অস্থিচ্যূত গ্রন্থিচ্যূত

ফেব্রুয়ারী – জুন ২০১২

দোলনচাঁপা চক্রবর্তী


ঝড় এলো মৌরি বাগানের চিবুকের তিলটির মতো। আরেকটি অসমাপ্ত মৃত্যুযাপনায়,

ঈশ্বরের জেলখানার দেয়াল নরম হয়ে আসে।

গরাদের নিচে যে মৌলজীবন – তার ঘামরক্তকাদামাটি, তার সরীসৃপ গতি –

সমান্তরাল পুঞ্জপথে আগ্রাসী হরিণীর মতো, ছুটে গেলো।

অন্ধকারকে প্রদীপে রেখে আলোটি যেভাবে চিরকাল ছুটে চলেছে,

নির্জনকে হার মানানোর দুরাশায়।

স্বস্তি ধর্ম ; স্বস্তিই বিষাদের উৎস

এ বিষাদ বংশপরম্পরায় উঠে এসে মৌনী হয়েছে

সাধু বললেন, পুনর্ভব !

কিভাবে খন্ড খন্ড হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে

মহাশক্তিময় ; কৃষ্ণ গহবরের ধারণার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে

নিবিড় বস্তুখন্ডে পরিণত হচ্ছি ;

ত্বরণ অস্থিমজ্জাগত  শোক বিলুপ্তপ্রায়

 

লাবণ্য বসিয়াছে মূর্তির সম্মুখে,

কহিতেছে – আমি তার ছায়া

শতবর্ষাধিক কাল নিমিত্ত হইয়া আছি

এইবারে মৃন্ময়ী হইতে চাই

মৃন্ময়ী হইবার কত সুখ, অপত্যের অধিকার ভোগ করিবার

বাসনা জাগিয়াছে। হে পিতা ! হে মহাজীবন,

তোমার অংশ দান করো

আমার জন্মটি পরমাত্মায় পুনঃপ্রবিষ্ট হউক

 

অস্থিমাংস জুড়ে বাসনায় নিমজ্জিত ঢেউ

নিখাদ মিথ্যে দিয়ে আরেকবার, হে মহাজীবন,

রোদ ভাঙো, রশি খোলো –

নৌকোতে এক এক করে সবক’টি প্রস্তুতি রাখি

পরের সুরাপাত্রটি মূর্ছনার বিনিময়ে বালসাম্‌ হোক

 

অ্যাজটেক মানুষের শ্রমক্ষমতার কথা তো জানলেন আপনি

আপনার ভেতরে যে সাতটি চক্র রয়েছে, এবারে তাদের তবে জানুন

কুলকুন্ডলিনী ঠিকরে উঠলো, জানলার আলোয় – গরাদ থেকে যে

তেল বেরোচ্ছে গো  আমাদের সাতজনের যে চর্মরোগ হবে

একটু সাবধানে রাখ, পুজোয় নৈবেদ্যে ধ্যান কর আমাদের

তোমার তিন নম্বর চোখটা খুলে দিই এসো

নিঝুম করি তোমায়   নাভিচক্র অলীক স্পর্শে উঠোন করুক

গোটা ছয়তলা বাড়িখানি।

 

এইরকমই এক মৃত সকালে আমার জন্ম হল

কার্ফু লেগেছিল শহরে, আমার ডরপোক পিতা

আমাদের ফেলে পার্টি অফিসে চলে যান।

কমিউনে মা’র জায়গা হয়নি। সদ্যোজাত কমরেড,

জন্মের আগে অপরাপর ঘটনাবলী জেনেছিল

সদ্যমৃতদের থেকে।  তাই তারা অবাক হয় নি কেউ

দু’দিন পরেই মা হসপিটাল থেকে বাড়ি চলে আসে

তিনতলার বারান্দায় কাপড় শুকোতে দেয়া আলগোছটুকু

আর, কেরোসিনবিহীন স্টোভের পুড়ে যাওয়া পলতে

বৃষ্টিবাদলায় ছাত থেকে জল চুঁয়ে পড়াও যা ভেজাতে পারবেনা

 

নিদাঘ গ্রীষ্মের কাছে মদ মাংস ও রুটির মানত –

ঋতুটি একদমসে ভুল হইয়ে গেল দিদি,

গ্রীষ্ম নয়, শীতের সাপার ছিল সেটা

বাবাকে এবারও আমার মালপোয়া বানিয়ে দিয়ে আসা হয় নি

সমস্ত মালপোয়া ও শীতের স্মৃতিগুলোকে বাবা ভুলে যেতে চায়

ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার জন্য এক জীবনই যথেষ্ট

এ ক্রুশের যত পেরেক, রক্ত আর হাতের তালুগুলি তোমাকে দিলাম, প্রিয় কন্যা

হাতের রেখায় আরো জীবনের সন্ধান পাবে,

যে জীবন পিতামহ মাতামহদের

 

 

এই গরল, যা জীবপরম্পরায় তোমার, তুমি অনামিকায় রাখ

ধীবরদের রক্ত শীতল হবে

নদীর বিকেলগুলো রাধার আলোয় মাখামাখি

রাধাদের ঘামরক্ত যাবজ্জীবন

অংশত মেঘলা সিঁড়িতে রুয়ে দেয়া দেবদারু

বাঘছালের মতো, দেবদারুরও একটি স্পর্শনীতি আছে

সে তোমাকে দেখে, আর তুমি গলাজলে নেমে যাও

সে তোমার আগুনকে ছিনিমিনি খেলে

কোথায় পালাবে । এ জীবন হরিণীর আঁচলের

মোমবাতিরও নয় ?

ছাই থেকে গোলাপের বাষ্প এল  বিষ এল

ফিরে ফিরে আঙুল এসে গেল

পিষ্ট হও চাপে, পিষ্ট হও প্রত্যাশা হও নেহাৎ অল্প দামে

 

সেতারটার কথা মনে আছে বাবা, তোমার ?

কত বয়স অবধি বাজিয়েছো তুমি?

তখনো কি গান্ধীজি বেঁচে ? সত্যাগ্রহ কীভাবে কাটিয়েছিলে ?

গুজরাতে গিয়েছিলে কবে? প্লেগগ্রস্ত গ্রাম থেকে কী অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছিলে ?

এইসব তোমার জার্নালে লেখা নেই

আছে শুধু ফলজল অধ্যুষিত গ্রামগুলির কথা

এক্ষণে সব কথার পেশকশ সমাপ্ত হইল

আমি প্রস্তুত হতে পারি নি কন্যা,   তোমার বিমুখ চোখদুটি আমি নিয়ে যাই

তুমি আমার সমাপ্তি থেকে দুনিয়াকে দেখো

যেমন কখনও, সৃষ্টি থেকে দেখেছিলে

 

সৃষ্টির মহিমাগুলি দিনশেষে নক্ষত্র হয়ে যায়

রজস্বলা রমণীরা মৃৎপাত্রে বুড়ো আঙুল ছুঁইয়ে তা পবিত্র করে দিল

এই পবিত্রতায় প্রদীপের শিখাটি জ্বলবে। সন্ধ্যার আগেই,

নদীর ওপারটি দৃষ্টিগোচর

স্পর্শগন্ধ নির্বিশেষে সকলকে দুটি আনা দিতে হবে

নইলে নৌকোর ছই, পাটাতন সব গলে গলে যায়

পাল নামিয়ে নোঙর করেছে সন্ত – এসো, গুরুনাম কর

দক্ষিণা দেয়ার প্রয়োজন নেই, সদ্গুরু কি জয়গান কর

 

রাত জেগে শনির বলয় দেখে যে ছেলেটি

ভিজে শুকতারা থেকে তার জন্য একপ্রস্থ শান্তি বর্ষিত হোক

ও তোমার মেয়েকে স্বাধীনতা দিল, বাবা

অতএব, গা ধুয়ে এসে একসাথে সান্ধ্যপ্রার্থনায় বসো, প্রতীয়মান হও

মোমবাতি জ্বলুক – পৃথিবীর নীড় প্রদক্ষিণ এখনো আলোকবর্ষ বাকি

আমাদের সাত পাক কি ভাবে যে সারা হয়ে গেল

প্রভুমীশমনীষমশেষগুণং গুণহীনমহীশগলাভরণম্।
রণনির্জিতদুর্জয়দৈত্যপুরং প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুম্‌॥

 

রাজা যযাতিও এক কল্পতরুর সন্ধানে ছিলেন

নিজপুত্রের বক্ষচক্রে তার অলীক সন্ধান তাকে অমৃত দিয়েছিল

 

আমার পঞ্চেন্দ্রিয়তে গোটা সরগম সাজিয়ে রেখেছি

এস, তোমার ধুন ভাব, সুরটি তুলে নাও

কালভৈরবের মন্দিরচত্বর পায়রার বুলিতে পরিপূর্ণ

বড়ি মিঠি বোলি ছে আম্মি, দো গো রোটি দ্যায় দিহি  –

এইভাবে মোহ স্পর্শ করল তোমায় –

তুমি আচ্ছন্ন হলে আমার একাংশ অন্ধকার হল

উজান ঠেলে আসল আমার বুক অবধি

কিন্তু পাখি ও পরিব্রাজক আমায় প্রশ্ন করে না, ফলত,

আমার অস্তিত্বের ভেতর তাদের নিমজ্জন আছে

তুমি মোহাচ্ছন্ন হও, গৃহী হও, নিমজ্জন ভুলিয়া বিসর্জনমুখী হইয়া যাও –

তৎসত্ত্বেও তোমার দুর্দিনে আমরা তোমাকে গ্রহণ করিব

 

দাই কিংডম কামস, দাই উইল বি ডান

এসো, তোমার রাজত্ব গ্রহণ করো – তোমার ইচ্ছাপাত্রটি সুরভিত হোক

আমি হাঁটতে হাঁটতে ম্যালের চৌমাথায় চলে যাব

পুরনো গির্জায়, ফ্রেস্কো বানাবো প্রতি রবিবারে প্রার্থনার পর

এইভাবে শিকড় ক্রমশ গাঢ় করে রুখে দেব ভূমিকম্প

তারপরে, তোমার যৌবনের আকাঙ্খা শেষ হলে ফিরে আসব

সঙ্গে থাকবে তোমার শিশুপুত্রটি ; ওকে পালন করব একা

তুমি স্বেচ্ছানির্বাসনে যাবে

আমাদের মাঝখানে বরাক উপত্যকা, মীমাংসা চেনাবে প্রজাদের

 

তুমি আমার কলঙ্ক হতে পার, আমি তোমার প্রচ্ছদ হব

তোমার মেরুদন্ডের শাখাপ্রশাখাগুলি আমার আঙুলে পরিপূর্ণ

একটি নিভৃতি প্রস্তুত হচ্ছে এইভাবে,  তুমি উত্তাপ দাও  আমি সমুদ্র দেব

– অতঃপর, অনন্তশয্যায় শায়িত জীবাশ্মকে সামান্য স্পর্শ করে

আমার জরায়ুতে স্থাপন করলেন শ্যাম; আমি অনন্তমুখীন হলাম

 

স্বর্গ ও পাতাল বয়ে নিয়ে গিয়ে নিজ নিজ প্রস্তরখন্ডে রেখে এল হারকিউলিস

মর্ত্য আমার করায়ত্ত হল।

প্রস্তরস্থাপনার শব্দ পৌঁছেছে অরণ্যের তলদেশে,

অমৃতের পুত্রকন্যারা শিকড় বিছিয়ে স্থির

ওই নভোলোক ঘিরে যে দুর্দম বাসনা নিয়ত বহমান

সুঠাম আগুনে তার সর্বাঙ্গ প্রলুব্ধ মেঘের মতো বর্ষণোন্মুখ

লেলিহান শিখাগুলি ক্রমশ বিস্তারে উন্মোচিত

দাঁত, নখ, জিভ ও সম্পূর্ণ মানবশরীর ঘিরে সরীসৃপ গতি

সমাধির প্রেক্ষাপটে,

এইসব নিতান্তই একটি উল্কাপাত অপেক্ষা বেশি কিছু নয়।

 

উল্কাপাত যা আসলে কল্পনা

ওই যে মাটির মধ্যে প্রকান্ড গর্ত তৈরি হল, পুড়ে গেল

আশেপাশের ঘাসফুল সব – ওখানে কিছু ছিলোই না কখনও

ভবিষ্যতের শিশুরা এখনো খেলছে ওখানে – নাগরদোলার

মৃদুমন্দ গতি, উড়িয়ে দিচ্ছে নিচে দাঁড়ানো মেয়েটির চুল

কক্ষচ্যূত উল্কাটি এইসব দেখে অন্য প্রান্তরে ঘুরে গেল

স্তিমিত তারাদের নামে রাস্তা খোদাইয়ের কাজ শুরু হয়নি

 

যা কিছু শুরুই হল না, আমি সেইসব স্বপ্নাদেশে পাই

বাবামা’র দেশ-গাঁ ও তার লুন্ঠিত মাটির তালাশ

আমায় আচ্ছন্ন করে।

এইসব রাত আমি না ঘুমিয়ে জেগে ছিলাম

মিথোলজির রাতগুলি এ’রকমই স্বপ্নসম্ভব

এভাবেও যাপন ও মিথের

এভাবেও ইতিহাস ও মিথের যৌথযাপন ভেঙে যায়

 

তোমার দৃষ্টিও স্বপ্নাতুর বাবা

তবে তুমি ফিরে যেতে পারতে না, আমিও পারি না

ভাঙা আয়নার ভেতরে যে অহমটি দাঁড়িয়ে রয়েছে

কি ভাবে বোঝাবে তাকে, এই প্রতীক্ষা যথার্থ নয়

আসলে স্বপ্নসম্ভাবনা, অতীতের কিছু কিছু আখ্যান লেখে

যেমন এই ঝাড়বাতি ঠাকুমা’র খুব প্রিয় ছিল অথবা ঠাকুরদা’

এই ছড়ি হাতে এ’রকম ভোরে দীঘির ধারে প্রাতর্ভ্রমণে যেতেন।

আমি ঝাড়বাতি, ছড়ি দীঘি কিছুই পাই নি, ঠাকুরদা’কেও নয়

ঠাকুমা আমায় শুধু ফুল তোলা দিয়ে গেছে

ফলত বিষাদবিজ্ঞান – আমি স্নায়ু দিয়ে মুছে হেঁটে যাই

পরের প্রজন্মের কাছে।

 

নিবিড় ঘন আঁধারে কে জ্বলতে জ্বলতে কাঠঠোকরা হল

ধ্বসিয়ে আনলো মরণরে, তুই আমার কে ছিলি গত জন্মে ?

কে আমার ছাতে হেঁটে বেড়ায় এখনো

ওই প্রাসাদের মত বাড়ির ধ্বংসস্তূপ নিংড়ে দিদার স্মৃতিচারণ

এক বিষাদাবর্তের দরজা খুলছে

ছাতের অন্ধকারগুলোতে ফাটল ও অশ্বত্থের ম্রিয়মাণ চারা

নিরাময়রূপিণী ওই অন্ধকার আমার ভেতরে

শালবনের ভেতর দিয়ে বাকি সবাই জ্যোৎস্না রাত হয়ে উঠল।

 

ক্রমশ এক দীর্ঘ প্রাচীরের সিংহদরজার সামনে এসেছি

তার ভেতরের মায়াগুলো ক্রমশ রূপক হচ্ছে

পায়রার পুরনো বাক্স থেকে সদ্যজাত শাবকের চিৎকার

আমাদের খিদে পেয়েছে, আমাদের কান্না থামা

আমাদের উদ্বাস্তু কলোনির নামধাম মুছে গেছে

সরকারি হিসেবের খাতা থেকে। আমাদের সম্বল এখন ভাঙা ওয়াগন

ছেঁড়া শাড়ির হোর্ডিঙে পার্ফেক্ট বডি, সাইজ জিরো

ভাঙা রেলগেট পেরিয়ে ওপারে আসিস রাতে, আরও গল্প দোব

শুধু পাঁউরুটি আনিস একটা গোটা – আটার নয়, ময়দার সাদা নরম

খেতে দিলে আমিও সফেদ রূপে জ্বলে জ্বলে ধ্রুবতারা হই

 

এই রাত যেন বসিয়া আছে বাতাসে, হে শ্যামলসুন্দর

মৃদুমন্দ গ্রীষ্মের বাতাস, ফুরাতে চায় না। তুমি দারিদ্র উপেক্ষা করে

তাহা অনুধাবন কর। ঝর্না নয়, উইন্ডমিল ভাব

উইন্ডমিল একা বাঁচবার রহস্যগুলি জানে

 

 

তুমি তো জানোই বাবা, যে কোন উৎসবে খুশি হতে আমি

কি আপ্রাণ চেষ্টা চালাই ! আজ যেমন ভ্যালেন্টাইন’স ডে –

সবাই গোলাপ কিনছে । আমিও ফুলের ঝুপড়ির সামনে দু’দন্ড দাঁড়িয়ে

শিঙাড়ার দোকানে চলে এলাম

এ বাদে খুশির কোন সহজ উপায় আমার মাথায় আসে না

 

 

ট্রেন চলে গেলে লোহালক্কড় ঝেঁঝে ওঠে, না-বলা কথার ভিন্নতায়

যে ঠোকাঠুকি, রিকশায় যাওয়ার সময় সেইসব ভুলে যেতে চাই

যেন প্রাণবায়ু দু’হাতে জড়িয়ে ধরে হামি দেয়, আমার মেয়েরা

স্কুলের গল্প বলে – কি কারণে টিফিন খেতে দেরি হয়েছিল,

সেটা শুনতে শুনতে আমি আবার স্কুলবাসের জানলায় বসে পড়ি।

রাত পোহানোর মুখে এই বাসগুলো বিপিও অফিসের গাড়ি হয়ে যাবে,

আর তিনটে বাজার আগেই নামিয়ে দেবে আমাকে

ঘুমন্ত ফ্ল্যাটের সামনে। খোপে খোপে পায়রারা বাদে কেউ

এই ফিরে আসা জানতে পারলো না

 

আই বেগ ইয়োর পার্ডন মামা

তোমার টেবিল গুছিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে

নুড়ির টুকরো পড়ে সমুদ্রের ধারে,

স্পষ্ট হয়ে উঠছে ঝিনুক ও শাঁখের আলোমাখামাখি

জানলায় দাঁড়িয়ে রয়েছো ঘুম ভেঙে

আমায় ওই আলোময় সমুদ্র পার হতে হবে

জলপাই বাগানের আলো খানিকটা এ’রকম, মা’

ক্রুশবিদ্ধ যিশুর পায়ের ওপর এই জলপাই আলো পড়েছিল

তাতে পিঠের ব্যথা অনেকটা প্রশমিত হয়। এইসবই আমি জেনেছি

মেপল সরণীতে একসাথে হাঁটার সময়, দীর্ঘ বার্তালাপ থেকে

 

সে’সব কথাবার্তা আমাকে ধর্ম নিয়ে প্রভাবিত করেছিল

যা অদূর ভবিষ্যতে শ্রীচৈতন্য বলবেন

সারা গৌড় শুনবে ও শ্রীকৃষ্ণের উপাসক হবে

হরিনামে বদলে যাবে একটা সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাস

 

চেতো-দর্পণ-মার্জনং ভাবমহাদাবাগ্নিনির্বাপণম্।
শ্রেয়-কৈরব-চন্দ্রিকাবিতরণং বিদ্যাবধূজীবনম্॥
আনন্দম্বুদ্ধিবর্ধনং প্রতিপদপূর্ণামৃতাস্বাদনম্।
সর্বাত্মজ্ঞাপনং পরং বিজয়তে শ্রীকৃষ্ণসঙ্কীর্তনম্॥

          কৃষ্ণনামই জাগতিক জ্ঞানের আধার। জগৎ সেই নামের মহিমায় পূর্ণ। নাম সংকীর্তন করে তুমি অক্ষয় জ্যোৎস্নার অংশস্বরূপ হলে। তোমার হৃদয়ে জমে থাকা ধুলো পরিষ্কার হয়ে আবার তার স্বচ্ছ রূপ ফিরে এল। সেখানে ভাবের আয়নায় কৃষ্ণের প্রতিবিম্ব দেখা যায়। এই জন্মের শুদ্ধতায় পা ফেলে তুমি আবহমান বৃত্তে ফিরে গেলে।

          এই প্রত্যাবর্তন নৌকো, মাঝি ও নদীটির জন্য নিয়ম। যে ফিরে গেল, তার জন্য নিরাময়। যে রয়ে গেল, তাকে সব সয়ে নিতে হবে। সে ঝরে পড়া কাঁঠালপাতা সরিয়ে রাখবে বাগানের এক কোণে, কুয়ো পরিষ্কার করবে ঝকঝকে জলে তার প্রতিবিম্ব বেয়ে উঠে আসবে গোল মাথার সাপ।

          সমস্ত যাতায়াত শেষ হলে প্রতিবিম্ব আবারো স্থির হল। কিন্তু যে স্থির হল, সে কেবলই প্রতিবিম্ব। কেননা কুয়োর জলে কেবল মুখই দেখা যায়। ফলত, পায়ের আঙুল নাড়ানোর কম্পনটুকু ওই জলে তরঙ্গ তোলে না। অর্থাৎ, আমার ভেতরে সম্পূর্ণ শান্তি নেই, সম্পূর্ণ অস্থিরতাও নয়। কিন্তু কতটুকু কী আছে, সে বিষয়ে কেবল আমিই জানি। এইভাবে আমি ভাবের আয়নাকে ধোঁকা দিলাম। সেখানে শ্রীকৃষ্ণের প্রতিবিম্ব আমাকে শান্তি দেয়ার অপেক্ষায় রইল। আমি সেদিকে দৃকপাত করলাম না। সয়ে নেয়ার মত মানসিকতা এখনও আমার তৈরি হয়নি। এখনও আমার রাগ হয়, ক্ষোভ হয়, চোখে জল আসে। খিদের মুখে, ভাতের একেকটি গ্রাস আমার খুব বেশিমাত্রায় মানুষ থাকার ইচ্ছেটুকুকে জড়িয়ে ধরে থাকে। আমি সে বাঁধন কাটাতে পারি না। সেরকম ইচ্ছে হলে, আমার কাঠের আগুনে ভাত হওয়ার গন্ধ মনে পড়ে। আমি কাঠের কথা ভাবি। জল থেকে মুখ ফিরিয়ে গাছের কাছে ফিরে যাই।

 

তোমাকেও বাবা, বারান্দার দরজায় রোজ দেখতে পাই,

হাতে কমলালেবু, ছাঁট আসছে বৃষ্টির  –

তুমি কিছুতেই ঘরের ভেতরে ঢুকে আসছ না

অথচ বাদামপাহাড়ের অক্লান্ত কয়েকটি টুকরো তুমিও পেয়েছ

তুমি পাঁচমারির জঙ্গলে ঢুকেছিলে নাগপঞ্চমীর রাতে

সেটা কমলালেবুর মরসুম –  এত সুবাস যে,

কমলা রঙের খুচরোতে আমার কোল ভরে গেল

নুড়ি ও পাতায়,   জলের বিস্তার হোক বা বসন্তের আলপিন

ঝরে পড়ার চিহ্ন থেকে যায়।

 

এগোলেই লাগছে পায়ে – হোঁচট আসছে খুব

পিচের রাস্তা ছেড়ে বাঁ – দিকে ঢুকলাম

তুমুল বার্চের ফাঁকে পৌষের কেবিন

এখন আলোর মরসুম নয়;  বিভিন্ন নিরক্ষর মাটি

আমাকে শব্দ দিচ্ছে তবু,  রাতের পর রাত

চারপাশ গাঢ় হলে ভাষার ডাক অবিরাম

ধ্বনির আদলে তার সদ্যোজাত চোখ

তুমিও কি ভূমিষ্ঠ হবে?

দ্বিধাকে ভেব না। এই তুমি আমাদের নও

আমাদের শ্রেণীতে কোন কলরব ছিলো না

নদীর ঊরুতে বসিয়া যে পক্ষিকুল

শ্রাবণ ভাবিয়াছে, তুমি তাহাদেরও কেউ নও

তবে তুমি কোত্থেকে এলে ? কোথায়ই বা যাবে?

উজান বাইছ কত মরণপণ টানে

ভাটাকে রাখছ লগিতে । ভুলিয়াছ,

এ’ জন্মে তোমার মাঝি হইবার প্রয়োজন নাই

 

The voice of the Lord is upon the waters: the God of glory thundereth: the Lord is upon many waters…

 

উপসত্তায় নিবিষ্ট হচ্ছি আমি ও আদিম সেই আলো

ভাষ্যের জল ভাঙছে ; অখন্ড স্রোত

ভাসিয়ে চলেছে বৈঠাটি ।

মানুষের অবশিষ্ট,  আরো দূরে ফিরে যাবে

স্লুইস গেট খুলে দেবেন স্বয়ং ঈশ্বর।

ফলত, নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত আমরা

আলো এসে লাগছে আমাতে – মাস্তুলে ওঠো গো নাবিক

বলো, তীর দেখা যায় ?  নবি কি বসেছেন মানচিত্র খুলে?

কাফিলা কোথায়, কী ভাবে সাজানো, কোন্‌দিকে যাবে, সব বলো

কতকিছু বানালাম এই দ্বীপে – গুর্‌দোয়ারা, সিনাগগ্‌

মন্দির, গির্জা ও মসজিদ – ঈশ্বরের পা কোথাও রইল না

 

তবু, সান্ত্বনা। আমি ও আমার মতো সমস্ত সন্তানেরা

মায়ের ভেতরে আবারও ফিরে যেতে পারি। এবং পরমাত্মা,

আগুন, ও হাওয়া –

এই হাওয়া আমারই পিতামহী

আগুন আমার পিতামহ

পরমাত্মার মাঝে আমি নশ্বরতম

 

আমার জন্মমুহূর্তে পৃথিবীর অক্ষ থমকে গিয়েছিল

আনন্দে; যেন মুদারায় বৃষ্টির উদ্‌ভ্রান্ত আলাপ –

আমার পায়ের তলায়, বিরামহীন

 

যাবার সময় এই সবইকিছু সাথে নিয়ে যাব

মায়ের ভেতরে ফিরে যাব।

 

The Lord shall preserve thy going out and thy coming in from this time forth, and even for evermore.

 

হে পরিশ্রান্ত নাবিক, অতঃপর, তুমি মাস্তুল থেকে নেমে এস

ঈশ্বর আমার পথরোধ করে রাখলেন। তুমি শুদ্ধ হওনি।

তোমার ঘরের উঠোনে একটি মিক্বাহ্‌ হোক

তোমার ঘরের ভিত গাঁথবারও আগে, একটি মিক্বাহ্‌ বানাও

কী ভাবে বানাবে ? প্রশান্তির জল আনো, যে জল

আমার চোখ থেকে ঝরে ও বিমুখ-প্রবাহিনী নয়।

 

মিশনাহ্‌ এর ছ’টি নির্দেশে তোমায় অখন্ডতা দিলাম

উৎসর্গিত হবার শক্তি ও আনন্দ দিলাম; তুমি একইসাথে প্রপাত এবং অরণ্য হলে।

মাটির শিরা ফাটিয়ে মেঘ আনলাম তোমার জন্য, ও সন্তান আমার

তুমি ভেজো, পরিস্রূত হও – আসন্ন গর্ভের জন্য একটি উপাসনা কর

একটি উপাসনা হোক মৃত্যুর – কেননা এতেই সন্নিবিষ্ট সম্পূর্ণ জীবন

আমিই এর আধার ও তুমি আমাকেই উপাসনা করছ।

 

লা ইলাহা ইল-লালাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শরিকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ইয়ুহি ওয়া ইয়ুমিতু ওয়া হুয়া হাইয়ু লা ইয়ামুতু আবাদান আবাদা

 

এই তওহিদ তিনি আমাকে দিলেন ও আমরা মানুষেরা,

বংশপরম্পরায় তার প্রিয় হলাম।  আল্লাহের অনুগত সন্তান হলাম।

তিনি বললেন, শুধু আমাকেই উপাসনা কর।

আমি একক, এবং আমার কোনো সঙ্গী নেই

সমগ্র সৌরবিশ্বটি আমার সাম্রাজ্য – আমারই গুণ গাও

আমিই স্রষ্টা ; মৃত্যু আমারই নির্দেশ বহন করে

সুসমাচার আমারই প্রশ্বাস নিঃসৃত, আমারই কররেখায় চিত্রিত

আমিই সর্বময়।

 

গ্রহণের প্রতিকূল টানে জল নেমে যাচ্ছে, হিমশৈলে আটকে পড়ছি

একমাত্র তুমিই আমাদের জমিতে ফিরিয়ে আনতে পারো

একটি ইশারা দাও, তোমার আশ্বাসে রাত্রিও আলোময় হোক

আমাদের সম্মিলিত ভয় ও বিশ্বাস থেকে নদীতে উজান আসুক

আমরা তোমার সামনে নতজানু হই

 

The fear of the Lord is the beginning of knowledge.

 

ঈশ্বরভীতিই জ্ঞানের আধার।  এবং, ঈশ্বরজ্ঞানই প্রজ্ঞান।

ক্রমশ নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে নির্মোহ হচ্ছো তুমি

অর্থাৎ আমিই কথা বলছি তোমার ভেতর

তোমার প্রতীক্ষার সামনে দুধ ও মধু নিয়ে পরিস্ফুট কনান প্রদেশ ;

আমাতে আস্থাশীল হও কেননা আমিই তোমাকে বিপন্মুক্ত করব।

 

এই স্থাপনা তোমাকে হাজার বছরেরও পার বয়ে নিয়ে যাবে

প্রজ্ঞান, যা তোমাকে সর্ব ইন্দ্রিয় থেকে বিমুক্তি ও অখন্ডতা দিল,

তোমার আত্মার তৃতীয় নয়নটিকে প্রোজ্জ্বল করবে

এক মেষপালকের ভালোবাসা,

অপর এক শতাব্দীর মেষপালকে প্রতিস্থাপিত হল এইভাবে

মেষগণ বিচরণভূমি থেকে চিনে নিল যষ্ঠি ও বাঁশিখানি

কোমল ধৈবতে প্রবহমান নিরাকারে ভিত বাঁধলে তোমরা।

 

সেই ভিত, যা আমার পূর্বপুরুষ বাংলা অক্ষরে গেঁথেছিল

তুমি ভেবেছিলে, তাদের ক্ষমতা তোমার অনুবর্তী নয়,

এবং বিপথগামী ; আর তাই তুমি প্রতিশোধ নিলে ?

অভ্যুত্থানম্‌ অধর্মস্য

তদাত্মানং সৃজাম্যাহম্‌

যেন, অত্যাচারের একটি পুঞ্জীভূত রক্তপিন্ড ঝরে গেল

পিতৃভূমি ও মাতৃক্রোড় থেকে

দেখো, একটি প্রজন্ম শেষ হয়ে গেল।

আমাদের পিতা ও পিতামহ আজ মৃত।

আমার ও আমার ভাইবোনেদের রক্ত কেমন অনুর্বর, হে পিতা !

ও, একাকী বয়ে যায় চিরন্তনের দিকে

এই নতুন মাটিতে কোনো শিকড়ের জন্ম হল না আজও।

 

যে অন্যায় আমার – সেইগুলি ক্ষমা করে দাও ও যা সম্পর্কে আমি অবহিত নই – সেইসব নির্জ্ঞান অন্ধকার থেকে আমাকে মুক্তি দাও, হে পরম জ্ঞানী, অন্তর্যামী। আস্তাগ্‌ফিরুল্লাহ্‌ !

 

ভালবাসা অবশেষে ভাষাযুদ্ধ পার হয়ে চারমিনারে এল

দু’দন্ডের বিশ্রাম। সিগারেট পুরোপুরি ছেড়ে দেয়া কারুর জন্য –

ফেলে দেয়া সেতু থেকে অব্যবহিত নিচে, জলের ওপর –

তাকে কি মেনে নেয়া বলা যায়? অথবা আরেকটি নিপুণ সংগ্রাম

 

ওই যে ট্রাক, হাইটেনশন টাওয়ারকে বেড় দিয়ে চলে গেল

গ্রামটি সদ্য স্নান সেরে উঠেছে যেখানে – ঘুরপথে গেলে

নদীটিও ওখান দিয়ে যেত, অথবা বারান্দার ছায়া

 

নেমে যেত ওইখানে। এইসব ও আরো যত গ্রামীণ রূপকথা

রেখে গেছ, বাবা, আমি সে’সব থেকে রীতিমত বিচ্ছিন্ন বোধ করি

ওই জলে আমি আঙুল ডোবাব কেন? সে আমার কে হয়?

আমি তার কে ? কেন যাব? কেন ফিরে যাব?

দীঘির অবেলায় আমার স্নান কেন রেখে আসব বলো?

ওখানে তোমার একটা ছায়া রাখা আছে

সেইটা আনতে শুধু কোনদিন যাব

 

জাফরের দাদির মত পুরোনো মাছগুলোও তোমার বাল্যকাল জানে।

ইট’স আ টেল টোল্ড বাই অ্যান ইডিয়ট

পঞ্চাশ বৎসরেও বৃদ্ধ নতুন দেশটিকে মেনে নেননি

টু হেল উইথ ইয়োর ভিটা !

পরিস্থিতি এখনো ফুল অব সাউন্ড অ্যান্ড ফিউরি –

আগুন তো থাকবেই, প্রচুর ঘরবাড়ি পুড়েছে –

খেতখলিয়ান, মন্দির – যেমন বাবরি ভাঙল আর,

রামপুরা বদলে গিয়ে ইসলামপুরা হল ;

সীমানা পেরোলেই বিএসএফ ধরে ঝুলিয়ে দিল কাঁটাতারে

স্বাভাবিক, বাট, সিগ্‌নিফায়িং নাথিং !

কারণ, তুমি থাকলে না – আমিও থাকব না

আমার সন্তানরা কি থাকবে ?  এ প্রশ্নের ভার কাকে দিই ?

বরং এসো অনন্তের গান করি, কেননা অনন্তই ঈশ্বর

 

তুমি ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলে না বাবা

ফলে তুমি জানো না, আকাশে ঢিল ছোঁড়ার মতো তুচ্ছ বিষয়ের জন্য

আমাদের সন্তানেরা মরে গেল।

ওদের রঙ রক্ত নাভি থেকে তন্তু নিয়ে  উঠোন বানাব

তার অন্তস্থলে  – ইরাক, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন

এই সেই ভূমি

যেখানে তোমার সন্তান ও তার উত্তরাধিকার ভূমিষ্ঠ হবে

 

They say to their parents we’ll fight for what is right

They say not to worry God is on our side.

 

কয়েক লহমা আমরা একসাথে ছিলাম

আমাদের জন্মের সময় তোমার হাতে রঙতুলি ছিল

কিন্তু সামান্য সময়ের জন্য –

জমাট লাভায় আঁকা ছবিও তো ক্ষয়ে যায়

জলপ্রপাতের উচ্ছ্বলতা কেড়ে নেয় অনাবৃষ্টি ; তেমনই আমরাও।

অল্প সময়ের জন্যই তুমি আমাদের কাছাকাছি এনেছিলে

ফলত শোক করিনি আমি ; নতুন বীজ ও অ্যাজালিয়া রোপণ করলাম

চাঁদ উষ্ণ থেকে গোলাপি হতে হতে আমাদের ক্ষেত ভুট্টা ও ফুলে ভরে যাবে

 

তোমার শোক আমাকে উৎসর্গ করো, প্রিয় কন্যা

রক্তের মত অবিরল কান্নাটুকু মাটিতে থাকুক

সন্তানের ওপরে ওই স্নেহস্পর্শটুকু রাখো

আমি ঈশ্বর হলেও মায়ের মমতার থেকে বড়ো নই

তবু, আমার শান্তিতে তুমি অবগাহন করো

তোমার প্রচ্ছায়া আমার মধ্যেই পূর্ণতাপ্রাপ্ত হবে

 

পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে।
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে॥

 

ভাই দ্যাখ, আরেকবার লাল চেরির মরসুম এসে গেল

সমুদ্রের অন্য পারে পাকা ফলের ঘ্রাণ উদ্‌ভ্রান্ত গৃহস্থের মত

মা বললেন, আমাদের ভান্ডারে দুধ ও মধু শুকিয়েছে।

যবও শেষ হল। শুকনো বালিতে পা পুড়ে যায়।

অথচ ঈশ্বর ভাবছেন, আমাদের জলের প্রয়োজন নেই!

 

রক্তে তোমার মাটি ভেজা।

রক্ত না ধুলে তুমি পাক্‌ হবে না, প্রিয় সন্তান

পাক্‌ না হলে তিনি তোমার প্রার্থনা কবুল করবেন না

রক্ত ধুয়ে এসো, তার উপাসনায় রক্তের স্থান নেই

জল না পাও, মাটি দিয়ে তোমার শরীর শুদ্ধ করো

মাটি সব সময়ই পাক্‌ কেননা তুমি মাটি থেকে এসেছ,

মাটিতেই ফিরে যাবে। তিনি তার বুড়ো আঙুল ছুঁইয়ে

মাটিকে পবিত্র করেছিলেন। উপাসনায় বস

আদম ও ঈভের সন্তানেরা –

নইলে তোমরা সাত বছরের অনাবৃষ্টির অভিশাপ পাবে

 

অন্ধগুহার ভেতরে বৃষ্টি পড়ছে, শোন

কিন্তু তোমরা সেই স্তম্ভকে স্পর্শ করতে পারছ না

ঈশ্বর স্তব্ধ হয়েছেন। এবং, তার নৈঃশব্দের ভাষাটি

আমাদের বিবাদের থেকেও ম্লান ও অভূতপূর্ব

পৃথিবীর নাভি থেকে উঠে আসা সকাতর ধ্বনিটির কাছে

আমাদের বিসংবাদ ম্লান ও ধূমাচ্ছন্ন হয়ে যায়

 

প্রবল দুর্ভিক্ষ ও মহামারী আমাদের বুক থেকে, পায়ের শিরা থেকে, হাতের পেশী ও ঘাম থেকে মাটির গন্ধ মুছে দিচ্ছে। আমরা ফসলের সুঘ্রাণ ভুলে গেছি। চাষাবাদ ভুলে গেছি। জলের অভাবে কৃষিজমি পতিত হলে আমরা আর শস্যের সন্তান রইলাম না। জল নামানোর জন্য মল্লার গাইছি। রক্ত নামছে, মুষলধারে। মেসোপটেমিয়ার পাঁচ হাজার শিশু এক রাতে নিহত – সেই রাতে পৃথিবীর কোনো গান শোনা গেল না। শুধু লাল ধোঁয়া ছেয়ে রইল। ঈশ্বর সেই রাতে নিজেকে অন্তরীণ রাখলেন। সেই রাত, ও তার পরে আরো অনেকগুলি রাত তিনি নিজেকে সরিয়ে নিলেন আমাদের কাছ থেকে। সমস্ত মায়েদের ও কন্যাদের কাছ থেকে। নারী সৃষ্টির রহস্য জানে। ফলে তার কাছে ঈশ্বরের অশ্রুপাত লুকোনো থাকল না।

 

তথাগত’র কাছে এক গৃহী মানুষ আশীর্বাদ চাইলেন। প্রভু, আমি আনন্দ চাই। তথাগত তাকে বললেন, মন থেকে আগে ‘আমি’-কে সরাও। অহম্‌ অর্থ অহংকার। যতক্ষণ অহংকার আছে, ততক্ষণ শুধু সেই আছে তোমার সম্পূর্ণতা জুড়ে। তুমি নেই। তারপরে, ‘চাই’ বলতে ভুলে যাও। চাই মানে দাবি। দাবি করার আগে অন্যদের কথা ভাবো। আগে দাও। দেয়াটাই পাওয়া। এবারে দ্যাখো, তোমার ভাবনা থেকে ‘আমি’ আর ‘চাই’ সরে গেলে শুধু আনন্দই পড়ে থাকে। এখন তোমার সম্পূর্ণ সত্ত্বা জুড়ে শুধু আনন্দ !

 

সুসুখং বাতা জীবম
বেরিণেসু অবেরিণো
বেরিণেসু মনুস্‌সেসু
বিহারম অবেরিনো।

 

আমরা আনন্দে আছি; যারা ঘৃণা করে, আমরা তাদের মত নই

তাদের মধ্যে থেকেও আমরা আনন্দে আছি কেননা আমরা কাউকে ঘৃণা করি না

 (ধম্মপাদ, সুখভগ্‌গা, ১৯৭)

 

মিসাইলের আওয়াজে তথাগতের কথা ঢাকা পড়ে গেল। সেরাজেভো, বসনিয়া, চেচনিয়া, কান্দাহার – ফাঁকা রাস্তাঘাটে ট্যাঙ্কার উড়ে যাওয়ার ধাতব যন্ত্রণা ; পোড়া জমিতে ফাইটার জেট আছড়ে পড়ার আগুন ; আর, অন্তহীন অপেক্ষা শুধু কখন বাঙ্কার থেকে বেরিয়ে আসব, নেমে আসব ট্রাকের পিছন থেকে। কাঁটাতারগুলো সব পুড়ে ছাই হবে আর ডেনভার প্রিয় নদীর পথ বদলে গেয়ে উঠবেন – আমায় ডুবাইলি রে, আমায় ভাসাইলি রে, অকূল দরিয়ার বুঝি কূল নাই রে… ওহ্‌ আবার মাইন ফাটলো, একটা চিৎকার।

 

আবার চুপচাপ সবকিছু। এই নিস্তব্ধতা বড় অসহ্য। তার চেয়ে ওদের গানটা আমিই গেয়ে দিই। পাশতু ভাষার গানটা, যাকে আল্লাহ্‌ দোয়া করলেন। ‘রিন্দ পোশ মাল্‌ গিন্দনে গ্রায়ে লো লো’ – সঙ্গীতেই রাম এবং আল্লাহ্‌ আছেন – গীতা ও কুরআন পাশাপাশি আছে। আজকাল কেবলই বিষাদের গান জন্মায়।  এই পাশতু গানটি ব্যতিক্রম। জন্ম মুহুর্তে এ বিষাদ উপত্যকা থেকে আলোর দিকে পালিয়ে আসতে পেরেছিল। সেই পবিত্র আলোটি স্বয়ং তাকে দোয়া করেছিল। গীতা ও কুরআনের মালিক তাকে দোয়া করেছেন। গানের স্রষ্টাদের তিনি দোয়া করেননি। সশস্ত্র সংঘর্ষে এ যাবৎ কয়েক হাজার কাশ্মীরী নিহত। ওরা আলাদা থাকবে বলেছিল। আমাদের মাটি ওদের চাই না। কিন্তু আমরা দেবই। আমাদের মাটিতে তোমাদের দাঁড় করিয়ে কাঁটাতারে মুড়ে রেখে দেব।

 

এই গান আমি গাই, তোমরা শোনো। শুনতে শুনতে মাটি খোঁড়ো। অনেক মাটি। কাঁটাতার খুঁড়ে ফ্যালো। কেননা মাটি দিয়ে আমাদের সকলকে পবিত্র হতে হবে। তারপরে আমরা উপাসনা করব। আমাদের প্রার্থনায় মাটি আবার জলদায়িনী ও শস্যবতী হবে। আমাদের অভিশাপের দিন শেষ হবে।

 

ক্ষমেমি সব্বে জীব সব্বে জীব ক্ষমন্তু মে
মিত্তি মে সব্ব ভূয়েসু বীরং মজ্ঝং ন কেন্বি মিচ্ছামি দুখ্‌খম্।

শিবমস্তু সর্বজগতঃ পরহিত নিরতভবন্তু ভূতগণ।
দোষপ্রায়ন্তুনাশং সর্বত্রসুখিভবন্তু লোকাঃ॥

 

বিষণ্ণ দানিয়ুবের বুকের ওপর এই যে শেষ চরটুকু জেগে আছে, এখানে আর কোন মসজিদ বা চ্যাপেল অবশিষ্ট নেই। সিনাগগ্‌ বা মন্দির নেই। গুর্‌দোয়ারা নেই। সব ভেঙে, পুড়ে গেছে। জল উঠে আসছে শুধু এই চরটুকুকেও গ্রাস করবে বলে।

 

আস্-সালাতু খায়রুন মিনান্নাউন
আস্-সালাতু খায়রুন মিনান্নাউন

এখানেই ক্ষমাপ্রার্থনায় বসব আমরা। প্রচন্ড রোদের মধ্যেই প্রার্থনায় বসতে হবে আমাদের। কোথাও ছায়া নেই।

শান্তির জন্য প্রার্থনা করব আমরা। পুড়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের ভেতরেই একত্র হতে হবে আমাদের। গস্‌পেল হবে না, মন্ত্রধ্বনি নেই।

 

এখানেই ভোর, হাওয়া ও জ্ঞানের দেবতা কোয়েজালকোলের কাছে আমরা প্রার্থনায় বসব। সূর্যদেবতার কাছে শেষবার প্রার্থনা আমাদের। পরম শূন্য থেকে আবার আনন্দ উদ্ভাসিত হোক। ক্ষিতি, অপ্‌, তেজঃ, মরুৎ, ব্যোম্ সমান ভাবে অধিকার করুক জগৎকে। দানিয়ুবের তীরে ঝুঁকে রয়েছে একটিমাত্র মালবেরি গাছ। তাতে বাসা বেঁধে আছে দশটি সোনালী ডানার কাক। লাল রঙের। ওরা ঈশ্বরের নির্দেশের অপেক্ষায় আছে। পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের পাঁচটি পৃথিবী ধ্বংসের পরে, ডাঙা জেগে উঠলে, ঈশ্বর ষষ্ঠ পৃথিবী তৈরি করবেন। ওরাই তখন আবার আমাদের আলো এনে দেবে।

 

ভূর্ভুবঃ স্বঃ

তৎসবিতুর্ভরেণ্যম্‌

ভর্গো দেবস্য ধীমহি

ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ।।

 

চোখ মেললেন অনন্তনাগ। ঈশ্বর দেখলেন ঝড় আসছে। তিনি কলম তুলে নিলেন। তার চুলগুলি কাঁপতে থাকল। বালিয়াড়িতে লুকোচুরি খেলতে থাকা শিশুদের তিনি মঠের ভেতরে ডেকে নিলেন। সেখানে তখন একটি শিশুর জন্ম প্রক্রিয়ায় বিধ্বস্ত মা’ অবসন্ন হয়ে পড়ছেন। বাচ্চারা তার মাথার কাছে বসল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। তৈরি হল এক অদ্ভুত সুর। ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়লেন মা। আর, মঠের চারপাশ শীতলপাটি দিয়ে ঢেকে দিলেন ভিক্ষু। চোখ না তুলে একমনে লিখতে থাকলেন ঈশ্বর।

 

তোমার গর্ভেই সৃষ্টি ও ধ্বংস প্রোথিত হল

উল্লাস কোরো না নারী, আমাতেই পর্যাপ্ত হও

আমার দৃষ্টির বিপরীতে শুধুই শূন্যতা ও অন্ধকার

তোমাকে গ্রাস করতে চেয়ে এগিয়ে আসছে

সূর্যগ্রহণ থেকে নতুন আগুন তুলে দিলাম তোমায়

সন্তানসম্ভাবনায় তুমি উষ্ণ, সিক্ত ও আঁধারাচ্ছন্না হলে

তুমি জন্মের জন্য আনন্দ প্রকাশ করবে না

মৃত্যুও জন্মস্রোতটির মত তরল ও প্রবহমান

সুতরাং তুমি, গর্ভধারিণী, মৃত্যুর জন্যেও শোক তোমাকে মানায় না

কেননা তুমি জন্ম থেকে মৃত্যু ও এই পুনরাবৃত্তিতে প্রবাহিত

আগুন, হাওয়া, জল ও মাটি থেকে পূর্ণতায় এসেছ

এবং পুনরায় প্রকৃতিতেই নিমজ্জিত হবে

 

বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়

নবানি গ্রুহ্নাতি নরোপরাণি

তথা শরীরাণি বিহায়

জীর্ণানি অন্যানি নবানি দেহী।

 

দোলনচাঁপা চক্রবর্তী। পেশায় অনুবাদক। দুটি কবিতার বই – ঈভ একটি ডালিমখেতের বিজ্ঞাপন (কৌরব), এবং অস্থিচ্যূত গ্রন্থিচ্যূত (কারু কথা)। ইংরেজি আন্তর্জাল পত্রিকা লীলা ইন্ট্যার-অ্যাকশনের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য।

2 Replies to “

অস্থিচ্যূত গ্রন্থিচ্যূত

ফেব্রুয়ারী – জুন ২০১২

দোলনচাঁপা চক্রবর্তী


Leave a Reply to Rajib Ghosal Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *