আরও একা হবার দিন

দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম


একলা থাকার অভ্যেস নিয়ে যত গরিমা আমাদের তা ধুলিস্যাত করার বাসনা নিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে ঘরবন্ধ দিন। বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনার দাপটে ঘরে থাকা সবচেয়ে কার্যকরী উপায় বিবেচিত হলে যারা একলা জীবন উদযাপন করা মানুষ আছেন আমার মতো, তাদের যাপনে খুব একটা পরিবর্তন আসবেনা যতই ভাবা যাচ্ছিল, ঠিক তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আজ মনে হচ্ছে আমাদের একা থাকা, আমাদের বিচ্ছিন্ন থাকা প্রকৃতার্থ একার জীবন নয়। আরো অনুষঙ্গ জড়িয়ে তাকে পরোক্ষেই সামাজিক জীবন করে তুলে, আমরা হয়তো খেয়ালও করতে পারিনি এতোদিন। সে অনুষঙ্গে কারা, রাস্তায় নিয়ত দেখা ভিড় কিংবা রাস্তা নিজেই, কাপড় ইস্ত্রি করা দোকানের হাসিমুখ লোকটি কিংবা তারই পাশে অবিরাম রিপু করে যাওয়া নিচুমুখ সেলাইকল। তাদের সাহচর্য, মুখোমুখি হবার যে অভ্যেস আমরা এড়িয়ে গেছি দিন প্রতিদিন, এখন ঘরবন্দি সময়ে মনে পড়ছে সব একে একে।

প্রতিদিন নির্ঘন্ট ধরে পৃথিবীর এই অসুখের বিস্তার শুনে শুনে বিষিয়ে ওঠা মন, আর সম্ভাব্য সব শুভ সংবাদ কার্যত নিষ্প্রাণ মনে হলে আমাদের মনে হতে থাকে আমরা ক্রমশ ঢুকে যেতে থাকি গভীর এক অন্ধকার দেশে, যেখানে ফণা তুলে রোদ্দুর উঁকি দেবার সম্ভাবনা কোনদিন ছিলো কিনা আমরা বলতে না পারলেও, অন্ধকারের মেঘ-তুলো খসে শরীরে ছড়ালে আমাদের কান্না কোনদিন শুনবে না আর কেউ, সে প্রতিবেশী, কিংবা শ’য়ের অধিক কিলোমিটার দূরে থাকা স্বজন, এই ভয় আর উৎকন্ঠায় সংজ্ঞায়িত হতে থাকে মুহূর্তকাল। যেন নিজের থেকে সরে গেছে নিজেরই ছায়া, আর প্রভূত নিঃসঙ্গতা হামাগুড়ি দিচ্ছে আমারই আত্মার ভেতর। চারদিকে গভীর রাত, অন্ধকারের হর্ষধ্বনি নিঃশব্দে বাজতে থাকে, আমি কেবলই নিরীহ শ্বাস, বিধস্ত পড়ে থাকা এক, চির বিলীন হবার অপেক্ষায়।

তবুও বিলীন হবার আগে যে শ্বাস চলাচল, এবং সূর্য উঁকি দেবে জানলার করিডোরে, এইরকম আশাবাদ নিয়ে আরও গভীর রাত্রিযাপনের দিকে যেতে যেতে যে বেঁচে থাকা, তার সহায়ক হয়েছে নিজেরই কিছু পুরনো অভ্যাস, তা স্বীকার করি। পড়া হবে বলে থরে থর সাজানো বইয়ের থেকে যে পাপ জমে যাচ্ছিল বহুদিন, তার দিকে প্রায়শ্চিত্ত করবার একটা উপায় হয়ে ধরা দিয়েছে এই ঘর-বন্দি কাল। আর সাদা কাগজে কালো হরফে যদি দেখা গেছে সমাগত মানুষের মুখ, মনে হয়েছে বারবার এও সত্যি, বিমুক্ত আকাশের নিচে পাখিদের মতো মানুষের বিচরণ, সকালে যারা আরও কিছুদিন সুস্থ্য বেঁচে থাকবার বাসনায় বেরিয়ে যাবে রাত-জাগা শহরের অলিগলিতে, আর খানিক পরেই যাপন এক নিয়ত যুদ্ধ মেনে কর্মস্থলের দিকে, আর সন্ধ্যায় ক্লান্ত অথচ বর্ণাঢ্য আলোর দিকে, হেঁশেলের গন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছে ঘর-বারান্দায়, মানুষের মুখ দেখে মানুষ, মানুষের আনন্দ দেখে মানুষ, এইরকম সত্যিই আমরাও দেখেছি। এবং শীঘ্রই ফিরে আসবে তার নতুন অধ্যায়।

আর নিঃসঙ্গ দড়িটিতে বাঁধা বৌদ্ধের নৌকা, চারদিক হিম শান্তি, বৃক্ষের গায়ে গায়ে জড়ানো শীত, তারই দিকে এগিয়ে আসছে নব্য সন্ন্যাসী, এরকম চিত্রকল্পের মতো এঁকে রাখা সচল যত ক্যানভাসেরা কিছুদিন ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে অচল পৃথিবীলোকের কান্না, বহুবার মনে হয়েছে এই পুঞ্জিভূত দৃশ্যরা আমাকে খুঁজেছে বহুদিন, যেন মুখ দেখাবে বলে, প্রকৃত প্রেমিকের দিকে ছুটে যাবার আগে বিশ্বস্ত আয়না ভেবে, তাদেরই মনোবাসনা পূরণের এইসব সময়। কিন্তু হায়, এই বর্ণাঢ্য তাঁকানোর দিকে ছুটে আসবে বিষধর সাপ, বদ্ধ যাপনের প্রথম ছোবল নিয়ে এঁকে দেবে শ্মশানের অভিমুখ, কে জানতো! ফলে শান্ত ছবিটি রইলোনা আর শান্ত, চিরদিন বিপদসঙ্কুলতার দিকে আমাদের এগিয়ে দেয়া, কখন সে গিলে নিবে এই স্মরণ নিয়ে মন-খারাপ নামে অন্তর্লোকে। যে মুখ দেখেছি আমি জলের রেখায়, সে মুখ বিলুপ্ত পাখিটির স্বরে আমাকেও কাঁদায়!

কিছুই থাকে না আর, ভস্মের ভেতর দিয়ে ভেসে যেতে যেতে মনে হতে থাকে একা এই ঘর, তার চারদিক ঘিরে আছে যত ইট-পাথরের বেড়া, সব ধুলিস্যাত একা, গুড়িগুড়ি একলাবোধ নিয়ে সমস্ত যৌথ আর সামাজিক যাপনের থেকে হয়ে যাচ্ছে আলাদা। লেখা হয় না কিছুই, কাকে লেখা যায়, মনে হতে থাকে এই সংযোগ পথেও বিদ্ধ হয়ে আছে বিপর্যয়, সর্বনাশা। যা ছিল সন্নিহিত মন মানুষের, সজল নীলের অপেক্ষা, সবই সরে গেছে আরও দূর স্থলের কাছে, সেখানে কালো আগুন, নতুন চিন্তার দিকে যেতে না-দেয়া এক অভিশাপ। তুমি কেমন আছো হে সতেজ দিন, প্রেমিকার মতো অভিমান নিয়ে দূরে দূর, আমি ধংসোন্মুখ পৃথিবীতে কিছুই ভাবতে পারি না তার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *