লেন্স ও এক্সপোজার

হিন্দোল ভট্টাচার্য


আমি জানি সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু তাকে আমি দেখতে পাচ্ছি না। আমি দেখতে পাচ্ছি একটা মাঠ, মাঠের একদিকে আকাশের দিকে উঁচু হয়ে থাকা কিছু অহংকারী আবাসন, ঘুমহীন একটা চোখের মতো আকাশ, অসংখ্য অনিবার্য দিগন্ত, যাদের দেখে একটিই দিগন্ত মনে হয়, আর তার নীচে কিলবিল কিলবিল করে চলা আমার-তোমার এই সভ্যতা। আমি জানি সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, যেভাবে আমি মাঝেমাঝে একটা মাইক্রোস্কোপে দেখি ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার আশ্চর্য পৃথিবী। কেউ কেউ দেখে অণু-পরমাণুর আশ্চর্য বিস্ময়। কিন্তু তাকে আমি দেখতে পাচ্ছি না। আর মনে মনে ভাবছি হয়তো তার মতো একা আর কেউ নেই।

সেও আমাকে হয়তো একাই ভাবছে। বা হয়তো ভাবছে না। কারণ সে আমাকে দেখছে অনেক দূর থেকে। অনেক উঁচু থেকে। আর দেখছে বলেই, সে দেখতে পাচ্ছে আমার খুব কাছেই হয়তো আছে আমার মতোই আরও একজন মানুষের পৃথিবী, যার সঙ্গে আমার কোনওদিন দেখাই হবে না। হয়তো তার ও আমার মধ্যে সংযোগ হবে এক সম্পূর্ণ ঘুরপথে। সে সারাজীবন নিজেকে ভেবে যাবে এক চূড়ান্ত নিঃসঙ্গ মানুষ। আর আমি ভেবে যাব, আমার এই একাকিত্ব ভাগ করে নেওয়ার কেউ নেই। কিন্তু সে, দেখতে পাচ্ছে, তার শক্তিশালী দূরবীন বা মাইক্রোস্কোপের তলায়। এই দেখেছ, কী বললাম! দূরবীন বা মাইক্রোস্কোপ! দুটো যে এক নয়, তা তো একটা বাচ্চাও বোঝে। কিন্তু একটা দূরত্বে গিয়ে খুব ছোট জিনিস আর বড় জিনিসের মধ্যে পার্থক্য হয়তো থাকে না। কে বলতে পারে, হয়তো একটি ইলেক্ট্রনই একটি নক্ষত্র!

কিন্তু এর মানে এই নয় যে শান্তি এবং শূন্যতা এক জিনিস। এমনকী শূন্যতার সঙ্গেও শূন্যতার অনেক পার্থক্য। খুব সুন্দর সুরে বেজে ওঠা গান বা সঙ্গীত কিন্তু চরম একাকিত্ব এনে দেয়। সঙ্গীতের যে নির্জনতা তার কথা ভেবেছ কখনও? শ্মশান বা কবরের নির্জনতা বা একটা ছিন্নভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রের নির্জনতার সঙ্গে তার কত পার্থক্য। কত পার্থক্য একটি নির্জন ঘরের সঙ্গে একটা চৌকো সমাধির! কিন্তু এর মানে এটা নয়, যে সে আমাকে লক্ষ্য করেই যাবে! কিন্তু এও তো হতে পারে, যে সে লক্ষ্য করবে বলেই আমার জন্ম? কোথাও তার আর আমার নীরবতা এক হয়ে গেলে তবেই হয়তো তার সঙ্গে কথা বলা যায়। কিন্তু সে কবে?

আতঙ্কের মধ্যে আর যাই থাকুক আনন্দ তো নেই। আনন্দ না থাকলে আর নির্জনতা আসবে কোথায়? আতঙ্ক মানেই তো তথ্যের ভিড়। আর সেই সব তথ্য হল অন্ধকারের তথ্য। নরকে সূর্যোদয়ের তথ্য নয়। নরকে ধ্বংসস্তূপের তথ্য। এসব তথ্যের পিওন হয়ে থাকতে চাই না আমি। বলেছিলাম তোমায়। কিন্তু কী যে এক অদ্ভুত সময় এলো, পিঠে চেপে বসল লক্ষ লক্ষ হাহাকারের ভার। আতঙ্কের শূন্যতা। যেন হরপ্পা মহেঞ্জোদরোর সভ্যতা। যেন মাচুপিচুর স্তম্ভ, যেন পিরামিডের অন্ধকার পেট। যেন আর্কাডিয় সভ্যতায় চাপা পড়ে থাকা গিলগামেশের মৃৎফলক!

সে কি আমিই? আমিই কি দেখছি আমাকে?

 

উপাসনা আসলে এক ছল মাত্র, যা আমাকে সতর্ক করে রাখে। তোমার দিকে তাকিয়ে থাকার সতর্কতা। কারণ আমি জানি, আমি লক্ষ্য করলে, তুমিও লক্ষ্য করবে আমায়। আর তখন আমাদের চারপাশে গড়ে উঠবে বাজার, সংসার, ভিড়। ভিড়ের মধ্যে এক আশ্চর্য নির্জনতায় তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে। আমি সেই দিনের কথা ভাবি। তুমিও কি ভাব?

ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আসলে যে প্রাণহীন ভিড় থেকে যায়, সেখানে নৈঃশব্দেও থাকে প্রচুর কোলাহল। সেখানে তোমার কথা ভাবা যায় না। শুধু দোষারোপ করা যায়।

 

দেবতার সঙ্গে আমি দাবা খেলতে গিয়ে টের পাই সে কখন মৃত্যু হয়ে যায়। আর মৃত্যুর সঙ্গে পথে হাঁটতে গিয়ে টের পাই সেই আমার প্রিয়া। আমার লেখা। আমার ঈশ্বরী।

ঘর বড় হোক, যেমন সব সমাধিই চায় একদিন সংসার হয়ে যেতে।

 

কিন্তু সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তার দিকে। আমার জীবনদেবতা।

6 Replies to “

লেন্স ও এক্সপোজার

হিন্দোল ভট্টাচার্য


  1. চমৎকার লেখা। যেভাবে অনুভূতির স্তরগুলি উন্মোচিত হয়েছে, তা আমাকে আলোড়িত করেছে।

  2. একটা অসম্ভব ভালো লেখা। বার্গম্যানকে খুব মনে পড়ল এই লেখায়। ওয়াল্ড স্ট্রবেরি, দ্যা সেভেন্থ সিল ♥♥

  3. বা! মায়াবী লেখা। শূণ্যতার বাঙ্ময়তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *