দুটি কবিতা

অনিন্দিতা ভৌমিক


আবছায়া, যে শহর

১.
…এই শহরে কোনো ঘ্রাণ নেই কুয়াশার। পুরনো দরজা খুলে বেরিয়ে আসা জলবায়ু, অতর্কিতে টেনে নিচ্ছে ভাঙা বলিরেখাদের। স্মৃতির অর্ধেক অংশে গেঁথে দেওয়া কাগুজে ভঙ্গিদের। আর পিছিয়ে যাওয়াকে এখন থেকে সময় বলছি আমরা। সীমানা পেরিয়ে দেখছি তার ধূসর চোখ কীভাবে অনন্ত হয়ে ওঠে। নীল শবাচ্ছদের উপর তুলে রাখে দু’টো বিশ্বস্ত হাত। অথবা উজ্জ্বল আলো। অথবা আলোর নিচে বিব্রত এক মৃত্যু। যেখানে কয়েকটা রশ্মি হারিয়ে গেছে আমাদের। এই শহরের ভেতর দিয়ে হারিয়ে গেছে কয়েকটা চেনা রশ্মি। দূরের আবহ। সৎকার।

 

২.
এই যে ভিজে ওঠার বিস্তার, সকালের দিকে নেমে যাওয়া হাতবদল, হয়তো দু-চারটে নিসর্গ ঠেকবে কোথাও। রিক্ততার কাছে ফিরে যাবে এমন সহজ ধারণা ।
বহুদিন পর আমি প্রাণপণ স্মৃতি
গোটা একটা বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে সাফ হয়ে যাচ্ছে ঠোঁট
মেট্রো সিটির পূর্বাভাসে
অলিখিত হচ্ছে যে নদী
তাকে অনুবাদ করছি গর্ভে
আছড়ে পড়ার শব্দ
তারই প্রশস্ত নির্জনতা
এরপরেও কি দৃশ্য কেবল ন্যারেটিভ হতে চাইবে?

 

৩.
কি রাখা যেতে পারে এই প্রস্থানের দিকে?
ছেঁড়া শিকড়, অশ্রু, সন্তাপ
অথবা নোনতা দু-ঠোঁটের ফাঁক?
যাকে বেছে নিয়েছ ধূ ধূ নশ্বরতা পর্যন্ত

বরং এসো, সমাধির উপর হাত রেখে
প্রমাণ করো এই সংস্কার
হাত রাখো সমুদ্ররেখার মতো নিক্ষেপিত শব্দের উপর
আলিঙ্গনের মধ্যে উহ্য কোনো স্পর্শের উপর
যেখানে বিচ্ছিন্নতা এইমাত্র শুরু হয়েছে
নির্বাপিত হয়েছে এমন এক পৃথিবী
যার খোলামুখে লবণাক্ত খাড়ি, কাকের উড়াল

এসো, প্রমাণ করো এই তীব্রতা
প্রতিটা উচ্চারনের বাইরে যেভাবে কয়েকজন্ম
কখনও তারচেয়ে বেশি
কখনও তারচেয়ে ঘনিয়ে ওঠা কিছু

 

৪.
মূলতঃ নির্বিকার এক চেহারা। আর সূক্ষ্মতার দিকে শব্দ খুলে রাখলে। দাহ্য শোকের পাশে তুলে রাখলে আরও একটু উত্তাপ।

কোথাও কি সম্মতি ফেলে আসতে হতো ঘুমিয়ে পড়ার আগে?

তুমি বাইরে থেকে লক্ষ্য করছ ঈষৎ সাদা বসন। যেখানে ঘনীভূত ধোঁয়া ও উত্তপ্ত ভূপৃষ্ঠের সামনে বুঝে নিতে হয়, দীর্ঘ তরঙ্গের এই পাঠ্যক্রম আসলে তো চোখের অসুখ…
খিলানের কোণে যেভাবে তীর্যক রশ্মি এসে পড়ে

৫.
সমস্ত চিহ্নের শেষে খুঁজে নিচ্ছি একটা সূত্রের নিয়ন্ত্রণ। যেখানে পোড়ামাটির কোনো উটের ছায়া তোমাকে ঠেলে দিচ্ছে খননকার্যের এই দেশে, আর বৃষ্টির একটানা ভুল থেকে উঠে আসছে সম্ভাব্য দূরত্ব। যাকে ঠিক বিশ্বাসযোগ্য করা যায় না। হরফের গায়ে রাখা যায় না একটু একটু বেপথু হওয়ার দৃষ্টি।

উজ্জ্বল আলোর এই ঘরে
নিজের হাতদুটোকে বিষন্ন মনে হয় এবার
অথচ কিছুক্ষণের মধ্যেই
ভুল উচ্চারণ বা পেরেকের স্তব্ধতা
বুঝিয়ে দেয় যে – শূন্যতার বেশি
অন্ধকার কখনও হারিয়ে ফেলতে নেই

এই প্রথম
তীব্র কোনো আরোগ্যে নিষেধ হচ্ছো তুমি

৬.
বাকিটুকু ক্লান্তি জড়ো করছি এবার
নোনাধরা হাতের ভেতর
নারঙ্গি দৃশ্যের ভেতর
গুঁজে দিচ্ছি একটা পর্যায়
যৌথতার কাছে সাময়িক কাতর হয়ে থাকা

হয়তো এই সময় একটুও যুক্তি নেই কোথাও
পাশাপাশি নামিয়ে রাখা সংকেতের গায়ে
বেঁকেচুরে যায় যে উত্তাপ যে অনুপাত
তাদের সাজিয়ে ফেলা হচ্ছে
নৈসর্গিক রেখা বরাবর

আসুন পাঠক, এই মুহূর্তে নিজের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ভাবি। আপনাকে নিয়ে ভাবি। বিচলিত বোধ থেকে চামড়া ছাড়িয়ে মেপে নিই তার উলঙ্গ শুদ্ধতা। কফিন, চাদর, নস্টালজিয়া ও স্তন ফুটে ওঠার প্রশ্নে যা পরিবর্তিত হতে থাকে। আর সাবলীলতার কথায় আমি উন্মুক্ত করে দিই যাবতীয় স্নায়ু…গভীরতম প্রদেশে রাখা ভাঙাচোরা অন্ধকার।
অথচ সব চরিত্রই তো সমবেত সংলাপ মাত্র। হাওয়ায় হাওয়ায়। নির্জন নির্জন। শুধু নিজেকে আশ্বস্ত করতে চাওয়া। গোটা একটা জীবন থেকে তুলে আনতে চাওয়া পলকা উদ্দীপক। হয়তো শেষবারের মতো…উচ্ছিষ্টে, শ্রমে ও সমাজশাসিত রেশমি মজ্জায়।

তবুও, এই মুহূর্তে কেবল নিজের ভবিতব্য নিয়ে ভাবছি। একটা নিঃস্বতা নিয়ে ভাবছি। আমার চোখ টানছে স্বীকৃতির কোনো আঁশটে ব্যবহারে এবং দৃষ্টিজনিত বিক্ষেপকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেই বুঝতে পারি যে, আদতে কোনো অবসাদ নেই আমার…

আমি কেবল টেনে-হিঁচড়ে লিখে যাচ্ছি আমার দ্রোহ, আমার চিৎকার, আমার পুরনো বাড়িটার কথা।

 

 

প্রামাণ্য কিছু নেই…

১.
থেকে যেতে চাইছি এই সময়ের প্রসঙ্গে। ঢাল বেয়ে নেমে আসা কাঁকরের ভেতর ডুবিয়ে দিতে চাইছি দুটো বিরোধী মতবাদ। যা নগ্নতাকে পেরিয়ে যায়। স্নায়ুর দিকে ঘষে ঘষে তীক্ষ্ণ করে তোলে অতিরিক্ত আলো। গোর দেওয়া পাথর। স্মৃতির চেয়েও পরিতক্ত্য কোনো ঠিকানা।
সংবেদনের বোধ তো আসলে আরোগ্যহীন। ধারালো অভিযানের পাতায় লিখে রাখে আরও কতটা নুন প্রয়োজন বসতি গড়ে তুলতে। আরও কতটা জলবায়ু প্রয়োজন টেনে নিয়ে আসতে তার হারিয়ে ফেলা প্রদেশ।
আমি তো নৈঃশব্দ্য চেয়েছি বরাবর। একটা সাদা দেওয়াল আর ধৈর্য্যের আভাসটুকু নিয়ে পার হয়ে গেছি একের পর এক স্যাঁতস্যাঁতে সুড়ঙ্গ। যেখানে নুয়ে ঝুলে পড়া দৃষ্টি। যেখানে প্রতিটা বিন্দু ধরে রাখ এক টুকরো শ্বাস। মধ্যরাতের চুম্বনে মৌন স্থবিরতা।

২.
জল থিতিয়ে উঠছে তোমার ভ্রূর উপরে। ক্লান্ত গলার কাছে ফুলে থাকছে অতিরিক্ত শিকড়। পাক খেতে খেতে চোয়ালের দিকে যার জখম টকটকে লাল। নির্বিকার এই ক্ষরণ যার কাছে নেহাতই সহিষ্ণু হয়ে থাকে।
আর তোমাকে ছুঁড়ে দিচ্ছি কাফেলার দিকে। টুকরো টুকরো ব্যবহার হয়ে ওঠা দেদেরিয়েহ গুহার দিকে। যেখানে নিজেদের গন্ধ পড়ে আছে। ভাঁজ করা হাঁটুর মতো উঁচু হয়ে আছে প্রাচীন বাণিজ্যপথ।

এখানেই তো কাঠের টুকরো, বাদামি গালের দাগ, প্রকাশ্য রাস্তায় লিখে ফেলা নিছক যুদ্ধের খতিয়ান… যার ভেতর দিয়ে তুমি এগিয়ে আসবে। ঘন উজানের ভেতর দিয়ে, ধাপে ধাপে পুরনো অংশ ভেদ করে।

সূত্র : দেদেরিয়েহ গুহা সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমে আফরিন উপত্যকায় অবস্থিত, যেখানে প্রাচীন মানবসভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে।

 

৩.
প্রাচীনতা। সে স্নেহ। সে স্তনের ভারে নুইয়ে আসা বিছানায় হাত রাখে। উৎসমুখ ধরে টের পায় কতটা স্মৃতি হারিয়ে গেছে, কতটা জড়তা খুলে গেছে স্পর্শকাতর বাক্যের শরীরে।
একটা দূরত্ব নিয়ে ফিরছি আমি
কিছু মেদ কিছু অঘ্রাণ নিয়ে ফিরছি
লাল পাথরের মেঝেতে
যেভাবে শূন্যতার কথা। আর মোটা দাগ বরাবর একটা অবয়ব নিয়ে ভাবছ। ঠোঁটের ভাঁজের মত সাবধানে তুলে নিচ্ছ তার নিরাবতাটুকু। কুন্ঠা থেকে বেরিয়ে আসতে চাওয়া শ্রান্ত ভঙ্গিটুকু।

৪.
শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি এখানে কোনো ব্যবহার নেই শব্দের। পা ফেলি। আর গভীর এক নুনজলের আভাস ভিজে ওঠে। তাকে ঠিক অনশ্বর বলা যায় না। বরং আদি-মধ্য-অন্তে জুড়ে থাকা চিহ্ন। শিরোনাম লেখার আগের নিপুণ কৌশল। কিছুটা ধারণা তুলে রাখছে। ত্বরণ বদলে বদলে হয়তো গতি হিসেবে সাজিয়ে রাখছে ছত্রভঙ্গ রেখা। দিগন্তে ঝুলে থাকা মৃত পতঙ্গের ডানা। যেকোনো অংশ থেকেই তাকে সরিয়ে ফেলা যায়। প্রথামতো বসিয়ে রাখা যায় মদ-মাংস-শুভ্র শরীরের আয়োজনে।

 

৫.
শব্দের পরে একটা নীরবতা আসে। টোকা দেয়। উপমা থেকে
উড়িয়ে দেয় বিভ্রমের কণা। কিছুটা অক্ষর হয়ে কিছুটা অকারণে বেঁচেবর্তে থাকা। এই প্রক্রিয়া সাবলীল। অথচ তার অবিশ্বাস ছিটকে আসে । জটিলতা নিয়ে কাটাকুটি করে শাকপাতা অথবা সাধের বালিশে।

উবু হয়ে বসো
যে দর্শন অবাধ তার কাছাকাছি তুমি
কব্জি ধরে নামিয়ে রাখছ গেঁজলে ওঠা ক্ষয়। হয়তো বিপন্নতা। হয়তো গোটা শ্রাবণ জুড়ে লেগে থাকা নুড়িপথের দাগ। যা পায়ে পায়ে ঝিম মেরে থাকে। সমস্ত দ্রাঘিমার কেন্দ্রে স্থাপন করে ধারালো বিভাজিকা।

শুধু তুমি তখনও মুখ ফিরিয়ে
চামড়ার ক্ষত টের পাচ্ছ
বনে-বাদাড়ে পেরিয়ে যেতে দেখছ নিপুণ অভ্যাস

 

৬.
মুহূর্তই সব যা অমোঘ হয়ে ওঠে। দিনের মাঝে তিরতির করে ঝুলিয়ে রাখে একটা শাদা রঙ। প্রশ্ন করে। প্রশ্নের ঠোঁট কামড়ে তুলে আনে আগামী বছরের কথা। একজোড়া ডানা। পালকের গায়ে রক্ত লেগে আছে। ভাঙা টেবিলের উপর ছিটিয়ে আছে বন্য দাগ। আর ঠিক দরজা অব্দি হেঁটে যাচ্ছে কেউ। তাকিয়ে থাকছে কবেকার দীর্ঘ সূর্যাস্তের দিকে।

আমি হাড়গোড় সরিয়ে রাখি। নাগালের বাইরে ঠেলে দিই অপেক্ষারত ভঙ্গি। জুতোর ফিঁতে বাঁধার মতো সামান্য আয়ু। যার চোখে কাজল। যার রূপোলি আলো ভারি হয়ে আসে।

 

৭.
এভাবেই প্রত্যেক সিদ্ধান্তের আগে
নিজের মুখ বুড়িয়ে যেতে দেখি
চিবুকের উপর গালের দাগের উপর
ছিটকে আসতে দেখি অনুচ্চ নির্দেশ
পায়ের দিকে যে শরীর গুটিয়ে রাখে
বুক থেকে খুলে রাখে ঝাঁঝালো নীল চোখ

অকারণ এই ভ্রমণ
ঘরে ঢোকার শব্দ নিভিয়ে দেয়
মাথা কাত করে দেয় ঘুমন্ত কফির কাপে
আমি তার পেটে হাত ঘষে দিচ্ছি
সাদা সাদা দুটো কাগজের কাছে
ফেরত চাইছি প্রকাশ্য ক্ষত

আমার পাতলা স্মৃতি
লেগে থাকছে মগজের কোষে
আমার গোস্তের টুকরো শুকিয়ে চড়চড় করে

৮.
লিখে ফেলতে চাইছি
দরজায় ঝোলানো এই প্রতিকৃতি
যা আমার মুখের চেয়ে প্রিয়
চূড়ান্ত পরিচয়ের সময় কুড়িয়ে নিতে থাকে
গলা চোখ আর ঘোলাটে ঠোঁটের মাঝে
চেপে রাখা ঘুমের ওষুধ

আমার শরীর উদ্দেশ্যহীন
আমার ভালো হয়ে ওঠা ডায়েরি
কবিতা লিখে রাখে আঙুলের খাঁজে
জ্বালা জ্বালা করে

টের পাই কাচের দরজার বাইরে
অন্ধকার কেটে ধোঁয়া উঠছে
ঘন লালায় ভরে যাচ্ছে মুখ, হাতের দু’পাশ

৯.
যে ধীবর আমাদের পরিশ্রম শিখিয়েছিল, পাথরের খাঁজ থেকে তুলে এনেছিল স্ফীত ও কম্পিত শরীর, তার নগ্নতার প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। বরং নিজেদের সফেদ বস্ত্রের দিকে তাকিয়ে বারেবার বুঝিয়েছি – ক্ষমাশীলতা আসলে ঘূর্ণন গতির মতোই একা করে তোলে। আবেগ থেকে ঘষেমেজে নেয় লিখিত বিবরণ।

আলোসুরভিত এক সূক্ষ্মতায় দাঁড়িয়ে আছি আমি। কাঁধে রূপোর জল করা ইতিহাস। ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসছে নিহিত প্রভাবের জন্যে। খড়ের মাদুরে ছড়িয়ে পড়া তামাম দ্রাক্ষারসের জন্যে। আমি তার চুল বিস্রস্ত করে দিচ্ছি। মোলায়েম শ্বাস টেনে তাকে পালিয়ে যেতে দিচ্ছি ঘোলাটে প্রণালীর দিকে।

স্বেদ ও অশ্রুর ভেতর যে হাঁটতে থাকবে নির্বিকার… মাথা নীচু করে হাঁটতে থাকবে দু-চার ফোঁটা বিভ্রান্তি নিয়ে

 

অনিন্দিতা ভৌমিক (জন্ম ১৯৮৬ সাল)। বড় হয়ে ওঠা প্রায় সমগ্র উত্তরবঙ্গ জুড়ে। উদ্ভিদবিদ্যা বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বর্তমানে কর্মসূত্রে জলপাইগুড়ি জেলার বাসিন্দা। জেলা বিচারবিভাগের অধীনে কর্মরত। কবিতা বলতে বোঝেন, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার অভিমুখ। সেখানে হয়তো জোলো হাওয়া, হয়তো পৌরাণিকতা, হয়তো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করা নিজের অনুনাদী কন্ঠস্বর। আর প্রবেশের চেষ্টা অধ্যায়ের সেই মূল বিন্দুটিতে। নিজের অস্তিত্বের ভাঙাচোরা প্রত্নতত্ত্বে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *