গুচ্ছ কবিতা

হিন্দোল ভট্টাচার্য


পাঠক

শুনেছি রাতের কাছে তুমিও ফিসফিস করে কথা বলে ওঠো-
আরেকটু আয়ুর জন্য যেভাবে সমস্ত প্রাণ
নিঃশব্দে তাকায়।
এই তো জীবন, তাকে সংসার ভেব না।
অগোছালো করো।
এলোমেলো ঘুরে যাও নির্জন শীতের পাড়া দিয়ে।
যখন সমস্ত ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যায় , আর
বাজারি কুকুরগুলো নেকড়ে হয়ে শোঁকাশুঁকি করে;

এরকম রাতে
গৃহস্থ দুঃখের কথাগুলো আর না-ই বা শোনালে।

বসন্ত

এভাবে হয় না পুজো; কিছুতে হয় না।
গোলাপ, চকলেট আর উদাসী তারিখ পড়ে থাকে।
একেকটি শহর ছোটে একেকটি মেলায়-
এভাবে হয় না গান, বাঁশি বাজে দূরে।
তোমাকে গভীর থেকে ছুঁয়ে দেখি
কী বিষাদ লেগে আছে তোমার গোপনে।
সে বড় দু:খের কথা,-
চুপিচুপি গাছেদের ভালোবাসা লেগে থাকে জানি।
যত সে নি:সঙ্গ তত প্রেম।
আলো আছে অল্প অল্প, অন্ধকারও তত কড়া নয়।
ঘরে ঘরে বেজে উঠছে শাঁখ।
একা একা বাস ছাড়ছে রাতের ড্রাইভার।
আমরা দুজনে জানি
আছি।
আমরা দুজনে বুঝি,
এভাবে থাকার কথা ছিল না কখনো।

কামসূত্র

পোশাক তো পুরনো হয়, ছিঁড়ে যায় তার দৃশ্য,- তুমি কি তেমন?
জীবন, দুঃখিত মুখ তুলে ধরে ঘুম থেকে উঠে।
নিজের আয়নার দিকে শুঁকে শুঁকে দেখে গন্ধ পাওয়া যায় কিনা!
তার পর নগ্ন হয়, নিজেকে আদর করে, সাজায়, গোছায়।
প্রেমের কবিতা লেখে সারারাত ধরে,-
আদর, নগ্নতাপ্রিয়। খুঁটে খুঁটে হিসেব কষে কত আলগা হল…
সমস্ত দৃশ্যের কাছে অন্ধকার ঘাপটি মেরে থাকে।
জীবন, দুঃখিত মুখ, সুখ চুরি করতে করতে
ভাবে কেউ পুরনো হবে না।

গোপনে সে ভালোবাসে নিজেকে কেবল।

 

উত্তর কলকাতা

আচমকা বিষাদ আসে, বসন্তহাওয়ায়, চুপিচুপি।
এটুকু রবীন্দ্রনাথ এখনও রয়েছেন তবে ? একা একা লাগে
সন্ধ্যার আলোয়, শোনো রেডিয়োয় সময় পিছোয়।
ঘড়ির উদাসী দৃশ্য, পাড়া থেকে পাড়ায় যাওয়ার
সরু সরু গলিপথ, দুপাশে সংসার শব্দ করে।
নির্জন দুঃখিত মুখ, অবসর নেওয়া চোখে এ শহরে আজও
দক্ষিণ, হাওয়ায় তার গল্প বলে যায়।
হয়তো এটুকু আলো আছে তাই লীলাময়ী তুমি
অকারণ কেঁদে ওঠো, অকারণ হাসো।

 

শিকড়

একটি গভীর দুঃখ রয়েছে কোথাও ঘাপটি মেরে
সমস্ত সুখের মধ্যে
হাহাহিহি ন্যাড়াপোড়া জাগ্রত বসন্তে
সকল বাড়িয়ে দেওয়া পায়ে কেন পিছুটান লেগে
কোথায় যে ফিরতে চায়, হয়ত নিজস্ব বাড়ি
রয়েছে কোথাও, খোলামেলা
যে ঘরে কখনও কোনও তালাচাবি নেই
দরজাও রয়েছে হাট
জানলায় খাঁ খাঁ করছে কোনও এক মাতৃমুখ
‘বেশি রাত করিস না আর, বাড়ি ফিরে আয়’
আমরা তো হারিয়ে গেছি
মাঝরাতে, যে কোনও রাস্তাই
ভুলে যায় কোথা থেকে এসেছিল, কোথায় চলেছে
তখন বুকের মধ্যে জেগে ওঠে গাছ
মনে হয়, কবে ফিরব
একটি গভীর দুঃখে, যেখানে বসন্তকাল আছে

ভিখিরি

আনন্দ ধুলোয় মেখে গ্রাস তুলছ অনন্তের ঘাটে
মন, বাঁধা ডিঙি এক, অর্ধেক রাজত্ব তার
নিয়ে গেছে স্রোত;
তবুও কে টান দেয়, কাছাকাছি ডাকে?
তবে কি পালিয়ে যাওয়া কখনও যাবে না আর-
ডুবে ডুবে জল খাওয়া হবে?
তুমিও তো তৃপ্তি নাও, কলসীতে ভরে নাও প্রাণ
জীবন ফ্যালফ্যাল করে ভেসে যায় বিস্ময়ের দিকে।
জল পায়ে উঠে যাও ঘাটে।
তোমাকে দেখেছি তাই জানি তুমি মাঝি
যতদিন টেনে রাখো,
ঘাট ছুঁয়ে থাকি।
দু দিকেই টান থাকে, জোয়ারে, ভাঁটায়
ডিঙিজন্ম সুখ-দুঃখে জীবন কাটায়।

 

সিরিয়া

এ শহরে প্রতিধ্বনি হয় না কোথাও

দক্ষিণ, তোমার কাছে খুলে রাখি আমার জানালা
এসো, ছুঁয়ে যাও

কোথাও নিরীহ কিছু শরীরে ঘাসফুল ফুটে আছে

প্রতিটি শিশুর মুখে
যীশুর বেদনা

কোথাও ফুঁপিয়ে কাঁদছে ক্ষত

একটি কোকিল শুধু থেমে থেমে ডেকে যায়
কোথাও, নিহত

এ শহর রক্তমাখা তথ্য খায়
পেট-ভরানো ভাতে

 

সন্ত্রাসের আগে

বাতাসে চড়ের শব্দ; ঘাড়-ধাক্কা দেওয়া হাওয়া বলে
তুমি আর নেই কোথাও;
বলে – চলে যাও। সব দরজাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
দরজাই তো বন্ধ হয়। জানলা দিয়ে মুচকি হাসে লোক;
দেখে কারা চান্স পেল না, বোঝে কারা হেরে ভূত
ভাঙা বিস্কুটের টুকরো পোষা কুকুরের দিকে মানুষ ছড়ায়।
মালিকপক্ষের লোক, চকচকে সবুজ দেখতে
চোঙা ফুঁকে বলে যায় নাম।
এসব দুচোখ বুজে সহ্য করে গেলে তবে
ইমিউনিটি আসে; চোখ জলে ভরে গেলে তাই
কেঁদ না কখনও। বেঁচে থাক।
অপমান আছে, তাই, সমস্ত দরজার কাছে
রাত-পাহারা আছে।

পেশেন্স

দুঃখ তো নিজেও কত দুঃখ পায়, সে কথা বোঝ না?
একা একটা মাঠে নেমে কত দূর দৌড়ে যেতে চাও?

মাঠ তো দিগন্ত নয়, তারও আছে চারিদিকে কঠোর সীমানা
তার চেয়ে দূরে গেলে তুমিও গ্যালারি

হ্যাঁ খেলা ঘুরতেও পারে, যতদিন তুমি নিজে নিজের বিরোধী
নিজেই ফেঁদেছ ফাঁদ্, চেলেছ কঠিন চাল, করেছ ডিফেন্স

গ্যালারি কেবল জানে কতটা রেকর্ড ভেঙে গেল…
কে কাকে হারাল আর কে ডাগ-আউটে!

হ্যাঁ খেলা ঘুরতেও পারে, কারণ তোমার খেলা শুরুই হয়নি

সন্ত্রাসের পর

আচমকা হাওয়ার কাছে খসে যায় সমস্ত সম্ভ্রম…
চললাম বলেও তবে চলে যাওয়া যায় না কখনও
ভিতরে গুনগুন করে খিদে
মীরার ভজন থেকে অনেকটাই সরে এসে
দেখি প্যারাশুট ধরে মৃত্যু নেমে আসে
বন্দুক ধর্ষণ করে ফুল
কোথায় হারিয়ে যাওয়া যায় এই পৃথিবীতে আজ?
হে সোনার কাঠি, তুমি
কাকে ছুঁইয়ে দিয়েছ এখানে?
শহরে দোলের মাস এসে গেছে তবু দেখো
বসন্ত নিজেও হয়ত বুঝে গেছে বেশিক্ষণ
টিকে থাকা যাবে না এখানে।

অভিসার

কৃষ্ণনাম জপি আমি, রাধারানি, যেরকম বাঁশি শুনে পুলকিত হয়
কত লক্ষ বছরের পুরনো এ বাঁশি
কত ক্রোশ হেঁটে এসে বেজে ওঠে প্রাণের ভিতর
এভাবে তোমার কাছে পলাশের বনের ভিতরে
আমিও যে চলে যেতে চেয়েছি কখনও
ওগো কৃষ্ণ বেজে ওঠো
সাগরপাড়ের গন্ধ ভেসে আসে পোড়া মানুষের
অধর্ম সন্ত্রাস করে, প্রেম নেই, মীরা নেই, রাবেয়াও মৃত
হায় কৃষ্ণ, বোবা চোখ, এইবার বাঁশি তুলে রাখো
অনেক আগুন রাস্তা পেরোলে তবেই প্রেম পদাবলী হয়
রাধারানি যাচ্ছে ওই, কাঁটা না, পায়ের ফাঁকে সভ্যতার ব্যথা ফুটে আছে

 

আত্মনং বিদ্ধি

আয়নার ভিতরে এক তালাবন্ধ ঘর আছে, সকাল-বিকেল
ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে তাকে বসবাসযোগ্য করে রাখা
বহুবছরের কাজ, আমি চাবি খুঁজে যাচ্ছি সেই কবে থেকে,-
তুমিও আমার হয়ে খুঁজে যাচ্ছ, নিজের ঘরে, প্রত্যেক আয়নায়
সেই খুঁজে যাওয়াটিও ফুটে ওঠে আমাদের, আমরা পা ফেলি
কাচের ভিতর দিকে, যেখানে দক্ষিণ শুধু, রয়েছে দক্ষিণে
চিরবসন্তের দেশ, কেন যে থাকে না প্রিয় আমার-তোমার
আয়নার বাইরে এসে, বুঝি না, দেখেছি সব হারায় সহজে।
আয়নার ভিতরে কেউ ঘেমে যায় না, তবু তার বসন্ত নিখুঁত…
সে-ই তো রঙিন, যার রঙের ভিতরে কোনও রাজনীতি নেই।

 

চিতা

এ হাওয়া সিপিয়া, গাছ মন খুলে রেখেছে সন্ধ্যায়
সবুজ রঙের আশা ছুটে গেছে ঈশ্বরসন্ধানে
নিজেকে কুঠার করো, বলেছিল কেউ, আজও সেই স্বর
শোনা যায় অন্ধকার গাছে
মানুষ আঘাত করে, নিজেকেও সেভাবেই, স্বভাব যেমন।
সমস্ত সভ্যতা তবে পোড়া গাছ, কাটা গাছ? গ্রাম থেকে সরে যাওয়া
গ্রামে গ্রামে শহরের হার্মাদবিজয়?
বসন্ত নিয়তি, তাই ফুটে ওঠে ফুলে, যদি
ইটের পাজার মধ্যে প্রাণ জন্ম নেয়।
ওদিকে আগুন জ্বলছে দেখি রোজ, যে আগুন শহর জ্বালায়
গাছের শ্মশানভূমি
নিজেরাই পুড়ে পুড়ে চিতাকাঠ হয়।

 

নিজস্ব প্রতিনিধি

জলের গভীর লিখি। লিখি এ জীবন দুঃখময়।
মনের ভিতরে শব্দ
রাত নটায় শাটার নামানোর;
প্যাডেল ঘোরায় রিক্সা, এ পাড়া, ও পাড়া।
তোমার চোখের মধ্যে দেখি মফস্বল পাড়া
বড় বেশি একলা হয়ে আছে।
রাতের গভীরে শুনি কারা কারা হেঁটে যায়
সেই সব পথে। তারা, কড়াও নাড়ে না।
তুমি শ্বাস নাও, শ্বাস ফেলো-
যেন একবুক
আশাবাদ নিয়ে তুমি ডুব-সাঁতারে পেরোচ্ছ শহর
আর পিছু পিছু আসছে
ধর্ম, দল, নির্বাচন, রাতের বাজার।
আমাদের মাঝখানে শুয়ে থাকে নির্বিকার খবর কাগজ।

আহ্নিক

ধূপের ধোঁয়াটি সরু, অল্প একটু গিয়ে,ভেঙে যায়
ভেসে আসে কোলাহল, বেসামাল বারান্দায় কৌতূহলগুলি;
সংসার ঘরোয়া তাঁর, তবু
ঠাকুর-দেবতার ছবি সামনে নিয়ে মাতৃমূর্তি, পুজোয় বসেন।
যেন সেই বালিকাটি আজও রান্নাবাটি খে’লে
কত না মনের কথা বলছে তার পুতুলের কাছে।
প্রাণের পুতুল তার, কতজন্ম পেরোনো ঈশ্বর
না-শুনে না-বলে কতদিন বলো চুপচাপ থাকেন?
ঝড় আসে, বৃষ্টি আসে, রোদ বুড়ো হয়।
মা-আমার পুজোয় বসেন।
ধূপের ধোঁয়াটি, শুধু, অল্প একটু গিয়ে, ভেঙে যায়

 

বাড়িওয়ালা

সময়, তোমার শব্দ একা একটি ঘরে বেজে ওঠে।
অথবা ভিড়ের মধ্যে, চকিতে সাবধানবাণী যেন;
নিশুতি রাতের মধ্যে, কুয়াশায়, বৃষ্টির ভিতর
সমস্ত নির্জন গাছ নীরবতা জানায় প্রকৃত।
একাকী মানুষ যায় ঘরের বাইরে, আর
ঘরের ভিতরে ছোটে যারা বাইরে আছে।
নিজের সমস্ত আয়ু খেতে খেতে একা
সময়, পুরনো লোক, শান্ত, হেঁটে যায়।
বাজার, দোকান, রাস্তা, প্রেম, আয়ু, নগদবিদায়
দরজায় দরজায় ঘোরে, ভাবে ঘর ফাঁকা পাওয়া যাবে।

রহস্য

উন্মাদ বৃষ্টির মধ্যে ট্রামের জলরঙ তুমি, তোমাকে বুঝি না।

বুঝি না বলেই আমি ভালোবাসি, যত গর্জে তত সে বিদ্যুত!
বিদেশি আবহ বাজে তোমার দুচোখে-

রহস্যফাইলে বন্দী ধোঁয়াটে কেসের গায়ে প্রামাণ্য কিছুই
লেখেনি কাহিনিকার, জীবন যেমন
নিজের দিকেই বড় বোকা হয়ে থাকে।

কিছুই কি চাওয়া যায়? তোমার বুকের মধ্যে হাজার ভিড়েও
ধর্মঘটগামী এক শহরের বডি পড়ে আছে।

গোপনে লোপাট করো, প্রমাণ রেখো না

নেকড়ে

বিদ্যুৎ, তোমার খিদে। আমি বলি বৃক্ষ বৃক্ষ আশা
রেখো না কী করবে ভাবো কপালে ভোকাট্টা ঘুড়ি অন্যের বাগানে
নেমে যায়।
তোমার হাতে তো থাকে সুতো ছেঁড়া লাটাই, বালক
মধু ও মৌচাক থেকে বিন্দু বিন্দু কী মসৃণ স্বাদ গন্ধ টিপটপ জীবন
বলি সেই ছোট্ট থেকে হচ্ছে না কিছুই তবু সন্দেহ সন্দেহ
কোথাও রয়েছে শত্রু কেউ চায় না কপালের চাঁদ
ভাসাও কাগজনৌকো তবে, জলে নিজের ছায়ায়
প্রণাম ভাসাও তুমি, দ্যাখো স্নান আসলে যুবক
আমিও প্রস্তুত তুমি শুয়ে পড় ভাসমান, দিগন্তে কাপড় ঝুলছে
আমি নারায়ণ বলব চুপিচুপি ঝুঁকে শুষে নিয়ে
অগস্ত্য-ইচ্ছের কাছে কোনও প্রতিরোধ তুমি ভাসিয়ে দেবে না

এবার বিবাহ হলে বিদ্যুৎ তোমার কাছে পেতে দেব অসংযত মাঠ

 

হিন্দোল ভট্টাচার্য, পেশার সূত্রে বিজ্ঞাপন জগতের সঙ্গে যুক্ত, যদিও কবিতাই জীবন। একটি নামী বিজ্ঞাপন সংস্থার কপি রাইটার, আছে সাতটি কাব্যগ্রন্থ। পেয়েছেন বীরেন্দ্র পুরস্কার। জগত্‍গৌরী কাব্যের জন্যে। সদ্য পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কার।

5 Replies to “

গুচ্ছ কবিতা

হিন্দোল ভট্টাচার্য


  1. খুব ভালো লাগলো। একটা যেন আগেরটার চাইতেও ভালো। একবার পড়ার পর আবারো পড়তে হয়।

  2. মুগ্ধতা। ‘মাঝরাত’ বা মধ্যরাত্রি সময়টা বড়ই জটিল। হারিয়ে যাওয়ার। শাসন করার..

  3. নেকড়ে, পেশেন্স, সন্ত্রাসের আগে একটু বেশী ভালো লাগল… মুগ্ধ

  4. দুর্দান্ত! একসঙ্গে এতগুলো ভালো লেখা, ভাবাই যায় না!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *