ডেইজ অব কোয়ারেন্টাইন

সিফাত বিনতে ওয়াহিদ


শিরদাঁড়াটা ভাঙবে যদি, তবে
‌উল্টেপাল্টে দেখলে কেন এসে?
‌বারুদঘরে আগুন দিতে গিয়ে
‌উপচে ফেললে, যা ছিল বিশ্বাস।
‌কোথাও কিছু আর কি বাকি আছে?
‌নদীর শেষে মেঘলা ভোরের আকাশ
‌বুকে কিছু তার অচল আদর পড়ে
‌আঘাতে মোড়াও, চেতনা যেন না ফিরে।
‌শোনোনি কি তুমি ঘুমপাড়ানি গান?
‌কত রাত জেগে আদর মাখা ডাকে
‌ঘুমকে বলেছি, এসো না আমার কাছে
‌তার চোখে দিও চুমুর প্রতিদান।
‌এ খেলা শেষে উড়তে গিয়ে, ইশ!
‌চিতায় আগুন জ্বলছে অহর্নিশ
‌তুমি সুখী হও, ঘুমিয়ো আহ্লাদে
‌মৃতপাখিটার কী-ই বা করার থাকে?
‌#ডেইজ_অব_কোয়ারেন্টাইন
‌২৫ মার্চ, ২০২০
‌বনশ্রী, ঢাকা
চলে যাই যদি আড়মোড়া ভেঙে দূরে
আমাকে করো না সমুদ্র আহ্বান
শরীরের নিচে জ্যান্ত যে মৃতদেহ;
কাঁটাতার ঘেরা, আগুনে গিয়েছে পুড়ে।
চুপ করে কাঁদে চোখ ঢেকে দেওয়া ধূলি
উড়ছে আকাশে মন খারাপের চিঠি
গাছের ডালে আটকে থাকা পাখি,
ভাসছে তোমার প্রণয়-দোষগুলি।
কোথায় যাবো, কে খুলেছে দ্বার?
মাঠের উপর দাঁড়িয়ে কোন ফুল?
একলা ভোরে বাঁচবো কেমন করে?
নিঃশ্বাস ভারি, পুড়ে পুড়ে অঙ্গার।
চলে যাই যদি, ছুঁড়ে ফেলে দিও জলে
কপাল-চিবুক-ঠোঁটের চুমুগুলো
বর্ষায় যেও কবরের কাছাকাছি
মাথায় ছাতা, বেলি ফুল হাতে নিও।
#ডেইজ_অব_কোয়ারেন্টাইন
৪ এপ্রিল, ২০২০
বনশ্রী, ঢাকা
মাথার উপর থমকে দাঁড়ায় চাঁদ
বুকভাঙা কাম ভাসছে এ বন্দরে
নগর ছেড়ে ঢুকলে অলি-গলি
কালো স্বর্গ নেচে উঠে আহ্লাদে।
কী নাম ছিল, পত্র দেয় যে যেচে?
সন্ধ্যা নামার পথে থামলে ঢেউ
হাওয়ায় উড়ে খুব চেনা দুই হাত
পা বাড়ালে সমুদ্রেরই ফাঁদে।
দুঃখ-শোকের আগুন হলে ছাই
মাটির তলায় নিঃশ্বাস হয় ভারি
পাহাড় বেয়ে এঁকেবেঁকে গেলে নদী
জ্যোৎস্নায় ডাকে পাখিরা শুনশান।
ওই যে সকাল, রাত পোহালেই দেখা
ঝিরিঝিরি গায়ে বৃষ্টি নামলো শেষে
কাঁটাতার ঘেরা মাঠ পেরোলেই পরে
কোন পুরোহিত মগ্ন নদীর জলে?
#ডেইজ_অব_কোয়ারেন্টাইন
২৪ মার্চ, ২০২০
বনশ্রী, ঢাকা
তোমার বুকে সাঁতার কেটে চলি
ফাঁকা নৌকা
দোল খেয়ে যায় জলে;
জাদুর আকাশ,
আটকে থাকা ঘুড়ি
উড়ছে মেঘে ছন্নছাড়ার দলে।
তোমার ঠোঁটে জ্বলছে চৈত্রমাস
জল নেই আর
রাত্রিঝরার শোকে
বুক-পিঠে দাগ
আদরের নাম নখ
মাতাল মেতেছে উন্মাদিনীর ঝোঁকে।
তোমার আঙুল, নদীর চলাচল
ছুঁয়ে দিলেই
বাঁধ ভেঙে যায় পাড়ে
কবি উদাসীন, কবি
বেদনার হা-হুতাশ
ডুবিয়ে মারো, ভাসিয়েছো যাহারে।
#ডেইজ_অব_কোয়ারেন্টাইন
৪ এপ্রিল, ২০২০
বনশ্রী, ঢাকা
মেঘের উপর কালো জলের ঘর
দুয়ার এঁটে বললো, ‘কী খবর?’
অমনি ডানা ঝাপটে বলে পাখি
‘আসবে কি গো, আবার যদি ডাকি?’
হাত ফসকে পড়লো যেন প্রাণ
বাইরে সবাই পাতছে ঘরে কান
থাক না আড়াল এসব ডাকাডাকি
ধৈর্য্য ধরো, অনেকটা পথ বাকি।
ভুল বুঝবে লোকে যদি শোনে
লোকের কথা কেইবা আছে গোনে?
পাখিটার বুঝি ডানাগুলো নড়বড়ে
উড়তে গেলে পড়ছে ভীষণ জোরে।
শত শত পথ দৌড়ে এসে দেখি
আকাশ ভরা ছলচাতুরীর দোষ
ভেসে আছে জলে মৃতদেহ পাখিটার
কে আর দেখেছে বেদনার আক্রোশ?
#ডেইজ_অব_কোয়ারেন্টাইন
৩০ মার্চ, ২০২০
বনশ্রী, ঢাকা
মাতাল আমি পাতাল কেটে চলি
চোখের কোনে সমুদ্রজল ফোটে
আঙুলে আঙুল বেঁধে ফেললো, কে সে?
মেঘের বুকে ঠাঁই কারই বা জোটে?
গাছের নীচে ঘুমোতে এলে হাওয়া
ধুলায় লুটায় জবরদস্তির ঝড়
কেউ ফেরেনি সরিয়ে দিতে তাকে
সব পাখিরই নিজের থাকে ঘর।
হোক তবে হোক শব্দগুলোর ক্ষয়
না পাওয়াদের নিলাম হাতে তুলে
জ্বরের ঘোরে আছড়ে পড়ে দেখি-
পাখিহীন খাঁচা আকাশ জুড়ে ঝুলে।
বুকের কাছে নত হয়ে আসে মুখ
দু’ এক পলক বৃষ্টিভেজা ডাক
গাছে গাছে যারা ডানা ঝাপটে বসে
আমায় তারা একটু কাঁদিয়ে যাক।
#ডেইজ_অব_কোয়ারেন্টাইন
৩ মে, ২০২০
বনশ্রী, ঢাকা
হয়তো খুব শিগগিরই চলে যেতে হবে,
পেছনে পড়ে থাকবে কিছু পাতা, কিছু ফুল,
খুব যত্নে বেড়ে উঠা কিছু বেখেয়ালি ভুল!
খুব বেশি দিন বেঁচে থাকাদের দলে ক্রমশ বাড়ছে হা-হুতাশ,
এইসব গোলযোগ-বিড়ম্বনা ভালো লাগে না আর
মধ্যরাতে আর কতই ভোগাবে আমার একার সন্ন্যাস?
তারচেয়ে হাওয়ায় ঘুরে ঘুরে, কুয়োর জলের মতো স্তব্ধ বসে থাকি শূন্য শ্মশানে।
এখানে, মৃতদের দলে ভিড়ে যাওয়াও যেন গোলকধাঁধা কোনো,
হাত বাড়ালেই মনে হয়, জন্ম থেকে এর দূরত্ব তেমন কিছু নয়।
তবুও মৃত্যুর কাছাকাছি যেতে হলে,
প্রথমেই ছিন্ন করতে হয়- বুকের ভেতরে থাকা
ভালোবাসাবাসির অদ্ভুতুড়ে বখাটেপনা!
তারপর সমস্ত অনুভূতির ধারাবাহিকতা অবশ হয়ে গেলে
ছাইয়ের মতো ওড়ে যাওয়া সহজ হবে হয়তো।
#ডেইজ_অব_কোয়ারেন্টাইন
১২ এপ্রিল, ২০২০
বনশ্রী, ঢাকা
দু’দিকেই খাদ আর চর্তুদিক ঘিরে আছে-
স্থির কাঁটাতার
মাঝে কালো জল,
তার ভেতরেই চলে যাচ্ছে রাত কোনোমতো।
মর্গের সেলাই নিয়ে গায়ে
নির্ঘুম পড়ে থাকে ঢেউ,
যেন সে হারিয়ে ফেলেছে সমুদ্রকে, আগুনের বনে
জ্বলতে জ্বলতে সময় হলে, সেও চলে যাবে অন্তরালে।
দু’দিকেই খাদ আর চর্তুদিক ঘিরে আছে-
স্থির কাঁটাতার
তারই মাঝখানে হাহাকার করে মেঘ,
এমন আর্তনাদে দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে বোকা চাঁদ-
‘জানি, ঝড়ের মতো এক ধাক্কায় ভেঙে যাবে
যে বাঁশির সুরে সাজাই শুকতারা, প্রতিদিন!’
অবশেষে একদিন,
শূন্যে দাঁড়িয়ে জলকাদায় সাঁতার কাটে মীন,
যেহেতু দু’দিকেই খাদ আর চর্তুদিক ঘিরে আছে-
স্থির কাঁটাতার,
স্বর্গের সমস্ত খাসজমির স্বত্ব ছেড়ে সে
অন্ধকারের ঋণ নিয়েই ফিরে আসে মাটিতে।
#ডেইজ_অব_কোয়ারেন্টাইন
১৮ এপ্রিল, ২০২০
বনশ্রী, ঢাকা
ঝিরিঝিরি বৃষ্টিস্নাত রাতে
মেঘ থেকে ছিন্ন হতে হতে
গলা চেপে ধরে আছে তোরঙ্গ অন্ধকারের।
এই রাতে, তোমাকে না পাওয়া ছাড়া
কোনো কারণ ছিল না মরে যাওয়ার,
তবু বিষাদের ফাঁদ পাতা রাস্তায়
ডানা ছেঁড়ার হাহাকার শোনে ভুতুড়ে শহরবাসী।
দমকা বাতাসে, চুপচাপ পাতারা আঁকিবুঁকি করে
প্রায় মৃত হয়ে আসা জলের শরীরে,
মাঝেমাঝে দারুণ শূন্যতায়
কারা যেন ঘরে আলো জ্বেলে বসে
সাহেব-বিবি-গোলামের খেলা খেলে অনায়সে।
তাদের নিঃশ্বাস ভারি হয়-
পরষ্পর অবিশ্বাসের ঘৃণ্যতার বাতাসে।
সেখানে অর্ধেক চাঁদ ডুবে গেলে
ফ্যাকাশে সব বিকট গলায় ভেসে আসে-
‘কী লাভ হলো শেষে, তোমার কাছে এসে?’
ঝিরিঝিরি বৃষ্টিস্নাত রাতে
এসব কুতর্ক বুকে কিছু পেঁচারা হেঁটে যায়
সিলভিয়া প্লাথ আর টেড হিউজের বেশে।
অথচ অভিযোগের এই নোংরা নগরীতে
তোমাকে না পাওয়া ছাড়া
কোনো আক্ষেপের মেদ জমাইনি আমি-
শেষ ট্রেনের পরিত্যক্ত বগিটাতে।
এই মাঝরাতে
এই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ভেজা মাটির গন্ধ সাথে
মরে যেতে যেতে মনে হলো-
দু’জনই তো আছি, দু’জনের কাছাকাছি
যতদিন নিঃশব্দে থাকা যায়!
#ডেইজ_অব_কোয়ারেন্টাইন
২১ এপ্রিল, ২০২০
বনশ্রী, ঢাকা
১০
ঘুমের ঘোরে ব্যর্থ আকাঙ্ক্ষার সুখ ক্রমশ ব্যথা হয়ে ওঠছে,
এতদিন ভেবেছি- চাঁদ চলমান রাতে কেউ আসে; চুপিসারে,
পিপাসিত তারাদের মতো মিটিমিটি জ্বলে
চুমু খেয়ে যায় বকুলের বনে।
এ সকল অনিশ্চিত অস্থিরতার দ্বন্দ্ব ভেদ করে
কদাচিৎ আধভাঙা দেয়াল খুঁড়ে দেখি-
বুকের ভেতরে আকাশের সুদূরতা ছাড়া কোনো দৃশ্য নেই আজ।
তোমারও কি তাই মনে হয়?
এত অবিশ্বাস আর এত এত আলো-আধারে মেশানো অভিনয়ে ডুবে আছে পাথর হৃদয়।
সমাধান নেই!
আহত মাংসের তলে বারুদ ফুরিয়ে আসে বারেবারে।
তবু চলে যাবো বলেও তোমার কাছেই ফিরে ফিরে সবিস্ময়ে আসি, মৌমাছি!
কখনো অধিকার পাবো না জেনেও
গভীর অসুখে বেদনা আলিঙ্গন করে, দিলখুশ ভাবনায় দুলি!
যে হৃদয় নিজস্ব রূপ ভুলে উন্মাদ হয়ে ওঠে,
পৃথিবীর কোনো ব্যর্থতা সে রাখে না মনে।
সে শুধু চেয়েছে, জগতের সমস্ত হৃদয়-
উন্মাদ ভালোবাসায় সংক্রামিত হয়ে ওঠুক।
#ডেইজ_অব_কোয়ারেন্টাইন
২৮ এপ্রিল, ২০২০
বনশ্রী, ঢাকা
১১
কীভাবে জানি না অসুখ গভীর হয় অবকাশকালে
শুশ্রূষার নির্বিকার উদ্যানে
প্রিয় বেদনা ঘর বেঁধেছে হারিয়ে নিজের ঠিকানা
আরো দূরে, হারিয়ে ফেলার ভয় আয়োজন নিয়ে ঘুরে,
দেখি জানালায়- এই অন্ধকার জেগে থেকে থেকে একা কথা কয় কানে কানে,
কী যেন ব্যথায় অস্ফুট স্বরে
ঘুম পাড়াবার বড় সাধ তার হয়।
জানি, ভবিষ্যত চিরকাল আশ্চর্য একাকী
তুমি নয়নতারা, তোমার উপস্থিতিটুকু বুঝে নিয়ে
একসঙ্গে থাকি, বাকি সব বিভ্রম!
আমাদের জটিল জীবনের বিন্দু থেকে সরে যাচ্ছে কেবলই সঠিক সময়।
অন্ধকারের বিপরীতে, আমাদের কথাগুলোর বুকে বেজে ওঠে ঝড়ের সিম্ফোনি
ধীরে ধীরে টানি- এই মায়ামুখ আর আড়াল করি নিজেকে শঙ্খমালার কমজোরি সুতোয়।
তবু গোপন বাসনারা
কাছাকাছি কোনো স্থূল কোণে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে
পায়ে শেকড় গজায়।
ইচ্ছে হয় খুব- সরিয়ে দিতে কপালের চুল ঘুমঘোরে
একা একা রোজ রাতে
চোখের সমুদ্রের তলে নেমে যেতে যেতে
ইচ্ছে হয় ডেকে বলি-
ভুল! সে তো মানুষেরই হয়!
তবু তুমি জেনে রেখো মিষ্টি বকুল,
বড় বেশি কাছে এসেছিলে বলেই
এভাবে তোমাকে হারাই বারেবারে
যদি মনোযোগ দাও, তবে শোনো বলি-
এই দিন-রাত প্রতি ক্ষণে,
শুধু তোমাকেই চেয়েছি আমার সমস্ত দিয়ে!
#ডেইজ_অব_কোয়ারেন্টাইন
২৯ এপ্রিল, ২০২০
বনশ্রী, ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *