যাবজ্জীবন গৃহ-স্থ

জিয়া হক


এই লকডাউন নতুন নয় আমার কাছে। ২০০৭ সালে হঠাৎ আমার জীবনে লকডাউন নেমে আসে আকাশ থেকে। আকাশ থেকেই তো। কীভাবে কী হয়ে গেল তার আজ আর বিস্তারিত বিবরণ দেবো না। আমি গৃহবন্দী হলাম। চারপাশে সবাই চলেফিরে বেড়ায় আর আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে সামান্য অতীতের কথা ভাবি। দিনগুলো সরে সরে যায়। স্মৃতির ক্রম গুলিয়ে গেছে। পুরনো স্কুলের সামনের বেদিতে শিক্ষকরা দাঁড়িয়ে থাকতেন আর আমরা জনগণমন গাইতাম, মনে পড়ে। আরও কত কথা। আমার বুড়োদার সঙ্গে ভোরে সুতি খালের ধারের জমির আলে বসানো ঘুনি ঝেড়ে চুনোমাছ সংগ্রহ করে আনতাম। বুড়োদা মানে আমার পিতামহ। বুড়োদা সারাদিন পশ্চিম ডাঙার কলাবাগানের ঘাস নিড়িয়ে দিত আর তার জন্য পুষ্টিভাত নিয়ে যেতাম। দাদার পাশে বসে তার ঘামভর্তি মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সুদূর অতীতের মানুষের মুখ কল্পনা করতাম। সেদিন কল্পনাটুকু বেঁচে ছিল। কত ঢোঁড়া সাপ, বিষধর সাপ পাশ দিয়ে ব্যস্তসমস্ত হয়ে চলে যেত। আমি ভয় পেলেও বুড়োদাকে বলতাম না। প্রায় লোকের সাপে কাটত। চিকিৎসা বলতে ছিল গ্রামীণ ওঝা। তাদের কাছে নাকি এমন শিকড় ছিল যা দিয়ে বেঁজি সুস্থ হয় সাপের কামড় থেকে। বেঁজিকে অনুসরণ করেই তারা পেয়েছে ওই বিশল্যকরণী। লোক সেরেও উঠত। লোক মরেও যেত। সাপ চোখে দেখা যায়, দেখে পালানো যায়, অদৃশ্য নয়, দংশনে পীড়িত রোগীকে ঘিরে মেলা বসে যেত কেননা তা ছোঁয়াচে নয়। বিপর্যয়ের দিনে, বিপন্নতার দিনে মানুষের পাশে থাকা যে কী বড়ো কল্যাণ! অনেক দূরে ‘জানা’ পাড়ার কোলে বিক্ষিপ্ত গাছগুলো অরণ্যের রূপ নিয়ে সবুজের উঁচু-নিচু পাহাড় তৈরি করত। আমি বুড়োদাকে ভালোবেসেছি। যখন দাদা প্রায় চলচ্ছক্তিহীন হয়ে পড়ল, যখন তার সঙ্গে গল্প করার মতো কেউ আর রইল না, যখন তার বিছানায় মৃত্যুর গন্ধ দেখা দিল, যখন বুড়োদা ‘সামাজিক দূরত্বে’ চলে গেল, আমি তার ঘরে ঢুকে বিছানায় তার মাথার কাছে বসতাম। বুড়োদা আমাকে ভালোবেসেছিল সব নাতির চাইতে বেশি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি আরেকবার, আরও একবার বুড়োদার ভালোবাসা টের পেতে চাইতাম। কিন্তু আমার অনুভবের শক্তি ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। একে বলে ডিরিয়ালাইজেশন। আমার আন্তরিকতা ততটাও আন্তরিক নয় কেননা সে শুধু পরিস্থিতির সাপেক্ষে প্রতিক্রিয়া মাত্র। আমাকে অভিনেতা বনে যেতে হল। যেন সব বুঝতে পারছি, যেন আমার কিছু হয়নি। কীভাবে ঢাকা দেওয়া যায় এই অস্বাভাবিকতা? আমার মধ্যে জন্ম হল ভালোবাসার। দেখলাম, মানুষ ভালোবাসা পেলে সব ক্ষমা করতে প্রস্তুত। আমি ক্ষমার জন্য কাতর হলাম। অথচ ভালোবাসতে গেলে অনুভূতি লাগে। আমার তো তা নেই। আমি তো নিজেকেই ভালোবাসতে পারিনি, ছড়িয়ে ফেলেছি রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডে। একটা যুতসই পথের সন্ধান করতে লাগলাম। ভাবলাম যদি চুপ হয়ে যাই একেবারে, কেমন হয়? তারপরই মনে হল, এটা সকলের বড়ো চোখে পড়বে। তাহলে কী করা যায়? চিন্তা করার মতো অবস্থা কি সেদিন আমার ছিল? ছিল না তো। যা ইচ্ছা তাই করলাম। আঘাত করলাম, আহত হলাম, প্রতিশ্রুতি দিলাম, প্রতিশ্রুতি ভাঙলাম, পাশে দাঁড়ালাম, সরে এলাম, প্রশংসা পেলাম, ঘৃণা পেলাম। আমি কী করব? কী করবে একজন যার অনুভূতি হারিয়ে গিয়েছে? নিজেকে নিয়তির হাতে ছেড়ে দিলাম। তর্কের পথ ছেড়ে মেনে নেওয়া শিখলাম। নিয়তির সঙ্গে তর্ক করা যায় না। ঘরের ধারে আদিগঙ্গার পাড়ে গিয়ে বসে রইলাম দিনের পর দিন। কচুরিপানায় ঢাকা একটা মৃতপ্রায় নদী। কে বলবে একে নদী? একদিন তারও জলস্রোত ছিল, তালগাছের শালতি ভাসিয়ে মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে, কে বলবে? নিজেকে বললাম, আজ থেকে আমি এই নদীটি হলাম। তার সঙ্গে সখ্য হল। প্রেমিক হলাম। মনে হল, সব কচুরিপানা সরিয়ে দিয়ে তাকে আবার অতীতের মতো রূপবতী করে তুলি। তার মুখের দিকে তাকালে আমি বুড়োদাকে দেখতে পেতাম। সেও ঝাপসা। আমার স্মৃতির উপর রাশিরাশি কচুরিপানা। কে সরাবে? গৃহেই রয়ে গেলাম। আমার দৌড় যাদবপুর অবধি সীমাবদ্ধ রয়ে গেল। এর ওপারে সব কেমন যেন অপরিজ্ঞাত। বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেল আমার মসজিদ। পাঁচ ওয়াক্ত নয়, প্রতিটি ওয়াক্ত সেখানে কাটাতে পারলে যেন আমার সুখ। কিন্তু নিয়তির কী পরিহাস, সেই সুখ অনুভব করার মতো মানুষী শক্তি আমার রইল না। শুধু থেকে যাওয়া। টিকে থাকা। থাকা। বিশাল ব্যপ্ত মহাবিশ্ব, গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ নিয়ে যে একটা ছবি, যাকে আমি দূর থেকে দেখতাম কল্পনায়,–একদিন, ২০০৭ সালে আমি সেই ছবির গায়ে উলটে যাওয়া দোয়াতের কালির একটা অনভিপ্রেত এবড়োখেবড়ো রঙ হয়ে আটকে গেলাম। ডিরিয়ালাইজেশনের ঘরে অনিচ্ছুক প্রবেশাধিকার পেলাম।

সেই দিনই শুরু হয়েছিল আমার লকডাউন। নিয়তি চাপিয়েছিল। এখন রাষ্ট্র চাপিয়েছে। রাষ্ট্রই কি নিয়তি?  যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, সে কি তাহলে নিয়তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে? ঘরে বসে শুধু আমার আদিগঙ্গার কথা মনে পড়ে। কত কাছে, কিন্তু কত দূরে। সেখানে নাকি অনেক বক-পাখপাখালি এসে ভিড় জমাচ্ছে এখন, সূত্রের খবর। মৃতপ্রায়রা মৃতপ্রায়দের সংবাদ সংগ্রহ করে। মানুষ অহেতুক মৃত্যুর প্রার্থনা করে। যখন সত্যিই মৃত্যু এসে সামনে দাঁড়ায়, চারপাশে ঘোরাঘুরি করে, তখন জীবনকে রোজ স্যানিটাইজার দিয়ে ধুতে ধুতে বলে, জীবন রে, তুঁহু মম ‘same’ ও সমান। কিন্তু পাথরের কোনও বন্দীদশা নেই। সমুদ্রতটে সে পাথর, খাটের পায়ার তলায়ও সে পাথর। আমি ওই পাথর। সচলাবস্থায় স্থির, অচলাবস্থায়ও। যাবজ্জীবন লকডাউনের দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আমি শুধু চাই প্রীতির সংক্রমণ হোক। প্রীতি-লতা দেদার ছেয়ে যাক সমস্ত দলীয় দফতরে। কেউ কি কাঁদচ্ছে প্রতিবেশে? শুনতে পাই, অনুভব করি না কেন? আমরা সবাই কি তবে ডিরায়ালাইজেশনের খানিক খানিক স্বয়ংসেবক হলাম?

3 Replies to “

যাবজ্জীবন গৃহ-স্থ

জিয়া হক


  1. খুব ভালো লাগল লেখাটা। অনুভূতির এমন প্রগাঢ়তা যদি ‘অনুভূতিহীন’ হয়ে পাওয়া যায় তাহলে আমিও সে পথই শ্রেয় মনে করি। বড়ো ভালো লাগ।

  2. লেখাটিতে প্রাণের স্পর্শ পেলাম। এ একপ্রকার সততা। অনেক দূর অব্দি নিজের ভেতর খুঁড়ে দেখা। বর্ণনা শৈলীর সক্ষমতায় এমন অনেক অনুভবই আমরা গ্রহণ করতে পারিনা। এ লেখা ছবি হয়ে হয়ে সেসব ফুটিয়ে তোলে। বুড়োদাদার সাথে আদিগঙ্গার সাথে লেখকের একাত্মতা তার মিথ্যে, তার মিথ্যের প্রতিস্পর্ধী উচ্চারণও ছুঁয়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *