির কোনও প্রকাশ? হইতেই পারে। দীর্ঘ অসুস্থতার মধ্যে তখন চলিতেছে জীবনের সহিত মৃত্যুর সহিত তাঁহার শেষ বুঝাপড়া। মাত্র একদিন আগেই উচ্চারিত হইয়াছে সেই নির্মম অনুভব – ‘ধূসর গোধূলিলগ্নে সহসা দেখিনু একদিন/ মৃত্যুর দক্ষিণ বাহু জীবনের কণ্ঠে বিজড়িত’। সেই প্রায়-অন্তিম রোগশয্যার পাশে পশম বুননরত একটি প্রিয় অবয়বের উপস্থিতি তো তখন হইয়া উঠিতেই পারে, জ্বরতপ্ত সময়ের কপালে যেন প্রশান্তির এক জলপটি।

   কিন্তু সময় যে তখন অন্যভাবেও জ্বরতপ্ত। ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলিতেছে পুরাদমে। ইয়োরোপ জ্বলিতেছে। জ্বলিতেছে এশিয়াও। তীব্র অসুস্থতার ভিতরেও কবি কিন্তু ঘটনাপ্রবাহের দিকে সজাগ। আর দুনিয়াজোড়া সেই মৃত্যুপ্রবাহের আবর্ত তাঁহাকে রক্তাক্তও করিতেছে। তাই ওই একই দিনে (৫ ডিসেম্বর ১৯৪০), একই সকালে,আর এক কবিতায় তিনি লিখিয়া ফেলিয়াছেন – ‘ধর্মরাজ দিল যবে ধ্বংসের আদেশ/ আপন হত্যার ভার আপনিই নিল মানুষেরা।/ ভেবেছি পীড়িত মনে,পথভ্রষ্ট পথিক গ্রহের/ অকস্মাৎ অপঘাতে একটি বিপুল চিতানলে/ আগুন জ্বলে না কেন মহা এক সহমরণের।’ তখন বুঝা যায়, বুঝি ততদূর ব্যক্তিগত শান্তি নয়,এক বৈশ্বিক শান্তিরই প্রতিমা রচনা করিতে চাহিয়াছেন কবি, নীরবে পশম বুনিয়া-চলা এক অস্তিত্বের উষ্ণতায়। বুননের সেই নিবিড় নির্বিঘ্নতার ভিতর দিয়া যেন ‘সৃষ্টির অমোঘ শান্তির’ প্রতি বিশ্বমানুষেরই একাগ্র ‘সমর্থন’ ঝরিয়া পড়িতেছে।

   ব্যক্তিজীবনের প্রশান্তি কোনওদিনই কি খুব কাম্য ছিল ঠাকুরের? অন্তত ততদূর কাঙ্ক্ষিত, যে,তাহার আহাজারিগুলি কবিতা ঘনাইয়া তুলিবার বিভাব বা অনুভাব হইয়া উঠিয়াছে? বরং উলটাই তো দেখিতে পাই তাঁহার রচনার সাক্ষ্যে। গীতিমাল্য-এর ৬৯নং কবিতায় যাহার স্পষ্ট প্রকাশ ঘটিয়াছে এইভাবে – ‘তোমার কাছে শান্তি চাব না,/ থাক-না আমার দুঃখ ভাবনা’। কী আশ্চর্য, জীবনের আখেরি পঙক্তিমালার ভিতরেও তাঁহাকে বলিতে শুনি – ‘আমৃত্যু দুঃখের তপস্যা এ জীবন,/ সত্যের দারুণ মূল্য লাভ করিবারে,/ মৃত্যুতে সকল দেনা শোধ ক’রে দিতে’ (১১নং কবিতা, শেষ লেখা)। কবির ভবিতব্যতার ভিতর যে শান্তির কোনও ফুরসত নাই, বা তেমন শান্তির মুহূর্ত কখনও রচিত হইলেও, তাহা যে নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী তাহা কি হাড়ে হাড়ে টের পান নাই জীবনানন্দও? এমনকি বনলতা সেন, সেও দুদণ্ডই শান্তি দিতে পারে মাত্র। কবিতালিপ্ত জীবন ‘ক্ষুধা প্রেম আগুনের সেঁক’ চাহিয়া শেষ পর্যন্ত ‘হাঙরের ঢেউয়ে … লুটোপুটি’ খায়। ব্যক্তিগত শান্তির অধিকারই যেন তাহার নাই। আত্মজীবনীর শান্তিকে হরপলক জলাঞ্জলি দিতে দিতে সে ভাবে কোনও দূরতর শান্তিকল্যাণের কথা। সেই পাথর-ছড়ানো পথে চলিতে চলিতে একদিন সে টের পায় বটে – ‘প্রশান্তিই প্রাণরণনের সত্য শেষ কথা’। তবে, ব্যক্তির একবচন হইতে কবি তখন পঁহুছিয়াছেন মানুষের বহুবচনে –

আমরা মানুষ ঢের ক্রূরতর অন্ধকূপ থেকে

অধিক আয়ত চোখে তবু ঐ অমৃতের বিশ্বকে দেখেছি;

শান্ত হয়ে স্তব্ধ হতে উদ্বেলিত হয়ে অনুভব ক’রে গেছি

প্রশান্তিই প্রাণরণনের সত্য শেষ কথা, তাই

চোখ বুজে নীরবে থেমেছি।     (মৃত্যু স্বপ্ন সংকল্প, বেলা অবেলা কালবেলা)

পুরনোতুন মানুষ

যতই না কেন নিভৃতবাসে দিন কাটাই, একবচনের বহুবচন হওয়া আটকায় না। এই দুর্দিনে শারীরিক দূরত্বের অভ্যাসটি মানুষ কবুল করিলেও, সামজিক দূরত্বের ধারণা দুনিয়া জুড়িয়া আপসেই বাতিল হইয়া গিয়াছে। বিশেষ করিয়া সামাজিক সংযোগমাধ্যমের বদৌলতে যখন সারা দুনিয়া হইতে তথ্যের ঢেউ আসিয়া ব্যক্তির দেউড়ি টপকাইয়া নাকের ডগায় আছড়াইয়া পড়িতেছে আটপ্রহর। ফলে, পহেলাই যাহা টের পাইতেছি, মৃত্যুর এই দিগন্তবিথারী সংখ্যার ভারে, অভিধান হইতে ভাসিয়া উঠিয়াছে দুইটি শব্দ – পৃথিবী আর মানুষ। ভাসিয়া উঠিয়াছে, তাহাদের প্রকৃত অর্থ লইয়া। অত্যন্ত হেলাফেলার এই শব্দ দুইটি আজ লাশের পাহাড় হইতে প্রতিনিয়ত উচ্চারিত হইতে হইতে আমাদের মনে করাইতেছে, এই গ্রহ আসলেই একটি সামগ্রিকতা, আমরা আসলেই একটি একক প্রজাতি। হায়, এই সামান্য স্মৃতিটুকু উস্কাইতে আসরে নামিতে হইল এমন একটি অণুজীবের, যাহার ওজন মাত্র ০.৮৫ অ্যাট্টোগ্রাম। ১ অ্যাট্টোগ্রাম = ১০(-)১৮ গ্রাম!

   দেখিলাম, দুনিয়া জুড়িয়া ভীত মানুষ ঘরবন্দি হইবার কয়েক দিনের মধ্যেই আবহাওয়া সাফ হইল, তাপমাত্রা কমিল, কোণঠাসা ভূচর জলচর ও খেচর প্রাণীরা ফুর্তির সহিত নানান মহানগরের আনাচে কানাচে তাহাদের অস্তিত্ব জানান দিল। দেখিলাম, বিমানবন্দরে বন্দরে পাল পাল বিমান মুখ থুবড়াইয়া ঝিমাইতেছে। দেখিলাম, তেল কিনিলে খরিদ্দার উপরন্তু কিছু পয়সা পাইতেছে। দেখিলাম, গাড়িনির্মাতা রোলস রয়েস কোম্পানি মধু বানাইতেছে। এসব কি রূপকথা!না কি গ্রেটা থুনবার্গের অশ্রুরুদ্ধ ক্রোধের অভিব্যক্তি অবশেষে শুনিলেন প্রকৃতি!

   এইসব কল্পচিত্রের পাশাপাশি, এই নিভৃতবাসেই, একটি কেতাবের কথা জানিলাম। তাহার নামটি প্রায় কোনও উপন্যাসের মতো – এক ডুবন্ত জাহাজের পহেলা শ্রেণির যাত্রীরা (First Class Passengers on a Sinking Ship)। উপন্যাস নয়,গবেষণামূলক নিবন্ধ। বিষয়, ঐতিহাসিক সমাজতত্ত্ব। লেখক এক মার্কিন বিদ্বান, অধ্যাপক রিচার্ড লাখমান। এই বহিতে তাঁহার চমকপ্রদ পর্যবেক্ষণ হইল, দুনিয়ার বুকে মার্কিন দাদাগিরির দিন ঘনাইয়া আসিয়াছে। আধুনিকতম সামরিক প্রযুক্তির অধিকারী হইয়াও তাহাদের সেনাবাহিনি হালফিল এমন কি দুর্বলতম প্রতিপক্ষের সহিতও আঁটিয়া উঠিতে পারিতেছে না। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মুখে মার্কিন পুঁজিও দিকে দিকে মুখ থুবড়াইয়া পড়িতেছে। ফলে, দুনিয়ার যেকোনও বিষয়ে শেষ কথা বলিবার কর্তৃত্বের রাশ আলগা হইয়া পড়া ঠেকাইবার এলেম আর সে-দেশের নাই। অধিপতির তখত হইতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবশ্যম্ভাবী পতন তাই এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। বহিটি জানুয়ারি ২০২০তে প্রকাশিত। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অতিমারি তখনও মার্কিন মুলুকে থাবা বসায় নাই। তাহার পর পরিস্থিতি কোথায় পঁহুছিয়াছে, তাহা আমরা রোজই দেখিতেছি। দুনিয়ার ‘উন্নততম’ দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবার এমন নাজুক হাল!উন্নতির সূচক কি শুধু অস্ত্র উৎপাদন?

   লাখমান সাহেবের মাথায় ফুল-চন্দন পড়ুক, চাকা কি সত্যই ঘুরিতেছে? নিজ নিজ দেশের জিডিপির ৪% সামরিক খাতে বরাদ্দ করিবার মার্কিন হুকুমত ইতোমধ্যেই ন্যাটোভুক্ত দেশগুলি অগ্রাহ্য করিয়াছে। এমন কি ২০১৯এ ২৮টির মধ্যে মাত্র ৯টি দেশ প্রস্তাবিত ২% অর্থ গোলা-বারুদ বোমা-বন্দুকের পিছনে বরাদ্দ করিতে পারিয়াছে। আন্তর্জাতক অতিমারির ফলে এই খাতে খরচ আরও কমিবে বলিয়া ‘আশংকা’। ইহা হইতে সুসংবাদ আর কী হইতে পারে!

   কয়েক লক্ষ মৃত্যুর ভিতর দিয়া তবে কি এমন একটি সম্ভাবনা জাগিতেছে, যে, প্রকৃতির কর্তাসত্তা মানিয়া লইবার বুঝ এইবার গজাইবে মানুষের? প্রকৃতিকে মান্যতা দেওয়ায় কি মানুষের পরাভব? কেনই বা তাহা হইবে! মানুষ তো প্রকৃতিরই অংশ। এইটি ভুলিবার শুরু জীবাশ্ম-জ্বালানিভিত্তিক সভ্যতার শুরু হইতে। যত জলদি সম্ভব সেই সভ্যতার অন্তর্জলী শুরু হউক।

   করোনা সংক্রমণকে জয় করিয়া আসা স্পেনের প্রবীণতম নারী, প্রণম্য মারিয়া ব্রান্যাস (১১৩)-এর কয়েকটি কথা এই সূত্রে আমাদের কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল। তাঁহার নিভৃতবাসের কক্ষ হইতে দুনিয়ার মানবতার উদ্দেশে তিনি লিখিলেন – ‘ কিছুই আর ঠিক আগের মতো চলিবে না। পুনর্বিন্যাস, পুনরুদ্ধার, পুনর্নির্মাণ – এসব কথা আর মাথায় আনিয়ো না। পুরাদস্তুর নতুন করিয়া আর অন্যরকমভাবে সবকিছু করিতে হইবে। … তোমাদের চাই একটি নতুন ব্যবস্থাপনা। মূল্যবোধ আর প্রাথমিকতাগুলি যেভাবে সাজানো আছে তাহার স্তরবিন্যাসে চাই বদল। চাই, একটি নয়া মানবতার যুগ …’

মুক্তি চাই   

        

বহু-র রংধনুক আঁকা প্রান্তর হইতে আবার ফিরিয়া আসিতে হয় এক-এর বিরান কুঠুরিতে। সমস্ত না-বলা না-গড়া কথাগুলি সেখানে বাষ্পরুদ্ধ হইয়া পড়িয়া আছে। গ্রেটা থুনবার্গ, রিচার্ড লাখমান, মারিয়া ব্রান্যাস – রঙিন ঘুড়ির মতো এইসব নামগুলি কখন হারাইয়া গিয়াছে আসমানের প্রান্তে প্রান্তে। হারাইয়া গিয়াছে আমার সেই বন্ধুও। যে আসিয়া কাঁধে হাত রাখিলে ফিসফিস করিয়া শুধাইতাম – তোমার পরামর্শের আওতায় কি নাজায়েজ কিছু আছে? সড়কে রেলপথে অনশনে পথশ্রমে পরিযায়ীদের বেশুমার মৃত্যুগুলির সামনে আমরা কী ভাষায় কথা কহিব? পরাণসখা বন্ধু হে আমার, যদি তুমি নিরুত্তর, তবে অক্ষরের ব্যর্থতা মানিয়া লই আজ। স্বীকার করি, এই নিভৃতবাস আসলেই এক বিলাসিতা মাত্র। যেমন চন্দ্রযান মঙ্গলযান বুধযান হীনযান মহাযান। এই শ্বাসরোধী সৌন্দর্য হইতে আজ মুক্তি চায় বাক্য। চায়, হাড়ে হাড়ে বাজিয়া উঠুক আদিমতম কর্কশ এক গান। হাড়ে হাড়ে চিনিয়া লইয়ো তাহারে।