একাকী পায়ের ছাপ

শ্রীদত্তা বিশ্বামিত্রন


সেই লোকটার কথা অথবা তারই মতো। খয়েরি রঙ খয়াটে একজন, মনে রাখার মতন কিছুই নেই, এমন লোক। তার কথা। হবে নাই বা কেন? সে একা বলে কি একক? সামান্য বলেই কি নগণ্য?

 

অন্যরকমও হতেই পারত, কিন্তু সেসব কথা তো খবররের কাগজেই পড়া যায়। বড় বড় কথারা কলার উঁচু করে থাকে। কান পেতে তাদের শোনার প্রয়োজন হয় না, আবার চাইলেও তেমনভাবে শোনা যায় না। একাকী একাগ্রতায় হারিয়ে যায় লাউডস্পিকার, পড়ে থাকে পুরনো রেডিও। নির্জনতম দুপুরে উটের গ্রীবার নিঃসঙ্গতায় যখন অশ্বত্থ পাতার মৃদু ঝিরিঝিরি… সে এক বিশেষ শব্দ, যা শুধু অশ্বত্থের, বটের নয়, আম-জাম-জারুলের নয় — যা অন্ধকেও বলে দেয় প্রশ্নহীন নিশ্চয়তায় যে এই শীতলতা অশ্বথ-ছায়ারই… সেই নিবিষ্ট কর্ণময়তায় কি শোনা যায় মানুষের সোচ্চার সঙ্গীত, স্লোগান, কলহ-কোলাহল? তারার আকাশে কি গনগন করতে পারে উচ্চকিত এক সূর্য? অন্যরকম হতে পারত, কিন্তু আসলে অন্য কিছু হতেই পারত না। খয়েরি রঙ ক্ষয়াটে এক লোক তার বিস্মরণীয় ধূসরতায় যাবতীয় একাকী কথন সহ একাই ছিল, সেরকমই থাকতে হত তাকে। যূথবিচ্ছিন্ন ধুলোটে সব ধূসর মানুষের নিরালা অ্যাণ্টেনায় মৃদুতম ঝিরিঝিরি সিগনালে ধরা পড়তে পারত শুধুমাত্র তারই একাকী কথন, যা নিরুচ্চার হলেও স্বগতোক্তি নয়।

 

সেই লোকটা। তার অনুচ্চারিত কথন। মনে রাখার মতন কিছুই নেই, এমন যাপন। সেই তার বেলাভূমি। বালি পেরোলে সেই সমুদ্র, যা তার নয়। এসব মানুষের সমুদ্র থাকে না, বালি থাকে। বালিতে তার পায়ের ছাপ, যা থাকে না, জোয়ার আসার আগের ঢেউয়েই মুছে যায়। সমুদ্রে চলে যায় তার পদচিহ্ন, যেখানে সে নিজে যেতে পারে না। একা মানুষটিকে আরও একা ফেলে ভেসে যায় তার পায়ের গোড়ালি, আঙুল, বা তার বালুছাপ। তারা চলে যায় দূরতম দ্বীপের ওপারে। ফেলে যাওয়া এপারে সিকতা-খাতায় সন্ধের কোটাল পেরিয়ে তবু পড়ে ফেলা যায় তার পদাক্ষর বা তার ছাপ, মুছে ফেলার দাগটি সমেত। চাঁদ পড়ে। একা চাঁদ পড়ে। অনেক দূরে কোনো এক ফরাসী সৈকতে সেই এক চাঁদের জোয়ারে সেইসব মুছে যাওয়া পায়ের প্রত্নছাপ চিনে নিয়ে মুচকি হাসেন এক প্রয়াত দার্শনিক। বালু-শিল্প ভাঙার… ভেঙে গড়ার… গড়ে ভাঙার… তার অগঠনের, নির্মাণের, বিনির্মাণের জ্যোৎস্না সন্ধ্যা-ভাষায় কানে কানে পেরোয় মহাদেশ। বিস্মরণীয় পায়ের অন্যমনস্ক চিহ্ন আর পদক্ষেপের বিস্মৃত অর্থ অন্ধকারের আশ্রয়ে অবিস্মরণে পাড়ি দেয়।

 

খয়েরি রঙ ক্ষয়াটে সেই লোক আকাশের ছায়ায় রাত জাগে। ঢেউ শোনে সারারাত, ঢেউ বোঝে, গোনে না। ভোর শোনে। ভোরের ঘ্রান নেয়। ভোর দেখে। ভোর পেরিয়ে সকালে যায় নিয়ম করে… দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। সকাল পেরিয়ে দুপুর। দুপুর এলে তার তেষ্টা পায়। কি আশ্চর্য! তার সাগর নেই, নদী নেই, কিন্তু তেষ্টা আছে। তেষ্টা পেলে সারা গায়ে রোদ মুড়ি দিয়ে সে দেহের প্রতিটি রন্ধ্র থেকে অন্তর্জলের বাষ্প হয়ে যাওয়া আটকাতে চেষ্টা করে। তারপর ঝিনুক দিয়ে কুয়ো খোঁড়ে তটের শরীরে। রোজ খোঁড়ে। তারামাছের শব পেরিয়ে পৃথিবীর গভীরের দিকে যায়। একদিন না একদিন জলের সন্ধান পাবে ভেবে ঘড়ি ধরে কাজ করে চলে একাগ্র করণিকের নিষ্ঠায়। বছর পেরোয়। কর্মে কর্ম যোগ হতে থাকে প্রত্যহ। তার কর্ম অক্লান্ত কিন্তু নিষ্কাম নয় বলে মোক্ষ এসে ধরা দেয় না। জল ছোঁয় না তার কুয়ো, শুধু বালু উঠে আসে… অনন্ত ও সুগভীর বালুকণা। মধ্যাহ্নে অভ্রের মতো ঝলমল করে তারা… জলের মতো চিকচিক করে। বছর ঘোরে। সূর্যকে চারদিক থেকে দেখে ফিরে এসে খবর দেয় বুড়ি পৃথিবী। আবার বেরিয়ে পড়ে। লোকটাকে নিয়ে যায় না পরিক্রমণে। কেউ নিয়ে যায় না তাকে কোথাও। কেউ তাকে সাগর দেয় না, মোহনা দেয় না। শুধু দৈনিক বালির বরাদ্দ রেখে ফিরে যায় ঢেউ।

 

তা বলে এমন নয় যে নৌকো আসেনি। নৌকা তো সব ঘাটে আসে… সকল বন্দরে, বালুচরে। নোয়ার নৌকো আসে, মৎস্য অবতারেরও। প্রলয়-তুফান এলে কাকে নিয়ে যাবে আর কাকে নেবে না, তার তালিকা বানায়। প্রশ্ন করে। পরিচয় জানতে চায়, বৈশিষ্ট্য খোঁজে, অর্জন দেখতে চায়। লোকটা কিছুই দেখাতে পারে না। সামান্য এক নর সে। এককথায় “গড়পড়তা”। এই অসাধারণ সাধারণত্ব তার মধ্যে দেখে সেই কবে প্রাক-যৌবনে তাকে ছেড়ে চলে গেছে একান্ত প্রেমিকা। তখন থেকে সে আর পুরুষতর হতে পারেনি, জয়ী হতে পারেনি, বড় হতে পারেনি, বুড়ো হতে থেকেছে। মহাপুরুষ নয় সে, নারীও নয়, লিঙ্গ-পাঁচিল ডিঙোতে পারা মানুষও নয়। রাজা নয়, ধনী নয়, সন্ন্যাসী নয়, বিদ্রোহী নয়। কবি বা কথক, চিত্রী বা ভাস্কর, সুযন্ত্রী, নর্তক, নট, কারিগর, বিজ্ঞানী… কিছুই নয়। শুধু নিজের বরাদ্দ জীবনটুকু সে বেঁচে চলেছে নীরবে। শুধু নিজের কাজটুকু নিয়ে ব্যস্ত। একেবারে নিজের মাপের… নয় তার চেয়ে একটুও বড় কিম্বা ছোট। অ্যামিবা নয়, ভাইরাসও নয়। সিংহ, অশোকতরু, ম্যামথ, বটবৃক্ষ বা তিমি… এমন কিছুই নয় যাকে প্রলয়ের ওপারে ফের মনে পড়বে সুপ্তোত্থিত স্রষ্টার। নৌকো তাকে নেবে কেন?

 

সোনার ডিঙিও এসেছিল একদা অঘ্রান বিকেলে? ” ধান আছে? নতুন ধান? উৎসব এল গো!” একাকী মাঝি ডাক দিয়ে গেছিল একা মানুষকে। ধান কোথায় পাবে লোকটা? আজীবন কুয়ো খুঁড়ে তুলেছে শুধু বালি। আঁজলা ভরে সুবর্ণ-ধূলি নিয়ে ছুটল সে ডিঙিমুখো। “এই নাও ধূলিমুঠো, এই নাও ধূলিমুঠো। সোনামুঠো নিয়েছিলাম মা পৃথিবী, ধূলিমুঠো দিয়ে শোধ করলুম।” ডিঙি নিল না তার ধূলোবালি। অন্তত ফসলটুকু যদি থাকত তার! প্রলয়কালে নিজে নয় ভেসেই যেত, অন্তত কর্মফলের বোঝাটুকু দিয়ে যেতে পারত সুখী পৃথিবীর কাঁধে। এখন তার সারাজীবনের অর্জন এই অন্নত বালিয়াড়ি নিয়ে সে কী করবে?

 

এদিকে ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর বয়স হল। খবর এল, আর বেশিদিন নেই। এবার সে মরবে সবচেয়ে বেশি মাথায় তোলা ছোট ছেলেটির হাতেই। বুড়ি চিন্তায় পড়ে গেল। সে মরলে খোকাটিও বাঁচবে না। এখনো কোল থেকে নামেনি সে। বাঁচবে না অন্য সন্তানেরাও। দুর্ভাবনায় ভাঁজ পড়ল নোয়া, মীন ও ঈশ্বরের কপালেও। এবারে বাঢ়ে বুঝি ভেসে যাবে সকল প্রদেশ। নৌকা ডুবে যাবে আর বাঁচবে না কোনো প্রাণবীজ। দুরন্ত বালকটিকে থামাতে হবে। সে এক বিভ্রান্ত নটরাজ। প্রকৃষ্ট লয়ের তাল ভুলে যে ছন্দে সে নাচছে আগুনে, সেই নাট্যে ধ্বংস আছে, ধ্বংস পেরিয়ে সৃষ্টির বোলটি গেছে হারিয়ে। অথচ সে ভাবে মনে এই যেন সৃজন ছন্দ তার। সকল প্রত্নছাপ মুছে মাটি ছেনে বানিয়ে চলেছে নিজের মূর্তি অগণিত। দুরন্ত ক্ষুধায় সেই মূর্তিরা ছিঁড়ে খাচ্ছে বালকের পেশিতন্তু ও মেদ। যে জলের আয়নায় প্রথম নিজেকে দেখেছিল নার্সিসাস, সেই দীঘির শরীরে আর ঢেউ নেই… অপরিবর্তনীয় পারদ আর কাচ। অথচ তৃষ্ণা ভোলেনি সে। তেষ্টা পেলে সে কুয়ো খুঁড়তে বসে বল্লম হাতে। বন্ধুত্বের শব পেরিয়ে সে গর্ত খোঁড়ে পৃথিবীর বুকের ভেতর। অবিরাম খননে উঠে আসে বিটুমিন ও বালি।

 

 এমনিতর ভাবনায় হতাশ, নোয়া-মৎস্য-ঈশ্বর-পৃথিবী যুগপৎ ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস। সেই শ্বাস নীল হয়ে ভেসে থাকে লাল ধোঁয়া, কালো ধোঁয়া, বেগুনি ধোঁয়ার পাশে ক্লান্ত ওজোনের ফাঁকে ফাঁকে। তার নীল দুঃখ থেকে ট্রপোস্ফিয়ারে নেমে আসে এক অদ্ভুত কান্নার বিষ… ক্রুদ্ধ ভাইরাসের মতো। সেই বিষ ছড়িয়ে পড়ে বন্দরে বন্দরে, মানুষ থেকে মানুষে। বিষের ভয়ে মানুষ ভয় পেতে শুরু করে মানুষকে। এমনকি আক্রমণ করতেও ভয় পায়, পাছে ছোঁয়া লাগে। পিছিয়ে আসে, এড়িয়ে চলে, গুটিয়ে যায়। গুটিয়ে আনে নিজের দখল। সরিয়ে আনে সৈন্য। নিভিয়ে ফেলে চুল্লি। ভাঁজ করে পকেটে ভরে বাণিজ্য-জাল। ত্রস্ত মানুষ রাজপথ ছেড়ে ফিরে যায় গৃহে, গৃহ থেকে কোটরে, কোটর থেকে গুহায়। বহু সহস্র বছর পর আবার আলতামিরায় ফিরে গুহার প্রায়ান্ধকারে সে টের পায় পাথরের দেওয়ালে চিত্রিত অনড় মহিষের পাশে সে একা। যেন স্থির হলে সেই প্রাগৈতিহাসিক প্রাণের মতো সেও বাঁচতে পারবে তুষার ও সুনামি পেরিয়ে আরও বহু যুগ।

 

সেই নির্জনতার নৈঃশব্দ্যে তার অন্তঃকর্ণ জেগে ওঠে। বহুদিন পর টিভি ছাড়া, এফএম ছাড়া, হেডফোন ছাড়াও সেই গান শুনতে পায়… অবশিষ্ট কয়েকটি ঝিঁঝির। বাঁশবনের। বাতাসের। বাতাস বেয়ে একাকী শ্রোতার কানে আসে একান্ত একার স্বগত-স্বনন। একা আর একক থাকে না।

 

সব জাহাজ, সব নৌকা থেমে গেলে তবে বন্দরের তোয়াক্কা না করে অজস্র একা মানুষের ভেতর ছড়িয়ে যায় নিঃসঙ্গ বালুচরের ক্ষয়াটে মানুষের খয়েরি বেঁচে থাকা বা বেঁচে থাকার ছাপ অথবা ছাপের মুছে যাওয়া… মুছে যাবার দাগ, সেই দাগ সমেত ছাপ আর ধুয়ে যাওয়া পদচিহ্নের জীবন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *