রাক্ষসের গান

বিকাশ গণ চৌধুরী


একলা থাকার নিয়তি বহুদিনের সঙ্গী হলেও এরকম বাধ্যতামূলক ঘরে থাকার, প্রকৃতি থেকে দূরে থাকার গল্প জীবনে কখনও হয়নি; ব্যক্তিজীবনে পরিবহন সংস্থার গদীতে খাতা লিখে দিন গুজরান হয়, সেকাজের থেকে ছুটি পাওয়ার জন্য সর্বদাই মন হাঁকপাঁক করে, কিন্তু সেকাজ থেকেও যে এরকম ছুটি পাওয়া যাবে তা ভাবিনি কখনো, আর ছুটি যখন পাওয়া গেল তখন সে ছুটি হ’ল বন্দীজীবনের সমান, সশ্রম, বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে যাওয়ার হুকুম নেই, চারিদিকে এক ত্রাসের আবহ, কারও বাড়ি যাওয়া যাচ্ছে না, পাশের বাড়ির মানুষজন ফোন করে কুশলসংবাদ জানতে চাইছেন, এরপর তো আর তাদের বাড়িও যাওয়া যাচ্ছে না, বিকেলে ছাদে উঠেও দেখেছি, আশেপাশের ছাদও জনমানবশুন্য। এরকম এক সময় সবাই দেখি এক অজানা আতঙ্কে গ্রস্ত; প্রথম প্রথম কী খাব, মুদিখানায় জিনিষপত্র পাওয়া যাবে কিনা এই আতঙ্কে মানুষজনকে ছোটাছুটি করে খাওয়ার জিনিষ মজুত করতে দেখেছি, কিন্তু কিছুদিন পর থেকে অবস্থা একটু সয়ে যেতেই শুরু হ’ল অন্যচিন্তা, এই বন্দীদশার পর কাজকর্ম থাকবে কি থাকবে না এই চিন্তা : আশেপাশের দৈনিক রোজগারের ওপর নির্ভর মানুষজন, অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করা মানুষজন, এমনকি সংগঠিত ক্ষেত্রে কাজকরা মানুষজনও দেখলাম এই আতঙ্কে একে একে ডুবতে শুরু করেছেন, কোথায় অবসরে বসে একাকী মানুষের সৌন্দর্য উপভোগের পরিসর, চতুর্দিকে তো শুধু রাক্ষসেরই গান…

সমাজের যে আর্থসামাজিক স্তরে আমার আবস্থান সেই স্তরের মানুষজন অর্থনৈতিকভাবে একটু ভালো অবস্থায় থাকার দরুন এই মহামারীর কালে দেখেছি তাদের সাংস্কৃতিক (?) উল্লাস; কিছুদিন আগে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নববর্ষবরণকালে রবীন্দ্রবাণীর যে অপলৌকিক সংসর্গদোষ ঘটেছিল সেটা যে আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের প্রকাশ এটা আমার পরিচিত যারা মেনে নিতে পারছিলেন না সেইসব সুধী ভ্রাতারা এই করোনাকালে “সামাজিক নেটওয়ার্ক” জুড়ে আদিরসালাপের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন, আমোদগেঁড়ে হয়ে মহিলাদের সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য করেছেন, জাতিগত বা ধর্মগত বিদ্বেষও বাদ যায়নি, সময়বিশেষে সেটাও মাথা চাড়া দিয়েছে, আমাদের সাংস্কৃতিক-উল্লাস তার দাঁত-নখ বার করে দেখিয়ে দিয়েছে যে একটা মেকি, লোকদেখানো মূ্ল্যবোধ নিয়ে আমরা চলেছি, আমাদের সমাজের অধিকাংশই ঐ আমোদগেঁড়ে জনতা, যারা আকাশ থেকে নেমে আসেনি, তারা আমার আপনারই ভাই-বোন, আমার আপনারই পুত্র-কন্যা, তাদের চিন্তাভাবনা যদি অবক্ষয়ী হয় তো সে দায় প্রাথমিকভাবে আমাদের, আমাদের নিজেদের মধ্যকার অবক্ষয়টাকে না দেখে আমরা অন্যের মধ্যে সেটা দেখানোর চেষ্টা করছি। প্রসঙ্গ ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছি কিনা জানিনা, একটা ভাবনার কথা বলি : প্রতি বছর এখন দেখি ১০ লক্ষ ছাত্রছাত্রী মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, ১৯৬০ থেকে ২০১৯ এই ৬০ বছরে এই উত্তীর্ণের গড়সংখ্যা যদি ৫ লক্ষও ধরা যায় তো তবে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ২কোটি, এর মধ্যে যদি বাংলা মাধ্যমে পরা ছেলেমেয়ের সংখ্যা ৭০%-ও হয় তো সংখ্যাটা হবে ১.৪ কোটি, আর এর ২০% মানুষজন যদি বাংলা সাহিত্য কিনে পড়েন তো তাদের সংখ্যাটা হয় ২৮ লক্ষ, আর এরা যদি বছরে গড়ে ২০০ টাকা দামের ৫টি বইও কেনেন তো বিক্রিত বইয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ১.৪ কোটি আর তার বাজারমূল্য হয় ২৮০ কোটি টাকা; আর বাজারমূল্যের ৭%-ও যদি রয়্যালটি হিসেবে লেখকরা পান তো সেটা দাঁড়ায় ১৯.৬, প্রায় ২০ কোটির কাছাকাছি, সহজ অঙ্কের নিয়মেই এই লেখকদের মধ্যে যাদের বই সবচে’ জনপ্রিয় এরকম প্রায় জনা পঞ্চাশেকের (বেশি মনে হলে পাঠক সংখ্যাটা দশ-এ নামিয়ে আনতে পারেন) তো এই রোজগারেই বহাল তবিয়তে থাকা উচিৎ, কিন্তু বাস্ততবে আমরা কী দেখি, বাংলায় লিখে একজনও, হ্যাঁ একজনও সাহিত্যিকেরও দিন গুজরান হয় না, লেখার পাশাপাশি অন্যকাজ করে তাঁকে জীবন নির্বাহ করতে হয় (বাংলা বাজারে দু’একজন বলে থাকেন বটে তারা লিখে খান, তো তারাও প্রুফ দেখে বা প্রকাশনার অন্য কোন কাজ করেই দু’পয়সা রোজগার করেন, আর তারা কেউই বেস্টসেলার বইয়ের লেখকও নন)। এত কথা বলার কারণ বাংলা ভাষার লেখকদের রোজগারের করুণ আবস্থাটা দেখানো নয়, আমি দেখাতে চাইছে যে গড়পরতা বাঙালির বই পড়ার রুচিটাই নেই, তাই সে বই কেনে না, পড়েও না; আগে সামাজিক অনুষ্ঠানে বই উপহার দেবার রেওয়াজ ছিল, সেটা প্রায় এক লুপ্ত পূজাবিধিতে পর্যবসিত; কিন্তু এর পরেও আমাদের সাহিত্য নিয়ে বড়ফাট্টাই একটুকুও কমেনি, যে সারা বছর, সারা বছর কেন সারা জীবনেও স্কুলপাঠ্যের বাইরে রবিঠাকুরের কোন লেখা পড়েনি সেরকম লোকজনও সাহিত্যের ব্যাপার নিয়ে অহরহ নানান চটুল এবং অযৌক্তিক মন্তব্য করতে দেখেছি, আসলে কোন বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে যে সে বিষয়ের ‘অধিকারী’ হবার একটা ব্যাপার থাকে সেটা আমরা ধর্তব্যের মধ্যেই আনিনা। বিভিন্ন বিনোদনের মাধ্যম, খবরের কাগজ সবাই এই ‘অধিকারী’-র ব্যাপারে ভয়ঙ্কর নীরব, পকেটে পয়সা বা হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকলেই সব বিষয়ে কথা বলার ক্ষমতা জন্মায়, পণ্যনির্ভর সভ্যতা আমাদের এটা শিখিয়েছে…

একলা ঘরে বসে এসব ভাবনার পাশাপাশি দেখি দুনিয়া জুড়ে মানুষের এই বন্দীদশার কালে প্রকৃতি আমাদের অনেক আশ্চর্য দেখিয়েছে, দেখিয়েছে সারা পৃথিবীতে দূষণ উল্লেখযোগ্যরকম কমে গেছে, সুমেরু এলাকায় ওজোনস্তরের ফুটো নিজে থেকে ভরাট হয়ে যাচ্ছে, যে বিপুল প্রাণীজগতকে আমরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিলাম তারা আজ আমাদের কাছাকাছি ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু আমরা তো জানি লক ডাউন শেষ হলেই এইসব স্বপ্নের মতো উবে যাবে, আমাদের লোভ, আমাদের চাহিদা এসবকে স্থির হতে দেবে না, সেটা আর সম্ভবও নয়, তাই এসব সাময়িক খুশি আমার হৃদয়ে আগামীর রাক্ষসের গানে চাপা পড়ে যাচ্ছে, এই লক ডাঊনের কাল শেষ হলে আমি তো আর প্রকৃতির এই সৌন্দর্য্যসুষমা দেখতে পাবোনা, জিপসীদের তাঁবুর মতো সে হারিয়ে যাবে।

কবি স্রষ্টা। আর সর্বদাই একলা। সবসময়ই একলা মানুষের সৌন্দর্য্যে সে নিমজ্জিত। এই বন্দীদশায় তার নতুন করে একলা হবার কিছু নেই; তবে সামাজিকভাবে বাধ্যতামূলক এই একলাদশা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে সৌন্দর্য্যের থেকে বেশি দেখিয়েছে রূঢ় বাস্তব আর বাড়ির ভিতর থেকে দেখা টুকরো আকাশের নীল রঙের সুরের থেকে বেশি শুনিয়েছে রাক্ষসের গান।

 

 

 

7 Replies to “

রাক্ষসের গান

বিকাশ গণ চৌধুরী


  1. বিকাশ গণচৌধুরীর রচনাটি সম্পর্কে কেবল ‘চমৎকার’ শব্দটাই প্রযোজ্য হল।

  2. অত্যন্ত ভালো ও সময়োচিত দরকারি লেখা! আয়না দেখানোর জন্যে বিকাশ গন চৌধুরীকে সাধুবাদ!

  3. বন্দীদশায় রাক্ষসের আর্তনাদ লেখক ঠিকই শুনেছেন। তার লেখায় সুন্দর ভাবে উঠে এসেছে ভিন্ন রুচির পণ্য সংস্কৃতির কথা , উঠে এসেছে বর্তমান বাংলা পাঠককুলের আসল অবস্থানটা!

  4. বন্দীদশায় রাক্ষসের আর্তনাদ লেখক ঠিকই শুনেছেন। তার লেখায় সুন্দর ভাবে উঠে এসেছে ভিন্ন রুচির পণ্য সংস্কৃতির কথা , উঠে এসেছে বর্তমান বাংলা পাঠককুলের আসল অবস্থানটা!

  5. বন্দীদশায় রাক্ষসের আর্তনাদ লেখক ঠিকই শুনেছেন। তার লেখায় সুন্দর ভাবে উঠে এসেছে ভিন্ন রুচির পণ্য সংস্কৃতির কথা , উঠে এসেছে বর্তমান বাংলা পাঠককুলের আসল অবস্থানটা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *