যারা চিরলকডাউনে

প্রসূন মজুমদার


মগজের স্ক্রুগুলোয় একটু ঠোকাঠুকি করলেই যে ব্যাপারটা মনে হতে থাকে সেই কথাটা পেড়েই আজ শুরু করা যাক। আমরা, মানে এই মনুষ্যকুলের নাদান সুখবিলাসীরা সাধারণত ভূতের রাজত্বে বাস করতে ভালোবাসি। প্রথামাফিক এইক্ষেত্রে যে কথাটা বলে নেওয়া ভালো সেটা হল সুখবিলাসী শব্দটা আমি ভেবেচিন্তেই বলেছি। শেষদৌড়ে আমাদের দুঃখবিলাসও একধরনের সুখানুভূতি প্রাপ্তির চেষ্টাই বটে। যাই হোক, কথাটা হল ভূতের রাজ্য নিয়ে। ভূত বলতে এক্ষেত্রে অতীতকেই বলেছি। আমরা প্রায় কেউই বর্তমানে বাঁচি না। বাঁচি অতীতে। ভবিষ্যত সবার অজানা টাইপের আপ্তবাক্যের বোর্ড হৃদয়ে ঝুলিয়ে রেখে আমরা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মতো করে নিজেকে গড়ে তুলি না। আমাদের চেতনে, নিশ্চেতনে এমনকি সামগ্রিক নিশ্চেতন, মানে যাকে ইংরেজিতে বলে কালেক্টিভ আনকনশাস, সেই সামূহিক অ- জ্ঞানেও গ্যাঁট হয়ে বসে থাকে এই অতীতচারিতা।

ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজের ট্যাবুলা রাসাকে বারবার মুছে, নিকিয়ে চেষ্টা করেছি বর্তমান থেকে ভবিষ্যতে বাঁচতে।  কিন্তু স্বভাব না যায় মলে, ফলে স্ব- ভাব সুযোগ পেলেই ঘাই দেয়। লকডাউনের এই তালাবন্ধ ঘরযাপন তাই আচমকা আমার ভিতরেও ভূতেদের নামিয়ে এনেছে। অতীতের বিশেষত কচিবেলার কয়েকটা চরিত্র আমায় মাঝেমাঝেই দেখা দিচ্ছে আর হাসিমুখে বলে যাচ্ছে, ‘ ছোটভাই, মনখারাপ কোরো না।আমাদের কথা ভাবো। আমরা তো চিরলকডাউনেই দিব্যি কাটিয়ে দিলাম! ‘ এরপরে যদি আমি তাদের নিয়ে দুচার কথা এই লকডাউনের দিনকালে না বলি তবে নিজের কাছেই অপরাধ হয়।

লকডাউন – ১
চারিদিকে হইহই।বাজার জনসমুদ্রে থইথই। সরকার একটা নতুন অনুশাসন এনেছে।তার দুই নাম হোম – কোয়ারান্টাইন আর সোশাল ডিসট্যান্সিং। বিবেকানন্দের কল্যাণে আমরা প্লেগের সময়ের কারাটিঁন শব্দটা আগে শুনে থাকলেও সামাজিক দূরত্ব শব্দটা তখন একেবারে আনকোরা। শীতঘুমে যাওয়ার আগে তাই পিঁপড়েরা যেভাবে পিলপিল করে খাবার জোগাড় করতে বেরিয়ে পড়ে তেমনই ব্যস্ততায় মানুষ আগামীর খাবার জড়ো করতে প্রাণপণে ঝাঁপ দিয়েছে। তখনই মনে পড়লো মান্তুর কথা।মান্তু আমাদের বাড়িতে আজও আসে।বাসন মাজে আর ঝাঁট দেয়। মান্তু কী করছে এখন? হয়তো মানুষের এই সুখাদ্য খোঁজার হাভাতেপনা দেখে আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে আছে। মান্তু কী এসবে আর সত্যিই আশ্চর্য হতে জানে আজও? ওকে তো আমরাই শিখিয়েছি,বলা যায় মাথার ঘাম পা-এ ফেলে শিখিয়েছি, কী খেতে হয় আর কী খাওয়া যায় না।মান্তু এসব জানতো না। সকাল হলেই ওকে পাওয়া যেতো ছাইএর গাদায়, ছাই  বেছে বেছে অতি তৃপ্তি করে ছাই দিয়ে প্রাতরাশ করে নিতো ও। লাঞ্চে টালির টুকরো কিংবা গায়ে মাখার পাউডার পেলে একগাল হেসে ফেলতো আনন্দে। একবার অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে ওকে আমি পেয়ারাপাতা দিয়ে আনারসের পাতা চিবোতে দেখলাম বিকেলে। সেই মান্তু কীভাবে হজম করতো এসব তা সম্ভবত ডাক্তারি শাস্ত্রের অধিগত নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান যেহেতু আমাদের শিখিয়েছে মানুষে ওসব খায় না,তাই আমরাও ওকে মানুষ করে তুলেছি প্রায় দশবছরের টানা চেষ্টায়। এখন আর ও ছাই ঘাঁটে না তাই পাপ কোথায় লুকিয়ে আছে সেটাও বুঝতে পারে না আর। মান্তুও হয়তো এখন রেশন দোকানের লাইনে থলে হাতে দাঁড়িয়ে পড়েছে। কোয়ারান্টাইন শব্দটাও আগের মতো করেই ওকে শিখিয়ে ফেলবো আমরা।মান্তুও মাস্ক পরে ঘুরবে আর ওর প্রিয় লঙ্কাজবার মধু শুকিয়ে যাবে পুংকেশরের আগায়। সে মধুতে জিভ দেওয়া এখন পাপ,এখন লকডাউন ১।
লকডাউনের প্রথম দিনেই লোকজনের এইভাবে দোকান ফাঁকা করে দেওয়ার অকাতর আর্তির দিকে তাকিয়ে  আমাদের গ্রামের নবেদাকে আচমকা মনে পড়ে যায়। নবেদা মানে জয়দেব। মাঝেমধ্যে জালাখানেক চোলাই পেটে চালান করে দিয়েই নবেদা দার্শনিক হয়ে যেতো। পাশ দিয়ে সভয়ে চলে যেতে চাওয়া পথচারীর রাস্তা আগলে হামেশাই বলে উঠতো, ‘ ভয় পাবেন নে কত্তা।জয়দেব বলে নবে নাকি মদ খায় কিন্তু নবে জানে জয়দেব মদ খায় না’। সেই ছোটবেলায় নবে আর জয়দেবের দ্বিবিধ অস্তিত্ব নিয়ে আমরা বিস্তর হাসাহাসি করতাম। পরে ফ্রয়েড সাহেবের তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করে জয়দেব আর নবের একদেহে আলাদা অস্তিত্বকে যেদিন বুঝলাম সেদিন অতীতের সেইসব মজামস্করার জন্যে অপরাধী মনে হয়েছিল নিজেকে।যাই হোক, সেই নবেদা একদিন পান না করেই আহার করতে গেছিল এক চায়ের দোকানে।একটু বেশি খাচ্ছে দেখে দোকানি মজার ভঙ্গিতেই তার সঙ্গে বাজি ধরে বসে। দোকানের সব খাবার খেয়ে নিতে পারলে দোকানদার নবেদার কাছ থেকে এক পয়সাও নেবে না। নবে কালাতিপাত না করে খাওয়া শুরু করল, চা,চিনি,দুধ,বিস্কুট, পাঁউরুটির পুরো স্টক খালি করে দিয়ে শেষে যখন তাকে সাজানো মাটির গণেশটা মুখে পুরতে যাবে, মুগ্ধ খদ্দেররা তখন নবেদাকে আটকায়। লকডাউনের শুভারম্ভে জয়দেবদের নবে হয়ে যেতে দেখে তাই সম্ভবত আমার বিস্তর আমোদ হয়েছিল।

লকডাউন – ২

‘শীতকাল কবে আসবে, সুপর্ণা? / আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব।’ এমন একটা লাইন লিখে যে কবি সমসময়ের একগোছা তরুণ কবিতাপাঠকের মনে অলস বিষাদের জুইসঁস ছড়িয়ে দিয়েছেন সেই কবি বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই তাঁর চাহিদা পূরণের আনন্দঘন দুঃখ উদযাপন করতেন,’ কেন ঘুম আসে হৃদয় আকাশে ‘ টাইপের লাইনে দুঃখ ঢেলে দিয়ে। অথচ মজা হলো, কবির ছায়া-অনুসরণকারীদের

অনেকেই দেখা গেলো তিনমাস দূর তিন সপ্তাহর গৃহবন্দিত্বই মেনে নিতে পারছে না। এই ভাষ্কর অনুরাগীদের আলস্যবর্জন কর্মসূচি দেখতে দেখতে আমার বাসুদাকে মনে পড়ে গেলো। বাসুদা কখনওই দাবি করেনি যে ‘ কে যেন তার শরীরে ব্যাঙের রক্ত ঢুকিয়ে দিয়ে যায় ‘। সম্ভবত এতো সুন্দর করে দুঃখ যাপন করতে পারেনি বলেই বাসুদাকে আজও লোকে পাগল বলে। বাসুদা কখনও কোনও অর্থকরী  কাজ করেনি, খাবার জোগাড়ের জন্য পরিশ্রমকে সে মনে মনে ত্যাগ করেছে।তার আদর্শ, ‘জিভ দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি ‘। তার পেশা নিমন্ত্রণরক্ষা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে বিনা আমন্ত্রণে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতঃ বাসুদা দরিদ্রকে অন্নদান করার অপার্থিব পুণ্য গৃহস্থকে দান করে থাকে। খাওয়ার পরে পাতাটা ফেলতে বললে বাসুদা অবাক চোখে তাকিয়ে চুপচাপ উঠে আসে,তার মতে নিমন্ত্রিতকে স্বহস্তে পাতা ফেলতে বলা আসলে তাকে অপমান করা। বাসুদা গৃহস্থকে এই পাপ করতে দিতে পারে না। সেই বাসুদা আজও একটা দীর্ণ, জীর্ণ কুঁড়েঘরে একটা চৌকির উপরে দিনের প্রায় ২০ ঘণ্টাই শুয়েবসে কাটায়। একদিন তার বাড়ির সংলগ্ন মাঠে খেলার শেষে আমরা কয়েকজন বন্ধু বসে একটু গুলতানি করছি। সন্ধে সবে নামবে। দেখলাম বাসুদার ঘরের জানলা দিয়ে একটা প্রমাণ সাইজের কেউটে হেলেদুলে ঢুকে পড়লো। আমাদের বুক ছ্যাঁত করে উঠলো। জানলা দিয়ে উঁকি মারতেই দেখি বাসুদা বালিশে মাথা দিয়ে জানলার বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। খুব নিচুস্বরে বাসুদাকে বললাম, ‘ তোমার খাটের পায়ায় কেউটে’।  বাসুদা, মৃদু হাসলো, ‘তালাবন্দী আছি তো,ভয় কী? ও আসে। ঘোরেটোরে। ইঁদুর হয়েছে তো। খেয়ে যাক।  খাবার জন্যে কতো খাটনি এদের। ‘ বলতে বলতে বাসুদার চোখ বুজে এলো। বাসুদাকে আজও আপনারা আমাদের গ্রামে গেলে খুঁজে পাবেন। শুনলাম কয়েকদিন আগে বাবাকে জানলা দিয়ে  ডেকেছিল বাসুদা, জানতে চেয়েছিল, ‘ সবাই বলছে, লকডাউন। ওই নামের কিছু তো শুনিনি! আপনি কিছু জানেন, সেজদা?’

লকডাউন -৩

মাসখানেক ঘরবন্দী থেকে লোকজনের মাথা আউলে গেছে। যে ছেলেটার বাড়িতে এই দোলের দিনেও ঢুকতে গিয়ে তুমুল হোঁচট খেয়েছি আর চোঁ করে তিনতলা থেকে এক দৌড়ে নিচের গেটে এসে হাঁপিয়েছি তার সাধের কুকুরের তাড়া খেয়ে আর যে আমায় পুনরামন্ত্রণ জানিয়ে ওপর থেকে বলছিল, ‘ কুকুরকে চেনে বেঁধে দিয়েছি,আর ভয় নেই উঠে এসো’, সেই ছেলেটাও লকডাউনে আর থাকতে চাইছে না, বলছে তারও নাকি মাথাখারাপ হয়ে যাচ্ছে বন্দী থেকে থেকে, তারও নাকি কামড়ে দিতে ইচ্ছে করছে প্রশাসকদের।  এসব শুনে মটকা মেরে পড়ে থাকি আর আমার চোখে ভেসে ওঠে চুড়োদার সেই চাহনি।সে চাহনিতে কি কৌতুক ছিল?  চুড়োদা আমাদের বাড়িতে আসতো।এসেই বলতো ‘চুড়োপাগলা আর ঘরে থাকতি পারে না। কাজ দাও। খেতে লাগবে’। বাবাও কাজ দিত। কখনও কলাপাতা কাটা,কখনও ঘাস নিড়ানো।কাজের শেষে বরাদ্দ কুড়ি টাকা।কুড়ি টাকার তখন দাম ছিল। দশ পয়সায় তখনও মালাইবরফ পাওয়া যেতো।  কিন্তু চুড়োদাকে কুড়ি টাকার নোট দেওয়া যেতো না। দশ টাকার দুটো নোট দিলেও চুড়োদা নোটগুলো পায়ের কাছে ছুঁড়ে দিত। তারপর,নিজের বুকে দুমদুম করে কিল মারতে মারতে গরগর করতো,’ আমি কি অত পাগোল নাকি যে টাকার ব্যালু বুজবুনি? ‘ কাজের বিনিময়ে চারটে পাঁচটাকার নোট তার প্রাপ্য,তার জায়গায় একটা বা দুটো নোট দিলে তার তো রাগ হবেই! চারটে পাঁচ টাকার নোট হাতে দিলেই চুড়োদা একগাল হাসতো,’আমাদের তো খেটি খেতি হয়,পাগোল হয়ে ঘরে থাকার জো আমাদের আচে!’ আজ লকডাউনে হাজার হাজার মানুষ সরকারের কাছে যখন এই কথাই বলছে তখন কোনও লোক তাদের চুড়োপাগলা বলে ক্ষেপায় না। আমার কৌতুক জাগে।
কুদ্দুস বয়াতির মতো গেয়ে উঠতে ইচ্ছে করে, বিচার করলে সবাই পাগল, আমি পাগল একলা না।’

লকডাউন – ৪

দ্বিজদার কথা মনে পড়ে।দ্বিজদার নাম যে দিয়েছিল সেই লোকটার নাম যদি আমাকে কেউ দিতে বলতো তবে এককথায় আমি বলতাম নস্ত্রদামুস। মানুষ কতোটা দূরদর্শী হলে কোলের ছেলেকে দেখে বুঝতে পারে, এ ছেলে একদিন দ্বিজ মানে পাখির মতো গাছে গাছে উড়ে বেড়াবে! হ্যাঁ,দ্বিজদা যখন কোমরে দড়ি বেঁধে সব গাছ ছাড়ানো তালগাছের মাথায় ঝুলতে ঝুলতে তাল কাটতো তখন নিচ থেকে বাজপাখি ছাড়া তাকে আর কিছুই মনে হতো না আমার। সেই দ্বিজদা প্রায় তিনমাস না আসার পরে আমাদের বাড়িতে ফিরে এলো একদিন।দ্বিজদা আবার ফিরে এসেছে খবর পেয়েই আমরা পড়িমরি করে বেরিয়ে এসে দেখি দ্বিজদা পা ছড়িয়ে আমাদের দালানে বসে আছে। পাশে উবু হয়ে বসে বাবা দ্বিজদার কুশল-সংবাদ জানছে দুলে দুলে। ‘ কী করবো বাবু, ঘরবন্দী ছেলুম।  তিনমাস। কী করে বেরুব। মাকে দেখতে হবে নি? ‘
বাবা বললো,কেন গো, কাকিমার কী অসুখ করেছে?
দ্বিজদা একগাল হেসে জবাব দিয়েছিল,’ না গো কত্তা!  মাকে দেখতে হবে নে? ভেন্ন হয়ে গেলুম তো!  দাদার সঙ্গে সব হাফ-হাফ ভাগ হই গেলো। পুরো মাপে মাপে ৫০-৫০।  আমার ভাগে মা পড়লো,দাদার ভাগে বৌদি ‘।
নারীবাদী থেকে গাড়িবাদী আসলে সকলেই আমরা অর্থনীতির বাঁটোয়ারা দ্বিজদাদের সঙ্গেই করতে চাই। এমনকি কেন্দ্র আর রাজ্যের অর্থনীতির প্যাকেজেও আসলে মোদীদাদাদের ভাগে বউ পড়ে আর আমোদী এই ভাইলোগের ভাগে মা। হিন্দি সিনেমার হিরোর মতো যতই এখন ‘ মেরে পাস মা হ্যায় বলে তড়পাও না কেন, আসলে মিত্রোঁ তোমাদের মা ভাঁড়ে থাকা ভবানী বই আর কেউ কি?

One Reply to “

যারা চিরলকডাউনে

প্রসূন মজুমদার


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *