নিরাশ্রয়-নামচা

সুদেষ্ণা মজুমদার


(সেইসব মানুষগুলো, যারা শুধু নিজের ঘরে ফিরতে চেয়েছিল, তাদের পাশে শারীরিকভাবে কোনোদিন থাকতে পারিনি, পারবও না। তাদের কারোর হাত ধরে বলতে পারিনি, পারবও না, এসো আমার সঙ্গে, তোমাকে তোমার ঘরে পৌঁছে দিই। এ লজ্জা আমার। আমাকে ক্ষমা করো।)

 

১০/০৪/২০২০

শুক্রবার

 

বিকেল সাড়ে চারটে। বিটি রোড দিয়ে আফতাবের অটোটা যখন এগোচ্ছিল, আমার একটু একটু ভয় যে করছিল না, তেমনটা নয়। আমি এই আফতাবকে চিনি না, আগে কখনো দেখিনি, কোনোদিন যে দেখা হবে এমনটা কস্মিনকালেও ভাবিনি। কিন্তু এটাও বুঝতে পারছিলাম খড়িবাড়ির অটো বিটি রোডের ধুলো চেনে না, মানুষ চেনে না, পুলিশ চেনে না, এমনকী হাওয়াটা পর্যন্ত তার অচেনা। সুতরাং ভয়টা আফতাবই বেশি পাচ্ছিল। ওর মুখে বাঁধা ঠুলি ঠেলে সেই ভয় বেরিয়ে আসতে চাচ্ছিল। আমি অভয় দিতে দিতে দেখছিলাম আগরপাড়া, কামারহাটি, রথতলা, ডানলপের ভিড়গুলো সব হাওয়া হয়ে গেছে। গত মাসের ২০ তারিখ রাতে এই একই রাস্তা দিয়ে যখন পেছনের দিকে গিয়েছিলাম, জমজমাট ভিড়, মনে ফুর্তি। অনেকদিন পরে সবার সঙ্গে দেখা হবে, আড্ডা হবে। সবাইকে দেখেছি, দেখা কিন্তু কারো সঙ্গে হয়নি। অন্তরাল থেকে বেশ কয়েক জোড়া চোখ আমাকে জরিপ করে গেছে। আর যাদের বাড়ি আমি গিয়েছিলাম দুদিন থাকব বলে, তারা যেন চুরির দায়ে ধরা পড়েছে। তারাও বিচ্ছিন্ন। তটস্থ। আর কোনো অপরাধ না করেও অপরাধ বোধে ভুগছিলাম আমি।

২২ দিন কেটে যাবার পর আবার পথে নেমেছি। চেনা পথটা একই আছে। বাঁকে কোনো বদল হয়নি। মানুষের যে দু-চারটে চেহারা দেখতে পাচ্ছি তাতে শুধুই ভয়। ধরা পড়ে যাবার ভয়। মার খাবার ভয়। মাথার ওপর তুলে ধরা পুলিশের লাঠি দেখতে পেলাম।

গত দুদিন ধরে সেইসব বন্ধু, যাদের হাতে একটু ক্ষমতা আছে, যারা সময়-অসময়ে যে-কোনো সমস্যায় মানুষের সঙ্গে আছে বলে দাবি করে, তাদের ফোন করে অনুরোধ করেছি একটা কোনো ব্যবস্থা করতে। শেষে হঠাৎ-ই এক বন্ধুর বদান্যতায় বাড়ি ফিরতে পারছি। হাতে কোনো ছাড়পত্র নেই। মোবাইলে শুধুমাত্র একটা ফোন নাম্বার আছে। যদি রাস্তায় পুলিশ বা থানা ধরে… একটা সংশয়, বাড়ি ফেরার জন্য একটা ফোন নাম্বার যথেষ্ট তো?

গতকাল যখন আমি মরিয়া হয়ে একে-তাকে ফোন করছিলাম, যদি কেউ সাহায্য করতে পারে এই ভেবে, তখন সবাই বলেছিল, ভোর-ভোর, অন্ধকার থাকতে থাকতে বেরোতে পারবে যদি গাড়ি নিয়ে যাই? বলেছিলাম, পারব।

কেউ পারেনি। এমনকী, কথা দিয়েও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। মানুষের চেহারার দ্রুত পরিবর্তন আমাকে অনেক কিছু শেখাল। কী অদ্ভুত ভয়। রোগটাকে নয়, পুলিশকে। আর সেই সাহায্যই এমন একজনের কাছ থেকে এল, অযাচিতভাবে, আমি থম মেরে গেছিলাম। এমনটাও হয়!

আমি আমার নিজের বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলাম।

 

০২/০৪/২০২০

বৃহস্পতিবার

 

ভয়– একটা আজন্মলালিত শব্দ। যখন আমি একদম শিশু, দন্তহীন মাড়ি বের করে খক্‌খক্‌ বা ঠক্‌ঠক্‌ করে হাসি, তখনই প্রথম ভয় পাওয়ায় সেই ব্যক্তি, যে আমাকে কোলে তুলে খেলাতে খেলাতে হঠাৎ ওপরে ছুড়ে দিয়ে আবার লুফে নেয়। আমি নামক সেই শিশুটার চোখে-মুখে যে আতঙ্ক ফুটে ওঠে, সেটার নামই ভয়। আর আমার এই ভয় পাওয়া দেখে, যে ছুড়েছিল বা আশেপাশে দাঁড়িয়ে-বসে যারা দেখছিল, তারা হা-হা, হো-হো করে হেসে উঠেছিল। তারা শিশুটিকে, মানে আমাকে বোঝাতে চেয়েছিল, এতে ভয় পাওয়ার কী আছে? হাসো সোনা হাসো! আমি যে বিন্দুমাত্র বুঝতে পারিনি সেটা বুঝে তারা যেন আরো আমোদ পেয়েছিল। ফলে, বারংবার, দিনের পর দিন এই লোফালুফির খেলা তারা চালিয়ে গিয়েছিল। তাদের এই ভয় পাওয়ানোর আনন্দ তাদের মধ্যে এমনভাবে চারিয়ে গিয়েছিল যে বাড়িতে কেউ বেড়াতে এলেও এই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটছিল। বড়োদের মধ্যে মনোরঞ্জনের সাধন হয়ে উঠছিল আমি নামক শিশুটির ভয়।

ভয় আমি পেতে না চাইলেও, অপরজন আমাকে ভয় দেখাবেই। এক ‘অজানা’ ভয়ের প্রতি মানুষের এক অদম্য আকর্ষণ। এবং ‘ভয়’ তৈরি করতে পারলে মানুষ খুব খুশি হয়। কারণ, তা একটা আশ্রয়ের কাজ করে। এবং ভাবে, আমি একা কেন ভয় পাব, আরো একজনকে, দুজনকে, বিশজনকে ভয়টা পাওয়াই না কেন! একটা সম্মিলিত ভয় অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও বেশ বিভোর করে রাখবে! কারণ, ভয়ের ভেতর আশ্রয় খোঁজার চেয়ে মধুর আর কিছু হয় না। ক্ষমতা যে ভোগ করে, ভয় দেখানোর আনন্দ, যা হিংস্রতাও বটে, সে ভোগ করে। আর যে ভয় পায়, তারও আনন্দ—ভয় পাওয়া ভালো, এই বোধে।

আমি আমার নিজের বাড়ি ফিরতে চাই।

 

২৫/০৩/২০২০

বুধবার

 

গতকাল রাত ১২টা থেকে লকডাউন। গোটা দেশে। পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে, লকআউট দেখে দেখে বড়ো হয়েছি। শৈশবে ব্ল্যাকআউট দেখেছি। ফ্যান দাও দেখেছি। র‍্যাশনের পূতিগন্ধময় চাল খেয়েছি। কিন্তু গোটা দেশ তালাবন্ধ হয়ে যাওয়া দেখিনি। সামনের রেল লাইন দিয়ে দিনে কয়েকশো ট্রেন যায়। সব বন্ধ হয়ে গেল হঠাৎ আসা নোটিসে। এবং আমি জানতে পারলাম আমি আর বাড়ি ফিরতে পারব না। জানি, যে ব্যাধিতে আমরা আক্রান্ত, তাতে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত নয়, অনন্তকালের জন্যও হয়তো আমাকে এই বাড়িতে কয়েকজন মানুষের সঙ্গে থাকতে হবে। একাকী। নিজের ঘরের চেনা আবহাওয়া ছেড়ে, নিজের আকাশ ছেড়ে, নিজের জানালা ছেড়ে বারোতলার ওপর ‘নিশ্চিন্ত’ হয়ে থাকতে হবে। এসেছিলাম দুদিনের জন্য। শুনতে হচ্ছে, তুমি তো ভালোই আছ! পঙ্গু মানুষ, ঘরে গেলে তো সব করতে হবে! তার চেয়ে এখানে ভালোই তো আছ। রিস্ক নেবে কে? পারবে তুমি হেঁটে হেঁটে ১২ কিলোমিটার যেতে? এখানে তো ১৪ তারিখ পর্যন্ত থাকতেই হবে!

না পারব না। ১২ কিলোমিটার হেঁটে যেতে পারব না। আমাকে সবাই ভয় দেখাচ্ছে। আমি শুধু নিজের ঘরে ফিরতে চাই। ভাঙা হোক, ছেঁড়া হোক, সে আমার নিজের ঘর। সেখানকার দেওয়ালগুলো আমাকে চেনে, আমিও তাদের চিনি। আশি বছরের কড়ি-বরগাগুলো আমাকে চেনে। ওরাই এই পঙ্গু মানুষের আকাশ হয়ে ওঠে যখন জানালায় গিয়ে দাঁড়াবার ক্ষমতাটুকুও থাকে না।

এখানে সামনে তাকালেই দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ দেখা যায়। অনেক দূরে আবছা কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে। আরও দূরে দিনের বেলাতেও কুয়াশার আস্তরণ। ডানদিকে তাকালে এয়ারপোর্টের অবয়ব। রাতে সেখানে টুপটাপ বাতি জ্বলে। এসি মেশিনের ওপরে পায়রার দুটো বাচ্চা চুঁই-চুঁই করে ডাকে। এক মাস আগে একবার যখন এসেছিলাম, অন্তঃসত্ত্বা পায়রা মা উড়ে উড়ে আসত। সঙ্গে পুরুষটি। তাদের ঘর মানুষের যন্ত্রের আশ্রয়ে। তাদের ব্যস্ততা দেখতাম। এখন তারা তাদের সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত। এদের কেউ আটকে রাখে না, চলে যেতে বললেও এরা চলে যায় না। দিব্যি ঘর বানিয়ে বাস করছে।

এখানে আসার পরপরই যে আতঙ্ক আমাকে ঘিরে ধরেছিল, সেটাই আমাকে আরো জড়িয়ে ধরছে। আমি খুব শিগগির বাড়ি ফিরতে পারব না।

আমি আমার নিজের বাড়ি ফিরতে চাই।

 

২৩/০৩/২০২০

সোমবার

আপনি বেনারস থেকে ফিরে সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত। জ্বর-জ্বর ভাব, নাকি সত্যি জ্বর! লুকোবেন না। আপনি সমাজ থেকে বেরিয়ে যেতেও পারবেন না। আমরা অপেক্ষা করব আপনার শারীরিক অবনতি কতটা হল দেখার জন্য। আপনাকে ১৪ দিন দেখা হবে। আপনি সন্দেহভাজন। আপনি আসামি। প্রয়োজনে আপনাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে।

শুনছেন, এই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আপনাদের কেউ গেছেন কখনো? আমি যাচ্ছি।

এবং… আমি নিরন্তর যাচ্ছি…
দমবন্ধ… একা… বালিয়াড়ি নাকি সমুদ্র? অথচ, সমুদ্র আমার বড্ড প্রিয়…

আমি আমার নিজের বাড়ি ফিরতে চাই।

8 Replies to “

নিরাশ্রয়-নামচা

সুদেষ্ণা মজুমদার


  1. ভয় তৈরি করতে পারলে মানুষ খুব খুশি হয় কারণ তা এক্টা আশ্রয় তৈরি করে…দারুণ লিখেছিস।
    আর প্রতি প্যারার শেষে.. আমি আমার নিজের বাড়ি ফিরতে চাই..সুরের মতো যেন মণত্র। জাগার।জাগিয়ে রাখার।
    আরো লেখা চাইইই

  2. লেখাটা পড়ে খানিক্ষন থমকে থাকার মতো!! অনেকখানি অনিশ্চয়তা, একাকিত্ব, শূন্যতা আর ভয় ভীড় করে এলো।
    আমিও বাড়ি ফিরতে চাই….

    1. আমার বাবাটা!
      তুমিও নিজের ঘরে ফিরবে। জয়ী হয়ে। আরো অনেক বড়ো হয়ে। একদম ভয় পাবে না।

  3. এ লেখা আমার ও আমার মতো অনেকের মনের তন্তুর ভেতরে ঘুরবে।কোনদিন মরে যাবে না ।

    –——– — ——— ————– —–

    1. বল্লরী, তুমি পড়েছ! আমার খুব ভালো লাগছে জেনে। খুব ভালো থেকো।

  4. তৃপ্তিদি। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ লেখাটা পড়ার জন্য। আর আপনার ভালো লাগা মনের জোর বাড়িয়ে তোলে। খুব ভালো থাকুন।

  5. বল্লরী, তুমি পড়েছ! আমার খুব ভালো লাগছে জেনে। খুব ভালো থেকো।

  6. ভাল লাগলো পড়ে. লেখাটা জুড়ে রয়েছে অনেকটা একাকীত্ব আর ভয়.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *