রাত্রি অথবা নিরাময়ের গল্প

প্রশান্ত গুহমজুমদার


অবসানের এই বিরহে কোথাও নিক্কন বাজিতেছে। আসিয়াছে এবং

চলিতেছে অনিবার। কেহ নাই, বলিবে, এইবার অপর গ্রহের কথা বলো

 

নবতর ফুর্তির আয়োজন, সময়ে সুন্দর অথবা অসুন্দরের উপাসনা, নিয়মমাফিক রমণ, বিলাস, বৈভব, ক্ষুধা কিংবা খিধের ভাবনা, মিথ্যে সুখ-অসুখের কল্পনা। অশেষ লোভ, ইঁদুর দৌড়, অসভ্য প্রতিযোগিতা, ঈর্ষা, অপ্রাপ্তিজনিত হতাশা। প্রতিটি মুহূর্ত শিকারযোগ্য। বিচিত্র ব্যস্ত রাজপথ, অন্ধ গলিতে ছায়াসব, আশ্লেষের গাঢ় শব্দ। অথচ কোথাও প্রেম নেই। তথাপি বিমূঢ় বোধ এক। অপরাহত ক্লান্তি। এ এক পরিচিত জীবনের চিত্র।

পথে, রেলব্রিজে, অন্য আরেক শরীর, মুখ, বাঁচার জন্য, স্রেফ বেঁচে থাকার তাগিদে আতুর হাত। পোস্টমর্টেমের বাতানুকুল ঘরে অপমানিতা, ধর্ষিতা, হত, মৃত লাশ। এইসব কিছুই এই পৃথিবীর এবং অন্য এক অপরিচিত জগতের গল্প।

ছিল। এমনই জীবন ছিল। যেমনই হোক, ছিল। রসে বশে ক্ষুধায়, অ-সুখে, ভালোবাসায়, পরাজয়ে, অপ্রেমে, জয়ে, ঈর্ষায়, প্রেমে, কলঙ্কে। আর ধ্বংসে। বিগত সত্তর হাজার বছরে মানুষ পরিবেশ জেনেছিল, অশ্রুর স্বাদ, হাহাকারের শব্দে উৎসব। আর ব্যবসা। অস্ত্রের উদ্ভাবনীতে, রক্তের প্লাবনে, হত্যার উন্মাদনায় সে ক্রমে অন্য আরেক ঈশ্বর। এই পৃথিবীর সব কিছুই হননযোগ্য তার কাছে। কেবল জিগীষা। নানাবিধ নামাবলীর আড়ালেও বহু বর্ণের ওই ঈশ্বরকে তোষণের প্রয়োজন কখনো ফুরিয়ে যায় নি।

আমরা করব জয়…’, কেবল স্বপ্নেই। আসলে মানবিকতার , মনুষ্যত্বের শত্রু যে কে, তাই সঠিক ভাবে আর চিহ্নিত করা হল না। কেবল ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে দরজাসব বন্ধ করে অমিত বিক্রমের এক মস্তিষ্ক নিয়ে তখন আমরা সকলেই ‘রক্তকরবী’র রাজা।

আর আমি? কোথায় ছিলাম আমি? এই বহুল মুখোশধারী সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত অস্তিত্ব? কোন কূলে? কেবল ইতিহাস আমাকে প্ররোচিত করছিল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আকাঙ্খায়। উপায়ান্তর না পেয়ে চেয়েছি কিছু নিঃসঙ্গতা। এত অবান্তর, এত ‘আমার’ আর নিতে পারছিলাম না। অসহ এই যাপন অসামাজিক এক জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। চাইছিলাম, কিছু অন্য রকম বসবাস। কিছু নিঃসঙ্গতা। হে পৃথিবী, দিলে। একেবারে সম্পূর্ণ ভরে দিলে।

এই পাওয়ার মধ্যে আমি অন্তত স্বেচ্ছাধীন ছিলাম। এক যাতায়াত ছিল। অন্তত সে সম্ভাবনা ছিল। দরোজা বন্ধ করেছি, জানালাও। নিঃসঙ্গতা প্রার্থিত ছিল, শোক নয়। তবুও ক্রমে সেই নিঃঙ্গতাকে ব্রাত্য করে এসে বসল এক অমোঘ রাক্ষস। যা চাই নি, তাও যেন এইবার তুমি দিলে। এক ভাইরাসের ছলে একাকীত্ব। নিষ্ঠুর এক দান। নিঃসঙ্গতা ছিল ঐচ্ছিক। একাকীত্ব হয়ে উঠল সম্পূর্ণ বশ্যতা, নির্দয়, আরোপিত। সেখানে যাতায়াত নেই। অভূতপূর্ব শোকের এক নবতর কোয়ারানটাইন। এভাবেই বসন্ত গেল। গ্রীষ্মও যাই যাই। ক্রমে সে হয়ে উঠল অদৃশ্য অব্যর্থ ভয়ঙ্কর। ধীরে প্রমাণিত হল, you will never feel alone, if you run down the stairs of loneliness; as every solitary step becomes your companion- এক অসহ্য মিথ্যা।

টের পাওয়া গেল, জীবন, যেখানে অভ্যস্ত ছিলাম যে যেমন, দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। তুমি কি সবই শুনতে পাও! তুমিও তো তবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলে দুর্মর অবাধ্যতায়, লোভে? অপরাহ্নের জানালায় অপেক্ষারতা আতুর সুন্দরকে ক্রমে করে তুলছিলে অসহিষ্ণু মুখর, ঝরিয়ে দিচ্ছিলে উন্মুখ সবুজ, নামিয়ে আনছিলে পাহাড়ের দেয়াল থেকে ভাঙ্গনের ভীষন শব্দ। তিন ভাগ জলের স্বাভাবিক চরিত্র বদলে দিচ্ছিলে। নির্দয়, নিস্পৃহ উদাসীন করে নিচ্ছিলে নিজেকে। অবাধ উন্মুক্ত যাপন, আকাশ, নীল, অলোকসাধারণ চন্দ্রিমা দূর, ক্রমে আরো দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছিলে! সেই অকালে একা হওয়ার শুরু আমার। শুধু আমার নয়। আমরা, যারা এই শোকে আক্রান্ত, তাঁরা সবাই। যে রাস্তায় আমরা পৌঁছে যেতে চাইছিলাম ঘরের নিশ্চিন্তে, যে শব্দে আলো বা অন্ধকার চয়ন করে নেওয়ার স্বাধীনতা ছিল, কিছুটা হলেও বদলে নিতে পারছিলাম শব্দের আকার, প্রকৃতি; অব্যর্থ একাকীত্ব সব অবান্তর করে দিচ্ছে। এপাশ ওপাশ থেকে মানুষ, ব্রাত্য অথবা প্রিয় ভেবেছি যাদের, নিঃশব্দে সরে যাচ্ছে। মুখটুকুও আর দেখা যাচ্ছে না। কোথায় যাচ্ছে তাঁরা! ময়ূর, প্যাঁচা, বনবিড়াল, কালো চিতা, পেঙ্গুইন, সিংহ নিঃশঙ্কে নেমে এসেছে পথে। কেবল সাইরেনের শব্দ। অ্যামবুলেন্স কিংবা শান্তিরক্ষকের। পথ থেকে সরে যাচ্ছে পথ, নিঃশব্দেই, প্রবল অভিমানে। স্বাভাবিক কথা সরে গেছে ঘর থেকে, পাছে সে-ও রাক্ষসে আক্রান্ত হয়, গ্রাস করে তাকে। চারপাশে কেবল ফিসফিস, চারপাশে অজস্র ঘেটো। চারপাশে শুধু বার্তা বিনিময়ের যান্ত্রিক শব্দ। আলো জ্বলছে পথে পথে, সে কেবল পায়ের শব্দ নয়, মানুষের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য। স্বপ্ন দেখতে ভুলেছে মানুষ। তার জন্য বরাদ্দ এখন কেবল নির্ঘুম রাত্রি। অপেক্ষা করছো তুমি। ভয়াবহ এক পরিণতির। আর এর মধ্যে, আমি আমরা, কোথায়? ঝুলন্ত ফ্যান দেখেছি বারবার। ভার নিতে পারবে! নির্ঘুম রাত্রে ছ’তলার কার্নিশে দাঁড়িয়ে অন্ধকারকে প্রশ্ন করেছি, মৃত্যুযন্ত্রনা কি দীর্ঘ সময় নেবে, খুব দীর্ঘ হবে! সাদা প্রভাতকে ঘৃণা করতে শুরু করেছি। কোথাও তুমি নেই। তোমাকে কতদিন দেখা হয় নি। একাকিত্ব জুড়ে থাকলো আমার সবটুকু। এক নিরাবয়ব অস্তিত্বের বিকট গন্ধ নিয়ে সে এলো। সে ত্রাস এক অপূর্ব! তার সর্বাঙ্গে সাদা অন্ধকার। তার ঘুঙ্গট বেজে চলে একই লয়ে, একই ছন্দে। আবেগ নেই, আনন্দ নেই, আলো নেই। ক্রমশ গ্রাস করছে তাকে, ওকে, আমাকে। আক্রান্তের প্রতিটি শ্বাসে উঠে আসছে সেই আহত নিশ্চিত অবসানের জন্য অপেক্ষারত মহিষের ছবি। প্রতি প্রশ্বাসে যন্ত্রণায় কেঁপে উঠছে আক্রান্তের শরীর। আসঙ্গলিপ্সা জেগে উঠছে প্রবল। কিছু প্রিয় মুখ দেখার বড় সাধ এখন। কিছু মুখ। নিঃসঙ্গতার জন্য প্রার্থনা হারিয়ে গিয়েছে কোথাও। চাইলে, একদিন তাকে দূরে সরিয়ে মিশে যেতে পারতাম সঙ্গদোষে, সংঘের চিলেকোঠায় কিংবা পথে। যে পথে যাওয়া, যে পথে জীবন, যে পথে আলো, ইচ্ছেবাতাস, কৌতুক। সামাজিক যাপনে বহুবিধ দূষণ আমাদের আশেপাশে হাঁটত, জড়িয়ে ধরতো, অসহ্য করে তুলতো সকাল বিকেল। তবু তো ছিল। ইচ্ছে মত ডুব দিতাম, হাঁসফাঁস করতাম, চাইতাম পরিত্রাণ, তথাপি আবার সংঘের কোলে।

সেই অকালে একা হওয়ার শুরু আমার। শুধু আমার নয়। আমরা, যারা সে অব্যর্থ, অসুন্দর ভয়ঙ্করে আক্রান্ত, তাঁরা সবাই। কুৎসিত একাকীত্ব সব অবান্তর করে দিচ্ছে। শ্বাসপ্রশ্বাসে এত যন্ত্রণা! বাতাস এত দুর্লভ! সুন্দর নয়, আজ কেবল অবোধ্য ভাইরাসের ঘুঙুরশব্দ, হিম যাতায়াত। আজ সর্বত্র শাসন করছে হারিয়ে যাওয়ার এক ভয়।

যেন, নিরাময় নেই আর। এখন কেবল রাত্রিশেষের নিরুপায় অনিশ্চিত অপেক্ষা। অন্য এক নিরুপম ভুবনের, অর্বাচীন প্রভাতের। কি ভাবছে আমাদের ভালোবাসার পৃথিবী?

১২ মে;

subhropoesia@gmail.com

 

নিরাময়

অপ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *