সমস্ত বিড়াল সম্পর্কে সত্যি

শুভ্রা মুখার্জি


এই যে উবু হয়ে বা হাঁটু মুড়ে বসার ভঙ্গিটা দেখছেন অথবা ধরুন ওই কালো হাতবাক্সটা কিম্বা এখান থেকে উঠে একটু পশ্চিমের দেওয়ালের দিকে গেলে একটা ছোট্ট হাতমোজা দেখতে পাবেন সেল্ফের ওপর, এগুলো সবই রিপিট টেলিকাস্টের মত আমার জীবনে জড়িয়ে রয়েছে। তার জড়িয়ে যাচ্ছে, সুর কাটছে, তবুও এসব বাস্তব থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন হতে দিচ্ছে না। কী যেন একটা প্রয়োজন মাথায় নিয়ে রোজ সকালে উঠি আর রাত্রি ঘন হলে একটা চটের বস্তার ওপর গুটিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। এসব অভিজ্ঞতার আগে আমার হলুদরং বিকেল ছিল,লিকার চা ছিল, মদ ছিল। একটা বিপন্ন দুপুরে মঞ্জু যখন পাছা উলটে শুয়ে আছে আমি টের পেলাম আমি ক্রমশ ছোট হয়ে আসছি। দৌড়ে বাথরুমে গেলাম এবং জল বেরোনোর ফুটো দিয়ে গলে সোজা নর্দমায় পড়লাম। নর্দমার অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম। নিজেকে এই ছোটো রূপে নর্দমায় দেখে প্রথমটা ঘাবড়ে গেছিলাম। তারপর মনের জোরে বিস্তর টানাহ্যাঁচড়ার পর বাথরুমের মেঝেয় ফিরলাম। আবার বড় হতে হতে নিজের সাইজের থেকে প্রায় আধহাত বড় হয়ে ঘরে ফেরার পর মঞ্জুর আর ইচ্ছে নেই বলে ঘুমিয়ে পড়ল।পরের সকালে চা দিল,জলখাবার দিল কিন্তু আমার আধহাতি বেড়ে ওঠাটা লক্ষ্য করল না৷ আসলে মঞ্জু কোনওদিনই আমাকে বিশেষ লক্ষ্য করে না,শুধু সময়মতো পাছা উল্টে অথবা পা ফাঁক করে শুয়ে পড়ে। বরং ও যাদের লক্ষ্য করে মানে রীতিমতো খেয়াল করে,যাদের জামার বোতামের অভাবও ওর ঠিকঠাক চোখে পড়ে তারা আমার প্রতিবেশী। আমি এ বিষয় নিয়ে একটুও ঈর্ষান্বিত হতে পারি না,বহুবার চেষ্টা করে দেখেছি,প্রতিবারই মনে হয় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সুগম সম্বন্ধ থাকাই ভালো। এখন প্রতিটা প্যান্ট আধ হাত করে বাড়ানোর চিন্তা আমার ওপর এমনভাবে চেপে বসল যে আমি মঞ্জু, রীনা এবং রঙিন মাছ বিষয়েও সমস্ত কথা ভুলে গেলাম।
ঘটনাক্রম আমাকে যেদিকে নিয়ে গেছে আমি চুপচাপ সেদিকেই সরে পড়েছি। প্রতিবাদ আমার ধাতে নেই,ঘুষের লেনদেন সংক্রান্ত কাজ তাই আমার হাতে খুবই সুন্দর ভাবে হয়ে যায়। যেন হালকা গরম ছুরি মাখনে চালিয়ে ব্রেকফাস্ট টেবিলে তুমি মজা দেখছো। জলের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে যেতে টের পেলাম আমার এবার থেকে বাড়িতেও মোজা পরে থাকা দরকার। আঙুল ও পায়ের গড়ন আমাকে এবার একটু চিন্তিত করে তুলছিল। দুটো ভালো কোয়ালিটির মোজা কিনে পায়ে গলিয়ে বাড়ি ফিরে দেখলাম মঞ্জু টেবিলে বসে গাজর কুচোচ্ছে। এরকম সব ছুটির দিনে আমার সাথে রীনার কথা হয়না।যেন একটা অলিখিত চুক্তি,ছুটির দিনে আমি মঞ্জুর বাকি দিনগুলোর ওপর রীনার অধিকার। আজ কি মনে হতে রীনাকে ফোন করতেই ও স্বভাবের খানিকটা বাইরে গিয়েই জোরে হেসে ফেলল।গুজগুজে নিচু স্বরে কথা বলেও আমি মঞ্জুর কোনও আলাদা মনোযোগ আদায় করতে পারলাম না।  এমনকি রাতে শোওয়ার পর আমার মোজা শোভিত পা-ও ব্যর্থ হল সেকাজে। গায়ে হাত দিতে ও চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল,আমি ওর ভেতর ঢুকে কিছুক্ষণ নাড়িয়ে চাড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লাম।
আমার চিন্তা ছিল অফিস নিয়ে, সেখানে আমার এই আধহাতি লম্বা চেহারা সবাই দেখবে এবং তারপর এটা নিয়ে জটলা হবে,মন্ত্রণা সভা বসবে। কিন্তু আদতে তেমন কিছুই হল না! আমি যে এখানে কতখানি নগন্য একজন সেটা টের পেতেই ভালো মুখে বেয়ারাকে ডেকে চায়ের অর্ডার দিলাম।লোকটা আমার এই নব্য ভদ্রতা দেখে হকচকিয়ে গেলেও চা দিল। হঠাৎই গন্ধে টের পেলাম আমার চেয়ারের পিছনে মহুল ফুল ঝরছে।কোনও একটা গোলাপি হলুদে ডুবে যাচ্ছে সব।দৌড়ে উঠে আসি, আহ্ ছাতিমের গন্ধ।  ছাতিমের তলা জুড়ে ছড়ানো লাল শাড়ি, শিফনের প্যাঁচানো প্যাঁচানো ঘোর।লাল যেন জলের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে।  আমার পায়ের পাতা ঈষৎ হলুদ ও রোমশ।রীনা হাসছে,মুচকি কিম্বা জোরে জোরে শব্দ করে। মঞ্জু শিৎকার করছে ; এগারো বছরের অভ্যাসবসত শিৎকার।এসব অপরিকল্পিত ভয়ের মত ছড়িয়ে ছড়িয়ে আমাকে স্থবির করে দিলে আমি শুধু মাথা ঘুরিয়ে নিজের চারপাশে জমে থাকা সুন্দরীদের মাথা দেখতে পাই। সবকটা থেকে উল্টো করে জিভ ঝুলে আছে,লাল জিভ, কাঁটা কাঁটা লাল জিভ! সরে যেতে চাই, পা আরও গভীরে বসে যেতে থাকে। মাথাগুলি শেয়ালের মত চিৎকার করে ওঠে…
আমি কি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম? এখন চেয়ারের পিছনে মহুল নেই, কাঠকাঠ সাদা দেওয়াল আর ফাইলের তাক। আরও কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর উঠে পড়লাম। চশমার কাচ মুছে এবার বেরিয়ে পড়লেই হয়। আজ আমার বিড়াল হতে ইচ্ছে হল।  বিড়াল হয়ে চারটে বাড়ির বউদিদের দুপুরকালীন ক্রিয়াকর্ম দেখে নিজের বাড়ির রাস্তা ধরলাম। বিড়াল হওয়ার একটা বড় সুবিধা হল আপনাকে কেউ ধর্তব্যের মধ্যেই রাখবে না। এই যেমন এখন মঞ্জু আমাকে সামনে রেখেই ওর এক নামকাওয়াস্তে ভাইয়ের সাথে চূড়ান্ত অ্যাকটিভ সেক্স করছে।আমি চুপচাপ দেখছি,যেমন একটু আগে নমিতা বউদি কোলে তুলে থলথলে মাইএর মধ্যে আমাকে চটকে দেওয়ার সময় শুধু একটু মিঁউ করেছিলাম। এমন অবস্থায় আমার রীনাকে দেখতে ইচ্ছে হল। এ-পাঁচিল ও-পাঁচিল টপকে আমি রীনাদের অফিসে এসে ঢুকলাম।রীনা দেখে খুশি হয়ে একটুকরো সেঁকা পাউরুটি ছুড়ে দিল। সাধারণত আমি এভাবে খেতে অভ্যস্ত নই তবু রীনাকে খুশি করতে খেয়ে নিলাম।রীনাও খুশি হয়ে ‘বিল্লুটা’ বলে মাথায় হাত বুলিয়ে বসের কেবিনে চলে গেল। আমিও পায়ে পায়ে ঢুকে পড়ি। দীর্ঘ সময় ওদের মন্দারমনির আলোচনা শুনি এবং আমাকে টুপি পরানোর বুদ্ধিগুলি শুনে চুপচাপ বেরিয়ে আসি।
গোলপার্কে বসে আছি। গত দুদিন হল এই গোলপার্ক কেন্দ্রীক জীবন আমার ভালোই লাগছে।জলে বুড়বুড়ি কেটে ঘুরে যাচ্ছে মাছ,পথচলতি কুকুর বিড়ালের সাথে ধাক্কা লেগে লেগে আমার সফিস্টিকেশন খসে পড়েছে। স্কার্ট পরা মেয়েদের পায়ের তলায় গিয়ে বসি,বহুদূর দেখা যায়। যেমনটি আমি দেখতে চেয়েছি। চকলেট চকলেট রঙের ওপর সাদাসাদা ফুল। ফুল ঝরে পড়ছে আমার মাথার ওপর ; নাকে ফুলের সোঁদা ও আঁশটে গন্ধ টের পাই। বিড়ালীর গর্ভকালীন স্বপ্নে জল বাড়ে, মৃদু আঁচে লেজ সেঁকে নেয় ক্লান্ত বিড়াল। আমি ফুলের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি সেখান থেকে মর্গ ও সাদা দেওয়ালের দূরত্ব সমান সমান। আমি দেওয়ালের দিকে ঘুরে দেখি মর্গে আমার মত কোনও দেহর খোঁজে টানাটানি চলছে। মঞ্জু কি কাঁদছে? অমিত, রানা এরা সবাই কি একটু কষ্ট করে চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে? রীনা কি মন্দারমনি না গিয়ে আমার লাশ দেখতে এসেছে? মঞ্জুর সাথে কি ওর সেই ভাই..? কিছুই স্পষ্ট করে দেখতে পাই না অথচ এই অসম বিকেলে আমার সমস্তকিছুর জন্য কান্না পেতে থাকে। এই চতুষ্পদ প্রবণতায় মগজ লাফিয়ে পড়ে। আমি গিয়ে লাফিয়ে পড়ি কাগুজে টেবিলে। সবকটি প্রবণতা একসাথে ছিঁড়ে ছিঁড়ে জলের নিয়ন্ত্রন থেকে খুবলে ভাসিয়ে দিই,অনন্ত আরও অনন্তকাল…

একাকী পায়ের ছাপ

শ্রীদত্তা বিশ্বামিত্রন


সেই লোকটার কথা অথবা তারই মতো। খয়েরি রঙ খয়াটে একজন, মনে রাখার মতন কিছুই নেই, এমন লোক। তার কথা। হবে নাই বা কেন? সে একা বলে কি একক? সামান্য বলেই কি নগণ্য?

 

অন্যরকমও হতেই পারত, কিন্তু সেসব কথা তো খবররের কাগজেই পড়া যায়। বড় বড় কথারা কলার উঁচু করে থাকে। কান পেতে তাদের শোনার প্রয়োজন হয় না, আবার চাইলেও তেমনভাবে শোনা যায় না। একাকী একাগ্রতায় হারিয়ে যায় লাউডস্পিকার, পড়ে থাকে পুরনো রেডিও। নির্জনতম দুপুরে উটের গ্রীবার নিঃসঙ্গতায় যখন অশ্বত্থ পাতার মৃদু ঝিরিঝিরি… সে এক বিশেষ শব্দ, যা শুধু অশ্বত্থের, বটের নয়, আম-জাম-জারুলের নয় — যা অন্ধকেও বলে দেয় প্রশ্নহীন নিশ্চয়তায় যে এই শীতলতা অশ্বথ-ছায়ারই… সেই নিবিষ্ট কর্ণময়তায় কি শোনা যায় মানুষের সোচ্চার সঙ্গীত, স্লোগান, কলহ-কোলাহল? তারার আকাশে কি গনগন করতে পারে উচ্চকিত এক সূর্য? অন্যরকম হতে পারত, কিন্তু আসলে অন্য কিছু হতেই পারত না। খয়েরি রঙ ক্ষয়াটে এক লোক তার বিস্মরণীয় ধূসরতায় যাবতীয় একাকী কথন সহ একাই ছিল, সেরকমই থাকতে হত তাকে। যূথবিচ্ছিন্ন ধুলোটে সব ধূসর মানুষের নিরালা অ্যাণ্টেনায় মৃদুতম ঝিরিঝিরি সিগনালে ধরা পড়তে পারত শুধুমাত্র তারই একাকী কথন, যা নিরুচ্চার হলেও স্বগতোক্তি নয়।

 

সেই লোকটা। তার অনুচ্চারিত কথন। মনে রাখার মতন কিছুই নেই, এমন যাপন। সেই তার বেলাভূমি। বালি পেরোলে সেই সমুদ্র, যা তার নয়। এসব মানুষের সমুদ্র থাকে না, বালি থাকে। বালিতে তার পায়ের ছাপ, যা থাকে না, জোয়ার আসার আগের ঢেউয়েই মুছে যায়। সমুদ্রে চলে যায় তার পদচিহ্ন, যেখানে সে নিজে যেতে পারে না। একা মানুষটিকে আরও একা ফেলে ভেসে যায় তার পায়ের গোড়ালি, আঙুল, বা তার বালুছাপ। তারা চলে যায় দূরতম দ্বীপের ওপারে। ফেলে যাওয়া এপারে সিকতা-খাতায় সন্ধের কোটাল পেরিয়ে তবু পড়ে ফেলা যায় তার পদাক্ষর বা তার ছাপ, মুছে ফেলার দাগটি সমেত। চাঁদ পড়ে। একা চাঁদ পড়ে। অনেক দূরে কোনো এক ফরাসী সৈকতে সেই এক চাঁদের জোয়ারে সেইসব মুছে যাওয়া পায়ের প্রত্নছাপ চিনে নিয়ে মুচকি হাসেন এক প্রয়াত দার্শনিক। বালু-শিল্প ভাঙার… ভেঙে গড়ার… গড়ে ভাঙার… তার অগঠনের, নির্মাণের, বিনির্মাণের জ্যোৎস্না সন্ধ্যা-ভাষায় কানে কানে পেরোয় মহাদেশ। বিস্মরণীয় পায়ের অন্যমনস্ক চিহ্ন আর পদক্ষেপের বিস্মৃত অর্থ অন্ধকারের আশ্রয়ে অবিস্মরণে পাড়ি দেয়।

 

খয়েরি রঙ ক্ষয়াটে সেই লোক আকাশের ছায়ায় রাত জাগে। ঢেউ শোনে সারারাত, ঢেউ বোঝে, গোনে না। ভোর শোনে। ভোরের ঘ্রান নেয়। ভোর দেখে। ভোর পেরিয়ে সকালে যায় নিয়ম করে… দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। সকাল পেরিয়ে দুপুর। দুপুর এলে তার তেষ্টা পায়। কি আশ্চর্য! তার সাগর নেই, নদী নেই, কিন্তু তেষ্টা আছে। তেষ্টা পেলে সারা গায়ে রোদ মুড়ি দিয়ে সে দেহের প্রতিটি রন্ধ্র থেকে অন্তর্জলের বাষ্প হয়ে যাওয়া আটকাতে চেষ্টা করে। তারপর ঝিনুক দিয়ে কুয়ো খোঁড়ে তটের শরীরে। রোজ খোঁড়ে। তারামাছের শব পেরিয়ে পৃথিবীর গভীরের দিকে যায়। একদিন না একদিন জলের সন্ধান পাবে ভেবে ঘড়ি ধরে কাজ করে চলে একাগ্র করণিকের নিষ্ঠায়। বছর পেরোয়। কর্মে কর্ম যোগ হতে থাকে প্রত্যহ। তার কর্ম অক্লান্ত কিন্তু নিষ্কাম নয় বলে মোক্ষ এসে ধরা দেয় না। জল ছোঁয় না তার কুয়ো, শুধু বালু উঠে আসে… অনন্ত ও সুগভীর বালুকণা। মধ্যাহ্নে অভ্রের মতো ঝলমল করে তারা… জলের মতো চিকচিক করে। বছর ঘোরে। সূর্যকে চারদিক থেকে দেখে ফিরে এসে খবর দেয় বুড়ি পৃথিবী। আবার বেরিয়ে পড়ে। লোকটাকে নিয়ে যায় না পরিক্রমণে। কেউ নিয়ে যায় না তাকে কোথাও। কেউ তাকে সাগর দেয় না, মোহনা দেয় না। শুধু দৈনিক বালির বরাদ্দ রেখে ফিরে যায় ঢেউ।

 

তা বলে এমন নয় যে নৌকো আসেনি। নৌকা তো সব ঘাটে আসে… সকল বন্দরে, বালুচরে। নোয়ার নৌকো আসে, মৎস্য অবতারেরও। প্রলয়-তুফান এলে কাকে নিয়ে যাবে আর কাকে নেবে না, তার তালিকা বানায়। প্রশ্ন করে। পরিচয় জানতে চায়, বৈশিষ্ট্য খোঁজে, অর্জন দেখতে চায়। লোকটা কিছুই দেখাতে পারে না। সামান্য এক নর সে। এককথায় “গড়পড়তা”। এই অসাধারণ সাধারণত্ব তার মধ্যে দেখে সেই কবে প্রাক-যৌবনে তাকে ছেড়ে চলে গেছে একান্ত প্রেমিকা। তখন থেকে সে আর পুরুষতর হতে পারেনি, জয়ী হতে পারেনি, বড় হতে পারেনি, বুড়ো হতে থেকেছে। মহাপুরুষ নয় সে, নারীও নয়, লিঙ্গ-পাঁচিল ডিঙোতে পারা মানুষও নয়। রাজা নয়, ধনী নয়, সন্ন্যাসী নয়, বিদ্রোহী নয়। কবি বা কথক, চিত্রী বা ভাস্কর, সুযন্ত্রী, নর্তক, নট, কারিগর, বিজ্ঞানী… কিছুই নয়। শুধু নিজের বরাদ্দ জীবনটুকু সে বেঁচে চলেছে নীরবে। শুধু নিজের কাজটুকু নিয়ে ব্যস্ত। একেবারে নিজের মাপের… নয় তার চেয়ে একটুও বড় কিম্বা ছোট। অ্যামিবা নয়, ভাইরাসও নয়। সিংহ, অশোকতরু, ম্যামথ, বটবৃক্ষ বা তিমি… এমন কিছুই নয় যাকে প্রলয়ের ওপারে ফের মনে পড়বে সুপ্তোত্থিত স্রষ্টার। নৌকো তাকে নেবে কেন?

 

সোনার ডিঙিও এসেছিল একদা অঘ্রান বিকেলে? ” ধান আছে? নতুন ধান? উৎসব এল গো!” একাকী মাঝি ডাক দিয়ে গেছিল একা মানুষকে। ধান কোথায় পাবে লোকটা? আজীবন কুয়ো খুঁড়ে তুলেছে শুধু বালি। আঁজলা ভরে সুবর্ণ-ধূলি নিয়ে ছুটল সে ডিঙিমুখো। “এই নাও ধূলিমুঠো, এই নাও ধূলিমুঠো। সোনামুঠো নিয়েছিলাম মা পৃথিবী, ধূলিমুঠো দিয়ে শোধ করলুম।” ডিঙি নিল না তার ধূলোবালি। অন্তত ফসলটুকু যদি থাকত তার! প্রলয়কালে নিজে নয় ভেসেই যেত, অন্তত কর্মফলের বোঝাটুকু দিয়ে যেতে পারত সুখী পৃথিবীর কাঁধে। এখন তার সারাজীবনের অর্জন এই অন্নত বালিয়াড়ি নিয়ে সে কী করবে?

 

এদিকে ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর বয়স হল। খবর এল, আর বেশিদিন নেই। এবার সে মরবে সবচেয়ে বেশি মাথায় তোলা ছোট ছেলেটির হাতেই। বুড়ি চিন্তায় পড়ে গেল। সে মরলে খোকাটিও বাঁচবে না। এখনো কোল থেকে নামেনি সে। বাঁচবে না অন্য সন্তানেরাও। দুর্ভাবনায় ভাঁজ পড়ল নোয়া, মীন ও ঈশ্বরের কপালেও। এবারে বাঢ়ে বুঝি ভেসে যাবে সকল প্রদেশ। নৌকা ডুবে যাবে আর বাঁচবে না কোনো প্রাণবীজ। দুরন্ত বালকটিকে থামাতে হবে। সে এক বিভ্রান্ত নটরাজ। প্রকৃষ্ট লয়ের তাল ভুলে যে ছন্দে সে নাচছে আগুনে, সেই নাট্যে ধ্বংস আছে, ধ্বংস পেরিয়ে সৃষ্টির বোলটি গেছে হারিয়ে। অথচ সে ভাবে মনে এই যেন সৃজন ছন্দ তার। সকল প্রত্নছাপ মুছে মাটি ছেনে বানিয়ে চলেছে নিজের মূর্তি অগণিত। দুরন্ত ক্ষুধায় সেই মূর্তিরা ছিঁড়ে খাচ্ছে বালকের পেশিতন্তু ও মেদ। যে জলের আয়নায় প্রথম নিজেকে দেখেছিল নার্সিসাস, সেই দীঘির শরীরে আর ঢেউ নেই… অপরিবর্তনীয় পারদ আর কাচ। অথচ তৃষ্ণা ভোলেনি সে। তেষ্টা পেলে সে কুয়ো খুঁড়তে বসে বল্লম হাতে। বন্ধুত্বের শব পেরিয়ে সে গর্ত খোঁড়ে পৃথিবীর বুকের ভেতর। অবিরাম খননে উঠে আসে বিটুমিন ও বালি।

 

 এমনিতর ভাবনায় হতাশ, নোয়া-মৎস্য-ঈশ্বর-পৃথিবী যুগপৎ ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস। সেই শ্বাস নীল হয়ে ভেসে থাকে লাল ধোঁয়া, কালো ধোঁয়া, বেগুনি ধোঁয়ার পাশে ক্লান্ত ওজোনের ফাঁকে ফাঁকে। তার নীল দুঃখ থেকে ট্রপোস্ফিয়ারে নেমে আসে এক অদ্ভুত কান্নার বিষ… ক্রুদ্ধ ভাইরাসের মতো। সেই বিষ ছড়িয়ে পড়ে বন্দরে বন্দরে, মানুষ থেকে মানুষে। বিষের ভয়ে মানুষ ভয় পেতে শুরু করে মানুষকে। এমনকি আক্রমণ করতেও ভয় পায়, পাছে ছোঁয়া লাগে। পিছিয়ে আসে, এড়িয়ে চলে, গুটিয়ে যায়। গুটিয়ে আনে নিজের দখল। সরিয়ে আনে সৈন্য। নিভিয়ে ফেলে চুল্লি। ভাঁজ করে পকেটে ভরে বাণিজ্য-জাল। ত্রস্ত মানুষ রাজপথ ছেড়ে ফিরে যায় গৃহে, গৃহ থেকে কোটরে, কোটর থেকে গুহায়। বহু সহস্র বছর পর আবার আলতামিরায় ফিরে গুহার প্রায়ান্ধকারে সে টের পায় পাথরের দেওয়ালে চিত্রিত অনড় মহিষের পাশে সে একা। যেন স্থির হলে সেই প্রাগৈতিহাসিক প্রাণের মতো সেও বাঁচতে পারবে তুষার ও সুনামি পেরিয়ে আরও বহু যুগ।

 

সেই নির্জনতার নৈঃশব্দ্যে তার অন্তঃকর্ণ জেগে ওঠে। বহুদিন পর টিভি ছাড়া, এফএম ছাড়া, হেডফোন ছাড়াও সেই গান শুনতে পায়… অবশিষ্ট কয়েকটি ঝিঁঝির। বাঁশবনের। বাতাসের। বাতাস বেয়ে একাকী শ্রোতার কানে আসে একান্ত একার স্বগত-স্বনন। একা আর একক থাকে না।

 

সব জাহাজ, সব নৌকা থেমে গেলে তবে বন্দরের তোয়াক্কা না করে অজস্র একা মানুষের ভেতর ছড়িয়ে যায় নিঃসঙ্গ বালুচরের ক্ষয়াটে মানুষের খয়েরি বেঁচে থাকা বা বেঁচে থাকার ছাপ অথবা ছাপের মুছে যাওয়া… মুছে যাবার দাগ, সেই দাগ সমেত ছাপ আর ধুয়ে যাওয়া পদচিহ্নের জীবন।

যারা চিরলকডাউনে

প্রসূন মজুমদার


মগজের স্ক্রুগুলোয় একটু ঠোকাঠুকি করলেই যে ব্যাপারটা মনে হতে থাকে সেই কথাটা পেড়েই আজ শুরু করা যাক। আমরা, মানে এই মনুষ্যকুলের নাদান সুখবিলাসীরা সাধারণত ভূতের রাজত্বে বাস করতে ভালোবাসি। প্রথামাফিক এইক্ষেত্রে যে কথাটা বলে নেওয়া ভালো সেটা হল সুখবিলাসী শব্দটা আমি ভেবেচিন্তেই বলেছি। শেষদৌড়ে আমাদের দুঃখবিলাসও একধরনের সুখানুভূতি প্রাপ্তির চেষ্টাই বটে। যাই হোক, কথাটা হল ভূতের রাজ্য নিয়ে। ভূত বলতে এক্ষেত্রে অতীতকেই বলেছি। আমরা প্রায় কেউই বর্তমানে বাঁচি না। বাঁচি অতীতে। ভবিষ্যত সবার অজানা টাইপের আপ্তবাক্যের বোর্ড হৃদয়ে ঝুলিয়ে রেখে আমরা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মতো করে নিজেকে গড়ে তুলি না। আমাদের চেতনে, নিশ্চেতনে এমনকি সামগ্রিক নিশ্চেতন, মানে যাকে ইংরেজিতে বলে কালেক্টিভ আনকনশাস, সেই সামূহিক অ- জ্ঞানেও গ্যাঁট হয়ে বসে থাকে এই অতীতচারিতা।

ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজের ট্যাবুলা রাসাকে বারবার মুছে, নিকিয়ে চেষ্টা করেছি বর্তমান থেকে ভবিষ্যতে বাঁচতে।  কিন্তু স্বভাব না যায় মলে, ফলে স্ব- ভাব সুযোগ পেলেই ঘাই দেয়। লকডাউনের এই তালাবন্ধ ঘরযাপন তাই আচমকা আমার ভিতরেও ভূতেদের নামিয়ে এনেছে। অতীতের বিশেষত কচিবেলার কয়েকটা চরিত্র আমায় মাঝেমাঝেই দেখা দিচ্ছে আর হাসিমুখে বলে যাচ্ছে, ‘ ছোটভাই, মনখারাপ কোরো না।আমাদের কথা ভাবো। আমরা তো চিরলকডাউনেই দিব্যি কাটিয়ে দিলাম! ‘ এরপরে যদি আমি তাদের নিয়ে দুচার কথা এই লকডাউনের দিনকালে না বলি তবে নিজের কাছেই অপরাধ হয়।

লকডাউন – ১
চারিদিকে হইহই।বাজার জনসমুদ্রে থইথই। সরকার একটা নতুন অনুশাসন এনেছে।তার দুই নাম হোম – কোয়ারান্টাইন আর সোশাল ডিসট্যান্সিং। বিবেকানন্দের কল্যাণে আমরা প্লেগের সময়ের কারাটিঁন শব্দটা আগে শুনে থাকলেও সামাজিক দূরত্ব শব্দটা তখন একেবারে আনকোরা। শীতঘুমে যাওয়ার আগে তাই পিঁপড়েরা যেভাবে পিলপিল করে খাবার জোগাড় করতে বেরিয়ে পড়ে তেমনই ব্যস্ততায় মানুষ আগামীর খাবার জড়ো করতে প্রাণপণে ঝাঁপ দিয়েছে। তখনই মনে পড়লো মান্তুর কথা।মান্তু আমাদের বাড়িতে আজও আসে।বাসন মাজে আর ঝাঁট দেয়। মান্তু কী করছে এখন? হয়তো মানুষের এই সুখাদ্য খোঁজার হাভাতেপনা দেখে আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে আছে। মান্তু কী এসবে আর সত্যিই আশ্চর্য হতে জানে আজও? ওকে তো আমরাই শিখিয়েছি,বলা যায় মাথার ঘাম পা-এ ফেলে শিখিয়েছি, কী খেতে হয় আর কী খাওয়া যায় না।মান্তু এসব জানতো না। সকাল হলেই ওকে পাওয়া যেতো ছাইএর গাদায়, ছাই  বেছে বেছে অতি তৃপ্তি করে ছাই দিয়ে প্রাতরাশ করে নিতো ও। লাঞ্চে টালির টুকরো কিংবা গায়ে মাখার পাউডার পেলে একগাল হেসে ফেলতো আনন্দে। একবার অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে ওকে আমি পেয়ারাপাতা দিয়ে আনারসের পাতা চিবোতে দেখলাম বিকেলে। সেই মান্তু কীভাবে হজম করতো এসব তা সম্ভবত ডাক্তারি শাস্ত্রের অধিগত নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান যেহেতু আমাদের শিখিয়েছে মানুষে ওসব খায় না,তাই আমরাও ওকে মানুষ করে তুলেছি প্রায় দশবছরের টানা চেষ্টায়। এখন আর ও ছাই ঘাঁটে না তাই পাপ কোথায় লুকিয়ে আছে সেটাও বুঝতে পারে না আর। মান্তুও হয়তো এখন রেশন দোকানের লাইনে থলে হাতে দাঁড়িয়ে পড়েছে। কোয়ারান্টাইন শব্দটাও আগের মতো করেই ওকে শিখিয়ে ফেলবো আমরা।মান্তুও মাস্ক পরে ঘুরবে আর ওর প্রিয় লঙ্কাজবার মধু শুকিয়ে যাবে পুংকেশরের আগায়। সে মধুতে জিভ দেওয়া এখন পাপ,এখন লকডাউন ১।
লকডাউনের প্রথম দিনেই লোকজনের এইভাবে দোকান ফাঁকা করে দেওয়ার অকাতর আর্তির দিকে তাকিয়ে  আমাদের গ্রামের নবেদাকে আচমকা মনে পড়ে যায়। নবেদা মানে জয়দেব। মাঝেমধ্যে জালাখানেক চোলাই পেটে চালান করে দিয়েই নবেদা দার্শনিক হয়ে যেতো। পাশ দিয়ে সভয়ে চলে যেতে চাওয়া পথচারীর রাস্তা আগলে হামেশাই বলে উঠতো, ‘ ভয় পাবেন নে কত্তা।জয়দেব বলে নবে নাকি মদ খায় কিন্তু নবে জানে জয়দেব মদ খায় না’। সেই ছোটবেলায় নবে আর জয়দেবের দ্বিবিধ অস্তিত্ব নিয়ে আমরা বিস্তর হাসাহাসি করতাম। পরে ফ্রয়েড সাহেবের তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করে জয়দেব আর নবের একদেহে আলাদা অস্তিত্বকে যেদিন বুঝলাম সেদিন অতীতের সেইসব মজামস্করার জন্যে অপরাধী মনে হয়েছিল নিজেকে।যাই হোক, সেই নবেদা একদিন পান না করেই আহার করতে গেছিল এক চায়ের দোকানে।একটু বেশি খাচ্ছে দেখে দোকানি মজার ভঙ্গিতেই তার সঙ্গে বাজি ধরে বসে। দোকানের সব খাবার খেয়ে নিতে পারলে দোকানদার নবেদার কাছ থেকে এক পয়সাও নেবে না। নবে কালাতিপাত না করে খাওয়া শুরু করল, চা,চিনি,দুধ,বিস্কুট, পাঁউরুটির পুরো স্টক খালি করে দিয়ে শেষে যখন তাকে সাজানো মাটির গণেশটা মুখে পুরতে যাবে, মুগ্ধ খদ্দেররা তখন নবেদাকে আটকায়। লকডাউনের শুভারম্ভে জয়দেবদের নবে হয়ে যেতে দেখে তাই সম্ভবত আমার বিস্তর আমোদ হয়েছিল।

লকডাউন – ২

‘শীতকাল কবে আসবে, সুপর্ণা? / আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব।’ এমন একটা লাইন লিখে যে কবি সমসময়ের একগোছা তরুণ কবিতাপাঠকের মনে অলস বিষাদের জুইসঁস ছড়িয়ে দিয়েছেন সেই কবি বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই তাঁর চাহিদা পূরণের আনন্দঘন দুঃখ উদযাপন করতেন,’ কেন ঘুম আসে হৃদয় আকাশে ‘ টাইপের লাইনে দুঃখ ঢেলে দিয়ে। অথচ মজা হলো, কবির ছায়া-অনুসরণকারীদের

অনেকেই দেখা গেলো তিনমাস দূর তিন সপ্তাহর গৃহবন্দিত্বই মেনে নিতে পারছে না। এই ভাষ্কর অনুরাগীদের আলস্যবর্জন কর্মসূচি দেখতে দেখতে আমার বাসুদাকে মনে পড়ে গেলো। বাসুদা কখনওই দাবি করেনি যে ‘ কে যেন তার শরীরে ব্যাঙের রক্ত ঢুকিয়ে দিয়ে যায় ‘। সম্ভবত এতো সুন্দর করে দুঃখ যাপন করতে পারেনি বলেই বাসুদাকে আজও লোকে পাগল বলে। বাসুদা কখনও কোনও অর্থকরী  কাজ করেনি, খাবার জোগাড়ের জন্য পরিশ্রমকে সে মনে মনে ত্যাগ করেছে।তার আদর্শ, ‘জিভ দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি ‘। তার পেশা নিমন্ত্রণরক্ষা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে বিনা আমন্ত্রণে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতঃ বাসুদা দরিদ্রকে অন্নদান করার অপার্থিব পুণ্য গৃহস্থকে দান করে থাকে। খাওয়ার পরে পাতাটা ফেলতে বললে বাসুদা অবাক চোখে তাকিয়ে চুপচাপ উঠে আসে,তার মতে নিমন্ত্রিতকে স্বহস্তে পাতা ফেলতে বলা আসলে তাকে অপমান করা। বাসুদা গৃহস্থকে এই পাপ করতে দিতে পারে না। সেই বাসুদা আজও একটা দীর্ণ, জীর্ণ কুঁড়েঘরে একটা চৌকির উপরে দিনের প্রায় ২০ ঘণ্টাই শুয়েবসে কাটায়। একদিন তার বাড়ির সংলগ্ন মাঠে খেলার শেষে আমরা কয়েকজন বন্ধু বসে একটু গুলতানি করছি। সন্ধে সবে নামবে। দেখলাম বাসুদার ঘরের জানলা দিয়ে একটা প্রমাণ সাইজের কেউটে হেলেদুলে ঢুকে পড়লো। আমাদের বুক ছ্যাঁত করে উঠলো। জানলা দিয়ে উঁকি মারতেই দেখি বাসুদা বালিশে মাথা দিয়ে জানলার বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। খুব নিচুস্বরে বাসুদাকে বললাম, ‘ তোমার খাটের পায়ায় কেউটে’।  বাসুদা, মৃদু হাসলো, ‘তালাবন্দী আছি তো,ভয় কী? ও আসে। ঘোরেটোরে। ইঁদুর হয়েছে তো। খেয়ে যাক।  খাবার জন্যে কতো খাটনি এদের। ‘ বলতে বলতে বাসুদার চোখ বুজে এলো। বাসুদাকে আজও আপনারা আমাদের গ্রামে গেলে খুঁজে পাবেন। শুনলাম কয়েকদিন আগে বাবাকে জানলা দিয়ে  ডেকেছিল বাসুদা, জানতে চেয়েছিল, ‘ সবাই বলছে, লকডাউন। ওই নামের কিছু তো শুনিনি! আপনি কিছু জানেন, সেজদা?’

লকডাউন -৩

মাসখানেক ঘরবন্দী থেকে লোকজনের মাথা আউলে গেছে। যে ছেলেটার বাড়িতে এই দোলের দিনেও ঢুকতে গিয়ে তুমুল হোঁচট খেয়েছি আর চোঁ করে তিনতলা থেকে এক দৌড়ে নিচের গেটে এসে হাঁপিয়েছি তার সাধের কুকুরের তাড়া খেয়ে আর যে আমায় পুনরামন্ত্রণ জানিয়ে ওপর থেকে বলছিল, ‘ কুকুরকে চেনে বেঁধে দিয়েছি,আর ভয় নেই উঠে এসো’, সেই ছেলেটাও লকডাউনে আর থাকতে চাইছে না, বলছে তারও নাকি মাথাখারাপ হয়ে যাচ্ছে বন্দী থেকে থেকে, তারও নাকি কামড়ে দিতে ইচ্ছে করছে প্রশাসকদের।  এসব শুনে মটকা মেরে পড়ে থাকি আর আমার চোখে ভেসে ওঠে চুড়োদার সেই চাহনি।সে চাহনিতে কি কৌতুক ছিল?  চুড়োদা আমাদের বাড়িতে আসতো।এসেই বলতো ‘চুড়োপাগলা আর ঘরে থাকতি পারে না। কাজ দাও। খেতে লাগবে’। বাবাও কাজ দিত। কখনও কলাপাতা কাটা,কখনও ঘাস নিড়ানো।কাজের শেষে বরাদ্দ কুড়ি টাকা।কুড়ি টাকার তখন দাম ছিল। দশ পয়সায় তখনও মালাইবরফ পাওয়া যেতো।  কিন্তু চুড়োদাকে কুড়ি টাকার নোট দেওয়া যেতো না। দশ টাকার দুটো নোট দিলেও চুড়োদা নোটগুলো পায়ের কাছে ছুঁড়ে দিত। তারপর,নিজের বুকে দুমদুম করে কিল মারতে মারতে গরগর করতো,’ আমি কি অত পাগোল নাকি যে টাকার ব্যালু বুজবুনি? ‘ কাজের বিনিময়ে চারটে পাঁচটাকার নোট তার প্রাপ্য,তার জায়গায় একটা বা দুটো নোট দিলে তার তো রাগ হবেই! চারটে পাঁচ টাকার নোট হাতে দিলেই চুড়োদা একগাল হাসতো,’আমাদের তো খেটি খেতি হয়,পাগোল হয়ে ঘরে থাকার জো আমাদের আচে!’ আজ লকডাউনে হাজার হাজার মানুষ সরকারের কাছে যখন এই কথাই বলছে তখন কোনও লোক তাদের চুড়োপাগলা বলে ক্ষেপায় না। আমার কৌতুক জাগে।
কুদ্দুস বয়াতির মতো গেয়ে উঠতে ইচ্ছে করে, বিচার করলে সবাই পাগল, আমি পাগল একলা না।’

লকডাউন – ৪

দ্বিজদার কথা মনে পড়ে।দ্বিজদার নাম যে দিয়েছিল সেই লোকটার নাম যদি আমাকে কেউ দিতে বলতো তবে এককথায় আমি বলতাম নস্ত্রদামুস। মানুষ কতোটা দূরদর্শী হলে কোলের ছেলেকে দেখে বুঝতে পারে, এ ছেলে একদিন দ্বিজ মানে পাখির মতো গাছে গাছে উড়ে বেড়াবে! হ্যাঁ,দ্বিজদা যখন কোমরে দড়ি বেঁধে সব গাছ ছাড়ানো তালগাছের মাথায় ঝুলতে ঝুলতে তাল কাটতো তখন নিচ থেকে বাজপাখি ছাড়া তাকে আর কিছুই মনে হতো না আমার। সেই দ্বিজদা প্রায় তিনমাস না আসার পরে আমাদের বাড়িতে ফিরে এলো একদিন।দ্বিজদা আবার ফিরে এসেছে খবর পেয়েই আমরা পড়িমরি করে বেরিয়ে এসে দেখি দ্বিজদা পা ছড়িয়ে আমাদের দালানে বসে আছে। পাশে উবু হয়ে বসে বাবা দ্বিজদার কুশল-সংবাদ জানছে দুলে দুলে। ‘ কী করবো বাবু, ঘরবন্দী ছেলুম।  তিনমাস। কী করে বেরুব। মাকে দেখতে হবে নি? ‘
বাবা বললো,কেন গো, কাকিমার কী অসুখ করেছে?
দ্বিজদা একগাল হেসে জবাব দিয়েছিল,’ না গো কত্তা!  মাকে দেখতে হবে নে? ভেন্ন হয়ে গেলুম তো!  দাদার সঙ্গে সব হাফ-হাফ ভাগ হই গেলো। পুরো মাপে মাপে ৫০-৫০।  আমার ভাগে মা পড়লো,দাদার ভাগে বৌদি ‘।
নারীবাদী থেকে গাড়িবাদী আসলে সকলেই আমরা অর্থনীতির বাঁটোয়ারা দ্বিজদাদের সঙ্গেই করতে চাই। এমনকি কেন্দ্র আর রাজ্যের অর্থনীতির প্যাকেজেও আসলে মোদীদাদাদের ভাগে বউ পড়ে আর আমোদী এই ভাইলোগের ভাগে মা। হিন্দি সিনেমার হিরোর মতো যতই এখন ‘ মেরে পাস মা হ্যায় বলে তড়পাও না কেন, আসলে মিত্রোঁ তোমাদের মা ভাঁড়ে থাকা ভবানী বই আর কেউ কি?

অন্তরীণ দিন

যূথিকা আচার্য্য


বিশ্বাস করুন, প্রথমে কিন্তু সত্যিই বুঝিনি যে এমনটা হতে পারে। লকডাউনের কথা বলছি।

মেনে নিয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নিইনি শুরুর দিকে। সুপার মার্কেটে টয়লেট পেপার রোল নিয়ে মারামারি হলে নিজেদের মধ্যে ইন্ডিয়ান লোটা সিস্টেমের এফেক্টিভনেস নিয়ে ইয়ার্কি মেরেছি। কিন্তু মার্চের প্রথম সপ্তাহে টুইটারে ইটালীর মৃত্যুমিছিলের ছবি দেখে সবকিছু ওলোটপালোট হয়ে গেল। হোয়াটস্অ্যাপ, ফেসবুক গ্রুপে সবাই চুপচাপ। কারোর মুখে কথা নেই। সত্যিটা মেনে নিতে বড় কষ্ট হচ্ছিল। আমরা তবে সর্বশক্তিশালী নই। দ্য মাইটিয়েস্ট অফ্ অল্! ওয়েল, ইটস্ নট আস্! খালি চোখে দেখা যায় না এমন একজন এসে আমাদের সামনে যেন আয়না তুলে ধরল। তারপর ধাক্কাটা সামলে নিয়ে আবার উঠে দাঁড়ালাম।

আমরা দুজন, মানে আমি আর আমার কত্তাবাবুটি থাকি সেন্ট কিলডার অ্যালমা পাড়ায়। মেলবোর্নের সবচাইতে পুরোনো সাবার্বগুলোর মধ্যে একটা। এই কারণে রাস্তায় দুপাশে প্রচুর ভিক্টোরিয়ান ডিজাইনের বাড়ি দেখতে পাওয়া যায় এখনও। দিব্যি সুন্দর লাগে দেখতে। ঝিরিঝিরি ফিলিগ্রীর ঝালর দেওয়া মস্ত বড় জানালা। বারান্দার রেলিং বেয়ে লতিয়ে ওঠা আইভি লতা। দোতলা বাড়িগুলোর ব্যালকনিতে ছোট ছোট টবে ফরগেট মী নট আর স্প্রে রোজের রঙের বাহার সকালের নরম রোদেও ঝলমল করে। বাড়ি থেকে সামান্য দূরে একটা জুয়িশ স্কুল রয়েছে। সেখানে আগে সবসময় চুন্নু মুন্নুদের চ্যাঁ ভ্যাঁ লেগেই থাকত। সেসব এখন বন্ধ। এছাড়া বাড়ির সামনের রাস্তায় চলতে থাকা গাড়ির আওয়াজও আর শোনা যায় না তেমন। মোড়ের মাথায় মাইক সহকারে পিড়িং পিড়িং গীটার বাজিয়ে গান গাইত একটা পোলিশ ছেলে। গান শুনে লোকে ডলার দিত ওকে। সেই গানের আওয়াজও নেই আজকাল। সকাল বেলা থেকেই বিচিত্র আওয়াজে সরগরম হয়ে ওঠা আমাদের অ্যালমা পাড়া যেন কবরখানার মতো স্তব্ধ হয়ে গেছে।

লকডাউনের ফলে অস্ট্রেলিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ও স্টেট বর্ডার দুইই বন্ধ অনির্দিষ্ট কালের জন্য। বাড়ি থেকেও বেরোনো যাবে না। আর্থিক ভাবে বিপর্যস্ত অবস্থা অনেকেরই। অলরেডি প্রায় দশ লক্ষ মানুষ চাকরি খুইয়েছে। তবে এও বলবো যে এখানে সরকার যথেষ্ট সাহায্য করছে। করোনার অভিশাপে চাকরি হারিয়েছে যারা তাদের জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হোমলেসদের জন্যও আশ্রয় ও তিনবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ল্যান্ডলর্ডদের বলা হয়েছে পরিস্থিতি বুঝে তারা যেন টেনান্টদের প্রতি সদয় ব্যবহার করেন। কেউ যদি প্রমাণ দেখাতে পারে যে করোনার কারণে তারা ইনকাম হারিয়েছে, তাহলে ল্যান্ডলর্ড তাকে অন্তত মাস দুয়েকের জন্য আশ্রয় দিতে বাধ্য। প্রতিবেশীরাও একে অপরকে যথেষ্ট সাহায্য করছে। সুপার মার্কেট আর কেমিস্টের দোকান ছাড়া বাকী সবকিছু বন্ধ এখন। যেসব ব্যস্ত জয়েন্টগুলোতে সরষে ফেলার জায়গা পাওয়া যেত না, সেখানে লিটারেল অর্থেই ঘুঘু চড়ছে। ছোটো ব্যবসায়ীদের সেন্টারলিঙ্ক থেকে সাহায্য করা হচ্ছে যাতে তারা সারভাইভ করতে পারে। সেদিক থেকে বলব কোভিড 19-এর প্রতিরোধে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। পুরো মহাদেশে এখনও পর্যন্ত করোনা পজেটিভের সংখ্যা সাত হাজারের নীচে এবং মৃত্যু একশোর কাঁটাও ছোঁয়নি এখনো। ইকনোমির যদিও বারোটা বেজে গেছে অলরেডি। তবে এটাও ভাবছি যে অ্যাটলিস্ট প্রাণে তো বেঁচে আছি আমরা। ইটালী, স্পেন, বা আমেরিকার কথা ভাবলে শরীর শিউরে উঠছে।

আমরা এখন সকাল সন্ধ্যায় ব্যালকনি বা বারান্দা থেকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে গপ্পোগাছা করি। খোলা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা কফির মাগ হাতে উচ্চঃস্বরে আড্ডা হয়।

“মিস্টার লিউ, আপনার মেয়ের পিয়ানো ক্লাস কেমন চলছে?”

“ সারা, তোমার কলিগের সঙ্গে ঝামেলা মিটলো?”

“মিসেস টেয়লর, ফেসবুকে আপনার নতুন ডিপি দেখলাম। এই পীকক কলারের গাউনটা নতুন কিনেছেন বুঝি? দারুণ লাগছে কিন্তু।“

“গ্র্যান্ডমা লেনা, তোমার হাঁটুর ব্যাথাটা কেমন আজকাল। ওষুধ লাগাচ্ছো তো? কিছু লাগলে হেজিটেট করো না। সঙ্গে সঙ্গে বলবে একদম।“

“সালভাদোর, বলি খবর কী তোমার! আজকাল যে তোমার টিকিরও নাগল পাওয়া যায় না। পাড়া প্রতিবেশীদের ভুলে গেলে নাকি!”

এটা লকডাউনের একটা ভালো দিক। কাজেকর্মে ব্যস্ত থাকায় কখনোই যাদের সঙ্গে কথা বলা হয়ে ওঠেনি, এখন তাদের সঙ্গেও যেন নতুন করে আলাপ হল। অনেকের হিডেন ট্যালেন্টও বেরিয়ে আসছে লকডাউনের গুঁতোয়। সালভাদোর যে এত সুন্দর ব্যাঞ্জো বাজায় তা কে জানত! গ্র্যান্ডমা লেনা নাতনির সাহায্যে ফাইনালি তাঁর স্বর্গীয় অ্যাপেল পাই আর পাম্পকিন স্যুপের সিক্রেট রেসিপি ফেসবুকে আপডেট করতেই সবাই হুররে বলে লাফিয়ে উঠলাম। অমন পাম্পকিন স্যুপ খাওয়ার পর মরে গেলেও দুঃখ নেই। পাশের বাড়ির থমাস লজ্জা লজ্জা মুখে জানাল যে তার প্রেমিকা ন্যাটালী ফাইনালি তাকে বিয়ের জন্য “হ্যাঁ” বলেছে। স্কাইপেই প্রপোজ করেছিল সে। শুভেচ্ছার বন্যা বয়ে গেল অমনি চারদিকে। ব্যস লকডাউনটা উঠলেই ওরা বিয়ের ডেট ঠিক করবে। মিস্টার টেয়লর বলতে যাচ্ছিলেন, “গেল হে তোমার সুখের দিন।“ জাঁদরেল মিসেস টেয়লরের ধমক খেয়ে তিনি চুপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন।

দুদিন অন্তর বিকেলের দিকে পার্কে হাঁটতে যাই। ওইটুকু না করে উপায় নেই। বেসমেন্টে ফ্ল্যাট না হলে ধুপধাপ লাফালাফির শব্দে নীচের ফ্লোরের লোকজন কমপ্লেন করবেন। সবদিক ভেবেচিন্তে চলতে হয়। গতকাল যাওয়ার পথে জুয়িশ স্কুলের প্রিন্সিপাল মিস্টার বেলসনের সঙ্গে দেখা হল। উনি তখন বাগানের গোলাপ গাছে জল দিচ্ছিলেন। পরনে খাকি শর্টস আর একখানা হাফহাতা টিশার্ট। আমাদের দেখে টুপি খুলে শুভসন্ধ্যা জানালেন। আমি প্রত্যুত্তর দেওয়া মাত্রই বললেন,

“অত মনমরা হয়ে গুড ইভনিং বলছ কেন? ট্রাই টু লুক অ্যাট দ্য ব্রাইট সাইড।“

আমি চোখদুটো সরু করে তাকালাম ওঁর দিকে,

“মহামারীর মধ্যে ব্রাইট সাইড!”

মিস্টার বেলসন ওঁর গোলাপ বাগানের দিকে দেখিয়ে বললেন,

“পাশেই স্কুল। খুদেরা যখন তখন রেলিং ডিঙিয়ে এপাশে এসে গোলাপ ফুল ছিঁড়ে নিয়ে যায়। সাধ করে সাদা গোলাপের বাগান বানালাম, অথচ ফুল ভালো করে ফোটার আগেই কেউ না কেউ এসে তুলে নিয়ে যেত। লকডাউনের ফলে গোলাপ তোলা বন্ধ। এখন দেখ দিকিনি আমার বাছাদের দিকে।“

দেখলাম সত্যিই। গোলাপ গাছে ফুলের হাসি যেন আর ধরে না। তারপর মিস্টার বেলসন বললেন,

“ বাগানের ভেতরে এস, একটা দারুণ জিনিস দেখাবো।“

সোশ্যাল ডিসট্যান্স মেইনটেইন করেই বাগানের ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালাম। উনি আঙুল দিয়ে বাঁদিকে দেখালেন,

“দেখ, কিন্তু কাছে যেও না।“

দেখি গোলাপ গাছের দুটি ডালের মধ্যে খরকুটো দিয়ে একটা খুদে সদ্যনির্মিত হনিইটার পাখির বাসা। সেখানে পক্ষী দম্পতি দুজনে কূজনে জমজমাটি প্রেম কচ্ছেন । আমরা হেসে বললাম,

“ ও বাবা, দারুণ তো। আপনার বাগানের নতুন অতিথি নাকি?”

উনি বললেন,

“ওদের নাম দিয়েছি উইলিয়াম আর মেরী। উইলিয়াম এই বাগানেরই বাসিন্দা। কিন্তু মেরী এসেছে কিছুদিন আগে। উইলিয়াম সেই যাবৎ তার মন জয় করার চেষ্টা চালাচ্ছিল। কিন্তু স্কুলের চেঁচামেচির জন্যই হোক বা গোলাপের অভাবে, উইলিয়ামের বাসাখানা মেরীর ঠিক পছন্দ হচ্ছিল না। সে বিয়েতে মোটেই সম্মতি দিচ্ছিল না। থ্যাঙ্কফুলি লকডাউনের জন্য স্কুল বন্ধ আর গোলাপ ছিঁড়ে নষ্টও করছে না আর কেউ। তাতেই দেখ ওদের প্রেম জমে কেমন ক্ষীর হয়ে উঠেছে।“

আমরা কথা বলতে বলতে দেখলাম, উইলিয়াম আর মেরী আমাদের পাত্তাও দিল না। তারা ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে প্রেমালাপে মগ্ন। মিস্টার বেলসনকে বললাম,

“বোধহয় আপনি ঠিকই বলেছেন।“

“বোধহয় মানে, আলবাৎ আমি ঠিক বলেছি। পৃথিবীটা শুধু আমাদের জন্যই নাকি? পশু-পাখি,গাছপালা, কীটপতঙ্গেরা তাহলে কোথায় যাবে? মে বি ওরাই কমপ্লেন করেছে আমাদের নামে। দেখ তো ওদের দিকে, কত সুখে ঘরকন্না করছে দুটিতে।“

হেসে বেরিয়ে এলাম বাগান থেকে। চারপাশে এত মৃত্যুর খবরের মধ্যে কোথাও তো একচিলতে আনন্দ পাওয়া গেল। হলই বা সে ছোট্ট খড়কুটোর বাসায়। না হয় তাদের কিচিরমিচির ভাষা বুঝি না আমরা। তাতে কী! দুটিতে ভাব হয়েছে দিব্যি। উইলিয়াম আর মেরীর উদ্দেশ্যে হাওয়ার একটা ফ্লাইং কিস পাঠিয়ে দিলাম আমি। আশা করছি মাসখানেকের মধ্যেই অ্যালমা পাড়ার আমরা সবাই আঙ্কেল-আন্টি হয়ে যাব…

 

 

একটি মাঠের কাহিনি

বেবী সাউ


আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরে একটা কবরখানা আছে। জায়গাটা গাছে ঢাকা। সন্ধে হতে না হতেই ওই এলাকা জনশূন্য হয়ে যায়। কবরখানা আর আমাদের বাড়ির মধ্যে রয়েছে একটা বড় মাঠ।মাঠের পিছনেই ক্ষেত। আর বাড়ির সামনে দিয়ে একটা রাস্তা। বাড়ি থেকে বাঁদিকে এগিয়ে গেলেই জঙ্গল। অল্প দূর দিয়ে চলে গেছে একটা পুরনো মিটার গেজ লাইন। শ্যাওলা পড়ে গেছে কত বছরের তা ঠাহর করা যায় না। আমাদের বাড়ির একটা লম্বা বারান্দা আছে, যেখানে বসে থাকলে মাঠ পেরিয়ে সেই কবরখানা দেখতে পাওয়া যায়। সেই কবরখানার একটা ভাঙা পাঁচিলের গর্ত দিয়ে দেখা যায় একটি শান্ত কবর।

ওই যে মাঠের কথা বললাম, সেই মাঠটা সারাবছর নীরব থাকে না। মাঠে হাট বসে। তখন চতুর্দিকে মানুষ, মানুষ। কবরখানা ঢেকে যায়। কবর ঢেকে যায়। মানুষের পায়ের শব্দ শোনা যায়। বিক্রিবাট্টার শব্দ শোনা যায়। দরদামের শব্দ শোনা যায়। জায়গাটা বেশ শব্দে ঘামে জলে দামে আর দীর্ঘনিঃশ্বাসে গমগম করে। রাত হতেই আবার সবাই একটু একটু করে ফিরে যায়। কিছু মাতাল পড়ে থাকে মাঠে। অনেক গভীর রাত পর্যন্ত চলে তাদের মাতলামী। তার পর সবাই শান্ত হয়ে কোথায় যে চলে যায়, কেউ খেয়াল রাখে না। আর সে সময় মাঠটা মনে হয় অনেকটা ছোট হয়ে গেছে। নীরবতা দূরত্ব কমিয়ে আনে। মনে হয়, জানলা খুললেই সেই কবরখানা। ওই যে দেওয়াল, আর এই যে আমার জানলা, আসলে দেওয়ালটাই আমার জানলা আর জানলাটাই সেই দেওয়াল।

শুনেছিলাম দেওয়ালে গর্ত থাকলে, সেই গর্ত দিয়ে মৃত্যু আসে। মানুষ বিড়বিড় করতে থাকে। মানুষ ভয় পায়। মানুষ অকারণ উচ্চস্বরে ঝগড়া করতে থাকে একে অপরের সঙ্গে। স্রেফ এই নীরবতাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এই নীরবতাকে এড়িয়ে তো যাওয়া যায় না। কখন ডে লা মেয়ারের ঘোড়া আসবে, আর তার পায়ের শব্দ শুনতে শুনতে আমার ভোর হবে, এই অপেক্ষায় কতদিন বসে থেকেছি আমি রাতে। কিন্তু এখন মাঠে আর গুনগুন শোনা যায় না। লোকমুখে শুনি, মাঠে নাকি মৃত্যু আসে। মৃত্যুভয়ে কেউ আর মাঠে যায় না। ক্ষেতে যায় না। রাস্তা দিয়ে কারো পদশব্দ শোনা যায় না।

ওহ নীরবতা! আমি তোমায় চেয়েছিলাম এ কথা সত্যি। কিন্তু এমন নৈঃশব্দ চাইনি। আমার যে লুকিয়ে থেকে মানুষের ঘামের গন্ধ টের পেতে ভাল লাগে। কান পেতে মানুষের কথা শুনতে ভাল লাগে। আর ভাল লাগে এক একটি মানুষকে দেখে তার জীবন সম্পর্কে ভেবে যেতে। কিন্তু এখন কারো মুখ দেখতে পাচ্ছি না। গান শুনতে পাচ্ছি না। কোনও মাতাল এসে গভীর রাত পর্যন্ত গান গাইছে না আমাদের কবরখানার পাশের মাঠে। মনে হচ্ছে কবরখানা অনেকটাই এগিয়ে এসেছে। দেওয়ালটাকে মনে হচ্ছে আমার জানলার প্রতিবেশী।

শব্দ না থাকলে নীরবতাকে বোঝা যায় না যেমন, তেমন নীরবতা না থাকলে শব্দকেও বোঝা যায় না। তাই্‌, এখন চারদিকে অদ্ভুত নৈঃশব্দ। কিন্তু নীরবতা নেই। কারণ শব্দ নেই। আর তার জন্য মনে হচ্ছে, নীরবতার কাছে আমরা এখন কোনও সুর, কোনও শব্দ, কোনও গান প্রত্যাশা করতে পারি না। যদি না আবার মানুষ গুনগুন করে ওঠে রিক্ত হয়ে যাওয়া মাঠে।

আমাদের বাড়ির পাশে একটি কবরখানা আছে। কিন্তু এখন আর কোনও মাঠ নেই। মাঠটি ঘন সবুজ। কিন্তু তা মাঠ নয়। কবরের উপরের জমি। তার উপর জমে আছে নৈঃশব্দ। দেওয়ালটা ভেঙে পড়ে গেছে। জানলা বন্ধ করে রেখেছি আমিও।

 

মফস্বল এবং তার বিলুপ্ত শামুকেরা

অলোকপর্ণা


রামতনুর ঠাকুমাকে মফস্বলী বিকেলবেলার পেটের মধ্যে দিব্বি মানিয়ে যেত। প্রতিদিনের নামতায় দেখতাম, বাঁশের যুবক লাঠি দাঁতে দাঁত চেপে প্রাণপন টেনে নিয়ে চলেছে ঠাকুমা আর তাঁর পিঠের কুঁজকে- নয়নদের বাড়ির দিকে, সেখানে একটু পরে মহাভারত পাঠ হবে। তারপর ঠাকুমা কুঁজ ভর্তি করে মহাভারতীয় গালগপ্প নিয়ে বাড়ি ফিরবে সন্ধ্যেবেলার আঁধারে। বুড়ির কুঁজের প্রতি মোহের শেষ ছিল না আমাদের। লাঠি, বুড়ি আর কুঁজ রাস্তায় নামলেই আশেপাশের বাড়ি থেকে প্রত্যেকে লোভীর দৃষ্টিতে বুড়ির কুঁজের দিকে চেয়ে থাকত। অথচ এছাড়া আর কোনো প্রসঙ্গে বুড়ির কথা কেউ বলত না কোনোদিন। মফস্বলে কুঁজ মানেই রামতনুর ঠাকুমা। আর বুড়ি মানেই তার কুঁজ। বুড়িকে দেখে দেখে মফস্বলী ধারণা হয়েছিল, খুব বেশি বেঁচে ফেললে কানফিসফিস খেলা মানুষ গুঁটিয়ে শামুক হয়ে যেতে থাকে। রামতনুদের বাড়ি গেলে বুড়ির কথা জিজ্ঞেস করলে ও আঙুল তুলে বাড়ির সাথে আলগা হয়ে লেগে থাকা বেড়ার ঘরের দিকে ঈশারা করত। রামতনু কানফিসফিস খেলায় আমাদের বলে পাঠাত, “ঠাকমা বেবাক শামুক হয়ে যাচ্ছে বুঝলি। কাল রাতে বৃষ্টির পর দেখি…” রামতনু চুপ হয়ে যেত দুম করে। কথা বলতে বলতে চুপ হয়ে যাওয়া যাদের স্বভাব, তাদের প্রতি মানুষের স্নেহ থাকে। সেবার বর্ষাকালে প্রথম লক্ষ্য করেছিলাম, প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা শ্যাওলা ধরা পাঁচিলের আকাশে শামুকদিদি হয়ে লেগে লেগে আছে। জীবনের সাথে জুড়ে থাকার এতই লোভ তাদের যে দেখে রাগ হল। ঝাঁটার কাঠি নিয়ে এসে খচ খচ করে শামুকদের মাংস খুঁচিয়ে দিতেই অনেকে তারাখসার মত পাঁচিলের আকাশ থেকে নিচের ঝোপে ঝুপ ঝুপ করে পড়ল ঝরে। বাকিরা নরম মাংস আগলে আত্মগোপন করল খোলসের অন্তরালে। মফস্বলী কান ফিসফিস খেলায় কিছু কথা আরও চালু ছিল, যেমন, খুব বেশি বেঁচে ফেললে একা মানুষ বোবা। খুব বেশি বেঁচে ফেললে একা মানুষ অন্ধ। খুব বেশি বেঁচে ফেললে একা মানুষ বধির। খুব বেশি বেঁচে ফেলা মানুষ তাই এসব হওয়ার আগেই একদলা মাংসের মত নিজের শরীরের ভিতরে লুকিয়ে পড়ে। শরীর যেন আসল মানুষ নয়, চিঠির খামমাত্র। চিঠিটা ভিতরে ভাঁজ করে কোথাও একটা ঢুকিয়ে রাখা আছে। রামতনুর ঠাকুমাও একা বোকা বোবা হয়ে কুঁজের মধ্যে গিয়ে আত্মগোপন করতে শুরু করেছিলেন।

এরপর একদিন রামতনু স্মৃতির ছেঁড়া পকেট দিয়ে এক টাকার কয়েনের মত গলে গেল। বুড়িও পুরোপুরি শামুক। রামতনুকে ফের কুড়িয়ে পেলাম যখন, ততদিনে রোদ তার মাথা খেয়ে ফেলেছে। পৃথিবী ধ্বংস হতেও আর মাত্র পাঁচ মাস বাকি, ২০১২ -র জুলাই। রামতনু তখন এক রোদ লাগা বাদামী মানুষ। আমায় দেখতে পেয়ে ভরা বাজারের মধ্যে কানফিসফিসিয়ে বলল, “টিয়াটি গাছের সাথে নিবিড়, তাই সে গাছের রঙ পায়। তোর গায়ে আমি তো কোনো রঙ দেখিনা বুবুন…”

 

পৃথিবী ধ্বংস হতে যখন সত্যি সত্যি এক মাস বাকি আর, ২০১২ সালের নভেম্বরে খবর পেলাম কুঁজি বুড়ি মরতে বসেছে। রামতনুদের উঠোন উপচে ভিড় জমেছে শেষবারের মত বুড়ির কুঁজের মহিমা দেখার বাসনায়। নয়নের মা মাসিরাও এসেছে গীতা পাঠের অছিলাতে। উঠোনে নামিয়ে রাখা হয়েছে বুড়ির শেষ সম্বল যাকিছু সব, বুড়ির ব্যক্তিগত সামগ্রী,- সমস্তই তার শ্মশানবন্ধু। পৃথিবীর সমস্ত অপ্রয়োজনীয় জিনিস মানুষ বাল্য আর বৃদ্ধাবস্থায় আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। দেখলাম রাজশেখরবসুর মহাভারত তখন গড়াগড়ি খাচ্ছে ধুলোর রোদে। বইটা কুড়িয়ে নিতে যাবো, তখনই কোত্থেকে এসে রামতনু বুড়ির কুঁজের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে কানফিসফিস খেলতে লাগলো। টের পেলাম উঠোনের উত্তাপ বেড়ে যাচ্ছে। আশেপাশের জটলামোদী মানুষেরা ভীনগ্রহী অপহরণের মত উবে গেল পৃথিবীর বুক থেকে। জরাজীর্ণ মহাভারত আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে দেখলাম বুড়ির কুঁজ মুরগির ডিমের অসহায়তায় ফেটে ফেটে যাচ্ছে। একটু পরে কুঁজের ভিতর হতে বেরিয়ে এলো একটা শামুক। কানফিসফিসিয়ে বলল, “মাঝে মাঝে চোখ বুজে ভেবো হাওয়ায় ভাসছ। পাখির মত নয়, পালকের মত নয়, কাগজ পোড়ানো ছাইয়ের মত, বাতাসে উড়ে যাচ্ছ, এদিকে ওদিকে। চারদিক ছেয়ে ফেলছ। বরফকুচির মত নয়, সুগন্ধীর মত নয়। অন্ধকারের মত।”

বলেই পিছলে পিছলে চলে গেল শ্যাওলা ধরা পাঁচিলের দিকে।

এর ঠিক এক মাসের মধ্যে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেল। যারা বেঁচে থাকল, তারা প্রেতমাত্র। মাটিতে তাদের এখন আর কোনো ছায়া পড়ে না। তাদের পদযুগল হাঁটুর নিচ থেকে উলটো করে লাগান। যার ফলে তারা কেউই কোনোদিন পা ভাঁজ করে গুঁটিয়ে শামুক হয়ে যেতে পারবে না। মানুষ আর তেমন করে শামুক হওয়ার মত নিবিড় বাঁচবে না কোনোদিন।

এখন মাঝে মাঝে যখন চোখ বুজি, দেখি, গরম বালির মধ্যে আমার হাঁটুর নিচ থেকে উলটো করে লাগানো পায়ের পাতা ডুবে যাচ্ছে। কোথাও কোনো হাওয়া নেই। ডানা নেই। ডানার কান্নাও নেই কোনো।

বিৎ

সাদিক হোসেন


কিছু বই না চাইতেই হাতে চলে আসে। আর অনায়াসে জীবন পাল্টিয়ে দেয়। লুডমিলা পেত্রোশেভস্কায়ার গল্পের বইটিও তেমনি। পড়বার আগে অব্দি লেখিকার নাম জানতাম না। পড়বার পর আমার জীবন খানিক পাল্টে গেল।

জীবন যে পাল্টাচ্ছে, তা পাল্টানোর আগে অব্দি বোঝা যায় না। বোঝা যায়, পাল্টে যাবার অনেক পর। আমার ক্ষেত্রেও তেমনি ঘটেছিল। এলা চলে যাবার পর দেখি বইটা বিছানায় পড়ে রয়েছে। আমাদের দু-জনার ওলোটপালোট বিছানায় সেটি শ্রমজাত কিতাব বিশেষ। ভুল করে ফেলে যাওয়া সামগ্রী নয়। অতএব, সেটির পাঠ ছিল অনিবার্য।

লুডমিলার জন্ম ১৯৩৮ সালে(হায়!)। মস্কো শহরে(ইস!)। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। মস্কো শহরও নিরাপদ নয়। ফলে তাকে সঙ্গে করে তার মা চলে আসে কিউবেশেভ শহরে। সেখানে লুডমিলার দিদিমা রয়েছেন। কথা ছিল, যুদ্ধ শেষ না হওয়া অব্দি তারা সেখানেই থেকে যাবে।

কিন্তু বিধাতা(তৎকালীন সোভিয়েতের কথা মাথায় রেখে শব্দটি ব্যবহার করলাম) যার ললাটে অক্ষর প্রতিমা নির্মানের প্রস্তুতি নিয়েছে, তার শৈশব যে পলায়নের শাকান্নে নরম ও অনায়াস হতে পারে তা তো সম্ভব নয়। তাদের সম্মুখে আচমকা বাঁক নয়, কুয়ো থাকে প্রতিপদে। গভীর কালো কূপ। তবে পতনের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। শব্দটি ক্ষণিক। মানবের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। কল্পনা করুন একটি ঢিলের। নিদেনপক্ষে একটি প্রস্তর খন্ডের। এবার মনে করুন সেটাকে কেউ একজন ছুঁড়ে ফেলল। ঐ তো সেটা পড়ে যাচ্ছে, নেমে যাচ্ছে, ধাক্কা খেতে খেতে এগোচ্ছে সরু ও লম্বা কুয়োটার ভেতর। আপনি কি একটি ঢিলের শব্দ পেলেন? অহেতুক ও তুচ্ছ শব্দটি আপনার কান অব্দি কি পৌঁছাল? যদি পৌঁছতে পারে, তবে ভেবে নিন, লুডমিলার পতনও ছিল তেমনি – তুচ্ছ ও মানবিক ভারশূন্য।

মা কথা রাখেনি। উন্মাদগস্ত দাদু ও বৃদ্ধা দিদিমার কাছে তাকে ফেলে রেখে পুনরায় মস্কোতে চলে গিয়েছিল।

এক কামরার ছোট্ট ঘর। তাতে একটা বড়সড় টেবিল। টেবিলটি যে কী কারণে সেখানে ছিল তা কেউ বলতে পারবে না। অবশ্য টেবিলটি ছিল বলেই লুডমিলা জিন্দা থাকতে পেরেছিল।

এবার আমরা টেবিলেরে পায়াটার দিকে তাকাই – টেবিলের কোণায় ঝুল জমে আছে, মাকড়সার জালে মাকড়সা নেই; কিন্তু জালের ভেতর থেকে দেখা যায় তার অবসাদ। তাও শৈশবের!

হ্যাঁ, টেবিলের নিচেই বেড়ে উঠছিল লুডমিলা। কারণ টেবিলের বাইরে ছিল দিদিমা।

মা যখন আবার ফিরে এল, তখন লুডমিলা আক্ষরিক অর্থেই ভিখিরি। রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে বেড়াত।

পরবর্তীকালে দিদিমার বাড়িটিও বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। দুই বুড়ো বাপ-মা আর মেয়েকে নিয়ে মা উঠে আসে আরও ছোটো একখানা ঘরে। সেখানেও টেবিল। হ্যাঁ, আর একটি টেবিলের নিচে মা ও মেয়ে বাঁচতে শিখছিল পরস্পরের প্রতি তীব্র ঘেন্না নিয়ে।

রুশ ভাষায় একটি শব্দ রয়েছে – বিৎ(byt)। যা প্রধাণত দৈনন্দিন কাজকর্ম বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। অবশ্য লুডমিলার প্রেমের গল্পগুলিতে বিৎ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে একটি রাজনৈতিক কর্ম হিসেবে। লুডমিলা এই শব্দটির ভেতর ঢুকিয়ে দেয় অপেক্ষা, ঝগড়া, রাগ, ক্ষয়… এবং থাকবার অনুপযুক্ত ঘরের বিবরণ।

রুশ বিপ্লবের পরে দেখা গেছিল হাজার হাজার ভূমিহীন কৃষক মস্কো শহরে চলে আসছে জীবিকার সন্ধানে। কিন্তু তাদের থাকবার জায়গা নেই। রাষ্ট্র তখন জমির উপর ব্যক্তি মালিকানার আইন খারিজ করল। শহরের সমস্ত ঘরবাড়ি হয়ে গেল রাষ্ট্রের সম্পত্তি। রাষ্ট্র ঐ সম্পত্তির একটা বড় অংশ ব্যবহার করল যাতে শহরে চলে আসা কৃষকরা সেখানে বসবাস করতে পারে।

বেঁচে থাকা আর বসবাসের মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য। একটা ঘরকে চারভাগে ভাগ করা হয়েছিল। মোটামুটি একখানা সুটকেস আর দুজন মাথা গুঁজতে পারে – এমন একটি চারকোণা জ্যামিতিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল ঘর হিসেবে।

লুডমিলার গল্পে বিৎ – সেই ক্ষদ্র পরিসরকেও নির্দেশ করে। এই পরিসরে ঘটে চলা প্রেম, ঘেন্না, চেঁচামিচি, বমি…

লুডমিলা সোভিয়েত মডেলটির সমালোচনা করে এই শব্দটির প্রয়োগে। সে সচেতনভাবে ফ্যাক্টরি, চিমনি, ওপার অব্দি দেখা যায় না এমন গমের ক্ষেত, ইস্পাতের চকচক – এসবের বিবরণ ত্যাগ করে বসবাসের অযোগ্য ছোটো ছোটো ঘরের প্রতিটি কোণার বিবরণ দিতে থাকে – সেখানে মানুষেরা নীচ, অবিশ্বাসী, সেখানে মানুষেরা অর্থহীন ও ক্ষুদ্রতার প্রতীক; জীবনে যা কিছু মহৎ তার প্রতিই তাদের তীব্র অনীহা – সেখানে আছে শুধু সরু ও লম্বাটে কুয়োতে পতনের শব্দ। যেন আগাছা। কিংবা উলুখাগড়ার সংসারে বুড়ো থুত্থুড়ে পেঁচাও আর হাদিস শোনাতে আসে না! বিৎ, এখানে, ক্ষুদ্রের পক্ষে বৃহৎ রাজনীতি।

তবু, এতসবের মধ্যেও, একটি আধারের উপর সে যেন খানিক ভরসা রাখতে পেরেছিল। সেই আধারটি হল মাতৃত্ববোধ।

একটি গল্পের উদাহরণ দেওয়া যাক –

মেয়েটির নাম আলিবাবা। বয়েস তিরিশের কোটায়। ধর্মে ইহুদী। এখন শহরের একটি সস্তা বারে সে ভিক্টরের সঙ্গে বসে গল্প জুড়েছে। আসুন, তাদের খানিক গল্পগুজব করতে দিই, আর এই সুযোগে তাদের সম্পর্কে আমরা কিছু খোঁজখবর নিয়ে রাখি।

কদিন আগেই আলিবাবা তার প্রমিকের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলেছে। সম্পর্ক চোকানোটা অবশ্য এমনি এমনি হয়নি। হাতাহাতি তো বটেই, এমনকি সেদিন সে খুনও হয়ে যেতে পারত। যদিও তাদের মধ্যে এমন ঝগড়া প্রায়ই ঘটত। সেদিন হল কী, তার পুরুষ বন্ধুটি মদের বোতলগুলি খুঁজে না পেয়ে আলিবাবাকে সন্দেহ করল। সন্দেহ হয়ত আলিবাবা বোতলগুলি চুরি করে বাজারে বেচে দিয়েছে। ব্যাস, এই নিয়েই শুরু। চড়চাপাটির পর একসময় পুরুষ বন্ধুটি তাকে ব্যাল্কনি থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। চারতলা থেকে পড়ে গেলে কে আর বাঁচে। আলিবাবা বেঁচে গেল – পড়তে পড়তে সে ব্যাল্কনির একখানা রড কোনোমতে ধরে ফেলতে সক্ষম হয়। এবং রড ধরে ঝুলতে থাকে। শেষপর্যন্ত লরির ড্রাইভাররা তাকে নামায়। নামানো গেলেও সে বেশ চোট পেয়েছিল তাতে। আর পুরুষ বন্ধুটির কাছে ফিরে যাবার সাহস পায়নি। চলে আসে মায়ের কাছে। মা আবার অসুস্থ। মাঝে মাঝেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। আর সেই সুযোগে আলিবাবা হাতের কাছে যা কিছু পায় তা বিক্রি করে মোচ্ছব করতে বেরোয়। আজ যেমন বিখ্যাত রুশ কবি অ্যালেকজান্ডার ব্লকের কবিতার বইটি ভালো দামে বেচতে পেরেছে।

অন্যদিকে ভিক্টর কোনো অফিসের বেয়ারা। মাঝে মাঝে দুপুরে অফিস কেটে বারে ঢুকে বিয়ার গেলে। তার গায়ে প্যাচপ্যাচে গন্ধ সবসময় – এই গন্ধ সুন্দরী মেয়েরা যে পছন্দ করেনা তা সে অভিজ্ঞতা থেকে জানে। আলিবাবা সুন্দরী নয়। তার উপর ভাঙা কোমর নিয়ে তার নাচটি ছিল কুৎসিত। ফলে ভিক্টেরের মনে খানিক আশা জন্মেছিল। তাকালে এমন মেয়েই তো তার দিকে তাকাতে পারে!

তার আশাটি ভ্রান্ত নয়। আলিবাবা ইশারা দিয়ে তার পাশে এসেই বসল।

দু-চারটে কথা বলার পর এখন তারা একসঙ্গে মদ খাচ্ছে।

আলিবাবা নাছোড়। ছয় পেগের পরেও তার পিপাসা মেটেনি। এদিকে ভিক্টরের জেব ফাঁকা হয়ে গেছে। তার থলথলে শরীর ম্রিয়মাণ। কিন্তু ভিক্টরের এই চেহারা দেখে আলিবাবার মনে পড়ল বেড়াল ছানার কথা। হ্যাঁ, বেড়ালের বাচ্চাই তো – আলিবাবা অবাক হয়ে ভাবে – পুতুপুতু মানুষটা এবার কি মিআআও করে ডেকে উঠবে? মিআআও করলে তার কি ভালো লাগবে?

সে ভক্টরের ভয় দূর করে দেয়। ব্লকের বই বিক্রির টাকাটা দিয়ে আরও দু-পেগের অর্ডার করে।

পানশালা তখন মৌচাক। যাকে পাবি তাকে ছোঁ অবস্থা। ভিক্টর প্রথমে রাজি ছিল না। আলিবাবাই তাকে রাজি করাল।

সাবধানে তালা খুলল ভিক্টর। বেশ সন্তর্পণে আলিবাবাকে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল।

ঘরটি ছোটো। অগোছালো। কেমন এক পচা গন্ধ রয়েছে। তবে অত নেশায় আর গন্ধটিকে তেমন পাত্তা দিল না সে।

ভিক্টরকে টেনে বিছানায় নিয়ে গেল। যৌনতা করল।

এখন তারা পাশাপাশি শুয়ে। তৃপ্তিতে ভিক্টর চোখ বুজে আছে। আলিবাবার খুব সখ হল একখানা প্রেমের কবিতা আওড়াবার। সে বেশ জোরে জোরে ব্লকের কবিতা পড়ছিল। তারপর হঠাৎ-ই শুনতে পেল ভিক্টর নাক ডেকে ঘুমচ্ছে।

আর কী করা যায়। খানিক পর আলিবাবাও ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙল ভিজে যাবার অনুভূতিতে।

ভিক্টর ঘুমের ঘোরে বিছানায় হিসু করে ফেলেছে।

আলিবাবা উঠে পড়ল। সে বুঝতে পারল ঘরের পচা গন্ধটা আসলে কীসের। ভিক্টর রোজ রাতে তবে এভাবেই বিছানা ভেজায়।

সে বাথরুমে গিয়ে পরিষ্কার হল। তারপর চেয়ার টেনে বসতে বসতে তার দু-চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে শুরু করল।

কতদিন পর এখন সে কাঁদতে পারছে। এই কান্নায় বিয়োগ চিহ্ন নেই। মায়া আছে। স্নেহ আছে।

সে বিছানায় শোয়া মানুষটির দিকে আবার তাকাল। ভিক্টর তখনো গভীর ঘুমে। সারা ঘর জুড়ে তার নাক ডাকার শব্দ।

তবু কান্না থামছে না আলিবাবার। সে বুঝি জীবনে এই প্রথমবার কোনো মানুষের প্রতি ভালোবাসায় আহ্লাদিত হতে পারছে।

 

 

গল্পটি শেষ করে আমি আমার ঘরটার দিকে তাকাচ্ছিলাম। ঘরটায় প্যাচপ্যাচে গন্ধ নেই। এলার গন্ধ রয়েছে। কিংবা সেই গন্ধের প্রতিও আমার আর কোনো আকর্ষন ছিল না। আমি খুঁজছিলাম আমার নিজস্ব বিৎ-কে। সেই পরিসরকে, সেই পরিসরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলিকে – ক্ষুদ্রতাকে – কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

এলা ফোন করে বলেছিল, ধুলাগড় যাবি?

– ধুলাগড়? কেন?

– কেন আবার। আমি বলছি তাই যাবি।

কী মুশকিল। আমি বেশ টেনশনে পড়ে গিয়েছিলাম। ধুলাগড়ে কয়েকমাস আগে একটা দাঙ্গা বেঁধেছিল। ভাবলাম আবার হয়ত সেইরকম কিছু ঘটেছে। কিন্তু দাঙ্গা বাঁধলে আমরা ওখানে গিয়েই বা কী করব?

এলা জানাল, দাঙ্গা না। একটা সভায় বক্তৃতা রাখতে যাচ্ছি। আমার সঙ্গে চল।

সভাটা এরেঞ্জ করেছিল আশাকর্মীদের সংঘটন। সেখানে যাওয়াটা বেশ মজার হল। ধর্মতলা থেকে বাসে ওঠবার কথা, কিন্তু বাসে ওঠবার আগে মানিব্যাগ খোয়া গেল। অতঃপর এলা ছাড়া আমার আর গতি ছিল না। এতে এলা খুশি। বলল, পরগাছা হয়ে বেঁচে থাকাটা কী আজকে বুঝবি।

বুঝলাম পরগাছা ব্যাপারটা খারাপ কিছু নয় যদি গাছটা এলা হয়ে থাকে। যাহোক, এলার বক্তৃতাটা ছিল লাল, শেষ করল যখন, তখন বিকেল, আকাশটাও লাল।

এলা বলল, একটু ঘোরাঘুরি করে যাবি?

– এখানে?

– ধুর পাগলা। এখানে না। গঙ্গা পেরোলেই মেটিয়াবুরুজ।

– তুই বাড়ি ফিরবি না?

এলা সত্যিই বাড়ি ফেরেনি। চলে এসেছিল আমাদের বাড়ি।

 

বাড়ির আর বর্ণনা করব কেন? আমি শুনতে পাচ্ছিলাম জলের শব্দ। এলা তখন বাথরুমে। স্নান করছে। দরজা বন্ধ। বাইরে কুকুরের ডাক। জলের শব্দ। জল। রান্নাঘর। আমাদের ব্যাল্কনি নেই!

বিছানার চাদর টানটান করে পেতেছিলাম। জানলার পাল্লা দুটো বন্ধ। ফ্যান চলছে। হাওয়ায় কিছু পৃষ্ঠা উড়ে গেল। কলমগুলো কলমদানিতে রেখে দিলাম। দেয়ালঘড়ি ১০ মিনিট এগিয়ে সময় দেখায়। ফোনের চার্জারটি প্লাগে গোঁজা। সুইচ অন করা থাকে প্রায় সবসময়। বুকশেলফের একটা কাচ ভেঙেছে কদিন আগে। ছোটোবেলার একটা ছবি টাঙানো – ফটোফ্রেমের পেছন থেকে টিকটিকি উঁকি দিল। ফোন বাজল এলার। ও ধরল না। আমি চা বানিয়ে কাপ দুটো টেবিলে রেখে দিয়েছিলাম।

শুরু করতে প্রায় রাত দুটো বেজে গেছিল। তার আগে আমরা বইপত্তর, দিল্লি, শাহবাগ, পার্কসার্কাস, ধর্ণা, হিজাব… এইসব নিয়ে কথা বলছিলাম। কুকুর ডেকেছিল আর একবার। তারপর এলা হাই তুলল। সে মাথার বালিশ কোলে চেপে খানিক ঝিমোল।

আমার ঘুম আসছিল না। এলা পোষাক আলগা করছিল। লাইট নিভিয়ে দেওয়া হল। ওর আদল স্পষ্ট। যদিও গমের মত ওর রঙ নয়। স্তন ঝুলে গেছে। বোঁটাটা বেশ কালো।

ভোরে একবার ঘুম ভেঙে ছিল কি? আমি মনে করতে পারছি না। এখন বইটা হাতে নিলে কুকুরের ডেকে ওঠা, টিকটিকির উঁকি মারা, ঘড়ির ১০ মিনিট…এইসব মনে আসে।

মেঝেটা পুরনো। তবে মোজাইক। খাটের নিচ থেকে পুরনো পারফিউমের শিশি পাওয়া গেল। নখ বড় হয়েছে। এলা বলছিল। নেলকাটার খুঁজে পেলাম না।

মোটর চালাতে ভুলে গেছিলাম। বাথরুমে জল নেই। দুপুরের জন্য রান্না করতে হবে। রাস্তা দিয়ে সাইকেল যাচ্ছিল। কারিয়ারে বউ। ওরা কতদূর যাবে?

আমাদের পরিসর কতটুকু? বৃত্তের ব্যাস কোথায় কোথায় ছুঁয়ে আছে? কানের নিচে একখানা ফুসকুড়ি হয়েছে। জানলার পাল্লা দুটো খুলে দিলাম।

স্নান করা হয়নি। খাবো কিনা ভাবছিলাম। ফোন এল। কথা হল। কাজের কথা না। বানান ভুল নিয়ে তর্ক খানিক। বুধবারে পরিতোষের বাড়ি যেতে হবে।

আর পড়তে ভালো লাগছিল না। সিঁড়ির নিচ থেকে খুটখাট শব্দ আসছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম ইঁদুর। ইঁদুর নয়। মনে হল মানুষ। চোর? এলা যাবার পর কি দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছি?

শব্দটা বাড়ছিল। জিনিসপত্র সরানোর শব্দ। একবার চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম – কে? শব্দটা থেমে গেছিল। দু মিনিট। তারপর আবার শুরু হল। কে?

আমিও নিচে নামছিলাম। ফিসফাস আওয়াজ শুনলাম। কে? চুপ। আবার ফিসফাস। আমি নামছিলাম। ভয় করছিল। হাতে একটা ডান্ডা থাকলে বেশ হত। কে? কে ওখানে?

ওরা হেসে উঠল। তাচ্ছিল্যের হাসি। চোর হলে তো হাসবে না। তবে ওরা চোর নয়। অন্য কেউ। কিন্তু কারা? আমি আর এগোতে সাহস পেলাম না।

এবার পায়ের শব্দ। বুঝি ওরাই উপরে উঠে আসছে। এখন কী করব আমি? ঘরে গিয়ে সোজা দরজাটা বন্ধ করে দেব?

আমার পা পাথরের মত ভারী হয়ে গেছিল।

কে?

কে ওখানে?

 

নিরাশ্রয়-নামচা

সুদেষ্ণা মজুমদার


(সেইসব মানুষগুলো, যারা শুধু নিজের ঘরে ফিরতে চেয়েছিল, তাদের পাশে শারীরিকভাবে কোনোদিন থাকতে পারিনি, পারবও না। তাদের কারোর হাত ধরে বলতে পারিনি, পারবও না, এসো আমার সঙ্গে, তোমাকে তোমার ঘরে পৌঁছে দিই। এ লজ্জা আমার। আমাকে ক্ষমা করো।)

 

১০/০৪/২০২০

শুক্রবার

 

বিকেল সাড়ে চারটে। বিটি রোড দিয়ে আফতাবের অটোটা যখন এগোচ্ছিল, আমার একটু একটু ভয় যে করছিল না, তেমনটা নয়। আমি এই আফতাবকে চিনি না, আগে কখনো দেখিনি, কোনোদিন যে দেখা হবে এমনটা কস্মিনকালেও ভাবিনি। কিন্তু এটাও বুঝতে পারছিলাম খড়িবাড়ির অটো বিটি রোডের ধুলো চেনে না, মানুষ চেনে না, পুলিশ চেনে না, এমনকী হাওয়াটা পর্যন্ত তার অচেনা। সুতরাং ভয়টা আফতাবই বেশি পাচ্ছিল। ওর মুখে বাঁধা ঠুলি ঠেলে সেই ভয় বেরিয়ে আসতে চাচ্ছিল। আমি অভয় দিতে দিতে দেখছিলাম আগরপাড়া, কামারহাটি, রথতলা, ডানলপের ভিড়গুলো সব হাওয়া হয়ে গেছে। গত মাসের ২০ তারিখ রাতে এই একই রাস্তা দিয়ে যখন পেছনের দিকে গিয়েছিলাম, জমজমাট ভিড়, মনে ফুর্তি। অনেকদিন পরে সবার সঙ্গে দেখা হবে, আড্ডা হবে। সবাইকে দেখেছি, দেখা কিন্তু কারো সঙ্গে হয়নি। অন্তরাল থেকে বেশ কয়েক জোড়া চোখ আমাকে জরিপ করে গেছে। আর যাদের বাড়ি আমি গিয়েছিলাম দুদিন থাকব বলে, তারা যেন চুরির দায়ে ধরা পড়েছে। তারাও বিচ্ছিন্ন। তটস্থ। আর কোনো অপরাধ না করেও অপরাধ বোধে ভুগছিলাম আমি।

২২ দিন কেটে যাবার পর আবার পথে নেমেছি। চেনা পথটা একই আছে। বাঁকে কোনো বদল হয়নি। মানুষের যে দু-চারটে চেহারা দেখতে পাচ্ছি তাতে শুধুই ভয়। ধরা পড়ে যাবার ভয়। মার খাবার ভয়। মাথার ওপর তুলে ধরা পুলিশের লাঠি দেখতে পেলাম।

গত দুদিন ধরে সেইসব বন্ধু, যাদের হাতে একটু ক্ষমতা আছে, যারা সময়-অসময়ে যে-কোনো সমস্যায় মানুষের সঙ্গে আছে বলে দাবি করে, তাদের ফোন করে অনুরোধ করেছি একটা কোনো ব্যবস্থা করতে। শেষে হঠাৎ-ই এক বন্ধুর বদান্যতায় বাড়ি ফিরতে পারছি। হাতে কোনো ছাড়পত্র নেই। মোবাইলে শুধুমাত্র একটা ফোন নাম্বার আছে। যদি রাস্তায় পুলিশ বা থানা ধরে… একটা সংশয়, বাড়ি ফেরার জন্য একটা ফোন নাম্বার যথেষ্ট তো?

গতকাল যখন আমি মরিয়া হয়ে একে-তাকে ফোন করছিলাম, যদি কেউ সাহায্য করতে পারে এই ভেবে, তখন সবাই বলেছিল, ভোর-ভোর, অন্ধকার থাকতে থাকতে বেরোতে পারবে যদি গাড়ি নিয়ে যাই? বলেছিলাম, পারব।

কেউ পারেনি। এমনকী, কথা দিয়েও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। মানুষের চেহারার দ্রুত পরিবর্তন আমাকে অনেক কিছু শেখাল। কী অদ্ভুত ভয়। রোগটাকে নয়, পুলিশকে। আর সেই সাহায্যই এমন একজনের কাছ থেকে এল, অযাচিতভাবে, আমি থম মেরে গেছিলাম। এমনটাও হয়!

আমি আমার নিজের বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলাম।

 

০২/০৪/২০২০

বৃহস্পতিবার

 

ভয়– একটা আজন্মলালিত শব্দ। যখন আমি একদম শিশু, দন্তহীন মাড়ি বের করে খক্‌খক্‌ বা ঠক্‌ঠক্‌ করে হাসি, তখনই প্রথম ভয় পাওয়ায় সেই ব্যক্তি, যে আমাকে কোলে তুলে খেলাতে খেলাতে হঠাৎ ওপরে ছুড়ে দিয়ে আবার লুফে নেয়। আমি নামক সেই শিশুটার চোখে-মুখে যে আতঙ্ক ফুটে ওঠে, সেটার নামই ভয়। আর আমার এই ভয় পাওয়া দেখে, যে ছুড়েছিল বা আশেপাশে দাঁড়িয়ে-বসে যারা দেখছিল, তারা হা-হা, হো-হো করে হেসে উঠেছিল। তারা শিশুটিকে, মানে আমাকে বোঝাতে চেয়েছিল, এতে ভয় পাওয়ার কী আছে? হাসো সোনা হাসো! আমি যে বিন্দুমাত্র বুঝতে পারিনি সেটা বুঝে তারা যেন আরো আমোদ পেয়েছিল। ফলে, বারংবার, দিনের পর দিন এই লোফালুফির খেলা তারা চালিয়ে গিয়েছিল। তাদের এই ভয় পাওয়ানোর আনন্দ তাদের মধ্যে এমনভাবে চারিয়ে গিয়েছিল যে বাড়িতে কেউ বেড়াতে এলেও এই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটছিল। বড়োদের মধ্যে মনোরঞ্জনের সাধন হয়ে উঠছিল আমি নামক শিশুটির ভয়।

ভয় আমি পেতে না চাইলেও, অপরজন আমাকে ভয় দেখাবেই। এক ‘অজানা’ ভয়ের প্রতি মানুষের এক অদম্য আকর্ষণ। এবং ‘ভয়’ তৈরি করতে পারলে মানুষ খুব খুশি হয়। কারণ, তা একটা আশ্রয়ের কাজ করে। এবং ভাবে, আমি একা কেন ভয় পাব, আরো একজনকে, দুজনকে, বিশজনকে ভয়টা পাওয়াই না কেন! একটা সম্মিলিত ভয় অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও বেশ বিভোর করে রাখবে! কারণ, ভয়ের ভেতর আশ্রয় খোঁজার চেয়ে মধুর আর কিছু হয় না। ক্ষমতা যে ভোগ করে, ভয় দেখানোর আনন্দ, যা হিংস্রতাও বটে, সে ভোগ করে। আর যে ভয় পায়, তারও আনন্দ—ভয় পাওয়া ভালো, এই বোধে।

আমি আমার নিজের বাড়ি ফিরতে চাই।

 

২৫/০৩/২০২০

বুধবার

 

গতকাল রাত ১২টা থেকে লকডাউন। গোটা দেশে। পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে, লকআউট দেখে দেখে বড়ো হয়েছি। শৈশবে ব্ল্যাকআউট দেখেছি। ফ্যান দাও দেখেছি। র‍্যাশনের পূতিগন্ধময় চাল খেয়েছি। কিন্তু গোটা দেশ তালাবন্ধ হয়ে যাওয়া দেখিনি। সামনের রেল লাইন দিয়ে দিনে কয়েকশো ট্রেন যায়। সব বন্ধ হয়ে গেল হঠাৎ আসা নোটিসে। এবং আমি জানতে পারলাম আমি আর বাড়ি ফিরতে পারব না। জানি, যে ব্যাধিতে আমরা আক্রান্ত, তাতে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত নয়, অনন্তকালের জন্যও হয়তো আমাকে এই বাড়িতে কয়েকজন মানুষের সঙ্গে থাকতে হবে। একাকী। নিজের ঘরের চেনা আবহাওয়া ছেড়ে, নিজের আকাশ ছেড়ে, নিজের জানালা ছেড়ে বারোতলার ওপর ‘নিশ্চিন্ত’ হয়ে থাকতে হবে। এসেছিলাম দুদিনের জন্য। শুনতে হচ্ছে, তুমি তো ভালোই আছ! পঙ্গু মানুষ, ঘরে গেলে তো সব করতে হবে! তার চেয়ে এখানে ভালোই তো আছ। রিস্ক নেবে কে? পারবে তুমি হেঁটে হেঁটে ১২ কিলোমিটার যেতে? এখানে তো ১৪ তারিখ পর্যন্ত থাকতেই হবে!

না পারব না। ১২ কিলোমিটার হেঁটে যেতে পারব না। আমাকে সবাই ভয় দেখাচ্ছে। আমি শুধু নিজের ঘরে ফিরতে চাই। ভাঙা হোক, ছেঁড়া হোক, সে আমার নিজের ঘর। সেখানকার দেওয়ালগুলো আমাকে চেনে, আমিও তাদের চিনি। আশি বছরের কড়ি-বরগাগুলো আমাকে চেনে। ওরাই এই পঙ্গু মানুষের আকাশ হয়ে ওঠে যখন জানালায় গিয়ে দাঁড়াবার ক্ষমতাটুকুও থাকে না।

এখানে সামনে তাকালেই দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ দেখা যায়। অনেক দূরে আবছা কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে। আরও দূরে দিনের বেলাতেও কুয়াশার আস্তরণ। ডানদিকে তাকালে এয়ারপোর্টের অবয়ব। রাতে সেখানে টুপটাপ বাতি জ্বলে। এসি মেশিনের ওপরে পায়রার দুটো বাচ্চা চুঁই-চুঁই করে ডাকে। এক মাস আগে একবার যখন এসেছিলাম, অন্তঃসত্ত্বা পায়রা মা উড়ে উড়ে আসত। সঙ্গে পুরুষটি। তাদের ঘর মানুষের যন্ত্রের আশ্রয়ে। তাদের ব্যস্ততা দেখতাম। এখন তারা তাদের সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত। এদের কেউ আটকে রাখে না, চলে যেতে বললেও এরা চলে যায় না। দিব্যি ঘর বানিয়ে বাস করছে।

এখানে আসার পরপরই যে আতঙ্ক আমাকে ঘিরে ধরেছিল, সেটাই আমাকে আরো জড়িয়ে ধরছে। আমি খুব শিগগির বাড়ি ফিরতে পারব না।

আমি আমার নিজের বাড়ি ফিরতে চাই।

 

২৩/০৩/২০২০

সোমবার

আপনি বেনারস থেকে ফিরে সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত। জ্বর-জ্বর ভাব, নাকি সত্যি জ্বর! লুকোবেন না। আপনি সমাজ থেকে বেরিয়ে যেতেও পারবেন না। আমরা অপেক্ষা করব আপনার শারীরিক অবনতি কতটা হল দেখার জন্য। আপনাকে ১৪ দিন দেখা হবে। আপনি সন্দেহভাজন। আপনি আসামি। প্রয়োজনে আপনাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে।

শুনছেন, এই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আপনাদের কেউ গেছেন কখনো? আমি যাচ্ছি।

এবং… আমি নিরন্তর যাচ্ছি…
দমবন্ধ… একা… বালিয়াড়ি নাকি সমুদ্র? অথচ, সমুদ্র আমার বড্ড প্রিয়…

আমি আমার নিজের বাড়ি ফিরতে চাই।

রাত্রি অথবা নিরাময়ের গল্প

প্রশান্ত গুহমজুমদার


অবসানের এই বিরহে কোথাও নিক্কন বাজিতেছে। আসিয়াছে এবং

চলিতেছে অনিবার। কেহ নাই, বলিবে, এইবার অপর গ্রহের কথা বলো

 

নবতর ফুর্তির আয়োজন, সময়ে সুন্দর অথবা অসুন্দরের উপাসনা, নিয়মমাফিক রমণ, বিলাস, বৈভব, ক্ষুধা কিংবা খিধের ভাবনা, মিথ্যে সুখ-অসুখের কল্পনা। অশেষ লোভ, ইঁদুর দৌড়, অসভ্য প্রতিযোগিতা, ঈর্ষা, অপ্রাপ্তিজনিত হতাশা। প্রতিটি মুহূর্ত শিকারযোগ্য। বিচিত্র ব্যস্ত রাজপথ, অন্ধ গলিতে ছায়াসব, আশ্লেষের গাঢ় শব্দ। অথচ কোথাও প্রেম নেই। তথাপি বিমূঢ় বোধ এক। অপরাহত ক্লান্তি। এ এক পরিচিত জীবনের চিত্র।

পথে, রেলব্রিজে, অন্য আরেক শরীর, মুখ, বাঁচার জন্য, স্রেফ বেঁচে থাকার তাগিদে আতুর হাত। পোস্টমর্টেমের বাতানুকুল ঘরে অপমানিতা, ধর্ষিতা, হত, মৃত লাশ। এইসব কিছুই এই পৃথিবীর এবং অন্য এক অপরিচিত জগতের গল্প।

ছিল। এমনই জীবন ছিল। যেমনই হোক, ছিল। রসে বশে ক্ষুধায়, অ-সুখে, ভালোবাসায়, পরাজয়ে, অপ্রেমে, জয়ে, ঈর্ষায়, প্রেমে, কলঙ্কে। আর ধ্বংসে। বিগত সত্তর হাজার বছরে মানুষ পরিবেশ জেনেছিল, অশ্রুর স্বাদ, হাহাকারের শব্দে উৎসব। আর ব্যবসা। অস্ত্রের উদ্ভাবনীতে, রক্তের প্লাবনে, হত্যার উন্মাদনায় সে ক্রমে অন্য আরেক ঈশ্বর। এই পৃথিবীর সব কিছুই হননযোগ্য তার কাছে। কেবল জিগীষা। নানাবিধ নামাবলীর আড়ালেও বহু বর্ণের ওই ঈশ্বরকে তোষণের প্রয়োজন কখনো ফুরিয়ে যায় নি।

আমরা করব জয়…’, কেবল স্বপ্নেই। আসলে মানবিকতার , মনুষ্যত্বের শত্রু যে কে, তাই সঠিক ভাবে আর চিহ্নিত করা হল না। কেবল ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে দরজাসব বন্ধ করে অমিত বিক্রমের এক মস্তিষ্ক নিয়ে তখন আমরা সকলেই ‘রক্তকরবী’র রাজা।

আর আমি? কোথায় ছিলাম আমি? এই বহুল মুখোশধারী সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত অস্তিত্ব? কোন কূলে? কেবল ইতিহাস আমাকে প্ররোচিত করছিল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আকাঙ্খায়। উপায়ান্তর না পেয়ে চেয়েছি কিছু নিঃসঙ্গতা। এত অবান্তর, এত ‘আমার’ আর নিতে পারছিলাম না। অসহ এই যাপন অসামাজিক এক জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। চাইছিলাম, কিছু অন্য রকম বসবাস। কিছু নিঃসঙ্গতা। হে পৃথিবী, দিলে। একেবারে সম্পূর্ণ ভরে দিলে।

এই পাওয়ার মধ্যে আমি অন্তত স্বেচ্ছাধীন ছিলাম। এক যাতায়াত ছিল। অন্তত সে সম্ভাবনা ছিল। দরোজা বন্ধ করেছি, জানালাও। নিঃসঙ্গতা প্রার্থিত ছিল, শোক নয়। তবুও ক্রমে সেই নিঃঙ্গতাকে ব্রাত্য করে এসে বসল এক অমোঘ রাক্ষস। যা চাই নি, তাও যেন এইবার তুমি দিলে। এক ভাইরাসের ছলে একাকীত্ব। নিষ্ঠুর এক দান। নিঃসঙ্গতা ছিল ঐচ্ছিক। একাকীত্ব হয়ে উঠল সম্পূর্ণ বশ্যতা, নির্দয়, আরোপিত। সেখানে যাতায়াত নেই। অভূতপূর্ব শোকের এক নবতর কোয়ারানটাইন। এভাবেই বসন্ত গেল। গ্রীষ্মও যাই যাই। ক্রমে সে হয়ে উঠল অদৃশ্য অব্যর্থ ভয়ঙ্কর। ধীরে প্রমাণিত হল, you will never feel alone, if you run down the stairs of loneliness; as every solitary step becomes your companion- এক অসহ্য মিথ্যা।

টের পাওয়া গেল, জীবন, যেখানে অভ্যস্ত ছিলাম যে যেমন, দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। তুমি কি সবই শুনতে পাও! তুমিও তো তবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলে দুর্মর অবাধ্যতায়, লোভে? অপরাহ্নের জানালায় অপেক্ষারতা আতুর সুন্দরকে ক্রমে করে তুলছিলে অসহিষ্ণু মুখর, ঝরিয়ে দিচ্ছিলে উন্মুখ সবুজ, নামিয়ে আনছিলে পাহাড়ের দেয়াল থেকে ভাঙ্গনের ভীষন শব্দ। তিন ভাগ জলের স্বাভাবিক চরিত্র বদলে দিচ্ছিলে। নির্দয়, নিস্পৃহ উদাসীন করে নিচ্ছিলে নিজেকে। অবাধ উন্মুক্ত যাপন, আকাশ, নীল, অলোকসাধারণ চন্দ্রিমা দূর, ক্রমে আরো দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছিলে! সেই অকালে একা হওয়ার শুরু আমার। শুধু আমার নয়। আমরা, যারা এই শোকে আক্রান্ত, তাঁরা সবাই। যে রাস্তায় আমরা পৌঁছে যেতে চাইছিলাম ঘরের নিশ্চিন্তে, যে শব্দে আলো বা অন্ধকার চয়ন করে নেওয়ার স্বাধীনতা ছিল, কিছুটা হলেও বদলে নিতে পারছিলাম শব্দের আকার, প্রকৃতি; অব্যর্থ একাকীত্ব সব অবান্তর করে দিচ্ছে। এপাশ ওপাশ থেকে মানুষ, ব্রাত্য অথবা প্রিয় ভেবেছি যাদের, নিঃশব্দে সরে যাচ্ছে। মুখটুকুও আর দেখা যাচ্ছে না। কোথায় যাচ্ছে তাঁরা! ময়ূর, প্যাঁচা, বনবিড়াল, কালো চিতা, পেঙ্গুইন, সিংহ নিঃশঙ্কে নেমে এসেছে পথে। কেবল সাইরেনের শব্দ। অ্যামবুলেন্স কিংবা শান্তিরক্ষকের। পথ থেকে সরে যাচ্ছে পথ, নিঃশব্দেই, প্রবল অভিমানে। স্বাভাবিক কথা সরে গেছে ঘর থেকে, পাছে সে-ও রাক্ষসে আক্রান্ত হয়, গ্রাস করে তাকে। চারপাশে কেবল ফিসফিস, চারপাশে অজস্র ঘেটো। চারপাশে শুধু বার্তা বিনিময়ের যান্ত্রিক শব্দ। আলো জ্বলছে পথে পথে, সে কেবল পায়ের শব্দ নয়, মানুষের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য। স্বপ্ন দেখতে ভুলেছে মানুষ। তার জন্য বরাদ্দ এখন কেবল নির্ঘুম রাত্রি। অপেক্ষা করছো তুমি। ভয়াবহ এক পরিণতির। আর এর মধ্যে, আমি আমরা, কোথায়? ঝুলন্ত ফ্যান দেখেছি বারবার। ভার নিতে পারবে! নির্ঘুম রাত্রে ছ’তলার কার্নিশে দাঁড়িয়ে অন্ধকারকে প্রশ্ন করেছি, মৃত্যুযন্ত্রনা কি দীর্ঘ সময় নেবে, খুব দীর্ঘ হবে! সাদা প্রভাতকে ঘৃণা করতে শুরু করেছি। কোথাও তুমি নেই। তোমাকে কতদিন দেখা হয় নি। একাকিত্ব জুড়ে থাকলো আমার সবটুকু। এক নিরাবয়ব অস্তিত্বের বিকট গন্ধ নিয়ে সে এলো। সে ত্রাস এক অপূর্ব! তার সর্বাঙ্গে সাদা অন্ধকার। তার ঘুঙ্গট বেজে চলে একই লয়ে, একই ছন্দে। আবেগ নেই, আনন্দ নেই, আলো নেই। ক্রমশ গ্রাস করছে তাকে, ওকে, আমাকে। আক্রান্তের প্রতিটি শ্বাসে উঠে আসছে সেই আহত নিশ্চিত অবসানের জন্য অপেক্ষারত মহিষের ছবি। প্রতি প্রশ্বাসে যন্ত্রণায় কেঁপে উঠছে আক্রান্তের শরীর। আসঙ্গলিপ্সা জেগে উঠছে প্রবল। কিছু প্রিয় মুখ দেখার বড় সাধ এখন। কিছু মুখ। নিঃসঙ্গতার জন্য প্রার্থনা হারিয়ে গিয়েছে কোথাও। চাইলে, একদিন তাকে দূরে সরিয়ে মিশে যেতে পারতাম সঙ্গদোষে, সংঘের চিলেকোঠায় কিংবা পথে। যে পথে যাওয়া, যে পথে জীবন, যে পথে আলো, ইচ্ছেবাতাস, কৌতুক। সামাজিক যাপনে বহুবিধ দূষণ আমাদের আশেপাশে হাঁটত, জড়িয়ে ধরতো, অসহ্য করে তুলতো সকাল বিকেল। তবু তো ছিল। ইচ্ছে মত ডুব দিতাম, হাঁসফাঁস করতাম, চাইতাম পরিত্রাণ, তথাপি আবার সংঘের কোলে।

সেই অকালে একা হওয়ার শুরু আমার। শুধু আমার নয়। আমরা, যারা সে অব্যর্থ, অসুন্দর ভয়ঙ্করে আক্রান্ত, তাঁরা সবাই। কুৎসিত একাকীত্ব সব অবান্তর করে দিচ্ছে। শ্বাসপ্রশ্বাসে এত যন্ত্রণা! বাতাস এত দুর্লভ! সুন্দর নয়, আজ কেবল অবোধ্য ভাইরাসের ঘুঙুরশব্দ, হিম যাতায়াত। আজ সর্বত্র শাসন করছে হারিয়ে যাওয়ার এক ভয়।

যেন, নিরাময় নেই আর। এখন কেবল রাত্রিশেষের নিরুপায় অনিশ্চিত অপেক্ষা। অন্য এক নিরুপম ভুবনের, অর্বাচীন প্রভাতের। কি ভাবছে আমাদের ভালোবাসার পৃথিবী?

১২ মে;

subhropoesia@gmail.com

 

নিরাময়

অপ

যাবজ্জীবন গৃহ-স্থ

জিয়া হক


এই লকডাউন নতুন নয় আমার কাছে। ২০০৭ সালে হঠাৎ আমার জীবনে লকডাউন নেমে আসে আকাশ থেকে। আকাশ থেকেই তো। কীভাবে কী হয়ে গেল তার আজ আর বিস্তারিত বিবরণ দেবো না। আমি গৃহবন্দী হলাম। চারপাশে সবাই চলেফিরে বেড়ায় আর আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে সামান্য অতীতের কথা ভাবি। দিনগুলো সরে সরে যায়। স্মৃতির ক্রম গুলিয়ে গেছে। পুরনো স্কুলের সামনের বেদিতে শিক্ষকরা দাঁড়িয়ে থাকতেন আর আমরা জনগণমন গাইতাম, মনে পড়ে। আরও কত কথা। আমার বুড়োদার সঙ্গে ভোরে সুতি খালের ধারের জমির আলে বসানো ঘুনি ঝেড়ে চুনোমাছ সংগ্রহ করে আনতাম। বুড়োদা মানে আমার পিতামহ। বুড়োদা সারাদিন পশ্চিম ডাঙার কলাবাগানের ঘাস নিড়িয়ে দিত আর তার জন্য পুষ্টিভাত নিয়ে যেতাম। দাদার পাশে বসে তার ঘামভর্তি মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সুদূর অতীতের মানুষের মুখ কল্পনা করতাম। সেদিন কল্পনাটুকু বেঁচে ছিল। কত ঢোঁড়া সাপ, বিষধর সাপ পাশ দিয়ে ব্যস্তসমস্ত হয়ে চলে যেত। আমি ভয় পেলেও বুড়োদাকে বলতাম না। প্রায় লোকের সাপে কাটত। চিকিৎসা বলতে ছিল গ্রামীণ ওঝা। তাদের কাছে নাকি এমন শিকড় ছিল যা দিয়ে বেঁজি সুস্থ হয় সাপের কামড় থেকে। বেঁজিকে অনুসরণ করেই তারা পেয়েছে ওই বিশল্যকরণী। লোক সেরেও উঠত। লোক মরেও যেত। সাপ চোখে দেখা যায়, দেখে পালানো যায়, অদৃশ্য নয়, দংশনে পীড়িত রোগীকে ঘিরে মেলা বসে যেত কেননা তা ছোঁয়াচে নয়। বিপর্যয়ের দিনে, বিপন্নতার দিনে মানুষের পাশে থাকা যে কী বড়ো কল্যাণ! অনেক দূরে ‘জানা’ পাড়ার কোলে বিক্ষিপ্ত গাছগুলো অরণ্যের রূপ নিয়ে সবুজের উঁচু-নিচু পাহাড় তৈরি করত। আমি বুড়োদাকে ভালোবেসেছি। যখন দাদা প্রায় চলচ্ছক্তিহীন হয়ে পড়ল, যখন তার সঙ্গে গল্প করার মতো কেউ আর রইল না, যখন তার বিছানায় মৃত্যুর গন্ধ দেখা দিল, যখন বুড়োদা ‘সামাজিক দূরত্বে’ চলে গেল, আমি তার ঘরে ঢুকে বিছানায় তার মাথার কাছে বসতাম। বুড়োদা আমাকে ভালোবেসেছিল সব নাতির চাইতে বেশি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি আরেকবার, আরও একবার বুড়োদার ভালোবাসা টের পেতে চাইতাম। কিন্তু আমার অনুভবের শক্তি ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। একে বলে ডিরিয়ালাইজেশন। আমার আন্তরিকতা ততটাও আন্তরিক নয় কেননা সে শুধু পরিস্থিতির সাপেক্ষে প্রতিক্রিয়া মাত্র। আমাকে অভিনেতা বনে যেতে হল। যেন সব বুঝতে পারছি, যেন আমার কিছু হয়নি। কীভাবে ঢাকা দেওয়া যায় এই অস্বাভাবিকতা? আমার মধ্যে জন্ম হল ভালোবাসার। দেখলাম, মানুষ ভালোবাসা পেলে সব ক্ষমা করতে প্রস্তুত। আমি ক্ষমার জন্য কাতর হলাম। অথচ ভালোবাসতে গেলে অনুভূতি লাগে। আমার তো তা নেই। আমি তো নিজেকেই ভালোবাসতে পারিনি, ছড়িয়ে ফেলেছি রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডে। একটা যুতসই পথের সন্ধান করতে লাগলাম। ভাবলাম যদি চুপ হয়ে যাই একেবারে, কেমন হয়? তারপরই মনে হল, এটা সকলের বড়ো চোখে পড়বে। তাহলে কী করা যায়? চিন্তা করার মতো অবস্থা কি সেদিন আমার ছিল? ছিল না তো। যা ইচ্ছা তাই করলাম। আঘাত করলাম, আহত হলাম, প্রতিশ্রুতি দিলাম, প্রতিশ্রুতি ভাঙলাম, পাশে দাঁড়ালাম, সরে এলাম, প্রশংসা পেলাম, ঘৃণা পেলাম। আমি কী করব? কী করবে একজন যার অনুভূতি হারিয়ে গিয়েছে? নিজেকে নিয়তির হাতে ছেড়ে দিলাম। তর্কের পথ ছেড়ে মেনে নেওয়া শিখলাম। নিয়তির সঙ্গে তর্ক করা যায় না। ঘরের ধারে আদিগঙ্গার পাড়ে গিয়ে বসে রইলাম দিনের পর দিন। কচুরিপানায় ঢাকা একটা মৃতপ্রায় নদী। কে বলবে একে নদী? একদিন তারও জলস্রোত ছিল, তালগাছের শালতি ভাসিয়ে মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে, কে বলবে? নিজেকে বললাম, আজ থেকে আমি এই নদীটি হলাম। তার সঙ্গে সখ্য হল। প্রেমিক হলাম। মনে হল, সব কচুরিপানা সরিয়ে দিয়ে তাকে আবার অতীতের মতো রূপবতী করে তুলি। তার মুখের দিকে তাকালে আমি বুড়োদাকে দেখতে পেতাম। সেও ঝাপসা। আমার স্মৃতির উপর রাশিরাশি কচুরিপানা। কে সরাবে? গৃহেই রয়ে গেলাম। আমার দৌড় যাদবপুর অবধি সীমাবদ্ধ রয়ে গেল। এর ওপারে সব কেমন যেন অপরিজ্ঞাত। বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেল আমার মসজিদ। পাঁচ ওয়াক্ত নয়, প্রতিটি ওয়াক্ত সেখানে কাটাতে পারলে যেন আমার সুখ। কিন্তু নিয়তির কী পরিহাস, সেই সুখ অনুভব করার মতো মানুষী শক্তি আমার রইল না। শুধু থেকে যাওয়া। টিকে থাকা। থাকা। বিশাল ব্যপ্ত মহাবিশ্ব, গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ নিয়ে যে একটা ছবি, যাকে আমি দূর থেকে দেখতাম কল্পনায়,–একদিন, ২০০৭ সালে আমি সেই ছবির গায়ে উলটে যাওয়া দোয়াতের কালির একটা অনভিপ্রেত এবড়োখেবড়ো রঙ হয়ে আটকে গেলাম। ডিরিয়ালাইজেশনের ঘরে অনিচ্ছুক প্রবেশাধিকার পেলাম।

সেই দিনই শুরু হয়েছিল আমার লকডাউন। নিয়তি চাপিয়েছিল। এখন রাষ্ট্র চাপিয়েছে। রাষ্ট্রই কি নিয়তি?  যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, সে কি তাহলে নিয়তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে? ঘরে বসে শুধু আমার আদিগঙ্গার কথা মনে পড়ে। কত কাছে, কিন্তু কত দূরে। সেখানে নাকি অনেক বক-পাখপাখালি এসে ভিড় জমাচ্ছে এখন, সূত্রের খবর। মৃতপ্রায়রা মৃতপ্রায়দের সংবাদ সংগ্রহ করে। মানুষ অহেতুক মৃত্যুর প্রার্থনা করে। যখন সত্যিই মৃত্যু এসে সামনে দাঁড়ায়, চারপাশে ঘোরাঘুরি করে, তখন জীবনকে রোজ স্যানিটাইজার দিয়ে ধুতে ধুতে বলে, জীবন রে, তুঁহু মম ‘same’ ও সমান। কিন্তু পাথরের কোনও বন্দীদশা নেই। সমুদ্রতটে সে পাথর, খাটের পায়ার তলায়ও সে পাথর। আমি ওই পাথর। সচলাবস্থায় স্থির, অচলাবস্থায়ও। যাবজ্জীবন লকডাউনের দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আমি শুধু চাই প্রীতির সংক্রমণ হোক। প্রীতি-লতা দেদার ছেয়ে যাক সমস্ত দলীয় দফতরে। কেউ কি কাঁদচ্ছে প্রতিবেশে? শুনতে পাই, অনুভব করি না কেন? আমরা সবাই কি তবে ডিরায়ালাইজেশনের খানিক খানিক স্বয়ংসেবক হলাম?