সঙ্গ নিরুদ্ধের ফিসফিসানি

শুভদীপ মৈত্র


‘Old pond

Frog jumps in

Plonk’

রোজ সকালে উঠে দেখি ছাদ থেকে বাড়ির পিছনের ডোবাটায় পানকৌড়ি ডুব দিচ্ছে আর ভেসে উঠছে। তার সাথে কতগুলো বক বিজ্ঞ প্রফেসরদের মতো একটা ভাসমান কাঠের টুকরোয় বসে। কলিকাতা শহরে জলাশয় বিরল, তার একটি আমার বাড়ির পিছনে। অথচ এতকিছু খেয়াল করিনি তো। একদিন রাতে দেখলাম একটা পেঁচা সাঁ করে নেমে এসে কী একটা ধরল। ছুঁচো-টুচো হবে। আমি কোনো দিন তার জন্য বসে থাকিনি। কবিতার জন্যও কি এভাবে বসে থাকি?

সঙ্গনিরোধ। তুলতুলে একটা শব্দ কবিতার মতো। শব্দটাকে মাথার মধ্যে নিয়ে খেলি একটা পশমের বল যেন। বা উলের গোলা। মানুষ কাছে এলে প্রকৃত সারস উড়ে যায় না কি? কিন্তু প্রকৃত মানুষ? প্রকৃত কবিতা? আমরা কি পারব আর ঘাস ফড়িঙের কবিতায় – এত কথা বলা হয়ে গেছে – অভ্যাসে শব্দ স্রোত – সামাজিক। আমাদের সঙ্গনিরোধ ছিল ‘বহু জনতার মাঝে আমি অপূর্ব একা’। অর্থাৎ ফ্ল্যানুর। বিগত শীতে সদর স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিটে অনেকগুলো দুপুর কাটিয়েছি। একা। কাঁচের দরজা টানা কফির দোকানে, কালো ভাল কফি, সামনে রাস্তায় মানুষের স্রোত। পেইন্টার অফ মডার্ন টাইম-এর অংশ অনুবাদ করতে করতে এবারের মতো বসন্ত হল গত। কিন্তু ঘাস ফড়িঙের কবিতা হল না। না হলে না হল ক্ষতি নেই যদি রসটুকু মেলে। এক বন্ধুর কাছে শোনা – প্যারিসে জার্মান অকুপেশন প্রায় এক হপ্তা হল, মাতিস বেরিয়েছেন রাস্তায়, দেখছেন স্বাভাবিকের তুলনায় রাস্তায় ভিড় কম, সেই প্রাণ নেই। তিনি তা খেয়াল করেও করলেন না। একটু দূরে পিকাসোর সঙ্গে দৈবাৎ দেখা। পিকাসো অবাক হয়ে শুধালে আপনি এখানে, প্যারিসে এখনো? জানেন না জার্মান অকুপেশন চলছে? বিব্রত গলায় মাতিস বলেন না মানে আমি তো কয়েক দিন ধরে ঘরে বসে আঁকছি, রুটি নেই তাই বেরোতে হল।

হয়তো মিথ। গালগল্প। তবু মাতিস সত্যি যতটা সত্যি পিকাসোর গেরনিকা। কেউ তন্ময় তো কেউ রেজিসস্ট্যান্স। আমার দুই-ই চাই। কবিতায় থাক তুমুল উদযাপন আর গভীর নিভৃতি। আসলে ফ্ল্যানুর জানে প্রকৃত সঙ্গ নিরোধ।

লক ডাউন। তালা মারার দুটো দিক হয় – একটা বাইরে আরেকটা ভিতরে। ভিতরে একা অগুনন চিন্তার ভিড়; বাইরে অগুনন মানুষ, খিদে, রোগ, গ্লানি। সেমি কোলনে এই দুইকে আলাদা করলাম, দাঁড়ি নয়, কখন কীভাবে জায়গা বদলাবদলি হয়ে যায় একমাত্র গ্রেগর সামসা হয়তো জানতে পারে। তার অভিজ্ঞতা আছে। আমাদের নেই। এই সময়ের কবিতা হওয়া উচিত ম্যুরাল-এর মতো। দিয়েগো রিভেরা-র, কে.জি সুব্রক্ষ্মণিয়ম-এর। প্রত্যেক জানলা থেকেই যা স্পষ্ট। কিয়দংশ দৃশ্যমান বা পুরোটা – যাই হোক না কেন যে যতটুকুই দেখুক – বোধে থাক একটা বড় সমগ্র। লিভ্‌স অফ গ্রাস থেকে কান্তো হেনেরাল। একটা বইয়ের মধ্যে বেঁধে ফেলার চেষ্টা কবিতাকে, কবিতা উইথ ক্যাপিটাল লেটার্স। নেরুদার মিসোজিনি, ধর্ষণের স্বীকারোক্তি ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে ইজাবেল আয়েন্দেকে প্যাঁচে ফেলতে গেলে সাংবাদিকরা সরাসরি তিনি বলে দেন কান্তো হেনেরালে বাদ দিয়ে লাতিন আমেরিকার আধুনিক কবিতা বা ইতিহাস কোনোটাই সম্ভব নয়। অর্থাৎ কবিতা তার স্রষ্টাকে ছাপিয়ে গেছে। এমন সম্ভাবনাময় কবিতা শহরের দেওয়ালে দেওয়ালে ফুটে উঠুক। অথবা ট্র্যাপেস্ট্রির মতো দীর্ঘ বুননের কবিতা।

আলনায় রাখা শার্ট ও ট্রাউজার-এর দিকে তাকিয়ে থাকি। অফুরান সম্ভাবনা। এখন অব্যবহারে উজ্জ্বল। কবিতাও তাই শুধুমাত্র অসীম সম্ভাবনা আর অব্যবহার্যতা তাকে টিঁকিয়ে রাখে।

মাঝে মধ্যেই এখন মেলায় কেনা তালপাতার সেপাইটাকে নিয়ে খেলা করি। তার একটা হাত নেই। দুটো পা, অবশিষ্ট হাতখানা হাওয়ায় ফরফর শব্দে ওঠে নামে। আমি মালার্মের ‘পাখা’র কথা ভাবি। আর ভাবি আবহমানের শ্রমিকদের কথা। এই সামান্য নড়াচড়াটুকু ওদের সবকিছু। অস্তিত্ব।

‘Beauty is the beginning of terror’ কিন্তু সব আতঙ্ক কবিতায় পৌঁছয় না। মাস্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি দিয়ে আমরা আটকে রাখি মারী, মৃত্যু। কবিতাও আটকে যায় তাতে। অথচ প্রকৃতি নিষ্ঠুর উদাসীন এবং উদাসীন নিষ্ঠুর – জীবনানন্দের শালিকের শরীর ভেসে যায় জলে। কবিতাও একইভাবে তাই হতে পারে। তাই ব্যোদলেয়রকে ছবিতে দেখায় মুর্চ্ছোত্থিত। এই বোধ কবির যা শুধুমাত্র ক্রাফ্‌ট ধরতে পারেনি কোনওদিন। রেনোয়া মার্লামের প্রতিকৃতি এঁকেছেন মোটাসোটা পানাহার পুষ্ট এক ব্যক্তির, বিখ্যাত, সামাজিক যেন সাঁলোয় আড্ডা দিয়ে ফিরছেন – তাতে ক্রাফট আছে কবিতা নেই। গঁগা এঁকেছেন সেই একই মানুষটিকে যার চুলের বিন্যাস দেখলে মনে হবে বইয়ের খোলা পাতা – যেন আধুনিক কবিতা জন্ম নিচ্ছে তাঁর মাথায় আর একটা পাখির হিংস্র ঠোঁট তার কাঁধের উপর থেকে মাথার দিকে। এ আর শুধুমাত্র ক্রাফট নয় গঁগা পৌঁছে গেছেন মার্লামের কবিতার ভিতরে – আধুনিক কবিতার ভিতরে, যেখানে সৌন্দর্যের সঙ্গেই অপেক্ষায় আছে স্ক্যাভেঞ্জার বার্ড।

পিছনের পুকুরে রোজ আসা পানকৌড়িকে বন্ধু ভেবে নিয়েছিলাম, সে আসলে শিকারি পাখি, তার ঠোঁটে ধরা রূপালি মাছ দেখে তবু আমি আশ্চর্য হই। আমরা দু’জনে দু’জনকে দেখলেও সে আসে মাছের সন্ধানে। আজ পঁচিশে বৈশাখ। আজ চারিদিকে হিংস্র মৃত্যুর খবর।

সারা সকাল ধরে ছাদের দিকের দরজা আধো বন্ধ করে, আধো অন্ধকারে সারা ঘর ভরিয়ে তুলি সুজাত খানের গান ও বাজনায়। গ্বালিব শুনি। ফিরে যাই গ্বালিবের কবিতায় –

               চাহা হ্যায় ফির কিসি কো মুকাবিল মে আরজু

             সুর্মে সে তেজ দশা-এ-মিজঘাঁ কিয়ে হুয়ে।

ভ্রূ-পল্লবের ছুরি তার কাজলের কালোয় শান দেওয়া, কখন লিখছিলেন এই লাইন – যখন দিল্লি জ্বলছে, ইংরেজদের তোপের মুখে উড়ে যাচ্ছে সেপাইরা? এই ছুরি সুর্মা এগুলো কী পালিয়ে যাওয়া, না কবির একমাত্র প্রতিরোধ? প্রায় একই সময়ে সুদূর ফ্রান্সে বসে এক কবিও লিখছেন –

       ‘I will taste the make-up cried by your eyelids,

          To see if he can give to the heart you hit

          The insensitivity of azure and stones.’

একই তো – কী আশ্চর্য না। মালার্ম যখন এই লাইনগুলো লিখছেন ভেঙে পড়ছে রিপাবলিক, প্যারিসের রাস্তায় হয়তো ব্যারিকেড। তাই ওই insensitivity of azure and stones -এর মধ্যেও ধরা পড়ে সময়। কবিতায় তা এড়ানো যায় না। গ্বালিব বা মালার্মের প্রিয়তমার প্রতি সম্ভাষণেও থেকে যায় সময়ের দাগ।

পঁচিশে বৈশাখের কবি আশি বছর বয়সে এসে ছড়া লিখছেন ‘শ্রাদ্ধ’। একটা ছড়া কীভাবে হাড় হিম করে দিতে পারে তা না পড়লে বিশ্বাস হয় না। তার মৃত্যু বর্ণনা যেন আজকে আমার পৃথিবী –

             আপনি এল ব্যাকটেরিয়া তাকে ডাকা হয় নাই

             হাঁসপাতালের মাখন ঘোষাল বলেছিল ‘ভয় নাই’।

             সে বলে, ‘সব বাজে কথা, খাবার জিনিস খাদ্য’।

             দশ দিনেতেই ঘটিয়ে দিল দশ জনারই শ্রাদ্ধ।

সারা কবিতার জুড়ে দৃশ্যকল্পের পর দৃশ্যকল্প যেন পচা, ভেপসে ওঠা একটা পৃথিবী, আর তার  মধ্যে –

             ওই শোনা যায় রেডিওতে বোঁচা গোঁফের হুমকি-

             দেশ বিদেশে শহর-গ্রামে গলা কাটার ধুম কী!

সময় কবিতাকে এভাবে সংক্রমিত করে। আমি এই কবিতার পাতা উলটে চলে যেতে পারি না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *