সূর্যাস্তে ওড়া পাখি আর চাঁদওয়ালা : শ্যামল সিংহের কবিতা

কৌশিক চক্রবর্তী


নির্বাচিত শ্যামল সিংহ ।। প্রকাশক: এখন বাংলা কবিতার কাগজ, দেশবন্ধুনগর, জলপাইগুড়ি ।। ২০১৪ ।। ২০০ টাকা

 

শ্যামল সিংহ বাংলা কবিতার এক বিস্ময়। আজকের কবিতার অনুসন্ধিৎসু পাঠক নতুন করে যেন আবিষ্কার করে নিচ্ছেন তাঁর কবিতা। সত্তর দশকের প্রথম পর্বে যখন ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রসাদপ্রাপ্ত সাহিত্যপত্রিকার বলয় ঘিরে বিশেষ এক বিবৃতি ধর্মী আবেগমথিত কবিতারা ক্রমশ চেপে বসছে বাংলা কবিতায়, যখন বাংলা কবিতার পরিচয় পাঠকের কাছে অনেকটাই শহরকেন্দ্রিক, তখন গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার অঙ্গীকার শুধু রাজনীতিই করেনি, বাংলা কবিতাও ছিল তার অংশীদার। তাই পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, কৃষ্ণনগর, জলপাইগুড়ি ঘিরে গড়ে উঠছিল নতুন এক বাংলা কবিতার স্বপ্নদেশ। তুমুল হৈ-হল্লা থেকে অনেকটা দূরে সেই স্বপ্ন দেখছিলেন কবি শ্যামল সিংহ। মিতকথন যাঁর অস্ত্র ছিল, জলপাইগুড়ি ছিল যাঁর শহর, আর সে কবিতার গভীরতা ছিল যাঁর চেতনায়।

প্রায় একক সাধনায় মেতে ছিলেন তিনি কবিতার দেশে। সন্ধান করেছিলেন আগামীদিনের কবিতার ভাষা। যে কারণে, হাতে গোনা কয়েকটি ছোট কাগজ ছাড়া কোনোদিন কোথাও, কোনো কবিতার সংকলনেও তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়নি। অবশ্য সে বিষয়ে শ্যামল সিংহ নিজেও কি আদৌ ভাবিত ছিলেন। তিনি তো কবিতার নেশায় বুঁদ। লিখেছিলেন মাঝরাতে লোকটি বাড়ি ফিরলো/ তখন আকাশ থেকে মদ পড়ছে / তখন গাছ ফেটে মদ পড়ছে/ তখন মাটি ফেটে মদ পড়ছে/ দূর থেকে উড়ে এল কুলো/ কুলোয় চেপে উড়ে এলো পরী/ লোকটি পরীকে জড়িয়ে ধরলো/ পরীর পা ফেটে রক্ত পড়ছে/ লোকটি মদের অনুবাদ করলো/ রক্ত/ রক্ত নিয়ে লোকটি ঢুকলো ঘরের ভেতর” [নেশা]

রক্তই ক্ষরণ করেছেন শ্যামল আজীবন কবিতার নেশায়। ১৪ই নভেম্বর, ১৪১৯ সালে ওদলাবাড়িতে জন্ম কবি শ্যামল সিংহ। ২০০৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি জলপাইগুড়ি শহরের জেলা হাসপাতালে মারা যাওয়ার সময়ে তাঁর সম্বল বলতে তিনটি মাত্র প্রকাশিত কবিতার বই, আর রেখে যাওয়া অগুন্তি অপ্রকাশিত কবিতা। আর হয়ত সামান্য কয়েকজন অনুরাগী বন্ধু-পাঠক, যাঁরা আজীবন বিশ্বাস করেছেন, শ্যামল সিংহ শুধু কবিতা লিখতেন, তিনি প্রকৃত প্রস্তাবে জীবন রচনা করতেন। তাঁর কবিতায় শব্দের সঙ্গে সঙ্গে মিশে থাকে ছবির মায়া। তিনি চিত্রকল্প নির্মাণ করেন না। সে করার প্র্যোজন নেই তাঁর কবিতায়। তাঁর লেখা প্রায় নিজে নিজেই শব্দের নৈঃশব্দ্য থেকে এক রেখাচিত্রময় ফ্রেমের দিকে গড়িয়ে যায়। আকাশের তারা ধরে শিশুটি বললো/ ‘মা খিদে পেয়েছে, খেতে দাও’/ নদীর ভেতর থেকে শিশুটির মা বললো/ ‘চুপ’/ আকাশের তারা ধরে শিশুটি আবার বললো/ ‘মা খিদে পেয়েছে, খেতে দাও’/ নদীর ভেতর থেকে শিশুটির বাবা বললো/ ‘চুপ করো’/ শিশুটি ধীরে ধীরে রাত হয়ে গেল’ [আকাশের তারা]

শ্যামল সিংহের কবিতায় তাঁর রক্তমাংস আঁকা ভাবনারা রাতের আকাশের তারার মতনই মৃদু অথচ ঝিকমিক। দেখতে সামান্য অথচ তার গভীরতা অতল। সত্তরের দশকে জলপাইগুড়ি থেকে প্রকাশিত ছোট কাগজ ‘পাগলা ঘোড়া’ইয় প্রথম তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। প্রথম কয়েক সংখ্যা পেরিয়ে যখন তারপর ‘সাম্প্রতিক ২৫টি অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক তাঁর একগুচ্ছ কবিতা প্রকাশ পায়, বাংলা কবিতার পাঠক নড়েচড়ে বসেন। আক্ষরিক অর্থেই এক নতুন ভাষার কবিকে আবিষ্কার করা হয়। অথচ, স্বভাবে শ্যামল সিংহ আর যাই হোক পাগলা ঘোড়া ছিলেন না তো, নতুন এক কবিতা ভাষার সূত্রে পাঠক ও কবি বন্ধুরা যখন তাঁকে প্রায় মাথায় করে রাখছেন, তখনও আশ্চর্য এক উদাসীনতায়, প্রায় একলা সাধনার মতন তিনি খ্যাতি, বড় কাগজের সান্নিধ্য – এসবের কিছুরই ভাবনা না ভেবে, নিজের মতন করে কেবলই কবিতার চর্চা করে গেছেন। বড় শহরের ক্ষমতাকেন্দ্রের বাইরে, দূর মফস্বলে বেঁচেছেন তাঁর নিজস্ব কবিতাজীবন। সঙ্গী ছিলেন একই শহরের কবিবন্ধু সমর রায়চৌধুরী, বিজয় দে; সঙ্গী ছিল পাগলা ঘোড়া, ক্রুসেড-এর মতন একান্ত প্রিয় লেখার কাগজেরা।

আজকের সময়ের নিরিখে, পত্রিকায় কবিতা বা নিজের কবিতা বই প্রকাশেও তাঁর মিতজীবন প্রায় তাঁর কবিতায় শব্দ ব্যবহারের মতনই। লেখালেখি শুরু করবার প্রায় দেড় দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরে ১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতাবই, সম্ভবত বাংলা কবিতার অন্যতম গুরুত্বকামী বই ‘চাঁদ ও খোঁড়া বেলুনওয়ালা’। তারপরের বই ‘সূর্যাস্ত আঁকা নিষেধ’ ঠিক দশ বছর পর প্রকাশিত, ২০০১ সালে। এই বইতেই ছিল তাঁর সেই কবিতা ‘রুমাল’। পাঠক, খেয়াল করলেই দেখবেন, কীভাবে পরতে পরতে কবি শ্যামল সিংহ একটা শহর, তার জীবন, একটা জ্বলতে থাকা সময়, অনেকগুলো স্বপ্নভঙ্গ লিখে রাখলেন। বেদনার মুহূর্তগুলো লেখা হয়ে গেল, অথচ, পাঠক কোথাও এতটুকু রক্তের গন্ধ পেলেন না। পরে, অনেক দিন পর, একদিন রাত্রিবেলা ঘুম ভেঙে গিয়ে তাঁর এই কবিতার কথাই মনে পড়ল হয়ত। চাঁদ উঠলেই/ মেয়েটির বিয়ে ভেঙে যায়/ রুমালে রুমালে বাতাস বেঁধে/ মেয়েটি রুমাল ছেড়ে দেয় কবিতায়/ কবিতার প্রতিটি লাইনে উড়ছে রুমাল/ লাল, সাদা কালো রুমাল/ রুমালের তলায় চিঠি/ চিঠিতে বহুতল বাড়ি/ বাড়ির তলায় বহে যাচ্ছে নদী/ নদীতে ভেসে উঠছে যুবকের মৃতদেহ’ [রুমাল] শ্যামল সিংহ তাঁর স্বভাবেই কোলাহল থেকে দূরে, পতাকার থেকে দূরে থাকতে জানতেন, শব্দ ছিল তাঁর কবিতার হাড়পাঁজর। যে কারণে, আজীবন যন্ত্রণা তাঁর সঙ্গী। অর্থাৎ, যা হওয়ার ছিল। তোমার পিঠে ওটা কী? /সারাদিন তোমার পিঠে বসে থাকে পাখি/ তুমি কি আমার চেনা কেউ? /সবরকম গন্ধ থেকে আমি দূরে আছি/ তাই তোমার পিঠে পাখি পুড়ছে [সম্পর্ক]

শ্যামল সিংহ এভাবেই তাঁর কবিতায় রেখে দিয়েছেন এক বিশাল ফাঁকা প্রান্তর, শূণ্য স্পেস। যে স্পেসে আসলে মিশে আছে জীবনযাপনের কত অসংখ্য ছবি। সেভাবে ভাবলে তাঁর কবিতা যেন এক ছোট শহরের জার্নাল। তাঁর অনন্য চিত্রকল্প, রূপক ব্যবহার, কত শব্দ না লিখতে চাওয়ায়, সামান্য আয়োজনে অনেক কিছু বলে দেওয়ার যে মুন্সিয়ানা, তা একান্তভাবে তাঁর নিজস্ব অরজন। একইভাবে, বাংলা কবিতায় স্যুররিয়ালিজমের এমন সার্থক প্রয়োগ, প্রায় হাতে গোনা। তাঁর তৃতীয় ও শেষ কবিতাবই ‘জেগে উঠছেন বাঘাযতীন’ প্রকাশ পায় ২০০৩ সালে, তাঁর মৃত্যুর ঠিক আগে। সেখানেও তাঁর এই কবিতা ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রকাশ লক্ষ্যণীয়। আকাশের মতো গম্ভীর নয়/ বাতাসের মতো জরুরি নয়/ তবুও, একটি গান পাতা ঝরাতে ঝরাতে / ফুরিয়ে গেলে / নদীর জন্ম’ [নদীর জন্ম] পাঠক, আরও একবার খেয়াল করুন, মাত্র পাঁচটি পংক্তিতে, আঠারোটি শব্দে কীভাবে একটি কাহিনি রচনা করা যায়। আমরা আগেও বলেছিলাম, এ কবিতা জীবন যন্ত্রণা দেয় শুধু, শ্যামল সিংহ সে যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। তাই প্রথম বইতে যেমন লিখেছিলেন পাতায় পাতায় যতখানি গিয়েছিলাম/ ঠিক ততখানি ফিরে এসেছি সুতোয় সুতোয়’ [চার্লি], তাঁর দ্বিতীয় বইতে সে যন্ত্রণার আখ্যান হয়ে উঠেছিল তীব্রতর। পাখির ডানার নীচে/ আমি ছুটি কাটাচ্ছি/ সমুদ্র এসে ধুয়ে দিচ্ছে আমার পা/ প্রহরীর গলায় থমথম করছে রাত/ যুবতী ঠোঁটস্বপ্নেখুঁজছে বৃষ্টি/ আঁধারে পেকে উঠছে যুবকের শিস্‌/ মাছের আঁশ ছড়িয়ে পড়ছে গোপনে/ প্রহরীর গলায় শেষ হয়ে আসছে/ আমার ছুটি’ [ছুটি] আর তৃতীয় বইতে এসে তাঁর সেই যন্ত্রণার ধারাবিবরণী হয়ে উঠল যেন যুদ্ধ শেষে এক ক্লান্ত সৈনিকের গান। শত্রুকে নিমন্ত্রণ করেছি/ পাতার উৎসবে/ শত্রুপক্ষ থেকে প্রস্তাব এলো/ নদী বদলের/ রক্তাক্ত মেঘেতে/ আমরা দেখছি পরস্পরের ছায়া’ [নিমন্ত্রণ] এ কি শুধুই এক সমাপতন, যে, এই বই প্রকাশের মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই কবি শ্যামল সিংহ নশ্বরতা নামক সেই অমোঘ ময়ুরটির ডাকে সাড়া দিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন কোথাও !

মাত্র তিনটি প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ছাড়াই কবি শ্যামল সিংহ রেখে গেছেন আরও অসংখ্য অপ্রকাশিত কবিতা। সম্প্রতি, ২০১৪ সালের কলকাতা বইমেলা উপলক্ষ্যে জলপাইগুড়ির ‘এখন বাংলা কবিতার কাগজ’-এর উদ্যোগে প্রকাশিত ‘নির্বাচিত শ্যামল সিংহ’ বইটি কবির সেই সমস্ত গ্রন্থিত কবিতা ও তাঁর অপ্রকাশিত কবিতার এক নির্বাচিত ও প্রামাণ্য অংশ আমাদের সামনে এনে দিয়ে, নতুন বাংলা কবিতা পাঠককে আবিষ্কারের আনন্দে মগ্ন করেছে। এই বইয়ের সূত্র ধরেই তো আমরা পড়ে নিয়েছি তাঁর ‘২০০২(ক)’ নামাঙ্কিত ডায়েরির সেই কবিতাটি – রোদের পররোদ উল্টিয়ে গেলেও/ খুঁজে পাবে না মাকে/ মায়ের লেখাগুলি লক্ষ্য করলে/ বোঝা যায় কোন স্টেশন থেকে/ ছেড়েছিল ট্রেন/ রক্তে রক্তে ভিজে যাচ্ছে বইয়ের পৃষ্ঠাগুলি’  অথবা ‘২০০২(খ)’ ডায়েরিতে লেখা সেই কবিতা, যা এই ‘নির্বাচিত শ্যামল সিংহ’ বইয়ের শেসতম মূদ্রিত কবিতা, যা আসলে শ্যামল সিংহের কবিতাচেতনা বিষয়ক না লেখা গদ্যটি – মদের বোতলে পরে আছে/ পুরানো সংসার/ আজ উঠছে শুধু মৃত ঘোড়ার কথা/ প্রতিটি বেশ্যারাতকে/ ঘোড়ার পিঠে রেখে/ কবি চলে যায়/ শব্দের আড়ালে/ কবি পড়তে থাকে নিজস্ব আঁধার এভাবেই জীবনযাপনের মোড়কে আসলে তিনি মৃত্যু লিখে গেছেন। শ্যামল সিংহের কবিতা দর্শন তাঁর এই যন্ত্রণা যাপনের দর্শন।

শ্যামল সিংহের কবিতা বিষয়ক এক গদ্যলেখায় কবি বিজয় দে লিখেছিলেন ‘…এত জটিল এত সরল এত পোয়েটিক যে মনে হয় কবিতার প্রকৃত দুধ খাচ্ছি। এর কি কোনো অনুবাদ হয়? আর শেষ পর্যন্ত প্রকৃত কবিতা তো তাই, যা অনুবাদ-অযোগ্য। আপাত অর্থহীন এই লাইনগুলির ভেতরে যেন চোরাঘূর্ণি, জলের ভিন্ন মাত্রা, লুকিয়ে আছে যা ডুবে যাওয়ার আগে কোনোদিন বুঝতে পারবো। … ঘরের বেড়াল কিংবা বনের বাঘ যেমন পায়ে পায়ে, গুটি গুটি এগিয়ে নিঃশব্দে, জিরো আওয়ারে উপহার দেয় সেই বিখ্যাত লাফ, ঠিক শ্যামলও তেমনি, দু-চার লাইন ধরে হাঁটি হাঁটি পা পা এগিয়ে শেষ এক বা দুই লাইনে কবিতার টুঁটি টিপে ধরে এবং পাঠকেরও। এটা এক ধরনের মারাত্মক শিকার ও শিকারীমনস্কতা ছাড়া সম্ভব নয় …’ তাঁর কবিতা বিষয়ক এই-ই হয়ত শেষতম কথা, আর এ কথা আমরাও অনুভব করি। আর ঠিক সেই কারণেই, আরো একবার ‘এখন বাংলা কবিতার কাগজ’ ও ‘নির্বাচিত শ্যামল সিংহ’ বইটির প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেককে বাংলা কবিতার পাঠক হিসেবে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে পড়ে নিতে চাই কবিকেই, যিনি বলেন, মাঝরাতে/ কোথা থেকে ভেসে আসে/ ‘মা-কে তুলতে পারছি না’/ ফুলের বাগানে/ মা আঁধার হয়ে গেছে/  কোনো কিছুই সহজ-সরল ছিল না/ আমরা কেউ বুঝিনি/ গান চিরকাল একা’

 

কৌশিক চক্রবর্তী। কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। চারটে কবিতার বই বেরিয়েছিল।
চাকরি করেন। গান আর ছবি আঁকা নিয়ে সময় কাটে। এছাড়া নানারকমের ভুলভাল খোয়াব দেখে মাঝেমাঝেই সবকিছু তালগোল পাকানোতে সিদ্ধহস্ত।
দুটো উপন্যাস লিখে ফেলেছেন। তৃতীয়টি ভেতরে ভেতরে গুমরোচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *