নিজস্ব আয়নার কাছে

রিমঝিম আহমেদ


ব্যাপারটা এমন, মৃত্যু দরজায় দাঁড়িয়ে। কেবল কড়া নাড়ার অপেক্ষা। যেমন প্রতিদিন সকালবেলা অফিসে যাওয়ার তাড়া ছিল, বিকেলে দরজায় নিয়ম করে কড়া নাড়ানো। ওপাশে কেউ দরজা খুললেই সপ্রতিভ হাসি। আজ আর বাইরে যাওয়া নেই, দরজায় কেউ কড়া নাড়ে না। যেন এই ইহজগতের সাথে সব সম্পর্ক চুকেবুকে গেছে। মানুষের অহংকার করবার আর কোনো অনুষঙ্গই অবশিষ্ট থাকছে না।

 

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যু। আর এপাশে মৃত্যুভয়ে সেঁধিয়ে আছে কিছু প্রাণ। প্রতিটি ক্ষণ গুনছে। ক্যালেন্ডারের পাতা লাফিয়ে চলছে, অথচ থমকে আছে জীবনের তরঙ্গ। দরজা খুলে দিলেই মৃত্যু আকর্ণ হাসি দিয়ে সম্ভাষণ জানাবে। তাই অবরুদ্ধ দিনরাত্রি ছায়ার মতো ঝুলে আছে শরীরের সাথে। অদৃশ্য কিন্তু কী সাংঘাতিক টের পাই!

 

এমন কি ভেবেছি কখনো, আমি আমাকে এতভাবে দেখব! যে সরু কাজলের রেখাটাও এতটা খুঁটিয়ে দেখা হয়নি। এতটা মনোযোগ দিয়ে আগে দেখা হয়নি বারান্দার টবের উদ্ভিদের জীবনচক্র। কীভাবে প্রগাঢ়  সবুজ পাতা হলুদে হয়ে ঝরে পড়ছে। আজ এতই অবসর, নিজের জীবন নয় শুধু, উদ্ভিদের জীবনও দেখি।

 

বদলে গেছে মানুষের জীবন ও যাপনের নৈমিত্তিক কড়চা। বড় শহরটা আজ অনিদ্রার রোগী নয়, শান্ত ঘুমের অতলে ডুবে আছে। কিছুই যেন করবার নেই। একসমুদ্র অস্থিরতা এসে ঢুকে গেছে মানুষের মস্তিষ্কে। কিছুই হচ্ছে না। কোথাও একটা বড়সড় অসুখ লেগে আছে। প্রকৃতি নিজেই সবাইকে গৃহবন্দী করে দিয়ে নিজেকে সাজিয়ে নিচ্ছে। এই নিত্যকার ধোঁয়াটে আকাশটা আজ ধোয়া কাচের মতো ঝকঝকে। আকাশটাও হারিয়ে যাওয়া পাখির ডানার কোলাহলে মুখর। ধূলো ধূসর গাছেরা শ্যামল  সবুজের মায়া ঝরাচ্ছে। কবিতার আদলে কী সব মিথ্যে লিখেছে মানুষ! সবকিছুকে অর্থহীন লাগে। আজ যদি ছিঁড়ে ফেলি মিথ্যের খাতা, অক্ষরের আগাছা, লেখার অসুখ কি সেরে যাবে?

এই অসুখী সময়ের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে যেটুকু আজ উপলব্ধি, মানুষ হিসেবে মানুষের আদতে কোনো অহংকার নেই। দেখছি মানুষ কতটা ঠুনকো। খামোকাই স্তরবিন্যাস করে, উঁচুনিচু বিভেদের ভাঁজে সমাজ, রাষ্ট্র আর মানুষকে আলাদা করে রেখেছিল। অযথাই মহামান্য জীবনের বড়াই করে গেছে। সব অহংকার আজ অনিশ্চয়তার তাপে গলে পড়ছে। মানুষের বিভ্রম কেটে যাচ্ছে সময়ের উপলব্ধিতে।

 

মানুষ থেকে মানুষের দূরত্ব কতটা? কোনো দিন মাপা হয়নি! সে যে নিত্য রুটিন মেনে আয়নার সামনে দাঁড়ানো, টিপ ও চোখের মাপ— কাজলের সরু রেখা ছুঁতে গিয়ে অন্য কাকেই ছুঁয়েছি যেন! নিজেকে তো নয়। কেন, নিজেও তো এইসব নাকমুখ চোখ, মানুষের আদলে একটা আস্ত মানুষ! কেন তবে তাকাইনি নিজের দিকে? এই অফুরন্ত অবসরে আমি আর জানালা পাতানো বোন। ঘুমের রেশ কেটে গেলে, চোখের মাদকতা মিলিয়ে এলে আমি আর জানালা ওপেনটি বায়োস্কোপ খেলি। জানালা যেন আমাকে আরও আমার কাছে এনে দেয়। বলে, ছেলেবেলার গল্প, বটফুল আর সুঁইচোরা পাখিদের গল্প। এক পা ভাঙা রেহেলের ফাঁকে অলস পড়ে থাকা আমপারা, আলিফ লাম মীম… মায়ের পাকঘরে পোড়া পাতিলের গন্ধকেও তর্জমা করে দিয়ে যায়। আর, ভাবি- কেন মানুষ থেকে মানুষ এতো দূরে!  কেন আমরা খুঁজে পাইনা কারুর পুড়ে যাওয়া হৃদয়ের আন্দাজ। আগুন ও ধোঁয়ার রসায়ন।

ফলত পালং শাকের হলুদ হয়ে যাওয়া, উনুনের শিখা কেমন ফুঁসে ওঠে প্রশ্রয় পেয়ে সেটুকু দেখার অবসরে কত কী ভাবি!

মায়ের কাঁঠালগাছের ছায়ার নিচে কতদিন স্নান করা হয়নি! সেই জীর্ণ জর্জরিত মাটির ঘরটি এতিম শিশুর মতো ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তার গায়ে কি আর হাত বুলানোর সুযোগ আসবে? আর কী সবুজ পাসপোর্টটা নিয়ে যেতে পারব স্বপ্নের স্বর্গরোহিণীর কোলে?

 

ঘুম ভাঙলে জানালা, ভোর ফাটলে জানালা। জানালা ছাড়া আমাদের আর গন্তব্য কই! আলোর যৌবন ক্রমান্বয়ে ফিকে হয়ে আসাটা দেখা হয়। পাশের ফ্ল্যাটের ফোকলা দাঁতের শিশুটির হাসি, বৃদ্ধটির সারাদিন ছাদবাগানে মায়াচাষের বিবিধ ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়া কখনো এমন করে দেখা হয়নি। দূর ছাদ থেকে ঘুড়ি ওড়ানো যুবকের দল যেন বসে আছে উড়বে বলে। ওড়ার অপারগতা থেকে হয়তো ঘুড়ি ওড়ায় ওরা। ব্যস্ততা ও স্বার্থপরতার ফাঁক গলে যেসব সম্পর্কে উঁকি দেওয়া হয়নি, আজ ইথারে উষ্ণতা পাঠিয়ে দিই। বলি- ভালো থেকো, বেঁচে থেকো! আর ভেবে দেখো, চিড়িয়াখানার আর কি কোনো দরকার আছে? নিজের বন্দিত্বের ইতিহাসের দিকে তাকাও তবে!

 

গ্রামে যাওয়া হয় না অনেকদিন। যদি জানতাম এই ইটের নগরে এভাবে আটকে যাব, তাহলে এই বন্দিত্বের মুক্তি খুঁজতাম গ্রামের সবুজে। অনেকদিন সেই গাছগুলোর সাথে কথা বলা হয় না। সঙ্গহীনতায় ওদের ছাল-বাকলে রুক্ষতা এসেছে। যেচে গিয়ে একটু জল দেওয়ার, নিড়ানি দেওয়ার কেউ নেই। এতিমের চেহারা নিয়ে ওরাও অপেক্ষা করে আছে কোনো দয়ালু হাতের। যেতে পারলে খানিক ওদের যত্ন নেওয়া যেতো।

এই ঋতুতে গামারি গাছটায় হলুদাভ ফুল এসে মাটিতে বিছিয়ে থাকে।  মালা গাঁথবার কেউ নেই। আজকের শিশুরা তো জানে না এই বুনোফুলে কী চমৎকার মালা গাঁথা যায়। মায়ের মতো মায়াবিনী শিমুল গাছটিও মরে গেছে আরও আগে। তার লালে আর উঠোন ভরে থাকে না।  আমের মুকুল এসেছে, স্বল্পায়ু জীবন নিয়ে কাঁঠালের মুচি সবুজ পাতার ভেতর মাথা তুলে তাকিয়ে থাকে কালো হয়ে ঝরে যাবে বলে। আমি পুরোটাই গ্রামের। কিন্তু গ্রাম কি আর আমার আছে পুরোটা! মানুষগুলো শেকড় বিচ্যুত হতে চায়, নগরের চাকচিক্য ওদের টানে। আর আমিই যেন-বা আদিগন্ত গেঁয়ো।

 

যদি আর যেতে না পারি? যদি এই ইচ্ছেগুলো এখানেই থির হয়ে যায়! কী হবে, মরার পর তো আর কোনো জীবন থাকে না—অপেক্ষা থাকে না। থাকে না ছিটকে পড়তে পড়তে ফের বেঁচে যাওয়ার দারুণ এক অভিযানের অভিজ্ঞতা । এখন শুধু তাকিয়ে থাকা। এখন শুধু একটা দারুণ ঝরঝরে জরাহীন সকালের অপেক্ষা।  শেয়াল-কুকুরের অবহেলা নিয়ে, চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে মরে যেতে আমিও চাই না। হাজার হোক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রাণি হিসেবে আমার ওটুকু নির্দোষ অহমিকা আছে। যদিও প্রকৃতিকে ধ্বংস করায় আমারও অংশগ্রহণ কিছু কম নেই।

 

দুপুর ফাটছে পাকা ডালিমের মতো। যেভাবে আমাদের চারপাশে মৃত্যু ফেটে উঠছে, জানি না টিকে যেতে পারব কিনা এই মহাবিপর্যয়ের থাবা থেকে। যদি না টিকি, যদি হঠাৎ থেমে যায় রক্ত সংবহন!  যদি ফুসফুস বাঁচিয়ে রাখাকে অস্বীকার করে!

 

প্রতিদিন বিকেলগুলো জানালার কাছে এসে থমকে দাঁড়ালে ছাদে উঠি। ফাঁকা নগরীর আকাশে একা, কদাচিত দল বেঁধে পাখিরা যায়। যে পাখিগুলো মানুষের ভয়ে কোথায় না কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল, আজ আবার তারা ফিরে এসেছে। নির্ভয়ে ডানা মেলছে। মনে হয়, এই পৃথিবীটা পাখিদের, আমরা খানিকটা ভাগ পেয়েছিলাম। আর স্বার্থপরের মতো তাদের পৃথিবী থেকে তাদের চ্যুত করে আমরাই দখল করেছি সবটা। স্বার্থপরতার কিছু শাস্তি তো পেতেই হয়!

যদি না টিকি, যদি হঠাৎ থেমে যায় রক্ত সংবহন!  যদি ফুসফুস বাঁচিয়ে রাখাকে অস্বীকার করে!

ভাবছি কারুর কোনো আঘাত মনে রাখব না। যারা আঁচড়েছে শাণিত নখরে, কামড়েছে বিষদাঁতে তাদেরও ক্ষমা করে দেব, দিয়েছিও।

আর যদি বেঁচে থাকি—সম্পূর্ণ নতুন করে বাঁচব। নিজের কাছাকাছি থেকে, নিজেকে আঁকড়ে ধরে বাঁচব।

One Reply to “

নিজস্ব আয়নার কাছে

রিমঝিম আহমেদ


  1. মগজের গভীরে বিঁধে গেলো সত্যকথাগুলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *