নিঠুর এপ্রিলে

স্বপন রায়


…..

এইতো সমুদ্র। আমি নেই, আমি নেই গাইছি। অনেকেই তখন। কে যেন বলল এই গানটা মন খারাপ করে দেয় আর তোর গলায় সুর নেই, বন্ধ কর।হাসাহাসি।তো রাতে আমি একাই, আমি নেই আমি নেই, সেই সমুদ্রের ধারে, পুরীতে।আর তখনই আছড়ে পড়া ঢেউসমগ্রে কিছু একটা হল।আমি ওই গান গাইতে গাইতে দেখি জল মাথার ওপরে।আমি ক্রমশই নিচের দিকে নেমে যাচ্ছি।অন্ধকার তীব্র হচ্ছে।আমি কী সত্যিই নেই? ভয় পেলাম।জলের সুড়ঙ্গে আমি, অভাবনীয় জোরে ভেসে যাচ্ছি,একা।আমি কী মরে গেলাম?

 

মৃত্যু এত দ্রুত, এত চলমান, এত শরীরি!আমি যাচ্ছি কোথায়? আজ পঁচিশে এপ্রিল। ‘এপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মান্থ’। ভাবলাম আর জলে উজ্জ্বলতা এল।ফ্লুরোসেন্ট।জল জমাট হচ্ছে, না বরফ নয়, জল জমে যাচ্ছে, বরফ হচ্ছে না।উত্তাপ পাচ্ছি আবার, ওই আলোই কী উৎস? মাথার ওপরে জলের ছাদ।আমার গতিও শ্লথ হয়ে এসেছে।সামনে কী কোনও হলঘর? বেশ বড়। হঠাতই আমায় কে যেন হাওয়ায় ভাসিয়ে দিল। জলছাদের নিচে আমি।গড়ুরাবোলোকন করছি এখন। আরে এতো হিউম্যান ব্রেন। মস্তিষ্ক। আমি হলঘর ভাবছিলাম! ওই তো ‘সেরেব্রাম’,’ব্রেনস্টেম’ আর ‘সেরেবেলাম’।শরীরের নিয়ন্ত্রক।অথচ এখন কেমন যেন স্তব্ধ।একবার মনে পড়ল, ‘ব্রেনস্টেম’কে ইচ্ছে করে ‘ব্রানস্টেম’ লিখে অপাবৃতাকে জিগগেস করেছিলাম, বল ভুল কোথায়? ও একবার দেখে বলেছিল, হারামি!আজ সবই আমি দেখতে পাচ্ছি।ওই যে চোদ্দ থেকে ষোলো বিলিয়ন ‘নিউরন’-এর মালিক ‘সেরেব্রাল কোর্টেক্স’ আর পঞ্চান্ন থেকে সত্তর বিলিয়ন ‘নিউরন’ ধরে রাখা ‘সেরেবেলাম’।আমি ওই গোলকধাঁধায় না গিয়ে খোঁজ নিলাম ‘ভার্টেব্রেট’-এর সেইসব লম্বা ‘প্রোটোপ্লাজমিক’ ‘এক্সন’গুলোর যারা মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্থানে সংকেত পাঠায়। কাছে গিয়ে দেখলাম পথহারা আতঙ্কগ্রস্ত একটি স্নায়ু-ফাইবার চোখ বিস্ফারিত করে দাঁড়িয়ে আছে। কোন সংকেত পাঠাচ্ছিল কে জানে!আরেকটি চুপ। মাথানিচু।আরেকটি,অসহায়।ভয় আর আতঙ্ক ওই মস্তিষ্ক জুড়ে,আমি মাথায় হাত দিলাম।হাল্কা মনে হল।ওটা কী আমারই তবে? চারদিকে জলের গন্ধ।ডুবে যাওয়ার এই সামুদ্রিক খাতে আমি, মৃত আমিই হয়ত এক অনন্ত যাত্রায় চলেছি।যে কথা আমি মুখ ফুটে বলতে পারিনি সেই অস্ফূট কথাটিও জড়িয়ে আছে আরেকটি ‘এক্সন’-এ।তাহলে কী সংকেতেই লকডাউন? এই নির্জন মস্তিষ্কে আমি নিজের অবরোধী মানসিকতার হাহাকার শুনতে পেলাম।তাতে হয়ত আরো একটু নোনতা হয়ে গেল সমুদ্রের জল।শুনেছিলাম বাল্টিক সমুদ্রের ‘গালফ অফ ফিনল্যান্ড’-এ সবচেয়ে কম নোনতা জল পাওয়া যায় আর সবচেয়ে বেশি নোনতা ‘রেড-সী’র জল। চোখের জলের হিসেবটা এর ভেতরে নেই। সারা দুনিয়ার ৭.৮ বিলিয়ন মানুষের চোখের জলে কী আট নম্বর সমুদ্রটা হয়ে উঠত না?

আমি তো কিশোর কুমারের গান ‘আমি নেই আমি নেই’ গাইছিলাম।কে সহ্য করতে পারল না আমার গান? ইয়ে আমার মাথা নয়তো? ‘চল তোকে দিয়ে আসি সাগরের জলে’ বলে মাথাই কী প্ররোচিত করল আমায় ঝাঁপ দিতে?নাকি রাজনৈতিক কারণে খুন হলাম? আমি, ফেসবুকে নিয়মিত পোস্ট দিতাম মানুষের সমস্যা নিয়ে।শেষ পোস্ট ছিল, ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান’ এটা পড়ে অনেকেই খেপে গেল।কিছু মন্তব্য এরকমঃ

১. মোল্লার কবিতা আউড়াচ্ছিস?দাঁড়া তোর ব্যবস্থা হচ্ছে

২. বাংলাদেশে ভাগ শালা রিফুউজি!

৩.বৃন্ত মারাচ্ছিস বাঞ্চোত, তোরাই দেশের দুষমন

এরকম আরো।আমি ওদের কমেন্টের নিচে লিখেছিলাম,হাম্বা!তাহলে কী ওরাই?কিন্তু আমায় ফেসবুক থেকে ‘লোকেট’ করে আমার সলিল সমাধি করাবে এটা কেমন বাড়াবাড়ি মনে হল!আমি আমার মস্তিষ্ককেই জিগগেস করলাম, ‘মাজরা’ কেয়া হ্যায় ভাই?                                                                           মস্তিষ্ক চুপ।মস্তিষ্ক ‘খোয়া খোয়া চাঁদ’।সেই কবেকার কথা।আমি তখন সত্যিই নেই।একটা জ্বর এল।১৯৫৭।‘এশিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা’।বাবারই তখন এক বছর।প্রায় পঁয়তাল্লিশ লক্ষ আক্রান্ত। এগারোশোর মত মৃত। আতঙ্কের গ্রাসে ভারত।এর মধ্যেই দেবানন্দ। এর মধ্যেই খোয়া খোয়া চাঁদ, তাইতো মস্তিষ্ক?বাবার বাবা, ঠাকুর্দা’র কাছে সেই আতঙ্কের গল্প। ওষুধ নেই, ভ্যাক্সিন নেই। প্যান্ডেমিক।ধীরে ধীরে সব শান্ত হয়েছিল।সেই সূত্রে আমিও এলাম একটি পরিবারে। ছিলাম তিরিশ বছর। নাকি আছি এখনো? আমি আবার সেই জলের টানেলে একাকার হতে থাকি।সমুদ্র,মনে পড়ে আমি বসে আছি, বালুকাবেলায়?গান গাইছি, আমি নেই, আমি নেই, তারপর?মাথা আবার কিছুটা ভারী।স্বস্থানে ফিরে এল? হাত দিলাম, ফাঁপা মনে হচ্ছে না। মনে হলেই বা কী?এই যে জলান্তরীণ অবস্থা, এখানে স্মৃতি সচল ওই সমুদ্র অবধি। এমনটাও তো হতে পারে যে আমি সমুদ্র ভ্রমণ শেষ করে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।হতেই পারে।ভাবনাটা বাড়তে দিয়ে লাভ নেই। আমি বেঁচে আছি কিনা, জানিনা। না বেঁচে থাকলে বাড়িতে বাবা,মা,বোন,হায়!আমি ভয় পেতে শুরু করি। আতঙ্ক গ্রাস করতে থাকে আমায়।মৃত্যুর পরেও কী ভয় আর আতঙ্ক থাকে, অনুভূতি হারায় না? নাকি আমি বেঁচে আছি?

সেই হলঘর, যা আমার মস্তিষ্ক ছিল হয়ত, আমি পেরিয়ে এসেছি।আবার জলের টানে ভাসছি এখন। কিন্তু ভিজছি না।অশরীরি ভেজে না।তাহলে? ঘামতে থাকি। ভিজছি না কিন্তু ঘামছি। এতো, ‘খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না’ কেস।হাসি পায়।কান্না দলা পাকায়।এইসব মানবিক অনুভূতি তো এখনো। মাথার ভেতরটা একটু আগে দেখলাম, কোনও উত্তরই ছিলনা সেখানে। শুধু নীরবতা।নীড়হারা, নীরহারা, নীরবতার তা শুধু মস্তিষ্ক জুড়ে। কোনও আঘাতের চিহ্ণ নেই।কী যে অহেতুক একটা মাথা, তাও আমার, হায় আমারই!জল বয়ে যাচ্ছে, নিয়ে যাচ্ছে আমাকে।আমি বঙ্গ সন্তান।এতক্ষণ এই অফুরন্ত মাছেদের গাদা গাদা সাঁতার দেখিনি কেন? কত রঙ, কত যে বিচিত্র শরীর আর নাথামা সাঁতারের আঁকিবুকি এই অকাতরে হয়ে চলা মাৎসন্যায়ের ভেতরে।আমি ওদের জলকেলি দেখি আর নিজের ভাসন্ত শব বা শরীরের দিকে তাকিয়ে ভাবি এই যে জলের ‘টানেল’ এর শেষে কী আছে? যদি মরেই গিয়ে থাকি তাহলে কী আমি ধীরে ধীরে কোনও সামুদ্রিক মাছ হয়ে যাবো? হলে, যেন ডলফিন হই।এই হতচ্ছাড়া ভেসে যাওয়ার সময়েও আমার মনে পড়ল সুন্দরী মেয়েরা ডলফিন পছন্দ করে, মাঝে মাঝে চুমুও খায়!

হঠাৎ আমার গতি কমে এল।কী হতে চলেছে আমার?কিছুটা এগোতেই দেখলাম জলের সুড়ঙ্গ দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে আলো, অন্যদিকে অন্ধকার।আর একজন দাঁড়িয়ে আছে সেই বিভাজিকায়।আলো আর ছায়ার জলজ তরঙ্গ তারা শরীরে খেলছে, যেন আচ্ছাদন!এতক্ষণ পরে একজন মানুষ। আমি কথা হারিয়ে ফেললাম।এখন আমি আর সে মুখোমুখি।

সে-স্বাগত জলীক!

আমি-জলীক কী স্যার?

সে-ভাসমান জলের অলীক প্রাণ,জলীক

আমি-প্রাণ?আমি তাহলে বেঁচে আছি?

সে-প্রাণ মরেনা।বেঁচেই আছ।এবার সিদ্ধান্ত নাও কোনদিকে যাবে।ডানদিকে অন্ধকার, যদি যেতে চাও তো অনন্ত যাত্রায় ভেসে যেতে পারবে।মৃত্যুহীন।আর বাঁদিকে, যে দিকে আলো, যদি যাও পৌঁছে যাবে তোমার ফেলে আসা দুনিয়ায়।পৃথিবীতে।

হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে, ময়ূরের মত নাচেরে,ওফ্‌ রবি ঠাকুর!গুনগুন করতে করতে বললাম, স্যার আমি বাঁদিকেই যাবো।

সে হাসল।জোব্বা পরা।দাড়িগোঁফে আচ্ছাদিত তার মুখে আলো পড়তেই মনে হল রবীন্দ্রনাথ, অনেকটাই। বলল, তাহলে যাও। তবে ফিরে গিয়ে তুমি কিন্তু তোমার পরিচিত মানুষ আর পৃথিবীকে পাবে না।

আমি- কী বলছেন স্যার, পাবোনা কেন?

সে- তুমি ইতিমধ্যে এক হাজার বছর পেরিয়ে এসেছ। ওই যে আলোর পৃথিবী ওখানে সব পাল্টে গেছে।তুমি কিছুই চিনতে পারবে না, বুঝতে পারবে না।কী হবে ওখানে গিয়ে? তুমি বরং ডানদিকে যাও।একটা ডিঙি আছে দেখো।ভেসে পড়ো।আর মায়ায় জড়িও না।বাঁধন টাধন ছাড়ো।চলে যাও অনন্তযাত্রায়।

আমি মনে মনে হাসলাম। বুড়ো লোভ দেখাচ্ছে।যতই দেখাক, আমি বাঁদিকেই যাবো। পৃথিবীতে।বললাম, আমি বাঁদিকেই যাবো স্যার।

বুড়ো স্মিত হাসি হেসে বলল,যাও।

 

আলো ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে।আমি যাচ্ছি পৃথিবীর দিকে।মাথায় হাত দিয়ে দেখলাম, মগজের ভার নিয়েই সে স্বাভাবিক।বাইরে এসে দাঁড়ালাম,আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল।আর আমায় কারা যেন ঘিরে ফেলল।ধাতস্থ হতেই দেখি আমি কিছু ইউনিফর্ম পরা মানুষের হাতে বন্দী।সবাইকে একরকম দেখতে।সমুদ্রবুড়ো বলেছিল আমি আমি এক হাজার বছর পার করে ফেলেছি সমুদ্রের টানেলে।এরা নিশ্চয়ই বাংলা জানে। জিগগেস করলাম, আমি কোথায়? কেউ একজন যান্ত্রিক উচ্চারণে কিছু একটা বলল।ওর কথা বা আদেশ শুনে ছোট্ট একটা মোবাইল ধরণের কিছু এনে ধরা হল আমার সামনে আর আমায় ঈশারা করল কথা বলার জন্য। বললাম,আমি কোথায়?

-বাংলা!সামনের লোকটি ওই মোবাইলসাদৃশ্য যন্ত্রের দিকে তাকিয়ে হাসল।যাক, এরা হাসে তাহলে। সেই লোকটিই বলল, আপনি আমার সঙ্গে চলুন, আমি বাংলা জানি।আমার নাম আয়ুধ।

হাজার বছর ধরেই তাহলে আমি হেঁটেছি,থুড়ি সাঁতরেছি হে জীবনানন্দ।এখন আমি এই একইরকম দেখতে মানুষদের হাতে বন্দী।আমায় বেশ আপ্যায়ন করছে ওরা।খাওয়া দাওয়া পুরো বাঙালি মতে।দেখলাম, হাজার বছর পরেও ভাপা ইলিশ আর গলদা চিংড়ির প্রতি আমার দুর্বলতা একই রকম রয়ে গেছে।আমার হোস্ট সেই লোকটি এবার বলল, চলুন আমরা কথা বলি।তো শুরু হল কথা আমার আর আয়ুধের মধ্যে।

-এটা কী কলকাতা?

-না। এখন সারা পৃথিবীতে কোনও দেশ নেই। আপনি ‘গ্যাঞ্জেস জোন’ বা গঙ্গা বিভাগে আছেন।

-এখানকার ভাষা বাংলা নয়?

-বাংলাই। তবে আপনি দুনিয়াসেনাদের হাতে এখন। এখানে বহু ভাষাভাষীর সেনারা কর্মরত।আমিও তাই।

-আপনাদের সবাইকে এক দেখতে, মহিলারাও কী এরকম, মানে একইরকম দেখতে?

-হ্যাঁ

-সবাই একরকম, আপনাদের অসুবিধে হয়না?

-না

-নিজের প্রেমিকা বা বৌকে আলাদা করেন কীভাবে?

-গন্ধ আর শব্দতরঙ্গ দিয়ে

-মানে?

-প্রত্যেকের আলাদা গন্ধ আর শব্দতরঙ্গ আছে ।গন্ধটা আর শব্দটা কোডেড।প্রয়োজনমত সক্রিয় হয়ে ওঠে।

-কিন্তু এটা করতে হল কেন?

-ভাইরাসের জন্য!

-ভাইরাস?

-হ্যাঁ, একটা ভাইরাস প্রায় তিনশো বছর আগে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল।ভাইরাসের আক্রমণ তো বারেবারেই হয়েছে, আপনি যে সময়ের তখনো করোনা ভাইরাস সারা দুনিয়াকে তছনছ করে দিয়েছিল।মনে পড়ছে?

-হাল্কা মত। আমি পুরীতে তখন। লকডাউন শুরু হল।আমি সমুদ্রের ধারে বসে গান গাইছিলাম,হঠাৎ..

-আমরাই একটা সময়ঘূর্ণি তৈরি করে সময়সুড়ংগ দিয়ে আপনাকে আমাদের কাছে নিয়ে আসি

-ইয়ার্কি নাকি, কেন আনবেন আমায়, আমার বাবা,মা,বোন..তারা কী অবস্থায় আছে আমি জানিনা,কেন করলেন এরকম?

-আমরা জানাতে চাইছি যে দুনিয়াতে কী কী হতে পারে ভবিষ্যতে।আপনি আমাদের সার্চ টিমের কাছেই ছিলেন, আমাদের তাড়া ছিল স্যাম্পল যোগাড়ের।তো আমাদের টাইম ডিটেক্টরে আপনি যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন।আপনি অবিবাহিত, এটাই আপনাকে যোগ্য প্রতিনিধি করে করে তুলেছিল।

-আমি জেনে কী করবো?আমি তো এক হাজার বছর পেরিয়ে এসেছি, তাছাড়া প্রতিনিধি মানে, কিসের প্রতিনিধি?

– আমরা বিভিন্ন ভাইরাসকালীন সময়ের স্তর থেকে প্রতিনিধি যোগাড় করছি।আপনি করোনা ভাইরাসের সময়ের প্রতিনিধি।আপনাকে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় আমরা এখনকার মানুষ করে তুলবো, এই ‘এক্সপেরিমেন্টে’র জন্য আমাদের জ্যান্ত শরীরের প্রয়োজন ছিল। একইভাবে স্প্যানিশ ফ্লু, এশিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা্র সময়ের প্রতিনিধিও এখানে আছে।

আমার মাথা ঘুরছিল।হায়, কেন যে দক্ষিণপন্থী হয়ে ডানদিকের রাস্তাটা নিলাম না। আমার তো সবই গেল দেখছি।এমনকি মুখটাও।

-আমায় আপনাদের মত করে দেবেন মানে? আমার মুখ আর শরীরও আপনাদের মত হয়ে যাবে?

-হ্যাঁ।এছাড়া অন্যকোনও উপায় নেই, আমরা প্রোগ্রামিং-এর সাহায্যে আপনাদের এই সময়ের জন্য ‘আপডেট’ করে দেবো,নইলে বাঁচবেন না আপনারা।

-বাঁচবো না মানে, আমি কী এখন বেঁচে আছি? আর থাকলে মরবোই বা কেন?

-আজ থেকে প্রায় তিনশো বছর আগে ‘ডি ভাইরাস’-এর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে সারা দুনিয়ায়। ‘ডি’ ফর ‘ডেমন’।কিছুতেই এর মোকাবিলা করা যায়নি। ‘এয়ারবোর্ণ’ ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তিনদিনের মধ্যেই ‘মাল্টি অর্গান ফেলিওর’ হয়ে যাচ্ছিল। মানুষ মারা যাচ্ছিল কাতারে কাতারে। প্রায় একশো কোটি মানুষ মারা যায় ওই সময়ে।এরকম অদ্ভুত পরিস্থিতিতে সব দেশ একজোট হয়ে একটা কেন্দ্রীভূত সরকার তৈরি করে। শুরু হয় এই ভাইরাসকে আটকানোর জন্য নানাধরণের পরীক্ষা নিরীক্ষা। বছরখানেকের মধ্যে বিজ্ঞানীরা সফল হয়, না ওষুধ বা ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করে নয়, তারা মানুষের প্রটোটাইপ তৈরি করার জেনেটিক কোড তৈরি করে ফেলে।

আমি অবাক হয়েই শুনছিলাম।একশো কোটি লোক মারা গিয়েছিল!আমি যে সময়ের তার থেকে সাতশো বছর পরে, ‘মাই গুডনেস’!কিন্তু এই ‘জেনেটিক কোড’ ব্যাপারটা কী?

আয়ুধ কী ‘থটরিডিং’ জানে? বলল, বিজ্ঞানীদের কাছে তখন একটাই বিচার্য বিষয় ছিল ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া আটকানো।কিন্তু কিভাবে?ভাইরাস মানুষের শরীর চায় বেঁচে থাকার জন্য। আবার যে শরীরকে সে আক্রমণ করে সেই শরীরেই সে ‘অ্যান্টিবডি’ তৈরি করে দেয়। আপনাদের ‘করোনা ভাইরাসে’র সময়েও রক্ত থেকে ‘প্লাজমা’ আলাদা করে আক্রান্তদের দেওয়া হয়েছিল ‘অ্যান্টিবডি’ তৈরি করার জন্য।তো, বিজ্ঞানীরা দেখলো যদি এই পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে একটা ‘জেনেটিক কোডে’র আওতায় এনে একই রকম করে ফেলা যায় তাহলে একটা উপায় বের করা যেতে পারে।আবার ‘এক্সপেরিমেন্ট’ চলল। রাতদিন।তারপর ওই ‘জেনেটিক কোড’ আবিষ্কার করে ফেলল বিজ্ঞানীরা। দশ বছরের মধ্যে সমস্ত মানুষকে একটাই ‘জেনেটিক কোড’-এ নিয়ে আসা হল।এটা করার সময় তাদের নিজস্ব ‘জিন’ আলাদা করে সুরক্ষিত ‘লকার’-এ রাখা হল ভবিষ্যতের জন্য, যাতে ভবিষ্যতের কোনও আজানা রোগে কাজে লাগানো যেতে পারে।

-কিন্তু সংক্রমণ আটকালো কিভাবে?

-খুব সহজে। ধরুন ভাইরাস আমায় আক্রমণ করল, আক্রান্ত আমার ভেতরে ‘অ্যান্টিবডি’ও তৈরি হতে শুরু করল। একইসঙ্গে আমার ‘প্রোটোটাইপ; সবার মধ্যেও ‘অ্যান্টিবডি’ তৈরি হতে শুরু করল, নিজে থেকেই।ভাইরাস আর নতুন শরীর পেলো না।পেলেও বিশেষ ক্ষতি করতে পারল না এবং ধীরে ধীরে মুছে গেল দুনিয়া থেকে।তবে এখানে ‘জিনপ্রযুক্তি’র কিছু খেলা আছে যা আমাদের সবাইকে আলাদা করেও বিভিন্ন আক্রমণ থেকে রক্ষা করে, ধরুন আমার ‘স্টমাক প্রব্লেম’ হলে বাকি সবারও হবে, এমনটা নয়।যাইহোক,আমি যা বললাম তার চেয়েও অনেক জটিল ব্যাপার আছে, প্রক্রিয়া আছে, বিজ্ঞানীরা সেসব জানে।আমাদের অত জেনেই বা কী হবে? এবার আমার সঙ্গে চলুন।তিনদিন লাগবে আপনাকে এই সময়ের উপযোগী করে তুলতে।আপনার চেহারা আমাদের মত হয়ে যাবে।আপনার একটি বিশেষ গন্ধ আর শারিরীক তরঙ্গের কোড থাকবে যা দিয়ে আপনাকে আলাদা করা যাবে।আমাদের এই সমাজে দেখার ক্ষেত্রে এ খারাপ আর ও ভাল’র কোনও ব্যাপার নেই।মেধার ক্ষেত্রে আছে আর এটা লটারি করে ঠিক করা হয়।যে যা হবে তাকে সেই অনুযায়ি ‘প্রোগ্রাম’ করে দেওয়া হবে। আমায় দেওয়া হয়েছিল সৈনিক হওয়ার প্রোগ্রাম।একনাগাড়ে এতটা বলে আয়ুধ হাসল।হাসিটা বেশ নির্মল।আমার হঠাতই মনে হল, এই নতুন দুনিয়ায় মানুষ অনেকটাই ভাল হতে পেরেছে।চুরি চামারি নেই। দুর্ণীতি নেই। রেপ নেই। শোষণ নেই। যুদ্ধ নেই।সারা পৃথিবী এখন একটাই দেশ।একটাই সরকার।একটাই সেনাবাহিনি।স্বপ্ন মনে হচ্ছে, তাইনা?

 

আমি এখন আমার নতুন জন্মের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।আমি আর আমি থাকবো না। মনে পড়ল একহাজার বছর আগে পুরীর সমুদ্র। আমি রাতের ঢেউ দেখতে দেখতে গাইছি, আমি নেই আমি নেই, ভাবতেই ব্যথায় ব্যথায় মন ভরে যায়…

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

One Reply to “

নিঠুর এপ্রিলে

স্বপন রায়


Leave a Reply to ব্রতী মুখোপাধ্যায় Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *