ছোটো শহরে যেভাবে প্রেম ভেঙে যায়

মনোজ দে


১.

কোনো হারমোনিয়াম ছিল না

এমনি বাড়িতে শৈশব কেটেছে

 

কীভাবে মেলাবে আমাদের সংস্কৃতি

প্রশ্ন দৃঢ় হয়,  তোমার দূরত্বে

 

গান শেখা ছাড়া

আর কোনো সুরাহা দেখছি না

 

২.

কখনো দুপুর ভেঙে যায়

আস্ত এক মনখারাপ আকাশ হয়ে উঠলে

 

এ সময় লোডশেডিং অনিবার্য

 

যেকোনো, যেকোনো চলে যাওয়া দৃশ্যে

অবিকল তোমাকেই মনে হয়

 

৩.

আদতে ঘটনা, মানিয়ে নিতে পারিনি

 

যেভাবে বাসন ফস্কে যায়

চটি উল্টে রাখলে, অথবা সিঁদুর

অপ্রীতিকর বলে কিছু নেই

 

শোক সামলে উঠে

প্রতিবার এভাবেই কিছু বলে উঠতে

 

৪.

ভুল নেই কোনো। তৃতীয় পুরুষও

তবে কেন

 

দোষারোপ করেছি কেবল

 

গভীরে নামলেই জানা যায়

যতদূর পদবী মেলে না

এ শহরে সমস্ত পেশাই সন্দেহজনক

 

৫.

সংকেত ফিরিয়ে দিচ্ছে অনর্গল

 

যেন সে জন্মের খিদে

রাহু তাক করে আছে

 

আমিও অনড়, খানিক নাছোড়বান্দা

 

আমাদের সমস্ত বিকেল

মিনু পিসির পায়ের নীচে

চাপা পড়ে ভীষণ আহত

 

৬.

মফস্বল তো গোঁয়ার

বৃদ্ধ মা নেই। – এমন শহরে সেটলড হবে

 

নগ্নতার উপর উজ্জ্বল সুতো

পবিত্র। মুক্তির পথ এখানেই রেখেছে ঈশ্বর

 

হে প্রিয়, তোমার সন্তানের নাম

কখনো আয়ত হবে না

 

৭.

হিসেব করেছ কোনোদিন

কতগুলো সন্ধ্যে আলাদা করেছে

তোমার তবলার স্যার, মা’র অসুস্থতা

বাবার অফিসছুটি, ঠাকুমার আসা

 

এসব সামলেও

ছাদে এসে যেই দাঁড়ালে, অসহ্য শাঁখ

 

কথা দাও, আর কাউকে গান শোনাবে না

 

৮.

টের পাওয়া স্বাভাবিক

যেভাবে হাসাতে তুমি

 

অথচ সমস্ত দোষ আমাকেই বিদ্ধ করতো

 

সে বিকেল এখন অতীত, পর্যদুস্ত

বন্ধু নেই। মেকি সন্ধ্যে, থেরাপিবিহীন

 

৯.

এ লেখা তুমি কী পড়বে

ছবি কী পাঠাবে আর

কতখানি এগোতে পেরেছ

 

স্বাস্থ্য ঠিকঠাক। শুধু এক অদ্ভুত অসুখ

কোনো গাঢ় নীল রঙে,  তাকাতে পারি না

 

১০.

যেন মহাকাশ,  শত নক্ষত্র তোমাকে

ঘিরে; কত কাছ থেকে দেখেছি তা

ভেতরে নরম টিলা। আলোকবর্ষ দূরত্বে

মনে করি সেসমস্ত দিন

 

অথচ, এভাবে দেখা হওয়ার কথা কী ছিল!

 

১১.

খুব ভালো থাকা কাকে বলে

 

বেলা বারোটার আগে স্নান

সন্ধ্যেতে টিফিন

 

যখন প্রত্যহ কেউ

টেলিফোনে মনে করিয়ে দিচ্ছে না

 

১২.

যেকোনো গজল

তুমি তার প্রথম আলাপ

 

এতটাই সৎ ছিল চোখ

আমি শুধু স্নানটুকু দেখি

 

নির্জনতা কেটে হেঁটে যাও অন্তরায়

 

১৩.

ছবি তো মুছে না

ভাষা ভুলে যায়

 

যে তালিমে কেটেছিল বহুরাত

 

তোমার সে স্বপ্ন মনে পড়ে?

মাঝরাতে ঘুম ভাঙাবার

 

১৪.

প্রিয় নখ ভেঙে গেলে

কান্না আসে

অসহায় যুবক স্বান্তনা দেয়

 

সেই নুন চুম্বনে মিশেছে বলে

বাকি জীবন একটিও কবিতা পড়লে না

 

১৫.

একদিন পাটিগণিত নিয়ে বসা হোক

 

লাভ-ক্ষতি, সময়-দূরত্ব

বুঝে নেব আমরা

 

ঠিক কেমনভাবে অপমানিত হলে

মানুষ কবিতা লেখা ভুলে যায়

 

মনোজ দে। ৬ জুন, ১৯৯২ বাঁকুড়া শহরে জন্ম। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজতত্ত্ব বিষয়ে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে গবেষণারত।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: আমিও ঈশ্বর ছুঁইনি (২০১৭), শরীরে সংগীত রেখো (২০১৯)।

3 Replies to “

ছোটো শহরে যেভাবে প্রেম ভেঙে যায়

মনোজ দে


  1. মনোজের লেখা সবসময় যেন স্টেজ পারফরমেন্স। নতুন প্রতিবার। কোথাকার যাপন
    অন্য কোথাকার পাটিগণিতের লাভক্ষতির পৃষ্ঠা চাপিয়ে ঘুরিয়ে আনবে প্রথম আলাপের বারবেলা। চমৎকৃত হব বারবার। চলুক মনোজ চলুক। লালমাটির পথেরও অনেক সাধ নীল আকাশ ধরবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *