খেলাঘর অথবা বাটি হারানোর গল্প

অভিমন্যু মাহাত


মাইকের আওয়াজে গোলাকৃতি আঁকা চলছে ক্রমশ। বিরতি নেই। গোলদাগে আমি, তুমি, আস্ত মানচিত্র। কিন্তু, এই গোলাকৃতির পরিধি কবে বাড়বে? যেখানে একাকীত্ব নয়, কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়াবে প্রতিবেশী। ওইসব কথা কাটাকাটি, নিশ্চিন্ত আলুরদম, ছাতাময় আকাশের আয়োজন, আবার ফিরে পাব?

…………

 

একটা সাদা পৃষ্ঠা তিনটে রঙে ভরে উঠল। লাল, কমলা, সবুজের স্পর্শকাতরতা। শাসনে ঢাকা বাতাসের জরিপ। কেবল তিনটে রঙ ডানা ঝাপটায়।

লাল রঙ ধরে হেঁটে যায় সহস্র খালি পা। চামড়া উঠলেও সাংসারিক সন্ধে হয় না। যতদূর চোখ যায়, নিজেকে জাগিয়ে রাখতে হবে। দীর্ঘশ্বাস যখন রেললাইনে, তখন শতাব্দীর রাত্রি নেমে আসে। ভাগাভাগি পড়ে রয় শুকনো রুটি। যে রুটি জটলা চেয়েছিল ১৬টি ক্লান্ত পেটের। রাষ্ট্রের রেললাইন বন্ধু হয় না। আত্মহত্যা সহায়ক তবে? চিৎকার ওড়ে ১৬টি জিভের লালারস থেকে। আড়ালে লুকিয়ে দৃশ্য দেখে গেছে রাতচরা পাখিটি।

সকালে, সংবাদ পৃষ্ঠায় রুটি দেখে কবিতা লিখলেন বাবুকবি! স্যানিটাইজার মাখা হাততালি পড়লদেওয়ালজুড়ে।

………

 

ভাঙা আয়নার শাপ যেন। নিজের মুখই দেখতে চাইছি না। চুলের মিশকালো ঢেউ, দাড়ির আখড়াভয় হয় না, ক্লীব এক বিকেল এল উঠোনে। গেরস্থালি জুড়ে আড়াল থাকার অভ্যেস। ভাঙা আয়নায় আমি শুধু একা নই, নলকূপে জল নিতে আসা বধূটিও অপরিচিত। তাকেও আমি দেখতে পাচ্ছি না! খেলা ভেঙে যাচ্ছে। বিহানবেলার প্রাতরাশ মাড়ভাত বিষণ্ণ হয়ে উঠছে। কাঁকর পাচ্ছি ভাতে। থালায় রেশনের আলু সেদ্ধ। কাঁচালঙ্কার অপেক্ষা করতে করতে জারমনি থালা শেষ। বেলা বাড়লে সবার অলক্ষ্যে, আইন ভেঙে ছোটরা কানামাছি খেলছে!

…………

 

তখন সূর্য ডুবুডবুবু, কাকিমা বন থেকে ফিরেছে। এসেই এক ডুভা মাড়ভাত গিলল। কুঁচফল রঙ দিয়ে যায় সংসারে। আজও কাঠ এনেছে। শস্যের খবর খুঁটে নেয়, কাঠের বোঝা। কাল হাটবার। কাকিমা হাটে যাবে। আমার জন্য ছোলাভাজা, গরম চপ নিয়ে আসবে। হাট থেকে আসবে একঝুড়ি সব্জি, লাল গামছা। তারপর, সন্ধায় একপাট মহুলা হবেক।

এইসব দৃশ্যকল্প নাটকের যে কোনো অঙ্কের চেয়ে জ্ঞানী। গত দুই মাস কাকিমা মুছে দিয়েছে বনপথ। হাটবার আজকাল মনে থাকে না। কাকু কাকিমার ঝগড়াও আর হয় না। জেগে আছে সবাই। সামান্য ভোরের ঘেঁটু ফুল ছেঁড়ার মোহ নেই। প্রতিবেশী ঘর থেকে এখন তরকারি বাটি আসে না। কুটু রান্নার মহক আসে না। তাই শরবেড়িয়া গ্রামে, বাটি হারানোর গল্পও আর কেউ জুড়ে না!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *