শেষ পৃষ্ঠা

জমিল সৈয়দ


অনেক অদ্ভুত মফঃস্বল শহরে আমাকে ঘুরে বেড়াতে হয়, যেখানে ধূসর মলিনতার কুয়াশার ভেতরে এক-একটা উজ্জ্বল দিন সহসা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে যায়, সেদিন কতিপয় সদ্য-তরুণ কবি তাদের কবিতার খাতা নিয়ে এসে বলে, ‘শুনতেই হবে আমরা কী লিখছি’! চাকরি না-পাওয়া, লেখাপড়া বন্ধ করে দেওয়া এই তরুণেরা আজ কী এমন নতুন কথা বলবে, যার জন্যে আমাকে উৎকর্ণ হয়ে উঠতে হবে? নতুন লিখতে আসা তরুণেরা প্রথমেই এই দ্বিধায় পড়ে থাকে — তারা কী লিখবে, কীভাবে লিখবে, কোথায় লিখবে! ছন্দ, অথবা ছন্দ নয়, এই বিতর্ক থেকে প্রথমেই প্রবেশ করে এক জটিল ধাঁধায়, কবিতা কি হবে খুব সহজ, সরল, হ্রস্ব পংক্তি যুক্ত; মঞ্চে উঠে তিনশো লোককে শুনিয়ে তৎক্ষণাৎ মুগ্ধ করে দেওয়া যাবে; না কি কবিতা হবে রমেন্দ্রকুমার বীরেন্দ্র রক্ষিত—যাঁদের পিছনে দিনের পর দিন কেবলই অনুসন্ধানে নিরত থাকাটাই একমাত্র শর্ত।
বিনয় মজুমদারের কাছে জেনেছি, কোন্‌ কবির ক’টি লাইন তাঁর মুখস্থ আছে, তাই দিয়ে তিনি কবিদের শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করেন। কিন্তু যাঁদের স্মৃতিশক্তি ততো দূর প্রখর নয়, মুখস্থ বিদ্যা ততো দূর আয়ত্বে নেই, তাঁদের কেবলই অনন্তকাল টানা পাঠ করে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। আমার স্মৃতি ততো দূর প্রখর নয়, তাই এটাই নিয়তি যে, একই গ্রন্থ একশবার পড়ে যেতে হয়; বারবার ঘুরে ঘুরে পড়তে হয়, যেভাবে পড়ি সংযুক্তার ‘অবিদ্যা’, ‘বসন্তপ্রকৃতি’, সুব্রতের ‘সহ্য করো বাংলাভাষা’, ‘ঘন মেঘ বলে ঋ’, হীরক ভট্টাচার্যের ‘জাঙ্ক ইয়ার্ড’। বয়স বেড়েছে ঢের, তাই শিশু খাদ্য জাতীয় কবিতা কি আমাদেরকে আর ততো দূর টানবে! খুব কম বয়সে ‘ড্রিরি ড্রাঁও স্ট্রোকেতে দেখি বন্যা জাগে চুলে … তিন নম্বর স্ট্রোকেতে নিতম্বতে ঢেউ’ … এই ধরনের তুষার রায় চুম্বকের আকর্ষণ ছড়াতেন; তারপর সেইসব চঞ্চল দিনগুলি সাপের খোলসের মতো পরিত্যাগ করে এসেছি বলেই কি আজ এইভাবে নিশ্চল, অসন্তুষ্ট, অতৃপ্ত জীবনযাপন করতে বাধ্য হতে হবে? যারা খুব সহজেই খুশি হয়ে ওঠে, প্রতিটি কথায় হো হো করে হেসে উঠতে পারে, কিছুতেই মনে সন্দেহ বা বিতর্ক জাগে না, সেইসব পাঠকেরাই কি ধন্য, যাদের জন্য ব্রততী বন্দ্যো শুভ দাশগুপ্ত ও তোচন ঘোষ অফুরন্ত আনন্দের ভাঁড়ার খুলে রাখবেন।
কার মতো লিখবে এইসব তরুণেরা? ‘না, কারুর মতো নয়, কেবল নিজের মতোই’—এরকম উত্তর দেওয়াটা আমাদের মতো বয়স্কদের পক্ষে অবশ্যম্ভাবী। বয়স বেশি হয়ে গেলে এই জাতীয় উপদেশামৃত অমোঘ বলেই মনে হয়। হয়তো প্রত্যেকেই নিজ নিজ হস্তাক্ষরে নিজের মতোই লেখেন; একেকজনের মনোগঠনের অন্তর্বয়ন এক-এক রকম বলে প্রত্যেকের বাক ভঙ্গি ও অগ্রগমন ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু তবুও কোথাও অগ্রজ সহোদর কি পিতৃব্যের চোখের চাউনি, দাঁড়ানোর ভঙ্গি, বা ঘাড় কাত করে ‘না’ বলার আদল হঠাৎ-হঠাৎ মিলে যায় না? ‘তোমার মুখের সীমানা যেন ঢাকা না পড়ে’ বালিকার উপরোধ থাকা সত্ত্বেও রবি যখন শ্মশ্রুগুম্ফময় হয়ে উঠলেন, তখন মহর্ষি বা জ্যোতি দাদার সামান্যতম আদল কি একটুকুও ছিট্‌কে এসে পড়েনি তাঁর শরীরে? মনীষার ভালোবাসা ছিল মাহুতের মতো উঁচু, ব্যক্তিগত লিখন ভঙ্গিমা হারিয়েছি বাদাম পাহাড়ে; অথবা, প্রত্যেকের ঘরে ঘরে একটি ঝরনা রয়েছে—এসবের তির্যক আলো যদি এসে পড়ে নতুন কবিদের খাতার পাতায়, আমি অত্যন্ত আহ্লাদিত হবো, কেন না, আমাদের পূর্বজদের উজ্জ্বল কবিতাগ্রন্থগুলি এখনও অবিশ্রান্ত আলোর সঙ্কেত পাঠাচ্ছে আমাদের অন্ধ নয়নে।
যে তরুণ কবি, অলোকরঞ্জন শঙ্খ ঘোষের কবিতায় মনোযোগী নয়, বা, মণীন্দ্র গুপ্ত যুগান্তর চক্রবর্তী শৈলেশ্বর ঘোষ সুব্রত চক্রবর্তী কারুর কবিতাই পড়লো না সে, তাহলে সেই অন্ধ তামসিকতার ভেতরে তলিয়ে যেতে যেতে সে নতুন কী কথা বলবে, যা তার পূর্বসূরিরা বলেননি, যখন তার ভাষাজ্ঞান শব্দভাণ্ডার রঙের পরিচয় কিছুই সম্পূর্ণতা পায়নি। ‘আমি কিছুই পড়ি না, শুধু নিজের মতো লিখি’, এই ঘোষণা হয়তো সেই জন্ম বধিরের প্রতিবন্ধকতাকে প্রকট করে, যে কানে শোনে নি বলে কথাও বলতে পারে না। বিহারীলাল চক্রবর্তীর কবিতা কি পড়েন নি কিশোর রবি? নজরুল ও মোহিতলালকে অনুসরণ ক’রে এগিয়ে আসেননি কি জীবনানন্দ? … প্রতিভা ও স্ব কৃতিত্ব তো তাই, যা পূর্বসূরির সীমাবদ্ধতাকে ডিঙিয়ে এগোতে থাকে। প্রথম সিঁড়িটি থেকে ব্যাঘ্রের উল্লম্ফনে পৌঁছে যায় ছাদের উপরে।
কোন্‌ পত্রিকায় লিখবেন নবীন কবি? যদি বড়ো পত্রিকায় ডাক মারফৎ লেখা পাঠিয়ে শেষপর্যন্ত ছাপা না হয়, তবে নিজেরাই না-হয় একটা ছোটো পত্রিকা বের করে নিজেদের কবিতা মুদ্রণের সুবন্দোবস্ত করে ফেলতে হয়; নচেৎ খোঁজ নিতে হয় ওই বড়ো পত্রিকায় কবিতা নির্বাচনের দায়িত্বে কে আছেন—তাঁর সঙ্গে সুমধুর সম্পর্ক গড়ে তুলে বড়ো কাগজের রন্ধ্র পথ আবিষ্কার করার উদ্যোগ নিতে হয়। এতেও যদি এগোনো না যায়, তবে নিজ পৃষ্ঠে স্বঘোষিত প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ছাপ লাগিয়ে বেশ লড়াকু কবি হিসেবে নিজেকে পরিচিত করা যায় বিদ্বৎসমাজে। সম্ভবত আত্মপ্রকাশের উদগ্র বাসনা নিবৃত্ত করা খুবই কঠিন কাজ, বিশেষত কম প্রতিভার লোকেদের কাছে, এবং খুব কম লোকই আছেন যারা প্রদর্শনকামিতার স্বভাব দোষ থেকে মুক্ত।
তবু এটাই আমাদের সৌভাগ্য যে সারা পৃথিবী নয় ঊষর মরুভূমি, কোথাও ক্বচিৎ থেকে গেছে এক চিলতে মরুদ্যান। সমগ্র পৃথিবীটাই নয় একটানা মৃত্তিকা খণ্ড, কোথাও কোথাও ঊর্ধ্বে উঁচিয়ে ওঠে পর্বতের শৃঙ্গ; কোথাও থেকে যায় বহতা নদীখাত। তাই কোচবিহারের হাওয়ার গাড়ি, ঘুঘুমারি গ্রামে অরুণেশ ঘোষ যখন কেবল কবিতাকেই নিজের অলৌকিক বায়ুযান হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন প্রশ্ন কি জাগে না—তাঁকে কলেজ স্ট্রিট পাড়ায়, কফি হাউসে, আকাশবাণী বা গলফগ্রিনে নামতে দেখিনি কেন কোনোদিন? তিনি ‘দেশে’ লিখেছেন, লিখেছেন ‘ক্ষুধার্ত’, ‘অজ্ঞাতবাস’, ‘কবিতীর্থ’ বা চার পাতার ছিন্নপত্র ‘এ মাসের কবিতা’তেও। যে কোনও সম্পাদক তাঁর কাছে কবিতা প্রার্থনা করলে অবশ্যই প্রত্যুত্তর পাওয়া যায়। তাঁর কাছে শুধু লেখাটাই এক আমৃত্যু বিশ্ব পৃথিবী, কলকাতা বা সুতারকিন স্ট্রিটের প্রসঙ্গ একান্তই বাহুল্য। সতীনাথ ভাদুড়ি পূর্ণিয়াতেই কাটিয়েছেন জীবন; কোচবিহারেই থাকেন অমিয়ভূষণ, তাতে তাঁদের লেখালেখির অসুবিধে হয়েছে কোথায়। ‘ঘরোয়া’ নামে একটি অধুনালুপ্ত সিনেমা পত্রিকায় অমিয়ভূষণ উপন্যাস লিখেছেন, শুচিবায়ু নেই তাঁর। নির্জন দ্বীপে বসেও রচিত হয় প্রকৃত সাহিত্য; বন্ধ জেলখানার ভেতরেও রচিত হতে পারে কবিতা। শুধুমাত্র লেখালেখির জন্যে দলবদ্ধতার প্রয়োজন হয় না, যেটুকু হয় ক্রিকেট ফুটবলের মাঠে। যিনি লেখেন, তিনি অবশ্যই এক নিঃসঙ্গ মানুষ; ছাপানোর ফিকির খুঁজতে বেরুলেই নানারকম দলে ভিড়তে হয়—তখন লেখাটাই যায় হারিয়ে।
অগণন ছোটো পত্রিকায় অগণন নতুন কবিকে দেখি, তাঁরা কার মতো লিখছেন? নিজের মতো? শঙ্খ বা উৎপলের মতো? এসবের উত্তর খুঁজতে গিয়ে খুবই ব্যথিত হয়ে পড়ি; পাঁচ-ছয়জনের বন্ধু গোষ্ঠীর প্রত্যেকে প্রত্যেকের মতো লিখছে, অর্থাৎ একজন ঠিক অন্যজনকে নকল করতে সমুদ্যত। এই পর্যায়ক্রমিক নকলনবিশির বৃত্ত থেকে জন্ম নিচ্ছে এক-একটি ছোটো কাগজ; একজন অন্ধ পথ দেখাতে চাইছে অন্য অন্ধকে। দুঃখ এই, ছাপার অক্ষরে কিছু লেখা হলেই তাকে কবিতা বলে অভিহিত করতে হয়; মঞ্চের উপরে কিছু পাঠ হলে তাকেও কবিতা বলে হাততালি দিতে হয়। নবীন কবিদেরকে পথভ্রষ্ট করার পক্ষে অনুকূল অনেক চোরা খাদ ইতস্তত ছড়ানো আছে। ‘ কবিতাকে সহজ হতে হবে ’ — এই উপদেশ বাণী কানে এলেই নবীন কবিরা দুদ্দাড় লিখতে বসে যান: সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, ইত্যাদি। যখনই কোথাও গুরু কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, তরুণেরা ছন্দ জানে না, অমনি দলে দলে কবিতার ক্লাসে ভর্তি হয়ে অন্ত্যমিল-অনুপ্রাসে ভরপুর লিখতে থাকে : প্রবর্তকের ঘুর চাকায়, যায় মহাকাল মূর্ছা যায়।
অনেক দূরবর্তী ছোটো শহরে যাই, মহিষাদল, আলুয়াবাড়ি রোড, কিংবা ধূপগুড়ি, কিছুদিন বাস করি, সেইসব শহরের ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলির নবীন কবিদের সঙ্গে পরিচিত হই, প্রায়শ সন্ধেবেলা তাদের কবিতা শুনে দিনাতিপাত করি এবং ভাবি, আশ্চর্য, এইসব তরুণেরা যারা অগ্রজ কবিদের কবিতাগ্রন্থ কখনও পড়েনি, কখনও জানে না জগদীশ গুপ্ত বা কমলকুমার কী লিখেছেন, কখনও শোনে নি গণেশ পাইন ও গণেশ হালুইয়ের ছবির কথা, তবুও কী দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে তারা কবিতা লেখে, পত্রিকা ছাপায়, পাড়ার লাইব্রেরি কক্ষে কবি সম্মেলন ডাকে, তাদের উচ্চাভিলাষ তাদের ছোটো শহরের চৌহদ্দিতেই নিয়ন্ত্রিত থাকে—এই আত্মবিশ্বাসকে কী নামে ডাকবো; উপেক্ষা করবো, নাকি সমাজ ও মনস্তত্ত্বের জটিল প্রক্রিয়াগুলি নিয়ে গবেষণায় ব্যাপৃত হবো। হয়তো এসবই অনাবশ্যক; নদীর ধারে ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে কবিতা লিখতেন ‘কবি কুণ্ডু মশায়’—বিভূতিভূষণের বর্ণনাতেই শুনি—“ পল্লীগ্রামের অজ্ঞাতনামা কত কবি যশঃ প্রার্থী হতভাগ্যদের সঙ্গে আমার কতবার পরিচয় ঘটেছে, কোনও সাহিত্যসভায় তাদের স্থান হয়নি কোনদিন। অথচ তাদের মধ্যে প্রকৃত কবি মন, কল্পনার উদার প্রসার, ছন্দের বা কোনও শব্দের সৌন্দর্য সম্বন্ধে জ্ঞান নিতান্ত দুর্লভ নয়—কিন্তু তাদের নেই কি, তাও আমি জানি। তাদের নেই বর্তমানের উপযোগী বিষয় নির্বাচনের ক্ষমতা। তাদের দৃষ্টি ১২৯০ সালের বাংলায় পড়ে আছে আজও — ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের, দাশরথি রায়ের প্রভাব তারা আজও কাটিয়ে উঠতে পারে নি।” (কবি কুণ্ডু মশায় / আশ্বিন ১৩৪৯)
সহজ স্বভাবকবিত্বকে অবশ্যমান্য বলে অনুভব করি আমি; উপহাস করার দুর্মতি যেন কদাপি না হয়। কিন্তু উপহাস করি সেইসব সুপ্রচুর বিখ্যাত কবিকে, যাঁদের নাম আমরা খুব নিখুঁতভাবেই জানি, কিন্তু তাঁদের একটা কবিতাও আমরা পড়ে উঠতে পারিনি এযাবৎ।

 

(পুরনো বানান অপরিবর্তিত)

 

জমিল সৈয়দ ৭০ দশকের এক প্রধান কবি। অজানা কারণে তিনি কবিতা থেকে দূরে আছেন। তাঁর হাতে শুরু হয় পদ্যচর্চা। তাঁর সম্পাদিত এ মাসের কবিতা নামক কবিতাপত্র সমসাময়িক অনেক কবির বীজতলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *