অন্তরীণ দিন

যূথিকা আচার্য্য


বিশ্বাস করুন, প্রথমে কিন্তু সত্যিই বুঝিনি যে এমনটা হতে পারে। লকডাউনের কথা বলছি।

মেনে নিয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নিইনি শুরুর দিকে। সুপার মার্কেটে টয়লেট পেপার রোল নিয়ে মারামারি হলে নিজেদের মধ্যে ইন্ডিয়ান লোটা সিস্টেমের এফেক্টিভনেস নিয়ে ইয়ার্কি মেরেছি। কিন্তু মার্চের প্রথম সপ্তাহে টুইটারে ইটালীর মৃত্যুমিছিলের ছবি দেখে সবকিছু ওলোটপালোট হয়ে গেল। হোয়াটস্অ্যাপ, ফেসবুক গ্রুপে সবাই চুপচাপ। কারোর মুখে কথা নেই। সত্যিটা মেনে নিতে বড় কষ্ট হচ্ছিল। আমরা তবে সর্বশক্তিশালী নই। দ্য মাইটিয়েস্ট অফ্ অল্! ওয়েল, ইটস্ নট আস্! খালি চোখে দেখা যায় না এমন একজন এসে আমাদের সামনে যেন আয়না তুলে ধরল। তারপর ধাক্কাটা সামলে নিয়ে আবার উঠে দাঁড়ালাম।

আমরা দুজন, মানে আমি আর আমার কত্তাবাবুটি থাকি সেন্ট কিলডার অ্যালমা পাড়ায়। মেলবোর্নের সবচাইতে পুরোনো সাবার্বগুলোর মধ্যে একটা। এই কারণে রাস্তায় দুপাশে প্রচুর ভিক্টোরিয়ান ডিজাইনের বাড়ি দেখতে পাওয়া যায় এখনও। দিব্যি সুন্দর লাগে দেখতে। ঝিরিঝিরি ফিলিগ্রীর ঝালর দেওয়া মস্ত বড় জানালা। বারান্দার রেলিং বেয়ে লতিয়ে ওঠা আইভি লতা। দোতলা বাড়িগুলোর ব্যালকনিতে ছোট ছোট টবে ফরগেট মী নট আর স্প্রে রোজের রঙের বাহার সকালের নরম রোদেও ঝলমল করে। বাড়ি থেকে সামান্য দূরে একটা জুয়িশ স্কুল রয়েছে। সেখানে আগে সবসময় চুন্নু মুন্নুদের চ্যাঁ ভ্যাঁ লেগেই থাকত। সেসব এখন বন্ধ। এছাড়া বাড়ির সামনের রাস্তায় চলতে থাকা গাড়ির আওয়াজও আর শোনা যায় না তেমন। মোড়ের মাথায় মাইক সহকারে পিড়িং পিড়িং গীটার বাজিয়ে গান গাইত একটা পোলিশ ছেলে। গান শুনে লোকে ডলার দিত ওকে। সেই গানের আওয়াজও নেই আজকাল। সকাল বেলা থেকেই বিচিত্র আওয়াজে সরগরম হয়ে ওঠা আমাদের অ্যালমা পাড়া যেন কবরখানার মতো স্তব্ধ হয়ে গেছে।

লকডাউনের ফলে অস্ট্রেলিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ও স্টেট বর্ডার দুইই বন্ধ অনির্দিষ্ট কালের জন্য। বাড়ি থেকেও বেরোনো যাবে না। আর্থিক ভাবে বিপর্যস্ত অবস্থা অনেকেরই। অলরেডি প্রায় দশ লক্ষ মানুষ চাকরি খুইয়েছে। তবে এও বলবো যে এখানে সরকার যথেষ্ট সাহায্য করছে। করোনার অভিশাপে চাকরি হারিয়েছে যারা তাদের জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হোমলেসদের জন্যও আশ্রয় ও তিনবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ল্যান্ডলর্ডদের বলা হয়েছে পরিস্থিতি বুঝে তারা যেন টেনান্টদের প্রতি সদয় ব্যবহার করেন। কেউ যদি প্রমাণ দেখাতে পারে যে করোনার কারণে তারা ইনকাম হারিয়েছে, তাহলে ল্যান্ডলর্ড তাকে অন্তত মাস দুয়েকের জন্য আশ্রয় দিতে বাধ্য। প্রতিবেশীরাও একে অপরকে যথেষ্ট সাহায্য করছে। সুপার মার্কেট আর কেমিস্টের দোকান ছাড়া বাকী সবকিছু বন্ধ এখন। যেসব ব্যস্ত জয়েন্টগুলোতে সরষে ফেলার জায়গা পাওয়া যেত না, সেখানে লিটারেল অর্থেই ঘুঘু চড়ছে। ছোটো ব্যবসায়ীদের সেন্টারলিঙ্ক থেকে সাহায্য করা হচ্ছে যাতে তারা সারভাইভ করতে পারে। সেদিক থেকে বলব কোভিড 19-এর প্রতিরোধে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। পুরো মহাদেশে এখনও পর্যন্ত করোনা পজেটিভের সংখ্যা সাত হাজারের নীচে এবং মৃত্যু একশোর কাঁটাও ছোঁয়নি এখনো। ইকনোমির যদিও বারোটা বেজে গেছে অলরেডি। তবে এটাও ভাবছি যে অ্যাটলিস্ট প্রাণে তো বেঁচে আছি আমরা। ইটালী, স্পেন, বা আমেরিকার কথা ভাবলে শরীর শিউরে উঠছে।

আমরা এখন সকাল সন্ধ্যায় ব্যালকনি বা বারান্দা থেকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে গপ্পোগাছা করি। খোলা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা কফির মাগ হাতে উচ্চঃস্বরে আড্ডা হয়।

“মিস্টার লিউ, আপনার মেয়ের পিয়ানো ক্লাস কেমন চলছে?”

“ সারা, তোমার কলিগের সঙ্গে ঝামেলা মিটলো?”

“মিসেস টেয়লর, ফেসবুকে আপনার নতুন ডিপি দেখলাম। এই পীকক কলারের গাউনটা নতুন কিনেছেন বুঝি? দারুণ লাগছে কিন্তু।“

“গ্র্যান্ডমা লেনা, তোমার হাঁটুর ব্যাথাটা কেমন আজকাল। ওষুধ লাগাচ্ছো তো? কিছু লাগলে হেজিটেট করো না। সঙ্গে সঙ্গে বলবে একদম।“

“সালভাদোর, বলি খবর কী তোমার! আজকাল যে তোমার টিকিরও নাগল পাওয়া যায় না। পাড়া প্রতিবেশীদের ভুলে গেলে নাকি!”

এটা লকডাউনের একটা ভালো দিক। কাজেকর্মে ব্যস্ত থাকায় কখনোই যাদের সঙ্গে কথা বলা হয়ে ওঠেনি, এখন তাদের সঙ্গেও যেন নতুন করে আলাপ হল। অনেকের হিডেন ট্যালেন্টও বেরিয়ে আসছে লকডাউনের গুঁতোয়। সালভাদোর যে এত সুন্দর ব্যাঞ্জো বাজায় তা কে জানত! গ্র্যান্ডমা লেনা নাতনির সাহায্যে ফাইনালি তাঁর স্বর্গীয় অ্যাপেল পাই আর পাম্পকিন স্যুপের সিক্রেট রেসিপি ফেসবুকে আপডেট করতেই সবাই হুররে বলে লাফিয়ে উঠলাম। অমন পাম্পকিন স্যুপ খাওয়ার পর মরে গেলেও দুঃখ নেই। পাশের বাড়ির থমাস লজ্জা লজ্জা মুখে জানাল যে তার প্রেমিকা ন্যাটালী ফাইনালি তাকে বিয়ের জন্য “হ্যাঁ” বলেছে। স্কাইপেই প্রপোজ করেছিল সে। শুভেচ্ছার বন্যা বয়ে গেল অমনি চারদিকে। ব্যস লকডাউনটা উঠলেই ওরা বিয়ের ডেট ঠিক করবে। মিস্টার টেয়লর বলতে যাচ্ছিলেন, “গেল হে তোমার সুখের দিন।“ জাঁদরেল মিসেস টেয়লরের ধমক খেয়ে তিনি চুপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন।

দুদিন অন্তর বিকেলের দিকে পার্কে হাঁটতে যাই। ওইটুকু না করে উপায় নেই। বেসমেন্টে ফ্ল্যাট না হলে ধুপধাপ লাফালাফির শব্দে নীচের ফ্লোরের লোকজন কমপ্লেন করবেন। সবদিক ভেবেচিন্তে চলতে হয়। গতকাল যাওয়ার পথে জুয়িশ স্কুলের প্রিন্সিপাল মিস্টার বেলসনের সঙ্গে দেখা হল। উনি তখন বাগানের গোলাপ গাছে জল দিচ্ছিলেন। পরনে খাকি শর্টস আর একখানা হাফহাতা টিশার্ট। আমাদের দেখে টুপি খুলে শুভসন্ধ্যা জানালেন। আমি প্রত্যুত্তর দেওয়া মাত্রই বললেন,

“অত মনমরা হয়ে গুড ইভনিং বলছ কেন? ট্রাই টু লুক অ্যাট দ্য ব্রাইট সাইড।“

আমি চোখদুটো সরু করে তাকালাম ওঁর দিকে,

“মহামারীর মধ্যে ব্রাইট সাইড!”

মিস্টার বেলসন ওঁর গোলাপ বাগানের দিকে দেখিয়ে বললেন,

“পাশেই স্কুল। খুদেরা যখন তখন রেলিং ডিঙিয়ে এপাশে এসে গোলাপ ফুল ছিঁড়ে নিয়ে যায়। সাধ করে সাদা গোলাপের বাগান বানালাম, অথচ ফুল ভালো করে ফোটার আগেই কেউ না কেউ এসে তুলে নিয়ে যেত। লকডাউনের ফলে গোলাপ তোলা বন্ধ। এখন দেখ দিকিনি আমার বাছাদের দিকে।“

দেখলাম সত্যিই। গোলাপ গাছে ফুলের হাসি যেন আর ধরে না। তারপর মিস্টার বেলসন বললেন,

“ বাগানের ভেতরে এস, একটা দারুণ জিনিস দেখাবো।“

সোশ্যাল ডিসট্যান্স মেইনটেইন করেই বাগানের ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালাম। উনি আঙুল দিয়ে বাঁদিকে দেখালেন,

“দেখ, কিন্তু কাছে যেও না।“

দেখি গোলাপ গাছের দুটি ডালের মধ্যে খরকুটো দিয়ে একটা খুদে সদ্যনির্মিত হনিইটার পাখির বাসা। সেখানে পক্ষী দম্পতি দুজনে কূজনে জমজমাটি প্রেম কচ্ছেন । আমরা হেসে বললাম,

“ ও বাবা, দারুণ তো। আপনার বাগানের নতুন অতিথি নাকি?”

উনি বললেন,

“ওদের নাম দিয়েছি উইলিয়াম আর মেরী। উইলিয়াম এই বাগানেরই বাসিন্দা। কিন্তু মেরী এসেছে কিছুদিন আগে। উইলিয়াম সেই যাবৎ তার মন জয় করার চেষ্টা চালাচ্ছিল। কিন্তু স্কুলের চেঁচামেচির জন্যই হোক বা গোলাপের অভাবে, উইলিয়ামের বাসাখানা মেরীর ঠিক পছন্দ হচ্ছিল না। সে বিয়েতে মোটেই সম্মতি দিচ্ছিল না। থ্যাঙ্কফুলি লকডাউনের জন্য স্কুল বন্ধ আর গোলাপ ছিঁড়ে নষ্টও করছে না আর কেউ। তাতেই দেখ ওদের প্রেম জমে কেমন ক্ষীর হয়ে উঠেছে।“

আমরা কথা বলতে বলতে দেখলাম, উইলিয়াম আর মেরী আমাদের পাত্তাও দিল না। তারা ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে প্রেমালাপে মগ্ন। মিস্টার বেলসনকে বললাম,

“বোধহয় আপনি ঠিকই বলেছেন।“

“বোধহয় মানে, আলবাৎ আমি ঠিক বলেছি। পৃথিবীটা শুধু আমাদের জন্যই নাকি? পশু-পাখি,গাছপালা, কীটপতঙ্গেরা তাহলে কোথায় যাবে? মে বি ওরাই কমপ্লেন করেছে আমাদের নামে। দেখ তো ওদের দিকে, কত সুখে ঘরকন্না করছে দুটিতে।“

হেসে বেরিয়ে এলাম বাগান থেকে। চারপাশে এত মৃত্যুর খবরের মধ্যে কোথাও তো একচিলতে আনন্দ পাওয়া গেল। হলই বা সে ছোট্ট খড়কুটোর বাসায়। না হয় তাদের কিচিরমিচির ভাষা বুঝি না আমরা। তাতে কী! দুটিতে ভাব হয়েছে দিব্যি। উইলিয়াম আর মেরীর উদ্দেশ্যে হাওয়ার একটা ফ্লাইং কিস পাঠিয়ে দিলাম আমি। আশা করছি মাসখানেকের মধ্যেই অ্যালমা পাড়ার আমরা সবাই আঙ্কেল-আন্টি হয়ে যাব…

 

 

One Reply to “

অন্তরীণ দিন

যূথিকা আচার্য্য


Leave a Reply to mahuya Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *