যুক্তি ও বিযুক্তির ভাবনা

কণিষ্ক ভট্টাচার্য


‘বাজিকরের খেলা রে মন, যার খেলা হায় সে-ই জানে।’

একা এবং বিচ্ছিন্ন মানুষের আরও একটা রূপ পাওয়া গেল এই বিশ্বজোড়া মহামারির সময়ে। গোটা বিশ্বেই মানুষকে মহামারির কবল থেকে বাঁচাতে সামাজিক মেলামেশা থেকে শারীরিক দুরত্বে থাকার নির্দেশ দিয়েছে বিজ্ঞান, রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যস্থতায়। এই মধ্যস্থতার প্রসঙ্গে আমরা আবার পরে আসব।

কিন্তু যোগবিয়োগ প্রায়শই গণিতাতিক্রমী অথবা হয়ত তার নিগূঢ় অজানা গণিত আছে যা এখনো অপ্রকাশিত।

বিশ্বজোড়া সামাজিক এই বিযুক্তির কথা যখন লিখছি তখন এই বিশ্বজোড়া শব্দের ‘জোড়া’ অংশের মধ্যে দিয়েই গোটা বিশ্বের মানুষের মহামারিকালীন যে একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতা সেই বিযুক্তির সঙ্গেই আমরা আসলে যুক্ত হয়েছি এক বাধ্যতায়। এই সময়ে যেন এমন এক পৃথিবী অবস্থান করছে যা আসলে বিযুক্তির ধারণায় যুক্ত। যোগ তো আর এক প্রকার নয়। সঙ্গরোধে আমাদের দৈনন্দিনতায় আরও অনেক কিছুর সঙ্গে যে বিষয়টির বিয়োগ ঘটেছে তা হল যুক্ত হওয়ার থেকে বিয়োগ। গণিতের সরল অঙ্কের মতো আমরা বিশ্বজোড়া একা ও বিচ্ছিন্ন মানুষেরা আমাদের সঙ্গে একটি করে বিয়োগচিহ্ন বহন করে অবস্থান করছি। সরল অঙ্কের সমস্ত বিয়োগচিহ্ন বহনকারী সংখ্যার মতোই এক-পঙক্তিক আমরা আসলে প্রথম-বন্ধনীকৃত হয়ে যুক্ত হচ্ছি ক্রমশ। এই বিশ্ব যেন স্বতঃ যোগচিহ্ন বহন করে পঙক্তির সামনে দাঁড়িয়ে আর এই বিযুক্তির মধ্যে দিয়েই সেই বিশ্বের সঙ্গে জুড়ে আছি আমরা।

#

এই একা বা বিচ্ছিন্ন অবস্থানে মানুষ কবে থেকে, কবেই বা সে ছিল যুক্ত! কার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত, কার থেকেই বা বিযুক্ত হয়েছে সে!

প্রকৃতির অংশ হিসেবেই অপরাপর জীবের মতো মানুষের জন্ম। প্রকৃতির মধ্যেই গোষ্ঠীবদ্ধতায় তার বিকাশ। গোষ্ঠীপরিচয়ের গণ্ডিতে বদ্ধ থেকেও যখন তার চিন্তা তাকে প্রকৃতি-নিরপেক্ষ ‘আমি’ বলে চিনতে শেখাল তখনই সে বিচ্ছিন্ন হল ‘বিশেষ’ হিসেবে। যে চারপাশের সে অঙ্গীভূত ছিল সেই ‘আমি’র সঙ্গে ‘এবং’ সম্পর্কে সে অন্বিত করল চারপাশকে। এই তার প্রথম বিযুক্তি। বস্তুত কারো সঙ্গে বিযুক্তির বোধ যদি না সঞ্চারিত হয় তাহলে সম্পর্কের অন্বয়ের কোনো ভিত্তি থাকে না। অঙ্গাঙ্গী, অর্থাৎ অঙ্গের সঙ্গে অঙ্গীর যে সম্পর্ক নিরূপণ করি আমরা সেখানেও একটি নিহিত ভেদকল্পনা থাকতেই হয়। যবে থেকে মানুষ ভাবতে শিখেছে তবে থেকেই সে বিচ্ছিন্ন।

একার বা বিচ্ছিন্নতার বোধ তাই নতুন নয়। বহুদিন ধরেই তা মানুষকে ভাবিয়ে চলেছে। ধর্মীয় জ্ঞানতত্ত্বের কাঠামোয় পরমেশ্বরের সঙ্গে জাগতিক মানুষের ভেদ বা বিচ্ছিন্নতাকে আলোচনা করা হয়েছে প্লেটিনাস, অগাস্টিন ও লুথারীয় ধর্মতত্ত্বে। ভারতীয় ভেদ ও অভেদতত্ত্ব ভেদাভেদে এসে মিলেছে। দ্বি না এক, নাকি বস্তুত এক কিন্তু লীলার নিমিত্ত দ্বিভেদ এই প্রশ্নে সঞ্চারিত হয়েছে।

পরমের কল্পনাকেন্দ্রিক এই ভাবনা ধর্মকাঠামোর বাইরের আলো পেল হেগেল ও ফয়েরবাখের আলোচনায়। সেই চিন্তাসূত্র আসে রুশোর থেকে যে, সামাজিক চুক্তি ব্যক্তিকে সমাজের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছে, যার ফল এই বিচ্ছিন্নতা। এখানে রুশো বস্তুত প্রাকৃতিক মানুষ এবং ও সামাজিক মানুষের মধ্যে এক ভেদরেখা টেনেছেন, যার সঙ্গে হেগেলের অবিচ্ছিন্ন ও আত্মবিচ্ছিন্ন মানুষের তুলনা টানা যায়।

হেগেলের দর্শনে আত্মবিচ্ছিন্নতার ধারণা প্রযুক্ত হয়েছে পরম ও পরম-মনের ওপর, যা হল একমাত্র বাস্তব। এই গতিশীল পরম-মন সবসময়ে আবর্তিত হয় বিচ্ছিন্নতার দিকে আবার বিচ্ছিন্নতার বিপরীতে। পরম আসলে প্রাকৃতিক জগতে নিজেই নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন আর মানুষের ভূমিকা সেখানে ক্রমশ বিচ্ছিন্নতা অতিক্রমের প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে পরম হয়ে ওঠায়। আত্মবিচ্ছিন্নতা এবং তাকে অতিক্রম করাই পরমের সত্তাস্বরূপ। যতক্ষণ মানুষ এক প্রাকৃতিক সত্তা ততক্ষণ সে আত্মবিচ্ছিন্ন কিন্তু যখন সে ঐতিহাসিক সত্তা তখন সে নিজের এবং প্রকৃতির সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনে সক্ষম। ফলে সে নিজের আত্মবিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করতেও সক্ষম। অর্থাৎ মানুষের মূল গঠনেও মানুষের আত্মবিচ্ছিন্নতা ও তার সমন্বয়ের প্রক্রিয়া বর্তমান। মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হল বস্তু উৎপাদন করা ও নিজেকে সেই বস্তুর মাধ্যমে অভিব্যক্ত করা। আবার এই উৎপাদিত বস্তুর মাধ্যমে সসীম মন নিজেই বস্তু হয়ে ওঠে এবং এই প্রক্রিয়ায় নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।

ফয়েরবাখ মানুষকে আত্মবিচ্ছিন্ন পরমাত্মা বলে স্বীকার করেননি বরং পরমাত্মাকে আত্মনবিচ্ছিন্ন মানুষ বলে মনে করেছেন। পরমাত্মা মানুষের সত্তার এক বিমূর্ত চরম রূপ যা মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন। নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন না হলে মানুষ ঈশ্বরকে সৃষ্টি করতে পারে না। বিচ্ছিন্ন বলেই সেই ঈশ্বরকে নিজের মাথার ওপর বসিয়ে তার ওপর সমস্ত মহত্তর গুণ আরোপ করে নিজেই তার দাস হয়ে পড়ে। মানুষের বিচ্ছিন্ন প্রতিকৃতিই হল ঈশ্বর। সেই ঈশ্বরকে বিলোপ করেই মানুষ সেই বিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করতে পারবে।

মার্কস মনে করতেন ফয়েরবাখ যে ধর্মীয় বিচ্ছিন্নতার কথা বলেন তা মানুষের নানা ধরনের বিচ্ছিন্নতার এক বিশেষ রূপ। কারণ বৌদ্ধিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সব স্তরেই মানুষ নিজের শিল্প-দর্শন, রাষ্ট্র, আইন, পুঁজি থেকে বিচ্ছিন্ন। বিভিন্ন উপায়ে মানুষ তার নিজের কাজকর্মের মাধ্যমে উৎপাদিত বস্তুর থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং বস্তুসমূহ নিয়ে এমন স্বাধীন, পৃথক, শক্তিশালী জগৎ সৃষ্টি করে যেখানে সে এক শক্তিহীন দাস। বস্তুত মানুষ শুধু নিজের উৎপাদিত বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, যে কাজকর্মের মাধ্যমে সে এইগুলি উৎপাদন করে, সেই কাজকর্মের থেকেও সে বিচ্ছিন্ন। যে প্রকৃতি ও জগতে সে বাস করে, সেখান থেকে সে যেমন বিচ্ছিন্ন সেইরকম সে বিচ্ছিন্ন অন্য মানুষের থেকেও। এই সমস্ত রকম বিচ্ছিন্নতাই মানুষের আত্মবিচ্ছিন্নতার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এমনকি মানুষের মানবিকসত্তা থেকে সে বিচ্ছিন্ন।

#

এই তত্ত্বভাবনা এতদূর বিকশিত হওয়ার বহু আগে থেকেই কিন্তু একা বা বিচ্ছিন্নতার বোধ সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রকাশিত হয়েছে।

মানুষ সামাজিক জীব। নির্জনতম সাহিত্যিক, যিনি ব্যক্তিক অভিজ্ঞতা বা ব্যক্তিক মনোজগৎকে সাহিত্যে অভিব্যক্ত করেন বলে মনে হয়, বস্তুত তিনিও আসলে সমাজের পরিপ্রেক্ষিতেই ব্যক্তিক অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করেন। তাঁর এই ব্যক্তিক একাকীত্ব বা বিচ্ছিন্নতা আসলে সমাজের পরিপ্রেক্ষিতেই। ফলে তাঁর নির্জনতার অভিধা তাঁকে আসলে কেন ‘জন থেকে নির্বাসিত’ সেই ভাবনাকেই পুষ্ট করে। এই প্রসঙ্গে এক প্রয়াত বাঙালি কবির কথা মনে পড়ছে যিনি চোখ তুলে ঈষৎ ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলতেন, ‘ও স-স সাহিত্য!’ এই ‘স-স’টি হল ‘সমাজ সচেতন’! কিন্তু সচেতনতাটিও আসলে ব্যক্তিক সচেতনতা। আরও স্পষ্ট করে বললে সমাজের প্রেক্ষিতে ব্যক্তিক সচেতনতা।

জার্মান দার্শনিক ফিশে, যিনি প্রথম জীবনে সাবজেক্টিভ আইডিয়ালিজম ও পরবর্তী জীবনে অবজেক্টিভ আইডিয়ালিজমের চর্চা করেও এঙ্গেলসের মতো বস্তুবাদীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, তিনি আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন ‘সাহিত্য ধর্মীয় ভাবনার অনুবৃত্তি।’ বস্তুত মধ্যযুগীয় সাহিত্য শুধু নয়, মালার্মে কথিত স্থাপত্য থেকে সংগীত শিল্পের সমস্ত মাধ্যমই ধর্মীয় ভাবনার অনুবৃত্তি।

সেখানে সমাজ বা গোষ্ঠী-উত্তর কোন একা বা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিভাবনার স্থান ছিল কী! সাধারণ ভাবে এর উত্তর হল না। তার অন্তঃপ্রেরণা থেকে উৎসর্গ সবই ধর্মের জন্য, এমনকি কখনো তা সাধনপ্রক্রিয়ার অংশ। তবু শিল্পের সৃষ্টি বা নির্মাণের যে স্তরপরম্পরা তার মধ্যেই রোম্যান্টিক কবির মনে প্রশ্ন জাগে, ‘হেরি কাহার নয়ান, রাধিকার অশ্রু-আঁখি পড়েছিল মনে?’ অথবা ধর্মীয় সাধ্যসাধনতত্ত্বের প্রতিতুলনায় আসে নিগূঢ় প্রতীকস্বরূপ সমাজচিত্র। কারণ কোনো নির্দিষ্ট পাঠকের সঙ্গে (হতেই পারে তিনি অপর উপাসক কেবল, ধর্মীয় নিষেধ মেনে তার বাইরে আর কেউই নয়) যোগাযোগের নিমিত্তই এই সৃষ্টি। কারণ ‘নীরব কবিত্ব’ ও ‘আত্মগত ভাবোচ্ছ্বাস’ কোন কাজের কথা নয় বরং ‘প্রকাশই কবিত্ব’। আর সেই প্রকাশকে চালিত করে কল্পনা। ‘মিউজ’এর প্রতিতুলনায় মুধুসুদন দেখেছিলেন এইভাবে,

‘তুমিও আইস দেবি, তুমি মধুকরী

কল্পনা কবির চিত্ত ফুলবনমধু

লয়ে রচ মধুচক্র…’

‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং’ বলেই শিল্পস্রষ্টার মনে হয়, ‘কী বলিনু আমি! এ কী সুললিত বাণী রে! কিছু না জানি কেমনে আমি প্রকাশিনু দেবভাষা, এমন কথা কেমনে শিখিনু রে!’

বস্তুবিশ্বের ক্রৌঞ্চমিথুনের প্রেমবিলাস ও ব্যাধের হন্তারকের জীবিকার অভিজ্ঞতা শিল্পস্রষ্টার ব্যক্তিত্বের স্পর্শে যে শিল্পমূর্তি হয়ে উঠল ‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং’ প্রকাশে তাঁকে শিল্পরসিক হিসেবে কবি নিজেই বিস্মিত হন। এই বিস্ময়বোধ কবিকে দৈব অনুপ্রেরণার ধারণাব্যতীত অপর কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারে না, তাই কাব্যে দেবী সরস্বতীর আগমন হয়।

কান্ট এই মধুকরী কল্পনার হত্যাকারী।

যতদিন কল্পনাশক্তির মহিমা ছিল ততদিন শিল্পীকে মনে করা হত দৈবানুপ্রেরিত ব্যক্তি। কান্ট সাধারণ কল্পনাশক্তির সঙ্গে কবিকল্পনার পারথক্য নির্ণয় করলেন। কল্পনাকে নান্দনিক, উৎপাদনশীল ও সৃজনশীল এই শ্রেণিতে বিভক্ত করলেন। এতে মিউজের মৃত্যু ঘটলেও শিল্পের জন্মরহস্য ব্যাখ্যা হল।

সমাজ বিকাশের সঙ্গে সাহিত্যের বিকাশের একটা ধারা লক্ষ করা যেতে পারে। মহাকাব্যে গোষ্ঠীগত ভাবনার প্রাধান্য ছিল। মিথ জুড়ে জুড়ে যে এপিক তৈরি হয় সেই মিথ গোষ্ঠীভাবনার ফসল। সেই এপিকের লেখক বা সংকলক কেউ থাকলেও তা ব্যক্তিচিহ্নিত শিল্পকর্ম নয়। এখানে মনে হতে পারে চেতনার বিকাশকে যদি আমরা বিচ্ছিন্নতার আদিমূল ধরি তাহলে তার সঙ্গে কি এখানে যুক্তিশৃঙ্খলার ব্যত্যয় ঘটছে? বস্তুত না, কারণ শিল্পী সেখানে গোষ্ঠীরভাবনাকেই সংকলন করছেন কেবল। ধারাক্রমে যখন ট্র্যাজেডি এলো তখন তার উপজীব্য হল ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের কর্তব্য-অকর্তব্যের সংঘাত। আবেগের অতিরেক বা অপর কোনো কারণে সমাজের নিষেধকে ব্যক্তি উল্লঙ্ঘন করছে এবং সমাজ তাঁকে শাস্তি দিচ্ছে, কখনো তার নিজের হাত দিয়েই দেওয়াচ্ছে। অর্থাৎ একা বা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিভাবনা এখানে অস্বীকৃত। তাই নায়কের প্রতি শাস্তিবিধান। কমেডিতে বা মিলনান্তকে এসে সেই ব্যক্তি সমাজের আধিপত্যকে অস্বীকার করে নতুন সমাজের বার্তা দেয়। অর্থাৎ পূর্বতন যে নিষেধনির্ণীত ব্যবস্থা তাকে অস্বীকার করে সে এক নতুন সমাজের স্বপ্ন দেখে। যাকে প্রতীকায়িত করে আমরা দেখি মূলধারার ক্ষেত্রে নায়কনায়িকা হাত ধরাধরি করে এক সূর্যোদয়ের পথে হেঁটে যায় আখ্যানের অন্তিমে। ইউরোপ তখন তার নিজের চোখ দিয়ে বহির্বিশ্বকে চিনছে যাকে সে আবিষ্কার বলে দাবি করবে সেখানে উপনিবেশ স্থাপনের পরে। রোম্যানটিসিজমে এসে দেখা গেল এই একাকীত্বের এক নতুন রূপ। এখানে আমরা রোম্যান্টিক রবীন্দ্রনাথকৃত সংজ্ঞার দিকে একবার চোখ ফেরাব। তার চারটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে যে তিনটি আমাদের এই আলোচনায় প্রয়োজন সেইদিকে দেখব। ১. প্রচলিত ধারার প্রতি দ্রোহপ্রবণতা, ২. দূরযানীবৃত্তি, ৩. প্রকৃতিপ্রাণতা। ব্যক্তিমানস সমাজের প্রচলিত ধারার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বা একা বোধ না করলে এবং সেই ধারা পরিবর্তনে অক্ষম না হলে কেনই বা সে সেই ধারার প্রতি দ্রোহপ্রবণ হবে! ট্র্যাজেডির কাল পেরিয়ে গেছে তাই সমাজ তার শাস্তিবিধান করতে পারে না। কমেডির কালও নয় যে ব্যক্তি সমাজকে ত্যাগ করে নতুন সমাজের পত্তন করবে। কারণ ইউরোপের চোখে ইতোমধ্যেই তথাকথিত বহির্বিশ্ব আবিস্কৃত। সেখানে উপনিবেশের নিষেধনির্ণীত নতুন সমাজ গঠনের প্রক্রিয়া চলমান। দূরযানীবৃত্তির স্থানিকতার সুযোগ আর নেই, তাই রোম্যান্টিক কবির দূরযানীবৃত্তিটি হয় কালিক। অর্থাৎ নির্বাসিতের স্বপ্নপ্রয়াণ। সেই স্বপ্নপ্রয়াণটি কোথায় সম্ভব! না, কোনো সমাজ কাঠামোয় আর তা সম্ভব নয় তা রোম্যান্টিক কবি জেনে গেছেন। কারণ এক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা সমাজসীমাকে অতিক্রম করলে আসলে সে আরেক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা সমাজসীমায় প্রবেশ করে। রোম্যান্টিক কবির একা এবং বিচ্ছিন্ন মনের কাছে সমাজনির্মিত মানুষ সহনীয় থাকে না আর তাই সে সমাজকাঠামোর বাইরে প্রকৃতির কাছে পৌঁছতে চায়। এমনকি তা স্বপ্নপ্রয়াণ হলেও। আসলে সে একা এবং বিচ্ছিন্ন, আসলে সে যুক্ত হতে চায় কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজকে সে পেয়েছে এক অনন্ত নিষেধমূর্তি রূপে। এছাড়া তখন তার কাছে আর অন্য উপায় নেই। অতএব সে সিদ্ধান্ত নেয়, ‘আমরা যাহার সহিত মিলিত হইতে চাহি সে আপনার মানসসরবরের অগম তীরে বাস করিতেছে; সেখানে কল্পনাকে পাঠানো যায়, সেখানে সশরীরে উপনীত হইবার কোনো পথ নাই।’ একা এবং বিচ্ছিন্ন মানুষের যুক্তি আর বিযুক্তির খেলা চলতেই থাকে। আধুনিক কেবল সেই একা বিচ্ছিন্নতার নানা রূপ ফুটিয়ে তুলছে। নানাভাবে তাকে ব্যাখ্যা করতে চাইছে। নানা রাজনৈতিক ভাবনায় সেই বিযুক্তি থেকে যুক্তির দিকে যাওয়ার প্রয়াসপথ সন্ধান করছে শিল্পকর্মে। কখনো তা সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতায় এমনকি কখনো বা ভিন্নভাবে অস্তিবাদে। কিন্তু সে পথ এখনো অনির্ণীত।

#

‘ও মন কখন শুরু কখন যে শেষ কে জানে!’

যে ‘আত্ম’র জন্যে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, সেই ‘আত্ম’কেই মানুষ আবার যুক্ত করার পথ খুঁজে ফেরে।

গোটা বিশ্বকেই মহামারি থেকে বাঁচাতে সামাজিক মেলামেশা থেকে শারীরিক দুরত্বে থাকার নির্দেশ দিয়েছে বিজ্ঞান, রাষ্ট্রের মধ্যস্থতায়। সেই নির্দেশ কিন্তু স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। কারণ তা সার্বিক ভাবে পালন করতে গেলে রাষ্ট্রের আরও কিছু ভূমিকা থাকে। যে ভূমিকা রাষ্ট্র পালন করেনি। যে দেশে স্বরাজ্যে কাজ নেই বলে কুড়ি কোটি অদক্ষ শ্রমিককে ভিনরাজ্যে কাজ খুঁজতে তথা কাজ করতে যেতে হয় সেই রাষ্ট্রেরও বিজ্ঞানের নির্দেশ পালন করার জন্য আরও কিছু কাজ করা অপেক্ষিত ছিল। সেই শ্রমিকদের রাষ্ট্র আসলে ভিন্নার্থে বিচ্ছিন্ন করেছে। তাদের একা করে দিয়েছে মূল রাষ্ট্রব্যবস্থার থেকে। যেন তারা নেই। যেন তারা উদ্বৃত্ত। যেভাবে তাদের শ্রমের দাম উদ্বৃত্ত হয়ে জমা হয় পুঁজির কাছে। একটা ভারত শতশত কিলোমিটার জাতীয়সড়কে হাঁটছে একা ও বিচ্ছিন্ন অবস্থা কাটিয়ে পরিবারের মানুষের কাছে ফিরবে বলে। সেই হাঁটার জন্য পুলিশের লাঠি কখনো দেশের মানচিত্র আঁকছে সেই শ্রমিকদের শরীরে। যেন সেই জাতীয় সড়ক তাদের হাঁটার জন্য নয় যেমনভাবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্বচ্ছল সাদাকলারের পরিযায়ী শ্রমিকের জন্য। সেই একা এবং বিচ্ছিন্ন মানুষদের তখন পুলিশের মার থেকে বাঁচতে জাতীয় সড়ক ছেড়ে রেলের লাইন ধরতে হয় কারণ অন্তত সাত-আট কিলোমিটার অন্তর যে ছোটো স্টেশন আসে সেখানে পুলিশ থাকে না। বড়ো স্টেশনের আগে লাইন ছেড়ে ঝোপঝাড় দিয়ে পথ পার হতে হয় তাদের। রাতে ক্লান্ত শরীরে রেলপথে ঘুমিয়ে পড়লে মালবাহী রেল তাদের শরীরের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করে ছড়িয়ে দেয় রেললাইনে। যুক্ত হওয়া, কেবল যুক্ত হওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা তাদের শিখিয়ে দেয় বৈশাখের অকরুণ সূর্যের নিচে দশ বারো দিনের হাঁটার চেয়ে রাতের ঠান্ডায় হাঁটা তুলনায় সহনীয়। তাছাড়া পুলিশও তখন সেই শ্রমিকদের রাষ্ট্রের মতো ঘুমিয়ে থাকে। বরং তাদের সঙ্গে জাগে শ্বাপদ। ধাতব রেললাইনের শীতলতা ছুঁয়ে থাকে সাপ। তবু ফোনের আলো তারা জ্বালায় না চার্জ ফুরিয়ে একা আর বিচ্ছিন্ন হবে না বলে। অনন্ত পথ আর অনন্ত রাত শেষ হয় না। শেষ হয় কেবল আশা আর রাহাখরচের সম্বল।

রোগের শ্রেণি হয় তা আমরা আগেই জানতাম। একা ও বিচ্ছিন্ন মানুষের আরও একটা রূপ আমরা দেখতে পেলাম মহামারির সময়ে। সেটা হল শ্রেণির রোগ। আলোকপ্রাপ্ত সুবিধাভোগী যে শ্রেণি ঘণ্টায় ঘণ্টায় সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে, জনসমাগমের দুরত্ব বাঁচিয়ে, ইন্টারনেটে জীবিকার সুরাহা করে, শিল্পসাহিত্য ও তত্ত্বচর্চায় একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতার ভণিতা লিখছে সেই লেখায় কি তারা আসবে যাদের হাত ধোয়ার হাত সাবান স্যানেটাইজার দূরের কথা পানকরার জন্যে পরিস্রুত জল নেই! আসলে আমরা সুবিধাপ্রাপ্তরা প্রত্যেকে একেকটি বিয়োগচিহ্নবাহী সংখ্যা। কেবল এক পঙক্তিক নই বলে যুক্ত হতে পারি না। আমাদের কোন প্রথম বন্ধনী নেই তাই। আসলে বন্ধনীকৃত হতে চাই না আমরা। হতে ভয় পাই। কারণ আমাদের সামনে নেই স্বতঃ যোগচিহ্নবাহী বিশ্ব। তাই আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গে যুক্ত হতে পারি না। আর তাত্ত্বিক তো কবেই বলে দিয়েছেন সাবঅল্টার্নের বাচন নেই। আমরা বহু আগেই তাদের একা ও বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে তাই নিয়ে আবার প্রবন্ধ লিখি।

8 Replies to “

যুক্তি ও বিযুক্তির ভাবনা

কণিষ্ক ভট্টাচার্য


  1. যুক্তি ও বিযুক্তির ভাবনা সত্যি ভাবিয়ে তুললো। অত্যন্ত প্রাসঙগিক লেখাটিতে বিযুক্তির ধারণা যেভাবে আলোচিত হয়েছে হেগেল, ফয়েরবাখ ও মার্কসের দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে তা প্রশংসার দাবি রাখে। এই স্বল্প পরিসরে এমন এক সমৃদ্ধ আলোচনা দর্শন, ধর্ম, রাষ্ট্রতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব,সাহিত্য নান্দনিকতত্ত্ব প্রতিটি দিক থেকে যে করা সম্ভব তা দেখলাম। বারবার পড়ছি।

  2. পড়লাম।সব যে বুঝলাম তা নয়।কিন্তু মনে হ’ল বুঝলাম।এটাও কম পাওয়া না।একাকীত্ব, বিচ্ছিন্নতার ব্যাখা পড়তে পড়তে নিজের দিকে তাকানো বাধ্যতামূলক হয়ে গেলো।উপকৃত হলাম,কত কি জানি না,তার এক কাঠামোগত ধারণার সম্মুখীন হয়ে।
    সূত্রায়ণের উপর নির্ভর করে মধ্যবিত্ত সুবিধা প্রাপক ব্যক্তি ‘আমি’কে কাঠগড়ায় দেখতে খারাপ লাগছিল না।সমস্যা একটাই কাঠগড়ায় এই ব্যক্তি ‘আমি’র সাথে নিজেকে মিলিয়েও ফেলছিলাম।আরো পড়তে ও লিখতে হবে এটা বুঝলাম।
    ধন্যবাদ কণিষ্ক ঘটনাটা দেবার জন্য

    1. এই মধ্যবিত্ত ব্যক্তি ‘আমি’রা কেবল যুক্ত হতে পারছি না সামনের যোগচিহ্নটার অভাবে গৌতমদা। সেটা আসবে হয়ত, তাই অপেক্ষা।

  3. পড়লাম। কঠিন লাগলেও জানলাম। যেটুকু নিতে পারলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *