একটি স্বাধীন বৈপ্লবিক শিল্পের জন্য ইস্তাহার

স্বাক্ষরঃ অঁদ্রে ব্রতঁ এবং দিয়েগো রিবেরা

অনুবাদ – দোলনচাঁপা চক্রবর্তী


এই ইস্তাহারটি ত্রোতস্কি এবং অঁদ্রে ব্রতঁ দ্বারা লিখিত বলে মনে করা হয়, যদিও এতে স্বাক্ষর ছিল রিবেরা এবং ব্রতঁর ।

একটুও বাড়িয়ে না বলেও আমরা বলতে পারি যে সভ্যতাকে কখনও সাম্প্রতিক সময়ের মতো হুমকির মুখোমুখি হতে হয়নি। বর্বরেরা, বর্বরোচিত এবং তূলনামূলকভাবে অকার্যকরী উপকরণের মাধ্যমে, ইওরোপের একটি কোণ থেকে প্রাচীনত্বের সমস্ত সংস্কৃতিটুকুকে শোষণ করে নিয়েছে। কিন্তু আজ আমরা বৈশ্বিক সভ্যতাকে এর ঐতিহাসিক গন্তব্যের মধ্যে সঙ্ঘবদ্ধ রূপে দেখতে পাচ্ছি,  যা সমস্তরকম আধুনিক প্রযুক্তির হাতিয়ারে সজ্জিত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির আঘাতের নিচে ঘূর্ণায়মান। আমরা কোনমতেই ক্রমশ এগিয়ে আসা বিশ্ব যুদ্ধ সম্পর্কে চিন্তা করছি না। এমনকি ‘শান্তি’র সময়েও শিল্প ও বিজ্ঞানের অবস্থান সম্পূর্ণরূপে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

যতক্ষণ পর্যন্ত তা কোনো ব্যক্তি থেকে উদ্ভূত, যতক্ষণ তা কোনো বৈষয়িক প্রতিভাকে কিছু সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসে যা থেকে সংস্কৃতির বস্তুগত সমৃদ্ধি বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব, যেকোনো দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক অথবা শৈল্পিক আবিষ্কারকে একটি মূল্যবান সুযোগের ফলাফল বলে মনে হয়; অর্থাৎ, প্রয়োজনের অভিব্যক্তি, অধিক অথবা কম স্বতস্ফূর্ত। এইধরনের সৃষ্টি হ্রাসপ্রাপ্ত হতে পারে না, সাধারণ জ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে (যা বর্তমান পৃথিবীকে অনুবাদ করে) অথবা বৈপ্লবিক জ্ঞানের (যার জন্য, পৃথিবীতে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে, এর আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণকারী আইনগুলোর একটি যথার্থ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়)। সুনির্দিষ্টভাবে, আমরা সেই বৌদ্ধিক শর্তগুলোর প্রতি উদাসীন থাকতে পারি না যার অধীনে সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়; বৌদ্ধিক সৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণকারী সেইসব নির্দিষ্ট আইনগুলোর প্রতিও আমাদের সম্মান জানাতে ব্যর্থ হওয়া উচিত নয়।

সমসাময়িক বিশ্বে বৌদ্ধিক ক্রিয়াশীলতা সম্ভবপর যেসব শর্তের অধীনে সেগুলোর সুদূরপ্রসারী ধ্বংসকে আমাদের অবশ্যই চিহ্নিত করতে হবে। এর থেকে কেবল শিল্পকর্মের অবক্ষয় নয় বরং সুনির্দিষ্টভাবে ‘শৈল্পিক’ ব্যক্তিত্বও প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা ক্রমবর্ধমান। হিটলারের শাসনকাল, যা যাদের কাজে সামান্যতম উদারতা দেখা গিয়েছিল, তা যতই কৃত্রিম হোক, এমন সমস্ত শিল্পীদের থেকে জার্মানীকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার পরে, সেইসব শিল্পীদের এই সরকারের গৃহভৃত্যের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে যারা এখনও কলম বা তুলি ব্যবহারের সম্মতি দেন, যাদের কাজই হলো আদেশপ্রাপ্ত হলেই, কুৎসিততম নান্দনিক রীতিরেওয়াজ অনুসারে সেই আমলকে মহিমান্বিত করা। প্রতিবেদনে ভরসা করতে হলে বলতে হয়, সোভিয়েত ইউনিয়নেও পরিস্থিতি অনুরূপ, যেখানে থার্মিডোরিয়ান প্রতিক্রিয়া বর্তমানে চরমসীমায় পৌঁছেছে।

এ কথা উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই যে বর্তমানের কেতাদুরস্ত বুলি, ‘ফ্যাসিবাদও নয়, কম্যুনিজমও নয়’-এর সঙ্গে আমরা নিজেদের চিহ্নিত করি না! – এটি একটি বাগ্বৈশিষ্ট্য যা ‘গণতান্ত্রিক’ অতীতের জীর্ণ অবশিষ্টাংশের সঙ্গে সংলগ্ন, গোঁড়া এবং ভীত, ফিলিস্তিনী মেজাজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। প্রকৃত শিল্প, যা পূর্ব-প্রস্তুত মডেলের উপর বৈচিত্র্য এনে সন্তুষ্ট নয় বরং মানুষ এবং তার সমসময়ের মানবজাতির অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রকাশের উপর জোর দেয় — প্রকৃত শিল্প বৈপ্লবিক না হতে, সমাজের একটি সম্পূর্ণ এবং মূলগত পুনর্নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা পোষণ না করতে অক্ষম। এটি এর ক্ষেত্রে অবশ্য পালনীয়, যে শৃঙ্খলে একে বাঁধা হয় তার থেকে শুধুমাত্র বৌদ্ধিক সৃষ্টিশীলতাকে উদ্ধার করা, এবং সমগ্র মানবজাতিকে নিজেদের সেই উচ্চতায় নিয়ে যেতে দেয়া যেই জায়গাটি কেবলমাত্র বিচ্ছিন্ন প্রতিভাধর ব্যক্তিরাই ইতিপূর্বে অর্জন করতে পেরেছেন।

ইউএসএসআর-এর সার্বভৌম সরকার, অন্যান্য দেশে এর নিয়ন্ত্রণাধীন তথাকথিত সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে, সমগ্র বিশ্বে একটি গভীর গোধূলির আলো ছড়িয়ে দিয়েছে যা সমস্ত আধ্যাত্মিক মানের প্রতিকূল; অশ্লীলতা এবং রক্তের গোধূলি যেখানে, বৌদ্ধিক ও শিল্পীদের ছদ্মবেশে, সেইসব ব্যক্তিরা অত্যধিক মাত্রায় রয়েছে যারা অপরের স্তুতির মাধ্যমে পেশাদার জীবন তৈরি করেছে, অর্থের বিনিময়ে মিথ্যাকথনকে রীতি, এবং অপরাধের হ্রাসকরণকে আনন্দের সংজ্ঞা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। স্তালিনবাদের পোশাকী শিল্প, ইতিহাসে উদাহরণবিহীন অশিষ্টতার সঙ্গে, নিজেদের ভাড়াটে পেশাকে বিশ্বাসযোগ্য করার প্রয়োজনে নিজেদের প্রচেষ্টাকে প্রতিবিম্বিত করে।

শিল্পের নীতিসমূহের এই লজ্জাজনক অস্বীকৃতি যে জঘন্যতাকে শৈল্পিক বিশ্বে অনুপ্রেরণা দিয়ে থাকে —  একটি অস্বীকৃতি যা এমনকি ক্রীতদাস স্টেটগুলোও বহন করার সাহস করেনি – তার বিরুদ্ধে একটি সক্রিয়, আপোষবিহীন নিন্দার উত্থান ঘটা উচিত। লেখক এবং শিল্পীদের বিরোধীতাই হলো এমন একটি শক্তি যা ব্যবহারযোগ্যভাবে সেইসব শাসনব্যবস্থার সম্মানহানি ঘটাতে এবং তাদের উৎখাত করতে পারবে যেগুলো উন্নততর পৃথিবীর জন্য প্রলেতারিয়েতদের আকাঙ্খার অধিকারের পাশাপাশি, মহানতা এবং এমনকি মানুষের মর্যাদার প্রতিটি অনুভূতিকেও ধ্বংস করে চলেছে।

কম্যুনিস্ট বিপ্লব শিল্পকে ভয় পায় না। এটি অনুধাবন করে যে ব্যক্তি এবং তার জন্য প্রতিকূল বিভিন্ন সামাজিক গঠনের মধ্যে দ্বন্দ্বের মাধ্যমে অবক্ষয়প্রাপ্ত একটি পুঁজিবাদী সমাজে শিল্পীর ভূমিকা নির্ধারিত হয়। এই বিষয়টি একাই, যতক্ষণ পর্যন্ত সে এ বিষয়ে সচেতন, শিল্পীকে বিপ্লবের সঙ্গে স্বাভাবিক সখ্যতায় রাখে। ঊর্ধ্বপাতনের প্রক্রিয়াটি, যা এখানে ব্যবহৃত হয় এবং যেটিকে মনোবিকলনের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, অবিচ্ছিন্ন ‘অহম্‌’ এবং তার দ্বারা প্রত্যাখ্যাত বাইরের উপাদানগুলোর মধ্যবর্তী ভগ্ন সাম্যাবস্থাকে পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করে। এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াটি ‘স্ব-এর ধারণা’টির সপক্ষে কাজ করে, যা অসহনীয় বর্তমান বাস্তবতার বিরুদ্ধে আভ্যন্তরীণ বিশ্বের, ‘ইদ’-এর সমস্ত শক্তিকে কেন্দ্রীভূত করে, যা সমস্ত পুরুষের জন্য স্বাভাবিক এবং যা প্রতিনিয়ত পরিস্ফূট ও বিকশিত হচ্ছে। স্বতন্ত্র আত্মার দ্বারা অনুভূত বন্ধনমুক্তির চাহিদাকে কেবলমাত্র তার স্বাভাবিক গতিপথকে অনুসরণ করতে হবে তার আদিম প্রয়োজনীয়তা –  মানবের বন্ধনমুক্তির চাহিদার সঙ্গে তার প্রবাহটিকে মেশানোর জন্য।

লেখকের কর্মের ধারণা যেটি নিয়ে তরুণ মার্ক্স কাজ করেছিলেন তা স্মরণযোগ্য। ‘লেখক’, তিনি বলেছিলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই অবশ্যই বেঁচে থাকা এবং লেখার জন্য অর্থোপার্জন করবেন, কিন্তু কোনো পরিস্থিতিতেই অর্থোপার্জনের জন্য বেঁচে থাকবেন না এবং লিখবেন না…লেখক কোনোভাবেই একটি উপায় হিসেবে তার কাজকে বিবেচনা করবেন না। এটি নিজেতেই পরিপূর্ণ এবং তাঁর নিজের ও অপরের দৃষ্টিতে এতই ক্ষুদ্র একটি উপায় যে যদি প্রয়োজন হয় তিনি তাঁর কাজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নিজের অস্তিত্বকে বিসর্জন দেবেন…সাংবাদিকতার স্বাধীনতার প্রথম শর্ত হলো যে এটি কোনো ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড হবে না।’

এই বিবৃতিটি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা অধিকতর যথোপযুক্ত যারা বৌদ্ধিক কর্মকাণ্ডকে নিজের অপরিচিত লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে ধাবিত করে এবং রাষ্ট্রের তথাকথিত কারণসমূহের পশ্চাতে থেকে, শিল্পের বিষয়বস্তুকে পরামর্শ দিয়ে থাকে। এই বিষয়বস্তুগুলোর স্বাধীন পছন্দসমূহ এবং তার অপব্যবহারের বিস্তৃতির উপর সীমাবদ্ধতার অনুপস্থিতি – এইসবই সেই অধিকারসমূহ যেগুলোর প্রতি একজন শিল্পীর অসখ্যতার দাবি জানানোর অধিকার আছে। শৈল্পিক সৃষ্টিশীলতার দুনিয়ায়, কল্পনাকে সমস্ত সীমাবদ্ধতা থেকেমুক্ত হতে হবে এবং কোনোভাবেই শর্তের অধীনে নিজেকে থাকার অনুমতি দেয়া চলবে না। যারা আমাদের কাছে আর্জি জানায়, আজকে অথবা আগামীকাল, এই সম্মতি দেয়াড় জন্য যে শিল্পের একটি শৃঙ্খলার প্রতি নিবেদিত হওয়া উচিত যাকে আমরা তার প্রকৃতির সঙ্গে মূলগতভাবে বেমানান বলে মনে করি,আমরা সেখানে সপাট প্রত্যাখ্যান জানাই এবং শিল্পের সম্পূর্ণ স্বাধীনতার সূত্রকে সমর্থনের জন্য আমাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ইচ্ছার পুনরাবৃত্তি ঘটাই।

আমরা, অবশ্যই চিহ্নিত করতে পারি, যে বুর্জোয়াদের প্রতি-আক্রমণের বিরুদ্ধে, এমনকি যখন তা বিজ্ঞান বা শিল্পের পতাকায় নিজেকে আবৃত করে নেয় তখনও, বৈপ্লবিক রাষ্ট্রের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার আছে। কিন্তু বৈপ্লবিক আত্ম-রক্ষার এইসব জোরপূর্বক ও সাময়িক পদ্ধতি এবং বৌদ্ধিক সৃষ্টিকে নির্দেশ দেয়ার ভণ্ডামির মধ্যে একটা বিশাল শূন্যতা থেকে যায়। পার্থিব উৎপাদন শক্তির উন্নততর বৃদ্ধির প্রয়োজনে, যদি, কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিপ্লবকে একটি সামাজিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতেই হয়, একটি বৌদ্ধিক সৃষ্টির বিকাশের জন্য প্রথম থেকেই স্বতন্ত্র স্বাধীনতার একটি নৈরাজ্যবাদী শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কোনো কর্তৃপক্ষ নয়, কোনো নির্দেশ নয়, শীর্ষ থেকে কোনো নির্দেশের চিহ্নমাত্র নয়! কেবলমাত্র বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার ভিত্তিতে, বহির্জগত থেকে অবরোধবিহীন, পণ্ডিত এবং শিল্পীদের পক্ষে নিজেদের কাজকে পরিপূর্ণতা দেয়া সম্ভব হবে কি, যা ইতিহাসে পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী হবে।

এতক্ষণে এটি স্পষ্ট হয়ে যাওয়া উচিত যে চিন্তার স্বাধীনতাকে সমর্থনের ক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক উদাসীনতার ন্যায্যতা প্রতিপাদন করার কোনও উদ্দেশ্য আমাদের নেই, এবং একটি তথাকথিত খাঁটি শিল্প যা সাধারণত প্রতিক্রিয়ার চূড়ান্ত অপবিত্র উৎসের প্রতি অনুগত তাকে পুনরুদ্ধার করার ইচ্ছে থেকে আমরা অনেক দূরে আছি। না, সমাজের ভাগ্যের উপর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা প্রত্যাখ্যান করার জন্য শিল্প সম্পর্কে আমাদের ধারণা অনেক বেশি উচ্চ। আমরা মনে করি যে আমাদের অধিযুগে শিল্পের সর্বোচ্চ ভূমিকা হলো সক্রিয়ভাবে এবং সচেতনভাবে বিপ্লবের প্রস্তুতিতে অংশ নেয়া। কিন্তু শিল্পী স্বাধীনতার লড়াইয়ে অংশ নিতে পারেন না যদি না তিনি উদ্দেশ্যগতভাবে এর সামাজিক উপাদানের সঙ্গে অঙ্গীভূত হন, যদি না তিনি নিজের স্নায়ুতন্ত্রে এর অর্থ এবং নাটককে অনুভব করেন এবং নিজের শিল্পকে নিজের অন্তর্নিহিত পৃথিবীর রূপপ্রদান করতে প্রস্তুত থাকেন।

পুঁজিবাদ, গণতান্ত্রিক এবং ফ্যাসিবাদের মৃত্যুযন্ত্রণাময় এই বর্তমান সময়কালে, শিল্পী নিজের বেঁচে থাকা ও কাজ করার অধিকার হারিয়ে ফেলার হুমকির মুখে নিজেকে দেখতে পান। দেখেন, যোগাযোগের সমস্ত পথগুলো পুঁজিবাদের ভেঙে পড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে অবরুদ্ধ হয়ে উঠছে। এটা স্বাভাবিক যে তিনি স্তালিনী সংস্থাগুলোর দিকে ঝুঁকবেন যেগুলোর মাধ্যমে তাঁর বিচ্ছিন্নতা থেকে পালানোর সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু যদি পূর্ণ অনৈতিকতাকে এড়িয়ে যেতে হয় তিনি সেখানে থাকতে পারবেন না, কারণ মূলত তাঁর নিজের বার্তা প্রদান করার অসম্ভাব্যতা এবং এই সংস্থাগুলো কিছু পার্থিব সুবিধার বিনিময়ে তাঁর থেকে অধঃপতিত স্তাবকতা নিংড়ে নেয়। তাঁকে বুঝতে হবে যে তাঁর স্থান অন্যত্র, যারা বিপ্লবের কারণগুলো এবং মানবজাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদের মধ্যে নয়, বরং তাদের মধ্যে যারা অটল বিশ্বস্ততার সঙ্গে বিপ্লবের সাক্ষী থাকে; তাদের মধ্যে যারা, এই কারণে, একাই সমস্ত ধরনের প্রতিভাধর মানুষদের চূড়ান্ত মুক্ত অভিব্যক্তি সহ একে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

এই আবেদনের লক্ষ্য হলো একটি সাধারণ ভিত্তি খুঁজে বার করা যেখানে সব বিপ্লবী লেখক এবং শিল্পীরা নিজেদের শিল্পের মাধ্যমে বিপ্লবকে সহায়তা করা এবং বিপ্লবের দখলদারদের বিরুদ্ধে শিল্পের মুক্তিকে রক্ষা করার প্রয়োজনে একত্রিত হতে পারেন। আমরা বিশ্বাস করি যে সবচেয়ে বিস্তৃত প্রকৃতির নান্দনিক, দার্শনিক এবং রাজনৈতিক প্রবণতাগুলো এখানে একটি সাধারণ ভিত্তি খুঁজে পাবে। মার্ক্সবাদীরা এখানে একত্রে নৈরাজ্যবাদীদের সঙ্গে হাঁটতে পারেন, যদি উভয় দল আপোষবিহীনভাবে জোসেফ স্তালিন এবং তাঁর সমর্থক গার্সিয়া অলিভারের প্রতিনিধিত্বে প্রতিক্রিয়াশীল পুলিশ-বাহিনীর নিয়ন্ত্রণকে বাতিল করতে পারে।

আমরা ভালোভাবেই জানি যে হাজার হাজার বিচ্ছিন্ন চিন্তাজীবি ও শিল্পীরা বর্তমানে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে, সু-শৃঙ্খল মিথ্যাবাদীদের চড়া মিথ্যায় যাদের স্বর ডুবে গেছে। শ’য়ে শ’য়ে স্থানীয় পত্রপত্রিকা ভর্তুকি নয় – নতুন পথ খুঁজতে চাওয়া তরুণ কন্ঠস্বরকে একত্রিত করতে চেষ্টা করছে। অবক্ষয়ের তকমা দিয়ে শিল্পের প্রতিটি প্রগতিশীল প্রবণতাকে ফ্যাসিবাদ ধ্বংস করে দিচ্ছে। স্তালিনবাদীরা প্রতিটি মুক্ত সৃষ্টিকেই ‘ফ্যাসিবাদী’ বলে থাকে। স্বাধীন বিপ্লবী শিল্পকে এবার অবশ্যই প্রতিক্রিয়াশীল নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য শক্তি সংগ্রহ করতে হবে। অস্তিত্বের অধিকারকে জোর গলায় প্রচার করতে হবে। শক্তির এমন একটি সমন্বয় ‘স্বাধীন বৈপ্লবিক শিল্পের আন্তর্জাতিক সঙ্ঘ’-এর লক্ষ্য যা আমরা মনে করি গড়ে তোলার সময় হয়ে গেছে।

এই ইস্তাহার, যেটিকে আমরা গন্তব্যের দিকে কেবলমাত্র প্রথম ধাপ বলে মনে করি তার মাধ্যমে প্রচারিত প্রতিটি ধারণার উপর আমরা কখনই জোর দিতে চাই না। এই আবেদনের প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধি না করে থাকতে পারবেন না – শিল্পের এমন প্রত্যেক মিত্র ও রক্ষকের কাছে আমরা এই মুহুর্তেই সরব হওয়ার আর্জি জানাই। আমরা অনুরূপ আবেদন জানাই বামপন্থায় বিশ্বাসী সেই সব প্রকাশনার কাছেও যারা আন্তর্জাতিক সঙ্ঘ স্থাপন, এবং এর কাজ ও কর্মপদ্ধতি বিবেচনার জন্য অংশগ্রহণে প্রস্তুত।

যখন সংবাদমাধ্যম ও পত্রব্যবহারের দ্বারা প্রাথমিক স্তরে আন্তর্জাতিক সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, আমরা মাঝারি মাপের স্থানীয় এবং জাতীয় কংগ্রেসের সংগঠনের দিকে এগোব। চূড়ান্ত পদক্ষেপটি হবে একটি বিশ্ব কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা যা আন্তর্জাতিক সঙ্ঘের ভিত্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করবে।

আমাদের লক্ষ্যঃ

শিল্পের স্বাধীনতা – বিপ্লবের জন্য।

বিপ্লব – শিল্পের পরিপূর্ণ মুক্তির জন্য!

অঁদ্রে ব্রতঁ

দিয়েগো রিবেরা