বিৎ

সাদিক হোসেন


কিছু বই না চাইতেই হাতে চলে আসে। আর অনায়াসে জীবন পাল্টিয়ে দেয়। লুডমিলা পেত্রোশেভস্কায়ার গল্পের বইটিও তেমনি। পড়বার আগে অব্দি লেখিকার নাম জানতাম না। পড়বার পর আমার জীবন খানিক পাল্টে গেল।

জীবন যে পাল্টাচ্ছে, তা পাল্টানোর আগে অব্দি বোঝা যায় না। বোঝা যায়, পাল্টে যাবার অনেক পর। আমার ক্ষেত্রেও তেমনি ঘটেছিল। এলা চলে যাবার পর দেখি বইটা বিছানায় পড়ে রয়েছে। আমাদের দু-জনার ওলোটপালোট বিছানায় সেটি শ্রমজাত কিতাব বিশেষ। ভুল করে ফেলে যাওয়া সামগ্রী নয়। অতএব, সেটির পাঠ ছিল অনিবার্য।

লুডমিলার জন্ম ১৯৩৮ সালে(হায়!)। মস্কো শহরে(ইস!)। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। মস্কো শহরও নিরাপদ নয়। ফলে তাকে সঙ্গে করে তার মা চলে আসে কিউবেশেভ শহরে। সেখানে লুডমিলার দিদিমা রয়েছেন। কথা ছিল, যুদ্ধ শেষ না হওয়া অব্দি তারা সেখানেই থেকে যাবে।

কিন্তু বিধাতা(তৎকালীন সোভিয়েতের কথা মাথায় রেখে শব্দটি ব্যবহার করলাম) যার ললাটে অক্ষর প্রতিমা নির্মানের প্রস্তুতি নিয়েছে, তার শৈশব যে পলায়নের শাকান্নে নরম ও অনায়াস হতে পারে তা তো সম্ভব নয়। তাদের সম্মুখে আচমকা বাঁক নয়, কুয়ো থাকে প্রতিপদে। গভীর কালো কূপ। তবে পতনের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। শব্দটি ক্ষণিক। মানবের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। কল্পনা করুন একটি ঢিলের। নিদেনপক্ষে একটি প্রস্তর খন্ডের। এবার মনে করুন সেটাকে কেউ একজন ছুঁড়ে ফেলল। ঐ তো সেটা পড়ে যাচ্ছে, নেমে যাচ্ছে, ধাক্কা খেতে খেতে এগোচ্ছে সরু ও লম্বা কুয়োটার ভেতর। আপনি কি একটি ঢিলের শব্দ পেলেন? অহেতুক ও তুচ্ছ শব্দটি আপনার কান অব্দি কি পৌঁছাল? যদি পৌঁছতে পারে, তবে ভেবে নিন, লুডমিলার পতনও ছিল তেমনি – তুচ্ছ ও মানবিক ভারশূন্য।

মা কথা রাখেনি। উন্মাদগস্ত দাদু ও বৃদ্ধা দিদিমার কাছে তাকে ফেলে রেখে পুনরায় মস্কোতে চলে গিয়েছিল।

এক কামরার ছোট্ট ঘর। তাতে একটা বড়সড় টেবিল। টেবিলটি যে কী কারণে সেখানে ছিল তা কেউ বলতে পারবে না। অবশ্য টেবিলটি ছিল বলেই লুডমিলা জিন্দা থাকতে পেরেছিল।

এবার আমরা টেবিলেরে পায়াটার দিকে তাকাই – টেবিলের কোণায় ঝুল জমে আছে, মাকড়সার জালে মাকড়সা নেই; কিন্তু জালের ভেতর থেকে দেখা যায় তার অবসাদ। তাও শৈশবের!

হ্যাঁ, টেবিলের নিচেই বেড়ে উঠছিল লুডমিলা। কারণ টেবিলের বাইরে ছিল দিদিমা।

মা যখন আবার ফিরে এল, তখন লুডমিলা আক্ষরিক অর্থেই ভিখিরি। রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে বেড়াত।

পরবর্তীকালে দিদিমার বাড়িটিও বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। দুই বুড়ো বাপ-মা আর মেয়েকে নিয়ে মা উঠে আসে আরও ছোটো একখানা ঘরে। সেখানেও টেবিল। হ্যাঁ, আর একটি টেবিলের নিচে মা ও মেয়ে বাঁচতে শিখছিল পরস্পরের প্রতি তীব্র ঘেন্না নিয়ে।

রুশ ভাষায় একটি শব্দ রয়েছে – বিৎ(byt)। যা প্রধাণত দৈনন্দিন কাজকর্ম বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। অবশ্য লুডমিলার প্রেমের গল্পগুলিতে বিৎ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে একটি রাজনৈতিক কর্ম হিসেবে। লুডমিলা এই শব্দটির ভেতর ঢুকিয়ে দেয় অপেক্ষা, ঝগড়া, রাগ, ক্ষয়… এবং থাকবার অনুপযুক্ত ঘরের বিবরণ।

রুশ বিপ্লবের পরে দেখা গেছিল হাজার হাজার ভূমিহীন কৃষক মস্কো শহরে চলে আসছে জীবিকার সন্ধানে। কিন্তু তাদের থাকবার জায়গা নেই। রাষ্ট্র তখন জমির উপর ব্যক্তি মালিকানার আইন খারিজ করল। শহরের সমস্ত ঘরবাড়ি হয়ে গেল রাষ্ট্রের সম্পত্তি। রাষ্ট্র ঐ সম্পত্তির একটা বড় অংশ ব্যবহার করল যাতে শহরে চলে আসা কৃষকরা সেখানে বসবাস করতে পারে।

বেঁচে থাকা আর বসবাসের মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য। একটা ঘরকে চারভাগে ভাগ করা হয়েছিল। মোটামুটি একখানা সুটকেস আর দুজন মাথা গুঁজতে পারে – এমন একটি চারকোণা জ্যামিতিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল ঘর হিসেবে।

লুডমিলার গল্পে বিৎ – সেই ক্ষদ্র পরিসরকেও নির্দেশ করে। এই পরিসরে ঘটে চলা প্রেম, ঘেন্না, চেঁচামিচি, বমি…

লুডমিলা সোভিয়েত মডেলটির সমালোচনা করে এই শব্দটির প্রয়োগে। সে সচেতনভাবে ফ্যাক্টরি, চিমনি, ওপার অব্দি দেখা যায় না এমন গমের ক্ষেত, ইস্পাতের চকচক – এসবের বিবরণ ত্যাগ করে বসবাসের অযোগ্য ছোটো ছোটো ঘরের প্রতিটি কোণার বিবরণ দিতে থাকে – সেখানে মানুষেরা নীচ, অবিশ্বাসী, সেখানে মানুষেরা অর্থহীন ও ক্ষুদ্রতার প্রতীক; জীবনে যা কিছু মহৎ তার প্রতিই তাদের তীব্র অনীহা – সেখানে আছে শুধু সরু ও লম্বাটে কুয়োতে পতনের শব্দ। যেন আগাছা। কিংবা উলুখাগড়ার সংসারে বুড়ো থুত্থুড়ে পেঁচাও আর হাদিস শোনাতে আসে না! বিৎ, এখানে, ক্ষুদ্রের পক্ষে বৃহৎ রাজনীতি।

তবু, এতসবের মধ্যেও, একটি আধারের উপর সে যেন খানিক ভরসা রাখতে পেরেছিল। সেই আধারটি হল মাতৃত্ববোধ।

একটি গল্পের উদাহরণ দেওয়া যাক –

মেয়েটির নাম আলিবাবা। বয়েস তিরিশের কোটায়। ধর্মে ইহুদী। এখন শহরের একটি সস্তা বারে সে ভিক্টরের সঙ্গে বসে গল্প জুড়েছে। আসুন, তাদের খানিক গল্পগুজব করতে দিই, আর এই সুযোগে তাদের সম্পর্কে আমরা কিছু খোঁজখবর নিয়ে রাখি।

কদিন আগেই আলিবাবা তার প্রমিকের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলেছে। সম্পর্ক চোকানোটা অবশ্য এমনি এমনি হয়নি। হাতাহাতি তো বটেই, এমনকি সেদিন সে খুনও হয়ে যেতে পারত। যদিও তাদের মধ্যে এমন ঝগড়া প্রায়ই ঘটত। সেদিন হল কী, তার পুরুষ বন্ধুটি মদের বোতলগুলি খুঁজে না পেয়ে আলিবাবাকে সন্দেহ করল। সন্দেহ হয়ত আলিবাবা বোতলগুলি চুরি করে বাজারে বেচে দিয়েছে। ব্যাস, এই নিয়েই শুরু। চড়চাপাটির পর একসময় পুরুষ বন্ধুটি তাকে ব্যাল্কনি থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। চারতলা থেকে পড়ে গেলে কে আর বাঁচে। আলিবাবা বেঁচে গেল – পড়তে পড়তে সে ব্যাল্কনির একখানা রড কোনোমতে ধরে ফেলতে সক্ষম হয়। এবং রড ধরে ঝুলতে থাকে। শেষপর্যন্ত লরির ড্রাইভাররা তাকে নামায়। নামানো গেলেও সে বেশ চোট পেয়েছিল তাতে। আর পুরুষ বন্ধুটির কাছে ফিরে যাবার সাহস পায়নি। চলে আসে মায়ের কাছে। মা আবার অসুস্থ। মাঝে মাঝেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। আর সেই সুযোগে আলিবাবা হাতের কাছে যা কিছু পায় তা বিক্রি করে মোচ্ছব করতে বেরোয়। আজ যেমন বিখ্যাত রুশ কবি অ্যালেকজান্ডার ব্লকের কবিতার বইটি ভালো দামে বেচতে পেরেছে।

অন্যদিকে ভিক্টর কোনো অফিসের বেয়ারা। মাঝে মাঝে দুপুরে অফিস কেটে বারে ঢুকে বিয়ার গেলে। তার গায়ে প্যাচপ্যাচে গন্ধ সবসময় – এই গন্ধ সুন্দরী মেয়েরা যে পছন্দ করেনা তা সে অভিজ্ঞতা থেকে জানে। আলিবাবা সুন্দরী নয়। তার উপর ভাঙা কোমর নিয়ে তার নাচটি ছিল কুৎসিত। ফলে ভিক্টেরের মনে খানিক আশা জন্মেছিল। তাকালে এমন মেয়েই তো তার দিকে তাকাতে পারে!

তার আশাটি ভ্রান্ত নয়। আলিবাবা ইশারা দিয়ে তার পাশে এসেই বসল।

দু-চারটে কথা বলার পর এখন তারা একসঙ্গে মদ খাচ্ছে।

আলিবাবা নাছোড়। ছয় পেগের পরেও তার পিপাসা মেটেনি। এদিকে ভিক্টরের জেব ফাঁকা হয়ে গেছে। তার থলথলে শরীর ম্রিয়মাণ। কিন্তু ভিক্টরের এই চেহারা দেখে আলিবাবার মনে পড়ল বেড়াল ছানার কথা। হ্যাঁ, বেড়ালের বাচ্চাই তো – আলিবাবা অবাক হয়ে ভাবে – পুতুপুতু মানুষটা এবার কি মিআআও করে ডেকে উঠবে? মিআআও করলে তার কি ভালো লাগবে?

সে ভক্টরের ভয় দূর করে দেয়। ব্লকের বই বিক্রির টাকাটা দিয়ে আরও দু-পেগের অর্ডার করে।

পানশালা তখন মৌচাক। যাকে পাবি তাকে ছোঁ অবস্থা। ভিক্টর প্রথমে রাজি ছিল না। আলিবাবাই তাকে রাজি করাল।

সাবধানে তালা খুলল ভিক্টর। বেশ সন্তর্পণে আলিবাবাকে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল।

ঘরটি ছোটো। অগোছালো। কেমন এক পচা গন্ধ রয়েছে। তবে অত নেশায় আর গন্ধটিকে তেমন পাত্তা দিল না সে।

ভিক্টরকে টেনে বিছানায় নিয়ে গেল। যৌনতা করল।

এখন তারা পাশাপাশি শুয়ে। তৃপ্তিতে ভিক্টর চোখ বুজে আছে। আলিবাবার খুব সখ হল একখানা প্রেমের কবিতা আওড়াবার। সে বেশ জোরে জোরে ব্লকের কবিতা পড়ছিল। তারপর হঠাৎ-ই শুনতে পেল ভিক্টর নাক ডেকে ঘুমচ্ছে।

আর কী করা যায়। খানিক পর আলিবাবাও ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙল ভিজে যাবার অনুভূতিতে।

ভিক্টর ঘুমের ঘোরে বিছানায় হিসু করে ফেলেছে।

আলিবাবা উঠে পড়ল। সে বুঝতে পারল ঘরের পচা গন্ধটা আসলে কীসের। ভিক্টর রোজ রাতে তবে এভাবেই বিছানা ভেজায়।

সে বাথরুমে গিয়ে পরিষ্কার হল। তারপর চেয়ার টেনে বসতে বসতে তার দু-চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে শুরু করল।

কতদিন পর এখন সে কাঁদতে পারছে। এই কান্নায় বিয়োগ চিহ্ন নেই। মায়া আছে। স্নেহ আছে।

সে বিছানায় শোয়া মানুষটির দিকে আবার তাকাল। ভিক্টর তখনো গভীর ঘুমে। সারা ঘর জুড়ে তার নাক ডাকার শব্দ।

তবু কান্না থামছে না আলিবাবার। সে বুঝি জীবনে এই প্রথমবার কোনো মানুষের প্রতি ভালোবাসায় আহ্লাদিত হতে পারছে।

 

 

গল্পটি শেষ করে আমি আমার ঘরটার দিকে তাকাচ্ছিলাম। ঘরটায় প্যাচপ্যাচে গন্ধ নেই। এলার গন্ধ রয়েছে। কিংবা সেই গন্ধের প্রতিও আমার আর কোনো আকর্ষন ছিল না। আমি খুঁজছিলাম আমার নিজস্ব বিৎ-কে। সেই পরিসরকে, সেই পরিসরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলিকে – ক্ষুদ্রতাকে – কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

এলা ফোন করে বলেছিল, ধুলাগড় যাবি?

– ধুলাগড়? কেন?

– কেন আবার। আমি বলছি তাই যাবি।

কী মুশকিল। আমি বেশ টেনশনে পড়ে গিয়েছিলাম। ধুলাগড়ে কয়েকমাস আগে একটা দাঙ্গা বেঁধেছিল। ভাবলাম আবার হয়ত সেইরকম কিছু ঘটেছে। কিন্তু দাঙ্গা বাঁধলে আমরা ওখানে গিয়েই বা কী করব?

এলা জানাল, দাঙ্গা না। একটা সভায় বক্তৃতা রাখতে যাচ্ছি। আমার সঙ্গে চল।

সভাটা এরেঞ্জ করেছিল আশাকর্মীদের সংঘটন। সেখানে যাওয়াটা বেশ মজার হল। ধর্মতলা থেকে বাসে ওঠবার কথা, কিন্তু বাসে ওঠবার আগে মানিব্যাগ খোয়া গেল। অতঃপর এলা ছাড়া আমার আর গতি ছিল না। এতে এলা খুশি। বলল, পরগাছা হয়ে বেঁচে থাকাটা কী আজকে বুঝবি।

বুঝলাম পরগাছা ব্যাপারটা খারাপ কিছু নয় যদি গাছটা এলা হয়ে থাকে। যাহোক, এলার বক্তৃতাটা ছিল লাল, শেষ করল যখন, তখন বিকেল, আকাশটাও লাল।

এলা বলল, একটু ঘোরাঘুরি করে যাবি?

– এখানে?

– ধুর পাগলা। এখানে না। গঙ্গা পেরোলেই মেটিয়াবুরুজ।

– তুই বাড়ি ফিরবি না?

এলা সত্যিই বাড়ি ফেরেনি। চলে এসেছিল আমাদের বাড়ি।

 

বাড়ির আর বর্ণনা করব কেন? আমি শুনতে পাচ্ছিলাম জলের শব্দ। এলা তখন বাথরুমে। স্নান করছে। দরজা বন্ধ। বাইরে কুকুরের ডাক। জলের শব্দ। জল। রান্নাঘর। আমাদের ব্যাল্কনি নেই!

বিছানার চাদর টানটান করে পেতেছিলাম। জানলার পাল্লা দুটো বন্ধ। ফ্যান চলছে। হাওয়ায় কিছু পৃষ্ঠা উড়ে গেল। কলমগুলো কলমদানিতে রেখে দিলাম। দেয়ালঘড়ি ১০ মিনিট এগিয়ে সময় দেখায়। ফোনের চার্জারটি প্লাগে গোঁজা। সুইচ অন করা থাকে প্রায় সবসময়। বুকশেলফের একটা কাচ ভেঙেছে কদিন আগে। ছোটোবেলার একটা ছবি টাঙানো – ফটোফ্রেমের পেছন থেকে টিকটিকি উঁকি দিল। ফোন বাজল এলার। ও ধরল না। আমি চা বানিয়ে কাপ দুটো টেবিলে রেখে দিয়েছিলাম।

শুরু করতে প্রায় রাত দুটো বেজে গেছিল। তার আগে আমরা বইপত্তর, দিল্লি, শাহবাগ, পার্কসার্কাস, ধর্ণা, হিজাব… এইসব নিয়ে কথা বলছিলাম। কুকুর ডেকেছিল আর একবার। তারপর এলা হাই তুলল। সে মাথার বালিশ কোলে চেপে খানিক ঝিমোল।

আমার ঘুম আসছিল না। এলা পোষাক আলগা করছিল। লাইট নিভিয়ে দেওয়া হল। ওর আদল স্পষ্ট। যদিও গমের মত ওর রঙ নয়। স্তন ঝুলে গেছে। বোঁটাটা বেশ কালো।

ভোরে একবার ঘুম ভেঙে ছিল কি? আমি মনে করতে পারছি না। এখন বইটা হাতে নিলে কুকুরের ডেকে ওঠা, টিকটিকির উঁকি মারা, ঘড়ির ১০ মিনিট…এইসব মনে আসে।

মেঝেটা পুরনো। তবে মোজাইক। খাটের নিচ থেকে পুরনো পারফিউমের শিশি পাওয়া গেল। নখ বড় হয়েছে। এলা বলছিল। নেলকাটার খুঁজে পেলাম না।

মোটর চালাতে ভুলে গেছিলাম। বাথরুমে জল নেই। দুপুরের জন্য রান্না করতে হবে। রাস্তা দিয়ে সাইকেল যাচ্ছিল। কারিয়ারে বউ। ওরা কতদূর যাবে?

আমাদের পরিসর কতটুকু? বৃত্তের ব্যাস কোথায় কোথায় ছুঁয়ে আছে? কানের নিচে একখানা ফুসকুড়ি হয়েছে। জানলার পাল্লা দুটো খুলে দিলাম।

স্নান করা হয়নি। খাবো কিনা ভাবছিলাম। ফোন এল। কথা হল। কাজের কথা না। বানান ভুল নিয়ে তর্ক খানিক। বুধবারে পরিতোষের বাড়ি যেতে হবে।

আর পড়তে ভালো লাগছিল না। সিঁড়ির নিচ থেকে খুটখাট শব্দ আসছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম ইঁদুর। ইঁদুর নয়। মনে হল মানুষ। চোর? এলা যাবার পর কি দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছি?

শব্দটা বাড়ছিল। জিনিসপত্র সরানোর শব্দ। একবার চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম – কে? শব্দটা থেমে গেছিল। দু মিনিট। তারপর আবার শুরু হল। কে?

আমিও নিচে নামছিলাম। ফিসফাস আওয়াজ শুনলাম। কে? চুপ। আবার ফিসফাস। আমি নামছিলাম। ভয় করছিল। হাতে একটা ডান্ডা থাকলে বেশ হত। কে? কে ওখানে?

ওরা হেসে উঠল। তাচ্ছিল্যের হাসি। চোর হলে তো হাসবে না। তবে ওরা চোর নয়। অন্য কেউ। কিন্তু কারা? আমি আর এগোতে সাহস পেলাম না।

এবার পায়ের শব্দ। বুঝি ওরাই উপরে উঠে আসছে। এখন কী করব আমি? ঘরে গিয়ে সোজা দরজাটা বন্ধ করে দেব?

আমার পা পাথরের মত ভারী হয়ে গেছিল।

কে?

কে ওখানে?

 

One Reply to “

বিৎ

সাদিক হোসেন


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *