ভয়

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়


একটা কবিতার শিরোনাম দিয়েছিলাম গেলবছর,মন মথুরাও চলে যেতে পারে। হ্যাঁ,নিশ্চিন্ত নিরাপদ(‘আপাত’ শব্দটা ফার্স্ট ব্র্যাকেটের মধ্যে রাখলাম) যাপনে বসে,যখন ইচ্ছে করলেই অনলাইন অথবা এজেন্ট মারফত রণে বনে জলে জঙ্গলে যেতে পারছি, তখন এসব লেখা খুব শোভা পায়। এখন?মন, জরাগ্রস্ত।
ভাবি, Sartre তাঁর একটা লেখায় লিখেছিলেন, when the privileged classes are happily ensconced in their principles, when they have good consciences, when they oppressed,duly convinced that they are inferior creatures,pride themselves on their servile condition, the artist is at ease…art could call itself humanistic because society remained inhuman.
না, এখনও আমি সুবিধেভোগী দলেই আছি।যে-সময়,যে ভয়ঙ্কর সময় কামু লিখবেন প্লেগ-য়ের মতো কিলবিলে জীবাণু সম্বল রুদ্ধশ্বাস উপন্যাস,যে-সময় , অর্থাৎ ১৯১৮-১৯১৯ নাগাদ স্প্যানিশ ফ্লু দেখা দিচ্ছে বিশ্বজুড়ে,এডওয়ার্ড মুংখের মতো শিল্পী অসুস্থ হয়ে ভয়ার্ত ছবি আঁকছেন। আবার সুস্থ হওয়ার পরের ছবিও আঁকছেন তিনি! (প্রসঙ্গান্তর হবে না হয়তো,এদেশেও ভয়ঙ্করভাবে আছড়ে পড়েছিল এই ফ্লু। কিন্তু শিল্প সাহিত্য সেভাবে ধরে রাখেনি সেই দুঃসময়কে। একজন লেখক,সত্যেন্দ্র ত্রিপাঠী তাঁর আত্মজৈবনিক লেখায় এঁকে গেছেন সে-ছবি,কিছুটা। কীভাবে শবদেহ উপচে উঠেছিল গঙ্গায়…)
আর, আমি শুধু ভিতু হয়ে পড়ি আরও।

ঘাসফুল দেখতে পেতাম।
তোমার ভোরের রান্নাঘরও।
টের পেতাম চায়ের চামচের শব্দ।
টাঙানো ছবিগুলোর রং।
যে বইটা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেছ কাল,আজ দেখতে পেতাম।
প্রচুর গল্প শুয়ে থাকতো আনোয়ার শাহ্ রোড জুড়ে।
অনেক  খিলখিল আর ফুলে-ওঠা হাসি দুশোচল্লিশ নম্বর বাসের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে যেত।
টিকিটের মতো উড়ে বেড়াতো হালকা দিনগুলো
চপকাটলেটের গন্ধ নিয়ে।
আমরা দুজনে দুজনকে লিখতে বসতাম তখন!

এখন চোখের সামনে কিছু নেই।
ভয় আছে।
(দেয়াল)
এমন কবিতা লিখে নিজেকে আর অন্যদেরও ভয় দেখাতে পারি শুধু। আমি দুর্ভিক্ষ, মহামারী, দেশভাগ কোনও বিপর্যয়ই প্রত্যক্ষ করিনি আগে। যেটুকু যা আঁচ পেয়েছি,যুদ্ধ,নকশাল আন্দোলন, তীব্র দাঙ্গাহাঙ্গামা,সবই অনেক মোড়কের ভেতর থেকে একটুখানি মুখ তুলে তাকিয়ে। আগুন, পায়ের পাতাটিও ছুঁতে পারেনি কখনও।
আজ কেমন সকাল হলেই আমি বুঝতে পেরে যাই, আমার আজকের দিনটা কীভাবে কাটবে।উঠব, বাথরুমে যাব,একপাক বারান্দায় রোদ্দুর খেয়ে নিয়ে চা-টা বানাতে বসবো।দিন গড়িয়ে যাবে এভাবেই, এভাবেই।জানা পথের বাঁকে গুঁড়ি মেরে বসে আছে অসুখ! দেখি না, টের পাই। নতুনভাবে বাঁচার কোনও দিক নেই, দিগন্ত নেই।সব, অন্ধকার।
লোকে গজগজ করে,’রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে সবাই,কেউ কিছু মানছে না…’, আমার ভাবনা পেছনদিকে হেঁটে যায়। কলাবাগান বস্তিঅঞ্চলে চলে যেতাম আর দেখতাম একেকটা ঘরে কমকরেও জনাপনেরো মানুষের বসবাস। ভোরের আলো ফুটলেই পথে বেরিয়ে পড়ে,রাত হলে কোনওমতে ঘরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ে।তো, এরা এখন কী করবে?এরা?
আমার খুব কাছের কিছু সবজি ও মাছবিক্রেতা,ট্যাক্সিচালক, রাজমিস্ত্রি,এরা এখন কী করবে?এরা?
অবরুদ্ধ দিনগুলো নিয়ে শিল্পচর্চা আর হয়ে উঠল না আমার। অপদার্থ মানুষের মতো ভয় পেতে পেতে দরজাজানলার পর্দা টেনে দিতে থাকি।

2 Replies to “

ভয়

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *