মফস্বল এবং তার বিলুপ্ত শামুকেরা

অলোকপর্ণা


রামতনুর ঠাকুমাকে মফস্বলী বিকেলবেলার পেটের মধ্যে দিব্বি মানিয়ে যেত। প্রতিদিনের নামতায় দেখতাম, বাঁশের যুবক লাঠি দাঁতে দাঁত চেপে প্রাণপন টেনে নিয়ে চলেছে ঠাকুমা আর তাঁর পিঠের কুঁজকে- নয়নদের বাড়ির দিকে, সেখানে একটু পরে মহাভারত পাঠ হবে। তারপর ঠাকুমা কুঁজ ভর্তি করে মহাভারতীয় গালগপ্প নিয়ে বাড়ি ফিরবে সন্ধ্যেবেলার আঁধারে। বুড়ির কুঁজের প্রতি মোহের শেষ ছিল না আমাদের। লাঠি, বুড়ি আর কুঁজ রাস্তায় নামলেই আশেপাশের বাড়ি থেকে প্রত্যেকে লোভীর দৃষ্টিতে বুড়ির কুঁজের দিকে চেয়ে থাকত। অথচ এছাড়া আর কোনো প্রসঙ্গে বুড়ির কথা কেউ বলত না কোনোদিন। মফস্বলে কুঁজ মানেই রামতনুর ঠাকুমা। আর বুড়ি মানেই তার কুঁজ। বুড়িকে দেখে দেখে মফস্বলী ধারণা হয়েছিল, খুব বেশি বেঁচে ফেললে কানফিসফিস খেলা মানুষ গুঁটিয়ে শামুক হয়ে যেতে থাকে। রামতনুদের বাড়ি গেলে বুড়ির কথা জিজ্ঞেস করলে ও আঙুল তুলে বাড়ির সাথে আলগা হয়ে লেগে থাকা বেড়ার ঘরের দিকে ঈশারা করত। রামতনু কানফিসফিস খেলায় আমাদের বলে পাঠাত, “ঠাকমা বেবাক শামুক হয়ে যাচ্ছে বুঝলি। কাল রাতে বৃষ্টির পর দেখি…” রামতনু চুপ হয়ে যেত দুম করে। কথা বলতে বলতে চুপ হয়ে যাওয়া যাদের স্বভাব, তাদের প্রতি মানুষের স্নেহ থাকে। সেবার বর্ষাকালে প্রথম লক্ষ্য করেছিলাম, প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা শ্যাওলা ধরা পাঁচিলের আকাশে শামুকদিদি হয়ে লেগে লেগে আছে। জীবনের সাথে জুড়ে থাকার এতই লোভ তাদের যে দেখে রাগ হল। ঝাঁটার কাঠি নিয়ে এসে খচ খচ করে শামুকদের মাংস খুঁচিয়ে দিতেই অনেকে তারাখসার মত পাঁচিলের আকাশ থেকে নিচের ঝোপে ঝুপ ঝুপ করে পড়ল ঝরে। বাকিরা নরম মাংস আগলে আত্মগোপন করল খোলসের অন্তরালে। মফস্বলী কান ফিসফিস খেলায় কিছু কথা আরও চালু ছিল, যেমন, খুব বেশি বেঁচে ফেললে একা মানুষ বোবা। খুব বেশি বেঁচে ফেললে একা মানুষ অন্ধ। খুব বেশি বেঁচে ফেললে একা মানুষ বধির। খুব বেশি বেঁচে ফেলা মানুষ তাই এসব হওয়ার আগেই একদলা মাংসের মত নিজের শরীরের ভিতরে লুকিয়ে পড়ে। শরীর যেন আসল মানুষ নয়, চিঠির খামমাত্র। চিঠিটা ভিতরে ভাঁজ করে কোথাও একটা ঢুকিয়ে রাখা আছে। রামতনুর ঠাকুমাও একা বোকা বোবা হয়ে কুঁজের মধ্যে গিয়ে আত্মগোপন করতে শুরু করেছিলেন।

এরপর একদিন রামতনু স্মৃতির ছেঁড়া পকেট দিয়ে এক টাকার কয়েনের মত গলে গেল। বুড়িও পুরোপুরি শামুক। রামতনুকে ফের কুড়িয়ে পেলাম যখন, ততদিনে রোদ তার মাথা খেয়ে ফেলেছে। পৃথিবী ধ্বংস হতেও আর মাত্র পাঁচ মাস বাকি, ২০১২ -র জুলাই। রামতনু তখন এক রোদ লাগা বাদামী মানুষ। আমায় দেখতে পেয়ে ভরা বাজারের মধ্যে কানফিসফিসিয়ে বলল, “টিয়াটি গাছের সাথে নিবিড়, তাই সে গাছের রঙ পায়। তোর গায়ে আমি তো কোনো রঙ দেখিনা বুবুন…”

 

পৃথিবী ধ্বংস হতে যখন সত্যি সত্যি এক মাস বাকি আর, ২০১২ সালের নভেম্বরে খবর পেলাম কুঁজি বুড়ি মরতে বসেছে। রামতনুদের উঠোন উপচে ভিড় জমেছে শেষবারের মত বুড়ির কুঁজের মহিমা দেখার বাসনায়। নয়নের মা মাসিরাও এসেছে গীতা পাঠের অছিলাতে। উঠোনে নামিয়ে রাখা হয়েছে বুড়ির শেষ সম্বল যাকিছু সব, বুড়ির ব্যক্তিগত সামগ্রী,- সমস্তই তার শ্মশানবন্ধু। পৃথিবীর সমস্ত অপ্রয়োজনীয় জিনিস মানুষ বাল্য আর বৃদ্ধাবস্থায় আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। দেখলাম রাজশেখরবসুর মহাভারত তখন গড়াগড়ি খাচ্ছে ধুলোর রোদে। বইটা কুড়িয়ে নিতে যাবো, তখনই কোত্থেকে এসে রামতনু বুড়ির কুঁজের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে কানফিসফিস খেলতে লাগলো। টের পেলাম উঠোনের উত্তাপ বেড়ে যাচ্ছে। আশেপাশের জটলামোদী মানুষেরা ভীনগ্রহী অপহরণের মত উবে গেল পৃথিবীর বুক থেকে। জরাজীর্ণ মহাভারত আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে দেখলাম বুড়ির কুঁজ মুরগির ডিমের অসহায়তায় ফেটে ফেটে যাচ্ছে। একটু পরে কুঁজের ভিতর হতে বেরিয়ে এলো একটা শামুক। কানফিসফিসিয়ে বলল, “মাঝে মাঝে চোখ বুজে ভেবো হাওয়ায় ভাসছ। পাখির মত নয়, পালকের মত নয়, কাগজ পোড়ানো ছাইয়ের মত, বাতাসে উড়ে যাচ্ছ, এদিকে ওদিকে। চারদিক ছেয়ে ফেলছ। বরফকুচির মত নয়, সুগন্ধীর মত নয়। অন্ধকারের মত।”

বলেই পিছলে পিছলে চলে গেল শ্যাওলা ধরা পাঁচিলের দিকে।

এর ঠিক এক মাসের মধ্যে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেল। যারা বেঁচে থাকল, তারা প্রেতমাত্র। মাটিতে তাদের এখন আর কোনো ছায়া পড়ে না। তাদের পদযুগল হাঁটুর নিচ থেকে উলটো করে লাগান। যার ফলে তারা কেউই কোনোদিন পা ভাঁজ করে গুঁটিয়ে শামুক হয়ে যেতে পারবে না। মানুষ আর তেমন করে শামুক হওয়ার মত নিবিড় বাঁচবে না কোনোদিন।

এখন মাঝে মাঝে যখন চোখ বুজি, দেখি, গরম বালির মধ্যে আমার হাঁটুর নিচ থেকে উলটো করে লাগানো পায়ের পাতা ডুবে যাচ্ছে। কোথাও কোনো হাওয়া নেই। ডানা নেই। ডানার কান্নাও নেই কোনো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *