শীতকাল, বাংলা কবিতা ও মুকুন্দ দাস

জমিল সৈয়দ


চতুর্দিকে কবিতাপাঠের উৎসব, এই শীতকালে। কবিরা দৃশ্যতই উষ্ণ হয়ে আছেন, উত্তেজনায়, আনন্দে। আর একদল কবি সবসময়ই ক্ষিপ্ত ও কটুভাষী হয়ে থাকছেন, অনুষ্ঠানে বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায়। হয়তো প্রত্যেক কবিই ভাবেন, প্রতিটি অনুষ্ঠানেই তিনি কবিতা পড়বেন; প্রতিটি কাগজেই যেন তাঁর কবিতা ছাপা হয়; প্রতিটি সংকলনেই তাঁর কবিতা অন্তর্ভুক্ত হোক। হয়তো প্রত্যাশা থাকাটা অনুচিত নয়; হয়তো যারাই লেখেন তাঁদের ভেতরেই আত্মবিশ্বাস নামক বস্তুটি সমধিক প্রবল। নবীন কবিও ভাবেন, তাঁর লেখা হয়ে উঠেছে অনন্য মাস্টারপিস্‌; যেহেতু দু’চারটি ছোটো কাগজে মুদ্রিত হরফে সেসব প্রকাশিত হয়, অতএব কোনও অনুষ্ঠানেই তাঁকে বাদ দেওয়া যাবে না।
কিন্তু উল্টো দিকে থেকে, অর্থাৎ অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে, বা পত্রিকার সম্পাদকের দিক থেকে ভেবে দেখলে বলা যায়, কোন্‌ কবিকে আহ্বান করা হবে, কাকে বাদ দেওয়া হবে, এসবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁদের আছে। এই সিদ্ধান্তের বহিঃপ্রকাশ দেখেই বোঝা যায় নির্বাচকমণ্ডলীর পছন্দ-অপছন্দ অভিরুচি কোন্‌দিকে বইছে। সম্পাদকের /পরিচালকের সিদ্ধান্ত বা মনোনয়ন আমার সঙ্গে মিলবেই, এভাবে ভাবা ঠিক নয় মানুষের ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য, নিজস্ব রুচি, নিজের বন্ধু গোষ্ঠী — এসবের প্রত্যক্ষ প্রভাব প্রতিটি নির্বাচনেই এসে পড়ে। কবিতাপাঠের কোনও সরকারী অনুষ্ঠান — তার পিছনেও কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষ থাকেন — তাঁদের পছন্দ-অপছন্দ ও বিচার পদ্ধতির উপর সমগ্র অনুষ্ঠানটি নির্ভর করে। যদি ওই পরিচালকমণ্ডলীর বদলে ভিন্ন একটি পরিচালন-কমিটি এসে যায়, তবে আমন্ত্রিত কবিদের নামের তালিকাতেও রদবদল ঘটবে — বলাই বাহুল্য। কিন্তু অনুষ্ঠানটি যেহেতু একটি গণতান্ত্রিক সরকারের বদান্যতায় সরকারী কোষাগারের ইন্ধনে সংঘটিত হয়, সেই হেতু সেখানে পশ্চিমবঙ্গবাসী প্রত্যেক কবিরই মুক্ত পেশী প্রদর্শন কেন থাকবে না – এরকম হট্ট মেলায় যারা বিশ্বাসী তাঁরা সুস্থ চিন্তার পরিচয় দেন না।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে অহরহ কবিতাপাঠের অনুষ্ঠান হয়ে চলেছে; বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কবিরা কবিতা পড়ছেন, তাতে কারুর আপত্তি চলে না। উদ্যোক্তাদের অভিরুচিকে মান্য করাটাই শালীনতা। কিন্তু, প্রতিটি স্থানেই কেন আমাকে ডাকা হচ্ছে না — নিজেকে এমন অপরিহার্য কবি ব্যক্তিত্ব ভেবে বসাটা মানসিক ব্যাধি বিশেষ। এমন তো নয় যে, মঞ্চের উপরেই হবে মল্লযুদ্ধ; নির্বাচিত হবে ‘শ্রেষ্ঠ কবি’, ‘মহাকাল’ এসে পরিয়ে দিয়ে যাবে শিরোপা। সুতরাং সামিয়ানা বেঁধে যে কবিসভা বসছে এ পাড়া-ও পাড়ায়, সেখানে ‘আহা আহা কেয়াবাৎ’ ধ্বনি যতোই উঠুক, বাংলা কবিতার রীতি প্রকৃতি একটু ভিন্নতর; শুধু অন্যমনস্ক শ্রোতাকে পদ্য শুনিয়ে পার পেয়ে যাওয়া সমূহ মুশকিল।
আমার ব্যক্তিগত প্রশ্ন : কবিরা ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন স্থানে চেঁচিয়ে কবিতা প’ড়ে — কাকে শোনান? এইসব জটিল বাক্য বিন্যাস যুক্ত কবিতার পংক্তিগুলি যাদের কানে ঢোকে, তারা কি এসব তৎক্ষণাৎ আত্মস্থ করে — না পরমুহূর্তেই ভুলে যায়? শুধুমাত্র শুনে কবিতার আস্বাদন সম্ভবপর? অপরকে কবিতা শুনিয়ে বেড়ানোর ভেতরে কবির ক্ষণিক আত্মতৃপ্তি নিশ্চয়ই আছে; দু’একটি অনুষ্ঠানে নবীন কবিকে “হয়তো-বিখ্যাত-কবি” ভেবে কতিপয় কচিকাঁচা তাঁর দিকে কাগজ বাড়িয়ে ধরে স্বাক্ষর সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। কিন্তু ওই শ্রোতৃমণ্ডলী অনুষ্ঠান ভেঙে যাওয়ার পরে যায় কোথায়? ছোটো পত্রিকা ও নবীন কবিদের কাব্যগ্রন্থ কিনে পড়ার জন্য তারা এগিয়ে আসে না কেন? অপরপক্ষে, অধিকাংশ কবি সম্মেলনে কবি নিজের কবিতা পাঠ করেই দ্রুত প্রস্থান করেন, পাছে অন্যের কবিতা শুনতে হয়। অন্যেরা প্রবেশপথের পাশে জটলা পাকিয়ে গল্পগাছা করেন, আর অপেক্ষা করেন কখন তাঁর ডাক পড়বে। সম্ভবত, মঞ্চে উঠে কবিতা-পড়াটা গৌণ; ওই ‘ওঠা”-টাই মুখ্য। যে কবি মঞ্চে উঠতে পারলো, সে তার বন্ধু-আত্মীয়-পরিজনের কাছে নিজের কবি-পরিচয়কে উজ্জ্বলতর করে তুলতে পারলো। আর যে বেচারা মঞ্চে ডাক পায়নি — সে প্রবল হতাশার ঘূর্ণবাত্যায়, প্রবল বিদ্বেষে, ক্ষিপ্ত হয়ে বসে থাকে; ভাবে, টেবিল একদিন ঘুরে যাবেই; পরবর্তী কোনও অনুষ্ঠানে সে ওইসব সুবিধাপ্রাপ্তদেরকে ছাঁটাই করে নিজের পছন্দমাফিক তালিকা বানিয়ে ফেলবে। ফলে, রাজ্যপাল তোমার কবিতা শোনেন নি, তো দুঃখ কীসের; উপমুখ্যমন্ত্রী শুনবেন। তিনিও না শুনলে, পর্যটনমন্ত্রী বা দমকলমন্ত্রী বা শিক্ষামন্ত্রী শুনবেন। না হলে, পানিহাটির পুর পিতা, হাওড়ার মেয়র, অথবা আছেন শতাব্দী রায়!
একটি কবি সম্মেলনে অগণন কবির বহুবিচিত্র ও পরস্পরবিরোধী কবিতা শুনতে শুনতে শ্রোতারা কি বিভ্রান্ত হন না — এই ভেবে যে, ভালো কবিতা কোন্‌গুলি। তাৎক্ষণিক শ্রবণ নির্ভরতা কি সেই বিচারক্ষমতা দিতে পারে, যাতে কবিতাগুলির ভেতরে প্রবেশের অযুত সম্ভাবনা সহসা খুলে যাবে? এই প্রশ্ন উত্থাপিত করার আবশ্যিকতা এইখানে যে, সেইসব কবিরাই মঞ্চে উঠে হাততালিতে সমৃদ্ধ হন, যারা তাঁদের লঘু ও নির্ভার পংক্তিগুলি নাটক ও ছড়ার মিশ্রণসহ উপস্থাপিত করতে সক্ষম হন। আমরা কি সেইসব প্রতিষ্ঠিত আবৃত্তিকারদেরকে দেখি না, যারা কবিতা পড়েন, না, নাটক করেন, বোঝা অসম্ভবপ্রায়। নাটকের সংলাপ আওড়ানোর মতো ক’রে, মুখমণ্ডলের মুহুর্মুহু বিকৃতি, ভ্রূ কুঞ্চন, দেখনহাসি, সহযোগে যেসব বস্তু মঞ্চ থেকে বজ্রনির্ঘোষে নির্গলিত হয় তাতে শ্রোতারা যথেষ্ট তৃপ্ত হন, যে কারণে এসব আবৃত্তির অনুষ্ঠানে লোকসমাগম হয়ে থাকে। ফলে, আবৃত্তিকারদের ধারণা, কবিতাকে তাঁরাই জনপ্রিয় করেছেন, এবং সেকারণেই কবিরা আর আড়ালে না থেকে আবৃত্তিকারদের ঈর্ষণীয় খ্যাতিকে অনুসরণ ক’রে মঞ্চে উঠে পড়ছেন। কিন্তু হায়, কবিরা কি আর ওই আবৃত্তিকারদের মতো মুখব্যাদান করতে পারবে? “শ্রোতারা কি আর কবিতাতে মুগ্ধ হয়, মুগ্ধ হয় আমাদের কেরদানি-কৌশল দেখে” — বললেন একজন অসমসাহসী আবৃত্তিকার।
আমজনতাকে কবিতা শোনানোর দায় যারা কাঁধে নেন, তাঁরা তাৎক্ষণিক প্রাপ্য পেতেই বেশি আগ্রহী; যথা মঞ্চ থেকে নেমে এলেই শ্রোতারা বলবে, অহো, কী শুনিলাম, জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না (কিন্তু সত্যিই কি কোন নির্ভেজাল শ্রোতা এরকম বলেছে?) — সেই সপ্রশংস বাক্য স্ব কর্ণে শুনতে শুনতে আত্মপ্রসাদে স্ফীত হওয়া যায়। আর যারা তাঁদের কবিতা কেবল পত্রিকাতেই ছাপান, যাঁদের পত্রিকা দু’চার কপি কদাচিৎ বিক্রি হয় — কারা এসব কেনে কিছুই বোঝা যায় না, শুধু — তাঁরা দূর অন্ধকারে প্রায় লুকিয়েই থাকেন, কেন না, তাঁদের পাঠক তো আর মুখোমুখি এসে বলতে পারে না, ‘ভালো লিখেছেন ভাই’। এই যখন অবস্থা, তখন ছাপার অক্ষরের পাশাপাশি প্রচারের অন্য মাধ্যম খুঁজে বের করতেই হয়। কে আর বঙ্কিমচন্দ্রের নির্দেশ শিরোধার্য ক’রে কবিতা লিখে ছয়মাস বিছানার নিচে চেপে রাখবে। তার চেয়ে চট্‌জলদি প্রাপ্তির আশায় সরাসরি হল ভর্তি মানুষের সামনে মেলে ধরা হোক পেখম।
দৈনিক পত্রিকার পাতায়, যেসব কবি সম্মেলনের বিজ্ঞাপন ছাপা হয়, সেগুলিতে চোখ রাখলে, একটা মজার ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে উঠে আসে। বহু বছর কবিতা লিখেও যে-বিজ্ঞাপনের আনুকূল্য কবি পাননি, এই অনুষ্ঠানের সুবাদে সেই বিজ্ঞাপন তিনি পাচ্ছেন। নইলে, সিনেমা-নাটক-‘আজ টিভিতে’ ইত্যাদির পাশে পাশে বিজ্ঞাপনে কবির নাম ছাপার হরফে দেখার সুযোগ কোথায় ছিল, ওই মঞ্চে উঠে কবিতা শোনানোর ছলটুকু না থাকলে। এখন বিজ্ঞাপন ছাড়া সমাদর নেই কবিরও (একবার শুধু ভাবুন, শারদীয় দেশ বেরুনোর সময়, বিজ্ঞাপনে কবিদের নামের তালিকায় যখন কয়েকটি নামের পরেই “এবং অন্যান্য” থাকে, সেই “এবং অন্যান্য”রা কীভাবে দুঃখে-শোকে-হতাশায় ভেঙেচুরে লুটিয়ে পড়ে!!) বিজ্ঞাপনের ভেতর দিয়েই তো আমাদের কবিরা মুখ উন্মুক্ত করতে চান। অনুষ্ঠানে প্রবেশমূল্য না-ই থাকুক, ‘প্রবেশ অবাধ’ হোক ক্ষতি কী; শুধু এক দোকানদারের সৌজন্যে একটি বিজ্ঞাপনও অন্তত ছাপা হোক দৈনিক সংবাদপত্রে। তবে অনুষ্ঠান যদি হয় সরকারী, তার স্বাদ-ই আলাদা; যেন রবীন্দ্র পুরস্কার বঙ্কিম-পুরস্কারের স্মৃতি গন্ধ ভেসে আসছে নাকে।
শুঁড়িখানায় জীবনানন্দের জন্মদিন পালন ক’রে, ‘মুক্তমেলা’য় ‘ব্যান্ডমাস্টার’ পাঠ ক’রে, ‘আরও কবিতা পড়ুন’ ব’লে রাস্তায় হেঁটে, ঢাকুরিয়া লেক স্টেডিয়ামে ‘কবিতা গ্রন্থাগার’ স্থাপন ক’রে — আমরা এপর্যন্ত কবিতার জনপ্রিয়তা বাড়াতে পারিনি (যদিচ, কবিদের জনপ্রিয়তা কিঞ্চিৎ বেড়েছে, বলা যাবে কি?) আমাদের ছোটো পত্রিকাগুলি আজও গ্রাহক-পাঠকের সমাদর ছাড়াই বের হয়; আমাদের কবিতাগ্রন্থ নিজেরই পকেটের পয়সায় ছাপতে হয় (সাময়িক সান্ত্বনা পাই, রবীন্দ্রনাথকেও নিজের বই নিজের পয়সায় একসময় ছাপতে হয়েছিলো) কদাচিৎ এক কপি বই বিক্রি হলে আশান্বিত হই, হ্যাঁ আমারও একজন ‘গোপন’ পাঠক আছে এই ধরাধামে — এই ভয়াবহ দুর্দিনে মঞ্চে উঠে যারা কবিতা শুনিয়ে বেড়াচ্ছেন লোকদেরকে — সেইসব একালীন মুকুন্দ দাসেরা কি উদ্বুদ্ধ করতে পারবেন পাঠককে; সৃষ্টি করতে পারবেন কবিতার প্রতি জনসাধারণের ঔৎসুক্য?

 

(পুরনো বানান অপরিবর্তিত)

 

জমিল সৈয়দ ৭০ দশকের এক প্রধান কবি। অজানা কারণে তিনি কবিতা থেকে দূরে আছেন। তাঁর হাতে শুরু হয় পদ্যচর্চা। তাঁর সম্পাদিত এ মাসের কবিতা নামক কবিতাপত্র সমসাময়িক অনেক কবির বীজতলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *