ঘুমের ভিতর লেবু ফুলের গন্ধ

অনিন্দিতা ভৌমিক


অন্ধকারের শেষবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আমরা যার মুখোমুখি হই, সে কি আমাদেরই স্বজ্ঞা? নাকি মনের গভীরে এড়িয়ে যাওয়া কোনো নির্জন বারান্দা? প্রতিফলনের চেয়েও অতিরিক্ত কিছু। হাত রাখলে যার মুখ বিস্রস্ত হয় না। অটুট থাকে, প্রমাণ করে আপাত স্থিরতার গভীরে জেগে থাকা আত্মা। ডাক পাঠায়।

অথচ সাধারণভাবে যা কিছু প্রাণহীন/অস্তিত্বহীন, স্পন্দন রয়েছে তাদের মধ্যেও। আমাদের উচ্চারিত শব্দ, এই সময়, বাতাসের কণার মধ্যে কম্পন তৈরি করলো। হয়তো শ্রবণমুহূর্ত অতিক্রম করে সে ধাক্কা দেবে অন্যকোনো এমনই ভেসে আসা কম্পনকে। স্থির হবে বা চূর্ণ হবে অভিঘাতে। বিশ্বের এই নিয়মতান্ত্রিকতা যিনি বিন্দুমাত্র বুঝতে পেরেছেন, কেবলমাত্র তিনিই সামান্য অবলোকন করেছেন নিজস্ব অস্তিত্বে। দাঁড়িয়েছেন সেই অন্ধকারের শেষতম বিন্দুতে।

নার্সিসাসের অসামান্য রূপ জল থেকে উঠে এসে গ্রাস করে নেয় তাকেই। কিন্তু কেবল শারীরিক সৌন্দর্য্য তা ছিল না। বরং নার্সিসাসকে মনেহয় একজন অক্লান্ত সন্ধানী, যিনি পৌঁছতে চাইছেন, খুঁজে যাচ্ছেন কোনো অন্তিম বিন্দু, কিন্তু খুঁজে পাচ্ছেন না কিছুতেই। ঠিক যেভাবে অনির্দিষ্ট ঘুরে বেড়ানো নার্সিসাসকে নিঃশব্দে অনুসরণ করে ইকো। তার নিজস্ব স্বর নেই, শব্দ নেই – সে প্রতীক্ষা করে উচ্চারণের। আর তারা যেন হয়ে ওঠে পরস্পরের পরিপূরক – নার্সিসাস খুঁজতে থাকে প্রতিবিম্বের ভাষা; ইকো খুঁজে বেড়ায় শরীর।

আমাকে থাকতে দাও এই উপকূলবর্তী স্তরে

না, যেও না। রচিত এই কাব্যে খসে পড়ে

আমার বাৎসল্য, আমার রজঃস্বলা দিন, লাবণ্যময় ধ্বনি

অথচ কবিতার সাফল্যের মূলে থাকে রসাভাস

ইঙ্গিত অনেক বেশি অর্থবহ। কপালে ফুটে ওঠা ঘাম

এটুকুই তো দিগন্ত। দূর এক মুক্তি, এক বোধ

ফাঁকা চৌষট্টি ঘরে, গভীর, তাৎক্ষণিক নাম

আমি জানি না, এই মুহূর্তে কতোটা নির্মোহ তোমার শ্বেত উরু?

অথবা জৈষ্ঠের ধানের শিষে কিভাবে জমাট বাঁধে শর্করা?

আমি শুধু ছুটে বেড়াই শব্দ ও স্বেদের জমিনে

সোঁদা গন্ধে, নিঃসঙ্গ বীজবিন্দু নিয়ে

                                                … ( নিষাদ – অনিন্দিতা ভৌমিক )

একা হতে চাইলেও কতটা একাকীত্ব ভোগের স্বাধীনতা পায় কোনো বস্তু বা ভাবনা? মূর্ত গঠনচিহ্ন থেকে অমূর্ত দর্শনের দিকে নিয়ে যাওয়া নিজেকে, এ যেন ভাবনার নগ্নতাকে তুলে ধরা প্রকৃতপক্ষে। শরীর থেকে ছিঁড়ে ফেলা আত্মাকে। যা উদ্দাম। ছন্নছাড়া। জীবন্ত। যাকে প্রকাশ করা যায় না পরিচিত কোনো ইঙ্গিত বা প্রতীক দিয়ে। অথচ ‘স্যুরিয়াল’ না। স্যুরিয়ালের জন্যে প্রয়োজন এমন কিছুর যেখানে মিল ঘটে চেতনা ও স্বপ্নের। যেখানে দুটো সম্পর্কহীন জিনিসের উপস্থিতিতে এমন এক পরিবেশের সৃষ্টি হয় যা পূর্বনির্দিষ্ট নয়, যা বস্তুকেন্দ্রিক নয়। বরং ভেঙে ফেলে চিন্তার আড়ষ্টতা। দর্শক/পাঠককে দেয় উদ্ভাস। এক অন্যরকম আলো, ভাবনার এক বিশেষ চেহারা।

আত্ম-প্রতিকৃতির ভেতর দিয়ে ফ্রিডা কাহলো তুলে ধরেছিলেন তাঁর নিজস্ব রক্তাক্ত, যন্ত্রণাদীর্ণ জীবনকে – তাঁর পৃথিবীকে। কিন্তু সেই যন্ত্রণা আজীবন মুক্তি দেয় নি তাঁকে। আসলে তীব্র শারীরিক আঘাতের সূচনা কাতরানির শব্দে হলেও, দীর্ঘ সময় তা সহ্য করার পর, শরীর আর উপশম চায় না। শুধু অনুভব করতে শুরু করে ধারালো ক্ষতগুলো, কিছু হয়তো বোঝার চেষ্টা করে – নিজেকে প্রতীক করে তোলে শুভের বা অশুভের। ঊনচল্লিশ বছর জীবনের অধিকাংশ সময় ফ্রিডা কাটিয়েছিলেন অসুস্থতায়, হাসপাতালে। বত্রিশবার হয়েছে অপারেশান – মেরুদণ্ডে, পেলভিসে, ডানপায়ে। নিজের এই জীবনই সঙ্গী হয়েছে তাঁর আত্ম-প্রতিকৃতির। “ Broken Column” ছবিতে তাঁর ছিন্নভিন্ন শরীর আটকে রাখছে চারটি লোহার পাত। পুরোপুরি সম্পর্কহীন দুটো বস্তু। অথচ দেহের দুটো অংশের মধ্যে সৃষ্ট হওয়া ফাটলকে রক্ষা করছে তারা। সাথে অজস্র পেরেকের ক্ষত। কিন্তু খুব অদ্ভুতভাবেই, প্রতিকৃতির মুখে কোনো যন্ত্রণার চিহ্ন রাখেনি ফ্রিডা। অনুভূতি ও উপলব্ধির বাইরে বেরিয়ে মুখ যেন কেবলমাত্র শরীরের একটা প্রত্যঙ্গ মাত্র। হাত, পা, উদরের মতো মুখও ফ্রিডার কাছে কেবল রক্তমাংসের একটা অংশ – যার প্রকাশ সম্পূর্ণ যন্ত্রণাহীন করেছে সে খুব সচেতনভাবেই।

“ We all have such fateful objects – it may be a recurrent landscape in one case, a number in another – carefully chosen by the gods to attract events of specific significance for us : here shall John always stumble ; there shall Jane’s heart always break.”

                                                                        ………….. Vladimir Nabokov

তীব্রতায় জ্বলে ওঠা বা শূন্যতায় গভীর পতন – প্রত্যেকটি অভিজ্ঞতাই আলাদা ঘর বানিয়ে রাখে জীবনে। সময়ের অবহেলায় কখনও তার শরীরে জমে শ্যাওলা। খসে পলেস্তরা। কোনো অংশ আবার খুব নিবিড়, ছায়াচ্ছন্ন। পাঁশ দিয়ে বয়ে চলেছে সোঁতা। তার দু’পাড়ের কাদায় পায়ের ছাপের গর্ত – যারা কখনও এসেছিল এই জীবনের ভেতরে – বাইরে। উজ্জ্বল লাল আলোয় ঠোঁট কামড়ে ধরে সেইসব কথা। তাদের শক্ত চোয়াল। ঝকঝকে রঙ। একটু দূর সামনে এগোলেই আবার হয়তো খোলা আকাশ। ফাঁকা। কেবল নিঃসঙ্গতার উদাহরণ হিসাবেই যাকে ধরে নিই আমরা।

বৈজ্ঞানিক সত্যগুলো বড় বেশি রহস্যময় করে তোলে আমাদের পরিচিত বস্তুজগতকে। আমরা দেখি কিভাবে পদার্থ টুকরো হয়ে যায় অনু-পরমাণুতে। বুঝি জল কেবল বহন করে নীলের ছায়া; আয়নায় যে আকাশের প্রতিবিম্ব তাতে একটুও নেই আকাশ। আমাদের চিন্তার দেওয়ালগুলো এভাবেই ভেঙে চুরমার হয়। ঠিক যেভাবে জলে নিজের প্রতিবম্বকে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে যেতে দেখেছিল নার্সিসাস। আর এভাবেই হয়তো সে পৌঁছে গিয়েছিল বস্তুজগতের পরবর্তী ধাপে – যা প্রতীকহীন, একা, অথচ প্রবলভাবে সম্পূর্ণ। শক্তির রূপান্তরের ধাপে সে কেবল রূপান্তরিত করে নিজেকে। এক স্তর থেকে অন্য স্তরে – সে বজায় রাখে বস্তুরই জীবন – নিবিড়তা। হয়তো কয়েকশো বছর আগেকার প্রবাহ। যতিহীন ও দীর্ঘ। আর এভাবেই আমাদের কাছে তার পুরো অংশটি অধরাই থেকে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *