১৫টি কবিতা

প্রসূন মজুমদার


অন্তিম

অপেক্ষা। দূর্বার পুচ্ছ। শিশিরের জল।

বিন্দুর বরফে শীর্ণ নদীর প্রখর থেকে

ছেনে আনা নরমের গাঢ় নির্নিকেত এই খল

সাম্রাজ্য-রচনা- লিপ্সু ক্ষমতার জতিল সনদ

অতিক্রান্ত পথের পিপাসা নামে ঝর্ণাধারা ঘুম

এই ঘুম সমাজের,অর্থহীন প্রতিষ্ঠা – পারদ

ঝরে যায় হিম থেকে নিম-তিক্ত জিভের কোরকে

কেন জন্ম -নাগরদোলার ঘূর্ণি, কেন ঘূর্ণি গণিত -হিসাব?

কেউ নেই,সত্য এই,নিষ্করুণ নিরর্থের দেশে

একার অক্ষর – শূন্যে স্তব্দতার স্বর ভালোবেসে

শব্দহীন নিশ্চেতনা ফল

বাকি যা নিরর্থ,মৃত্যু, জলের কাজল।

 

জেহাদ

শিকারি চিতার থাবা ব্যথার গণিত
ঢেকে রাখি বিদ্যুতের শীত শিরায় শিরায়।

রাত্রিট্রেন চলে যায় স্নায়ুর মতোই দূরে, হিম
সর্বত্র মহিম,শুধু একা,দেখার জলের দিকে চেয়ে
আন্দোলিত ঢেউশীর্ষে মেয়ে,যেভাবে পুলক আর যতটা ভয়ের
শায়ার ফুলকিকাটা ঘের সময়ের, নতজানু হব না বলেই
লিখেছি চিতার নখে ধার আছে, নান্দনিক নিষ্ফলতা নেই।

 

ধ্রুবপদ

নিঃস্বতা পরম – প্রাপ্তি। কৃষ্ণ, ঘন কয়লার প্রকার।

কয়লারই ভিতরে হিরে। কী আশ্চর্য! দ্যুতি একাকার।

যা রাক্ষস তাই কৃষ্ণ।কৃষ্ণ অর্থে পাপ- আকর্ষক।

রাক্ষসের নখরে তীক্ষ্ণ সময়ের সন্তপ্ত সড়ক।

নাস্তির গভীরে আলো বর্ণচ্ছটাময়।

সমস্ত মিথ্যার বীজে রীতিমতো সত্য-জন্ম হয়।

মিথ খুঁড়ে অতঃপর তুলে আনি সর।

দুধ নয়,জল নয়, চেতনা-তসর।

 

স্তব্ধতা – অভ্যাস

কে কার অভ্যাস? রাত্রি।মনে মনে স্তব্ধতা বাজাই।

প্রকৃতি আমার প্রিয় ফুল।

কোন কালে ঝরে পড়ে ছিল। ঘাসের নাভির ওমে তাই

মনে মনে স্তব্ধতা বাজাই।

বৃত্ত আঁকি স্থূল।

কোন কালে ঘাস মরে যায়।
প্রকৃতিও স্তব্ধতা বাজায়।

ভেসে আসে তীরে ফেরা ঢেউ-এর বুদবুদ।

ধীরে ধীরে মরে যাওয়া আসলে হাওয়ার কাছে যাওয়া

প্রকৃতি ফেরায় সব সুদ।

ফিরে আসে,শব্দহীন, পাতার শিরার মৃদু হাওয়া।

স্তব্ধতায় স্তব্ধতা সাজায়।
বালি ঝরে।বালি ঝরে যায়।

 

বোবা-ভবিষ্য

নন্দিত নৈঃশব্দ নামে আমার ভিতরে তাও বোবা।

একটা, একটা ঘৃণাবল খনিতে গড়ায়।

হিম হয়। জমে ওঠে।তেলের ভিতরে।কয়লায়।

আমাদের পর্যটন ডুবজলে, পাঁকালে, ডোবায়।

নিভৃতে ডোবায়।খুঁড়ি।আগামীর রোদ।

মনে হয় খনিজের বোধ

গাঢ়।রুগ্ন।অসহায়।তবু দূরে

এখনও আকাশ কিছু আলোরঙ, ব্যথার খনিজ খুঁড়ে খুঁড়ে

 

দূরত্ব

দূর দিব্য নশ্বরতা। নুনের ঘামের ভরাজল।

অপেক্ষা আসার। সরু গোপনের গুহার আড়াল।

ম্যাজিক অথবা মন্ত্র। প্রকাশ্যত কুয়োর অতল।

অভাবনীয়ের ঘাসে খসে পড়া অশথের ছাল।

বাদামী, ধূসর,মৃদু কামনার কামরাঙা ফল।

যতটা হলুদ আর যতখানি হরিদ্রাভ লাল

এই কুর্ম চলাচলে তারও বেশি অসম্ভব আশার জাঙাল।

 

চলপথ

বিপথ আমাকে দেখে আঙুল মটকায়।তারপর নেমে আসে পথে। ধুলোর কদম-ফুল, থ্যাঁতলানো পাখিদের ডানা। দেখে দেখে রেখে ঢেকে সড়ক পেরোলে,বিপথ আমাকে নিয়ে নদীপথে ভাসে। কাদাজলে, ছোটনদী। লগি ঠেলে,লগি ঠেলে যেতে যেতে, থেমে
বিপথ আমাকে ঠেলে ফেলে দেয় স্রোতে।

তখনই জোয়ার আসে, নদীও উতল জলে প্রেতিনী – প্রলাপ হয়ে ওঠে।

 

দর্শন

নির্জনতা। ধুলোর আড়াল।

আলতো বিড়াল-ছানা দুলে-দুলে শহরের সড়ক পেরোয়।

এটুকু জীবন আর এইটুকু খেলা।

ধুলোর ওপারে আর যা – কিছু স্থানিক? অবহেলা।

 

ডাকিনী – সংকেত

সভ্যতার থুতু যেন অতিমাত্রা-ক্ষার। সারাগায়ে অসহন ফোস্কার দাগ। ক্ষত থেকে পোড়া স্নায়ু কুরে কুরে মগজে বসাই। অসভ্যতার গায়ে ঠেস দিয়ে বসি। স্পর্শের বিষ থেকে বিকট ডাকিনী, ধোঁয়ার হাসির মতো গোল্লাপাক খেতে খেতে জাগে। নিভাঁজ তাকায়।হাসে। শ্মশান-অগ্নির থেকে পোড়াকাঠ তুলে নিয়ে আঙরায় ঠোঁট পুরে হাসে।এত অগ্নি!এত জ্বালা! এত তীক্ষ্ণ সুখ! বর্বরতা, প্রিয় ধর্ম, আরণ্য স্বভাব! কঠোর মসীর নিচে ডুবে যেতে এতটা আরাম! সমস্ত শরীর জুড়ে ঘাম।সফল সঙ্গম শেষে যেন তীব্র ঘোর।নেমে যেতে যেতে শুধু মনে হয় ভোঁর ঘোরে শরীরের প্রতিটি গুহায়। বন্যতার অন্ধকার নিয়ে গেলে সম্ভ্রান্ত আগুনে দহনের ক্ষত থেকে পারিজাত – ঘ্রাণ ঝরে মৃদু।

ডাকিনী- বিকেল এসে এই দেহে,একার নাভিতে জলপদ্ম জাগিয়েছে যদি,
আমার সমগ্র দৃষ্টি, অসভ্য-বর্বর দৃষ্টি, ডাইনের হাসি থেকে জানুসন্ধি -হাঙর অবধি।

 

প্রেতজন্ম

জ্যোৎস্নার ঢেউ ভেঙে আমি তাকে এগোতে দেখলাম।

ছায়ার ভিতরে। মৃদু, হিম উপচ্ছায়া।

সামান্যত ঝুঁকে,কিছু ম্লান মুখে। বিম্বিত ধূসর।

কেঁখে কেঁখে নিয়েছিল চেতনার সর।

সেই থেকে অপেক্ষায় আছি।

বিস্তীর্ণ শ্মশান জুড়ে শহরের সব কানামাছি

শুষে নেয় পচনের ঘাম।

ঘুমের ভেতরে, ক্বাথে,ঢাক বাজে চড়াম চড়াম

মারের ভেতরে মারী আড়াআড়ি কুণ্ডলী পাকালো।

শ্মশানে, ভাগাড়ে, একা খুঁজি সেই সরে যাওয়া আলো

রহস্য-ছায়ার সেই সরে সরে যাওয়া।

নিজের প্রেতের পাশে ঝুঁকে আসে শব্দহীন শবগন্ধী হাওয়া।

 

প্রার্থিত

নৈঃশব্দ্য অভ্যাসে আজ পুনর্বার ব্যর্থ ও পরাস্ত হইলাম।

অতঃপর দাঁড়াদীর্ণ মূর্ছা ও পতন।

অজ্ঞানতা অমৃততুল্য। এই জ্ঞানে স্তব্ধতায় আছি।

কাঁচি ও ক্ষুরের স্পর্শ গোক্ষুরের – তুল্য তবু ভ্রমে

দেখিতেছি জন্মপূর্ব কালভৈরবের গূঢ় দুন্দুভি – নিনাদ।

প্রলয়ের সম্ভবনা? যম? যক্ষ? ঝক্কিহীন ঘুম?

কেহ ইত্যাকার স্বপ্নে গাহিতেছে মালয়ী পান্তুম।

উদাত্ত সঙ্গমমাত্র স্বপ্ন আর বাস্তবের ঘোরে

দেখিতেছি কালচক্র দুর্নিবার, গুহ্যদ্বারে ঘোরে।

বাঁচাও হে মহাশব্দ, ওঁ ধ্বনি, অজরা,অক্ষরা

স্তব্ধতার মূর্তিকল্পে জ্ঞানহীনে ভোলাও নখরা।

 

প্রেমে ফেরা

আবার প্রেমের কাছে ফিরে ছায়ার কালোর মতো দিন কুরে খেতে ইচ্ছে করে আজ।

আসানসোল। রানিগঞ্জ। কয়লার কালোর মতো ছায়া গিলে উগরে থুঃ করে ফেলে দিতে ইচ্ছে হয় প্রেমের কুয়োর নিচে,জল।

জলের অনেক নিচে ডুবে যাক যাপিত আগুন।

নম্র কোনো প্রদীপের সলতে হয়ে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে হাওয়া।

শূন্যের আলোর পাশে রেখে আসা আলোর শূন্যে কিছু ফুল।

ফুটে ওঠা এপ্রিলের ঘাসের ধুলোর মতো অদরকারে ভেসে যেতে ইচ্ছে করে, আর

শবগমনের পথে তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু কেঁখে নিতে সাধ হয় ছায়ার যাপন।

কোনো মিল নেই আমাদের।

শীতকাতুরে তোমার পাশে শুয়ে খুব জোরে ফ্যান চালিয়ে দিই।

চাদরে ঢেকে মড়ার মতো সহ্য করো হাওয়া।

দাড়িতে পাক ধরে যাওয়া ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মন খারাপেরা ঢুকে পড়ে চোখের তলার কালি বেয়ে।

তুমি নতুন মুকুলের মতো নরম আর ছোট।

সামনে, আরো সামনে রাস্তারা রোদে জ্বলতে থাকে।

ছায়া কুড়োতে কুড়োতে রাস্তার দিকে চেয়ে থাকা আমার।

নিজেকে নষ্ট করছো, বলে যায় পরিচিত হাসি।

শূন্যের বিন্দুতে এসে ধূসর বনের শুঁড়িপথ বেছে নিয়েছে আমার কচ্ছপ।

ওরা তাকিয়ে থাকে, ওরা অপ্রস্তুত, ওরা বিস্মিত

নরম মুকুলের গর্ভকেশরে আমার বিগত- যৌবন।

ক্ষুধার্ত আমার চোখ তোমার উদাসীন ছুঁয়ে ছুঁয়ে চুপ।

চমক আর প্রাত্যহিকতার মধ্যে লুটিয়ে আছে পাইথন সেতু।

অযত্ন কি ভালোবাসা দিতে পারে? ভাবি।

গোপন সমস্ত আঁশ ছাই মেখে বসে আছে বঁটির ফলায়।

তবুও কোথাও দূরে আরতির ঘণ্টা শোনা যায়।

চলে তো যেতেই হবে।যাব।

তারও আগে আরো কিছু স্বপ্ন দেখা বাকি।

কেবল স্বপ্নের জন্যে মনে হয় আরো একটু থাকি।

 

ছায়া

প্রায়-সিদ্ধ ডিমের কুসুমের মতো রোদ আর

মেঘের আলোর মতো ছায়া।

এর বেশি কতটা জানার?

স্তব্ধতা। অপচয়ের ঘোর কিম্বা ঘোরের অপচয়

এই যাওয়া। ধুলোটুকু নিয়ে যাচ্ছি। পথটুকু।

তার বেশি সমস্ত অলীক।সব ভুল।

কেবল ছায়ারা সত্য।আমার বুকের তিলে দুলে ওঠা

ছায়া, দুটো, ছোট, খুব ছোট, দুটো অর্থহীন দুল।

 

উড়ো খড় অথবা শিকড়

একার নিঃসঙ্গ সন্ধ্যা,শহরের শিকড়ের বিষে।
বসে বসে দেখে নেওয়া,মেখে নেওয়া,ধুলোর প্রকার।
ধুলোর গভীর থেকে চলমানতার জিভে, সময়-হিসহিসে।
লালার তরল যেন, ন্যুব্জ হাহাকার।

এতো যে চমকতৃপ্তি,এতো যে কুহক-মন্থ হাওয়া
বিবৃতি-বিহীন কিছু গুঁড়ো – বরফের নিচে বালি
অদরকারে মিশে থেকে মিথ্যের সত্যির মতো বাওয়া
লোহার পাথর-কুচি ভেঙে ভেঙে পূর্ণ করা খালি।

খালি তো শূন্যের টুকরো,খালির টালির নিচু ঘরে
যেমন সামান্য ক্লান্তি, ঘামে,রক্তে নুনে, নখে ভিজে
খানিক তেমনি চলা নগর-বেঘর -চরাচরে
মিথ্যের সমুদ্র ফুঁড়ে খুঁড়ে খুঁড়ে জাগানো অদ্রিজে

এতো যে খনন, খোঁজ,এতো যে তলিয়ে যাওয়া নদী…
একার অবুঝ জ্বরে, নোনাজল, শিকড় অবধি।

 

বয়ে যাওয়া

খোঁচা। কাঁটার সূঁচের মতো শিরায় তলায়।

বয়ে যায় সময়ের জল।

যেখানে যাওয়ার কথা ছিল,যাওয়া হয় না আর।

নিজের প্রেতের সঙ্গে খেলা জমে নিজেরই ছায়ার।

ছেড়ে যাওয়া যায় সহজেই।

পথের শ্যাওলা থেকে পিছল মাপার জমি নেই।

গুরুত্ব,মুগ্ধতা ধীরে কমে যেতে থাকে।

মনন-ম্যাজিক উবে যায়।

অন্য কোনো জাদু এসে কেঁখে নেয় তোমার সময়।

দিঘিজলে ছায়া ভাঙে। শূন্য মনে হয়।

 

প্রসূন মজুমদার, জন্ম ১৯৭৮, পদ্যচর্চার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকদের একজন, ১৯৯৯ এর দামাল দিনে কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়া ছেড়ে জীবনে যোগ দেন। সেই বুনো জীবন এখনও চলছে। পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ তিনটি, অসুখ ও আরোগ্য (২০০৬), অধরে গোখুর-দন্ত (২০১৪), রাত্রিচর বুনোচাঁদ (২০১৬) । পেশায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিদ্যালয় শিক্ষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *