একটি মাঠের কাহিনি

বেবী সাউ


আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরে একটা কবরখানা আছে। জায়গাটা গাছে ঢাকা। সন্ধে হতে না হতেই ওই এলাকা জনশূন্য হয়ে যায়। কবরখানা আর আমাদের বাড়ির মধ্যে রয়েছে একটা বড় মাঠ।মাঠের পিছনেই ক্ষেত। আর বাড়ির সামনে দিয়ে একটা রাস্তা। বাড়ি থেকে বাঁদিকে এগিয়ে গেলেই জঙ্গল। অল্প দূর দিয়ে চলে গেছে একটা পুরনো মিটার গেজ লাইন। শ্যাওলা পড়ে গেছে কত বছরের তা ঠাহর করা যায় না। আমাদের বাড়ির একটা লম্বা বারান্দা আছে, যেখানে বসে থাকলে মাঠ পেরিয়ে সেই কবরখানা দেখতে পাওয়া যায়। সেই কবরখানার একটা ভাঙা পাঁচিলের গর্ত দিয়ে দেখা যায় একটি শান্ত কবর।

ওই যে মাঠের কথা বললাম, সেই মাঠটা সারাবছর নীরব থাকে না। মাঠে হাট বসে। তখন চতুর্দিকে মানুষ, মানুষ। কবরখানা ঢেকে যায়। কবর ঢেকে যায়। মানুষের পায়ের শব্দ শোনা যায়। বিক্রিবাট্টার শব্দ শোনা যায়। দরদামের শব্দ শোনা যায়। জায়গাটা বেশ শব্দে ঘামে জলে দামে আর দীর্ঘনিঃশ্বাসে গমগম করে। রাত হতেই আবার সবাই একটু একটু করে ফিরে যায়। কিছু মাতাল পড়ে থাকে মাঠে। অনেক গভীর রাত পর্যন্ত চলে তাদের মাতলামী। তার পর সবাই শান্ত হয়ে কোথায় যে চলে যায়, কেউ খেয়াল রাখে না। আর সে সময় মাঠটা মনে হয় অনেকটা ছোট হয়ে গেছে। নীরবতা দূরত্ব কমিয়ে আনে। মনে হয়, জানলা খুললেই সেই কবরখানা। ওই যে দেওয়াল, আর এই যে আমার জানলা, আসলে দেওয়ালটাই আমার জানলা আর জানলাটাই সেই দেওয়াল।

শুনেছিলাম দেওয়ালে গর্ত থাকলে, সেই গর্ত দিয়ে মৃত্যু আসে। মানুষ বিড়বিড় করতে থাকে। মানুষ ভয় পায়। মানুষ অকারণ উচ্চস্বরে ঝগড়া করতে থাকে একে অপরের সঙ্গে। স্রেফ এই নীরবতাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এই নীরবতাকে এড়িয়ে তো যাওয়া যায় না। কখন ডে লা মেয়ারের ঘোড়া আসবে, আর তার পায়ের শব্দ শুনতে শুনতে আমার ভোর হবে, এই অপেক্ষায় কতদিন বসে থেকেছি আমি রাতে। কিন্তু এখন মাঠে আর গুনগুন শোনা যায় না। লোকমুখে শুনি, মাঠে নাকি মৃত্যু আসে। মৃত্যুভয়ে কেউ আর মাঠে যায় না। ক্ষেতে যায় না। রাস্তা দিয়ে কারো পদশব্দ শোনা যায় না।

ওহ নীরবতা! আমি তোমায় চেয়েছিলাম এ কথা সত্যি। কিন্তু এমন নৈঃশব্দ চাইনি। আমার যে লুকিয়ে থেকে মানুষের ঘামের গন্ধ টের পেতে ভাল লাগে। কান পেতে মানুষের কথা শুনতে ভাল লাগে। আর ভাল লাগে এক একটি মানুষকে দেখে তার জীবন সম্পর্কে ভেবে যেতে। কিন্তু এখন কারো মুখ দেখতে পাচ্ছি না। গান শুনতে পাচ্ছি না। কোনও মাতাল এসে গভীর রাত পর্যন্ত গান গাইছে না আমাদের কবরখানার পাশের মাঠে। মনে হচ্ছে কবরখানা অনেকটাই এগিয়ে এসেছে। দেওয়ালটাকে মনে হচ্ছে আমার জানলার প্রতিবেশী।

শব্দ না থাকলে নীরবতাকে বোঝা যায় না যেমন, তেমন নীরবতা না থাকলে শব্দকেও বোঝা যায় না। তাই্‌, এখন চারদিকে অদ্ভুত নৈঃশব্দ। কিন্তু নীরবতা নেই। কারণ শব্দ নেই। আর তার জন্য মনে হচ্ছে, নীরবতার কাছে আমরা এখন কোনও সুর, কোনও শব্দ, কোনও গান প্রত্যাশা করতে পারি না। যদি না আবার মানুষ গুনগুন করে ওঠে রিক্ত হয়ে যাওয়া মাঠে।

আমাদের বাড়ির পাশে একটি কবরখানা আছে। কিন্তু এখন আর কোনও মাঠ নেই। মাঠটি ঘন সবুজ। কিন্তু তা মাঠ নয়। কবরের উপরের জমি। তার উপর জমে আছে নৈঃশব্দ। দেওয়ালটা ভেঙে পড়ে গেছে। জানলা বন্ধ করে রেখেছি আমিও।

 

7 Replies to “

একটি মাঠের কাহিনি

বেবী সাউ


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *