গুচ্ছ কবিতা

রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়


১।

ঝর্ণার সমস্ত জল ঝরে যায়

হ্রদ হয় না।

পরিবর্তে

শিশুর মত চারপায়ে

যারা উঠে আসে

ভূপৃষ্ঠ দেখেনি কোনদিন।

পরম স্নেহে বুকের আঁচল

সরিয়ে ডাকো-

ওরা ভূতলে ফিরে যায়

খাদ গভীর হয়

জল ঝরে

হ্রদ হয় না।

 

২।

এখানে বহুকাল কেউ জন্মায়নি।

যাদের কান্না শুনছ

তারা ভবিষ্যতে

গাছ দেখে উদ্ভিদ লেখা শিখবে।

তুমি ফিরে যাও ঘুমে-

অঙ্কুরোদগমের বৃষ্টি এখনো আসেনি।

আমি ততদিন

এসবকিছু টুকে রাখছি খাতায় …

 

আজকের খবরে লিখেছি যেমন-

“গ্রীষ্মের ছুটিতে এখানে মানুষ

মরা কুকুর ফেলে রেখে যায়।”

 

৩।

ঘরবদলের সময় প্রত‍্যেকে

কিছু চিন্হ রেখে যায়-

আয়নার পিছনের অস্পৃষ্ট দেওয়াল,

ছড়ানো পেরেক, রান্নাঘরে

তেলের ছিট-

পুরনো দাগ বিচার করে

বর্তমান তার স্পর্শ বুঝে নেয়।

 

সমস্ত শূন‍্যস্থান পূরণ হলে ডেকো-

আসব।

আমি –

তোমার শেষ ভাড়াটে।

 

৪।

তোমায় নিয়ে লিখতে পারিনি এখনও।

ঘিরে থাকা নিয়ে লিখেছি

বন্দীত্বপ্রিয় আসামীর মত

কারাগার প্রাচীরের দিকে তাকিয়ে-

নিরাপদ দূরত্বে।

 

তোমায় নিয়ে লিখতে পারেনি

এমন অনেকে চাষীদের কথা লেখে।

 

উঠে আসি। এসময়

বারান্দা থেকে লোকাল দেখা যায়-

তোমায় নিয়ে লিখতে না পেরে

ওরা বাড়ি ফেরে।

 

৫।

দুঃখ পুরনো হলে

হলদে-পাতা ব‌ইয়ের মত

খুলে পড়া যায়-

দুটো পাতা হয়তো

আরশোলার লালায়

আঁকড়ে ধরেছে একে অপরকে- তুমি

অপরিসীম স্নেহে ছাড়িয়ে নিলে, কিম্বা

উইপোকায় কাটা তোমার

প্রথম চাহনির ভেতর উঁকি দেয়

কয়েক পাতা পরের চুম্বন।

দুঃখ পুরনো হলে

যেখানে খুশি শুরু করা যায়-

তোমার কয়েক পাতা বুকের গন্ধ

পুরনো হতে হতে

ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত পাতায়।

 

৬।

আজকাল

আমাদের দুঃখগুলো

বাঁদিকের পাতা শূন্য রেখে

ডানদিকের পাতায় লেখার মত-

বিলাস মনে হয়।

 

৭।

দূরে সরে গেলে

চৌম্বক বলরেখার মত

ফুটে উঠি কাগজে-

সাধারণ লাভের হিসেবে যেমন

কৃষকের হাতে ওঠে কীটনাশক –

ফসলের প্রতি তার

আর ভালোবাসা নেই, সে

সময় তুমি দাওনি-

প্রেমদিবসের প্রকৃত প্রেমের মত

অর্গ‍্যানিক ফার্মিং বেছে নিয়েছ।

 

৮।

প্রাচীন সভ‍্যতার প্রমাণ

আগাছা জড়িয়ে

গাছ বলে ভ্রম হলে

ফুল তুলতে কাছে আসো,

যে শাখা তোমার দিকে এগিয়েছে

তার বুকে এই পাথরের হাত …

 

ছুঁয়ে জানাও

আমি জীবিত।

 

৯।

জ্বর বাড়লে

সমস্ত লেখায় ছন্দ নামে।

উত্তাপ ভাঙতে

গায়ের লোম খাড়া হয়-

কাঁপুনি দিয়ে জানোয়ারে পরিণত হই।

অন্ধকারে তোমার দেহজ তাপ চিনে এগোই-

সহজাত প্রবৃত্তিবশত বুঝতে পারি

কোথায় দাঁতের চাপ দিতে হবে-

অথচ, বাধা দাও না।

শিকারের এই আচরণে

অভ্যস্ত নই, তাই শুঁকে দেখি

চুল,চিবুক,স্তন … জরায়ু-তে পৌঁছে

চিনতে পারি উৎস,

মানুষের চোখে দেখি তোমার চোখ … কয়েক মুহূর্ত।

তারপর

দাঁত বসাই।

 

১০।

অঙ্কের হিসেবে

তোমার চলে যাওয়ার লেখা

তোমার কাছে পৌঁছবে না।

অভিকর্ষ ছাড়িয়ে উঠে গেলে

পিছিয়ে পড়া শব্দগুলো

ছাই হয়ে ঝরবে-

এক এক করে

আমরা দেখব পুড়ে যাওয়া,

এক এক করে

ছোটদের শেখাব তারাখসা!

 

১১।

উপহার

 

কিছুদিন পর

রাস্তা সয়ে এলে

কেবল গন্তব্যের হাতছানি রয়ে যায়-

ধীরে হাঁটা যায় না।

আমার সমস্ত চেনা রাস্তায়

দু’ দন্ড অপেক্ষা থাকল

তোমার জন্য।

 

১২।

আবারও বাঁধের পথে হেঁটে যাই,

এবং সাদা কাশ

যেন মানুষ

বৃদ্ধ হতে হতে

ছড়িয়ে পড়েছে মাঠে-

পাশে নদী

তর্পণের অপেক্ষায়।

এ নদী লাল জানে না

সমস্ত মৃতদেহ সাদা হয়ে শুয়ে।

বর্ষা আসতে দেরি-

পুনর্জন্মে নদীও জোয়ান শরীর খোঁজে।

 

ফিরে আসতে শুনি

কেউ প্রশ্ন করছে-

‘এখানে শ্রাদ্ধ-অনুষ্ঠান হয় নাকি?’

 

১৩।

কৃষ্ণগহ্বরের মত এগিয়ে আসো-

মুখে গিলে ফেলা নক্ষত্রের হাসি

মোছেনি তখনো।

তোমার সমস্ত প্রেমিক

তোমার হাতে খুন হয়েছে।

তুমি একা-

নক্ষত্র নয়

এখন

কোন কৃষ্ণগহ্বরের অপেক্ষায়।

 

১৪।

এখান থেকে তোমায় দেখা যায় না।

কোন বাড়ির আড়াল পড়েছে

কিম্বা সম্পর্কের …

কত সহজে এসব মনে আসে।

অথচ ভুলে যাই

ব্রম্ভান্ডের সমস্ত কিছু প্রতি মুহূর্তে

একে অপরের থেকে দূরে ছুটে চলেছে-

যাবার জন্যে আড়ালের প্রয়োজন নেই

ফিরে না তাকালেও তোমায় যেতেই হত।

 

১৫।

শয়তানের সাথে সওদা করে

প্রশ্ন তোলা যায়না –

“আমি কার?”

 

বলেছিলে-

তোমার মতো করে তুমি

বুঝে নেবে অন্ধকার।

 

১৬।

নারীর মতো

প্রতি সম্পর্কের

প্রথম ঋতু আসে,

যার পর

আর কোন কিছুই এক থাকে না।

 

১৭।

না চাইতেই আজকাল

ফিরে যেতে পারি তোমার ছবিতে-

পুরনো, নতুন- তেমন

অসুবিধে হয় না আর।

নাবিক যেভাবে মাঝসমুদ্রে ফিরে যেতে পারে

বন্দরের কাছে, সে কি ছবি দেখে?

সে ছবি হয়তো নোনা জল খেয়ে

মুখ বোঝা যায় না আর,

শুধু জানান দেয়- তুমি আছো। এটুকুই।

এটুকু জেনেই ফের প্রমাণ করে  ফেলা যায়

পৃথিবী গোলাকার।

 

১৮।

আমার নীল বোতলে, জল

এক লিটারের কিছু কম ধরে।

তাতে ওর কিছু যায় আসে না,

মাপকাঠি আমার।

 

বোতলের মুখ

আমার ঠোঁটে অভ্যস্ত,

নারীর স্পর্শ পায়নি বলে

নিরুত্তাপ। জানি-

সে চাহিদাও আমার।

 

বোতলের জল,

দরকারমত বাড়ে -কমে।

অন্যের প্রয়োজনে

গভীরতার এই তারতম্য

যেন খুব স্বাভাবিক-

এভাবে মেনে নেয়।

 

জীব ও জড়ের সম্পর্ক – যেভাবে

শেখানো হয়

ততটা সাদাকালো নয়,

আনুগত্যে

কিছুটা আঘাতপ্রবণ, নীল।

 

১৯।

দু’ সপ্তাহ হল, আমি

ও আমার দুঃখ একসাথে

ঘর করছি।

সকালে ওর মুখ দেখে উঠি,

বেরোবার আগে বলে যাই-

অপেক্ষা কোরো।

কাজের মাঝে মুখ ভাসে-

অন্যমনস্ক হই, লোকে শুধলে

ছবি বের করে বলি, আমার দুঃখ!

বিকেলে ফিরে বসি মুখোমুখি-

যে যার জগত ভাগ করে নিই,

করতে করতে ঘন হয়ে আসি,

সংসারের পবিত্র আলিঙ্গনে আবদ্ধ হই-

গহন কালো শিখা ওঠে আকাশে …

সুখের আঘাত থেকে দূরে … আরও দূরে।

ও আমার দুঃখ, আমরা আশ্রয় ভালোবাসি।

 

২০।

ধোঁয়ায় হেঁটে কিংবা

ধোঁয়ার মত করে ফিরি

পাশে, স্বপ্নের সারমেয়।

হয়তো ঘুম আসেনা প্রতিদিন

ভালোবাসা

দূরাগত বর্ষণের মত

বৃদ্ধ করে,

ভিক্ষুকের হাতের ন্যায়

প্রসারিত হলে, তবে

কখনো আসে প্রেম।

 

শুরুতে ব্যথা কবিতার আকার নেয়।
সমস্তই কবিতা
এ উপলব্ধি আসে পরে।

জন্ম ১৯৮৮। ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করে বর্তমানে গবেষণারত। যুক্তি এবং শিল্পের অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক ধরা পড়ে কবিতায়। অনুভূতির বৈচিত্রের চেয়ে সত্যতায় বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *