অসাড়লিপি ১৪

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়


১৪ 

মাথা সোজা করি, এই না হয়ে ওঠা শহরটার জীবন্ত প্রাচীন গম্বুজ তার যৌন প্রতীক মিশে থাকছে সকাল নামক গজ কাপড়ে 

আমরা বেরিয়ে পড়েছি পরস্পরের সহজ আঙুলে, কোথাও সামান্য উঁচু হয়ে থাকা সুরের স্থায়ীত্ব, কোথাও এবড়ো খেবড়ো বিশ্বাসের অক্ষে স্থির ঘূর্ণমান পথশিশু , মাতা, বেলুন বাজার

আমাদের কালির রং হালকা জলজ, মৃত দিল্লি, মৃত ভাষার ছড়ানো পৃষ্ঠাই আমাদের লেখা, অস্পষ্ট পথের মত যে সব কুয়াশার নামে জেগে উঠেছিল শহর, তাদের বিদায় জানাচ্ছি। বেরিয়ে পড়ার অর্থ আমাদের অগম্য, আমি তোমাকে বারবার বলছি বোবা হয়ে যেও না, বারবার বলছি আমাদের জিভে জড়ানো শেষতম রাতপ্রজাপতির রেণু তুলে ধরুক সাংবাদিক সত্যের ঊর্ধ্বে কিছু ফসলের ব্যাপক মাঠ 

তেমন কি প্রেরণা হয় আর? ঘোড়ার খুরের শব্দ, জ্যোৎস্না থেঁতলানো হ্রেষা, খুসরো, জক, পাথুরে রাস্তা আমাদের সমগ্রতাকে জীর্ণ করা অসাড়ের তীরকে ঘিরে ফেলছে! বাক্য নয়, চেরা শব্দের মত ভালোবাসা গলায় জ্বালা ধরিয়েছে, পিছনে পুড়ে গেছে রেশমি কাপড়ে লেখা অক্ষর আমাদের অশ্রুর নুন!  

প্রতিটা দিনের বাক্স খুলে যায় দুপুরগহ্বরে, প্রতিটা আলো ঔজ্জ্বল্যে পৌঁছয় না, যেমন প্রতিটা অস্পষ্টতা চায় না উন্মোচন, এই আমাদের বেরিয়ে পড়া বা খোঁজা অথচ বাড়িতে থাকাই ছিল শ্রেয়তর 

হালকা কোনও গন্ধের চারপাশে ঘুরে আমাদের সকাল আসলে একটা অক্ষরের মিনার একটু পরেই আকাশের দিকে সৃষ্ট পৃথিবীর বাইরে কিছু পাবার আশায় দলবন্ধ মানুষ সমবেত। দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্যে দেখা প্রথম জ্যোতস্নার মত নৈঃশব্দ্য, একেই মধ্যযুগ বলেছি আমরা, স্পর্শ করেছি আমাদের দুর্বলতাঃ ক্ষমতাই শেষ লক্ষ্য, স্বীকার শিকারের মধ্যে যতটুকু রেশম সম্ভাবনা তাকেই নিজেদের বলে ভেবে নিয়ে টুনটুনিউদাস কিছু জানলা খুলতে চাওয়া, অবিশ্বাসী আমাদের রূপান্তর হবে না জেনে অবরোহণের কালে স্থিরতা খুঁজেছি 

পুরনো বাড়িতে গিয়ে শীত বিকেলের জানলা বন্ধ করব ভাবলে যে ভাললাগা জন্মায়, তার মত কয়েকটা দশক চলে গেছে, আচমকা আসার কোনও চিঠি নেই, পোস্টকার্ড হলুদ একটা বিকেল তিনটে ফ্যাকাশে নিঃশ্বাস নিচ্ছে মফস্বলে, আমরা জানি এইখানে চুপ করে যেতে হয় 

শুধু এক ধরণের আখ্যানহীন দৈনন্দিন, এমনকি ১৯৪৭ কোনও প্রভাব ফেলেনি এমন এক রোঁয়া তলা বেঁজি বিকেলের মফস্বলে এসে পড়েছি, আমরা জানি কিছুই হয় না, শুধু নির্বাচন এসে গেলে কেউ কেউ বাড়ি থেকে পালায়, শুধু অদূর কলকাতায় বহুতল নির্মিত হলে কিছু লোক বাড়ে এখানে, লোকাল ট্রেনের বিক্রেতাদের মুখ চিনে নেয় সমস্ত রুচি, এভাবেই হাতের রেখায় উঠে আসে আঞ্চলিকতা যার ওম আমাদের বেরোতে দেয় না 

পরপর বৃষ্টি শুরু হয় 

ঋতু নির্বিশেষ ফোঁটার উপর বালি 

জং ধরা ধাতুর উপর 

কাগজের উপরে বালি 

নীচু বাড়িদের ফ্রয়েডীয় উচ্চতার উপর 

মন নামক শব্দের বাক্সের উপর 

কোনও কিছুতেই টোল না খাওয়া মফস্বলে 

বছর একধরণের তেরছা রশ্মি 

আমাদের দ্বান্দ্বীকতা থেকে দূরে

যে ইগল বিশ্রাম নিচ্ছে 

সেই এই তীব্র বালুকা ঘর্ষণজাত হলদে বাতাস 

সর্বত্র বিশ্বাসী মানুষের ভিড়

পাথর স্তম্ভের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে 

গোপনতম কথা 

আমাদের সামনে মুখভাঙা পাথুরে মাথা 

ভাবনা পেঁচিয়ে ওঠে, মানুষের স্বর ধাক্কা খায় গাছ অন্যান্য নির্মাণে, আমরা মাথা নামিয়ে মেনে নিই দেয়াল, নিশ্ছিদ্র প্রাচীন বালি বর্ষা ভরিয়ে চলেছে দেহ কামনার মধ্যবর্তী ভাষাগত ব্যবধান, অসাড় এক ধরণের স্থির ফাতনা বহুদিনের শ্যাওলা পুকুরে, আমরা টের পাই কামনা কখনও সঠিক শরীর পায় না আর শরীর পায় না সঠিক কামনা। শুকনো কালিতে লেখা আমাদের শরীর জুড়ে না দাগা সমস্ত উল্কি, দাগানো নম্বর, গলি দিয়ে ছুটে যাবার ভয়, পুলিশ রাষ্ট্র ইত্যাদি ব্যবহৃত শব্দগুলোর গায়ে আর ঘাম জমা হয় না 

অভিধান সবকিছু তোলে না, এশিয়ার মানচিত্র যেখানে আফ্রিকার ঋণ স্বীকার করে সেখানেই জমা হয় বিদেশি ভাষার ভয়, অচেনা অক্ষরের উপর ভরসা করে তৈরি হয় নতুন সব দেশ

আমি জানি কীভাবে মাথা নামানোর খেলায় বড় হলে ওঠে রক্তের ভার, আমি জানি স্বাভাবিকতার নিয়মে কোথায় আমাদের চলনবাগীশ কথা জড়ায়, যেভাবে আমাদের আধা গ্রাম্য কৈশোর, ডোবার নলখাগড়া, তার আটকে থাকা থকথকে পাঁকে বাতাস না ঢোকা আলো খোলসে মাছের ঔজ্জল্য আমাদের আছড়ে ফেলেছে স্কুল পালানোর নভেম্বর পাঁচিলে

আমি জানি তীব্রতম ধীর রাস্তার রহস্য, আমরা দলবদ্ধ, তীর্থযাত্রীদের মত, অথচ আমরা শব্দটার কোনও স্থাপত্য নেই, আমি বিচ্ছিন্নতা, প্রত্যেকআমিপ্রস্তুত দলবদ্ধ শোভাযাত্রা, অথচ প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে সমস্ত আমি জবরদখল হয়ে যাওয়া স্মৃতিতে, আমাদের সামনে সমস্ত বিরাট করে দেখানো চেহারাগুলো ফেঁপে উঠছে অথচ আমরা চুপ, বিশ্বাস করতে শিখছি বাজার অন্যান্য সম্ভাবনা, খুলে যাচ্ছে নাট্য মঞ্চ, তাতে মধ্যযুগের কোনও শহর, যদিও জানা নেই আমাদের আদৌ মধ্যযুগ ছিল কিনা, বিশ্বাস করতে শিখছি সব কিছুই কল্পনার সন্তান, আর সমস্ত সন্তানই বেদনা ঋতুর মত দগদগে

এখানেই রং বদলে আবিষ্কার করে নিতে চাই মানত ঋণে বন্দি কৃষিশ্রমিকের পেশি, মুখের ভাষার মধ্যে ডেলা হয়ে থাকা শহর, খনন পরিচয় ঘটাচ্ছে মিথ্যের সঙ্গে, মিথ্যে, খননের গায়ে গেঁথে যাচ্ছে বাতাসকে ভয় পাওয়ানো মুখোশ

সময় চলে যাচ্ছে আর আমি পছন্দের ছাঁচ খুঁজে পাচ্ছি না, আজ এই /১২/২০১৮, আজ এই চল্লিশ পেরনোর কয়েক মাস লাফিয়ে আমি সমস্ত বিছানা ঘর মাথা বমি উদ্বেগ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছি, চিৎকার নামক গর্তের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে বলছিনা”  আমার শহরের নাবৃষ্টি বিকেলের পাথর আঁচড়ে দেয় ধোঁয়া, খুলে যেতে থাকে পরপর দরজার গন্ধ, উন্মাদনা নামক ঘড়ির কাঁটাতে দাগ কাটছে মরুপ্রতীম অন্ধকার, কোনও প্রকৃত মরুভূমি দেখা হয়েছে কি

আমার সমস্ত রকম  দৃষ্টি বিভ্রমকেই  মরুভূমি বলে ডেকেছি, বালি আসলে একটা প্রেডিক্টেবল মেটাফর, আমি তলিয়ে যাই প্রতীক অনুবাদে –  símbolo – এসেছে গ্রিক থেকে – simbiosis একই শব্দের বেপথু বিভ্রম > আসলে শরীর একটা ছায়া চেয়েছিল, সেটাই বিবাহ! আরেক ধাপ একটু বেঁকে গেলে যেখানে বিষ একধরণের আকাশে পরিণত হয়। যেখানে কল্পনা আসলে ডেলা পাথরে সুতো বেঁধে রাখা > সেখানেই ফিসফিস করে বলি শ্বাসকষ্টের কথা, যতটা নিঃশ্বাস আমি তোমাকে দিয়েছি, যতটা ঘামের দাগ তোমার নগ্ন পিঠে লেগে আছে, যতটা ধীর লয়ে আমাদের স্পন্দনসমূহ এক নাচ হয়ে গেছে ততটাই পৃথিবী > এরপর আসবে কুঠার জঙ্গল, মৌমাছি তাদের বমন চাহিদা, আমার মুখহীন চুম্বন মিলিয়ে গেছে অনামী ঠোঁটের গায়ে, আমি সবরকমের মাথা নামানোর নাম দিয়েছি সাদা পাতা > অক্ষরবিহীন 

4 Replies to “

অসাড়লিপি ১৪

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়


  1. স্তব্ধ হয়ে পাঠ করার মতো একটি লেখা। বা, পাঠ ক’রে স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার।

  2. কবিঃ নিকানোর পাররার
    অনুবাদঃ মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

    তরুণ কবিরা

    লেখো যা তোমাদের খুশি
    যে-কায়দায় লিখতে ইচ্ছে করে তাতেই
    অনেক রক্ত বয়ে গিয়েছে সেতুর তলা দিয়ে
    এই কথাই বিশ্বাস ক’রে
    যে কেবল একটা রাস্তাই ঠিক।
    কবিতায় সবকিছুই চলে।
    একটাই শুধু শর্ত, বলাই বাহুল্য:
    শাদা পাতার চেয়েও উৎকৃষ্ট হতে হবে তোমাদের।
    ——-

    এটা মনে এলো শেষ লাইনটায় এসে।
    ভালো লেগেছে আপনার বাচন, পাশ ফেরা এবং অন্য রাস্তায় ঢুকে পড়া।

  3. মায়াময় এবং হন্তারক। এমন কবিতা, যা পড়ার পর দীর্ঘ সময় অন্য কোনো কাজ করা যায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *