সমস্ত বিড়াল সম্পর্কে সত্যি

শুভ্রা মুখার্জি


এই যে উবু হয়ে বা হাঁটু মুড়ে বসার ভঙ্গিটা দেখছেন অথবা ধরুন ওই কালো হাতবাক্সটা কিম্বা এখান থেকে উঠে একটু পশ্চিমের দেওয়ালের দিকে গেলে একটা ছোট্ট হাতমোজা দেখতে পাবেন সেল্ফের ওপর, এগুলো সবই রিপিট টেলিকাস্টের মত আমার জীবনে জড়িয়ে রয়েছে। তার জড়িয়ে যাচ্ছে, সুর কাটছে, তবুও এসব বাস্তব থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন হতে দিচ্ছে না। কী যেন একটা প্রয়োজন মাথায় নিয়ে রোজ সকালে উঠি আর রাত্রি ঘন হলে একটা চটের বস্তার ওপর গুটিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। এসব অভিজ্ঞতার আগে আমার হলুদরং বিকেল ছিল,লিকার চা ছিল, মদ ছিল। একটা বিপন্ন দুপুরে মঞ্জু যখন পাছা উলটে শুয়ে আছে আমি টের পেলাম আমি ক্রমশ ছোট হয়ে আসছি। দৌড়ে বাথরুমে গেলাম এবং জল বেরোনোর ফুটো দিয়ে গলে সোজা নর্দমায় পড়লাম। নর্দমার অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম। নিজেকে এই ছোটো রূপে নর্দমায় দেখে প্রথমটা ঘাবড়ে গেছিলাম। তারপর মনের জোরে বিস্তর টানাহ্যাঁচড়ার পর বাথরুমের মেঝেয় ফিরলাম। আবার বড় হতে হতে নিজের সাইজের থেকে প্রায় আধহাত বড় হয়ে ঘরে ফেরার পর মঞ্জুর আর ইচ্ছে নেই বলে ঘুমিয়ে পড়ল।পরের সকালে চা দিল,জলখাবার দিল কিন্তু আমার আধহাতি বেড়ে ওঠাটা লক্ষ্য করল না৷ আসলে মঞ্জু কোনওদিনই আমাকে বিশেষ লক্ষ্য করে না,শুধু সময়মতো পাছা উল্টে অথবা পা ফাঁক করে শুয়ে পড়ে। বরং ও যাদের লক্ষ্য করে মানে রীতিমতো খেয়াল করে,যাদের জামার বোতামের অভাবও ওর ঠিকঠাক চোখে পড়ে তারা আমার প্রতিবেশী। আমি এ বিষয় নিয়ে একটুও ঈর্ষান্বিত হতে পারি না,বহুবার চেষ্টা করে দেখেছি,প্রতিবারই মনে হয় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সুগম সম্বন্ধ থাকাই ভালো। এখন প্রতিটা প্যান্ট আধ হাত করে বাড়ানোর চিন্তা আমার ওপর এমনভাবে চেপে বসল যে আমি মঞ্জু, রীনা এবং রঙিন মাছ বিষয়েও সমস্ত কথা ভুলে গেলাম।
ঘটনাক্রম আমাকে যেদিকে নিয়ে গেছে আমি চুপচাপ সেদিকেই সরে পড়েছি। প্রতিবাদ আমার ধাতে নেই,ঘুষের লেনদেন সংক্রান্ত কাজ তাই আমার হাতে খুবই সুন্দর ভাবে হয়ে যায়। যেন হালকা গরম ছুরি মাখনে চালিয়ে ব্রেকফাস্ট টেবিলে তুমি মজা দেখছো। জলের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে যেতে টের পেলাম আমার এবার থেকে বাড়িতেও মোজা পরে থাকা দরকার। আঙুল ও পায়ের গড়ন আমাকে এবার একটু চিন্তিত করে তুলছিল। দুটো ভালো কোয়ালিটির মোজা কিনে পায়ে গলিয়ে বাড়ি ফিরে দেখলাম মঞ্জু টেবিলে বসে গাজর কুচোচ্ছে। এরকম সব ছুটির দিনে আমার সাথে রীনার কথা হয়না।যেন একটা অলিখিত চুক্তি,ছুটির দিনে আমি মঞ্জুর বাকি দিনগুলোর ওপর রীনার অধিকার। আজ কি মনে হতে রীনাকে ফোন করতেই ও স্বভাবের খানিকটা বাইরে গিয়েই জোরে হেসে ফেলল।গুজগুজে নিচু স্বরে কথা বলেও আমি মঞ্জুর কোনও আলাদা মনোযোগ আদায় করতে পারলাম না।  এমনকি রাতে শোওয়ার পর আমার মোজা শোভিত পা-ও ব্যর্থ হল সেকাজে। গায়ে হাত দিতে ও চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল,আমি ওর ভেতর ঢুকে কিছুক্ষণ নাড়িয়ে চাড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লাম।
আমার চিন্তা ছিল অফিস নিয়ে, সেখানে আমার এই আধহাতি লম্বা চেহারা সবাই দেখবে এবং তারপর এটা নিয়ে জটলা হবে,মন্ত্রণা সভা বসবে। কিন্তু আদতে তেমন কিছুই হল না! আমি যে এখানে কতখানি নগন্য একজন সেটা টের পেতেই ভালো মুখে বেয়ারাকে ডেকে চায়ের অর্ডার দিলাম।লোকটা আমার এই নব্য ভদ্রতা দেখে হকচকিয়ে গেলেও চা দিল। হঠাৎই গন্ধে টের পেলাম আমার চেয়ারের পিছনে মহুল ফুল ঝরছে।কোনও একটা গোলাপি হলুদে ডুবে যাচ্ছে সব।দৌড়ে উঠে আসি, আহ্ ছাতিমের গন্ধ।  ছাতিমের তলা জুড়ে ছড়ানো লাল শাড়ি, শিফনের প্যাঁচানো প্যাঁচানো ঘোর।লাল যেন জলের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে।  আমার পায়ের পাতা ঈষৎ হলুদ ও রোমশ।রীনা হাসছে,মুচকি কিম্বা জোরে জোরে শব্দ করে। মঞ্জু শিৎকার করছে ; এগারো বছরের অভ্যাসবসত শিৎকার।এসব অপরিকল্পিত ভয়ের মত ছড়িয়ে ছড়িয়ে আমাকে স্থবির করে দিলে আমি শুধু মাথা ঘুরিয়ে নিজের চারপাশে জমে থাকা সুন্দরীদের মাথা দেখতে পাই। সবকটা থেকে উল্টো করে জিভ ঝুলে আছে,লাল জিভ, কাঁটা কাঁটা লাল জিভ! সরে যেতে চাই, পা আরও গভীরে বসে যেতে থাকে। মাথাগুলি শেয়ালের মত চিৎকার করে ওঠে…
আমি কি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম? এখন চেয়ারের পিছনে মহুল নেই, কাঠকাঠ সাদা দেওয়াল আর ফাইলের তাক। আরও কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর উঠে পড়লাম। চশমার কাচ মুছে এবার বেরিয়ে পড়লেই হয়। আজ আমার বিড়াল হতে ইচ্ছে হল।  বিড়াল হয়ে চারটে বাড়ির বউদিদের দুপুরকালীন ক্রিয়াকর্ম দেখে নিজের বাড়ির রাস্তা ধরলাম। বিড়াল হওয়ার একটা বড় সুবিধা হল আপনাকে কেউ ধর্তব্যের মধ্যেই রাখবে না। এই যেমন এখন মঞ্জু আমাকে সামনে রেখেই ওর এক নামকাওয়াস্তে ভাইয়ের সাথে চূড়ান্ত অ্যাকটিভ সেক্স করছে।আমি চুপচাপ দেখছি,যেমন একটু আগে নমিতা বউদি কোলে তুলে থলথলে মাইএর মধ্যে আমাকে চটকে দেওয়ার সময় শুধু একটু মিঁউ করেছিলাম। এমন অবস্থায় আমার রীনাকে দেখতে ইচ্ছে হল। এ-পাঁচিল ও-পাঁচিল টপকে আমি রীনাদের অফিসে এসে ঢুকলাম।রীনা দেখে খুশি হয়ে একটুকরো সেঁকা পাউরুটি ছুড়ে দিল। সাধারণত আমি এভাবে খেতে অভ্যস্ত নই তবু রীনাকে খুশি করতে খেয়ে নিলাম।রীনাও খুশি হয়ে ‘বিল্লুটা’ বলে মাথায় হাত বুলিয়ে বসের কেবিনে চলে গেল। আমিও পায়ে পায়ে ঢুকে পড়ি। দীর্ঘ সময় ওদের মন্দারমনির আলোচনা শুনি এবং আমাকে টুপি পরানোর বুদ্ধিগুলি শুনে চুপচাপ বেরিয়ে আসি।
গোলপার্কে বসে আছি। গত দুদিন হল এই গোলপার্ক কেন্দ্রীক জীবন আমার ভালোই লাগছে।জলে বুড়বুড়ি কেটে ঘুরে যাচ্ছে মাছ,পথচলতি কুকুর বিড়ালের সাথে ধাক্কা লেগে লেগে আমার সফিস্টিকেশন খসে পড়েছে। স্কার্ট পরা মেয়েদের পায়ের তলায় গিয়ে বসি,বহুদূর দেখা যায়। যেমনটি আমি দেখতে চেয়েছি। চকলেট চকলেট রঙের ওপর সাদাসাদা ফুল। ফুল ঝরে পড়ছে আমার মাথার ওপর ; নাকে ফুলের সোঁদা ও আঁশটে গন্ধ টের পাই। বিড়ালীর গর্ভকালীন স্বপ্নে জল বাড়ে, মৃদু আঁচে লেজ সেঁকে নেয় ক্লান্ত বিড়াল। আমি ফুলের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি সেখান থেকে মর্গ ও সাদা দেওয়ালের দূরত্ব সমান সমান। আমি দেওয়ালের দিকে ঘুরে দেখি মর্গে আমার মত কোনও দেহর খোঁজে টানাটানি চলছে। মঞ্জু কি কাঁদছে? অমিত, রানা এরা সবাই কি একটু কষ্ট করে চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে? রীনা কি মন্দারমনি না গিয়ে আমার লাশ দেখতে এসেছে? মঞ্জুর সাথে কি ওর সেই ভাই..? কিছুই স্পষ্ট করে দেখতে পাই না অথচ এই অসম বিকেলে আমার সমস্তকিছুর জন্য কান্না পেতে থাকে। এই চতুষ্পদ প্রবণতায় মগজ লাফিয়ে পড়ে। আমি গিয়ে লাফিয়ে পড়ি কাগুজে টেবিলে। সবকটি প্রবণতা একসাথে ছিঁড়ে ছিঁড়ে জলের নিয়ন্ত্রন থেকে খুবলে ভাসিয়ে দিই,অনন্ত আরও অনন্তকাল…

2 Replies to “

সমস্ত বিড়াল সম্পর্কে সত্যি

শুভ্রা মুখার্জি


  1. খুব ভালো লেখা টা, অন্য রকমের। আশাকরি আগামী দিনগুলো তে আরও ভালো লেখা হবে।

  2. মুগ্ধ হলাম। তোমার ভেতরে যে-অন্ধকার আছে তা আরও উজাড় করে লেখো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *