দুর্লভ জীবনের আঁধার মোহমায়া

সুমিত পতি


আশ্চর্য এক নৈঃশব্দ টুঁটি চিপিয়া গৃহে বন্দী করিয়া রাখিতে চায়; পায়ের চলন, শরীরের স্পন্দন মনের নিয়ম। আসে; এমত কালমেঘ কদাচিৎ নিশ্চিত রূপে আসিয়া পড়ে আর মুখোশ পরিহিত মানব সমাজের সমূহ রঙ উৎপাটিত করিয়া গোপনে ঘাপটি মারিয়া রহে, ফুরাইয়া যায় না- কেবলি ফুরাইয়া যাইবার নাম লইয়া মুচকি হাসিয়া রঙ্গ তামাশা দেখিতে থাকে। দেখিতেছি; তাহার রুদ্র রূপ দেখিতেছি; যাতনা সহ্য করিতেছি। রুদ্র রূপ দেখিয়া যত না যাতনা পাইতেছি তাহার অধিকগুণ বেশী জীবন্মৃত হইয়াছি নিজেরি অন্তঃস্থলে উৎপাদিত ভয়ের চোরাস্রোত অবলোকন করিয়া।

 

সমস্ত কর্ম বন্ধ রহিবে; পথে ঘাটে মনুষ্যের অবাধ যাতায়াতে বেড়ি পড়িবে, সমস্ত মূল্যবান পোষাক পরিচ্ছদ তুলিয়া রাখিতে হইবে, কীটদষ্ট হইবে। সমস্ত মনুষ্যের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হইয়াছে খাদ্য সংগ্রহের জন্য- শুনিতে পাওয়া যায় খাদ্যের আশু সংকট উপস্থিত- এমত চিন্তা চেতনার আকাশ আমার সমস্ত শরীরকে অবশ করিয়া তোলে; বাহ্যকর্ম নিষ্কাসিত না হইয়া আবার স্বস্থানে চলিয়া যায়। গৃহে আরামপ্রদভাবে এতদিন কাটাইবার পরেও মনে হইতে লাগিল, গৃহে প্রাণবায়ু কম পড়িয়াছে; মন ছটফট করিতেছে, কোন কর্মে মন লাগিতেছে না, আসলে কোন কর্ম খুঁজিয়া পাইতেছি না, কাব্যচর্চায় মন লাগিতেছে না, কাব্যরস কেমন যেন শুষিয়া লইয়া নিরুদ্দেশে চলিয়া গেছে মৃত্যুরূপী দৈত্য। অচেতন ঘুমে কেবলি কদম্বের ন্যায় কি যেন আসিয়া আহত করিয়া আপনারে আপনা হতে বিচ্ছিন্ন করিতে চায়, নাসিকা, মুখমণ্ডলে বাসা বাঁধিতে চায়। মনুষ্যও কি কম যায়? দৈত্যের কাছে নাসিকা, মুখমণ্ডল আবরণী বাহির করিয়া অসম যুদ্ধে অবতীর্ণ হইয়াছে। যুদ্ধ চলিতেছে, আমি শান্তিপ্রিয় জনপদ খুঁজিয়া নিজেকে আড়ালের চেষ্টা করিবার প্রয়াসে লিপ্ত রহিয়াছি। সমস্ত রকম ভয়কে জয় করিয়া নিজস্ব বক্ষপটে সাহস সঞ্চয় করিয়া শ্বশুরালয়ে যাইবার সিদ্ধান্ত লইলাম। গৃহিণী উক্তস্থলে ভয়াল এই প্রকটিত দৈত্যের ভয়ে দীর্ঘকাল আটক হইয়া রহিয়াছে। নাগরিক দুর্লভ জীবন বহুবিধ রসনা তৃপ্ত করিয়া আসিয়াছে দীর্ঘকাল, অথচ এই প্রথমবার মনে হইল নগর আলোকোজ্জ্বল হইলেও ইহার গভীরে এক অন্ধকার চির বিরাজমান। অবশেষে একদা সমস্ত রকম রক্ষী ও অনুশাসনকর্তাদের অগোচরে গভীর সায়াহ্নে শ্বশুরালয়ের উদ্দেশ্যে বাহির হইতে পারিলাম ও বলাবাহুল্য এই উদ্দেশ্য বিধাতার আশীর্বাদে সফল হইল। গৃহিণী আমার মুখাবয়ব অবলোকন করিয়া যারপরণাই খুশি হইল; দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ক্রোড়ে তুলিয়া আমিও বাৎসল্য রসে ভাসিয়া গেলাম। আহা এক অদৃশ্য ভয়াল অন্ধকার এতদিন যাবৎ আমায় বঞ্চিত রাখিয়াছিল সন্তানের সুললিত হাস্যের দুর্লভ দর্শন হইতে। কি অপার তৃপ্তি! মনে মনে ভয়াল দৈত্যের বিনাশ চাহিয়া পরমেশ্বরের নিকট সহস্র নালিশ ঠুকিয়া বসিলাম।

 

কি অপার্থিব শান্তি! উদার প্রান্তরের সবুজ গালিচার উপরিদেশে নির্বিকার পদচারণ করিতে করিতে ভাবিলাম জীবন আদতেই লুকাইয়া রহিয়াছে গ্রাম্যদোষে দুষ্ট প্রাকৃতিক খনিজে। এ স্থলের মনুষ্যদিগের মধ্যে ভয়ের প্রাদুর্ভাব কম রহিয়াছে। জীবন যেমত চলিতেছিল প্রায় তেমনই চলিতেছে; খালি কালে- অকালে গল্প গুজবে ও সংবাদের ত্রাস চলিতে থাকে। গ্রামীণ মাতববরগণ মাঝে মাঝেই মনসামণ্ডপে মিটিং এ বসিয়া আগত দিনকাল সম্পর্কে সমূহ আলোচনা করিয়া গ্রামবাসীদিগকে সতর্ক করিয়া দেন। আমি অত্র জামাই মানুষ, শ্বশুরালয়ে প্রকৃত জামাই আদরেই উদরপূর্তি করিতেছি, মিছেমিছি গ্রাম্য আলোচনায় কর্ণপাত করিয়া ভয়ের সমূহ বাতাবরণ নিজস্ব করিবার বোকামি করিব এমত শিক্ষা আমার ক্কচিৎ হয় নাই। উদার জল হাওয়ায় খাই খাই বাড়িয়া গিয়াছে, আহারে রুচি বাড়িয়াছে, ক্ষুধাও বাড়িয়াছে; ভয় কমিয়াছে, মনে হইতেছে বন্দী জীবন হইতে মুক্তি পাইয়াছি।

 

প্রাতে গোধূলিতে বেশ খানিকক্ষণ সময় বিশালাকার আম্রকাননের নিবিড় ছায়ায় প্রাণ শীতল হইয়া যায়। অম্ল মধুর অপক্ক আম লবণ সহযোগে কড়মড় করিয়া চিবাইয়া নিজস্ব বাল্যকালকে নিজস্ব মনোদর্পণে ফুটাইয়া তুলিবার এক বিরাট ব্যবস্থা বহু কর্মের চাপে হইয়া ওঠে নাই। আহা! কি ছিল অবাধ্য বাল্যকাল। আম্রকুঞ্জের শীতলতা ক্রমশ কাব্যরসে নতুন জীবন প্রদান করিল। শুকিয়া যাওয়া কাব্যরস ফিরিয়া পাইবার উপক্রম হইতে লাগিল, কিন্তু দু এক কলি লিখিবার আগেই কানাঘুঁষো শুনিতেছি ভিনদেশী মনুষ্যগণ নিজস্ব বাটিতে আসিবে ও নিজেদের সহিত সেই ভয়াল দৈত্যের ছায়া লইয়া আসিতে পারে। ভয় করিতে লাগিল। গ্রাম্য মাতব্বরগণ উতলা হইয়া ঘন ঘন আলাপ আলোচনায় রত হইতেছেন। তাহা হইলে গ্রামও আর বসবাসের জন্য নিশ্চিন্ত আশ্রয় নয় বলিয়া মনে হইতে লাগিল ফিরিতে হইবে সেই নগরের বন্দী শিবিরে।

 

মনস্থির করিয়াছি আর কদিন বাদেই ফিরিব নিজস্ব বাটিতে। মন তেমন প্রীত নহে। আহার্যের ভিন্নতা আর তেমন রহিবে না ভাবিয়া বড়ই দুঃখ হইল, আবার ভাবিলাম বাঁচিয়া থাকিলে আহার আরও হইব, কিন্তু জীবন চলিয়া গেলে আর ফিরিবে না অতএব জীবনেই দীর্ঘ হোক এমত সিদ্ধান্ত হইল।

 

যাইব ঠিক, পরিত্রাণ পাইব দৈত্যরূপ মারণ রোগের করাল গ্রাস হইতে এমত বিশ্বাস আমি শয়নে স্বপনে নিদ্রায় জাগরণে সর্বত্রই রাখি। একেকেবার মনে উদয় হয়, আহা! যদি পক্ষী হইতে পারিতাম তাহা হইলে বন্দীত্ব বলিয়া কোনোরূপ শব্দ থাকিত না, থাকিত না কোনো মনঃকষ্ট। ভিনদেশী শ্রমিকেরা সর্বত্র হাঁটিতেছে, কেহ কেহ পথিমধ্যেই মরিতেছে, মহামারী কমিবার নামমাত্র লক্ষণ প্রকাশ পাইতেছে না- ক্রমে মরণের লীলা বাড়িতেছে। আমি আর সংবাদ কর্ণপাত করিবার পরিস্থিতিতে নাই। আঁখিতে ঝরঝর পানি লইয়া আমি শয়নে যাইতেছি, যাহারা চক্ষু প্রসারিত করিয়া রাখিয়াছেন তাহাদের চক্ষু আরও প্রসারিত হোক। আপাতত আমার বিরাম, আপনারা যাহাকে বলেন বিরতি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *