যাবজ্জীবন গৃহ-স্থ

জিয়া হক


এই লকডাউন নতুন নয় আমার কাছে। ২০০৭ সালে হঠাৎ আমার জীবনে লকডাউন নেমে আসে আকাশ থেকে। আকাশ থেকেই তো। কীভাবে কী হয়ে গেল তার আজ আর বিস্তারিত বিবরণ দেবো না। আমি গৃহবন্দী হলাম। চারপাশে সবাই চলেফিরে বেড়ায় আর আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে সামান্য অতীতের কথা ভাবি। দিনগুলো সরে সরে যায়। স্মৃতির ক্রম গুলিয়ে গেছে। পুরনো স্কুলের সামনের বেদিতে শিক্ষকরা দাঁড়িয়ে থাকতেন আর আমরা জনগণমন গাইতাম, মনে পড়ে। আরও কত কথা। আমার বুড়োদার সঙ্গে ভোরে সুতি খালের ধারের জমির আলে বসানো ঘুনি ঝেড়ে চুনোমাছ সংগ্রহ করে আনতাম। বুড়োদা মানে আমার পিতামহ। বুড়োদা সারাদিন পশ্চিম ডাঙার কলাবাগানের ঘাস নিড়িয়ে দিত আর তার জন্য পুষ্টিভাত নিয়ে যেতাম। দাদার পাশে বসে তার ঘামভর্তি মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সুদূর অতীতের মানুষের মুখ কল্পনা করতাম। সেদিন কল্পনাটুকু বেঁচে ছিল। কত ঢোঁড়া সাপ, বিষধর সাপ পাশ দিয়ে ব্যস্তসমস্ত হয়ে চলে যেত। আমি ভয় পেলেও বুড়োদাকে বলতাম না। প্রায় লোকের সাপে কাটত। চিকিৎসা বলতে ছিল গ্রামীণ ওঝা। তাদের কাছে নাকি এমন শিকড় ছিল যা দিয়ে বেঁজি সুস্থ হয় সাপের কামড় থেকে। বেঁজিকে অনুসরণ করেই তারা পেয়েছে ওই বিশল্যকরণী। লোক সেরেও উঠত। লোক মরেও যেত। সাপ চোখে দেখা যায়, দেখে পালানো যায়, অদৃশ্য নয়, দংশনে পীড়িত রোগীকে ঘিরে মেলা বসে যেত কেননা তা ছোঁয়াচে নয়। বিপর্যয়ের দিনে, বিপন্নতার দিনে মানুষের পাশে থাকা যে কী বড়ো কল্যাণ! অনেক দূরে ‘জানা’ পাড়ার কোলে বিক্ষিপ্ত গাছগুলো অরণ্যের রূপ নিয়ে সবুজের উঁচু-নিচু পাহাড় তৈরি করত। আমি বুড়োদাকে ভালোবেসেছি। যখন দাদা প্রায় চলচ্ছক্তিহীন হয়ে পড়ল, যখন তার সঙ্গে গল্প করার মতো কেউ আর রইল না, যখন তার বিছানায় মৃত্যুর গন্ধ দেখা দিল, যখন বুড়োদা ‘সামাজিক দূরত্বে’ চলে গেল, আমি তার ঘরে ঢুকে বিছানায় তার মাথার কাছে বসতাম। বুড়োদা আমাকে ভালোবেসেছিল সব নাতির চাইতে বেশি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি আরেকবার, আরও একবার বুড়োদার ভালোবাসা টের পেতে চাইতাম। কিন্তু আমার অনুভবের শক্তি ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। একে বলে ডিরিয়ালাইজেশন। আমার আন্তরিকতা ততটাও আন্তরিক নয় কেননা সে শুধু পরিস্থিতির সাপেক্ষে প্রতিক্রিয়া মাত্র। আমাকে অভিনেতা বনে যেতে হল। যেন সব বুঝতে পারছি, যেন আমার কিছু হয়নি। কীভাবে ঢাকা দেওয়া যায় এই অস্বাভাবিকতা? আমার মধ্যে জন্ম হল ভালোবাসার। দেখলাম, মানুষ ভালোবাসা পেলে সব ক্ষমা করতে প্রস্তুত। আমি ক্ষমার জন্য কাতর হলাম। অথচ ভালোবাসতে গেলে অনুভূতি লাগে। আমার তো তা নেই। আমি তো নিজেকেই ভালোবাসতে পারিনি, ছড়িয়ে ফেলেছি রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডে। একটা যুতসই পথের সন্ধান করতে লাগলাম। ভাবলাম যদি চুপ হয়ে যাই একেবারে, কেমন হয়? তারপরই মনে হল, এটা সকলের বড়ো চোখে পড়বে। তাহলে কী করা যায়? চিন্তা করার মতো অবস্থা কি সেদিন আমার ছিল? ছিল না তো। যা ইচ্ছা তাই করলাম। আঘাত করলাম, আহত হলাম, প্রতিশ্রুতি দিলাম, প্রতিশ্রুতি ভাঙলাম, পাশে দাঁড়ালাম, সরে এলাম, প্রশংসা পেলাম, ঘৃণা পেলাম। আমি কী করব? কী করবে একজন যার অনুভূতি হারিয়ে গিয়েছে? নিজেকে নিয়তির হাতে ছেড়ে দিলাম। তর্কের পথ ছেড়ে মেনে নেওয়া শিখলাম। নিয়তির সঙ্গে তর্ক করা যায় না। ঘরের ধারে আদিগঙ্গার পাড়ে গিয়ে বসে রইলাম দিনের পর দিন। কচুরিপানায় ঢাকা একটা মৃতপ্রায় নদী। কে বলবে একে নদী? একদিন তারও জলস্রোত ছিল, তালগাছের শালতি ভাসিয়ে মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে, কে বলবে? নিজেকে বললাম, আজ থেকে আমি এই নদীটি হলাম। তার সঙ্গে সখ্য হল। প্রেমিক হলাম। মনে হল, সব কচুরিপানা সরিয়ে দিয়ে তাকে আবার অতীতের মতো রূপবতী করে তুলি। তার মুখের দিকে তাকালে আমি বুড়োদাকে দেখতে পেতাম। সেও ঝাপসা। আমার স্মৃতির উপর রাশিরাশি কচুরিপানা। কে সরাবে? গৃহেই রয়ে গেলাম। আমার দৌড় যাদবপুর অবধি সীমাবদ্ধ রয়ে গেল। এর ওপারে সব কেমন যেন অপরিজ্ঞাত। বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেল আমার মসজিদ। পাঁচ ওয়াক্ত নয়, প্রতিটি ওয়াক্ত সেখানে কাটাতে পারলে যেন আমার সুখ। কিন্তু নিয়তির কী পরিহাস, সেই সুখ অনুভব করার মতো মানুষী শক্তি আমার রইল না। শুধু থেকে যাওয়া। টিকে থাকা। থাকা। বিশাল ব্যপ্ত মহাবিশ্ব, গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ নিয়ে যে একটা ছবি, যাকে আমি দূর থেকে দেখতাম কল্পনায়,–একদিন, ২০০৭ সালে আমি সেই ছবির গায়ে উলটে যাওয়া দোয়াতের কালির একটা অনভিপ্রেত এবড়োখেবড়ো রঙ হয়ে আটকে গেলাম। ডিরিয়ালাইজেশনের ঘরে অনিচ্ছুক প্রবেশাধিকার পেলাম।

সেই দিনই শুরু হয়েছিল আমার লকডাউন। নিয়তি চাপিয়েছিল। এখন রাষ্ট্র চাপিয়েছে। রাষ্ট্রই কি নিয়তি?  যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, সে কি তাহলে নিয়তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে? ঘরে বসে শুধু আমার আদিগঙ্গার কথা মনে পড়ে। কত কাছে, কিন্তু কত দূরে। সেখানে নাকি অনেক বক-পাখপাখালি এসে ভিড় জমাচ্ছে এখন, সূত্রের খবর। মৃতপ্রায়রা মৃতপ্রায়দের সংবাদ সংগ্রহ করে। মানুষ অহেতুক মৃত্যুর প্রার্থনা করে। যখন সত্যিই মৃত্যু এসে সামনে দাঁড়ায়, চারপাশে ঘোরাঘুরি করে, তখন জীবনকে রোজ স্যানিটাইজার দিয়ে ধুতে ধুতে বলে, জীবন রে, তুঁহু মম ‘same’ ও সমান। কিন্তু পাথরের কোনও বন্দীদশা নেই। সমুদ্রতটে সে পাথর, খাটের পায়ার তলায়ও সে পাথর। আমি ওই পাথর। সচলাবস্থায় স্থির, অচলাবস্থায়ও। যাবজ্জীবন লকডাউনের দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আমি শুধু চাই প্রীতির সংক্রমণ হোক। প্রীতি-লতা দেদার ছেয়ে যাক সমস্ত দলীয় দফতরে। কেউ কি কাঁদচ্ছে প্রতিবেশে? শুনতে পাই, অনুভব করি না কেন? আমরা সবাই কি তবে ডিরায়ালাইজেশনের খানিক খানিক স্বয়ংসেবক হলাম?

উদ্বৃত্তের পান্থশালায়

উল্কা


সম্পর্কের রেখে যাওয়া সুপুরির ওপর ঝরে পড়ছে বিন্নি ধানের খই। এই গতানগতিক ঝরে পড়া সময়ের হাতঘড়ি ধরে গুনে চলেছে নয় ছয়ের ঘর দালান। চৌকাঠ ডিঙোতেই ঠিক পঁচিশ ধাপ শব্দ পেরিয়ে টের পেলাম কিচ্ছু মনে পড়ছে না। বাস ট্রাম ট্রেনের চাকার ব্যাসার্ধ জুড়ে যাঁতাকলের মতো ঘুরে চলেছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কিভাবে এগোলে একটা গদ্য মুক্ত হতে পারে? কিভাবে পাঁচমেশালি দলবৃত্তের দল এবং বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে যেতে পারে ধর্ম আশ্রিত জিরাফ?

কিভাবে…? কিভাবে…

প্রশ্নগুলোও একের পর এক ভেঙে বেরোচ্ছে উচ্চ গ্রামের নিম্ন মধ্যবিত্তের পাঁচিল। তাগিদ এবং তাগাদা রাখা রয়েছে দুটো টেস্ট টিউবে। সামনে রাখা রয়েছে হাওয়াই চপ্পল আর বৈপরীত্য উত্তাপ। একটা অনুদিত দাস ক্যাপিটলের তালপুকুরে কড়ে আঙুল ডুবিয়ে বসলাম। মনে পড়ার মতো উটকো অভ্যাস দাঁত মাজার ব্রাশে ঘষতে ঘষতে আধা খ্যাচড়া হয়ে মিলিয়ে গেছিল বাবল্গামের ট্যাঁটু। অতঃপর মন নিবেশে খই চিবনো দাঁত। জিভ বলেছিল ধানের নাম বিন্নি!

এই সময়ে হাজার ভুলের মধ্যেও ঠিক ঠিক বলে উঠল কেউ। কাচের ওপারে ছায়া শরীর। খসে যাওয়ার বিচ্ছেদ বেদনায় ছটফট করে থেমে গেছে উচ্ছিষ্ট। খবর নেওয়ার পর পালিয়ে যাওয়াই একমাত্র উপায় ছিল কেবল। তোমার ব্ল্যাকলিস্টে মাস দুই কেটে গেল। কেটে গেল ফোন করার অছিলায় মন কেমনের ভালো থাকার ইচ্ছে। সাবলীল ভাবে দেখছি ঢেউয়ের মতো অভ্যাস। কখনও গড়ল কখনও ভাঙলো। আজ দেখলাম অনভ্যাসের খাতায় গড়গড়ে মুখস্থ নম্বর। বেগ পাচ্ছে। ধাক্কা খাচ্ছে এক অঙ্কের গায়ে অন্য। ডিসটেন্সিং বানান করতে গিয়ে গুলিয়ে ফেল্লাম অন্তরঙ্গে আবদ্ধ যুক্তাক্ষরী শ্লেষ। এক অজানা আশঙ্কায় ঘুম আসে না। আশঙ্কা- পথে নেমে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারার। অন্ধকারের মধ্যে ছাপ রাখার পর গবেষণাগার হারিয়ে গেছে মাত্রাতিরিক্ত ভিড়ে। তালা আঁটা দরজায় ঝুলছে- চাবি ঘোরানোর নিয়মাবলী। কিছুটা ডানে কিছুটা বাঁয়ে এবং পুনঃপুন। তারপর দীর্ঘশ্বাস জরিপ করতে করতে শব্দের বিপরীতে ছিটকে পড়ল শিকারী।

একেকটা ভাইব্রেশন খুব দুর্দম মনে হয়। যেমন ঠিক এই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে একটা চরম হার্ট অ্যাটাকের ভয় চেপে ধরছে শ্বাসপ্রশ্বাস। মাইল খানেক দৌড়ের পর যেভাবে হারিয়ে গেছে সূচনা, সেভাবেই চড়াই উতরাই দমন করে ঢুকে পড়ছি রাতের ক্যারাভ্যানে। আবিষ্কার করলাম এক কোনায় উবু হয়ে রয়েছে ফিডিং বোতল- ঘুম আসবার অপেক্ষায়। ক্যারাভ্যানের বুকশেলফে সিন্ডারেলা কিংবা হ্যান্সেল-গ্রেটেল সামলে তুলছে ছড়িয়ে যাওয়া গল্পের প্লট। বহু গতানুগতিক চেষ্টার কম্পাস বসিয়ে গোল ঘেরের লক্ষ্মণ রেখা টানা চলেছে মেঝেময়। আরশোলাদের ওড়ার সময় এল কিন্তু ঘুম শুকিয়ে রইল হোয়াইটনারের ঘোলে। হাতুড়ি পিটিয়ে ঢাকনা আলগা করার মোহ সামলে চটজলদি আসামী মুক্তির আবেদন জানিয়ে তীব্র হওয়ার সাজ। যাবজ্জীবন মাথা সামলে জেলের মেন গেট টপকাল। সাহায্যের হাতগুলো পিঠ চুলকাচ্ছে। রোদ পোহানো পিঠে জল ফোসকার মতো ইগলু। টলটলে ঘিলুর মতো চাপ খেয়ে বারবার নড়েচড়ে বসছে লাফিং বুদ্ধ। ফ্যাংশুই বিশ্বাসীর লুলাবাই ভেসে আসছে কঠিন মাধ্যমে। তারপর গ্যাসীয় থেকে তরল। পাত্র থেকে তরল হঠাৎ সংজ্ঞা হারিয়ে মেহগনি শয্যায়। ক্রমে মানচিত্রে বয়ে চলা নদীর শুষ্কতায় আধার হল প্রশ্ন মুক্ত ঠোঁট।

ভয়

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়


একটা কবিতার শিরোনাম দিয়েছিলাম গেলবছর,মন মথুরাও চলে যেতে পারে। হ্যাঁ,নিশ্চিন্ত নিরাপদ(‘আপাত’ শব্দটা ফার্স্ট ব্র্যাকেটের মধ্যে রাখলাম) যাপনে বসে,যখন ইচ্ছে করলেই অনলাইন অথবা এজেন্ট মারফত রণে বনে জলে জঙ্গলে যেতে পারছি, তখন এসব লেখা খুব শোভা পায়। এখন?মন, জরাগ্রস্ত।
ভাবি, Sartre তাঁর একটা লেখায় লিখেছিলেন, when the privileged classes are happily ensconced in their principles, when they have good consciences, when they oppressed,duly convinced that they are inferior creatures,pride themselves on their servile condition, the artist is at ease…art could call itself humanistic because society remained inhuman.
না, এখনও আমি সুবিধেভোগী দলেই আছি।যে-সময়,যে ভয়ঙ্কর সময় কামু লিখবেন প্লেগ-য়ের মতো কিলবিলে জীবাণু সম্বল রুদ্ধশ্বাস উপন্যাস,যে-সময় , অর্থাৎ ১৯১৮-১৯১৯ নাগাদ স্প্যানিশ ফ্লু দেখা দিচ্ছে বিশ্বজুড়ে,এডওয়ার্ড মুংখের মতো শিল্পী অসুস্থ হয়ে ভয়ার্ত ছবি আঁকছেন। আবার সুস্থ হওয়ার পরের ছবিও আঁকছেন তিনি! (প্রসঙ্গান্তর হবে না হয়তো,এদেশেও ভয়ঙ্করভাবে আছড়ে পড়েছিল এই ফ্লু। কিন্তু শিল্প সাহিত্য সেভাবে ধরে রাখেনি সেই দুঃসময়কে। একজন লেখক,সত্যেন্দ্র ত্রিপাঠী তাঁর আত্মজৈবনিক লেখায় এঁকে গেছেন সে-ছবি,কিছুটা। কীভাবে শবদেহ উপচে উঠেছিল গঙ্গায়…)
আর, আমি শুধু ভিতু হয়ে পড়ি আরও।

ঘাসফুল দেখতে পেতাম।
তোমার ভোরের রান্নাঘরও।
টের পেতাম চায়ের চামচের শব্দ।
টাঙানো ছবিগুলোর রং।
যে বইটা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেছ কাল,আজ দেখতে পেতাম।
প্রচুর গল্প শুয়ে থাকতো আনোয়ার শাহ্ রোড জুড়ে।
অনেক  খিলখিল আর ফুলে-ওঠা হাসি দুশোচল্লিশ নম্বর বাসের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে যেত।
টিকিটের মতো উড়ে বেড়াতো হালকা দিনগুলো
চপকাটলেটের গন্ধ নিয়ে।
আমরা দুজনে দুজনকে লিখতে বসতাম তখন!

এখন চোখের সামনে কিছু নেই।
ভয় আছে।
(দেয়াল)
এমন কবিতা লিখে নিজেকে আর অন্যদেরও ভয় দেখাতে পারি শুধু। আমি দুর্ভিক্ষ, মহামারী, দেশভাগ কোনও বিপর্যয়ই প্রত্যক্ষ করিনি আগে। যেটুকু যা আঁচ পেয়েছি,যুদ্ধ,নকশাল আন্দোলন, তীব্র দাঙ্গাহাঙ্গামা,সবই অনেক মোড়কের ভেতর থেকে একটুখানি মুখ তুলে তাকিয়ে। আগুন, পায়ের পাতাটিও ছুঁতে পারেনি কখনও।
আজ কেমন সকাল হলেই আমি বুঝতে পেরে যাই, আমার আজকের দিনটা কীভাবে কাটবে।উঠব, বাথরুমে যাব,একপাক বারান্দায় রোদ্দুর খেয়ে নিয়ে চা-টা বানাতে বসবো।দিন গড়িয়ে যাবে এভাবেই, এভাবেই।জানা পথের বাঁকে গুঁড়ি মেরে বসে আছে অসুখ! দেখি না, টের পাই। নতুনভাবে বাঁচার কোনও দিক নেই, দিগন্ত নেই।সব, অন্ধকার।
লোকে গজগজ করে,’রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে সবাই,কেউ কিছু মানছে না…’, আমার ভাবনা পেছনদিকে হেঁটে যায়। কলাবাগান বস্তিঅঞ্চলে চলে যেতাম আর দেখতাম একেকটা ঘরে কমকরেও জনাপনেরো মানুষের বসবাস। ভোরের আলো ফুটলেই পথে বেরিয়ে পড়ে,রাত হলে কোনওমতে ঘরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ে।তো, এরা এখন কী করবে?এরা?
আমার খুব কাছের কিছু সবজি ও মাছবিক্রেতা,ট্যাক্সিচালক, রাজমিস্ত্রি,এরা এখন কী করবে?এরা?
অবরুদ্ধ দিনগুলো নিয়ে শিল্পচর্চা আর হয়ে উঠল না আমার। অপদার্থ মানুষের মতো ভয় পেতে পেতে দরজাজানলার পর্দা টেনে দিতে থাকি।

নিজস্ব আয়নার কাছে

রিমঝিম আহমেদ


ব্যাপারটা এমন, মৃত্যু দরজায় দাঁড়িয়ে। কেবল কড়া নাড়ার অপেক্ষা। যেমন প্রতিদিন সকালবেলা অফিসে যাওয়ার তাড়া ছিল, বিকেলে দরজায় নিয়ম করে কড়া নাড়ানো। ওপাশে কেউ দরজা খুললেই সপ্রতিভ হাসি। আজ আর বাইরে যাওয়া নেই, দরজায় কেউ কড়া নাড়ে না। যেন এই ইহজগতের সাথে সব সম্পর্ক চুকেবুকে গেছে। মানুষের অহংকার করবার আর কোনো অনুষঙ্গই অবশিষ্ট থাকছে না।

 

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যু। আর এপাশে মৃত্যুভয়ে সেঁধিয়ে আছে কিছু প্রাণ। প্রতিটি ক্ষণ গুনছে। ক্যালেন্ডারের পাতা লাফিয়ে চলছে, অথচ থমকে আছে জীবনের তরঙ্গ। দরজা খুলে দিলেই মৃত্যু আকর্ণ হাসি দিয়ে সম্ভাষণ জানাবে। তাই অবরুদ্ধ দিনরাত্রি ছায়ার মতো ঝুলে আছে শরীরের সাথে। অদৃশ্য কিন্তু কী সাংঘাতিক টের পাই!

 

এমন কি ভেবেছি কখনো, আমি আমাকে এতভাবে দেখব! যে সরু কাজলের রেখাটাও এতটা খুঁটিয়ে দেখা হয়নি। এতটা মনোযোগ দিয়ে আগে দেখা হয়নি বারান্দার টবের উদ্ভিদের জীবনচক্র। কীভাবে প্রগাঢ়  সবুজ পাতা হলুদে হয়ে ঝরে পড়ছে। আজ এতই অবসর, নিজের জীবন নয় শুধু, উদ্ভিদের জীবনও দেখি।

 

বদলে গেছে মানুষের জীবন ও যাপনের নৈমিত্তিক কড়চা। বড় শহরটা আজ অনিদ্রার রোগী নয়, শান্ত ঘুমের অতলে ডুবে আছে। কিছুই যেন করবার নেই। একসমুদ্র অস্থিরতা এসে ঢুকে গেছে মানুষের মস্তিষ্কে। কিছুই হচ্ছে না। কোথাও একটা বড়সড় অসুখ লেগে আছে। প্রকৃতি নিজেই সবাইকে গৃহবন্দী করে দিয়ে নিজেকে সাজিয়ে নিচ্ছে। এই নিত্যকার ধোঁয়াটে আকাশটা আজ ধোয়া কাচের মতো ঝকঝকে। আকাশটাও হারিয়ে যাওয়া পাখির ডানার কোলাহলে মুখর। ধূলো ধূসর গাছেরা শ্যামল  সবুজের মায়া ঝরাচ্ছে। কবিতার আদলে কী সব মিথ্যে লিখেছে মানুষ! সবকিছুকে অর্থহীন লাগে। আজ যদি ছিঁড়ে ফেলি মিথ্যের খাতা, অক্ষরের আগাছা, লেখার অসুখ কি সেরে যাবে?

এই অসুখী সময়ের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে যেটুকু আজ উপলব্ধি, মানুষ হিসেবে মানুষের আদতে কোনো অহংকার নেই। দেখছি মানুষ কতটা ঠুনকো। খামোকাই স্তরবিন্যাস করে, উঁচুনিচু বিভেদের ভাঁজে সমাজ, রাষ্ট্র আর মানুষকে আলাদা করে রেখেছিল। অযথাই মহামান্য জীবনের বড়াই করে গেছে। সব অহংকার আজ অনিশ্চয়তার তাপে গলে পড়ছে। মানুষের বিভ্রম কেটে যাচ্ছে সময়ের উপলব্ধিতে।

 

মানুষ থেকে মানুষের দূরত্ব কতটা? কোনো দিন মাপা হয়নি! সে যে নিত্য রুটিন মেনে আয়নার সামনে দাঁড়ানো, টিপ ও চোখের মাপ— কাজলের সরু রেখা ছুঁতে গিয়ে অন্য কাকেই ছুঁয়েছি যেন! নিজেকে তো নয়। কেন, নিজেও তো এইসব নাকমুখ চোখ, মানুষের আদলে একটা আস্ত মানুষ! কেন তবে তাকাইনি নিজের দিকে? এই অফুরন্ত অবসরে আমি আর জানালা পাতানো বোন। ঘুমের রেশ কেটে গেলে, চোখের মাদকতা মিলিয়ে এলে আমি আর জানালা ওপেনটি বায়োস্কোপ খেলি। জানালা যেন আমাকে আরও আমার কাছে এনে দেয়। বলে, ছেলেবেলার গল্প, বটফুল আর সুঁইচোরা পাখিদের গল্প। এক পা ভাঙা রেহেলের ফাঁকে অলস পড়ে থাকা আমপারা, আলিফ লাম মীম… মায়ের পাকঘরে পোড়া পাতিলের গন্ধকেও তর্জমা করে দিয়ে যায়। আর, ভাবি- কেন মানুষ থেকে মানুষ এতো দূরে!  কেন আমরা খুঁজে পাইনা কারুর পুড়ে যাওয়া হৃদয়ের আন্দাজ। আগুন ও ধোঁয়ার রসায়ন।

ফলত পালং শাকের হলুদ হয়ে যাওয়া, উনুনের শিখা কেমন ফুঁসে ওঠে প্রশ্রয় পেয়ে সেটুকু দেখার অবসরে কত কী ভাবি!

মায়ের কাঁঠালগাছের ছায়ার নিচে কতদিন স্নান করা হয়নি! সেই জীর্ণ জর্জরিত মাটির ঘরটি এতিম শিশুর মতো ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তার গায়ে কি আর হাত বুলানোর সুযোগ আসবে? আর কী সবুজ পাসপোর্টটা নিয়ে যেতে পারব স্বপ্নের স্বর্গরোহিণীর কোলে?

 

ঘুম ভাঙলে জানালা, ভোর ফাটলে জানালা। জানালা ছাড়া আমাদের আর গন্তব্য কই! আলোর যৌবন ক্রমান্বয়ে ফিকে হয়ে আসাটা দেখা হয়। পাশের ফ্ল্যাটের ফোকলা দাঁতের শিশুটির হাসি, বৃদ্ধটির সারাদিন ছাদবাগানে মায়াচাষের বিবিধ ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়া কখনো এমন করে দেখা হয়নি। দূর ছাদ থেকে ঘুড়ি ওড়ানো যুবকের দল যেন বসে আছে উড়বে বলে। ওড়ার অপারগতা থেকে হয়তো ঘুড়ি ওড়ায় ওরা। ব্যস্ততা ও স্বার্থপরতার ফাঁক গলে যেসব সম্পর্কে উঁকি দেওয়া হয়নি, আজ ইথারে উষ্ণতা পাঠিয়ে দিই। বলি- ভালো থেকো, বেঁচে থেকো! আর ভেবে দেখো, চিড়িয়াখানার আর কি কোনো দরকার আছে? নিজের বন্দিত্বের ইতিহাসের দিকে তাকাও তবে!

 

গ্রামে যাওয়া হয় না অনেকদিন। যদি জানতাম এই ইটের নগরে এভাবে আটকে যাব, তাহলে এই বন্দিত্বের মুক্তি খুঁজতাম গ্রামের সবুজে। অনেকদিন সেই গাছগুলোর সাথে কথা বলা হয় না। সঙ্গহীনতায় ওদের ছাল-বাকলে রুক্ষতা এসেছে। যেচে গিয়ে একটু জল দেওয়ার, নিড়ানি দেওয়ার কেউ নেই। এতিমের চেহারা নিয়ে ওরাও অপেক্ষা করে আছে কোনো দয়ালু হাতের। যেতে পারলে খানিক ওদের যত্ন নেওয়া যেতো।

এই ঋতুতে গামারি গাছটায় হলুদাভ ফুল এসে মাটিতে বিছিয়ে থাকে।  মালা গাঁথবার কেউ নেই। আজকের শিশুরা তো জানে না এই বুনোফুলে কী চমৎকার মালা গাঁথা যায়। মায়ের মতো মায়াবিনী শিমুল গাছটিও মরে গেছে আরও আগে। তার লালে আর উঠোন ভরে থাকে না।  আমের মুকুল এসেছে, স্বল্পায়ু জীবন নিয়ে কাঁঠালের মুচি সবুজ পাতার ভেতর মাথা তুলে তাকিয়ে থাকে কালো হয়ে ঝরে যাবে বলে। আমি পুরোটাই গ্রামের। কিন্তু গ্রাম কি আর আমার আছে পুরোটা! মানুষগুলো শেকড় বিচ্যুত হতে চায়, নগরের চাকচিক্য ওদের টানে। আর আমিই যেন-বা আদিগন্ত গেঁয়ো।

 

যদি আর যেতে না পারি? যদি এই ইচ্ছেগুলো এখানেই থির হয়ে যায়! কী হবে, মরার পর তো আর কোনো জীবন থাকে না—অপেক্ষা থাকে না। থাকে না ছিটকে পড়তে পড়তে ফের বেঁচে যাওয়ার দারুণ এক অভিযানের অভিজ্ঞতা । এখন শুধু তাকিয়ে থাকা। এখন শুধু একটা দারুণ ঝরঝরে জরাহীন সকালের অপেক্ষা।  শেয়াল-কুকুরের অবহেলা নিয়ে, চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে মরে যেতে আমিও চাই না। হাজার হোক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রাণি হিসেবে আমার ওটুকু নির্দোষ অহমিকা আছে। যদিও প্রকৃতিকে ধ্বংস করায় আমারও অংশগ্রহণ কিছু কম নেই।

 

দুপুর ফাটছে পাকা ডালিমের মতো। যেভাবে আমাদের চারপাশে মৃত্যু ফেটে উঠছে, জানি না টিকে যেতে পারব কিনা এই মহাবিপর্যয়ের থাবা থেকে। যদি না টিকি, যদি হঠাৎ থেমে যায় রক্ত সংবহন!  যদি ফুসফুস বাঁচিয়ে রাখাকে অস্বীকার করে!

 

প্রতিদিন বিকেলগুলো জানালার কাছে এসে থমকে দাঁড়ালে ছাদে উঠি। ফাঁকা নগরীর আকাশে একা, কদাচিত দল বেঁধে পাখিরা যায়। যে পাখিগুলো মানুষের ভয়ে কোথায় না কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল, আজ আবার তারা ফিরে এসেছে। নির্ভয়ে ডানা মেলছে। মনে হয়, এই পৃথিবীটা পাখিদের, আমরা খানিকটা ভাগ পেয়েছিলাম। আর স্বার্থপরের মতো তাদের পৃথিবী থেকে তাদের চ্যুত করে আমরাই দখল করেছি সবটা। স্বার্থপরতার কিছু শাস্তি তো পেতেই হয়!

যদি না টিকি, যদি হঠাৎ থেমে যায় রক্ত সংবহন!  যদি ফুসফুস বাঁচিয়ে রাখাকে অস্বীকার করে!

ভাবছি কারুর কোনো আঘাত মনে রাখব না। যারা আঁচড়েছে শাণিত নখরে, কামড়েছে বিষদাঁতে তাদেরও ক্ষমা করে দেব, দিয়েছিও।

আর যদি বেঁচে থাকি—সম্পূর্ণ নতুন করে বাঁচব। নিজের কাছাকাছি থেকে, নিজেকে আঁকড়ে ধরে বাঁচব।

প্রবাদবিহীন অন্ধকার -ব্লাইণ্ড ব্যাণ্ডিটস

ঋষি সৌরক অরণ্য


গতকাল চাঁদের আলোটা ছিল গভীর। বিশেষ্যহীন।হাওয়া এমন, যেন সেই আলোকে সরের মত সরিয়ে নেবে দূরে কোথাও। অদূরে বিমূর্ত অন্ধকার। গজিয়ে উঠছে গোটাদশেক বৃক্ষ স্মৃতিময়। নিরীহ। দুর্ধর্ষ। অথচ শ্রোতা। অন্ধদস্যুদের মাথা দুলছিল। দুলছিল জটায় গাঁথা টিমটিমে নীহারিকার গান।  যেন এমন এক সন্ধ্যার অপেক্ষাতেই তাদের জন্ম হয়েছে। একটা পুরানো ছাদের মদ যেমন হয়। মাদুর বিছিয়ে রাখে আর কিছু মণিহারা গল্প। ইন্দ্রনীল ঘোষের মত অন্ধকার জলের বোতল। অনিন্দ্য রায়ের মত রাফ সারফেস। সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের মত খাম খেয়ালি। এইসব… সামগ্রীময়। অসম মেলবন্ধন
আসলে বিশেষ্য যেস্তরে বিশেষণ হয়ে ওঠে। জৌলুষহীন। সে’ও কি ছন্দ নয়? সচেতন ডানার। অর্ধ এক খেয়েছে অন্ধকারের ‘সম্ভবত কনকচাঁপা’ মৃদু ব্যঞ্জনা। কানা উপভাষার সিঁড়ি সে ভাঙলো বলে। সাধারণ গল্পের ভেতরে যেসব পুনঃ পুনঃ। আবৃত্ত থাকে, অথচ শ্রুতিমধুর। ছড়িয়ে থাকা বাঁকড়ি কুড়িয়ে নিচ্ছে তাদেরই জনাতিন। অন্ধদস্যু।সেভাবে কিছু প্রমাণের কোনও তালাচাবি নেই। নেই সময়কে পেরিয়ে যাওয়ার শীর্ণতম লাফ। যেভাবে যেটুকু সহজ৷ তেমনই সহজ ছিল কালকের গভীরতা। পাতকুয়ো আলো। ফেলে রাখা চাঁদ। দস্যুরা যাকে একটু একটু পাচ্ছিলো।  শূণ্যমাধ্যম। কেটে যাওয়া ঘুড়ি। কাছেপিঠে কোথাও তখনো আটকে। ছটপট করছে, নিশুতি রাতের পাহারার মত। তার শিস হয়ে উঠছে বিভ্রান্তিকর।
দৃশ্য। তখন অন্ধকার নিজেই। নিজেকে কাটিয়ে উঠবার নেশায়। ঘুড়ি হয়েছে। একজন অন্ধ বলে উঠলো, আমরা কি এসব পেরিয়ে আরেকটু যেতে পারি না? এমন আলোতে তাই শব্দ ছুঁড়ে দেখা গেল, গভীরতা ফিরে আসে কিনা। প্রতিফলন, শুধুই অসমবয়সী। বন্ধুত্ব। মেলবন্ধনের ফেলে আসা। তোপ। কে কীভাবে উদ্ধার করে নিজেকে চেপে বসেছি আগামীর ডুবো জাহাজে। মাধ্যাকর্ষণের উন্মাদনা শিথীল হয়েছে অনেকখানি। এখন শুধুই ভেসে উঠবার গান। গায়ে লেগে আছে। আর একটু একটু করে উধাও হয়ে যাচ্ছে পাতকুয়োয় প্রলম্বিত গদ্য।
গতকাল চাঁদ। চাঁদের আলো উভয়েই বিশেষণ হয়ে উঠেছিল। দস্যুদেরও কখনো না কখনো একটা শৈশব থাকে। থাকে পাতকুয়োয় ঝুঁকে পড়া। একটা আলতো ধাক্কা। এই তো দেখা হওয়া। টেলিস্কোপে চোখ রেখেছেন আকাশ চেনার দুর্নিবার। এঁরা বলছেন চাঁদ একটাই। জলে-স্থলে-অরণ্যে তার মলিন দাবদাহ। কিন্তু অন্ধ, ততোধিক দস্যু হয়ে ওঠা প্রবাদপ্রতিম…চাঁদ ততটাই জোরালো, যতটা তুমি নিতে পারো । মাথা দুলছিলো। কাটা ঘুড়ি উড়ছিলো। হাল ছেড়ে দেওয়ায় মাধ্যাকর্ষণ, নৌকাটি একসময় প্রবাদের চালেই তলিয়ে গিয়েছিল দৃশ্যে। সবচে জরুরি কথা। এই দেখা হওয়া। মতান্তরে ধাক্কার। কোথাও কোনও প্রজাপতি। বা পাখি ছিলো না। প্রয়োজনও ছিল না। অদ্ভুত…

আরও একা হবার দিন

দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম


একলা থাকার অভ্যেস নিয়ে যত গরিমা আমাদের তা ধুলিস্যাত করার বাসনা নিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে ঘরবন্ধ দিন। বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনার দাপটে ঘরে থাকা সবচেয়ে কার্যকরী উপায় বিবেচিত হলে যারা একলা জীবন উদযাপন করা মানুষ আছেন আমার মতো, তাদের যাপনে খুব একটা পরিবর্তন আসবেনা যতই ভাবা যাচ্ছিল, ঠিক তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আজ মনে হচ্ছে আমাদের একা থাকা, আমাদের বিচ্ছিন্ন থাকা প্রকৃতার্থ একার জীবন নয়। আরো অনুষঙ্গ জড়িয়ে তাকে পরোক্ষেই সামাজিক জীবন করে তুলে, আমরা হয়তো খেয়ালও করতে পারিনি এতোদিন। সে অনুষঙ্গে কারা, রাস্তায় নিয়ত দেখা ভিড় কিংবা রাস্তা নিজেই, কাপড় ইস্ত্রি করা দোকানের হাসিমুখ লোকটি কিংবা তারই পাশে অবিরাম রিপু করে যাওয়া নিচুমুখ সেলাইকল। তাদের সাহচর্য, মুখোমুখি হবার যে অভ্যেস আমরা এড়িয়ে গেছি দিন প্রতিদিন, এখন ঘরবন্দি সময়ে মনে পড়ছে সব একে একে।

প্রতিদিন নির্ঘন্ট ধরে পৃথিবীর এই অসুখের বিস্তার শুনে শুনে বিষিয়ে ওঠা মন, আর সম্ভাব্য সব শুভ সংবাদ কার্যত নিষ্প্রাণ মনে হলে আমাদের মনে হতে থাকে আমরা ক্রমশ ঢুকে যেতে থাকি গভীর এক অন্ধকার দেশে, যেখানে ফণা তুলে রোদ্দুর উঁকি দেবার সম্ভাবনা কোনদিন ছিলো কিনা আমরা বলতে না পারলেও, অন্ধকারের মেঘ-তুলো খসে শরীরে ছড়ালে আমাদের কান্না কোনদিন শুনবে না আর কেউ, সে প্রতিবেশী, কিংবা শ’য়ের অধিক কিলোমিটার দূরে থাকা স্বজন, এই ভয় আর উৎকন্ঠায় সংজ্ঞায়িত হতে থাকে মুহূর্তকাল। যেন নিজের থেকে সরে গেছে নিজেরই ছায়া, আর প্রভূত নিঃসঙ্গতা হামাগুড়ি দিচ্ছে আমারই আত্মার ভেতর। চারদিকে গভীর রাত, অন্ধকারের হর্ষধ্বনি নিঃশব্দে বাজতে থাকে, আমি কেবলই নিরীহ শ্বাস, বিধস্ত পড়ে থাকা এক, চির বিলীন হবার অপেক্ষায়।

তবুও বিলীন হবার আগে যে শ্বাস চলাচল, এবং সূর্য উঁকি দেবে জানলার করিডোরে, এইরকম আশাবাদ নিয়ে আরও গভীর রাত্রিযাপনের দিকে যেতে যেতে যে বেঁচে থাকা, তার সহায়ক হয়েছে নিজেরই কিছু পুরনো অভ্যাস, তা স্বীকার করি। পড়া হবে বলে থরে থর সাজানো বইয়ের থেকে যে পাপ জমে যাচ্ছিল বহুদিন, তার দিকে প্রায়শ্চিত্ত করবার একটা উপায় হয়ে ধরা দিয়েছে এই ঘর-বন্দি কাল। আর সাদা কাগজে কালো হরফে যদি দেখা গেছে সমাগত মানুষের মুখ, মনে হয়েছে বারবার এও সত্যি, বিমুক্ত আকাশের নিচে পাখিদের মতো মানুষের বিচরণ, সকালে যারা আরও কিছুদিন সুস্থ্য বেঁচে থাকবার বাসনায় বেরিয়ে যাবে রাত-জাগা শহরের অলিগলিতে, আর খানিক পরেই যাপন এক নিয়ত যুদ্ধ মেনে কর্মস্থলের দিকে, আর সন্ধ্যায় ক্লান্ত অথচ বর্ণাঢ্য আলোর দিকে, হেঁশেলের গন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছে ঘর-বারান্দায়, মানুষের মুখ দেখে মানুষ, মানুষের আনন্দ দেখে মানুষ, এইরকম সত্যিই আমরাও দেখেছি। এবং শীঘ্রই ফিরে আসবে তার নতুন অধ্যায়।

আর নিঃসঙ্গ দড়িটিতে বাঁধা বৌদ্ধের নৌকা, চারদিক হিম শান্তি, বৃক্ষের গায়ে গায়ে জড়ানো শীত, তারই দিকে এগিয়ে আসছে নব্য সন্ন্যাসী, এরকম চিত্রকল্পের মতো এঁকে রাখা সচল যত ক্যানভাসেরা কিছুদিন ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে অচল পৃথিবীলোকের কান্না, বহুবার মনে হয়েছে এই পুঞ্জিভূত দৃশ্যরা আমাকে খুঁজেছে বহুদিন, যেন মুখ দেখাবে বলে, প্রকৃত প্রেমিকের দিকে ছুটে যাবার আগে বিশ্বস্ত আয়না ভেবে, তাদেরই মনোবাসনা পূরণের এইসব সময়। কিন্তু হায়, এই বর্ণাঢ্য তাঁকানোর দিকে ছুটে আসবে বিষধর সাপ, বদ্ধ যাপনের প্রথম ছোবল নিয়ে এঁকে দেবে শ্মশানের অভিমুখ, কে জানতো! ফলে শান্ত ছবিটি রইলোনা আর শান্ত, চিরদিন বিপদসঙ্কুলতার দিকে আমাদের এগিয়ে দেয়া, কখন সে গিলে নিবে এই স্মরণ নিয়ে মন-খারাপ নামে অন্তর্লোকে। যে মুখ দেখেছি আমি জলের রেখায়, সে মুখ বিলুপ্ত পাখিটির স্বরে আমাকেও কাঁদায়!

কিছুই থাকে না আর, ভস্মের ভেতর দিয়ে ভেসে যেতে যেতে মনে হতে থাকে একা এই ঘর, তার চারদিক ঘিরে আছে যত ইট-পাথরের বেড়া, সব ধুলিস্যাত একা, গুড়িগুড়ি একলাবোধ নিয়ে সমস্ত যৌথ আর সামাজিক যাপনের থেকে হয়ে যাচ্ছে আলাদা। লেখা হয় না কিছুই, কাকে লেখা যায়, মনে হতে থাকে এই সংযোগ পথেও বিদ্ধ হয়ে আছে বিপর্যয়, সর্বনাশা। যা ছিল সন্নিহিত মন মানুষের, সজল নীলের অপেক্ষা, সবই সরে গেছে আরও দূর স্থলের কাছে, সেখানে কালো আগুন, নতুন চিন্তার দিকে যেতে না-দেয়া এক অভিশাপ। তুমি কেমন আছো হে সতেজ দিন, প্রেমিকার মতো অভিমান নিয়ে দূরে দূর, আমি ধংসোন্মুখ পৃথিবীতে কিছুই ভাবতে পারি না তার।

দুর্লভ জীবনের আঁধার মোহমায়া

সুমিত পতি


আশ্চর্য এক নৈঃশব্দ টুঁটি চিপিয়া গৃহে বন্দী করিয়া রাখিতে চায়; পায়ের চলন, শরীরের স্পন্দন মনের নিয়ম। আসে; এমত কালমেঘ কদাচিৎ নিশ্চিত রূপে আসিয়া পড়ে আর মুখোশ পরিহিত মানব সমাজের সমূহ রঙ উৎপাটিত করিয়া গোপনে ঘাপটি মারিয়া রহে, ফুরাইয়া যায় না- কেবলি ফুরাইয়া যাইবার নাম লইয়া মুচকি হাসিয়া রঙ্গ তামাশা দেখিতে থাকে। দেখিতেছি; তাহার রুদ্র রূপ দেখিতেছি; যাতনা সহ্য করিতেছি। রুদ্র রূপ দেখিয়া যত না যাতনা পাইতেছি তাহার অধিকগুণ বেশী জীবন্মৃত হইয়াছি নিজেরি অন্তঃস্থলে উৎপাদিত ভয়ের চোরাস্রোত অবলোকন করিয়া।

 

সমস্ত কর্ম বন্ধ রহিবে; পথে ঘাটে মনুষ্যের অবাধ যাতায়াতে বেড়ি পড়িবে, সমস্ত মূল্যবান পোষাক পরিচ্ছদ তুলিয়া রাখিতে হইবে, কীটদষ্ট হইবে। সমস্ত মনুষ্যের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হইয়াছে খাদ্য সংগ্রহের জন্য- শুনিতে পাওয়া যায় খাদ্যের আশু সংকট উপস্থিত- এমত চিন্তা চেতনার আকাশ আমার সমস্ত শরীরকে অবশ করিয়া তোলে; বাহ্যকর্ম নিষ্কাসিত না হইয়া আবার স্বস্থানে চলিয়া যায়। গৃহে আরামপ্রদভাবে এতদিন কাটাইবার পরেও মনে হইতে লাগিল, গৃহে প্রাণবায়ু কম পড়িয়াছে; মন ছটফট করিতেছে, কোন কর্মে মন লাগিতেছে না, আসলে কোন কর্ম খুঁজিয়া পাইতেছি না, কাব্যচর্চায় মন লাগিতেছে না, কাব্যরস কেমন যেন শুষিয়া লইয়া নিরুদ্দেশে চলিয়া গেছে মৃত্যুরূপী দৈত্য। অচেতন ঘুমে কেবলি কদম্বের ন্যায় কি যেন আসিয়া আহত করিয়া আপনারে আপনা হতে বিচ্ছিন্ন করিতে চায়, নাসিকা, মুখমণ্ডলে বাসা বাঁধিতে চায়। মনুষ্যও কি কম যায়? দৈত্যের কাছে নাসিকা, মুখমণ্ডল আবরণী বাহির করিয়া অসম যুদ্ধে অবতীর্ণ হইয়াছে। যুদ্ধ চলিতেছে, আমি শান্তিপ্রিয় জনপদ খুঁজিয়া নিজেকে আড়ালের চেষ্টা করিবার প্রয়াসে লিপ্ত রহিয়াছি। সমস্ত রকম ভয়কে জয় করিয়া নিজস্ব বক্ষপটে সাহস সঞ্চয় করিয়া শ্বশুরালয়ে যাইবার সিদ্ধান্ত লইলাম। গৃহিণী উক্তস্থলে ভয়াল এই প্রকটিত দৈত্যের ভয়ে দীর্ঘকাল আটক হইয়া রহিয়াছে। নাগরিক দুর্লভ জীবন বহুবিধ রসনা তৃপ্ত করিয়া আসিয়াছে দীর্ঘকাল, অথচ এই প্রথমবার মনে হইল নগর আলোকোজ্জ্বল হইলেও ইহার গভীরে এক অন্ধকার চির বিরাজমান। অবশেষে একদা সমস্ত রকম রক্ষী ও অনুশাসনকর্তাদের অগোচরে গভীর সায়াহ্নে শ্বশুরালয়ের উদ্দেশ্যে বাহির হইতে পারিলাম ও বলাবাহুল্য এই উদ্দেশ্য বিধাতার আশীর্বাদে সফল হইল। গৃহিণী আমার মুখাবয়ব অবলোকন করিয়া যারপরণাই খুশি হইল; দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ক্রোড়ে তুলিয়া আমিও বাৎসল্য রসে ভাসিয়া গেলাম। আহা এক অদৃশ্য ভয়াল অন্ধকার এতদিন যাবৎ আমায় বঞ্চিত রাখিয়াছিল সন্তানের সুললিত হাস্যের দুর্লভ দর্শন হইতে। কি অপার তৃপ্তি! মনে মনে ভয়াল দৈত্যের বিনাশ চাহিয়া পরমেশ্বরের নিকট সহস্র নালিশ ঠুকিয়া বসিলাম।

 

কি অপার্থিব শান্তি! উদার প্রান্তরের সবুজ গালিচার উপরিদেশে নির্বিকার পদচারণ করিতে করিতে ভাবিলাম জীবন আদতেই লুকাইয়া রহিয়াছে গ্রাম্যদোষে দুষ্ট প্রাকৃতিক খনিজে। এ স্থলের মনুষ্যদিগের মধ্যে ভয়ের প্রাদুর্ভাব কম রহিয়াছে। জীবন যেমত চলিতেছিল প্রায় তেমনই চলিতেছে; খালি কালে- অকালে গল্প গুজবে ও সংবাদের ত্রাস চলিতে থাকে। গ্রামীণ মাতববরগণ মাঝে মাঝেই মনসামণ্ডপে মিটিং এ বসিয়া আগত দিনকাল সম্পর্কে সমূহ আলোচনা করিয়া গ্রামবাসীদিগকে সতর্ক করিয়া দেন। আমি অত্র জামাই মানুষ, শ্বশুরালয়ে প্রকৃত জামাই আদরেই উদরপূর্তি করিতেছি, মিছেমিছি গ্রাম্য আলোচনায় কর্ণপাত করিয়া ভয়ের সমূহ বাতাবরণ নিজস্ব করিবার বোকামি করিব এমত শিক্ষা আমার ক্কচিৎ হয় নাই। উদার জল হাওয়ায় খাই খাই বাড়িয়া গিয়াছে, আহারে রুচি বাড়িয়াছে, ক্ষুধাও বাড়িয়াছে; ভয় কমিয়াছে, মনে হইতেছে বন্দী জীবন হইতে মুক্তি পাইয়াছি।

 

প্রাতে গোধূলিতে বেশ খানিকক্ষণ সময় বিশালাকার আম্রকাননের নিবিড় ছায়ায় প্রাণ শীতল হইয়া যায়। অম্ল মধুর অপক্ক আম লবণ সহযোগে কড়মড় করিয়া চিবাইয়া নিজস্ব বাল্যকালকে নিজস্ব মনোদর্পণে ফুটাইয়া তুলিবার এক বিরাট ব্যবস্থা বহু কর্মের চাপে হইয়া ওঠে নাই। আহা! কি ছিল অবাধ্য বাল্যকাল। আম্রকুঞ্জের শীতলতা ক্রমশ কাব্যরসে নতুন জীবন প্রদান করিল। শুকিয়া যাওয়া কাব্যরস ফিরিয়া পাইবার উপক্রম হইতে লাগিল, কিন্তু দু এক কলি লিখিবার আগেই কানাঘুঁষো শুনিতেছি ভিনদেশী মনুষ্যগণ নিজস্ব বাটিতে আসিবে ও নিজেদের সহিত সেই ভয়াল দৈত্যের ছায়া লইয়া আসিতে পারে। ভয় করিতে লাগিল। গ্রাম্য মাতব্বরগণ উতলা হইয়া ঘন ঘন আলাপ আলোচনায় রত হইতেছেন। তাহা হইলে গ্রামও আর বসবাসের জন্য নিশ্চিন্ত আশ্রয় নয় বলিয়া মনে হইতে লাগিল ফিরিতে হইবে সেই নগরের বন্দী শিবিরে।

 

মনস্থির করিয়াছি আর কদিন বাদেই ফিরিব নিজস্ব বাটিতে। মন তেমন প্রীত নহে। আহার্যের ভিন্নতা আর তেমন রহিবে না ভাবিয়া বড়ই দুঃখ হইল, আবার ভাবিলাম বাঁচিয়া থাকিলে আহার আরও হইব, কিন্তু জীবন চলিয়া গেলে আর ফিরিবে না অতএব জীবনেই দীর্ঘ হোক এমত সিদ্ধান্ত হইল।

 

যাইব ঠিক, পরিত্রাণ পাইব দৈত্যরূপ মারণ রোগের করাল গ্রাস হইতে এমত বিশ্বাস আমি শয়নে স্বপনে নিদ্রায় জাগরণে সর্বত্রই রাখি। একেকেবার মনে উদয় হয়, আহা! যদি পক্ষী হইতে পারিতাম তাহা হইলে বন্দীত্ব বলিয়া কোনোরূপ শব্দ থাকিত না, থাকিত না কোনো মনঃকষ্ট। ভিনদেশী শ্রমিকেরা সর্বত্র হাঁটিতেছে, কেহ কেহ পথিমধ্যেই মরিতেছে, মহামারী কমিবার নামমাত্র লক্ষণ প্রকাশ পাইতেছে না- ক্রমে মরণের লীলা বাড়িতেছে। আমি আর সংবাদ কর্ণপাত করিবার পরিস্থিতিতে নাই। আঁখিতে ঝরঝর পানি লইয়া আমি শয়নে যাইতেছি, যাহারা চক্ষু প্রসারিত করিয়া রাখিয়াছেন তাহাদের চক্ষু আরও প্রসারিত হোক। আপাতত আমার বিরাম, আপনারা যাহাকে বলেন বিরতি!

ঘুমের ভিতর লেবু ফুলের গন্ধ

অনিন্দিতা ভৌমিক


অন্ধকারের শেষবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আমরা যার মুখোমুখি হই, সে কি আমাদেরই স্বজ্ঞা? নাকি মনের গভীরে এড়িয়ে যাওয়া কোনো নির্জন বারান্দা? প্রতিফলনের চেয়েও অতিরিক্ত কিছু। হাত রাখলে যার মুখ বিস্রস্ত হয় না। অটুট থাকে, প্রমাণ করে আপাত স্থিরতার গভীরে জেগে থাকা আত্মা। ডাক পাঠায়।

অথচ সাধারণভাবে যা কিছু প্রাণহীন/অস্তিত্বহীন, স্পন্দন রয়েছে তাদের মধ্যেও। আমাদের উচ্চারিত শব্দ, এই সময়, বাতাসের কণার মধ্যে কম্পন তৈরি করলো। হয়তো শ্রবণমুহূর্ত অতিক্রম করে সে ধাক্কা দেবে অন্যকোনো এমনই ভেসে আসা কম্পনকে। স্থির হবে বা চূর্ণ হবে অভিঘাতে। বিশ্বের এই নিয়মতান্ত্রিকতা যিনি বিন্দুমাত্র বুঝতে পেরেছেন, কেবলমাত্র তিনিই সামান্য অবলোকন করেছেন নিজস্ব অস্তিত্বে। দাঁড়িয়েছেন সেই অন্ধকারের শেষতম বিন্দুতে।

নার্সিসাসের অসামান্য রূপ জল থেকে উঠে এসে গ্রাস করে নেয় তাকেই। কিন্তু কেবল শারীরিক সৌন্দর্য্য তা ছিল না। বরং নার্সিসাসকে মনেহয় একজন অক্লান্ত সন্ধানী, যিনি পৌঁছতে চাইছেন, খুঁজে যাচ্ছেন কোনো অন্তিম বিন্দু, কিন্তু খুঁজে পাচ্ছেন না কিছুতেই। ঠিক যেভাবে অনির্দিষ্ট ঘুরে বেড়ানো নার্সিসাসকে নিঃশব্দে অনুসরণ করে ইকো। তার নিজস্ব স্বর নেই, শব্দ নেই – সে প্রতীক্ষা করে উচ্চারণের। আর তারা যেন হয়ে ওঠে পরস্পরের পরিপূরক – নার্সিসাস খুঁজতে থাকে প্রতিবিম্বের ভাষা; ইকো খুঁজে বেড়ায় শরীর।

আমাকে থাকতে দাও এই উপকূলবর্তী স্তরে

না, যেও না। রচিত এই কাব্যে খসে পড়ে

আমার বাৎসল্য, আমার রজঃস্বলা দিন, লাবণ্যময় ধ্বনি

অথচ কবিতার সাফল্যের মূলে থাকে রসাভাস

ইঙ্গিত অনেক বেশি অর্থবহ। কপালে ফুটে ওঠা ঘাম

এটুকুই তো দিগন্ত। দূর এক মুক্তি, এক বোধ

ফাঁকা চৌষট্টি ঘরে, গভীর, তাৎক্ষণিক নাম

আমি জানি না, এই মুহূর্তে কতোটা নির্মোহ তোমার শ্বেত উরু?

অথবা জৈষ্ঠের ধানের শিষে কিভাবে জমাট বাঁধে শর্করা?

আমি শুধু ছুটে বেড়াই শব্দ ও স্বেদের জমিনে

সোঁদা গন্ধে, নিঃসঙ্গ বীজবিন্দু নিয়ে

                                                … ( নিষাদ – অনিন্দিতা ভৌমিক )

একা হতে চাইলেও কতটা একাকীত্ব ভোগের স্বাধীনতা পায় কোনো বস্তু বা ভাবনা? মূর্ত গঠনচিহ্ন থেকে অমূর্ত দর্শনের দিকে নিয়ে যাওয়া নিজেকে, এ যেন ভাবনার নগ্নতাকে তুলে ধরা প্রকৃতপক্ষে। শরীর থেকে ছিঁড়ে ফেলা আত্মাকে। যা উদ্দাম। ছন্নছাড়া। জীবন্ত। যাকে প্রকাশ করা যায় না পরিচিত কোনো ইঙ্গিত বা প্রতীক দিয়ে। অথচ ‘স্যুরিয়াল’ না। স্যুরিয়ালের জন্যে প্রয়োজন এমন কিছুর যেখানে মিল ঘটে চেতনা ও স্বপ্নের। যেখানে দুটো সম্পর্কহীন জিনিসের উপস্থিতিতে এমন এক পরিবেশের সৃষ্টি হয় যা পূর্বনির্দিষ্ট নয়, যা বস্তুকেন্দ্রিক নয়। বরং ভেঙে ফেলে চিন্তার আড়ষ্টতা। দর্শক/পাঠককে দেয় উদ্ভাস। এক অন্যরকম আলো, ভাবনার এক বিশেষ চেহারা।

আত্ম-প্রতিকৃতির ভেতর দিয়ে ফ্রিডা কাহলো তুলে ধরেছিলেন তাঁর নিজস্ব রক্তাক্ত, যন্ত্রণাদীর্ণ জীবনকে – তাঁর পৃথিবীকে। কিন্তু সেই যন্ত্রণা আজীবন মুক্তি দেয় নি তাঁকে। আসলে তীব্র শারীরিক আঘাতের সূচনা কাতরানির শব্দে হলেও, দীর্ঘ সময় তা সহ্য করার পর, শরীর আর উপশম চায় না। শুধু অনুভব করতে শুরু করে ধারালো ক্ষতগুলো, কিছু হয়তো বোঝার চেষ্টা করে – নিজেকে প্রতীক করে তোলে শুভের বা অশুভের। ঊনচল্লিশ বছর জীবনের অধিকাংশ সময় ফ্রিডা কাটিয়েছিলেন অসুস্থতায়, হাসপাতালে। বত্রিশবার হয়েছে অপারেশান – মেরুদণ্ডে, পেলভিসে, ডানপায়ে। নিজের এই জীবনই সঙ্গী হয়েছে তাঁর আত্ম-প্রতিকৃতির। “ Broken Column” ছবিতে তাঁর ছিন্নভিন্ন শরীর আটকে রাখছে চারটি লোহার পাত। পুরোপুরি সম্পর্কহীন দুটো বস্তু। অথচ দেহের দুটো অংশের মধ্যে সৃষ্ট হওয়া ফাটলকে রক্ষা করছে তারা। সাথে অজস্র পেরেকের ক্ষত। কিন্তু খুব অদ্ভুতভাবেই, প্রতিকৃতির মুখে কোনো যন্ত্রণার চিহ্ন রাখেনি ফ্রিডা। অনুভূতি ও উপলব্ধির বাইরে বেরিয়ে মুখ যেন কেবলমাত্র শরীরের একটা প্রত্যঙ্গ মাত্র। হাত, পা, উদরের মতো মুখও ফ্রিডার কাছে কেবল রক্তমাংসের একটা অংশ – যার প্রকাশ সম্পূর্ণ যন্ত্রণাহীন করেছে সে খুব সচেতনভাবেই।

“ We all have such fateful objects – it may be a recurrent landscape in one case, a number in another – carefully chosen by the gods to attract events of specific significance for us : here shall John always stumble ; there shall Jane’s heart always break.”

                                                                        ………….. Vladimir Nabokov

তীব্রতায় জ্বলে ওঠা বা শূন্যতায় গভীর পতন – প্রত্যেকটি অভিজ্ঞতাই আলাদা ঘর বানিয়ে রাখে জীবনে। সময়ের অবহেলায় কখনও তার শরীরে জমে শ্যাওলা। খসে পলেস্তরা। কোনো অংশ আবার খুব নিবিড়, ছায়াচ্ছন্ন। পাঁশ দিয়ে বয়ে চলেছে সোঁতা। তার দু’পাড়ের কাদায় পায়ের ছাপের গর্ত – যারা কখনও এসেছিল এই জীবনের ভেতরে – বাইরে। উজ্জ্বল লাল আলোয় ঠোঁট কামড়ে ধরে সেইসব কথা। তাদের শক্ত চোয়াল। ঝকঝকে রঙ। একটু দূর সামনে এগোলেই আবার হয়তো খোলা আকাশ। ফাঁকা। কেবল নিঃসঙ্গতার উদাহরণ হিসাবেই যাকে ধরে নিই আমরা।

বৈজ্ঞানিক সত্যগুলো বড় বেশি রহস্যময় করে তোলে আমাদের পরিচিত বস্তুজগতকে। আমরা দেখি কিভাবে পদার্থ টুকরো হয়ে যায় অনু-পরমাণুতে। বুঝি জল কেবল বহন করে নীলের ছায়া; আয়নায় যে আকাশের প্রতিবিম্ব তাতে একটুও নেই আকাশ। আমাদের চিন্তার দেওয়ালগুলো এভাবেই ভেঙে চুরমার হয়। ঠিক যেভাবে জলে নিজের প্রতিবম্বকে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে যেতে দেখেছিল নার্সিসাস। আর এভাবেই হয়তো সে পৌঁছে গিয়েছিল বস্তুজগতের পরবর্তী ধাপে – যা প্রতীকহীন, একা, অথচ প্রবলভাবে সম্পূর্ণ। শক্তির রূপান্তরের ধাপে সে কেবল রূপান্তরিত করে নিজেকে। এক স্তর থেকে অন্য স্তরে – সে বজায় রাখে বস্তুরই জীবন – নিবিড়তা। হয়তো কয়েকশো বছর আগেকার প্রবাহ। যতিহীন ও দীর্ঘ। আর এভাবেই আমাদের কাছে তার পুরো অংশটি অধরাই থেকে যায়।

যুক্তি ও বিযুক্তির ভাবনা

কণিষ্ক ভট্টাচার্য


‘বাজিকরের খেলা রে মন, যার খেলা হায় সে-ই জানে।’

একা এবং বিচ্ছিন্ন মানুষের আরও একটা রূপ পাওয়া গেল এই বিশ্বজোড়া মহামারির সময়ে। গোটা বিশ্বেই মানুষকে মহামারির কবল থেকে বাঁচাতে সামাজিক মেলামেশা থেকে শারীরিক দুরত্বে থাকার নির্দেশ দিয়েছে বিজ্ঞান, রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যস্থতায়। এই মধ্যস্থতার প্রসঙ্গে আমরা আবার পরে আসব।

কিন্তু যোগবিয়োগ প্রায়শই গণিতাতিক্রমী অথবা হয়ত তার নিগূঢ় অজানা গণিত আছে যা এখনো অপ্রকাশিত।

বিশ্বজোড়া সামাজিক এই বিযুক্তির কথা যখন লিখছি তখন এই বিশ্বজোড়া শব্দের ‘জোড়া’ অংশের মধ্যে দিয়েই গোটা বিশ্বের মানুষের মহামারিকালীন যে একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতা সেই বিযুক্তির সঙ্গেই আমরা আসলে যুক্ত হয়েছি এক বাধ্যতায়। এই সময়ে যেন এমন এক পৃথিবী অবস্থান করছে যা আসলে বিযুক্তির ধারণায় যুক্ত। যোগ তো আর এক প্রকার নয়। সঙ্গরোধে আমাদের দৈনন্দিনতায় আরও অনেক কিছুর সঙ্গে যে বিষয়টির বিয়োগ ঘটেছে তা হল যুক্ত হওয়ার থেকে বিয়োগ। গণিতের সরল অঙ্কের মতো আমরা বিশ্বজোড়া একা ও বিচ্ছিন্ন মানুষেরা আমাদের সঙ্গে একটি করে বিয়োগচিহ্ন বহন করে অবস্থান করছি। সরল অঙ্কের সমস্ত বিয়োগচিহ্ন বহনকারী সংখ্যার মতোই এক-পঙক্তিক আমরা আসলে প্রথম-বন্ধনীকৃত হয়ে যুক্ত হচ্ছি ক্রমশ। এই বিশ্ব যেন স্বতঃ যোগচিহ্ন বহন করে পঙক্তির সামনে দাঁড়িয়ে আর এই বিযুক্তির মধ্যে দিয়েই সেই বিশ্বের সঙ্গে জুড়ে আছি আমরা।

#

এই একা বা বিচ্ছিন্ন অবস্থানে মানুষ কবে থেকে, কবেই বা সে ছিল যুক্ত! কার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত, কার থেকেই বা বিযুক্ত হয়েছে সে!

প্রকৃতির অংশ হিসেবেই অপরাপর জীবের মতো মানুষের জন্ম। প্রকৃতির মধ্যেই গোষ্ঠীবদ্ধতায় তার বিকাশ। গোষ্ঠীপরিচয়ের গণ্ডিতে বদ্ধ থেকেও যখন তার চিন্তা তাকে প্রকৃতি-নিরপেক্ষ ‘আমি’ বলে চিনতে শেখাল তখনই সে বিচ্ছিন্ন হল ‘বিশেষ’ হিসেবে। যে চারপাশের সে অঙ্গীভূত ছিল সেই ‘আমি’র সঙ্গে ‘এবং’ সম্পর্কে সে অন্বিত করল চারপাশকে। এই তার প্রথম বিযুক্তি। বস্তুত কারো সঙ্গে বিযুক্তির বোধ যদি না সঞ্চারিত হয় তাহলে সম্পর্কের অন্বয়ের কোনো ভিত্তি থাকে না। অঙ্গাঙ্গী, অর্থাৎ অঙ্গের সঙ্গে অঙ্গীর যে সম্পর্ক নিরূপণ করি আমরা সেখানেও একটি নিহিত ভেদকল্পনা থাকতেই হয়। যবে থেকে মানুষ ভাবতে শিখেছে তবে থেকেই সে বিচ্ছিন্ন।

একার বা বিচ্ছিন্নতার বোধ তাই নতুন নয়। বহুদিন ধরেই তা মানুষকে ভাবিয়ে চলেছে। ধর্মীয় জ্ঞানতত্ত্বের কাঠামোয় পরমেশ্বরের সঙ্গে জাগতিক মানুষের ভেদ বা বিচ্ছিন্নতাকে আলোচনা করা হয়েছে প্লেটিনাস, অগাস্টিন ও লুথারীয় ধর্মতত্ত্বে। ভারতীয় ভেদ ও অভেদতত্ত্ব ভেদাভেদে এসে মিলেছে। দ্বি না এক, নাকি বস্তুত এক কিন্তু লীলার নিমিত্ত দ্বিভেদ এই প্রশ্নে সঞ্চারিত হয়েছে।

পরমের কল্পনাকেন্দ্রিক এই ভাবনা ধর্মকাঠামোর বাইরের আলো পেল হেগেল ও ফয়েরবাখের আলোচনায়। সেই চিন্তাসূত্র আসে রুশোর থেকে যে, সামাজিক চুক্তি ব্যক্তিকে সমাজের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছে, যার ফল এই বিচ্ছিন্নতা। এখানে রুশো বস্তুত প্রাকৃতিক মানুষ এবং ও সামাজিক মানুষের মধ্যে এক ভেদরেখা টেনেছেন, যার সঙ্গে হেগেলের অবিচ্ছিন্ন ও আত্মবিচ্ছিন্ন মানুষের তুলনা টানা যায়।

হেগেলের দর্শনে আত্মবিচ্ছিন্নতার ধারণা প্রযুক্ত হয়েছে পরম ও পরম-মনের ওপর, যা হল একমাত্র বাস্তব। এই গতিশীল পরম-মন সবসময়ে আবর্তিত হয় বিচ্ছিন্নতার দিকে আবার বিচ্ছিন্নতার বিপরীতে। পরম আসলে প্রাকৃতিক জগতে নিজেই নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন আর মানুষের ভূমিকা সেখানে ক্রমশ বিচ্ছিন্নতা অতিক্রমের প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে পরম হয়ে ওঠায়। আত্মবিচ্ছিন্নতা এবং তাকে অতিক্রম করাই পরমের সত্তাস্বরূপ। যতক্ষণ মানুষ এক প্রাকৃতিক সত্তা ততক্ষণ সে আত্মবিচ্ছিন্ন কিন্তু যখন সে ঐতিহাসিক সত্তা তখন সে নিজের এবং প্রকৃতির সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনে সক্ষম। ফলে সে নিজের আত্মবিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করতেও সক্ষম। অর্থাৎ মানুষের মূল গঠনেও মানুষের আত্মবিচ্ছিন্নতা ও তার সমন্বয়ের প্রক্রিয়া বর্তমান। মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হল বস্তু উৎপাদন করা ও নিজেকে সেই বস্তুর মাধ্যমে অভিব্যক্ত করা। আবার এই উৎপাদিত বস্তুর মাধ্যমে সসীম মন নিজেই বস্তু হয়ে ওঠে এবং এই প্রক্রিয়ায় নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।

ফয়েরবাখ মানুষকে আত্মবিচ্ছিন্ন পরমাত্মা বলে স্বীকার করেননি বরং পরমাত্মাকে আত্মনবিচ্ছিন্ন মানুষ বলে মনে করেছেন। পরমাত্মা মানুষের সত্তার এক বিমূর্ত চরম রূপ যা মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন। নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন না হলে মানুষ ঈশ্বরকে সৃষ্টি করতে পারে না। বিচ্ছিন্ন বলেই সেই ঈশ্বরকে নিজের মাথার ওপর বসিয়ে তার ওপর সমস্ত মহত্তর গুণ আরোপ করে নিজেই তার দাস হয়ে পড়ে। মানুষের বিচ্ছিন্ন প্রতিকৃতিই হল ঈশ্বর। সেই ঈশ্বরকে বিলোপ করেই মানুষ সেই বিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করতে পারবে।

মার্কস মনে করতেন ফয়েরবাখ যে ধর্মীয় বিচ্ছিন্নতার কথা বলেন তা মানুষের নানা ধরনের বিচ্ছিন্নতার এক বিশেষ রূপ। কারণ বৌদ্ধিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সব স্তরেই মানুষ নিজের শিল্প-দর্শন, রাষ্ট্র, আইন, পুঁজি থেকে বিচ্ছিন্ন। বিভিন্ন উপায়ে মানুষ তার নিজের কাজকর্মের মাধ্যমে উৎপাদিত বস্তুর থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং বস্তুসমূহ নিয়ে এমন স্বাধীন, পৃথক, শক্তিশালী জগৎ সৃষ্টি করে যেখানে সে এক শক্তিহীন দাস। বস্তুত মানুষ শুধু নিজের উৎপাদিত বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, যে কাজকর্মের মাধ্যমে সে এইগুলি উৎপাদন করে, সেই কাজকর্মের থেকেও সে বিচ্ছিন্ন। যে প্রকৃতি ও জগতে সে বাস করে, সেখান থেকে সে যেমন বিচ্ছিন্ন সেইরকম সে বিচ্ছিন্ন অন্য মানুষের থেকেও। এই সমস্ত রকম বিচ্ছিন্নতাই মানুষের আত্মবিচ্ছিন্নতার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এমনকি মানুষের মানবিকসত্তা থেকে সে বিচ্ছিন্ন।

#

এই তত্ত্বভাবনা এতদূর বিকশিত হওয়ার বহু আগে থেকেই কিন্তু একা বা বিচ্ছিন্নতার বোধ সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রকাশিত হয়েছে।

মানুষ সামাজিক জীব। নির্জনতম সাহিত্যিক, যিনি ব্যক্তিক অভিজ্ঞতা বা ব্যক্তিক মনোজগৎকে সাহিত্যে অভিব্যক্ত করেন বলে মনে হয়, বস্তুত তিনিও আসলে সমাজের পরিপ্রেক্ষিতেই ব্যক্তিক অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করেন। তাঁর এই ব্যক্তিক একাকীত্ব বা বিচ্ছিন্নতা আসলে সমাজের পরিপ্রেক্ষিতেই। ফলে তাঁর নির্জনতার অভিধা তাঁকে আসলে কেন ‘জন থেকে নির্বাসিত’ সেই ভাবনাকেই পুষ্ট করে। এই প্রসঙ্গে এক প্রয়াত বাঙালি কবির কথা মনে পড়ছে যিনি চোখ তুলে ঈষৎ ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলতেন, ‘ও স-স সাহিত্য!’ এই ‘স-স’টি হল ‘সমাজ সচেতন’! কিন্তু সচেতনতাটিও আসলে ব্যক্তিক সচেতনতা। আরও স্পষ্ট করে বললে সমাজের প্রেক্ষিতে ব্যক্তিক সচেতনতা।

জার্মান দার্শনিক ফিশে, যিনি প্রথম জীবনে সাবজেক্টিভ আইডিয়ালিজম ও পরবর্তী জীবনে অবজেক্টিভ আইডিয়ালিজমের চর্চা করেও এঙ্গেলসের মতো বস্তুবাদীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, তিনি আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন ‘সাহিত্য ধর্মীয় ভাবনার অনুবৃত্তি।’ বস্তুত মধ্যযুগীয় সাহিত্য শুধু নয়, মালার্মে কথিত স্থাপত্য থেকে সংগীত শিল্পের সমস্ত মাধ্যমই ধর্মীয় ভাবনার অনুবৃত্তি।

সেখানে সমাজ বা গোষ্ঠী-উত্তর কোন একা বা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিভাবনার স্থান ছিল কী! সাধারণ ভাবে এর উত্তর হল না। তার অন্তঃপ্রেরণা থেকে উৎসর্গ সবই ধর্মের জন্য, এমনকি কখনো তা সাধনপ্রক্রিয়ার অংশ। তবু শিল্পের সৃষ্টি বা নির্মাণের যে স্তরপরম্পরা তার মধ্যেই রোম্যান্টিক কবির মনে প্রশ্ন জাগে, ‘হেরি কাহার নয়ান, রাধিকার অশ্রু-আঁখি পড়েছিল মনে?’ অথবা ধর্মীয় সাধ্যসাধনতত্ত্বের প্রতিতুলনায় আসে নিগূঢ় প্রতীকস্বরূপ সমাজচিত্র। কারণ কোনো নির্দিষ্ট পাঠকের সঙ্গে (হতেই পারে তিনি অপর উপাসক কেবল, ধর্মীয় নিষেধ মেনে তার বাইরে আর কেউই নয়) যোগাযোগের নিমিত্তই এই সৃষ্টি। কারণ ‘নীরব কবিত্ব’ ও ‘আত্মগত ভাবোচ্ছ্বাস’ কোন কাজের কথা নয় বরং ‘প্রকাশই কবিত্ব’। আর সেই প্রকাশকে চালিত করে কল্পনা। ‘মিউজ’এর প্রতিতুলনায় মুধুসুদন দেখেছিলেন এইভাবে,

‘তুমিও আইস দেবি, তুমি মধুকরী

কল্পনা কবির চিত্ত ফুলবনমধু

লয়ে রচ মধুচক্র…’

‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং’ বলেই শিল্পস্রষ্টার মনে হয়, ‘কী বলিনু আমি! এ কী সুললিত বাণী রে! কিছু না জানি কেমনে আমি প্রকাশিনু দেবভাষা, এমন কথা কেমনে শিখিনু রে!’

বস্তুবিশ্বের ক্রৌঞ্চমিথুনের প্রেমবিলাস ও ব্যাধের হন্তারকের জীবিকার অভিজ্ঞতা শিল্পস্রষ্টার ব্যক্তিত্বের স্পর্শে যে শিল্পমূর্তি হয়ে উঠল ‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং’ প্রকাশে তাঁকে শিল্পরসিক হিসেবে কবি নিজেই বিস্মিত হন। এই বিস্ময়বোধ কবিকে দৈব অনুপ্রেরণার ধারণাব্যতীত অপর কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারে না, তাই কাব্যে দেবী সরস্বতীর আগমন হয়।

কান্ট এই মধুকরী কল্পনার হত্যাকারী।

যতদিন কল্পনাশক্তির মহিমা ছিল ততদিন শিল্পীকে মনে করা হত দৈবানুপ্রেরিত ব্যক্তি। কান্ট সাধারণ কল্পনাশক্তির সঙ্গে কবিকল্পনার পারথক্য নির্ণয় করলেন। কল্পনাকে নান্দনিক, উৎপাদনশীল ও সৃজনশীল এই শ্রেণিতে বিভক্ত করলেন। এতে মিউজের মৃত্যু ঘটলেও শিল্পের জন্মরহস্য ব্যাখ্যা হল।

সমাজ বিকাশের সঙ্গে সাহিত্যের বিকাশের একটা ধারা লক্ষ করা যেতে পারে। মহাকাব্যে গোষ্ঠীগত ভাবনার প্রাধান্য ছিল। মিথ জুড়ে জুড়ে যে এপিক তৈরি হয় সেই মিথ গোষ্ঠীভাবনার ফসল। সেই এপিকের লেখক বা সংকলক কেউ থাকলেও তা ব্যক্তিচিহ্নিত শিল্পকর্ম নয়। এখানে মনে হতে পারে চেতনার বিকাশকে যদি আমরা বিচ্ছিন্নতার আদিমূল ধরি তাহলে তার সঙ্গে কি এখানে যুক্তিশৃঙ্খলার ব্যত্যয় ঘটছে? বস্তুত না, কারণ শিল্পী সেখানে গোষ্ঠীরভাবনাকেই সংকলন করছেন কেবল। ধারাক্রমে যখন ট্র্যাজেডি এলো তখন তার উপজীব্য হল ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের কর্তব্য-অকর্তব্যের সংঘাত। আবেগের অতিরেক বা অপর কোনো কারণে সমাজের নিষেধকে ব্যক্তি উল্লঙ্ঘন করছে এবং সমাজ তাঁকে শাস্তি দিচ্ছে, কখনো তার নিজের হাত দিয়েই দেওয়াচ্ছে। অর্থাৎ একা বা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিভাবনা এখানে অস্বীকৃত। তাই নায়কের প্রতি শাস্তিবিধান। কমেডিতে বা মিলনান্তকে এসে সেই ব্যক্তি সমাজের আধিপত্যকে অস্বীকার করে নতুন সমাজের বার্তা দেয়। অর্থাৎ পূর্বতন যে নিষেধনির্ণীত ব্যবস্থা তাকে অস্বীকার করে সে এক নতুন সমাজের স্বপ্ন দেখে। যাকে প্রতীকায়িত করে আমরা দেখি মূলধারার ক্ষেত্রে নায়কনায়িকা হাত ধরাধরি করে এক সূর্যোদয়ের পথে হেঁটে যায় আখ্যানের অন্তিমে। ইউরোপ তখন তার নিজের চোখ দিয়ে বহির্বিশ্বকে চিনছে যাকে সে আবিষ্কার বলে দাবি করবে সেখানে উপনিবেশ স্থাপনের পরে। রোম্যানটিসিজমে এসে দেখা গেল এই একাকীত্বের এক নতুন রূপ। এখানে আমরা রোম্যান্টিক রবীন্দ্রনাথকৃত সংজ্ঞার দিকে একবার চোখ ফেরাব। তার চারটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে যে তিনটি আমাদের এই আলোচনায় প্রয়োজন সেইদিকে দেখব। ১. প্রচলিত ধারার প্রতি দ্রোহপ্রবণতা, ২. দূরযানীবৃত্তি, ৩. প্রকৃতিপ্রাণতা। ব্যক্তিমানস সমাজের প্রচলিত ধারার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বা একা বোধ না করলে এবং সেই ধারা পরিবর্তনে অক্ষম না হলে কেনই বা সে সেই ধারার প্রতি দ্রোহপ্রবণ হবে! ট্র্যাজেডির কাল পেরিয়ে গেছে তাই সমাজ তার শাস্তিবিধান করতে পারে না। কমেডির কালও নয় যে ব্যক্তি সমাজকে ত্যাগ করে নতুন সমাজের পত্তন করবে। কারণ ইউরোপের চোখে ইতোমধ্যেই তথাকথিত বহির্বিশ্ব আবিস্কৃত। সেখানে উপনিবেশের নিষেধনির্ণীত নতুন সমাজ গঠনের প্রক্রিয়া চলমান। দূরযানীবৃত্তির স্থানিকতার সুযোগ আর নেই, তাই রোম্যান্টিক কবির দূরযানীবৃত্তিটি হয় কালিক। অর্থাৎ নির্বাসিতের স্বপ্নপ্রয়াণ। সেই স্বপ্নপ্রয়াণটি কোথায় সম্ভব! না, কোনো সমাজ কাঠামোয় আর তা সম্ভব নয় তা রোম্যান্টিক কবি জেনে গেছেন। কারণ এক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা সমাজসীমাকে অতিক্রম করলে আসলে সে আরেক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা সমাজসীমায় প্রবেশ করে। রোম্যান্টিক কবির একা এবং বিচ্ছিন্ন মনের কাছে সমাজনির্মিত মানুষ সহনীয় থাকে না আর তাই সে সমাজকাঠামোর বাইরে প্রকৃতির কাছে পৌঁছতে চায়। এমনকি তা স্বপ্নপ্রয়াণ হলেও। আসলে সে একা এবং বিচ্ছিন্ন, আসলে সে যুক্ত হতে চায় কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজকে সে পেয়েছে এক অনন্ত নিষেধমূর্তি রূপে। এছাড়া তখন তার কাছে আর অন্য উপায় নেই। অতএব সে সিদ্ধান্ত নেয়, ‘আমরা যাহার সহিত মিলিত হইতে চাহি সে আপনার মানসসরবরের অগম তীরে বাস করিতেছে; সেখানে কল্পনাকে পাঠানো যায়, সেখানে সশরীরে উপনীত হইবার কোনো পথ নাই।’ একা এবং বিচ্ছিন্ন মানুষের যুক্তি আর বিযুক্তির খেলা চলতেই থাকে। আধুনিক কেবল সেই একা বিচ্ছিন্নতার নানা রূপ ফুটিয়ে তুলছে। নানাভাবে তাকে ব্যাখ্যা করতে চাইছে। নানা রাজনৈতিক ভাবনায় সেই বিযুক্তি থেকে যুক্তির দিকে যাওয়ার প্রয়াসপথ সন্ধান করছে শিল্পকর্মে। কখনো তা সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতায় এমনকি কখনো বা ভিন্নভাবে অস্তিবাদে। কিন্তু সে পথ এখনো অনির্ণীত।

#

‘ও মন কখন শুরু কখন যে শেষ কে জানে!’

যে ‘আত্ম’র জন্যে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, সেই ‘আত্ম’কেই মানুষ আবার যুক্ত করার পথ খুঁজে ফেরে।

গোটা বিশ্বকেই মহামারি থেকে বাঁচাতে সামাজিক মেলামেশা থেকে শারীরিক দুরত্বে থাকার নির্দেশ দিয়েছে বিজ্ঞান, রাষ্ট্রের মধ্যস্থতায়। সেই নির্দেশ কিন্তু স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। কারণ তা সার্বিক ভাবে পালন করতে গেলে রাষ্ট্রের আরও কিছু ভূমিকা থাকে। যে ভূমিকা রাষ্ট্র পালন করেনি। যে দেশে স্বরাজ্যে কাজ নেই বলে কুড়ি কোটি অদক্ষ শ্রমিককে ভিনরাজ্যে কাজ খুঁজতে তথা কাজ করতে যেতে হয় সেই রাষ্ট্রেরও বিজ্ঞানের নির্দেশ পালন করার জন্য আরও কিছু কাজ করা অপেক্ষিত ছিল। সেই শ্রমিকদের রাষ্ট্র আসলে ভিন্নার্থে বিচ্ছিন্ন করেছে। তাদের একা করে দিয়েছে মূল রাষ্ট্রব্যবস্থার থেকে। যেন তারা নেই। যেন তারা উদ্বৃত্ত। যেভাবে তাদের শ্রমের দাম উদ্বৃত্ত হয়ে জমা হয় পুঁজির কাছে। একটা ভারত শতশত কিলোমিটার জাতীয়সড়কে হাঁটছে একা ও বিচ্ছিন্ন অবস্থা কাটিয়ে পরিবারের মানুষের কাছে ফিরবে বলে। সেই হাঁটার জন্য পুলিশের লাঠি কখনো দেশের মানচিত্র আঁকছে সেই শ্রমিকদের শরীরে। যেন সেই জাতীয় সড়ক তাদের হাঁটার জন্য নয় যেমনভাবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্বচ্ছল সাদাকলারের পরিযায়ী শ্রমিকের জন্য। সেই একা এবং বিচ্ছিন্ন মানুষদের তখন পুলিশের মার থেকে বাঁচতে জাতীয় সড়ক ছেড়ে রেলের লাইন ধরতে হয় কারণ অন্তত সাত-আট কিলোমিটার অন্তর যে ছোটো স্টেশন আসে সেখানে পুলিশ থাকে না। বড়ো স্টেশনের আগে লাইন ছেড়ে ঝোপঝাড় দিয়ে পথ পার হতে হয় তাদের। রাতে ক্লান্ত শরীরে রেলপথে ঘুমিয়ে পড়লে মালবাহী রেল তাদের শরীরের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করে ছড়িয়ে দেয় রেললাইনে। যুক্ত হওয়া, কেবল যুক্ত হওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা তাদের শিখিয়ে দেয় বৈশাখের অকরুণ সূর্যের নিচে দশ বারো দিনের হাঁটার চেয়ে রাতের ঠান্ডায় হাঁটা তুলনায় সহনীয়। তাছাড়া পুলিশও তখন সেই শ্রমিকদের রাষ্ট্রের মতো ঘুমিয়ে থাকে। বরং তাদের সঙ্গে জাগে শ্বাপদ। ধাতব রেললাইনের শীতলতা ছুঁয়ে থাকে সাপ। তবু ফোনের আলো তারা জ্বালায় না চার্জ ফুরিয়ে একা আর বিচ্ছিন্ন হবে না বলে। অনন্ত পথ আর অনন্ত রাত শেষ হয় না। শেষ হয় কেবল আশা আর রাহাখরচের সম্বল।

রোগের শ্রেণি হয় তা আমরা আগেই জানতাম। একা ও বিচ্ছিন্ন মানুষের আরও একটা রূপ আমরা দেখতে পেলাম মহামারির সময়ে। সেটা হল শ্রেণির রোগ। আলোকপ্রাপ্ত সুবিধাভোগী যে শ্রেণি ঘণ্টায় ঘণ্টায় সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে, জনসমাগমের দুরত্ব বাঁচিয়ে, ইন্টারনেটে জীবিকার সুরাহা করে, শিল্পসাহিত্য ও তত্ত্বচর্চায় একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতার ভণিতা লিখছে সেই লেখায় কি তারা আসবে যাদের হাত ধোয়ার হাত সাবান স্যানেটাইজার দূরের কথা পানকরার জন্যে পরিস্রুত জল নেই! আসলে আমরা সুবিধাপ্রাপ্তরা প্রত্যেকে একেকটি বিয়োগচিহ্নবাহী সংখ্যা। কেবল এক পঙক্তিক নই বলে যুক্ত হতে পারি না। আমাদের কোন প্রথম বন্ধনী নেই তাই। আসলে বন্ধনীকৃত হতে চাই না আমরা। হতে ভয় পাই। কারণ আমাদের সামনে নেই স্বতঃ যোগচিহ্নবাহী বিশ্ব। তাই আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গে যুক্ত হতে পারি না। আর তাত্ত্বিক তো কবেই বলে দিয়েছেন সাবঅল্টার্নের বাচন নেই। আমরা বহু আগেই তাদের একা ও বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে তাই নিয়ে আবার প্রবন্ধ লিখি।

লকডাউন

শ্রুতকীর্তি


“লকডাউন” শব্দটা যে আমাদের যাপনে এভাবে ঘাড়ের ওপরে বসে নিশ্বাস নেবে, তা কি স্বপ্নেও ভেবেছিলাম কোনোদিন? মাঝেমাঝে আমি স্বেচ্ছায় নিজেকে গুটিয়ে নিই পৃথিবীর থেকে,কিন্তু সেটা তো ইচ্ছাকৃত! ভাবিনি কখনও একদিন দরজায় গণ্ডি কাটা হয়ে যাবে আর আমরা সবাই হব ‘লকড্ ডাউন’। প্রশ্ন হল ,এই সময়টাতে নিজেকে কি একটু বেশি ভালবাসলাম? আর যদি কখনও না-ই বেসে থাকি, তাহলে কি এই সময়টায় একটু মায়া হল? হল বোধহয়, তাই স্নান করার সময় শাওয়ার থেকে প্রথম বিন্দুটা প্রাণ দিয়ে শুষে নিই। অনেকটা সময় নিয়ে থালা সাজাই, ওই ঠিক যেরকম ফুড-ব্লগাররা করে! শেল্ফ থেকে বের করি তুলে রাখা সেরামিক্স, ওয়াইনের গ্লাস আর একটু একটু করে সেজে ওঠে আমার যাপন। আমি কথা বলি আমার বারান্দাবাগানে যত্নে হয়ে ওঠা গাছেদের সঙ্গে, এত যত্ন ওরাও কি কখনও আগে পেয়েছে? স্বার্থপরের মত ভাবি, এই এত যত্ন, হয়ত সেটাও আসলে আমার নিজের মনেরই পরিচর্যা! এভাবে দিন গড়িয়ে যায় আর আমি প্রেমে পড়ি নিজের। দেখি জাঙ্কফুডের অভাবে কীভাবে আস্তে আস্তে ঝরে পড়ছে এক্সট্রা ফ্যাট আর কীভাবে না রঙ করা চুল হয়ে উঠছে স্বাভাবিক খয়েরি। চোখে পুরোনো ঔজ্জ্বল্য আর মুখ পলিউশনহীন। আমার এই একাযাপন যেন মোমবাতির আলোর নত নরম, স্থির। সব কাজের বাইরেও নিজের সঙ্গে নিজের ডেট! লুকিয়ে থাকা রোমান্টিসিজম। বাইরের দিকে আর তাকাই না। খবর পেতেও চাই না। ভাবনার অনেক দূর দিয়ে চলে যায় রেলগাড়ি, মন আর চায় না হাইওয়ে। আমি সকালে চোখ খুলে ভিটামিন ডি খুঁজি।এভাবেই যদি কোনোদিন সমাপ্তি হয় আফশোস হবে না। আমি শেষ সময় পর্যন্ত আদর করব নিজেকে…সমস্ত ভালবাসা ঢেলে দেব কফিফ্রথে।