কোন্‌ নটিনীর ঘূর্ণি-আঁচল

গৌতম বসু


‘তোমার নিজের এবং বিশ্বপ্রকৃতির গভীরে কত-কি যে চাপা প’ড়ে আছে এতকাল, তার কোনও হদিস তোমার কাছে নেই; জীবনপ্রবাহের বহির্ভাগে, পরিতৃপ্ত মনে তুমি দিন কাটাচ্ছিলে, ঠিক যখন, ওই যাতনা, যা স্বয়ং মরণদশার অতিনিকটস্থ, অকস্মাৎ তোমায় আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে, সত্বর পাঠিয়ে দিল নিঃসীম,জটিল এক অঞ্চলে, যেখানকার উত্তাল ঘূর্ণাবর্তে তোমার অন্তর্মুখী সত্তা আজ সম্পূর্ণ দিশাহারা।’

এমিল চোরান (১৯১১-১৯৯৫)

*

‘পদ্যচর্চা’র বন্ধুরা,

 

একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বাঙলার কোনও-কোনও গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের বিক্রয়কেন্দ্রগুলিকে ভুষিমালের দোকান নাম দেওয়া হলেও, মনিহারি দোকান বললেই যেন ঝপ্‌ ক’রে একটা পরিচিত ছবি ভেসে ওঠে। এখানে দাঁড়িয়ে থেকেও, নিজেকে আমি চিনুদা-র দোকানে দেখতে পাই, দশ নয়া পয়সা মুঠোয় নিয়ে সারি-সারি কাচের বয়ামের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে রেখেছি, অপেক্ষা করছি, কখন পয়সাটা তুলে নেওয়া হবে এবং তার জায়গায় আমি পেয়ে যাব পুরানো খবরের কাগজে মোড়া আধ মুঠো মৌরী লজেন্স। চটিজুতোর ঘষ্টানিতে ঈষৎ ঝাপসা হয়ে-আসা খড়ির গণ্ডিতে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে অনুভব করি, এতগুলি দশক পার হয়ে এলেও মূল অবস্থার এতটুকু পরিবর্তন হয় নি। বিষয়টি সূক্ষ্ম ; নিজেকে বোঝাই, এখনই অতসব না ভাবলেও চলবে। তার চেয়ে বরং মুদির দোকানের এই নবার্জিত উচ্চাসনের বিষয়টি নিয়ে ভাবা যেতে পারে। পাড়ায়-পাড়ায় মুদির দোকানের মালিকদের এখন সম্পূর্ণ অন্য চোখে দেখা হচ্ছে। দশ বিশজন পাইকারি বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তাঁরা কয়েক শো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমাদের জন্য এতদিন ধ’রে নীরবে সংগ্রহ ক’রে এনে, পসরা সাজিয়েছেন আমাদেরই জন্য, সে-কথা কি একবারও ভেবে দেখার অবসর হয়েছে? স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমি ধ’রেই নিয়েছিলাম দোকানে গিয়ে দাঁড়ালে, এক টিউব দাঁতের মাজন পেয়ে-যাওয়া আমার জন্মগত অধিকারের মধ্যে পড়ে। প্রকৃত অবস্থা যে তা নয়, সে-বিষয়ে আমি যে অবহিত ছিলাম না এমন নয়, বরং বলা ভাল, সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছিলাম। সাহিত্যও এক সমান্তরাল অবস্থা। অকস্মাৎ, কান ধ’রে শিখিয়ে দেওয়া হল, কোন্‌ লেখা দাঁতের মাজনের মতো অনিবার্য, আর কোন্‌টা তা নয়। কোন্‌ নটিনীর ঘূর্ণি-আঁচল লাগল আমার গায়ে!

আমার নোটবইখানা তার চরিত্র পাল্টে ফেলে কীভাবে কোভ়িডের-১৯এর হিসেবের খাতা হয়ে উঠল, তা আমাকে অবাক করে না। মাস দেড়েক আগে যখন শুরু করেছিলাম তখনই সারা পৃথিবীতে আক্রান্তের সংখ্যা সদ্য ৫ লক্ষ পেরিয়েছে, প্রয়াত মানুষদের সংখ্যা ২৩ হাজার। আজ সেই সংখ্যা যথাক্রমে সাড়ে ৩৭ লক্ষ ও ২ লক্ষ ৬৩ হাজার। আমি ভাবি, সেই ২ লক্ষ ৬৩ হাজার মানুষ, আরও কয়েক লক্ষ মাইগ্রেন্ট শ্রমিক পরিবারকে ডেকে নিয়ে, সকলে মিলে একটা মাঠে জড়ো হয়ে, শিল্পসাহিত্য ও কৃষ্টি বিষয়ে একটিও প্রশ্ন যদি তোলেন, তার কী জবাব আছে আমার কাছে ?

নমস্কার। ইতি বুদ্ধপূর্ণিমা ১৪২৭।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *