তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়

অভীক ভট্টাচার্য


ভাবিয়াছিলাম, ভোরের নরম আলোয় অনন্তের দিকে বিছাইয়া থাকা রেলের দুই পট্‌রির মাঝখানে প্রস্ফুটিত পূর্ণিমার চাঁদের মতো গোল, তেমনই উজ্জ্বল, রুটিগুলির কথা কিছু লিখিব। কিন্তু যেহেতু সেই ছবি খবরের – যেহেতু তাহা ডিএসএলআর-এর মায়ায় তাহার প্রেক্ষাপটকে আবছায়া ও যথেষ্ট শিল্পোত্তীর্ণ করিয়া তুলে না – অতএব লিখিতে বসিয়া ড্যান্ডেলিয়ন ফুলের ন্যায় হলুদ রুটিগুলির পাশে অনবধানে জড়ো হইতে থাকে টায়ারের শতচ্ছিন্ন চটি, কাপড়ের ইতস্তত ছড়াইয়া থাকা পুঁটুলি, টাকার ব্যাগ, ভাঙা চশমার কাচ, এমনকী ভগ্ন একটি ডাঁটিও। ভোরের আলোয় আনুষঙ্গিক এইপ্রকার জিনিসপত্রের প্রতিটিকেই অতীব মায়াময় বলিয়া ভ্রম হয় – এবং চরিত্রগুণে ইহাদের প্রতিটিই যেহেতু কোনও না-কোনও সময়ে কোনও না-কোনও মানুষের সহিত লগ্ন হইয়া থাকার স্মৃতির কথা বলে – অতএব, তাহাদের সংস্পর্শে আসিয়া রুটিগুলির মধ্যেও একপ্রকার স্মৃতিলগ্নতা সংক্রামিত হতে থাকে। হইতে-হইতে, এইপ্রকারে, কিছুক্ষণের মধ্যে ঔরঙ্গাবাদ স্টেশনের কাছে ওই তন্দ্রালু রেললাইন বরাবর একটি অলৌকিক রাগমালার প্রস্তাবনা রচিত হয় – ভৈরবের মধ্য সপ্তকের শুদ্ধ ও খাড়া নিষাদের অন্তর্বর্তী তীক্ষ্ণতা ও একাকিত্বটিকে রামকেলির কোমল নিষাদ আসিয়া সুশ্রূষা দিতে থাকে… চশমার ভাঙা পরকলাটির উপর সকালের রৌদ্র পড়িয়া তাহাকে একটি সাতরঙা কাহিনির অবয়ব দেয়… এবং রেললাইনের ধারের মুচকুন্দ ঝোপের পাতাগুলি হাওয়ায় ঈষৎ দুলিয়া উঠিয়া সেই কাহিনিকে একটি কাব্যিকতার প্রেক্ষিৎ দান করে। সময় এইখানে আসিয়া কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকিয়া দাঁড়ায় – যেন বুঝিতে চাহে, অতঃপর তাহার ঠিক কী করা উচিত হইবে… এবং, তাহার পর, ঝাঁকুনি দিয়া দিন শুরু হইয়া যায়…

তাহার পর আসে রামপুকার পণ্ডিত। তাহাকে কোনও একদিন খর দ্বিপ্রহরে কোনও এক দিল্লির রাস্তায় বসিয়া হাপুশ নয়নে কাঁদিতে দেখা যায়, আর রৌদ্র আসিয়া তাহার মস্তকে, গালে ও চিবুকে কথাচিত্র লিখিয়া যায়। ভাঙা-ভাঙা হরফে লিখা এই কথাচিত্র পাঠ করিয়া জানা যায়, কোনও এক বিহারে তাহার সন্তানটি দুরারোগ্য ব্যাধিতে মৃত্যুশয্যায় – মানবকটিকে একবার চোখের দেখা দেখিতে সে পদব্রজে যাত্রা করিয়াছিল। ভারতবর্ষের এক আশ্চর্য বৃত্তান্ত এই যে, কোনও এক স্থান হইতে অন্য কোনও স্থানে পঁহুছিতে অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়। ইতিহাস বলে, দূরকে নিকটে আনিয়া অবাধ্যকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যেই পথ ও পরিবহনের নির্মাণ; কিন্তু পুত্রশোকে অধীর রামপুকার সে কথা স্মরণে না-রাখিয়াই দিল্লি হইতে বিহার পয়দল চলিয়াছিল। পথশ্রমে কাহিল হইয়া সে যখন একটু ছায়া খুঁজিতেছে তখন পুলিশ আসিয়া তাহাকে বলে, “তুমি ঘরে পহুঁছিলেই কি মৃত সন্তান ফিরিয়া আসিবে?” পুলিশের এই প্রজ্ঞা ও স্বান্তনামিশ্রিত বাক্যে তাহার হৃদয় দ্রব হইয়া আসে, ও সে আর কোনও বাক্য বলিতে না-পারিয়া ক্রন্দন করিতে থাকে। তাহার চক্ষের জলের কোনও ভারতবর্ষ আছে কি না তাহা জানিতে পারা যায় না, কিন্তু ক্রন্দনবেগ খানিক স্তিমিত হইয়া আসিলে রামপুকার জানায়, তাহারা দিনমজুর (আসলে সে ‘কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার’, কিন্তু অজ্ঞতার কারণে কিংবা সচেতনভাবে সে উক্ত শব্দবন্ধটি এড়াইয়া যায়) তাই তাহাদের জীবনের কোনও দাম নাই… তাহারা উন্নয়নের চাকার পাখিতে লাগিয়া থাকা ধূলিকণার অধিক নহে – যতক্ষণ ঝরিয়া না-পড়ে ততক্ষণ চাকার সহিত অনন্ত চংক্রমণই তাহাদের একমাত্র ভবিতব্য ইত্যাদি। এই কথা বলিতে-বলিতে রামপুকারের মুখে একপ্রকার ভাবান্তর ঘটে ও তাহাকে দেখিয়া মুহূর্তের জন্য পথের পাঁচালি ছবিতে দুর্গার মৃত্যুসংবাদ পাওয়া হরিহরের মুখখানি মনে পড়িয়া যায়। এইখানে, শাস্ত্রমতে আমি একটি তারসানাইয়ের আয়োজন করিয়া পটদীপ রাগিনীতে যথোপযুক্ত একটি হাহাকার বাজাইয়া তুলি এবং রামপুকারের বিহ্বলতা তাহাতে একখানি রসোত্তীর্ণ স্থিরচিত্রের মর্যাদা পায়।

বেলা পড়িয়া আসিলে রামপুকারের মুখখানি ছায়ার মধ্যে অন্তর্হিত হয়, কিন্তু তাহার অগ্রে-পশ্চতে আরও নানা স্থিরচিত্র ভিড় করিয়া আসে। তেলঙ্গানার লঙ্কাক্ষেতে কাজ করিতে যাওয়া ছত্তিশগঢ়ের জামলো মকদমের মুখখানি মনে পড়ে, অনেক দূর আকাশের নীচে মহাবীর কর্ণ যেইখানে মাটি হইতে রথের চাকা আজও টানিয়া তুলিতেছেন তাহার পাশ দিয়া সেই বালিকা যুগ-যুগ ধরিয়া হাঁটিয়া আসিতেছে বাড়ি পঁহুছিবে বলিয়া… তাহার পাশ দিয়া, খানাখন্দ পার করিয়া, নদীনালা পার করিয়া, জলজঙ্গল পার করিয়া, গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-বসন্ত পার করিয়া সার দিয়া গোটা ভারতবর্ষ হাঁটিয়া আসিতেছে… সুটকেসের উপরে নিদ্রাচ্ছন্ন শিশুসন্তানকে টানিয়া লইয়া হাঁটিয়া আসিতেছে… চাকা-লাগানো ঠেলায় আসন্নপ্রসবা পরিবারকে বসাইয়া হাঁটিয়া আসিতেছে… বৃদ্ধা মাকে পিঠে করিয়া হাঁটিয়া আসিতেছে… মাথায় পুটুলি, ক্রোড়ে সন্তান, পিঠে সাইকেল লইয়া যমুনাপার হইতে হাঁটিয়া আসিতেছে সুমিত্রা ঘোড়ুই, সরস্বতী জানা, সুদূর রঙ্গারেড্ডি জেলা হইতে, গুন্টুর-কুড্ডালোর-বিজয়নগর হইতে এক কাপড়ে হাঁটিয়া আসিতেছে জানকিবাঈ… হাঁটিয়া আসিতেছে ইন্দ্রপ্রস্থ হইতে, মছলন্দপুর হইতে, মেহেন্দিপট্টম হইতে, ভবানিপটনা হইতে, জগদলপুর হইতে, অবুঝমাড়, দান্তেওয়াড়া, রাইপুর, ঝাঁসি, ওরছা হইতে… দিবস অতিক্রম করিয়া অনন্ত রাত্রির মধ্য দিয়া যুগ-যুগান্ত পথ হাঁটিয়া আসিতেছে…

তাহাদের সেই সম্মিলিত পদযাত্রার মার্গশীর্ষে, রেললাইনে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত রোটিকাখণ্ডসমূহ সূর্য-চন্দ্রের মতো দিবসরাত্রি আলো ছড়াইতেছে – আমরা শহরে বসিয়া কায়ক্লেশে দেখিতে পাই। কিন্তু, এমন এক অন্তহীন পথ হাঁটার মহাকাব্যের পাশে বসাইবার মতো নাটকীয় কোনও আবহসঙ্গীত খুঁজিয়া পাই না।

4 Replies to “

তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়

অভীক ভট্টাচার্য


  1. লেখককে আমার প্রণাম। আর কিছু কহার শক্তি নাই

  2. চমৎকার গদ্য। মুগ্ধতায় স্নিগ্ধ হলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *