অথবা মানুষ এক ঝুলত ঝুলনে …

দীপান্বিতা সরকার


চামড়ার নীচে দৈত্য থাকে, আমি টের পাই। চামড়ার তলা থেকে এক একটা সুর বিঁধিয়ে সে রক্ত তুলে আনে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ভেসে যায় ঘরময়। ক্রমশঃ গান হয়ে উঠি। কফি ফোটার শব্দে বেজে ওঠে ঘর। ঘরের আকাঙ্ক্ষা, প্রতিশ্রুতিময় ধ্বস্ত বাসনাকাম। যাকে আমি, আমাকে যা, তাই কি আসলেই চেয়েছিলাম আমি? থাক। আপাততঃ বাহারি ট্রে বের করি। ধুয়ে মুছে দু’টো কাপ পাশাপাশি রাখি। শৌখিন সাদা কাপ, কোনও দিন কোনও ঠোঁট ছোঁবে না যাদের। কী ভীষণ একা চরাচর ! কী ভীষণ একা তুমি আটকে পড়েছ সবুজের সীমানায়। বন্ধ ট্রেন বাস, তবু কে পাঠালো গাছের গাছের ওই ঘনঘোর আনন্দ? তরুমূলে বাঁশি রাখা, ওপরে আকাশ ঘূর্ণায়মান। মানুষের ছায়া নেই কোনও। অথবা মানুষ এক ‘ঝুলত ঝুলনে…’।

ইত্যাবধি প্রসবের ধারণা নেই কোনও। খালি প্রিয় নারীদের মরে যাবার আগের যন্ত্রনানীল মুখগুলি মনে পড়ে। বড়পিসি হঠাত ছাদ থেকে পড়ে, ক্যানসারের শেষ কয়দিন শ্বাসকষ্টে ছটফট করতে করতে মা, শিরদাঁড়া ভেঙে গিয়ে আম্মা, আমাদের বাড়ির নারীদের বড় তাড়া, আগে আগে যায়। প্রতি রাত্রে এই যাত্রাগুলি দেখি। সারারাত ধরে ঘুমোতে পারি না।

তোমার একলা আঙুলখানি যা কেবল পুড়তে পারত আমার ভেতরে এসে, ভাবি কত সুন্দর তারা ! দূরের কুয়াশা পেরিয়ে একলা তোমার চোখের জল যদি এসে দাঁড়ায় আমার মৃত্যুর থানে, কী অপরূপ হতে পারে সে, তুমিও কি মানো? আসলে তুমি সত্যি হলে তো আমি মিথ্যে। আমি সত্যি হলে তুমি মিথ্যে। দু’জনেরই সত্যি হবার কোনও জো নেই আর। যদি আমার ত্বক, হাড় মজ্জা উপড়ে হৃদয় সমেত তুমিই বেরিয়ে এলে, সেই নগ্ন ভাস্কর্য কি সত্যি তুমিই হও? নাকি সে আমি হয়ে যায়। বসন্তবায়ে… ‘প্রাণ মিশায়ব বাঁশিক সুমধুর গানে’। নিজেকে মেশানোর মত সেই গান হয়ে যাই আমি।

আমি আর কত সহজ হলে একেবারে বিচ্ছিন্ন হবে তুমি? একেবারে ছেড়ে যাবে আমার শরীর? আরও কত গুহায় লুকোনোর গুপ্তবিদ্যা শিখতে হবে আমায়? সেই সে হৃদয় যার লাস্যময় ভঙ্গিতে কত মানুষেরা এসে ভিড় করে। নতজানু হয়। সেই ভিড় থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করতে হবে নিজেকে। চাপা দিতে হবে ছাই আর তিল তুলসীর নীচে। ‘তব দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে’। শুধু কি জীবন বলো? ঘরদোর, বাথরুম ঝাঁট দিতে দিতে, বাসন মাজতে মাজতে, কাপড় কাচতে কাচতে, কাঁসার থালায় ভাত আর কলমি শাক বেড়ে দিতে দিতে এইসব ভাবি। তুমি কী ভাবছ অনেকদিন খবর পাই নি।

খবর এসেছে ঝড়ের। ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়েছে বহুদিনের জং ধরা মন, কাচেরও মন। শুধু সার সার গাছের আর মন নেই কোনও । শরীর কেটে কেটে কারা নিয়ে গেল? কারা পেল জল, আলো? কারা পেল না? জলে ডুবে ডুবে শোক পাথর হয়ে গেল, কার? পাথরে বোসো হে প্রতিমা৷ তোমাকে সাজাই। তোমাকে সাজাই ও সুন্দরী ও গরান আবার আবার, আমার কান্নার নোনা ঢেলে দিলে তোমারই আঁচলে, বদলে আমিও তো ফিরে পাব শাকান্ন দু’ মুঠি? আমন ধানের জমি?

ঘুমের আগে আগে বাজে তাঁর গলা। ঘুমের ভেতরও বাজে। ঘুম ভেঙে ভেঙে গিয়ে বাজে। সবচেয়ে ক্রুদ্ধ, পৃথিবীতে সবচেয়ে নিষ্ঠুর আমার প্রতি যে, তাঁর বিষণ্ণতার ছায়ার মধ্যে আলতো করে ঘুমোই আমি। সে জানে না। আর কিছু না হোক, ঘুমের সময় একটা হালকা মত চাদর আমার গায়ের ওপর চাপা লাগবেই। ওই চাদরখানা সরিয়ে যা ইচ্ছে দেখার কোনও লোক চাই নি আর বহুদিন। কেবল ওই তাঁর তাঁর তাঁর অদৃশ্য বিষাদ আসে চুপিচুপি একা একা কোনও কোনও রাতে, এমনকী সমস্ত নিষেধ পেরিয়ে, ঝড় জল মারীর ভয় নেই।

প্রিয় শৃঙ্গারগুলি একে একে পাতা হয় মৃত্যুসূচিমুখে। যাবার আগে আগে পায়ে বিঁধে যায় আনন্দ। আমার শরীর জুড়ে কখনও আকাশ, কখনও সমুদ্র, কখনও পাহাড়। এই কি তাহলে বিষণ্ণ ব্রহ্মের সঘন আনন্দরস ?  আমার কোনও কথা নেই আর। কথা নিজেই আমাকে বলে আজকাল।

প্রিয় আয়না, তুমি পুড়ে গেলে কী দীপ্তিময় রোদ ঠিকরে বের হয়! আর চরাচরে ফুটে ওঠে আলো। পাহাড়তলি বেয়ে ওই ছোট্ট ছেলেটা একা একা পাড়ি দেয়, চড়াই উতরাই ভেঙ্গে ওঠে। কোথায় তার বন্ধুর বাড়ি? সারাদিন রোদে তেঁতে, বৃষ্টি ভিজে ক্লান্ত হতোদ্যম, লেখার খাতা কি ফিরিয়ে দিতে পেরেছিল প্রিয় বন্ধুকে তার? নাকি একা একা ফিরে আসতে হয়েছিল আবার পাহাড় ভেঙ্গে? বাহারি নকসার কাঠের দরজার ওপারে নেই কোনও বন্ধুর মুখ, এ কথা জানতো না বুঝি সে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *