ছন্দক, লোরকা ও পেসোয়া: তিনজন যাপন

ছন্দক চট্যোপাধ্যায়


আমি

২৭. ২. ২০২০

 

এই তো কাল – জন্মদিন পালন। আমার সবচাইতে নিকট জনের। কত লোকের আসা-আসি; চা-নোনতা খাওয়া। অঢেল কথা ঢালা-ঢালি। সারা দিন আমাদের ছোট্ট ফ্ল্যাট সরগরম। শুধু আমার মনেই অস্বস্থিকর প্রশ্ন: মৃত্যুর দিকে আরও এক পা এগিয়ে যাওয়া বলে? নাকি মৃত্যুকে আমরা কম-বেশি ভালবাসি বলে? আমরা কেউই কি মৃত্যুকে ভালবাসি? কত জন বলতে পারি: মরণে তুঁহু মম শ্যাম-সমান? আমি তো চাইনি আমার পরিচিত কেউ এই ভাবে শ্যামকে আপন করুক।

 

 

০৬.০৪.২০

 

আজ দিনটাকে ভাল হতে দিইনি। নিজে

ভাল না থাকলে অন্যকে ভাল থাকতে দিইনা।

এই খামখেয়ালিপনা দিনের পক্ষে ভাল না।

তাকে সঙ্গ দিতে হয় আমার মতো রামগরুড় কে।

 

 

 

০৮.০৫.২০

 

একাকিত্ব বুঝতেও পারত না

সে কত একা – যদি না সেদিন

প্রখর দ্বিপ্রহরে এক বিরাট তালা

ঝুলত – তারই বাড়ির মস্ত দরজায়

তাকে দাঁড় করিয়ে রেখে।

তার চিরিদিকে চক্ষু ফেরাল সে –

দেখল, বোধ করল অগাধ শূন্যতা।

একাকিত্ব পা বাড়াল শূন্যতার মধ্যে।

 

*

 

লোরকা

 

প্রতিটি গান

 

প্রতিটি গান

ভালবাসার

স্তব্ধতা।

 

প্রতিটি তারা

থেমে থাকা

সময়।

সময়ের

এক গুচ্ছ।

 

প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস

চিৎকারের

নিরবতা।

 

 

CASIDA DE LA ROSA

 

গোলাপ

খোঁজেনি প্রভাত:

তার ডালে প্রায় অনন্ত কাল

সে অন্য কিছু খুঁজেছিল।

 

গোলাপ

খোঁজেনি জ্ঞান বা ছায়া:

শরীরের সীমানা আর স্বপ্ন,

সে অন্য কিছু খুঁজেছিল।

 

গোলাপ

গোলাপকে খোঁজেনি।

গতিহীন আকাশে

সে অন্য কিছু খুঁজেছিল।

 

 

এটাই সত্যি

 

ওহ! আমি তোমাকে যেমন করে ভালবাসি

তেমন করে ভালবাসা কী কঠিন!

 

তোমার ভালবাসার কারণে বাতাস,

আমার হৃদয় আর আমার টুপি

আমায় আঘাত করে।

 

কে কিনবে আমার এই রিবন

আর এই সাদা সুতীর দুঃখ

রুমাল বানানোর জন্য?

 

ওহ! আমি তোমাকে যেমন করে ভালবাসি

তেমন করে ভালবাসা কী কঠিন!

 

CANCION DE JINETE (SONG OF THE RIDER)

কোর্দোবা

বহুদূরে, একা।

 

কালো ঘোড়া, পূর্ণ চাঁদ,

আর আমার পাশে ঝোলানো

বাগে অলিভ। যদিও আমি রাস্তা চিনি,

আমি কোনও দিন কোর্দোবা পৌঁছব না।

 

সমতল দিয়ে, বাতাসের মধ্যে দিয়ে,

কালো ঘোড়া, রাঙা চাঁদ।

মৃত্যু আমাকে দেখছে

কোর্দোবা মিনার থেকে।

আহ! কী লম্বা পথ!

আহ! আমার সাহসী ঘোড়া!

আহ! মৃত্যু আমার অপেক্ষা করছে

আমি কোর্দোবা পৌঁছোবার আগেই!

 

কোর্দোবা ।

বহুদূরে, একা।

 

CANCION DEL NARANJO SECO (SONG OF THE WITHERED ORANGE-TREE)

 

কাঠুরিয়া।

কাটো আমার ছায়া।

আমাকে পরিত্রান দাও

নিজেকে ফলহীন দেখার থেকে।

 

চারিদিকে আয়নায় ঘেরা টোপের মধ্যে

কেন জন্ম হল আমার?

দিন ঘোরে আমার চারি পাশে।

আর রাত্রি আমাকে জন্ম

দেয় তার প্রতিটি তারায়।

 

আমি বেঁচে থাকতে চাই নিজেকে না দেখে।

আর আমি স্বপ্ন দেখব পিঁপড়ে আর বাজপাখি

আমার পাতা আর পাখি।

কাঠুরিয়া।

কাটো আমার ছায়া।

আমাকে পরিত্রান দাও

নিজেকে ফলহীন দেখার থেকে।

 

*

 

আমি

..২০২০

চারিদিকে মাঠ-ভরা ভিড়
তবে
আমি এত একা কেন?
ভীড়, তুমি যাও।
একাকিত্ব, তুমিও।

“আমাকে আমার মত  থাকতে দাও”
ভীড়ে, গভীর-ভাবে একা ।

*

এই যে সময়
সময় না অন্য কিছু?
আমার চারিদিকে রয়েছে
কিন্তু নেই।
তবে কেন এত চাপ?
দু হাত দিয়ে চাপ সরাই
হাত গিয়ে ঠেকে কিসের দুধারে?

 

*

FERNANDO PESSOA AS ALBERTO CAEIRO

 

আমার তাড়া নেই। কিসের জন্য তাড়া?

সূর্য আর চাঁদ, তাদের কোনও তাড়া নেই; তারাই ঠিক।

তাড়া করা মানে ধরে নেওয়া আমরা আমাদের পা’কে অতিক্রম করতে পারি

অথবা নিজের ছায়ার ওপর দিয়ে লাফিয়ে যেতে পারি।

না, আমার কোনও তাড়া নেই।

আমি যদি আমার হাত বাড়িয়ে দিই, আমি ততদূরই পৌঁছব যতদূর আমার হাত পৌঁছায়,

তার থেকে আধ-ইঞ্চিও বেশি না।

আমি সেইখানে ছুঁই যেখানে আমার আঙ্গুল ছোঁয়, যেখানে ভাবি সেখানে নয়।

আমি যেখানে আছি শুধু সেখানেই বসতে পারি।

এই সবই কেমন হাস্যাস্পদ মনে হয়, সব যথার্থ সত্যের মত,

কিন্তু তা-ই সত্যি হাস্যাস্পদ যে আমরা সদা-সর্বদা কেমন অন্য কিছু ভাবছি,

আর আমরা কেমন অহরহ তার বাইরে, কারণ আমরা এখানে।

 

*

 

এখন, যখন আমি ভালবাসা অনুভব করতে পারি,

তখন আমার ঘ্রানে আগ্রহ জাগে।

তাতে আমার কোনওদিন কোনও আগ্রহ ছিল না।

এখন আমি অনুভব করি তাদের গন্ধ যেন নতুন কিছু দেখলাম,

আমি জানি তাদের গন্ধ আগেও ছিল, তেমনি ভাবে যেমন জানি আমি আছি।

এই সব জিনিষ আমরা বাহ্যিকভাবে আমরা জানি।

কিন্তু এখন আমি জানি, মাথার পিছনে নিঃশ্বাস থেকে।

এখন ফুলেদের এক স্বাদ আছে যার গন্ধ নিতে পারি আমি।

এখন অনেক সময় ঘুম থেকে জেগে উঠে গন্ধ পাই, দেখার আগেই।

 

*

 

রাস্তার বাঁকের ওপারে

একটা ইঁদারা থাকতে পারে, কিম্বা একটা দুর্গ,

নয়ত আরও কিছুটা রাস্তা।

আমি জানিনা আর জিজ্ঞাসাও করি না।

আমি যতক্ষণ রাস্তার বাঁকের এই দিকে

ততক্ষণ বাঁকের এই পর্যন্ত রাস্তাই দেখি,

কারণ বাঁকের আগের রাস্তা-টুকুই আমি দেখতে পাই।

কোনও লাভ হবে না আমি যদি অন্য কোথাও দেখি

বা যেখান আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না।

তারচেয়ে মন দিয়ে দেখা যাক শুধু এই – আমরা যেখানে আছি।

আমরা যেখানে আছি সেখানেই যথেষ্ট সৌন্দর্য, অন্য কোথাও নয়।

রাস্তার বাঁকের ওপারে যদি লোক থাকে

তারাই চিন্তা করুক রাস্তার বাঁকের ওপারে কি আছে।

তাদের জন্য সেটাই রাস্তা।

আমাদের যদি সেখানে আস্তে হয়,যখন পৌঁছোব সেখানে তখন জানব।

এখনকার মত আমরা জানি যে আমরা সেখানে নেই।

এখন শুধু রাস্তা আছে বাঁকের এপারে, আর বাঁকের আগে

আছে সেই বাঁক-হীন রাস্তা।

 

*

আমার দৃষ্টি সূর্যমুখীর মত পরিষ্কার।

আমার অভ্যাসই হল হাঁটার সময় রাস্তার
ডাইনে বাঁয়ে দুদিকে তাকানো
আর থেকে থেকে আমার নিজের পিছনে দেখা,
আর প্রতি মুহূর্তে যা দেখি
তা আগের মুহূর্তে কখনই দেখিনি,
আর আমি প্রতিটি জিনিস দেখায় পারদর্শী।
আমার ততটাই অবাক হওয়ার ক্ষমতা
যতটা অবাক হত একটি সদ্যজাত শিশু
যদি সে জানত সে সত্যিই জন্মেছে।
প্রতি মুহূর্তে আমি বোধ করি – আমি সত্যি এক্ষুনি জন্মেছি
একেবারে এক আনকোরা নতুন পৃথিবীতে…

একটা ডেজিতে যেমন  বিশ্বাস করি তেমনই এই পৃথিবীতে।
কারণ তা আমি দেখতে পাই। কিন্তু তার  সম্বন্ধে ভাবি না,
কারণ ভাবা মানেই না বোঝা।
আমাদের ভাবনা চিন্তার জন্য পৃথিবী তৈরী হয়নি
(ভাবা মানে সেই চোখ দিয়ে দেখা যে অসুস্থ)
শুধু দেখা আর তার সঙ্গে এক মত হওয়ার জন্য।

আমার কোন দর্শন নেই, অনুভূতি আছে …
আমি যদি প্রকৃতির কথা বলি তা এই জন্যে নয় যে আমি তাকে জানি
শুধু ভালোবাসি তাকে, আর শুধু সেই কারণে,
কারণ যারা ভালবাসে তারা জানে না তারা কি ভালবাসে
অথবা কেন ভালবাসে, অথবা ভালবাসা কি।
ভালোবাসা হল সরলতা,
আর গোটা সরলতা ভাবনা চিন্তা করা নয় …

 

*

 

ভগবান সম্বন্ধে চিন্তা করা মানে তাঁকে অমান্য করা,
কারণ ভগবান চান-নি আমরা তাঁকে জানি,
এই জন্যেই তিনি নিজেকে আমাদের কাছে প্রকাশ করেন নি…

এস, আমরা সহজ আর শান্ত হই,
গাছপালা আর নদীর মত,
তাহলে ভগবান আমাদের ভালবাসবেন, আমরা হয়ে উঠব
আমরা, যেমন গাছেরা গাছ
আর  নদীরা নদী,
আর আমাদের দেবেন সবুজ বসন্তে, যেটা তার ঋতু,
আর একটা নদী যেখানে আমরা যেতে পারব শেষ হয়ে যাব যখন …
তিনি আমাদের আর কিচ্ছু দেবেন না, কারণ বেশি দেওয়া মানে আমরা আমাদের চেয়ে কম হয়ে উঠব।

 

*

আমি জানি না কেউ সূর্যাস্তকে  কী করে দুঃখি ভাবতে পারে
একটাই কারণ হতে পারে – সূর্যাস্ত সূর্যোদয় নয়।
কিন্তু সে যদি সূর্যাস্ত হয়, সে কি করে কখনই সূর্যোদয় হবে?

 

 

One Reply to “

ছন্দক, লোরকা ও পেসোয়া: তিনজন যাপন

ছন্দক চট্যোপাধ্যায়


  1. ফের্নান্দু পেসোয়ার অনুবাদ ভালো লেগেছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *