নিভৃতবাসের কড়চা

গৌতম চৌধুরী


এক-কা দোক-কা

স্বভাবদোষে বা গুণে, কিছু কিছু কিছু মানুষ একটু একলসেঁড়ে হন। একলসেঁড়ে, না একলাপন? একটু লাজুক, মুখচোরা, দলছুট, ভিড়ের ভিতর মানাইয়া লইতে না-পারা – এমন বহু জনকেই আমরা সমাজের নানা এলাকায় কমবেশি দেখিতে পাই। শুধু কবিরাই যে একাকী মানুষ, তাহা বোধহয় নয়। কবিদের ভিতরেও অনেকেই দিব্য সামাজিক। অজানা জায়গায় অচেনা মানুষের সাথে অনেক কবিই এন্তার আলাপ জমাইয়া লইতে পারেন। বড় বড় সভাসমিতিতে মন্ত্রী-সান্ত্রীদের সাথে মঞ্চভাগ করিতেও বেশ সড়গড়।

   হ্যাঁ, কবিদের ভিতরেও অনেকে একটু একটেরে ধরনের হন বটে। উল্টাদিকে চেনা মানুষ দেখিলে, অভিমুখ পাল্টাইয়া অন্যদিক বরাবর হাঁটা দেন। আপনমনে বিড়বিড় করেন। কিন্তু, এমনটি তো শুধু জীবনানন্দ নন, আমাদের ইস্কুলের ইতিহাস-মাস্টারমশাই মিহিরবাবুও আপন মনে বিড়বিড় করিতেন। একদিন খালি টিচার্স রুমে হঠাৎ ঢুকিয়া পড়িয়া শুনি, বিড়বিড়, তবু বেশ খানিক স্পষ্ট স্বরেই, মিহিরবাবু বলিতেছেন – সিরাজ জিতেছে সিরাজ জিতেছে, মোহনলাল ক্লাইভকে পিছমোড়া ক’রে বেঁধে নিয়ে গেছে। তখন নিতান্ত বালক, ভাবিলাম স্যার বুঝি কোনও থিয়েটারের পাঠ মুখস্থ করিতেছেন!কানমলার ভয়ে ঝটপট কাটিয়া পড়িলাম।

   কেহ বলিতে পারেন, মিশুক অমিশুক যেমনই হউন, লিখিবার সময় তো কবি একেবারেই একা। বিলকুল নিঃসঙ্গ! কথা সহি। কিন্তু, কেহ যখন অঙ্ক কষেন বা অণুবীক্ষণে একটি ভাইরাসের চেহারা-সুরত ঠাহর করেন বা পায়ের অজানা কারসাজিতে প্রতিপক্ষের জালে বলটি ঢুকাইয়া দেন – সেইসব মুহূর্তে সেই সেই মানুষগুলিও কি একা নন? তাহা হইলে স্রেফ কবিদের কপালে একাকিত্বের বরমাল্য কেন!

   আমার তো বরং মনে হয়,এমনিতে যদিবা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কোনও কবি একা সময় কাটানও, কবিতা রচনার মুহূর্তে তাঁহার একা থাকিবার জো-টি নাই। সেইসব সময় তাঁহার তো সেই অন্য-আমিটিকে চাইই,যে-আমি কোথায় যেন ঘাপটি মারিয়া থাকে,শুধু মাঝে মাঝে দেখা দেয়। মাঝে মাঝে, যখন রচিত হয় কবিতারচনার মুহূর্ত। যখন, সেই অপর-আমিই কবিকে উস্কানি দেয় এক হইতে বহু হইবার জন্য। একভাবে সে-ই যেন কবির অব্যবহিতের পরিমিতকে অ-পরিমিত, লৌকিককে অ-লৌকিক করিয়া তুলে, শেষ তক এই সবকিছু যাহাতে ‘সকলসহৃদয়হৃদয়সংবাদী’ হইয়া উঠে।

   এতসব কাণ্ডকারখানা কাহার? সে কি তবে কবির মনের গহনে তলাইয়া-থাকা নিজেরই চির-অচেনা আত্মরূপ? অর্থাৎ কি না, তাঁহারই মনের মানুষ! যে-নামেই তাহাকে ডাকা হউক,পিদিমে ঘষা লাগিবা মাত্র সে হাজির। কবি ভালোই টের পান, আর তিনি একা নাই। নহিলে কাহার সহিত সংকেত বিনিময় হয় তখন, এমন কি দু’একটি অস্ফুট কথাবার্তাও চলে। একটি থিতু দশা হইতে কে সহসা সুতা বাড়াইয়া উড়াইয়া দেয় ঘুড়ি, সহসা ঘষ করিয়া কাটিয়ে দিতে বলে শব্দ, এধার ওধার করিয়া দেয় লাইন? কবিতা শেষ হইল তো সেও হাওয়া। হ্যাঁ, তখন খানিক ক্ষণের জন্য কবি একা বটে। সাততলা আসমানে যে-বন্ধুর বাস, তাহাকে কি যখন তখন পাওয়া যায়!

নৌকা না কি সাঁতার

আচ্ছা, আসমানে চড়িবার কি কোনও শর্টকাট আছে? না, আকাশপ্রসূন রচনার কথা বলিতেছি না। সে তো শুইয়া বসিয়া নাক ঝাড়িয়া যেমনভাবে খুশি রচা যায়। বলিতেছি সেই সাততলা আসমানের কথা, যেখানে আমাদের দোস্ত মহাশয় লুকাইয়া থাকেন, আমাদের না-লেখা কবিতাটির ভবিতব্য লইয়া। আসমান না-হইয়া সে-জায়গা গহন অটবীও হইতে পারে। বা দরিয়ার অতল। কে বলিতে পারে!শুধু টের পাওয়া যায়, আমাদের এই তুচ্ছ শরীরেরই, যাহার অংশ আবার মনও,গোপন ফাঁকফোকরে কোথাও সেই আসমান বা অটবী বা দরিয়া। শরীর না-বলিয়া অস্তত্ব বলিলে বুঝি কেউ কেউ বেশি খুশি হইবেন।

   মনে পড়িল, এ-বাবদে শক্তি চট্টোপাধ্যায় একটি জনপ্রিয় প্রবচন চাউর করিয়াছিলেন। মাঝে প্রায় আধা শতক কাটিয়া গেলেও, এখনও লোকস্মৃতিতে সেই সদুক্তিকর্ণামৃত ভালোমতোই ধরা আছে – মদ্যই আমাকে পদ্যের কাছাকাছি লইয়া যায়। আমার তো জবরদার ধারণা, ইহা ছিল স্রেফ একটি অনুপ্রাস-ঝংকৃত ‘শাক্ত’ রসিকতা মাত্র। লোকায়ত সাধকের চোখে যেমন ‘তোমার পথ’ মন্দিরে-মসজিদে ঢাকিয়া দেয়, মদ্যপানে পাওয়া তুরীয়তা কি সেইভাবেই কবিতার নিরিবিলি রাস্তাটিকে আচ্ছন্ন করিয়া দেয় না? নাজুক পতঙ্গেরা তবু দলে দলে মহাজন-পন্থা ঠাওরাইয়া পাত্রস্থ তরলে জম্পেশ সাঁতার কাটিলেন। অবশ্য শেষ তক পাড়ের অপাত্রে গিয়া ভিড়িতে পারিলেন কি না, তাহা ঠাহর করিবার জন্য টেমার লেনের ছোটকাগজের মহাফেজখানায় গিয়া আতশ কাচ লইয়া বসিতে হইবে।

   রসিকতা বাদ। আদত প্রশ্নটি তবু উটের মতো মুখ বাড়ায়। বাহিরের কোনও উপকরণ বা প্রকরণ এস্তেমাল করিয়া কি সেই পরানবন্ধুর দেখা পাওয়া যায়? ফিলহাল প্রশ্নটি আবার করিয়া জাগিল, স্নেহভাজন এক তরুণ কবির সহিত আলাপচারিতার সূত্রে। দিনকয় আগে তিনি জানাইলেন,ঘরবন্দি দশার মওকায় তিনি চুটাইয়া ধ্যান করিতেছেন। একটু অবাকই হইলাম। অক্ষরের পিছু-ধাওয়া না-করিয়া কবি ধ্যান করিতেছেন!পরে ভাবিয়া দেখিলাম, ধ্যান করিয়া যদি তিনি আনন্দ পান শান্তি পান, ধ্যান তো তিনি করিতেই পারেন। ইহা লইয়া খামোখা অবাক হইবার কী আছে!মানুষ তো শারীরিক সুস্থতা বহাল রাখিবার জন্য কতরকম কসরত করে ব্যায়াম করে। তাহা হইলে ধ্যান করিয়া যদি কেহ ভালো থাকেন,আপত্তি কিসের!ভালো থাকিতে-চাওয়া তো অনৈতিক কিছু নয়। কিন্তু খটকা এই যে,কবির যে-নিরাময়-অযোগ্য বিস্ফোরণ-উন্মুখ মনোভার,তাহা কি ধ্যানে প্রশমিত হয়? আর যদি প্রশমিতই হইল, তাহা হইলে আর কবিতা হয় কেমনে!

   ইহা সত্য যে, ভালো থাকিতে হইবে, এই আকাঙ্ক্ষাই মানব স্বভাব। কিন্তু,সেই স্বভাবের বাহিরে গিয়া, অর্থাৎ ভালো থাকিতে চাহিবার যে সহজাত মানব প্রবৃত্তি, হয়তো বা তাহাকে ব্যাহত করিয়াও, কবিতা মনে হয় নিজেই অন্য আর এক রকম ভালো থাকিবার পথ দেখায়। কবিতা রচনাতেই কবির চিরবেদনার ক্ষণিক উপশম। কবিতাই কবির ধ্যান ও জ্ঞান। নদী পার হইবার জন্য যদি কেউ নৌকায় চড়িতে চান, চড়িতেই পারেন, কিন্তু জটিল-কোমল অতলবিথারি জলে সাঁতার কাটা আর তাঁহার হইবে কেমনে!

   ধ্যানে বা পানে,নিজ নিজ তরিকায় শান্তি পাইবার অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু কবিদের জন্য কি এ-ভবসংসারে কোনও শান্তি বরাদ্দ আছে!

মহাজন পদ

 

দুঃস্বপ্ন! কী? না, তুমি বুঝি পাশে নাই। মনে হয়, দুনিয়া জুড়িয়া কী এক গভীর ফিসফাস চলিতেছে। বুঝি বা পায়ের তলা হইতে মাটি সরিয়া যাইবে। ভয়ে, আকাশকেই আঁকড়াইয়া ধরিবার জন্য দুই হাত বাড়াইয়া দেই। কিন্তু আকাশ তো শূন্য। চমকাইয়া ঘুম ভাঙিয়া যায়। দেখি, আমার পাশেই দিব্য বসিয়া আছ তুমি। মাথা নিচু করিয়া পশম বুনিতেছ – ‘সৃষ্টির অমোঘ শান্তি সমর্থন করি’। রোগশয্যায় কবিতাবহির ৩৯ নং এই কবিতা কি তবে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত শান্তির জন্য আর্তির কোনও প্রকাশ? হইতেই পারে। দীর্ঘ অসুস্থতার মধ্যে তখন চলিতেছে জীবনের সহিত মৃত্যুর সহিত তাঁহার শেষ বুঝাপড়া। মাত্র একদিন আগেই উচ্চারিত হইয়াছে সেই নির্মম অনুভব – ‘ধূসর গোধূলিলগ্নে সহসা দেখিনু একদিন/ মৃত্যুর দক্ষিণ বাহু জীবনের কণ্ঠে বিজড়িত’। সেই প্রায়-অন্তিম রোগশয্যার পাশে পশম বুননরত একটি প্রিয় অবয়বের উপস্থিতি তো তখন হইয়া উঠিতেই পারে, জ্বরতপ্ত সময়ের কপালে যেন প্রশান্তির এক জলপটি।

   কিন্তু সময় যে তখন অন্যভাবেও জ্বরতপ্ত। ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলিতেছে পুরাদমে। ইয়োরোপ জ্বলিতেছে। জ্বলিতেছে এশিয়াও। তীব্র অসুস্থতার ভিতরেও কবি কিন্তু ঘটনাপ্রবাহের দিকে সজাগ। আর দুনিয়াজোড়া সেই মৃত্যুপ্রবাহের আবর্ত তাঁহাকে রক্তাক্তও করিতেছে। তাই ওই একই দিনে (৫ ডিসেম্বর ১৯৪০), একই সকালে,আর এক কবিতায় তিনি লিখিয়া ফেলিয়াছেন – ‘ধর্মরাজ দিল যবে ধ্বংসের আদেশ/ আপন হত্যার ভার আপনিই নিল মানুষেরা।/ ভেবেছি পীড়িত মনে,পথভ্রষ্ট পথিক গ্রহের/ অকস্মাৎ অপঘাতে একটি বিপুল চিতানলে/ আগুন জ্বলে না কেন মহা এক সহমরণের।’ তখন বুঝা যায়, বুঝি ততদূর ব্যক্তিগত শান্তি নয়,এক বৈশ্বিক শান্তিরই প্রতিমা রচনা করিতে চাহিয়াছেন কবি, নীরবে পশম বুনিয়া-চলা এক অস্তিত্বের উষ্ণতায়। বুননের সেই নিবিড় নির্বিঘ্নতার ভিতর দিয়া যেন ‘সৃষ্টির অমোঘ শান্তির’ প্রতি বিশ্বমানুষেরই একাগ্র ‘সমর্থন’ ঝরিয়া পড়িতেছে।

   ব্যক্তিজীবনের প্রশান্তি কোনওদিনই কি খুব কাম্য ছিল ঠাকুরের? অন্তত ততদূর কাঙ্ক্ষিত, যে,তাহার আহাজারিগুলি কবিতা ঘনাইয়া তুলিবার বিভাব বা অনুভাব হইয়া উঠিয়াছে? বরং উলটাই তো দেখিতে পাই তাঁহার রচনার সাক্ষ্যে। গীতিমাল্য-এর ৬৯নং কবিতায় যাহার স্পষ্ট প্রকাশ ঘটিয়াছে এইভাবে – ‘তোমার কাছে শান্তি চাব না,/ থাক-না আমার দুঃখ ভাবনা’। কী আশ্চর্য, জীবনের আখেরি পঙক্তিমালার ভিতরেও তাঁহাকে বলিতে শুনি – ‘আমৃত্যু দুঃখের তপস্যা এ জীবন,/ সত্যের দারুণ মূল্য লাভ করিবারে,/ মৃত্যুতে সকল দেনা শোধ ক’রে দিতে’ (১১নং কবিতা, শেষ লেখা)। কবির ভবিতব্যতার ভিতর যে শান্তির কোনও ফুরসত নাই, বা তেমন শান্তির মুহূর্ত কখনও রচিত হইলেও, তাহা যে নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী তাহা কি হাড়ে হাড়ে টের পান নাই জীবনানন্দও? এমনকি বনলতা সেন, সেও দুদণ্ডই শান্তি দিতে পারে মাত্র। কবিতালিপ্ত জীবন ‘ক্ষুধা প্রেম আগুনের সেঁক’ চাহিয়া শেষ পর্যন্ত ‘হাঙরের ঢেউয়ে … লুটোপুটি’ খায়। ব্যক্তিগত শান্তির অধিকারই যেন তাহার নাই। আত্মজীবনীর শান্তিকে হরপলক জলাঞ্জলি দিতে দিতে সে ভাবে কোনও দূরতর শান্তিকল্যাণের কথা। সেই পাথর-ছড়ানো পথে চলিতে চলিতে একদিন সে টের পায় বটে – ‘প্রশান্তিই প্রাণরণনের সত্য শেষ কথা’। তবে, ব্যক্তির একবচন হইতে কবি তখন পঁহুছিয়াছেন মানুষের বহুবচনে –

আমরা মানুষ ঢের ক্রূরতর অন্ধকূপ থেকে

অধিক আয়ত চোখে তবু ঐ অমৃতের বিশ্বকে দেখেছি;

শান্ত হয়ে স্তব্ধ হতে উদ্বেলিত হয়ে অনুভব ক’রে গেছি

প্রশান্তিই প্রাণরণনের সত্য শেষ কথা, তাই

চোখ বুজে নীরবে থেমেছি।     (মৃত্যু স্বপ্ন সংকল্প, বেলা অবেলা কালবেলা)

পুরনোতুন মানুষ

যতই না কেন নিভৃতবাসে দিন কাটাই, একবচনের বহুবচন হওয়া আটকায় না। এই দুর্দিনে শারীরিক দূরত্বের অভ্যাসটি মানুষ কবুল করিলেও, সামজিক দূরত্বের ধারণা দুনিয়া জুড়িয়া আপসেই বাতিল হইয়া গিয়াছে। বিশেষ করিয়া সামাজিক সংযোগমাধ্যমের বদৌলতে যখন সারা দুনিয়া হইতে তথ্যের ঢেউ আসিয়া ব্যক্তির দেউড়ি টপকাইয়া নাকের ডগায় আছড়াইয়া পড়িতেছে আটপ্রহর। ফলে, পহেলাই যাহা টের পাইতেছি, মৃত্যুর এই দিগন্তবিথারী সংখ্যার ভারে, অভিধান হইতে ভাসিয়া উঠিয়াছে দুইটি শব্দ – পৃথিবী আর মানুষ। ভাসিয়া উঠিয়াছে, তাহাদের প্রকৃত অর্থ লইয়া। অত্যন্ত হেলাফেলার এই শব্দ দুইটি আজ লাশের পাহাড় হইতে প্রতিনিয়ত উচ্চারিত হইতে হইতে আমাদের মনে করাইতেছে, এই গ্রহ আসলেই একটি সামগ্রিকতা, আমরা আসলেই একটি একক প্রজাতি। হায়, এই সামান্য স্মৃতিটুকু উস্কাইতে আসরে নামিতে হইল এমন একটি অণুজীবের, যাহার ওজন মাত্র ০.৮৫ অ্যাট্টোগ্রাম। ১ অ্যাট্টোগ্রাম = ১০(-)১৮ গ্রাম!

   দেখিলাম, দুনিয়া জুড়িয়া ভীত মানুষ ঘরবন্দি হইবার কয়েক দিনের মধ্যেই আবহাওয়া সাফ হইল, তাপমাত্রা কমিল, কোণঠাসা ভূচর জলচর ও খেচর প্রাণীরা ফুর্তির সহিত নানান মহানগরের আনাচে কানাচে তাহাদের অস্তিত্ব জানান দিল। দেখিলাম, বিমানবন্দরে বন্দরে পাল পাল বিমান মুখ থুবড়াইয়া ঝিমাইতেছে। দেখিলাম, তেল কিনিলে খরিদ্দার উপরন্তু কিছু পয়সা পাইতেছে। দেখিলাম, গাড়িনির্মাতা রোলস রয়েস কোম্পানি মধু বানাইতেছে। এসব কি রূপকথা!না কি গ্রেটা থুনবার্গের অশ্রুরুদ্ধ ক্রোধের অভিব্যক্তি অবশেষে শুনিলেন প্রকৃতি!

   এইসব কল্পচিত্রের পাশাপাশি, এই নিভৃতবাসেই, একটি কেতাবের কথা জানিলাম। তাহার নামটি প্রায় কোনও উপন্যাসের মতো – এক ডুবন্ত জাহাজের পহেলা শ্রেণির যাত্রীরা (First Class Passengers on a Sinking Ship)। উপন্যাস নয়,গবেষণামূলক নিবন্ধ। বিষয়, ঐতিহাসিক সমাজতত্ত্ব। লেখক এক মার্কিন বিদ্বান, অধ্যাপক রিচার্ড লাখমান। এই বহিতে তাঁহার চমকপ্রদ পর্যবেক্ষণ হইল, দুনিয়ার বুকে মার্কিন দাদাগিরির দিন ঘনাইয়া আসিয়াছে। আধুনিকতম সামরিক প্রযুক্তির অধিকারী হইয়াও তাহাদের সেনাবাহিনি হালফিল এমন কি দুর্বলতম প্রতিপক্ষের সহিতও আঁটিয়া উঠিতে পারিতেছে না। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মুখে মার্কিন পুঁজিও দিকে দিকে মুখ থুবড়াইয়া পড়িতেছে। ফলে, দুনিয়ার যেকোনও বিষয়ে শেষ কথা বলিবার কর্তৃত্বের রাশ আলগা হইয়া পড়া ঠেকাইবার এলেম আর সে-দেশের নাই। অধিপতির তখত হইতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবশ্যম্ভাবী পতন তাই এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। বহিটি জানুয়ারি ২০২০তে প্রকাশিত। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অতিমারি তখনও মার্কিন মুলুকে থাবা বসায় নাই। তাহার পর পরিস্থিতি কোথায় পঁহুছিয়াছে, তাহা আমরা রোজই দেখিতেছি। দুনিয়ার ‘উন্নততম’ দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবার এমন নাজুক হাল!উন্নতির সূচক কি শুধু অস্ত্র উৎপাদন?

   লাখমান সাহেবের মাথায় ফুল-চন্দন পড়ুক, চাকা কি সত্যই ঘুরিতেছে? নিজ নিজ দেশের জিডিপির ৪% সামরিক খাতে বরাদ্দ করিবার মার্কিন হুকুমত ইতোমধ্যেই ন্যাটোভুক্ত দেশগুলি অগ্রাহ্য করিয়াছে। এমন কি ২০১৯এ ২৮টির মধ্যে মাত্র ৯টি দেশ প্রস্তাবিত ২% অর্থ গোলা-বারুদ বোমা-বন্দুকের পিছনে বরাদ্দ করিতে পারিয়াছে। আন্তর্জাতক অতিমারির ফলে এই খাতে খরচ আরও কমিবে বলিয়া ‘আশংকা’। ইহা হইতে সুসংবাদ আর কী হইতে পারে!

   কয়েক লক্ষ মৃত্যুর ভিতর দিয়া তবে কি এমন একটি সম্ভাবনা জাগিতেছে, যে, প্রকৃতির কর্তাসত্তা মানিয়া লইবার বুঝ এইবার গজাইবে মানুষের? প্রকৃতিকে মান্যতা দেওয়ায় কি মানুষের পরাভব? কেনই বা তাহা হইবে! মানুষ তো প্রকৃতিরই অংশ। এইটি ভুলিবার শুরু জীবাশ্ম-জ্বালানিভিত্তিক সভ্যতার শুরু হইতে। যত জলদি সম্ভব সেই সভ্যতার অন্তর্জলী শুরু হউক।

   করোনা সংক্রমণকে জয় করিয়া আসা স্পেনের প্রবীণতম নারী, প্রণম্য মারিয়া ব্রান্যাস (১১৩)-এর কয়েকটি কথা এই সূত্রে আমাদের কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল। তাঁহার নিভৃতবাসের কক্ষ হইতে দুনিয়ার মানবতার উদ্দেশে তিনি লিখিলেন – ‘ কিছুই আর ঠিক আগের মতো চলিবে না। পুনর্বিন্যাস, পুনরুদ্ধার, পুনর্নির্মাণ – এসব কথা আর মাথায় আনিয়ো না। পুরাদস্তুর নতুন করিয়া আর অন্যরকমভাবে সবকিছু করিতে হইবে। … তোমাদের চাই একটি নতুন ব্যবস্থাপনা। মূল্যবোধ আর প্রাথমিকতাগুলি যেভাবে সাজানো আছে তাহার স্তরবিন্যাসে চাই বদল। চাই, একটি নয়া মানবতার যুগ …’

মুক্তি চাই   

        

বহু-র রংধনুক আঁকা প্রান্তর হইতে আবার ফিরিয়া আসিতে হয় এক-এর বিরান কুঠুরিতে। সমস্ত না-বলা না-গড়া কথাগুলি সেখানে বাষ্পরুদ্ধ হইয়া পড়িয়া আছে। গ্রেটা থুনবার্গ, রিচার্ড লাখমান, মারিয়া ব্রান্যাস – রঙিন ঘুড়ির মতো এইসব নামগুলি কখন হারাইয়া গিয়াছে আসমানের প্রান্তে প্রান্তে। হারাইয়া গিয়াছে আমার সেই বন্ধুও। যে আসিয়া কাঁধে হাত রাখিলে ফিসফিস করিয়া শুধাইতাম – তোমার পরামর্শের আওতায় কি নাজায়েজ কিছু আছে? সড়কে রেলপথে অনশনে পথশ্রমে পরিযায়ীদের বেশুমার মৃত্যুগুলির সামনে আমরা কী ভাষায় কথা কহিব? পরাণসখা বন্ধু হে আমার, যদি তুমি নিরুত্তর, তবে অক্ষরের ব্যর্থতা মানিয়া লই আজ। স্বীকার করি, এই নিভৃতবাস আসলেই এক বিলাসিতা মাত্র। যেমন চন্দ্রযান মঙ্গলযান বুধযান হীনযান মহাযান। এই শ্বাসরোধী সৌন্দর্য হইতে আজ মুক্তি চায় বাক্য। চায়, হাড়ে হাড়ে বাজিয়া উঠুক আদিমতম কর্কশ এক গান। হাড়ে হাড়ে চিনিয়া লইয়ো তাহারে।

12 Replies to “

নিভৃতবাসের কড়চা

গৌতম চৌধুরী


  1. নৌকা নাকি সাঁতার সব থেকে ভাল লাগল ।

  2. অভিভূত আমি!
    এমন ভাবেও তবে এই ভয়ংকরকে দেখা যায়!

  3. আরো একটা মাস্টারপিস এই ‘ নিভৃতবাসের কড়চা’। এই প্রথম মনে হল লকডাউনও মাঝেমধ্যে জরুরী।

  4. অসামান্য এই লেখা। বেশ কয়েকবার পড়লাম। গৌতমদা, আপনাকে প্রণাম। ছিন্নভিন্ন সময়ে একটু আশ্রয়

  5. অনেক দিন পর এবঙ্গের কোনো বাঙালি কবির রচনায় বড়ো ভাবনার নির্যাস লক্ষ করে ভালো লাগল। অন্তত বিশ্বব্যাপী সংকটের সময়ও যে চিন্তা যথেষ্টই মূলীভূত এবং তার পরিসর আরও ব্যাপ্ত হতে পেরেছে, সেটাই টের পাওয়া গেল বিশেষ মুদ্রাঙ্কিত গদ্যে গৌতম চৌধুরীর আপনকথায়।
    –রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়(উত্তরপাড়া,হুগলি)

  6. অসামান্য লেখা গৌতমদা। কতবার যে পড়লাম। এ লেখার কাছে শুধু বসে থাকার সৌভাগ্য হয়েছে একজন্মে… আর কী চাই!

  7. অসামান্য লেখা গৌতমদা। এই লেখার কাছে বসে থাকার সৌভাগ্য হয়েছে একজন্মে। আর কী চাই!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *