গুচ্ছ কবিতা

শুভ্রা মুখোপাধ্যায়


রঙের দু-এক পোঁচের পর কেউ যেন ফেলে রেখে চলে গেছে, আর ফেরেনি। অনধিক চারটি শব্দে অবস্থানের ঘোর কাটছে। গতির সাপেক্ষে একেবারে স্থির ট্রেনের দরজার একটু একটু পিছনে চলে যাওয়ার দৃশ্যকে কি যেন একটা বলে? অথবা এই মেপে রাখা বিষাদের সামনে সামঞ্জস্যপূর্ণ ঝুঁকে রাখার সহজ নামের বিষয়ে ভাবতে ভাবতে তরলের বোধ আসে। পাশ ফিরে নিরুত্তাপ শুয়ে থাকাকেই সমগ্র সত্তা মনে হয়। পা ভাঁজ করা, হাঁটু কিছুটা বুকের কাছে উঠে এসে স্থির হয়ে। এভাবেই ঘুম আসে : শান্তিপূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং ক্রমান্বয়ী ঠান্ডা। যেন সাদা চাদরের নিচে দলাদলা লালে নিজেকে উচ্চারন হতে দেখি। মেঘ থেকে আত্মহনন নামে, তারপর পাথুরে দৃশ্যে অকপট থ্যাঁতলানো আমি,মুখে বাবলগাম চিপকানো। আরও নিচু হয়ে আসি, ঝুঁকে পড়ি, আঙুল ডুবিয়ে দিয়ে গলা মাংসের স্তুপ থেকে প্রয়োজনীয় একটাকার কয়েন তুলে নি। আলগোছে জল ঢালি,সম্ভাবনাময় সমস্ত নথিতে, তারপর তুলে রাখি।

কি বিভ্রমে রাস্তাঘাটের নোনা ধরিয়ে দি,জল থেকে তুলে রাখি সুস্থিত আধপোড়া মাছ। মাথায় থ্যাঁতলানো গাছের সংখ্যা বাড়ে, ফেস্টুনে নেমে আসে পায়ের পচনদৃশ্য। ফুটপাতে থুপকি মেরে বসে একটি খড়িওঠা মেয়ের রান্নার রসুন থেঁতো করে দিতে দিতে আড়চোখে সব চেটে দেহজ সুখ আসে। রক্তে ক্রমশ পোকাদের দখল বাড়ে, পিঠে অাততায়ী ফুটো, চোদার বাহানায় ঢোকা আরেকজন লিঙ্গসহ পোকা হয়ে যাচ্ছে আর রক্তে ঘুনের সাথে গাঢ় রঙের কান্না ছড়িয়ে যাচ্ছে। ন্যুব্জ কোমর,হামাগুড়ি একটি সুলভ ভাবনা এবং একটি বিশেষ মুহূর্তকাল। নিজেকে মাদী শুয়োর মনে হয়, পুরুষ্টু ঠোঁট কামনা করি : ভীষণ ইচ্ছে করে কোনও শুয়োরের বাচ্চার জন্ম দিতে। রঙ অসম্পূর্ণ,অসমতল ;সমীকরণ হীন আমি ছড়িয়ে পড়ছি কারও কারও রাত্রিকালীন ঘুমের পর্যাপ্ত গভীরে। এই সাদাকালো লিলিথ জন্মের আগে সম্ভবত প্রেমিকা ছিলাম।

 

শীতবাড়ি পেরিয়ে আসছি। বাড়ির রঙের নাম গোলাপি, ছাদ থেকে সমীপেষু উপত্যকা। যে গোলাপি রঙের হিল্লোল আমাকে মুগ্ধ করে রাখত তার ডাকনাম লেডি ম্যাকবেথ। লাইনে দাঁড়িয়ে চাল কেনে, চিনি কেনে; নিতান্ত ব্ল্যাকে যৌনসুখ ও কন্ডোম কেনে, তারপর নিতান্ত সতীপনা দেখিয়ে বিবেক চোদায়। রঙ থেকে দূরে থাকার সমূহ কৌশল শিখি, মাদী গাই সন্তান জন্মের উপযোগ খুঁজে নিয়ে যেভাবে বাকিসব নালিবন্দী ঘাসের ইতিবৃত্ত শেখে।

শীতবাড়ি একটি রঙের প্রলোভনমাত্র হয়ে ওঠে জীবন্ত ফানুসের দখলে যে রাত্রি চলে যায় তার নাম সোহারি অথবা জলের কোনও রুচিশীল আদিম অক্ষর ভেবে টিকে থাকি। শীতবাড়ি সুপ্রস্তাবে জামা তুলে ধরতে বলে,লাল জামা,জাম রঙ ইষৎ সবুজ। কৌশলে আনন্দ আসে, আব্বুলিশ আব্বুলিশ… একটু খেলার ডাক উদভ্রান্ত অক্ষরের মত চেপে বসে। শীতবাড়ি একটি নিশ্চিন্ত রঙের প্রলেপ হয়ে ওঠে।

আমি যে জন্মের কথা জানি তাতে জলের সম্ভাবনা কম,কম বলে ট্রেন কিছু সংলগ্ন স্টেশন পেরিয়ে যায়। জলকে অসামাজিক বোধে পেড়ে ফেলতে সাধ হয় ক্রমশ। ফিরে আসি,ছুঁয়ে ছুঁয়ে বেঁচে থাকি যা কিছু অপারগতা বলে জানি ; তরল ঘুমের মত জানি। দাঁত,দাঁতের আগায় লেগে থাকা থোকা থোকা মাংসের দিব্যি নিজেকে খাদক ভাবি,যে ছিঁড়েখুঁড়ে রক্তের অন্তিম খেতে পারে। ভাবি কোনওসময় মানুষের প্রতিনিধি ছিলাম, আরও তীব্ব ঘুম এসে সমস্ত সমাধান ঢেকে দেয়।

 

এই গলিতে রোদ ঢোকে না– এসব বাড়াবাড়ি স্বরবৃত্তে। আসলে রোদ ঢোকে,যখন খুব অপ্রয়োজন, সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে অথবা রোদের খোঁজে গলি ছেড়ে বড় রাস্তার মোড় অবধি উঠে গেছে। কিছুক্ষন রেলিং-এ চুপচাপ,ফিরে যাওয়া চিহ্নরূপ বোঝে না। ধরো এই হা হন্যের মত ঘুরে ঘুরে যাকে খুঁজছি,সে এলো।শ্যাওলাধরা বাসস্টপে ঘন্টা তিনেক অপেক্ষা করে ফিরে গেল। আমি তার একটু আগে ক্লান্তিকর খানাতল্লাশ শেষে লাস্ট বাসে উঠে গেছি। ইঁট বেরিয়ে আসা বেঞ্চ কোনও দাগ মনে রাখে না, আমাদের আসা-যাওয়া ক্রমিক ভুলের মত বারবার ঘুরে ফিরে আসে।

অপেক্ষার নামান্তর ছাদের ঘর। খুব বিপদজনক এলোমেলো-এলোপাথাড়ি। আমার মধুবালার চোখের মনি কটা, হালকা লালচে চুল, ঠোঁটের ঠিক মাঝখানে তিল। দৃশ্য ভিখারীর কাঠের পায়ের মত চড়া, তেলজল পড়া ক্ষতের মত দগদগে। আমার মধুবালার কালো রঙ, সুদৃশ্য নখের আঙুল। দৃশ্য আরও… নীলের ঘুমন্ত কোনও শেডে ছাদের ঘর ডুবে যাচ্ছে।

যে গলিতে রোদ ঢোকে না,বড় গাড়ি ঢুকতে ভরসা পায়না সেখানে মধুবালা ঢোকে। কেটলি আর চামচের টুংটা, গৃহস্থ অনুভূতি লালা ঝরায়, পা চাটে। তালাবন্ধ ঘরের আনাচকানাচ ফিনাইলের চড়া গন্ধে ভরে ওঠে,পেচ্ছাপের বালতি পরিষ্কার হয়। মধুবালার গোলাপি কুর্তি,অফ হোয়াইট প্যান্ট, অটোকে হাত দেখিয়ে উঠে যাওয়ার সাবলীল ভঙ্গী। সে এলে গলিতে চর্চা বাড়ে,উৎসাহে গলে পড়ে কার্নিশের ফার্ন। সন্ধ্যেগুলো একটু দেরি করে আলো জ্বালাতে উঠে যায়।

শীত কমে আসে,কুকুরের বাচ্চাগুলি সমর্থ হয়। কাঠের পা সমেত ভিখারী উঠে যায় চটের বস্তা ফেলে। রেলিং-এর রোদ পড়ে এলে একটি আধা যুবতী মেয়ে প্রকাশ্য ড্রেনে পাছা ঝুলিয়ে রাখে, মুতের গন্ধে আশপাশ গুলিয়ে আসে। দৃশ্য পটহীন, পরজীবী এই বেঁচে থাকাটুকু ফেলে রেখে আমি আর সে পাশাপাশি হেঁটে যেতে থাকি অনন্তের দিকে। নীচু কুলডাল, অশ্বত্থ, কাঁকুরে রাস্তাঘাট, শ্যাওলা ধরা বাসস্টপ। মধুবালা কোনও একজন অপরিচিত মেয়ের নাম হিসেবে কান্ট্রি লিকারে ডুবে থাকে।

কালকের অবশিষ্টাংশ থেকে শুরু করার কথা ভাবলেই আমার ভোকাবুলারি কমে আসে, শব্দ আংশিক হতে হতে কাগুজে নৌকার সবচেয়ে ছোট ভার্সান হিসেবে দেওয়াল আলমারির গায়ে মিলিয়ে আসে । এসব সময় এক ছাত্রের বাবার কাঁচুমাচু মুখের সংলাপ মনে পড়ে যায়। যে বারবার করে বলেছিল ” ছেলেটা ল্যাঙ্গুয়েজ গ্রুপে খুব খারাপ দিদিমণি। ” আর আমি তাকে পরীক্ষা পাশের আশ্বাস দিয়ে সমার্থক আর বিপরীতার্থক শব্দের লিস্টিং শিখিয়েছি শুধু। এসবের পর যতটা সম্ভব কুঁকড়ে শুই, আমার প্রথম মাস্টারব্রেট দেখে ফেলা মেস মালিকের মেয়েকে মনে মনে বলি, ” নিড আ ভার্জিন গার্ল ‘ অথবা ভার্জিন একজন সেমি পুরুষ। কিছুটা ন্যালা গোছের, যে পদ্মপতা চিনতে ভুলে গেছে,ফর্মাল শার্টের সংজ্ঞা ভুলে গেছে। রাসবিহারী থেকে বাসে উঠে যে হারিয়ে গিয়েছিল,আর বাড়ি ফেরা হয়নি বলে ঘরের চৌক শেপকে গোল ভাবে। তাকে নিয়ে অন্যকিছু একটা প্ল্যান করি,সেসবে যৌন সংবেদন খুব কম থাকে বলে তাকে আমি টলটলে জলের হদিস দিতে দিতে জ্বরের ঘোর আর সকালের আলোর মধ্যবর্তীতে গুম হয়ে যাই। ক্রমিক নম্বর মেনে রুলটানা খাতা আর সহজাত প্রতিবর্তক্রিয়ার শর্তহীন খিদে উঠে এলে একটা টিনের ছাউনিতে দৌড়ে যাবার রাস্তায় মিঠে সবুজ শ্যাওলারা মাখামাখি করে। সমস্ত নুড়ি লাপিসলাজুলি,ফিরোজা, অসম হলদেটে । যা কিছু এই ঘোরে দেখি তার সবটুকু বলত পারিনা, কিসব অসমতল দৃশ্যের সামনে আমি ঘুরে বেড়াই। বাউন্ডুলে হয়ে যাই। সিঁড়ির খোঁজ ছিল তবুও একটা ভাঙাচোরা পাঁচিলের কাছে দায়বদ্ধ থেকে ডুবে যেতে কোনও শান্ত জলের শীতলতায়।

এসব প্রলাপের কথা মাত্র। এডিটেড ছবিতে ক্রমাগত ব্যাকস্পেস মেরে বাঁশ পুঁতে যাওয়া যার বরাবরের পছন্দ তাকে রঙের বালতি ধরালে যেমন হয় । রিনিদির লিপস্টিক চুরির দৃশ্যে যে মাদক ছিল অমনটা আর পেলাম না বলে অনুষঙ্গ খুঁজি, বান্ধবীর কোমরে চুমুর সাথে যথেষ্ট চাটুবাক্য দিয়ে আরও কিছু ছুঁয়ে নিতে চাই। সত্যি বলতে কি এই কেউ আমাক জড়িয়ে নিশ্চিন্ত বোধ করে সেটাই অসহ্য লাগে ক্রমশ। তখন ধানখেতে ছুটে বেড়াতে ইচ্ছে করে , যদি কোনও ধারালো শিষ আঙুল কেটে দেয়। তখন আমার বাথান পাতা পোড়ার গন্ধও ভালো লাগে। পাখিদের ঘুম এলে আরও দ্রুত রাত্রি নেমে আসে।

আজ অন্ধ সাজার দিন। ভালো করে বলতে গেলে আজ বোবাকালা, নুলো কিম্বা ল্যাংড়া সাজার দিন নয়, শুধুমাত্র অন্ধ সাজার দিন। মাথার ওপর ভাঁজভাঁজ হয়ে মেঘ জমে আছে তাতে উড়ে এসে বসেছে লম্বা গলার বেঢপ পাখি, লকলকে কালো সাপ আর একটা হলদে বনা। মাথার ওপর মেঘ তুলোতুলো হয়ে বসেছে,ঘাড়ের ওপর অন্ধ শকুনি, সদ্য দানা খেতে শেখা নরম নরম কাঠবিড়ালি। চোখ ছেড়ে দিয়েছি,কানের ওপর পেঁজা পেঁজা মেঘ, ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন আজ আমার অন্ধ সাজার দিন।

সব দৃশ্য সাদাকালো লাগে। ন্যুব্জ হই,নিজেকে ঘোরাই। মাথাকে নিরাপত্তা দিতে যোনিতে লুকিয়ে রাখি, গুটিকয় পায়ের পাতা আড়ালের বন্দোবস্ত করে। ওপাশ থেকে যোগাসন মনে হয়,সাদাকালো ছবির সারিতে ঢুকে পড়ে নিজেকে বিপন্ন লাগে। হরিণের ভীতু ছবির মত মনে হয়,আঁশ আরও দলাদলা পাকিয়ে উঠেছে।আরও দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের ভানে পড়ে থেকে থেকে একজন চোরের কথা ভাবি।যে আমাকে প্রথম মোবাইলের থেকে বেশি লোভনীয় ভেবে প্যান্টি সরিয়েছিল,আঙুলকে শিখিয়েছিল পুরুষাঙ্গের সমকক্ষতা। সেসব আধখ্যাচড়া যৌনতার পর পাশ ফিরে প্রেমিকাকে দেখি, নগ্নতা চেটেচুটে বুঝি আমি সব সাদাকালো দৃশ্যের ভিতর টকটকে লালরঙ মিশিয়ে ফেলেছি।

কালোমতো মেঘ,চোখ খেয়ে উড়ে গেছে ক্লান্ত শকুন। এখন দৃশ্যের পর মাঠ মাঠ সাদা আর কালো। স্বপ্নে যেমন মাঝেমাঝে দেখি, ভাঙা রেললাইন পেরিয়ে যাওয়ার রাস্তায় ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস আমাকে সমেত এগিয়ে গেল। কতগুলো দলাদলা আমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে,আরও কতগুলো দলাদলা আমি খবরের কাগজের ভেতরের পাতা দিয়ে নিজেকে নিকিয়ে নিচ্ছি, মাছ মোড়ানোর মত মুড়িয়ে মুড়িয়ে ঢেকে রাখছি রাস্তার একপাশে। স্বপ্নে রক্তের রঙ কালো দেখি,চ্যাটচ্যাটে গভীর কালোর মধ্যে ডুবে যেতে যেতে মনে পড়ে মোটা মোটা শিকের কালো কাপড়ের একটা ছাতা। ঘোর লেগে আসে,দাঁতে জিভে নিজের মাংসের বোধ তীব্র হয়। চুমুতে ঘোড়ার চোয়াল চেপে ধরে বুঝি আমার মনুষ্যেতর জন্মের কথা লিকলিকে সাপের মত মগজে চারিয়ে গেছে। ক্রমশ অস্তিত্বে লোমশ ভাবনা আর নখ। বুঝি অন্ধ হয়ে গেছি,বয়ামে বয়ামে শুধু সাদাকালো সেনশুয়াস দৃশ্য, একটু লাফিয়ে উঠে গলা স্পর্শ করি, কালোরঙ সমস্ত শীতকাল ধুয়ে নিয়ে সেথের মগজে গিয়ে পড়ে। মাথার ওপর জুড়ে তুলোতুলো মেঘ,ভারহীন,আয়ত। অন্ধ আমার শুধু মহাসেথ হতে ইচ্ছা করে,সারাগায়ে উল্কির ফুটে ওঠা, দুটি দাঁতের পরিবর্তন… টের পাই। যোনিপথ ফাটিয়ে চোখহীন মাথাটুকু বের করে আনি ; জিভে এক বৃদ্ধ শকুন…

এই বিষাদ থেকে ঝরে যেতে যেতে মনে হয় মরে যাওয়া ভালো । এমন অর্থহীন বেঁচে থাকা,সমস্ত বুদ্বুদের মত মায়াবী অথচ কি তীব্র ক্ষণস্থায়ী। এখন সমস্ত ফসলের ঋতু শেষ বলে মনে হয়। ডাল থেকে পাতাদের ঝরে পড়া হলদে আশার মত জামার কলারে লেগে ছিল। সে সব দিনের কথা বালিকারা ভুলে গেছে, তারা আজ সম্ভাবনাহীন রুগ্ন যুবতী। বালকেরাও ভুলে গেছে সেসকল দিনলিপি, এখন তাদের মাথায় চাপচাপ ফুলের সুগন্ধ। সমস্ত দিনের মধ্যে ধুলোর আবর্তে নেচে নেচে সবকথা, সবকটি কাজ যার মনে থেকে যায় তাকে ঘিরে ঘুনিঘুনি জাল। তারাদের আলো ছুটে এসে তাকে ছুঁতে চেয়ে পাল্টা প্রশ্নে ফিরে যায় বড় কোনও গ্রীলওয়ালা বারান্দার কোনে।

সাদা, পাশে কালোরঙ দেওয়াল। যদিও খবরে প্রকাশিত হয়েছে কালোরঙের কোনও দেওয়াল হয় না, শুধু সেই জেলবন্দী ঘন জালের ভিতর দিয়ে একটানা রাস্তা মেপে মেপে কোনওসময় সেই কালোদেওয়ালের কাছে পৌঁছে যায়। সেখানের মরচেধরা ঘড়ি থেকে উপশম পেড়ে এনে অযথা ছড়িয়ে দেয় মেঝেতে, শ্যাওলাধরা উঠোনে। চকচকে পেরেক এনে ঠুকে ঠুকে জানলায় ফুটো করে। হাতের কামাল দেখানো বন্ধুরা কথা দেয় একদিন তুলে নিয়ে যাবে,সে যত সুক্ষ ফুটোই হোক। সেখান দিয়ে কতবার হেঁচড়ে বেরোতে গিয়ে প্রথমে চামড়ার মসৃণতা চলে গেছে তারপর ক্রমশ ঘোরের মধ্যে পিছল সাপের মত রফতার চামড়ার নিচে ও ওপরে। গু মুতের গন্ধ চটকাতে চটকাতে পাগলও বোঝে সে বেসিক্যালি চদু, ওটুকু ফুটোতে তার তেলতেলে সর্বস্ব ঢুকে যাবে শুধু সে নিজে কোনওদিন এঁটে উঠবে না ওই খাপে। তাই আবার সেই ছায়াবাজির খেলায় মন দেয়, খুব বেশি করে মন দিলে এখন তাড়াতাড়ি পৌঁছে যেতে পারে কালোরঙে, দেওয়াল থেকে দ্রুত পেড়ে আনতে পারে মরচেধরা উপশম আর বিষাদের গুণিতক।পিঠে তার জ্যেৎস্না লেগে আছে..

আমার মৃত্যুর কথা যারা ভুলে যাবে তাদের আগাম অভিনন্দন। নিছক টাইপ করা একটি স্বেচ্ছামৃত্যুর কথা ভুলে যাওয়াই সাংবিধানিক। মনে পড়ার জন্য যেসব যৎসামান্য অছিলার প্রয়োজনীয় তার ছিঁটেফোঁটা ছিল না বলেই আপনাদের অভিনন্দিত করার জন্য রেখে গেলাম কাটা হাত, রাইগার মর্টিস হয়ে যাওয়া জিভের তলা আর বিস্মৃতি।

ধূসর পাতার ওপর ঝরে পড়ছে কৃষ্ণচূড়া, পায়ে ঠেকে সরে সরে যাচ্ছে রাধাচূড়ার হলুদ। প্রিয় পুরুষটির কাঁধে মাথা দিয়ে জলের ওঠাপড়া দেখছি। দুপাশের ভিন্ন রঙ একরেখায় এসে মিশে গিয়ে এলোমেলো ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। এরকম শুদ্ধস্বরে বাঁধা সময় ঠিক চোখ পড়ে পরিতাপহীন হত্যাদৃশ্যে। আধখানা খাবারের জন্য চলে গেলে,বাকি আধখানা ছটফটিয়ে খানিকখন নিজের মৃত্যু নিয়ে একটা চাপা বিলাপ করে থেমে যায়। এইসব মরে যাওয়ার কথা বরং মনে রাখা ভালো, শিকারের প্রথাগত শিক্ষার মত ঘিলুতে চারিয়ে নিলে সহজে বোধগম্য হয় খাদ্যশৃঙ্খল। অর্থাৎ কখন কোন থাবার নিচে গুটিসুটি মেরে ঢুকে নিজেকে মৃতদেহ হিসেবে সামাজিক করে তোলার গঠনমূলক আলোচনারত সাধারন মানুষদের তুমি সহজে পাশ কাটিয়ে যেতে পারা যায়।

এসব বরং থাক। মরে যাওয়ার আগে বেশি ভাট বকা লোকেদের ডোমরা পছন্দ করে না। বিড়ির ভাগ চাওয়া বরং তাদের কাছে আনন্দের হয়ে ওঠে। লোকটা কথা কম বলত,তারপর মরে গেছে শুনলে দেখেছি ওরা এমনিই মায়াময় ভঙ্গিমায় বিড়ি দেশলাই বাড়িয়ে দেয়। তাড়াতাড়ি অন্দরে চালান করে শ্মশানবন্ধুদের শাস্তি মুকুব করে। তারাও ঘরে ফিরে একটু হাত পা ছড়িয়ে চা খায়,সিগারেটে সুখটান দেয়। নিউজ চ্যানেল সার্ফি করতে করতে মাছের পেটি দিয়ে কুঁতকুঁতে বেড়ালের মত ভাত মেখে খায়। তারপর ঘুমের মধ্যে গিয়ে পলাশ, শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ার সাথে পুড়ে যাওয়া কমলা আকাশটুকু এক করে ফেলে।

শুধু কিছু সামুদ্রিক কাঁকড়ার কাছে আমার স্পর্ধা রেখে চলে গেছি জেনে গুটিকয় ছোট নৌকা ইতরের ভিড়ে মিশে ছাই ঘেঁটে যাবে।

 

স্টেশনে সব ট্রেন দাঁড়াচ্ছে না, শুধু মাঝেমাঝে বৃষ্টির থামে। এসব দিনে নিজেকে ফুল ভিকটিম ভাবতে অসাধারন লাগে। বানানভুল অথবা ভুলে যাওয়ার অজুহাতে কেউ বা কারা আমার মগজ জলের তলা থেকে ঝাঁকনি দিয়ে তুলে এনে শুকোতে দিয়েছে হ্যাঙারে… হ্যাঙারে, কি হ্যাঙারে। জেলি জেলি তরলে জল জট পাকিয়ে দিচ্ছে, ব্রাউন কাগজে মোড়া লাল লাল লজ্যাঁরি। আমার সমতল থেকে উঠে আসা আত্মীয়রা আমাকে যেভাবে দেখছেন আমি তেমনটা ঠিক নই। চোখের হাইপাওয়ার একটা প্রিন্টেড তরলে চুবিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে আমি জুতোজামা সমেত সেলেব হয়ে গেছি। সমস্তই পূর্নাঙ্গ তরলে ঢাকা,কেউ রগড়ে উঠিয়ে দিচ্ছে না বলে আমাকে একটা গোটা মিউজিয়াম মনে হচ্ছে।

একটা সাদা পায়ের হাঁ মুখো পাখি,লোম ঝরা ঘাড়,পিঠের ওপরে বাসি হয়ে আসা ডানা, তাতে আয়ত নীলচে রঙ। মেধা জাতীয়করণ পক্রিয়ায় বিক্রি হয়ে গেছে, এখন তাদের আমি ফুড কন্টেনারে দেখি। চিরস্থায়ী মিউজিয়ামের কর্তব্যে উপদেশ দিই- এই কাপে এতটা মেশাও হে। খিদে ছাড়া জীবন্ত কোনও অনুভূতি একদিন আমার ছিল না,সব পেন্ডিং জল আমাকে এখন ডুবিয়ে দিতে পেরে শান্ত হয়ে আছে। রক্ত রক্ত ঘোলা জলকে মনে হল টিফিনবক্সে জমা যন্ত্রণা,আমি পয়সা কম পেয়েছি তুলনামূলক ফাঙ্গাস বেশি। যেভাবে তুলোর বল জমতে জমতে সব আলোহাওয়াহীন টেডিদের প্লাস্টিক জন্ম দিয়ে সার্থক করে তেমনই আমার শোবক্স ভরে উঠছে খুচরো পয়সায়।

কেউ রগড়ে না তুলে দিলে এরপর আমাকে একটা ফ্যাকাসে কালো ব্লাউজের পিঠ হয়ে পালাতে হবে। জলজলে শ্যাম্পুর বোতলে যারা আমার আঙুলে আঙুল ছুঁইয়ে সাহায্যের অঙ্গীকার করল, তাদের বলা যায় একটা ঘামাচি ভরা পিঠ এবং বাসন্তী জরি,ফলস পাড়হীন হেঁটে যাওয়ার তুলনামূলক পাঠশালা।

একটা চলন্ত মিউজিয়াম পালিয়ে যাচ্ছে। হাওয়া থেকে খবর ভেসে পৌঁছে যাচ্ছে যতদূর যাওয়া যায়। আজ রাতে সমস্ত অ্যান্টনাওয়ালা বাড়িগুলো হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকবে,সহজতম রাস্তায় পালানোর অভিসন্ধিহীন একটা জীবন্ত মিউজিয়াম আজ পালিয়ে যাবে। চারিদিক নিভে এল আলোর শো খতম, আমার সমতল থেকে উঠে আসা আত্মীয়রা এখনও আমাকে মিথ ভেবে কয়েন ছড়িয়ে যায়…

 

আসলে বিপ্লব বলে কিছু হয় না। কিছু লোকের চোয়াল ঝুলে পড়ে, কিছু লোক সময়ের আগে ডাঙায় উঠে আসা মাছের মত বসে থাকে – খাবি খায়। অনেকগুলো জলচৌকি পরপর সাজিয়ে রেখে যারা চলে গিয়েছিল নির্দিষ্ট সময়ের শেষে ফিরে এসে নামহীন জলচৌকি কমলা দড়িতে বেঁধে নিয়ে তারা ফিরে গেলে মাঠ জুড়ে কুকুরছানার কান্নার মত ধূধূ পড়ে থাকে।রোদের আলসেমি কমে কমে কার্নিভাল হয়,আর পলস্তরাহীন ইঁটের বাড়ির দাঁত ভোঁতা হলে হাতে তার কমণ্ডলু জোটে।

যেখানে পাতার রঙে, ফুলের রঙে বিভেদহীন উচ্চারণ; সেখানে তোমাদের গল্পের শেষে আমি বুঝিয়ে বলি আসলে বিপ্লব বলে কিছু হয় না,যা হয় তাতে জলচৌকির পাশে ভাতের থালার ওপর পোড়া লঙ্কা উঠে গিয়ে একবাটি ডাল আসে আর একটা লোক লঙ্কাপোড়ার গন্ধ খুঁজতে খুঁজতে ভাতের থালা থেকে ডালের বাটি হামাগুড়ি দিয়ে ঘুরে বেড়ায়।গু-মুত নিকিয়ে ফেলে থালার চারপাশে, সবশেষে টের পায় তার জলচৌকি অন্যকেউ টেনে নিয়ে গেছে কমলা সুতোয়।রুপোলি মাটিতে চাঁদ আসে একটু একটু করে এগিয়ে আসে অবৈতনিক,নিতান্তই অবৈধভাবে লোকটা আলো চুরি করে এনে জানতে পেরেছে আলোর নিচে কাজল জমে থাকে। আসলে যা স্বপ্নের ঘোর,মাটি কেন্দ্রিক সমস্ত ঘুমন্তদের সে ছুঁড়ে দিতে চায়। ভাবে বিপ্লব মানে আগুনের নিচের কালো, কালোর ওপরের আরও জ্বলে ওঠা আগুনের নিচে আরও গভীর কালোতে ঘুমন্তদের স্বপ্ন ডুবে যায়।

কোনও এক অপাপ বিলাসী ভোররাতে এসবের ঘোর কাটে, জল বোঝে ফিরে যাওয়া অবসম্ভাবী, বিপ্লব বলে কিছু হয়না আদতে। তাই সে চিহ্নের মত পুতুলের মাথা আর পা আলাদা ভাসিয়ে নিয়ে গেলে ধড়ের পর্যাপ্ত অংশ ঘুমে পড়ে থাকে।

১০

আমি শুধুমাত্র ঘরে ফিরতে চেয়েছিলাম ; আভাসে ভেসে আসা কথা লক্ষ্য করে যেসব ঘরের টান ছবির মত মাথাতে ফুটে ওঠে তেমনই একটা ঘরের কোনাতে পৌঁছানোর ইচ্ছে আমার জামার ওপর লালার দাগ স্পষ্টতর করে দিয়ে চলে গেছে। চলে যাওয়ার রাস্তাটি ধূসর, নীল শামুক শাবকের চোরা কান্না দিয়ে চেরা। আপাত ঢালাইহীন উপত্যকার শেষে রাস্তাটি হারিয়ে গেলে আমি বুঝি আমার ফেরার পথ ক্রমশই মাকড়শার জালের ক্ষুদ্রতম সুতো হয়ে ঝুলে আছে। ঘুমিয়ে পড়ার আগে যাবতীয় তথ্য মাথাতে ঢুকিয়ে দিয়েছে আমার অপারগতা।

এখন মাথার ভিতরে জল,হৈ হৈ ফাঁকা। সেখানে আরামে প্রজাপতি ওড়ে বাকি অর্ধেক মাথার ভিতরে সবুজ মাছের চাষ। ডানাতে পলকহীন চোখ,চোখে কতগুলি সুস্বাদু বিকেল। আমি জলের দৃশ্যকে সহজ ভাবি,সহজকে জলের দৃশ্য। আর মৃত্যু একটি সমগ্র উপত্যকার মত নেমে আসে, ছুঁয়ে চলে যায় জল। বরফের ঘরে প্রজাপতি নেমে আসে, তুলো তুলো আমাকে উড়িয়ে দিয়ে ফিরে আসে চাঁদ।

প্রারম্ভিক প্রতিটি দৃশ্যকালে পটুয়ার ছায়া আর ছায়াবাজি সংশ্লিষ্ট হয়।জলকে মোহময় মনে হয়, মোহকে জলের মরচে পড়া আবরণ। আমি গুলিয়ে ফেলেছি সমস্ত রাস্তাঘাট। নিজেকে ঘড়িতে রেখেছি।আমি লম্বাটে ঘন্টার কাঁটা – প্রতিটি ঘড়িতেই আমি লাভজনক সময় থেকে দুমিনিট দূরে দাঁড়িয়ে থেমে গেছি। এই অভিশাপের মত চন্দ্রমাস শেষ হলে পটুয়ার আঙুলে আঙুল ফেরত দিয়ে আমি সম্ভবত শুধু ঘরেই ফিরতে চেয়েছিলাম।

এখন আমার পায়ের দৃশ্যে অবাক রঙিন মাছ, মাথাতে কালো-নীল … অসম্ভব প্রজাপতি।

১১

মাথার ভেতর অসংখ্য দরজা খুলে গেছে,রঙ ইতিউতি রঙ ছড়িয়ে আছে চারপাশে। মাথার ভিতর ফাঁকা,উই ধরে গেছে সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তির গোড়াতে -আগাতে। কেমন পশম থেকে লোলচর্ম বৃত্তি খুলে এসে রঙে মেশে, কে যেন আদায় করে সুদের মাসুল।আমি একপেশে মাথাতে সুড়সুড়ি দেওয়া ক্ষতিকর প্রবনতাহীন শ্বাপদের সাথে সহবাহে জেনেছি প্রত্যয় আসলে অনির্দিষ্ট কিছু। হারানো গল্পের ভাঁজে মায়ের গন্ধ, আসলে গন্ধের মত করে পোস্তবাটা লাগানো রয়েছে আঙুলে।আমি তাকে প্রতিদিন চেটে নিতে নিতে বুঝি রঙেদের প্রবল অন্তর্ঘাত,বুঝি শিকারের সমূহ কৌশল। পারদর্শিতা আমাকে মেঝেতে নামিয়ে এনেছে,পারদর্শিতা আমাকে শিখিয়েছে বুক দেখতে নেই, মেয়েদের বুক দেখতে নেই। অথচ এই আমি বড্ড কাঙালের মত কাঙ্খিত সমস্ত সুখ ফেলে বুক দেখি, মেয়েদের বুক; ম্যানিকুইনের সাজানো বুকের মধ্যে গন্ধ ঢেলে দিই।আমার অস্থির লাগে চামড়া পুড়ে আসে,বারুদের নেশা গন্ধ বাবার থেকে প্রিয়। আসলে চামড়া বলতে যা বুঝি তার নিচে আসল কোনও মাংস নেই, আছে শুধু পুঁটুলি পুঁটুলি রক্তের আভাস। তাকে এড়ানোর মত যোগাযোগ মাথায় ঘটেছে তবু শরীরে ঘটেনি। আমিও শ্বাপদ খুব,প্রতি শ্বাসে ট্যাবুহীন যৌন নির্ভরতা।

আরও কত ইচ্ছের সাথে ক্রমাগত মিশে যাই,যেতে যেতে বুঝি আমার লক্ষ্যের তীর কার তূণে সাজানো রয়েছে আর আমি আদেখলা বেল্লিকের মতো এখানে ওখানে ছুটে কিছু ঝুটো কাঠি জুটিয়ে এনেছি। বরং এখন বেশ তৃপ্তি আসে, ক্লান্তি আসে। মেঘ থেকে নেমে আসে অপর নারীটি। ম্যানিকুইনের সুডৌল বুকের ওপর চোখ থেমে থাকে,মন থেকে হাত কসাইয়ের মাংস কেটে কুচিয়ে ছড়িয়ে দেয় গ্লাসের অন্দরে আর আমি তাতে কুচিকুচি বরফের মত গলে পড়ে কারও সামনে উঠে যাই,যেতে চাই।যাওয়া হলে গেলে বুঝি আজ রাতে কুয়াশা নামার কথা পাখিরা পালকের গায়ে ছিটিয়ে রেখে গেছে।

এযাবৎ সপ্নের রঙ নীল, ফ্যাকাশে হলুদ আর খোলামকুচি সাগ্রহে মেশানো। আমি টলতে টলতে এপাড়া-বেপাড়া হয়ে ঘরের চৌকাঠে ঢুকি।মনে হয় কেউ তুলে নেবে, অবিন্যস্ত স্মৃতির আমাকে কেউ তুলে নিয়ে কাপের নরমে এনে দেবে দুধ। ঠোঁটের ওপর দিয়ে ঢেলে দেবে মধু,আর বন্য এবং খাপছাড়া আদরে নেমে আসবে আমারই চোখের ওপর। ঘোরের সমস্ত ঋণ নিয়ে আমি মরে যাব,যেভাবে মরার পর প্রতিবার শুধু বোধ হয় প্রানী নয় কোনও আদিম মানুষ নয় আমি গাছেদের উত্তরসূরি। যেকোনও গভীরে আমি দাঁড়িয়ে দেখেছি স্যাঁতস্যাতে যতটা উঠে এসেছে ততটাই শিকড়প্রবণতা আমাকে ঘিরে ধরে,মহানন্দে নেচে নেচে যায়।ঘোর আরও ঘোর তীব্রতর জ্বরের দুপুরে ,আমাতে অসম্ভব মৃত্যু জেগে থাকে।

 

১২

আলোর সাথে অসংখ্য ভোঁতা পট বমি করার ফাঁকে গোপন ছবির মত নীল শব্দ আমাকে যাচ্ছেতাই গুলিয়ে দিলে বুঝতে পারি সমস্ত মধ্যস্ততাকারীদের সাথে আমার চুক্তি হয়ে গেছে। তারা প্রত্যেকেই জেনেছে আমি অর্ধেক,বাকি অর্ধেক টানলে ঢুকে আর বেরোতে পারেনি। জলের ওপর ছপছপ করে অাধখানা হেঁটে বেড়ায়, মাথায় ফিরে আসে আসন্নপ্রসবা বেড়ালের মুখ,পা তুলে মরে যাওয়া কয়েকটি কুকুর, যাদের ফোলা পেটে মাছি বসার দৃশ্যে আমি নাকে রুমাল চাপা দিয়ে পরবর্তীর খোঁজে উঠে গিয়ে দুটি মরা কাকের শরীর দেখে ঘটনার কাছে ফিরেছি।

এখন রোদের গল্পে যারপরনাই বিরক্তি আসে, শান্ত রাস্তা আর উপশমে ঘৃণা হয়। দাওদাও কাঠের ওপরে হাঁড়ি, নিজে সেদ্ধ হই। হাড়মাংসরক্তমেদমজ্জা, সুস্বাদু রান্নার মত ফুটপাতে ছড়িয়ে পড়ার পর মনে হল আয়তন কমে গেছে। আমি টুকরোতে এসে ঠেকেছি,সেখানে বিষণ্ন রোদ,মরা বিকেল আর চায়ের কাপের ওপর সবুজ আস্তরন। ছোটোখাটো হয়ে গড়িয়ে যাওয়ার বোধে মনে হল এই তো মরে যাব। এখন জলের কাছে নিজস্বীর সমস্ত কালো দিয়ে চলে যাব। আয়তন আরও ছোটো হতে হতে গড়িয়ে যাবে অদৃশ্য মৃতদেহকে পাশ কাটিয়ে। রুমালে নাক চাপা কেউ জল থেকে পরবর্তীতে উঠে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে আর আমি আর অকারণ কাকুতি মিনতিতে থুতু ফেলে আরও তীব্র ভেসে যাব।

জলের সকল দোষ আমার ওপরে এসে লাগুক।আমি কোনও পূর্ণিমার রাতকে নিস্তরঙ্গ করে একা একা হেঁটে যাব সাদা মাঠ আর লাল লাল রাস্তায়।জলের সমস্ত দোষ আমার শরীরে এসে লাগুক,আমার ঋতুর কাছে মুখ নামিয়েছে যে যুবক তার সাথে বিচ্ছেদ হোক অসহিষ্ণু চাঁদের আলোয়। আমি একা, শুধু একা একা ফিরে যাব, জলের পাশেই কোনও ক্ষীণ শিশিরে যেখানে অপেক্ষাকৃত মৃত্যু সুস্পষ্ট বলে বোধ হবে। আমার আয়তন আরও ছোটো হয়ে গুলিয়ে উঠবে সমস্ত রক্তমজ্জায়,কত যে আলোর রেখা ম্লান মনে হবে। তবু এই ফিরে আসা, আহ্! এই অসংলগ্ন একাকী ফিরে আসা,আমার সমস্ত চুক্তি বাতিল হয়েছে জেনে কতগুলি সামুদ্রিক শব্দ হাওয়াতে ভেসে যাবে। আর আমি জলের সমস্ত দোষ নিয়ে মরে যাব,ভেসে যাব অথবা হাওয়ার সাথে বালখিল্য করে সময় কাটিয়ে দিয়ে বালিরঙ তলানিটুকুর সাথে অনর্থক হেঁটে যাব…

১৩

একটি সবুজ মথের খোঁজে এতদূর হেঁটে আসার পর, যদি সে এভাবে তাকায়! রাস্তাকে ফালাফালা করেছি নখের আঁচড়ে,গোগ্রাসে গিলেছি সমস্ত নুড়ি-পাথর-গুল্ম এবং শিশুর কঙ্কাল,তারপর যদি সে এভাবে তাকায়? কিছু একটা খুব স্বাভাবিক ঘটনার মত ঘটে যায়। ছটফটে রক্ত চুপচাপ ডানপাশ ঘেঁসে শুয়ে পড়ে। মর্গ প্রনম্য ; তাকে তুলে নিয়ে যাই আতুর ঝোঁপঝাড়ে। কোলে বসাই, ঠোঁটে চুমু খাই,গাল ছুঁয়ে কিছুক্ষন ঘুমের ভান করে পড়ে থেকে মাটি খুঁড়ি। এ হাতে অনন্তের মাটি আর ক্লেদ উঠে আসে,গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে। তাকে আরও যত্ন করে শুইয়েছি,তারও বেশি যত্নের মাটিচাপা।

সপ্তাহ দুয়েক বাদে ফিরে আসি,যেভাবে পালিত কুকুর ফেরে প্রিয়জন অথবা নিয়ন্ত্রক কলারে। মাটি জুড়ে নরম ঘাস, হলুদ-বেগুনি ফুল, যেন সে আদর রেখে ভোররাতে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঈশ্বরী সম্মত মুদ্রা দেখি ; ভাঁজ করা হাঁটু, সাড়হীন রুপোলী গোলক। জড়োসড়ো করে রাখা কালো সিল্ক, চ্যাপ্টা আঙুল ; আগ্রহে জড়িয়ে রাখি। স্বাদু মাংস জিভে এসে লাগে, নিজস্ব মন্থন শেষে উঠে আসে ডোরাকাটা সাপুড়ের ঝাঁপি।

একটি সবুজাভ রঙের খোঁজে এতদূর হেঁটে এসে দুহাতে কুড়িয়ে নিয়ে যাই উচ্ছিষ্ট প্রেমিক। আঙুল তুলি ; সানকিতে বাদামী তেল, বারান্দায় বেড়ালের অপলক চোখ, সমস্তই একটানা ফিনাইলের গন্ধের মত চেপে বসে থাকে। রঙের পায়ে পায়ে দৌড়ে গিয়ে আরও তীব্রতর কামড়ের বোধ। আমার মাথায় বসে কোনও এক অতন্দ্র উন্মাদ বাধ্য করে, বাধ্য করে। মথের ডানার রঙে লাল। আমি ঘোরের আঙুল নিয়ে সবুজ খুঁজতে খুঁজতে আরও লাল, সাদা- কষকষে কালোরঙ মাড়িয়ে মাড়িয়ে আসি। কোনও জোরালো ধাতব ধাক্কার অপেক্ষা। তিনটি মাংসের খন্ড হয়ে ছড়িয়ে যেতে যেতে বুঝি ; একটি মথের খোঁজে, একটি সবুজ মথের খোঁজে এতদূর চলে এসে মাথায় সমুদ্র বেড়েছে। জলের শিকড়বোধ প্রকৃত খাদকের মত রতিশব্দ গিলে নেয়, ভয়ের কোমল রাগ – আচ্ছাদন গিলে নিয়ে ফিরে যেতে চায়। মনে হয় হনন একটি আত্মরতির নিজস্ব স্বাদু কাহিনী।

 

১৪

দৃশ্যগুলি গিরগিটির মত,ছবি থেকে নেমে পরিতাপহীন আমাকে চেটেচুটে চলে যায়। দাঁতের পাটির মধ্যে স্বজন-সুজনের ঘাড় ঘোরানো হাসি, আর…গাড়িতে ল্যাভেন্ডার গন্ধ। সহজতম পদ্ধতিতে উঠে বসা, সমস্ত শালীন কামড়, এই তো উরুসন্ধি -চোখের মনি-ক্যাটক্যাটে বহিরঙ্গ লিপস্টিক। শুধু তরল, গাঢ় রঙ-হালকা রঙ, বহনক্ষমতা পরিপাটি করে সাজানো। কথা বলার ভঙ্গীতে ঠোঁট ফাঁক হয়ে আসে, চেরা জিভ ক্লিটোরাস হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে আর একটু উঁচু ডালে বসে তামাশা দেখে। তামাশা দেখে, দুগালে আলগা করে টোল আঁকে, সিঁড়ির প্রথম ধাপে নেমে আসাকে একটি সাময়িক উত্তেজনা মনে হয়।

এই আমি গাঙুর পাইনি বলে আরও তীব্র পরিচ্ছনতা, মোহহীন আঁচড়ে অভ্যাস। গিরগিটিগুলি ঘুমহীন, মাথায় হেঁটে হেঁটে উপযুক্ত জায়গা খোঁজে। ডিম পাড়ে, আরও কিছু শিশুর জন্মে মাথায় মাদল বেজে ওঠে। নিজেকে সরীসৃপ ভাবনায় নিয়ে গিয়ে পা-হাত গুটিয়ে গুটিয়ে একদম সেঁটে রাখি। আগ্রহ আরও বাড়ে, মাথা থেকে ল্যাভেন্ডারের গন্ধ মুছে যায়…

রঙ,কয়েকশো ভারী ভারী রঙের নাম বলতে পারিনি বলে আমার সরীসৃপ জন্মে যারা অসম্মত হল,তাদের গায়ের রঙ ফ্যাকাসে সবুজ অথবা টকটকে কমলা। পরিবর্তে ব্যাঙের চামড়া,পরিবর্তে সোনালি তরল। পরিবর্ত হিসাবে আমি একটি আধচেনা পুরুষের পিঠে ছুরির ফলা হয়ে বিঁধে যেতে চেয়ে দেখেছি, সেসব অতিরিক্ত সরল।আগ্রহ কমে আসে, ঘুম পায়… যে কোনও যৌনতা পাখার শব্দের মত একঘেয়ে, পরিণতিহীন। শুধু একটি সরীসৃপ জন্মের আগ্রহে, গাড়িতে ল্যাভেন্ডার গন্ধ… নির্দিষ্ট ভঙ্গিমায় উঠে বসা অভ্যাস করে ফেলি।

 

শুভ্রা মুখোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৮৯, বাঁকুড়া) নতুন দশকের কবি, বলিষ্ঠ সাহসী স্বর, আখ্যান ভাঙা অপরিচিত গদ্যভাষা-মাধ্যমে কবিতার নির্মাণ, নবীনের ধর্ম স্বীকারোক্তি ও কল্পনা তাঁর কবিতার রক্তের মত প্রবাহমান।

 

One Reply to “

গুচ্ছ কবিতা

শুভ্রা মুখোপাধ্যায়


  1. ‘একটি সবুজাভ রঙের খোঁজে এতদূর হেঁটে এসে দুহাতে কুড়িয়ে নিয়ে যাই উচ্ছিষ্ট প্রেমিক।’ দারুণ। সবকটা লেখাই ভালো লাগল।
    আপনার কি বই আছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *