তৎসম শব্দ – একটি বঙ্গীয় সফর

গৌতম চৌধুরী


মানুষের সামাজিকতার সবচেয়ে বড় নজির হচ্ছে তার ভাষা। সবার কাছ থেকে পালিয়ে মানুষ যখন স্রেফ নিজের সাথে কথা বলতে চায়, ভাবতে চায় নিজের মতো ক’রে, তখনও কিন্তু তার আশ্রয় সেই সামাজিক ভাষাটাই। এক-একটা ভাষার ইতিহাসের ভেতর তাই লুকিয়ে থাকে এক-একটা সমাজের ইতিহাস, এক-একটা জাতির ইতিহাস।

মানুষ যেমন মানুষের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলতে পারে না, ভাষাগুলোও তেমনই। এক জাতির সঙ্গে আর এক জাতির মোলাকাত হয় – কখনও লড়াইয়ের মাঠে, কখনও বাজারে বন্দরে, কখনও একলা অভিযাত্রীর দুঃসাহসে, কখনও বা নিছক জ্ঞানচর্চার পিপাসায়। অমনই ভাষাগুলোর ভেতর শুরু হয় কানাকানি, ফিসফাস। কেউ দানে ধন্য হয়, কেউ গ্রহণে।

এইভাবেই একদিন ভারতীয় জ্যোতিষে গ্রিক প্রভাবের ফলে সংস্কৃতে গোটা ত্রিশেক গ্রিক শব্দ ঢুকে পড়েছিল। গ্রিকেও গিয়েছিল অল্প কিছু সংস্কৃত বা দু’চারটি মিশরি শব্দ। বৌদ্ধ প্রভাবের ফলে চিনা ভাষায় গোটা দশেক ভারতীয় শব্দ এসে যায়। আরবিতেও দু’চারটি ভারতীয়, কিছু গ্রিক, হিব্রু বা সিরিয় শব্দ দেখা যায়। দ্রাবিড় ভাষাগুলিতে যেমন সংস্কৃত শব্দ ঢুকেছে যদৃচ্ছ, সংস্কৃতকেও হজম করতে হয়েছিল প্রায় সাড়ে চারশ দ্রাবিড় শব্দ।

অন্য ভাষা থেকে নেওয়ার ব্যাপারে পৃথিবীর ভাষাগুলোর চরিত্র দু’ধরনের। প্রথম দলটিকে বলা যায় সৃজনশীল। যেমন জর্মান, চিনা বা আরবি। এরা নতুন কোনও ধারণার মুখোমুখি হলে শব্দ যথাসাধ্য নিজেরাই বানিয়ে নেয়। আর দ্বিতীয় দলটি হ’ল পরাশ্রয়ী। এদের মধ্যে পড়ে জাপানি, ফারসি আর ইংরেজি। জাপানি ভাষার অবলম্বন হ’ল হাজার হাজার চিনা শব্দ। অবশ্য তারা এখন চেহারা পালটে দিব্যি জাপানি হয়ে গেছে। তেমনই ফারসিতে ৬০% থেকে ৮০% আরবি শব্দ। ইংরেজিতেও ৬০%-এর বেশি শব্দ লাতিন-মুলের, হয় সরাসরি লাতিন থেকে নাহয় ফরাসি মারফত নেওয়া। যেকোনও গহন গম্ভীর জটিল ভাবপ্রকাশের ক্ষেত্রে ইংরেজির এই অলজ্জিত অধমর্ণতা আখেরে দুনিয়ার পয়লা নম্বর ভাষা হতে তাকে সাহায্যই করেছে।

ভাষাগুলির পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া সবসময়ই যে এমন সোনালি ফসল-ফলানো পলিমাটি ফেলে বন্যার স্মৃতির মতো চলে গেছে, তা অবশ্য নয়। কারণ ভাষার আশ্রয় তো সমাজ। একটি বিশেষ ভাষার আশ্রয় একটি বিশেষ জাতির বা জাতিসমূহের সমাজ। অনেক সময় কোনও সবল জাতি তাদের দুর্বল ভাষা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে কোনও দুর্বল জতির সবল ভাষার ওপর। ভাষায় ভাষায় টক্কর চলেছে বহুদিন। শেষে তৈরি হয়েছে ভাষার এক নতুন চেহারা, যার অন্বয়পদ্ধতি হয়তো বিজিতের, শব্দভাণ্ডার বিজয়ীর, কিংবা উল্টোরকম কিছু। আবার কখনও বা পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে গেছে বহু বিজিতের ভাষা। বিজয়ীর ভাষা মুখে নিয়ে তারা রচনা করেছে তাদের পরবর্তী ইতিহাস – আফ্রিকায়, লাতিন আমেরিকায়। আজকের আর্যাবর্তেও তো অনেক ভাষা মরণোন্মুখ বা মৃতই!

পূর্ব উঃপ্রদেশের কয়েকটি জেলা আর বিহারের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি মানুষের কথ্য ভাষা ভোজপুরিকে কি বাঁচাতে পারল কবীরের কালোত্তীর্ণ দোঁহাগুলি? পাঞ্জাবি, ব্রজভাখা বা খড়িবোলির প্রভাব থাকলেও, কবীরের ভাষা ছিল মূলত ভোজপুরি। কোথায় গেল মগধ(পাটনা-গয়া) অঞ্চলের সুপ্রাচীন লোকভাষা মগহি? বিদ্যাপতির ভাষা মৈথিলির আলো জ্বলছে টিমটিম ক’রে। তুলসিদাস কিন্তু রামচরিতমানস লিখেও বাঁচাতে পারলেন না আওধিকে। আশ্চর্য, এই আওধিতে রচিত মালক মুহম্মদ জ্যয়সির পদুমাবত (খ্রি.১৫৪০) অবলম্বনেই আলাওল লিখেছিলেন প্রথম বাংলা ধর্মনিরপেক্ষ কাব্য পদ্মাবতী (খ্রি. ১৬৪৬)! বঘেলি আর ছত্তিশগড়ির কথা বাদই দিলাম। কিন্তু ব্রজভাখা, যার জনপ্রিয়তা এক সময়ে মথুরা অঞ্চল ছাড়িয়ে সারা উত্তর ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল? মীরাবাই, তুলসীদাস, কবীর, নানকের মতো প্রাতঃস্মরণীয় কবিরাও এ-ভাষায় লিখতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। হায়, সম্রাট আকবরের উৎসাহ-আনুকূল্য আর তাবড় কবিদের রচনাও হার মেনে গেল! সবই আজ তিমিঙ্গিলের পেটে। আত্মপরিচয়হীনতার অন্ধকারে কবে হারিয়ে গেছে কনৌজি, কুমায়ুনি আর গাঢ়বালি।

এইসব মৃত্যুর মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষাকে সত্যিই খুব সৌভাগ্যবান বলে মনে হয়। কিন্তু স্রেফ কপালজোরে কি একটি ভাষা টিকে থাকতে পারে, এমন কি রবীন্দ্রনাথকে পেয়েও? যদি না দরদ থাকে নিজের ভাষার প্রতি, যদি না হুঁশ থাকে! ভাষার প্রতি সেই দায়বদ্ধতার সংরক্ত চেহারা বাঙালি দেখিয়েছে ঢাকায়-শিলচরে, প্রাণের মূল্যে।

 

২.

বাংলা আমাদের নিজেদের ভাষা বলেই তা একেবারে দোষত্রুটিহীন, এমন কথার কোনও মানে নেই। এখুনি হয়তো এর দশ রকম দুর্বলতার কথা ধরিয়ে দেবেন পণ্ডিতেরা। কিন্তু এ-ভাষার স্বভাবটা যে মোটের ওপর নমনীয়, তা নিয়ে বোধ হয় তর্ক নেই। শব্দ সংগ্রহের ব্যাপারে তা ইংরেজিরই মতো পরাশ্রয়ী, ছোঁয়াছুঁয়ি, জাতবিচারের ধার ধারে না বড় একটা।

বাংলার শব্দসংসারকে তিনটে বড় ভাগে ভাগ করা যায় – বাংলা শব্দ (৫১%+), অনুস্বর-বিসর্গহীন সংস্কৃত বা তৎসম (৪৪%) আর অতিথি বা কৃতঋণ শব্দ (৪%+)। মুখের কথায় অবশ্য তৎসমের অনুপাত লক্ষণীয়ভাবে কম, মাত্র ১৭%। জায়গাটা নিয়ে নেয় অতিথি (১২%) আর বাংলা (৭১%) শব্দের দঙ্গল। বাংলা শব্দ বলতে এখানে প্রাকৃতজ সব শব্দ (অর্থাৎ ব্যাকরণে যাদের তদ্ভব আর অর্ধতৎসম বলে), আর অজ্ঞাতমূল যেসব শব্দ আমাদের আদিম ঐতিহ্য থেকে বয়ে আসা (অর্থাৎ কিনা ‘দেশী’) – সেই সব শব্দকেই বোঝানো হচ্ছে। অতিথি শব্দের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৩৫-৪০টি তুর্কি, ১১০টার মতো পর্তুগিজ, প্রায় আড়াই হাজার ফারসি (ফারসির মারফত পাওয়া আরবি সমেত), আর ক্রমেই বেড়ে চলা সহস্রাধিক ইংরেজি শব্দ।

ঐতিহাসিক বিকাশের স্বাভাবিক রাস্তা ধরে এগোলে, হালের লেখ্য বাংলাতেও তৎসম শব্দের পরিমাণ ঢের কমই রইত। হাজার বছর আগে ব্যবহার হওয়া বহু তদ্ভব আর দেশী শব্দ গায়েব হয়ে গেছে, এমন কি আমাদের মুখের ভাষা থেকেও। বস্তুত চর্যাপদ-এ (আনু. খ্রি.৯৫০) তৎসম শব্দের অস্তিত্ব ছিল মাত্র ৫%। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ (আনু. খ্রি. ১৪০০) তা বেড়ে হয় ১২.৫%। তৎসম শব্দের এই বিপুল অনুপস্থিতি থেকে মনে হয়, চর্যাপদগুলি হয়ত সিদ্ধাচার্যদের গহন হেঁয়ালি মাত্র ছিল না। প্রাচীনতর অবহট্ট-অপভ্রংশ পর্যায়ে যে-উদ্দেশ্যেই সেগুলি রচিত হোক, ব্রাহ্মণ্যবাদের বাইরে পড়ে থাকা বিপুলসংখ্যক ‘অন্ত্যজ’ মানুষ ক্রমেই বাংলা হয়ে আসা এই গানগুলির ভাষাকে আশ্রয় ক’রে ভুসুকুর মতো বাঙালি হ’য়ে উঠতে চেয়েছিলেন। আর শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ তো কোনও ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই। আমজনতার রসাস্বাদনের জন্য তার দরোজা দু’হাট ক’রে খোলা। কোনও গৌড়ীয় বৈষ্ণবদর্শনের কম্বল মুড়ি দিয়ে তার তাপ পোহাতে হয় না। ইতিহাসের এ এক অদ্ভুত মস্করা এই যে, তৎসম শব্দের বিপুল অনুপস্থিতির কারণেই এই রচনাগুলি আজ আমাদের কাছে দুর্বোধ্য!

চৈতন্যদেবের আবির্ভাব (খ্রি.১৪৮৬-১৫৩৪) বাংলার সমাজমানসে এক কালান্তরের উড়াল এনেছিল, সন্দেহ নেই। সাহিত্যেও খুলে গিয়েছিল বিষয়বৈচিত্র্যের আজস্র ঝরোকা। গড়ে উঠেছিল এক পরিশীলিত রুচিবোধ। কিন্তু বর্ণহিন্দু লেখকদের হাতে পড়ে ব্রাহ্মণ্যবাদী জড় চাঙ্গা হতে বেশি সময় লাগেনি। বিষয়গত দিক থেকে যেমন, ভাষার ওপরও তেমনই তার এক উলটানো-পা প্রভাব পড়ল। শুরু হ’ল তদ্ভব শব্দের সংস্কৃতায়িত পরিমার্জনা। চিন্তাচেতনার উচ্চতর পর্যায়কে রূপায়িত করার জন্য কার্যকরী বাংলা শব্দ তৈরি করার বদলে, নতুন ক’রে তৎসম শব্দ আমদানিও শুরু হ’ল। বিশেষ ক’রে সংস্কৃত সাহিত্যের অক্ষম অনুবাদকদের হাতে এই কাণ্ডটা বেশি ক’রে ঘটল। কল্পনাহীন আক্ষরিক তর্জমায় ধার করা তৎসমের বহর এসে হাজির হ’ল। ফলে, ১৭শ শতক নাগাদ বাংলা শব্দভাণ্ডারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হয়ে দাঁড়াল এই নয়া-তৎসম শব্দগুলি।

অবশ্য প্রায় একই সময়ে একটা অন্য ধরনের ঢেউও এসে আছড়ে পড়েছিল বাঙালির ভাষায়। তুর্কি অভিযান (খ্রি.১২০৫) দিয়ে শুরু হওয়া তুর্কি, তুর্ক-আফগান, মুঘল প্রমুখ শাসকদের ধারাবাহিক শাসনামলে, প্রথমে মুখের কথায়, পরে লেখার ভাষায়, ক্রমেই এসে হাজির হ’তে থাকল ফারসি আর ফারসির মারফত আরবি ও তুর্কি শব্দ। প্রাক্‌-তুর্ক চর্যাপদ-এ ঐতিহাসিক কারণেই এই মিশাল শুরু হয়নি। এমন কি তুর্কি অধিকারের দু’শতক পরে রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর ৯৫০০ পংক্তিতে ফারসি শব্দ মাত্র ১০/১২টি। কিন্তু তারপর থেকে এই সংখ্যা শুধু বেড়েই চলেছে। বিজয়গুপ্তের পদ্মাপুরাণ-এ (১৫শ শতকের শেষে) ১৮,০০০ পংক্তিতে ১২৫টি, মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল-এ (১৬শ শতকের শেষে) ২০,০০০ পংক্তিতে ২০০-২১০টি, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল-এ (খ্রি ১৭৫২) ১৩,০০০ পংক্তিতে ৪০০+। রামপ্রসাদের (খ্রি. ১৭২৩-১৭৮১) এক অবিস্মরণীয় ৮ পংক্তির রচনা – মন রে কৃষিকাজ জান না… -তে পাচ্ছি এই শব্দগুলি – জমিন, আবাদ, ফসল, তছরুপ, বাজাপ্ত, এক্তার। ‘আধুনিক’ বাঙালির মননশীল লেখা থেকে এই শব্দগুলি কীভাবে যেন তছরুপ হয়ে গেল!

সমসাময়িক বাংলা গদ্যের যেটুকু নমুনা চিঠিপত্র-দলিল-দস্তাবেজ থেকে পাওয়া যায়, তা আবার এতটাই আরবি-ফারসি বহুল, যে আজকের রুচি নিয়ে তাকে আমাদের আদর্শ বলতে বাধবে। কখনও কখনও প্রয়োগের ভারসাম্য অবশ্য এক অন্যরকম সম্ভাবনার ইঙ্গিতও দিয়েছে। যেমন, পুত্র গুরুদাসকে লেখা মহারাজ নন্দকুমারের চিঠি (খ্রি.১৭৭১) –

 

অদ্য চারি রোজ এথা পৌঁছিয়াছি। …নাসাগ্রে প্রাণ হৈল। ফসীহৎ (<আ০ ফজ়িহৎ = অপযশ) যত যত পাইলাম তাহা কত লিখিব। …এ সময় তুমি কমর বাঁধিয়া আমার উদ্ধার করিতে পার তবেই যে হউক। নচেৎ আমার জান লোপ হৈল।

 

কিন্তু এই ইঙ্গিতে এসেই ইতিহাস পথ বদলায়। পাঁচ-ছ’শ বছরের আদান-প্রদানের মধ্যে দিয়ে মুখের ভাষায় সেঁধিয়ে যাওয়া হাজারাধিক ফারসি (+আরবি) শব্দ যে-স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় লিখিত ভাষার আঙিনাতেও চলে এসেছিল, কোনও যুগন্ধরের হাতে পড়ে তার শিল্পিত পরিণতি কী হ’তে পারত, তা আর দেখা হ’ল না আমাদের! বদলে, মাত্র এক শতাব্দীর ব্যবধানে আমরা পেলাম এই শ্বাসরোধকারী সৌন্দর্যে থর থর গদ্যভঙ্গিমা –

 

এই সেই জনস্থানমধ্যবর্তী প্রস্রবণগিরি। এই গিরির শিখরদেশ আকাশপথে সতত সঞ্চরমান জলধরমণ্ডলীর যোগে নিরন্তর নিবিড় নীলিমায় অলঙ্কৃত। অধিত্যকা প্রদেশ ঘনসন্নিবিষ্ট বিবিধ বনপাদপসমূহে আচ্ছন্ন থাকাতে সতত স্নিগ্ধ, শীতল ও রমণীয়; পাদদেশে প্রসন্নসলিলা গোদাবরী তরঙ্গবিস্তার করিয়া প্রবলবেগে গমন করিতেছে। (সীতার বনবাস, খ্রি. ১৮৬০)

 

৩.

আগুপিছু ঠাহর করলে, ভাষার এই নজরকাড়া উল্লম্ফনকে অধুনা ফ্যাকাশে হয়ে আসা একটি শব্দ দিয়েই চিহ্নিত করা যায় – বিপ্লব! আর বিপ্লব যদি কোনও ভোজসভা না হয়, তবে তা কোনও ভোজবাজিও নয়। অন্নদামঙ্গল থেকে সীতার বনবাস-এর মধ্যবর্তী এক শতাব্দীর মানুষিক তৎপরতাগুলিকে সনাক্ত করতে না পারলে অথচ, এই রূপান্তরকে অনৈসর্গিক বলেই মনে হয়। ফারাক মাত্র এক শতাব্দীর। বাঙালির সামাজিক ও জাতীয় জীবন এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় ক’রে দেওয়া এক শতাব্দী! সেই বর্গির হাঙ্গামা (খ্রি.১৭৪২-১৭৫১) দিয়ে শুরু। তারপর পলাশির আমবাগান (খ্রি.১৭৫৭) আর জনাব ক্লাইভের দেওয়ানি প্রাপ্তি (খ্রি.১৭৬৫)। উঠন্ত মুলো পত্তনেই চেনা যায়। মধ্যযুগের ‘অন্ধকার’ ভেদ ক’রে আধুনিকতার ‘আলোকায়ন’ আনার পরবর্তী দু’শতক ব্যাপী কর্মসূচির প্রথম পাঁচ বছরেই ঘটানো গেল ছিয়াত্তরের মন্বন্তর(খ্রি.১৭৭০) – যাতে নিকেশ হয়ে গেল এক কোটি বাঙালির প্রাণ!

এই বাংলা-উজাড় মারণযজ্ঞের ৮ বছরের মধ্যে হুগলি থেকে ছেপে বেরোল A Grammar of the Bengal Language (খ্রি.১৭৭৮)। রচয়িতা, কোম্পানির বাংলা-দক্ষ কর্মচারী নাথানিয়েল ব্রাসি হালহেড। ইংরেজিতে লেখা এই ব্যাকরণে ছাপার হরফে প্রথম ফুটে উঠল বাংলা ভাষার নমুনা। তাই আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এ-বইটি জায়গা ক’রে নিয়েছে। হালহেড অবশ্য স্পষ্টতই এটি লিখেছিলেন তাঁর সতীর্থ ও অনুজ ইংরেজ কর্মচারীদের বাংলা শেখাবার জন্য, ‘ফিরিঙ্গিনামুপকারার্থং’। তাই মন্বন্তর এবং ব্যাকরণ, দুটিই ইংরেজের প্রশাসনিক কর্মসূচির ফলশ্রুতি।

বড়লাট হেস্টিংসের বন্ধুস্থানীয় মেধাবী হালহেড আরবি-ফারসি বিলক্ষণ জানতেন। টানা দু’বছর ধরে ফার্সি আইনগ্রন্থ ইংরেজিতে তর্জমা শেষ ক’রে তিনি সদ্যপ্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্টে ফারসি দোভাষীর কাজে যোগ দিয়েছিলেন (খ্রি.১৭৭৫)। কিন্তু হেস্টিংসেরই সক্রিয় সহযোগিতা ও সাহায্যে প্রকাশিত তাঁর ব্যাকরণে (GBL) ফারসি-বিমুখতা ও সংস্কৃত-প্রবণতার ঝোঁকটিই প্রতিষ্ঠা পেল। অবশ্য তদানীন্তন বাংলায়, প্রশাসনিক, বিশেষত আইন সংক্রান্ত রচনাবলীতে, ফারসির প্রয়োগবাহুল্য এতটাই সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল যে, কোম্পানির উদ্যোগে প্রকাশিত এ-ধরনের বইগুলিও সে-ছোঁয়াচ বাঁচাতে পারেনি। এরকম তিনটি বই হ’ল জোনাথান ডানকানের দেওয়ানি আইন সংক্রান্ত ইম্পে বিধিমালার অনুবাদ (খ্রি.১৭৮৫), নীল বেঞ্জামিন এডমন্‌স্টোনের ফৌজদারি আইনের অনুবাদ (খ্রি.১৭৯২) এবং হেনরি পিটস ফরস্‌টারের কর্ণওয়ালিস বিধিমালার অনুবাদ (খ্রি.১৭৯৩)। সংস্কৃতজ্ঞ ফরস্টার অবশ্য তাঁর স্বমূর্তিতে দেখা দিলেন A vocabulary in two parts, English & Bengali and vice versa-র দু’টি খণ্ডে (খ্রি.১৭৭৫/১৮০১)। এক সংস্কৃতায়িত বাংলা শব্দকোষের উত্তরাধিকার ভূতের বোঝার মতো ঝুলে রইল অব্যবহিত পরবর্তী স্ফুটনোন্মুখ বাংলা গদ্যের ওপর।

বাংলাভাষার এই মোক্ষম মোচড়বিন্দুতে এসে একটি সংশয়দীর্ণ প্রশ্ন বুকের ভেতর থর থর ক’রে ওঠে। হালহেড-ফরস্টার প্রমুখ বিদ্বৎজনের এই সংস্কৃতমুখীনতা কি নিছক কাকতালীয় আপরুচির ফসল? নাকি তা ক্লাইভীয় সামরিক কূটকৌশলেরই এক সাংস্কৃতিক সংস্করণ?

বস্তুত মুরশিদাবাদের রবরবা, যা দেখে স্বয়ং ক্লাইভেরও চক্ষু চড়কগাছ হয়েছিল, ইংরেজ বানিয়াদের এক দীর্ঘমেয়াদি লুণ্ঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। তাই শুধুমাত্র সামরিক বিজয় অর্জন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করেই তাঁরা খুশি হননি। ইতিহাসকে তাঁরা এমনভাবে পুনর্নির্মাণ করতে চাইছিলেন, যাতে বাংলার অসামরিক প্রতিরোধগুলিও ভেঙে পড়ে। তুমি খারাপ, তোমার মাটি খারাপ, তোমার জলহাওয়া খারাপ, তোমার বাপ-চোদ্দপুরুষ খারাপ! হ্যাঁ, ভালো কিছু ছিল বটে – সে সব সেই মান্ধাতার আমলে। মুসলমানরা  তোমাদের দেশ কব্জা করার বহু আগে তোমাদের সেই তখনকার পূর্বপুরুষেরা আমাদের মতন আর্য। তোমাদের ভাষা, সে তো সংস্কৃতেরই ঘরের মেয়ে। আর সংস্কৃত – সে হ’ল আমাদের জননী লাতিনেরই তুতো বোন। তোমাদের এখনকার যাকিছু দুর্দশা, তার জন্য দায়ী ঐ নবাব-বাদশা আর তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা। আমরা এসেছি, তোমাদের সাগরপারের ত্রাতা। আমরা তোমাদের সব দেব। শিক্ষা দেব, সভ্যতা দেব, জ্ঞানের আলো দেব, লোকহিতৈষণা দেব, সাম্য অব্দি দেব। আর বেআদবদের ফাঁসিতে লটকাব। তোমরা শুধু ভেন্ন হও। যত সব লেড়ে-পাতিলেড়েদের থেকে ভেন্ন হও। যাবনি মিশাল থেকে বাঁচো, ভাষাকে বাঁচাও!

হালহেড আর ফরস্টারের পাণ্ডিত্যের আড়াল থেকে হেস্টিংস-কর্ণওয়ালিসের হিসহিসে কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে না তো! এই ধন্ধকে দূরে সরিয়ে রেখে আমরা দেখি, ফরস্টারের অভিধানের দু’টি খণ্ড প্রকাশের মধ্যবর্তী অবকাশে মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছেন আর এক অমানুষিক প্রতিভা, উইলিয়ম কেরী। দীর্ঘ ৭বছরের ইতস্তত প্রয়াসের পর তিনি পা রাখলেন শ্রীরামপুরের মাটিতে এবং তৈরি করলেন মিশন ও ছাপাখানা (খ্রি.১৮০০, ১০ জানুয়ারি)। মাত্র ৮মাসের মধ্যে ছেপে বেরোল মথি লিখিত সুসমাচার, বাংলায়। পরবর্তী ৩৪বছরে ৪০টি বিভিন্ন ভাষায় ২১২,০০০ কপি বাইবেল প্রকাশ, তাও হাতেচালানো ছাপাখানা থেকে, ভাবা যায়! আর শুধু তো বাইবেল নয়, রামায়ণ-মহাভারত সমেত অজস্র বাংলা বই, অভিধান, ব্যাকরণ। যার অনেকগুলি কেরীর নিজেরই রচনা।

ঐবছরেই (খ্রি.১৮০০) ওয়েলেসলি পত্তন করলেন ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ। এখানেও মধ্যমণি কেরী। কলেজের উদ্দেশ্য অবশ্যই সাহেব-কর্মচারীদের বাংলা সমেত অন্যান্য দেশীয় ভাষা শেখানো। কিন্তু শেখাবে কে? বই কই? ডাক পড়ল কেরীর। সংস্কৃত, বাংলা আর মারাঠি – তিন তিনটে ভাষা শেখানোর দায়িত্ব নিলেন তিনি। আর বাংলায় গদ্যবই লেখানো শুরু করলেন পণ্ডিত আর মুনশিদের দিয়ে। শ্রীরামপুরের ছাপাখানা থেকে ছাপা হতে থাকল সে সব বই। শুরু হয়ে গেল বাংলাগদ্যের পথ চলা।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, কেরীর তত্ত্বাবধানে ও ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের উদ্যোগে প্রকাশিত বাঙালি লেখকদের রচনাগুলিই তৎসম শব্দবাহুল্য ও সংস্কৃত রীতির অনুসারী বলে পণ্ডিতী গদ্য হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। যে-ভাষার কুজ্ঝটিকা ভেদ করতে পরবর্তী লেখকদের যথেষ্ট সচেতন প্রয়াস চালাতে হয়েছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এইসব লেখকেরা এবং কেরী নিজেও স্বাভাবিক বাংলায় যে যথেষ্ট সাবলীলভাবে লিখতে পারতেন তার নজির আছে।

ফো-উ-ক গ্রন্থমালার প্রথম বইটির কথাই ধরা যাক। কেরীর বাংলা শিক্ষক বা মুন্সি রামরাম বসু তাঁর পূর্বপুরুষকে নিয়ে লিখলেন রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র (খ্রি.১৮০১)। এই রচনার আরবি-ফারসি বাহুল্য পণ্ডিতী রীতির একেবারে উলটোমেরুর স্পন্দন। প্রসঙ্গত, এটিই কোনও বাঙালির লেখা প্রথম ছাপা গদ্যবই। পরবর্তী রচনা লিপিমালা-য় (খ্রি.১৮০২) রামরাম সংস্কৃতমুখী। এ কি লেখকের আপন খেয়াল, না কি কোনও নীতি নির্দেশনার রূপায়ণ, কে জানে!

এ-প্রসঙ্গে মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের নাম আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হয়। তাঁকেই পণ্ডিতী রীতির প্রধান পথিকৃৎ বলা হয়। তাঁর বত্রিশ সিংহাসন (খ্রি.১৮০২), হিতোপদেশ (খ্রি.১৮০৮), বেদান্তচন্দ্রিকা (খ্রি.১৮১৭)-র রচনারীতির অবলম্বন হ’ল সংস্কৃত আদর্শ। শুধুমাত্র তৎসম শব্দচয়নই নয়, সংস্কৃত বাকরীতির অন্ধ অনুকরণও এই আদর্শের চৌহদ্দিতে পড়ছে। মৃত্যুঞ্জয়ের গদ্য প্রসঙ্গে রামমোহন পর্যন্ত লিখছেন –

 

প্রগাঢ় ২ সংস্কৃত শব্দসকল ইচ্ছাপূর্বক দিয়া গ্রন্থকে দুর্গম করা কেবল লোককে তাহার অর্থ হইতে বঞ্চনা এবং তাৎপর্যের অন্যথা করা হয়।     (ভট্টাচার্য্যের সহিত বিচার – খ্রি. ১৮১৭)

 

অথচ এই মৃত্যুঞ্জয়ই যখন রাজাবলি (খ্রি.১৮০৮) লিখেছেন, তখন ইতিহাসের একেক পর্যায়ের বর্ণনায় একেক রকম রীতির ব্যবহার দেখে আশ্চর্য হতে হয়। প্রাক্‌-সুলতানি রাজাদের বর্ণনায় তৎসমের অধিষ্ঠান, পাঠান-মুঘল আমলের বেলায় ফারসির প্রয়োগ, আবার ইংরেজ রাজত্বের সূত্রপাতের বিবরণে দু’একটি ইংরেজি শব্দেরও ব্যবহার ঘটেছে তাঁর কলমে। প্রবোধচন্দ্রিকা (রচনা খ্রি.১৮১৩, প্রকাশ খ্রি.১৮৩৩)-র সংস্কৃতবহুল রচনারীতির ফাঁকফোকর দিয়ে উঁকি মারে এরকম স্বতঃস্ফূর্ত টুকরো –

 

ইহা শুনিয়া বিশ্ববঞ্চক কহিল, তবে কি আজি খাওয়া হবে না ক্ষুধায় মরিব। তৎপত্নী কহিল মরুক মানে আজি কি পিঠা না খাইলেই নয়। দেখি দেখি হাঁড়িকুড়ি খুদকুড়া যদি কিছু থাকে। ইহা কহিয়া ঘর হইতে খুদকুড়া আনিয়া বাটিতে বসিয়া কহিল শীলটা ভালো বটে লোড়াটা যাইচ্ছা তা। এতে কি চিক্কণ বাটা হয়। মরুক যেমন হউক বাটি ত।

 

এর তুলনায় বিদ্যাসাগরের বেতাল পঞ্চবিংশতি-র প্রথম সংস্করণের (খ্রি.১৮৪৭) ভাষাও বহুগুণ সংস্কৃতায়িত। পরবর্তী সংস্করণে বিদ্যাসাগর স্বয়ং যে-প্রবণতার সাথে লড়াই করেছেন।

 

৪.

আসলে প্রাচ্যের ‘পবিত্র’ ভাষা হিসাবে অগ্রিম চিহ্নিতকরণ সংস্কৃতকে ইংরেজ বুধমণ্ডলে যে বিশেষ আসন দিয়েছিল, এদেশী ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রকল্পেও তা ছিল ‘দেবভাষা’। তাই সমকালীন কৌলিন্যের প্রতীক ফারসি-কৃতবিদ্যতার প্রতিস্পর্ধী এক নতুন অভিজাততন্ত্রের রচনায় ইঙ্গ প্রশাসকেরা যে সংস্কৃতকে কথঞ্চিৎ প্রশ্রয় দেবেন, তাতে অবাক হবার কিছু নেই। তাই কেরী যখন প্রথম ইউরোপীয় হিসাবে ফো-উ-কলেজের সমাবেশে সংস্কৃতে বক্তৃতা করেন, তখন শাসক ও শাসিত দু’মহলেই ধন্য ধন্য পড়ে যায়। অথচ অন্বয় গড়বড় ক’রে ফেলা তৎসমবহুল বাংলায় রচিত তাঁর বাইবেল পড়ে একজন বাঙালিও ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন কি না সন্দেহ! এই পরস্পরবিরোধী ঘটনাচক্রে চাপা পড়ে যায় কাশফুল ও ছেঁড়ামেঘের  ছায়া বুকে নেওয়া শারদীয় নদীর মতো তাঁর এই লোকায়ত বাংলা –

 

আজি আমি বড় দায়তে পড়িয়াছি। তুমি যদি দশটাকা কর্জ্জ দিয়া রক্ষা কর তবে সে রক্ষা পাই। তা নলে গরু বাছুর মাগ ছেলে সকল রাজায় বেচে নেয়।

তোমার কয় হাল আছে আর জোত কয় বিঘা তোমার মালগুজারি কত লাগে। তাহা না বুঝিয়া টাকা কি মতে দিব।

মহাশয় আমার পঁচিশ বিঘা জমি তাহার খাজানা মোক্তা পনেরো টাকা লাগে। তাহার মধ্যে পাঁচ টাকা দিয়াছি এখন বাকি দশ টাকা আছে। অতএব আপনি আমাকে ধানের উপর টাকা দিওন আমি মাঘ মাসে সুধ আধ আনা হিসাবে ও যে ভাও ধান বিকায় তাহা হইতে দুই কাঠা ফি টাকায় ধরতা নিব। আপনার টাকার ধান আগে খামারে মাপিয়া দিয়া যাহা পাই তাহা লইয়া যাব।         (কথোপকথন – খ্রি. ১৮০১)

 

বদলে, আকাশ ছেয়ে ফেলে এমন এক দমবন্ধ ভাষাকাঠামো, যাতে সংস্কৃতের উপস্থিতি নিরঙ্কুশ। শুধু বেশুমার তৎসম শব্দের উপস্থিতিই নয়, কখনও কখনও তাদের নিছক আভিধানিক প্রয়োগ, সন্ধি ও সমাসের আড়ম্বর মেঘডম্বরের মতো বাজতে থাকে –

 

১.সুন্দরীমুখমনোহরান্দোলিতোৎফুল্লারাজীব – মৃত্যুঞ্জয়

২.পুন্নাগনাগকেশরাগুরুভাণ্ডীরাশোক-শোভিতবনসুন্দরীগণবিলাসিতাত্যন্তমনোহর দ্বিরদাস্পদ নামে বন – কেরী

 

বিভক্তি ও প্রত্যয় প্রয়োগে সংস্কৃত ব্যাকরণের অন্ধ অনুসরণ আর সরল বাক্যের বদলে জটিল বাক্যের ক্রমিক ব্যবহার, আমাদের বাংলাভাষাকে যেন দীর্ঘবাহু গাছেদের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া পায়ে-চলা পথটির মতো ক’রে তুলেছিল।

বিদ্যাসাগরের মতো প্রতিভাধর লেখকের নিরুপায়তা অতঃপর আমরা বুঝতে পারি। বুঝতে পারি, কোন্‌ ভাষাকাঠামোর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কলম তুলে নিয়েছিলেন। বেতাল পঞ্চবিংশতির প্রথম সংস্করণে ব্যবহৃত ‘প্রাড্ড্বিবাক পুত্রকে’, ‘উৎকণ্ঠাকুণ্ঠিত’, ‘উৎকলিকাকুল’ শব্দগুলিকে নির্মোহ বিচারে বাতিল করতে তাঁকে দ্বিতীয় সংস্করণ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু দ্বিতীয় সংস্করণে তিনি অনায়াসে নিয়ে আসেন ‘অমাত্যপুত্রকে’, ‘অতিশয় বিষণ্ণ’, ‘উৎকণ্ঠিত’। প্রথম সংস্করণের ‘অরণ্য প্রবেশ পুরঃসর’ দ্বিতীয়ে হয়ে যায় ‘অরণ্যে গিয়া’।

 

পরবর্তী ইতিহাস তো আমাদের সবারই জানা। আকাশছোঁয়া প্রতিভার অধিকারী নানান লেখকের হাতে বাংলা গদ্য খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একটা লাবণ্যময় তনুশ্রী পেয়ে গেল। লেখ্য বাংলায় লক্ষণীয়ভাবে কমে এল তৎসমের প্রয়োগ । বাংলা শব্দ (তদ্ভব/অর্ধতৎসম, দেশী) আর অতিথি বা কৃতঋণ শব্দের প্রয়োগের কত নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হ’ল উনিশ-বিশ শতকের মহাজনদের হাতে। আরও কত নিরীক্ষার আর স্বাভাবিক গ্রহণ-বর্জনের পুলকিত অভিজ্ঞতা পড়ে আছে এই ভাষার সামনে – আমাদের ছিন্নবিচ্ছিন্ন মৃত্তিকার আগামী কালপ্রবাহের বয়ানের মতোই রোমাঞ্চকর তা!

 

আশ্বিন ১৪০৮

 

গৌতম চৌধুরী, জন্ম ১৮ ফাল্গুন ১৩৫৮, ২ মার্চ ১৯৫২, কানপুর, উত্তর প্রদেশ, ভারত। শিক্ষা : উচ্চ মাধ্যমিক। পেশা : লেখালেখি। প্রকাশিত বই : কবিতা— কলম্বাসের জাহাজ [১৯৭৭, উলুখড়, হাওড়া] হননমেরু [১৯৮০, উলুখড়, হাওড়া] পৌত্তলিক [১৯৮৩, উলুখড়, হাওড়া] অমর সার্কাস [১৯৮৯, আপেক্ষিক, হাওড়া] চক্রব্যূহ [১৯৯১, আপেক্ষিক, হাওড়া] নদীকথা [১৯৯৭, যুক্তাক্ষর, হাওড়া] আমি আলো অন্ধকার [১৯৯৯, অফবিট, কলকাতা] সাঁঝের আটচালা [২০০২, কীর্তিনাশা, কলকাতা] আধপোড়া ইতিহাস [২০০৪, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া] অক্ষর শরীরে মহামাত্রা পাব বলে [২০০৬, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া] নির্বাচিত কবিতা [২০১০, সংবেদ, ঢাকা] আখেরি তামাশা [২০১৩, ছোঁয়া, কলকাতা] ঐতরেয় [২০১৩, রূপকথা, ক্যানিং] উজানি কবিতা [২০১৪, মনফকিরা, কলকাতা] ধ্যানী ও রঙ্গিলা [২০১৫, চৈতন্য, সিলেট] কলম্বাসের জাহাজ (২য় সং) [২০১৬, রাবণ, কলকাতা] বনপর্ব [২০১৬, সংবেদ, ঢাকা] কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত? [ধানসিড়ি, কলকাতা, ২০১৬] বাক্যের সামান্য মায়া [ভাষালিপি, কলকাতা, ২০১৭] রাক্ষসের গান [চৈতন্য, সিলেট, ২০১৭] কবিতাসংগ্রহ [প্রথম খণ্ড, রাবণ, কলকাতা, ২০১৭]। ইতস্তত কয়েক কদম [কাগজের ঠোঙা, কলকাতা, ২০১৮] বাজিকর আর চাঁদবেণে [পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি., ঢাকা, ২০১৮] গদ্য— গরুররচনা (বৈ-বই বা ই-বুক) [২০১২, www.boierdokan.com] খেয়া: এক রহস্যময় বিপরীতবিহারের ঝটিকালিপি [কুবোপাখি, কলকাতা, ২০১৭] বহুবচন, একবচন [বইতরণী, কলকাতা, ২০১৮] সময়পরিধি ছুঁয়ে [ঐহিক, কলকাতা, ২০১৮ নাটক— হননমেরু [মঞ্চায়ন: ১৯৮৬] অনুবাদ— আষাঢ়ের এক দিন [মোহন রাকেশের হিন্দি নাটক, শূদ্রক নাট্যপত্র, ১৯৮৪] যৌথ সম্পাদনা— অভিমান (১৯৭৪-৯০), যুক্তাক্ষর (১৯৯২-৯৬), কীর্তিনাশা (২০০২-০৫) ই-মেইল : gc16332@gmail.com

 

3 Replies to “

তৎসম শব্দ – একটি বঙ্গীয় সফর

গৌতম চৌধুরী


  1. অসাধারণ উপস্থাপনা। তথ্য নির্ভর রচনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *