গুচ্ছ কবিতা

সাম্যব্রত জোয়ারদার


নির্বাচিত অংশের প্রতি

 

এই রাস্তার একটা দিক ডাঙ্গে সাহেবের। পথিকের আরও খানিকটা ফাঁসিদেওয়া, খড়িবাড়ি খড়িবাড়ি সিট খালি আছে। ওই পথে কী একটা পাখি ভাই দ্যাখ মেঘরঙা। শহিদ বেদির পাশে পিছনে দু’হাতমোড়া এক কিশোর। শাল-সেগুনের মুখে অল্প অল্প দাড়ি। সাদা কালো রিল ছবি রেণু ও কনিকা। গার্ডের পতাকা আভা রোদ ঠেলে মালখানা ঘর মিটারগেজের লাইন। চিত্তপ্রসাদের ছবি কাঠখোদাই কাজ। বেড়ার ঘরের পাশে আগুন পোহাচ্ছে রাতে নেপচুন বাগান।

 

কবিতাকে নির্বাসন দিয়ে মার্কসের মজুরি আর পাতকুয়োর ভিতর খোঁড়াখুঁড়ির গভীর ধান্দায়। সিস্টেম চালালে পরে তবেই রোজগার। জ্বর নেই, জ্বালা নেই। ভয় শুধু গোলাপি স্লিপের। মানের বালাই ভুলে দিনভর সিস্টেম চালাই। মালিকের ঘোড়াগুলি দানা খায়। হাটেবাজারের দিনে কিনে রাখি দাঁতখুঁচি। রাজহংসীর ডিম কিনি কয়েক ডজন।

 

মিস্টার ম্যাকডোনাল্ডের কুমির মেনশেভিকদের বিচার চেয়ে কয়েক পাঁইট রম উড়িয়েছে। যেভাবে আমি লিখছি অন্ধদের তৈরি ধূপকাঠির কথা। মোমবাতি বিক্রেতার বিসর্জন আর হাতেটানা রিকশার স্কচালো গলি। লেফটেন্যান্ট সন্ডার্স আমাকে বাঁশবাগানে নিয়ে চলুন। বাদুড় সর্বস্ব কমরেড আমার জন্য রক্তদান শিবির, প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। আয়োজনের ত্রুটি রাখবেন না। যতীন দাস কলোনি আজ শিকলে শিকলে সেজে উঠেছে। লে পাগলু ডান্স ডান্স ডান্স। তেষট্টি দিনের অনশন শেষে আজ উনি তিরোধানে। অন্ধ। পঙ্গু। হাড্ডি সারাৎসার। শোক মিছিলের মাথা গুনছেন ভোটের বাবুরা।

 

কালাশনিকভের মতো এই আমার হাতিয়ার। যা আমি তুলে দিতে চাই বিরোধীদের হাতে। হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে চাই বাংলা লিরিকের কাছে। চরণে সেবার কাজে সহজ সরল ভাষায় লিখে রাখতে চাই বর্ধমান জেলায় প্রতি একর ধান উৎপাদনের কথা। শিকড়ের ভাষায় যেন লিখতে পারি কয়েক ফোঁটা লবণক্ষমতা। কুয়াশাবুড়ির মতো উবু হয়ে বসে গ্রাম-বাংলার অন্ধকার। অনুবাদ করি তাকে পদাবলী কীর্তন মাধ্যমে।

 

স্টেশনের দিক থেকে মেঘ এলো এলো নির্বাসন। ফাঁকা মাঠ পার হয়ে কতদূর যেতে পারব হাতে আর মাত্র পড়ে মিনিট খানেক যোগাযোগ, ঘুমন্ত গ্রন্থাগারের নীচে ঝাপসা চশমার কাচে রিমোট ওড়ায় প্লেন নটিক্যালে ভাবি এঞ্জিনিয়র। হাসপাতালের ঘরে পোকা ওড়ে ভিজিটিং আওয়ারে হাতে মাত্র পড়ে থাকে মিনিট খানেক যোগাযোগ রোগীদের পথ্য নেই ওষুধেরও ডেট এক্সপায়ার্ড।

 

পকেটে আঙুল রেখে ঝিল পথ পার হয়ে যাই। বাঁদরলাঠির খেলা নির্বাচনে বলের জাগলিংয়ে, একটি বল সবসময় শূন্যে ঝুলে থাকে। নির্বাসন। সম্মোহনে সেই সূত্রে ভেজা টালি পুঁইয়ের মাচায় জড়িয়েছি। যেমন জড়িয়ে থাকে সুতোর টানের ভাঁজে আজন্ম পোড়েন তাঁতঘরে।

 

ঘুম ভেঙে উঠে বসি বিপন্ন মাস্তুল ভোঁয়ের শব্দের ঘোর ভোঁতা পেরেকের নিস্তব্ধতা। ঢেউহীন চরাচর পড়ে থাকে কবিতা সমগ্রে। ভারী মলাটের নীচে জলপথ, নাবিকেরা বিহারে চলেছে।

 

নির্বাচন সহ্য করি পরিখা কামান ঘেরা পরিত্যক্ত কেল্লার ভিতর নির্বাসিত শিকলে বাকলে বেঁধে রাখা কন্ঠনালি। বোবা স্বর, দেওয়ালে মশাল গাঁথা গোলাকার উজ্জ্বলতা শ্যাওলা-পথ বাকিটা দুর্ভেদ্য, পুরোন লেখার মধ্যে যেরকম পরাজিত নায়কের যুদ্ধসাজ পেরেকে টাঙানো।

 

লেখনি দুর্বোধ্য হচ্ছে শ্রাবণের তেলেঙ্গনা মাঠে ঘাঠে রোপনের কাজে, বীজতলা থেকে ধান চারাগাছ জড়ো করে রাখা। কাদা জল ঠেলে ঠেলে মেঘের বিস্তারে, স্বর শুদ্ধ মিঞা কি মল্হার কোমলতা, ওই পথে সাইকেলে খোঁপায় যারা সান্ধকালে নাকছাবি ফুলহার রচনা করেছে।

 

মরিনি রোদ্দুরে জলে ঝড়ে, পতঙ্গের জন্মে, আগাছার বীজ হয়ে এখনও মরিনি। ভুখমারি পার্টির হরতালে গাভীর মতন চরে, আলফালফা মেঘে খাটা পায়খানায়, তলপেটে ঢুকে যাওয়া ইদের চাঁদের ছুরি জুনেইদ এখনও মরিনি।

 

দীর্ঘশ্বাস হাওয়ার নফসে দেবদারু, রুহ্ কি সুস্থতার স্যানিটরিয়াম ঘষা মাজা কাচ, স্নান সেরে চিরুনির সিঁথি, লিউকোমিয়ার ভোরে নল গিলতে বাধ্য হচ্ছে আরেকটু আরেকটু চাপ— যন্ত্রণায় মর্নিং শিফটের ভোঁ বালিশের নীচে চাপা রক্তফুল এমব্রয়ডারির, ভিজিটিং আওয়ার্স যায় আপেল কমলা ঘিরে পোকা ধরা রোদ মরতে থাকে।

 

ক্রেনের সারস খায় মৃত মাছ কয়লার দেহ। কামড়ে মাড়িয়ে চাটে ক্রলারের বেল্ট বর্জ্য, মুনাফার পাখা ঘোরে হতোদ্যম। বিজলি সড়ক পানি বিনিদ্রার কুয়া। আধাপেটা শেষরাতে রক্তমাখা ফ্রক তারার মতন জ্বলে খনি অঞ্চলের কুয়াশাপরীরা চাদর জড়িয়ে বুঝি নামে, উড়ে যায় ভোরে পিরিয়ডের সেদিন।

 

বালির তলায় পোড়া বারুদের রাখ্— প্রত্যাখ্যান অনুরাধা হরিজন মেয়ে, পিরিয়ড শুরু হলে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। নির্জন দ্বীপের চিঠি ভেসে আসে বোতলের পেটে, এসওএস এসওএস পলকের নীচে আরও কিছুদিন থেকে যেতে চেয়ে লিখেছিল দাঁত-উঁচু কালোমানুষেরা, অনুরাধা কার ঘরে কার যে দুয়ার খুলে রাখে।

 

ধুলোপড়া ডাকটিকিট— ভগবান রোগমুক্ত রোদ্দুর ও ফোকটের ভিটামিন ডি— ভীষণ পহেলওয়ান আল্লাহ্তালাও নিরাকার, তাঁর কোনও ছবি নাই স্ট্যাম্পছাপ নাই, তবে চিঠি আছে প্রকাশক নিশ্চয়ই পৌঁছে দেবে ডাকব্যবস্থার কল্যাণে উহাদের গান্ধিজির পোলিওমুক্ত দেশে, কারখানা শ্রমিকের তালাপড়া গেট জো হুজুরের কৃপা খুলে যাবে বোনাসের দিন তারাভরা জংধরা রাতের গভীরে।

 

এলিট ক্লাসের বিভূতির ম্যানুফ্যাকচারিং বোধ— পুরোভাগে জমি দখলের পূর্ণ স্বরাজ, ক্ষয় নেই হে রাজন ভয় নাই জনসংখ্যায়, অন্ধজনে চালাও কামান জয় করো পুনঃপুনঃ বর্ডারের দিক।

 

শুধু তোমাকেই বলতে পারি এসমস্ত মাত্রাছাড়া যদিও এখন নিরক্ষর জৈষ্ঠ্যে এমনকি শ্রাবনেও শরীরে লবণ জমে ওঠে একা ঘর বাঁশের বেড়ায় ওই পতঙ্গেরা শব্দ করে মাটির উপরে ছায়া বড় হয় উড়োজাহাজের।

 

জাতীয় আয়ের পাতকুয়া সিঁড়ি গুনে গুনে নামে। জনসংখ্যা ভাবে মিলিটারি যুদ্ধ যাবে, স্বামী-স্ত্রীর বনিবনা অগ্নিদগ্ধ হবে না কক্ষণও। কপিকল নেই, খালি বালতির দড়ি নাগরদোলায় ওঠে প্রমোশন হাতছানি দেয়, জাতীয় ব্যয়ের মূর্তি দেশনায়কেরা হেঁইয়া হো হেঁইয়া হো ম্যারাপে টাঙায়।

 

এ লেখার প্ররোচনা নেই, ব্যক্তিগত কেউ কেউ বলবেন সম্পদের অর্ধেকের বেশি বাংলা কবিতার… তবু বলি— বিমারি ভুখমারি অওর মওত, হম্রী হাত নহী হ্যায় ম্যানিজারসাব। হুগলি নদীর তীরে পতাকা ছোপান হয় সারারাত, শিফটের বারনার জ্বলে।

 

মূলধন আমার খনি প্রতিষ্ঠার বহু আকরিক। তবু ফলিডল খায় নিমাই সরকার। ভরদুপুরে ক্যারম খেলে কর্মহীন মজদুর। দেশ আরও ততোধিক দেশে হাটে ও বাজারে পোকামারা বিষ বিক্রয়কেন্দ্রগুলি— কৃষকের ঘুম চুরি করে, এ’বছর বিক্রি নেই হিমঘর থেকে আলু ছড়িয়েছে পথে।

 

দৈনিক পত্রিকা বিক্রি কমে যাচ্ছে কমরেড, শোনো লক্ষমাত্রা ঠিক রাখো ছাড়ো অহেতুক ঝোঁক, জেলা তহবিল থেকে লোন ব্যবস্থাও হয়ে যাবে, ঠিকা শ্রমিকের দলে সংগঠন কেন নয় মজবুত, না কমরেড এখনই আপনাদের হাতে পিস্তল তুলে দিতে পারছি না, দৈনিক কর্মকাণ্ডে মিটিং মিছিল জমায়েত নির্বাচন নির্বাচন আরও কিছু নির্বাচন পর হে মার্কেটর শ্রমের আগুন—  প্রকৃত কমিউনিস্টের কাছে হতাশার কোনও স্থান নেই, তাই চিঠি লিখে যেতে হবে দূর কোলিয়ারি চাবাগান থেকে— ভাল আছি শ্রদ্ধাস্পদেষু ও মাননীয়।

 

এইবার নাচ শুরু মাথা খাড়াইয়া হাঁটবার, জানি পানিট্যাঙ্কি বহুদূর— আত্মজীবনীর অংশে এইবার পার হতে হবে সাঁকো বর্ষাডুবি, ওই বুঝি বরানগরের গলি কিশোর অষ্টার লাশ আঁচলে জড়িয়ে ঢিমনি ও বেবুশ্যেরা নাচ শুরু করে দেবে— কিন্তু ঢিমনি বনাইল কেডা, বচ্ছরভর বানভাসি বন্যায় কারা শালা ব্যারাজের গেট খুলে দেয়।

 

এসেছি হরতাল দিনে গণভোট পার করে বিড়ির দোকানে মার খাওয়া সরকারি বাসের ড্রাইভার জীবনবিমার রক্ত জামার হাতায় মুছে অস্ত্রবিরতির পর ডিপোর স্টার্টারে প্রফেসর এই দেখুন কুড়িয়ে এনেছি প্রস্তরযুগের অস্ত্র থানইট।

 

উনুন পর্যন্ত রাত দীর্ঘ গড়িয়েছে, হতে পারে যে দিকে কয়লাঘর পেচ্ছাপের কষ্ট শিরদাঁড়া ঝুঁকে আসা কোনও প্রান্তরের চোয়ালের হাড়-উঁচু নীলকাজলের মানুষেরা ঝাঁঝরির চুলে ঘৃ্ণ্য জড়িয়ে পাকিয়ে বেঁচে আছে এ’জন্মের কীটের জীবনে মায়েরা সেলাই করছে পুষ্টি নেই স্নেহ নেই যুদ্ধে গেছে ছেলে।

 

হতে পারে যে কোনও রাত সারপেনটাইন কানাগলি— দরজায় দরজায় লাথি বেলেঘাটা রেলব্রিজ থেকে বরাহনগর ব্ল্যাকআউট ছুরি গাঁথা মাংসের অসহ্য আলোয় হতে পারে টেনে হিঁচড়ে বের করে ফ্রিজারের অন্ত্রনালি— কী মাংস ধর্ম কী পাকস্থলির অলিগলি পিনকোড একশো-সাত ঘেঁটে হাতুড়ি ও তারাভরা গ্রন্থাগার তুলে এনে হতে পারে যে কোনও রাতেই এনকাউন্টারের নামে বই পোড়ানোর দাউদাউ উল্লাস হতে পারে বিচারবিভাগ কমিশন হতে পারে প্যারেড সাবাশি।

 

রথের চাকার নীচে কলেরা ও ডায়ারিয়া বীজ, গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কুষ্ঠে ওড়ে মাছি, দরগার মানতের কাছে পরিস্রুত পানি চাই আরও যা চাই কখনও পৌঁছিও এসে পদব্রজে অযোধ্যানগর থেকে শহরের ডাক্তারবাবুরা প্রসব বেদনায় দিও আরামের বাজেট ভাষণ।

 

বিশ্বাসঘাতক ছিল না কোনওদিন ছেনি হাতুড়িরা, তারাভরা রাত মেশিনারি। যন্ত্রপাতি পুঁথি পড়ে মার্ক্স-মিশনের থেকে যাঁরা সদ্য এসেছেন গ্রামাঞ্চলে, লেটুসপাতার চাষ সম্ভাবনা নিয়ে, কথা ছিল জমির লড়াইকে সমর্থন। কিন্তু পাহাড় ডিঙোনর পথে জল্লাদের আঁশবটি জেনারেল ডায়ার, লেটুসপাতার গায়ে লিখে দিল— সংশোধনবাদ। শিশুদের রক্তমাখা কবরের গ্রাম লিখে দিল: পার্লামেন্ট দেওয়াল উন্মাদের মতন হাসে, হাসতে হাসতে এগিয়ে আসে, মৃত্যুভয় তাড়া করে ক্ষতবিক্ষত হাসপাতালের ছায়াগলি তক— আলতা মাখা তুলো, চেয়ারম্যানের টেলিফোন একটানা রিং হয়ে যায়…

 

মেঘের নিমন্ত্রণ ছিল না, সময়ে অসময়ে তবু বৃষ্টি-নির্ভর দেশে হাওয়ামোরগের স্ববিরোধিতাগুলি—  কৃষকেরা মুড়িতরকারি সামান্য ফুর্তির মদ মজুরি পেয়েছে দৈনিক, মেলামাঠে হেরেছে জুয়ায়। চরাচরে মেঘচাষ বাসগুমটি বুনোফুল আগাছা জঙ্গল—  দুর্ঘটনার চাকা জড়িয়েছে।

 

বলেছিল খাজনা মকুব নির্বাচনী হাওয়া ইশতাহারে, সুরিন্দর তোমার ছুরিকে বলেছিল খানিক লম্পট হও খালাসিটোলার শনিবারে পরিশ্রমে ঝকঝকে ধারাল মেদহীন গেলাসে গেলাসে গাঢ়-নীল কোহলের তর্জমায় ঝাঁঝাঁলো ইতরবুদ্ধি থুতুগেলা মানুষেরা কান্ট্রিরোডের গানে ঘরে ফেরেনি বহুদিন, রেলব্রিজের মাথায় চুলওঠা অতিকায় চাঁদ কত কি তারিখ পার করে সুরিন্দর তোমার ছুরিও আজ আহতের কথা বলে খিদে চেপে রাখে।

 

এইসব পেডিগ্রিহীন গলাধাক্কা খাওয়া মানুষরা পাথর ভাঙার কাজে লেগেছিল, আদরের জন্য হেঁটেছিল এক সভ্যতা বন্দর থেকে অন্য এক ভবঘুরে সভ্যতায়। দূরত্ব ও ব্যবধান ছিল শিলান্যাস ও রেলসেতু গড়ার ফারাকে।

 

মাথার পিছনে টান শ্যাওলা জুন মাস নোনাধরা সাম্পানের মাঝি, তো ব্যাপারটা দাঁড়াল এরকম—  ধরা যাক কর্ণফুলির নদী বৃষ্টিমাসে আবছা হয়ে গেছে, হলুদ মথের পাখা দেখলেই মনে পড়ে মারুবেহাগের দিকভ্রষ্ট দিওয়ানার আলাপচারিতা রেডারের থেকে মুছে গেছে সেই সবদিন, রাতও।

 

প্রশ্ন করছি তাই কীভাবে জন্মেছিলাম ইওর অনার, মহামান্য আদালত হারিকেনের আলোয় যখন ঢুলে আসত চোখ ঝিঁঝিঁডাকের চোরাপথে যখন ইভান যেত রাত পাহারায় আর গমখেতের উপর দিয়ে হেলবপ আগুনের জিভ যুদ্ধের ড্রাগন রাক্ষস খোক্কস দানো দুয়োরানির ঘরে কীভাবে জন্মেছিলাম ওহ্ মাই লর্ড কালো মেয়েদের নাভি ছিঁড়ে।

 

খনি শ্রমিকের শিরস্ত্রাণ ব্যাটারির হলদেটে আলোয় যা দেখতে পাওয়া গেছে— গরমের তাপে সর্দিজ্বর, এ’বছর কুলিং মেশিন কয়েলের ফ্যানবেল্ট ছিঁড়ে তাপমাত্রা ক্রমে শ্বাসরোধকারী প্রোডাকশন পড়েছে বিক্রি-বাট্টা কম তবু জান দিয়ে ওভারটাইমে খেটে— অগ্নিপথ আগুন লাগানো খুর বাজারের প্রতিযোগিতায় এই হাত যতদিন থাকবে ঠাকুর এই হাত যতদিন।

 

ধাবমান অস্ত্র সব তাক করা শহর। ভেঙে পড়া জলাধার বিষ নলকূপ। কৃষিখেত নদী ও জঙ্গল, পাতা কুড়নোর পর শুকনো ডালের যে উনুন তিন-মাথা তাও ভাঙা ছারখার। প্রার্থনাগৃহের মোম আর্তি সমবেত, নিভে গিয়ে জনপদ খালি করা নগ্ন শিশুদের সাইরেন, হিংস্রতা কিম ফুকের যোনির ভিতর ম্যানহাটন প্রকল্পের জার্নি অফ ডেথ, প্লুটোনিয়ম মৃত্যু তুমি প্লুটোর দেবতা—  সমুদ্রের জল ফুলে উঠে পরক্ষণে চোখ বেঁধে দেওয়া কানামাছি, অন্ধকার উন্মাদের মত আলুথালু মারছে আর প্রশ্ন করছে নিষিদ্ধ ফরমুলা, সিরিঞ্জ পুশের পর লকাপের ভিতর মারছে পায়ুদ্বারে নার্ভাস গ্যাসের নল, অক্ষিগোলক স্কন্ধকাটা ধড় আঁচড়াচ্ছে শবাধার… বর্ডারের পর বর্ডার আবিষ্কার করছে হে যুদ্ধলোভী লোলচর্ম নায়কেরা।

 

রসদ ফুরিয়ে আসে ওষুধপত্রও, সাপ্লাই লাইন কাটা গেরিলারা ঘাঁটি গেড়ে তাও পড়ে আছে— ম্যালারিয়া বর্ষায় জলবাহিত রোগের ভিতর। কৃষিকাজ ফেলে রেখে ভলানটিয়র, ডেটল গন্ধের মধ্যে মাকে লিখি— যদিও জানি না ডাকবাহকেরা আজও সাইকেল ম্যাপের দুপুরে এ’খবর দেশগ্রামে পৌঁছে দেবে কিনা, নাকি এবছরও বেতন বাড়েনি ফলে ধর্মঘট… অনেকটা দূর পথ সাবান কাচার সংসারে চশমার পাওয়ার ঠিক নেই, কীযে লেখা আছে ছাই পড়ে দেখি— চিন্তা কোরো না মা ব্যাটেলিয়ন লড়ে যাবে দাঁতে দাঁত দেশের অবস্থা ভাল না।

 

গান স্যালুটের দেশ—  বিউগলে মুছে গেছে সুরমা কাজল, জলের শপথে রাগে মায়েরা ট্রিগার চাপে সন্তানের মুখে চুমা খায় শেষবার অস্ত্রহীন মাথা নিচু আখরোট গাছের পাতা জোহরার বিলাপের মত ঝরে।

 

যে রাতে দুয়ারগুলি ঝড়ে জলে মেঘে ঢেকে যায়। তরবারি ক্ষিপ্র খোলা পাল্লাহাট রাত। মালতির জনপদে বুড়োভাম শিশুদেহ খোঁজে। যে রাতে দুয়ারগুলি চালেডালে মাখা আলুভোজী পরিবার। নিভু ডুম মাদুরে সাজিয়ে রাখে জিরা ফোড়নের গন্ধমাখা, হাজারো দুয়ারি মাঠ আশ্রয়বিহীন। যে রাতে হাঘরে এস ধূলি দাও চরণের একা মুসাফির। চাবুকের কাঁটাদাগ পিঠ বরাবর, ডোরাকাটা জেব্রাঘাম পথিকেরা এস। হিসেবনিকেশ ছিঁড়ে হল্লা বেসামাল সমবেত হয়ে যাক খেউড়গীতিতে, ধসে যাক যাবতীয় চৌকাঠের তৃতীয় প্রহর। সিঁড়ির তলানি বেয়ে শহরের পেটে, আহা সেই লাট খাওয়া লাটিমবাজির যে রাত যে প্রসূতিসদন থেকে আওয়ারা রাহীর প্রতিধ্বনি, ভ্যাগাবন্ড সাবওয়ে যৌনগ্রাফিত্তির কেশরের জন্মদ্বার, মাগো কালী জিভ— তীরচিহ্ন যোগফল হ্যান্ডবিল শ্মশানগোঙানি, আর্তনাদের উৎসব, সেবাদাসী চাঁদ পশ্চিম আকাশের কোনও পেরেকের কাঁধে ঝুলে ফেনামাখা আলো বলে যায় বারংবার, যেন তার প্রবেশাধিকার নেই কোনও শুদ্ধপঞ্জি নহবতখানায়।

 

হরিজন চায়ের দোকান ভোর নাম গোত্রহীন। পিচরাস্তা তৈয়ারির তাঁবুগুলি কাসির দমকে ধোঁয়া ওঠে। ইটের উনুনে আঁচ তখনও জ্বলেছে ধিকিধকি। ফিরে গেছে ট্রামশ্রমিকেরা মুসাফির চাবুকের দাগটানা ভোর বরাবর।

 

এই হল আমার দেশ কবিতা প্রলাপ, ঘুমন্ত অবস্থায় পুলিশের লাথি। নাপিত ধোপাদের পরছা ওয়ারেন্ট লাগে না। সালিশি সভার টিকিধারী পঞ্চায়েত, হলুদ দাঁতের মোড়লেরা, বলেছে প্যারেড কর, নাঙ্গা কর, গ্রামে গ্রামে ঘোর শালা পিছনে পিছনে ঘেয়ো কুকুরেরা— এই তোরা ভিডিও কর-ফটো কর-ল্যাংটো ছবি তোল: এই হল আমার লেখা কবিতাপ্রলাপ কবিযশোপ্রার্থনাও এই।

 

অথবা চেরেনোবিল রিঅ্যাক্টার ফোর চুলমাংসগলাজ্বালাপোড়া রেডিও অ্যাক্টিভ নেড়াগাছ—  ওহ্ মাই গড হোলিফাক বিকলাঙ্গ ফসলের বীজ, স্কিন গ্রাফটিংয়ের পর স্কিন গ্রাফটিং, কুড়ানকুলামে সরকার মাইবাপ মাইকিংয়ে বলে গেছে কুলিং মেশিন রক্ষাকবচ সব মৎস্যজীবীদের ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমের এনজিও মিথাইল আইসোসায়ানেট পোকা মারার ওষুধ একরাতেই তিন হাজার পোকা সাফ।

 

পয়সা বোলতা হ্যায় মাইবাপ পতাকার কতই বা মূল্য ভাড়া করা শ্রমিকের সূর্যাস্ত সফর শেষে কতই বা রোজগার সাইকেলে খোঁপায় যারা সান্ধকালে নাকছাবি মালা ফুলহার গ্র্যাচুইটি পেনশন বৃদ্ধ ঢোঁড়া সাপ খোলস ছেড়েছে মাঠে এ’বছর ভাই লোগ বাজাও হাততালি কিষাণ ক্রেডিট কার্ড এসেছে বাজারে।

 

৪৮ গড়িয়াহাট রোডে যারা গিয়েছিল শ্রাবণের মাসে, যারা দেখেছিল অজস্র ফড়িং। বিপন্ন মানুষ যারা বরিষণ পার করে উড়ে যাওয়া ভোর, হাসপাতাল বারান্দা এনআরএস ৭ নম্বর ঘরের সামনে বসে একা… যে গল্পে বাসখারাপ হয়ে যায় মনও মেলানকলিক, তুই আর রাজীব— যে গল্পে ডাক্তার প্রশ্ন করে মাস্টারবেটিং। শহিদ বেদির পাশে পিছনে দু’হাতমোড়া এক কিশোর, মাথার ভিতরে যার অকারণ নুড়ি পাথরেরা ব্যাঙবাজি করে। অসুখের সরু নদী বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে বড় দেরি হয়ে যায়।

 

 

হন্যমান শিবির

 

ম্যাকবুক আর কিন্ডলের কাহিনি থেকে ছিঁড়ে আনছি কাশেরজঙ্গল

সূর্যাস্তগ্রামের পর যেখানে কোনও কফিশপ নেই

গঞ্জের স্নানঘরে হামামের পাথুরে ঝরণা নেই

গরম পানীয় শেষ, রিজার্চ প্রেমিকেরা বড় বেশি ভীতু ফাঁকা

আর যে কোনও পাড়ায় আজও

জোনাকির ঝোপঝাড়ে একাকি সেতুর পাথারে পারাপার চাঁদে ডুবে আছে

 

দীপ্তিতে বিচ্ছু লাগছে, গরিবের অবেলায় কীইবা আছে এই আশ্বিনের

সামনেই রেল বসতি— পথচিহ্নে স্কুলবাড়ি টোটোর জঙ্গল

পুরোন বাতিলস্তূপ শিশিবোতলের ভিড়ে আমাদের নেশামুক্তি কেন্দ্রের পাতাবাহার

কদমতলার পুরাতন ট্যাক্সিস্ট্যান্ড— খইনি ডলার মধ্যে দেখছে

তিস্তার ঢলানিপনা, তামাসা আসলে ওইসব ছেঁড়াফাটা সেলাইমেশিনের

ঝিমনো রোদ্দুর

 

সাহুডাঙ্গি ইস্কুলের পাশ দিয়ে রাস্তা ট্রেনলাইন বরাবর

মেয়েরা আসছে কলাবিনুনির মত

পুরোন কাঠপোল আর কাশবন পাখসাটে সাদায় সবুজে একাকার দুর্গা

তখনও বসেনি শহরের টোল-ফ্রি নম্বর

ফসলের পুষ্টির জন্য দেওয়াল লিখন

 

ওভার দ্য হরাইজন একমাত্র সাঁকো— যার সাইকেল ভিজে সপসপে

কার সাথে কথা হবে গুঞ্জরিয়া পেরোলেই

পতঙ্গেরা বুঝি কাটিহার প্যাসেঞ্জার— এতোই মন্থর মেঘ উড়তে উড়তে শেষপর্যন্ত দাঁড়িয়েই গেল

এইসব বেগুনিফুল দিগন্তের সরুসিঁথির নীচে

 

বন্যগুল্মের বাস বেতসের ফুল জলাজংলা নিচুঢাল নেহাত এক প্যাসেঞ্জার বাউলা তাই পতঙ্গেরা একমহূর্ত স্থির পরক্ষণে উড়ে যায়

 

বিকলাঙ্গরা বসে আছে ভিক্ষেয় শরতে রোদ্দুরে

ছাতুঅলারাও শরতে রোদ্দুরে জংধরা পুরাতন সাইকেল গ্রিজমাখা করতল

গ্যাটিস ও পুলটিস গামছা বিক্রেতা দেহাতি মানুষেরা

একবেলা কাজের খোঁজে ভিড় করে আছে

রাস্তা মেরামতির ঠিকাদার, করলার জল আপাতত স্থির—

একবুক হবে, খুঁজে আনতে হবে শুধু কারা বিষ ঢালছে প্রতিদিন

দিনান্তে রুটিতে

 

সাদা বকফুলের বাঁক তেমনই এক নদী

হেমন্তের আঁধার কোনও এক অতীতের ডিঙি জল কাটছে

রাজ-বাইমের মতন হিলহিলে শাকবুড়ি তুলে আনছে কলমিলতা হেলেঞ্চার ঝোপ

দয়ামায়া শরীরে-বড় স্তনের লাবন্য মাঠ ধানকাটা শেষ হলে

নগ্ন কোনও ক্ষুধা জ্বলে যাচ্ছে তার ভাঙাঘরে

 

সাদা থান বিধবার গোলাপি আলোর সন্ধ্যাগুলি

বাজারে ছাউনি তলে জ্বলেছে ডুমের বাতি

মোনোক্রোম পোস্টারের লেখা— ব্যবসায়ী খোকন দাসের মৃত্যুগালগুজবখাতা

চায়ের দোকানে বসে বৃদ্ধদের চশমার খুঁটবাষ্প

তেজি মোরগের খোঁজে বনভোজনবিলাসীরা আপিলাচাপিলা ঘোরে

কাঁকড়া প্রজাতি টেনে আনে শহরের বরফচাপা শব

 

থ-এ থ-এ থুতু ফেলিবেন না

কৃত্রিম জুতোর পাশে সাঁঝবেলার ক্রাচ

থেমে গেছে দূর-দূরান্তের জার্নি সিগন্যাল পোস্ট

ট্রাফিক সাঁতার দিয়ে ভেসে উঠছে ঘড়ির দোকান

এত ফাঁকা যে সময় সার্কিট হৃদয়ের কথা সব স্থির

নিচুমাথা মানুষেরা মোবাইল ড্যাশবোর্ডে

নগর পেরিয়ে গিয়ে সমুদ্র সফরে

লুডোর এক দানে ব্যাকলিটের সর্পিলরেখা

অভিলাষে গিলে খায় শ্বাসরোখা রাস্তার অনন্ত ইন্তজার

 

কিং সাহেবের ঘাট— চুপ এখন সরকারি খাতা লেখা হবে

শুনশান কার্ট রোডও পলি জমে জমে পাথর কংক্রিট

চৌমাথা চক্রব্যূহ খুনিদের শাস্তি চায়

 

গ্রাম থেকে আবাহন রেকর্ড করে প্লে-লিস্ট ফ্রিকোয়েন্সি রেডিওর রাত

চুপ এখন, শিরীষের শুকনো ফলের বীজে বাতাসের আদরছায়া

আমাদের হাইপার টেক্সট উন্মাদের আর্তনাদলিপি

 

আপেল বেদানা কলা আনারস মাছি স্যানিটরি ন্যাপকিন

এই বন্যায় অসম্ভব জরুরি এক ত্রাণ

ঘরদোর সাফাইয়ের রাসায়নিক বেবিফুড সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা

দীনের দয়াল লোকায়ত প্রান্তিক মানুষ নৌকা নিয়ে ভেসে গেছে

বেপরোয়া দস্তানাবিহীন

দু’হাতে আড়াল করে শিখা

— হম লোগ অগলে পঁচাস্ সাল তক সততা ও সত্তা পে রহেঙ্গে

তো শিশ্নশান দাও নথ ছেঁড়ো পথনাটিকার কুশীলবে

পত্থালগাড়ির আদিবাসীদের জলজঙ্গলের শালবন

ব্লাডবাথে প্লাস্টিক জড়ানো শিশুরাও দ্রোহ্যকাব্যেরধনুকছেঁড়াক্রোধ

পাথরে পাথরে শুয়ে আয়ুষ্মান ভারতের চাকাভাঙা হাসপাতাল, নর্দমার মর্গ

 

অল দ্য ক্রিউ আর রিটার্নিং টু আর্থ—

বাতাসতরঙ্গলিপিকাঁপে শিশিরঘণ্টায় চিনামাটি চামচে পেয়ালায়

স্তব্ধতা কোনও শান্ত ব্রহ্মের সমর্পণসংগীত

 

একাকী স্টেশনরোড দূর থেকে দূরতম সিগন্যাল পোস্ট

অপার্থিব ঝিঁঝিঁপোঁতা গ্রাম আকাশবিহারীযান ধ্যানমগ্ন কালপুরুষ

মানমন্দিরের হংসপাখারধ্বনি ঘরে ফিরছে নীলাভ লন্ঠন হেঁটে-হেঁটে

উজ্জ্বল কোয়াসার আরও দূর পথে দ্য ক্রুজ ইজ ওনলি ফ্লাইং-বাই

 

রোদ্দুর স্ক্রচ বাইটের জ্বালা ছাতা সারাইয়ের দোকান

ক্লিপের যুদ্ধাস্ত্র স্প্রিং— চাপ দিলে পারাট্রুপারেরা একের পর এক নামছে

মেঘফসলের মাঠে লুঠে নেবে ধানক্ষেত

এও হল এক ধর্ষিতার ডায়েরি

এও এক ট্রপিকাল দেশ শাকবুড়ি আর টিনছাদের ঘরবাড়ি

অপুষ্টি অভাগা তবু কল্যাণের সুর

ছেলেমেয়ের ভালোমন্দে বাঁ-পায়ে কালো সুতলির

আকাশপ্রদীপ

 

সাদা এক থানশাড়ি ঘন কাশবন

ভোরবেলা ডিঙির নিকটে সেলাইবসতি জেগে ওঠে

মেরামতি প্রজাদল হন্যমান শিবির—

যারা দিনরাত নেশা করে, লোহার পাঁচিলে পুরোন ভিজেমেঘের সুতো

জামাকাপড় শুকোয়— ট্রেন চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ কাঁপে

 

বলি বৈকুন্ঠপুর মানচিত্র জঙ্গলঘেরা

বিট অফিসের প্রধান বালি খুঁড়তে খুঁড়তে গাছেদের শিকড় বাকড়

জলস্তর একফালি ফিতে

নীচে ঝুঁকে পড়ে— কেউ দ্যাখে বহতামান নালানিকাশির দুঃখ

বদরক্ত কিশোরীর মজে যাওয়া বমি

হুহু করে ঢুকে পড়ছে মাসকলাইবাড়ি

কত জ্বর মশক কর্পোরেশন

দিনবাজারের পচাপাতা প্লাস্টিকঠোঙা থার্মোকল বাকসো

জনশ্রুতি-সমেত তালগোল পাকিয়ে পাটবজরা এগিয়ে চলেছে

কাছাপরা ঘুন্টিচাবি মা-মরা করলার জলে

দোনলা বন্দুক থেকে গুলি ছুড়ছেন কিংসাহেব

 

কাজকাম বিশেষ কিছু নাই বুঝলেন ওই সপ্তাহে দুইচার দিন বাকি দিন তো বইসাই থাকি টাইমই কাটতে চায় না সব ব্যবসা তো শহরে পাড়ি দিছে ছেলে তো এইবারই প্রথম বসল খানিকটা এক্সপেরিয়েন্স কী বলেন জলের মত টাকা যাচ্ছে এইদিকে তো রাস্তা খুঁড়ছে পাইপ বসানোর আর টাইম পায় নাই এইটুকুই নেশা এই গুয়া-পান না না দেরি হয় নাই সই করলেই হল বুঝলেন না (চোখ টিপে)— লোকজন আর টাইমটেবিল আর তর্কাতর্কি আর মুহুরিরা আর একটা পুরোন কাঠের ওভারব্রিজ যে মায়েরা একা টেনে নিয়ে চলেছে সংসার

 

বিধায়কপদের টাকায় তো অ্যাম্বুল্যান্স হল, তা ভাল

রাস্তা মেরামতির ক্ষতচিহ্ন মুছতে মুছতে পিচড্রাম রোডরোলার ঘুরছে ফিরছে

জেব্রাক্রসিংয়ের আগে স্টপরেপ স্টঅপ

লেখা বন্ধ কর শালা রেডলাইট পট্টিও ধর্ষণরেখার দাগে শলাকা গেঁথে—

যে ছিঁড়ে যাচ্ছে রুলটানা কাগজ

শ্রমিকেরা গ্রাফিত্তিরং পিচকালো ঢালছে রাস্তায়

এ’সময় বোরোলিন আর শীতকাল মেশানো গন্ধে পশম মনে হয়

 

চিনা লন্ঠনের মতো দোলে যাবতীয় ছায়াবাগানের স্তব্ধ সুপুরিরসারি

বাবুপাড়া আর হাসপাতালপাড়া

উনিনশো আটষট্টির টিনঘেরাবাড়ি কয়েকটা রাস্তা শুধু উঁচুতলা লন

জুলাই মাসের সবুজ অন্ধকারে শচীনকত্তার— মেরা সজন হ্যায় উসপার মাঝি লে চল পার

দেওয়ালে দেওয়ালে সব বাঁধভাঙার গান

 

ঘোজাডাঙার অ্যাম্বুলান্স কে তার পাইলট

বেগম রোকেয়া পার্ক— ফুটপাথ বাচ্চারা বেলুন ফোলায়

শ্বাস টেনে টেনে টাইমারে কে কতক্ষণ একদমে

কতগুলো বাতাস

ঝলমলে কিন্ডারগার্টেন

প্রত্যেকেই আলুভাজা চায়

দেখি তাঁবুর ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে আস্ত একটা উপাসনালয় ছাইগাদা

ডাক্তার আমি এখন শ্বেতা শর্মার ফোন ধরব না

ও ফেরি করছে করুক নীল-সাঁতার হাইপার লিংক

ম্যানহোলে যারা নামছে ততোধিক স্কিল্ড নয়

নথিপত্রও নেই তবু বের করে আনতে হবে

শহরের অন্ধকার পাঁক

 

অক্সিজেনের অভাবে শ্বাস টানতে থাকে আমার নম্বর

কত ধরণের বিষাক্ত গ্যাস যাঁরা নীচে নামতে থাকেন

জামায় রোদের গন্ধ

ভিতরে কী ধরনের আগুন নথিপত্র বা হো হো বাতাস কমে আসতে থাকে

 

রোদচশমায় মেঘ করে আছে— একা অনেকেই বিষাদে ব্যথায় বসে বসে সময় গুনছে বারবার

অ্যাম্পুলের মুখ থেকে উড়ে আসছে কাচপোকা

পেইন্টব্রাশের গন্ধ নতুন সেজেছে আজ

আরোগ্যের দেওয়াল দরজা জানালা রোদ মিস্তিরির জামায় রংছিটের সে এক আশ্চর্য আলপনা

 

যদি আর ফিরে নাহি আস— পনেরো নম্বর ওয়াচটাওয়ারের পর ফুরিয়ে আসছে রানওয়ে

এরপর ক্লিভেজের খাদ মিথ্যে মিলনের রেডার শেষরাতের তীব্র বিষজ্বালা

ফোন আসতে থাকে পরপর কে এক সাকির আমি লুকিয়ে ফেলি খুলে রাখা অলঙ্কার কর্ণপাশার নকশা

কন্ঠার হাড়ের কাছে দলাপাকায় বিছানার ছল

পনেরো নম্বর ওয়াচটাওয়ার পার করে ক্লিভেজের গন্ধেমাখামাখি আবিষ্কার করি

মারুবেহাগের মধ্যম এ কোন ফাটল সরুসুতোর চারুকেশ

বেসিনের ফোয়ারায় ঘুরতে ঘুরতে দেখাশোনা শেষ হয়ে যায়

 

সাপ আসছে গর্তের নিকটে নাম ধরে ডাকছে কেউ

তলিয়ে যাওয়ার আগে উদ্ধারবিহীন নাবিক মুঠো খুলে দেখে

— চেরা জিভের মত অলঙ্কার মান্তাসার বিছা

বালিশের পাশে দুঃখের নদী িববাহের সিঁথি বরাবর যে রাস্তা যে দীর্ঘ চুল

 

ঘাসজঙ্গল জানে বুড়ো রোডরোলার কবে থেকে দাঁড়িয়ে

কীভাবে কোশিবেল বাজে কাচচুড়ির কঙ্কন কারা রং করছে বুলেভার্ডবেড়া

ধ্যানমগ্ন সাদা সরলরেখা পাশাপাশি হলুদ বুড়ো ব্যাঙ

কেমিক্যাল ঝাঁঝাঁলো গন্ধে পোকা মরে যাবে

উঁচু ব্যালকনি বহুতলার একইছাঁদ জানলার একরকম গ্রিলভঙ্গীমা

মাথা নিচু করে দ্যাখে— একরকম লেন-বাইলেন

মহেশতলার মেঘ গঙ্গা পেরিয়ে উড়ান নিল ক্রমশ পতন ঘটবে এমন উচ্চতায়

 

উঁচু পাহাড়ের ঘণ্টাবাতাস হারিয়ে যাওয়া মানুষ শুধু হাঁটতে থাকে

বন্দুকের খোঁজে শুধু লাশ কার্তুজসফল

জীবনানন্দের কবিতায় দেখি বেসক্যাম্প হটস্প্রিং স্নানাহার সেরে

—অন্ধদের হাঁটাহাঁটি অভ্যাস শেখায়

ক্রসফায়ার অথবা কোনও এনকাউন্টারের টার্গেট প্র্যাকটিস

 

অন্ধরা সূর্যাস্তে হাঁটে কাঁধে হাত রেখে

নির্ভার পন্ডিতিয়া রোডে না দেখা গোধুলিবেলা

পশ্চিম আকাশ ভেঙেচুরে লাল

নিকোন উঠোন প্রার্থনায় বসে একা মাটিকে চুম্বন

চোখের পাতায় আলো অন্ধরা হাঁটে কাঁধে হাত রেখে

নির্ভার পন্ডিতিয়া রোড

খালি এক স্বর্গযান পার করে যায়

 

বরং পরের পাতায় চলে যাই বাড়িঘর তৈরি করি

মেহনতি মানুষের চুল ধুলোমাখা

না হয় তাদের বুকের ভিতর থেকে জ্যোতি বাহির হয়নি কোনওদিন

হাতুড়ির ঘামে কালো আলকাতরার গন্ধ

ছাদপিটুনির গান দুপুরের দিকে টিফিনবাকসো খুলে

ডালভাতমাখামাখি কাঁচামরিচের ভালবাসা সাজিয়ে রেখেছে

 

ডায়না নদির লাশ কুয়াশাউপুড় হয়ে শুয়ে

মেয়েপাচার আর স্কুলছুটের জীর্ণ কুলিলাইন

বন্ধ রেডব্যাঙ্ক নিভিয়ার নীলের মধ্যে বিত্তের উলবল উষ্ণতা গড়িয়ে চলেছে

মদজঙ্গলের শিকার পিকনিকে— অতিরিক্ত ওজন কমান জিমখানা

ম্যানেজারের জিপ ট্রেডমিলের কনভেয়ার বেল্ট

হাড়গোড় গোনা যায় এমন চালাঘর

শরীর খাচ্ছে শীতের উত্তম প্রোটিন আর সড়কসংশ্লেষ

 

দর্পনের বিচ্ছুরণ কারা কুড়োয় চকমকি পাথর

হলং ব্রিজের পর সাদাবকের ঝাঁক দালসিংপাড়া— চোরাশিকারিরা ঘোরে

পশুছাল সোনাসন্ধানীরা জয়গাঁর ফুলবডি রিলাকসেশন

হ্যামিলটনগঞ্জের বাজারে অতিকায় ঝাঁকরা গাছ পাখিদের দঙ্গল

আদিবাসী মদ ও ঝলসানো শুয়োরে সন্ধে যায়—

এ’ গানের বেদন আর কেই বা শুনবে

 

হেই মিস্টার ট্যামবরিন ম্যান ঘুম আসছে না কিছুতেই

বিশাখা নক্ষত্র পার হচ্ছে কোন অন্তরীপ

কিছু কি বেঁধেছ জাহাজিব্যালাড উড়ে যাওয়া চুল— হেই নুনত্বকে সমুদ্রসন্ধের গল্প

মাঝিমাল্লার হুইলে ভুলে যাওয়া ব্যথাতুর ধোঁয়াজ্বালা

সে কোন বন্দরের পীতজ্বর

হেই মিস্টার ট্যামবরিন ম্যান কিছু কি বেঁধেছ—

যুদ্ধবন্দিশিবিরের পাথরখোদাই ছেঁড়াফাটা জিন্সের পকেট

রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ধরছে না যখন স্বপ্নের ভিতর শিশুরা হাসছে

ঢেউ ছুঁয়ে ছুঁয়ে উড়ে চলেছে ফ্রিগেটকলোনি পরিবার

 

লেট মি টেল ইউ হাও ইট হ্যাপেনড—

সেলফিজোনের বাইরে চলে যাচ্ছে মধ্যযামিনীর বরবাদি

কোহলের রাস্তা যাবে রাস্তার মতন

শাপগ্রস্ত কেউ বারংবার জড়িয়ে প্লাজমারংয়ের সর্পিলফ্ল্যাশলাইট

ভ্রমোল্লাসজব্দমায়াকাজলের ঝাঁঝিফুল-রোঁয়ায়

 

চলকে পড়েছে পানীয় চারলাইনের সম্পর্ক শবচ্ছেদ

রুবাইয়ত তুমি যাও হে শহর পাখি ধরা ফাঁদ

নির্মীয়মাণ বন্দর হয়তবা নোঙরপ্রত্যাশী

দূরে যে আলো জ্বলে গিটারের স্টিংয়ে কারা পুরোন ঘরদোর ছেড়ে চলে যায়

দেওয়ালের ফটোফ্রেম আসবাব রেকাবে—

এক্ তো সজন মেরে পাস নহী হ্যায়

বাগানের মালি কোপানো মাটির পরিচর্যা সারে

অচল মুদ্রার কীইবা মূল্য আছে দূরযাত্রা বাসের টিকিটে

 

হুডিঢাকা বিকেল ও সন্ধের মাঝামাঝি মানুষ আপেল কাটে ছুরি হাতে কুয়াশা সরায়

কফির গন্ধের তিতকুটে অগ্রহায়ণ সকলেই বলছে এ মধুমাস ওষুধপত্তরে কেটে যাবে

আলমন্ড চিবতে চিবতে হেঁটে যাবে লেকরোড আটকাবে না খাঁচায় কিছু

পানীয় না হলেই যাদের কলিজায় চুলা জ্বলে ফুঁ-দিয়ে উসকায় ট্রামধ্বনি

ছাতিম সরণি কোনও সহ্যসাধ নয় হিমের কুসুম ঝরে টুপটাপ

বারোয়ারিতলা ফাঁকা হয়ে যায়

 

হুইলচেয়ারে বসা চাকা ঘোরে দিন কেটে যায়

মাধুরিলেকের পতাকাউড্ডীন ছিল এ জীবন

কেন ফিরতে হয় উল্টো করে দেখা দূরবীন

মেছো মানুষেরাও তো ঝড়ের সম্মুখে কম্পাস হারায়

লুঙিতে গিঁট বাঁধে

ভাঙা গারাজের বনেটে পুরোন গাড়ি বিক্রির দরদাম চলতে থাকে

কত ক্রোশ হেঁটেছে এঞ্জিন রক্ত কি সস্তা হবে তেলেভাজার মতন

 

ক্যাশ ঢুকেছে অ্যাকাউন্টে নাকি সুপারি কাটছে জাঁতি ছোট ছোট করে

বরফ চড়াও আর একটা ভুজিয়া জুম্মাবারের দিন কারখানা বন্ধ

বিসমিল্লাহ্ ইয়ে চক্কর ক্যায়া হ্যায় আইস দে না বাবু থোড়া

গ্যাস কানেকশন তো এখনও হল না

ভাঁওতাবাজির ভিডিও চালাচালি করছে সবাই

অ্যান্ড দ্যাট ইজ হাও গভর্নমেন্ট ইজ রানিং

সিংহাসনের আবার নৈতিকতা সভ্যতা সামনেই তার দ্বারোদ্ঘাটন আজ

 

ঠুকরে ঠুকরে রাত গাছকোটর পেরেকগাঁথার লাইন ফিকে হয়ে আসে

পরিত্যক্ত বোমারু বিমান তাতে জামাকাপড় শুকোয়

নিস্তব্ধতা স্পিডব্রেকারের কাছে খালি সিগ্রেটের খোল

বাস চলে গেল

নেমেছি বানান ভুল আর অদ্ভূত গ্রাফিত্তির দেওয়ালে

 

আমি নই কোনও নাম এই সমুদ্রের আমি নই কোনও ধানিজমি

সন্ধ্যার জংলাফুল বনতুলসিগন্ধ আগাছাসাফাইচাষি শীর্ণন্যুব্জ কোনও হেমন্তফকির

একা মাঠ জল বেরনোর খালগেট যদি কিছু চাপড়া মেলে

এরা জানে সমুদ্র গোগ্রাসে কখনও কখনও গিলে খায় সবকিছু

টেবিল সাজিয়ে বসি হাইওয়ের ধারে—

বোতল গড়িয়ে দিই ফাঁকা অন্ধকার

শুধু পাথরের গায়ে গড়িয়ে যাওয়ার শব্দ

আমি নই কোনও ফিরতিবোতল রাত এই সমুদ্রের

 

আঁশটে গন্ধের ঘাম লবনাক্ত বাতাস ও দ্রাঘিমার তেজ

কাঁকড়ারা ঘোরে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে

আজীবন বালিগর্তে পা-গেঁথে ঝাউবন যেমন দাঁড়িয়ে উদাসীন

পালিয়ে এসেও যারা কাছাকাছি দূরে বিচ্ছিন্নতা

দড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে ডুবন্ত পাথর

অনন্ত সমুদ্রঢেউ তবু পানীয়ের খোঁজে

জল থেকে উঠে এসে মানুষ চলেছে কতদিন

 

সাম্যব্রত জোয়ারদার গত শতাব্দীর নয়ের দশকের এক প্রধান কবি। জন্ম কলকাতায়। তাঁর বই ‘স্টাফ রিপোর্টারের লেখা’, ‘বৃশ্চিক রেখার দাগ’, ‘ইঁদুরলিখিত’, যখন ফানুসেরা ওড়ে’। হিসাবশাস্ত্র নিয়ে পড়েছেন। পেশায় সাংবাদিক। ইমেল- samyabratajoardar@gmail.com

2 Replies to “

গুচ্ছ কবিতা

সাম্যব্রত জোয়ারদার


  1. অনেক দিন পর সাম্যসুরা পান করলাম। কবি তাঁর যৌবনের ঝাঁঝ খুঁজে পেয়েছেন। আমি কবির পুরনো চেহারাটা প্রত্যক্ষ করলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *