গুচ্ছ কবিতা

প্রসূন মজুমদার


শূন্যতা – বাস্তব

মেয়ে ও মাগির মধ্যে যেটুকু ফারাক
সেই শূন্যে বাস্তবতা দোলে।

শূন্যতা – বাস্তব থেকে বাস্তব – শূন্যতা ঝড়ো হাওয়া।

হাওয়ার পালকে নিজে পেখমের পেলব রেখেছি।

আসলে কিছুই নেই। তবু কিছু আছে।

এই বোধ শূন্যতাকে শূন্যতায় ছুঁল।

ছোঁয়ার কোয়ার থেকে বাস্তবের রস পিষে দেখি
বিদ্যুৎ – প্রবণ বিশ্ব জন্ম নেয়,মরে।

যে চলা রেখেছে দাগ,সে দাগের বর্ণহীন ভাষা

ছুঁয়ে ছুঁয়ে নুয়ে থাকাটুকু পুরুষের নারীর প্রত্যাশা।

স্বচ্ছতা – সন্ধান

অনিকেত ধুলোর জাজিম

ঘেয়ো কুকুরের মতো লুটোপুটি করি।

লোকে যাকে পাতাল বলেছে তার তুল্য স্বর্গ নেই কোন।

বিবৃতি – শোভন ভাষা শোভন- বিবৃতি দিতে পারে?

চাকা পড়ছে গর্তে আর উছলে উঠছে মোহমুগ্ধ স্তন।

দেখার দূরত্বে গর্ত অতঃপর নিসর্গ – শোভন।

কিছুটা পাঁকের নিচে শালুক – বিচির বেড়ে ওঠা।

যা কিছু নিষেধ সব, সমস্তই রতিকান্ত, শুভ।

ভয় ও ভাবনার ফেরে মিথ্যের মথিত বাস্তব।

চিনে নিতে পারি পুষ্প, ব্যক্তিগত, নিজস্ব,নিবিড়।

শুভবোধ কারা ঢালে করোটির হাড় ফুটো করে?

দ্রাক্ষারস মধুমেহ বাড়ালে কী আঙুর নিষিদ্ধ ফল হবে?

সমস্ত নির্মিত সত্য প্রত্যাখ্যানের জমি মাপি।

মনে হয় মানুষেরা অসহায় নিয়তি সয়েছে।

সহন – অতীত তেজে পুড়ে যেতে যেতে কোন পাখি

এইমাত্র ছায়া পেল, দানবের বিপুল দেহের।

দানব কি অবাস্তব, অবাস্তব ছায়ার আশ্রয়!

দানব যুক্তিগ্রাহ্য, সমাজধর্মের কাছে সম্পূরক নয়।

অথচ আমার পাখি ছায়া পেয়ে,ক্লান্তি ঘসে নখে।

যা কিছু অপর তাকে প্রেমিক পরাগ দেব, ফল

দেখার অপর পিঠে আর্শি নেই, শার্সি নেই, খোলা স্নানঘর

স্নান করব কাদাজলে,জল ও কাদার থেকে শুষে নেব মধু।

মধু ও মদের পাল্লা মিয়োনো মুড়ির মতো জীবনের দিকে

সামান্য দোলাব আর অসামান্য নেমে যাব নষ্টামি পুকুরে

ঝুরি ঝুরি পানা মেখে তুড়ি দিয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে ঝাড়া দেব।

এত কিছু লিখে জানি বদল হবে না কোন দল।

তবু লিখে রেখে যাব দোজখই জন্নত, অবিকল।

 

ভ্রমের ভ্রমণ

বাতাস – বাহিত কিছু ধুলো, অবিকল পাখি হয়ে ভাসে।

দৃশ্যের বাতাসে ওড়ে তারা,তারা ওড়ে দৃশ্যের বাতাসে।

কৌণিক দূরত্বে ওড়ে জাগতিক প্লেন বহুদূরে।

ওড়ে, তবু মনে হয় ভাসে,চলন্ত ট্রেনের ফ্রেম জুড়ে।

যা দেখি তা দেখি না কি? ভাবি।

যা দেখি না, মানুষ – স্বভাবী, ত্রুটিদৃষ্টি। মিথ্যাচারী দাবি।

সত্য ওই ধূলিবিম্ব? দৃশ্যঊর্ধ্ব প্রকৃতার্থ গতি বিমানের?

কিঞ্চিৎ ভ্রমের দৃশ্যে অগম্য বোধের সীমা ঢের

ফিরে যায়, ফিরে আসে,দেখার একার খোঁজে,খাঁজে।

বাস্তবতা সত্য নয়,সত্য খুঁড়ে শূন্যময়,ধু-ধু -র দূরত্বে শুধু বাজে।

ক্লান্তির বালি

দাবীহীন চেয়ে থাকা , চেয়ে থাকা,না চাওয়ায়, ভিজে।

তিমি ও তিমির থেকে কিছুদূরে প্রেতধাত্রী উপচ্ছায়া, পিঁজে…

ক্লান্তির বালিতে, ঝরে। ঝ’রে যায় রোদ, ফাগুনের।

বাতিল বাতাসে আসে রেণুর বিষাদ,সেই রেণু

ডিম্বাণুর খুব কাছে যায় নি যে কোনদিন। ধুলোয় ফুটেছে।

ধুলো কিছু সূর্য – শিখাময়।

সরে যায় সহজ সময়।

বানানো মাটির ঘোঁড়া দুলে দুলে চলে যায় হিমে।

কালের নিঃসীমে, মহাকালে, জন্মজল ভেসে থাকে কিছু।

নীরবতা থেকে আরও নিচু।

পরিমিতি

‘মন শক্ত করো’ ব’লে চিকিৎসক চুপ।

আমারও ভিতরে পোড়ে ধূপ।

ছাই হয়ে উড়ে যায় খই।

নিঃস্বতর মন্ত্রের মতোই।

পাখির ডানায় কিছু খই চোখের বাতাসে।

দু-চোখ পাথর হয়ে আসে।

কাত ও কাতর হয়ে মা,অনিকেত বিছানায় রহস্য বিছায়।

সমস্ত কুহক ঠেলে প্রতিস্রোতে ভেসে এই নষ্টগ্রহে ফিরে আসতে চায়।

সময়ের উরু চিরে ঝরে পড়া বৃষ্টিভিজে পাতা

উড়ে যায়, ফিরে আসে।ফিরে ফিরে আসে।

সামান্য জলের ঘুম কখনো কি হতে পারে কালখণ্ডে মৃত্যুর ব্যাখ্যাতা?

কুটিল আরক

রুচি বা শুচির ফ্রেমে ফাটলের ফাঁকে ফাঁকে ধুলো।

যা চাই, বা যা যা চাই,সমস্ত নিজের।

ইচ্ছেপাখিগুলো দোলে কাটা শিরা, পুঁজের প্রকারে।

হারানো ইজের থেকে যোনিঘ্রাণ কেঁখে খায় তুলো

নব্য – সময়ের। চোরা, ছদ্ম নাগরিক পরিমতি – ক্ষারে

ঝরে ঝরে ছাই আরও গাঢ়তর নীলিমায় ভিজে

গিঁট বাঁধে, জটিলের কুটিল আরকে।

ফেলে যাই, ফেলে রেখে চলে যাই ওকে।

নিজস্ব নির্বেদ থেকে নিঃস্বতায় পালানোর ঝোঁকে।

সম্পর্ক সে এক

এক একটা সম্পর্ক- পাখি চুপ করে বসে থাকে পাতার শিরায়।

মাঝে মাঝে ঘাই দেয়। মাঝে মাঝে ফিরে আসতে চায়।

অঙ্কের মতো না তারা।

ইশারা পাঠায়।

আগুন – স্পর্শের মতো কেঁপে ওঠে প্রায়।

ধীরে ধীরে মৃত্যুদিন মনে মনে স্তব্ধতা বাজায়।

কথা কিছু

নিভে যায় দরকারের টান।

সটান নীরব নামে মিলিটারি জিপের দাপটে।

বিস্তীর্ণ বিষাদ জুড়ে মাটির প্রতিমা চাঁদে ফোটে।

শোনা যায় ভোরের আজান।

বেরিয়ে পড়ার আগে অগোছালো করে দিই কিছু

শূন্যবর্ণের স্বাদু জল, মাধবীলতার উঁচু – নিচু

সব ঘাম শুষে নিলে হাওয়ারও ওজন বাড়ে, ফলে

ঘামের দানার মতো কিছু কথা ফেলে যাই স্মৃতির তরলে।

দেয়ালা

তোমার ক্লান্তি নিয়ে,তোমার ঘুমিয়ে পড়া নিয়ে

ও বিবিসাহেব ,ও মজার সার্কাস,ও ট্রাপিজের খেলুড়ে

এক বাক্স অভিমান উপুড় করি ঘাসে।

তাকালে, ফ্যালফ্যাল করে খানিক ভেবে,দেখে

আবার ঘুমিয়ে পড়লে।

পাথরের মেঝেতে পা পুঁতে যাচ্ছে।

মহাকাশ চোখ মারার মতো তারা টাঙিয়ে…

কোথাও ঘণ্টা বাজছে।

ছুটির না প্রার্থনার? প্রার্থনার না ছুটির?

বিস্তার – বপন

পর হয়ে যেতে শিখি।

অভিন্ন অপর … ।

গাছেরা শেখায়।

কী টানে ফড়িং আসে, ঠোঁট রাখে। রেণু শুষে খায়।

শিখি। শিখী কোনভাবে ছিঁড়ে খায় সাপ।

সমস্ত আলাপ রাখি বিস্তারের জ্যা-এর ছিলায়।

ঘ্রাণে ভেসে যায় হাওয়া, ডিম্বাণু – প্রবণ প্রেমালাপ।

চিরায়ত

কু-অভ্যাস? রাষ্ট্র-নাম। উত্তুঙ্গ আকাট।

সমস্ত অভ্যাস তাই দুর্দৃশ্য- পালক।

মুকূট আসলে ভারি বোঝা।

পদক্ষেপ অস্বীকার জানে।

স্লোগানে অজ্ঞানে মিশে থাকি

নার্কোটিক অন্যবিশ্ব টানে।

টানে যা, মুহূর্ত নয়

চির- মিথ্যা। ছদ্ম-সত্য ভেঙে ফেলা

কালের বাগানে।

 

খোঁজ

সমস্ত যাত্রাই দীর্ঘ, দৈবপথ হতে পারে আর সব দৈবপথ হয়ে যেতে পারে যাত্রা।

জ্যোৎস্নার মতো মিথ্যাগুলো আমাদের হতস্পৃহ জরার বোতামে দোলে, রাতে

যাতে সাজানো সহজ সব জোকারের জারজ সন্তান খরগোশ – কুয়াশা চিরে ছুটে যায়, অপ্রয়োজনের দেশে, হেসে।

মাথার ভিতরে বাজ, ঊর্ধ্বাচারী পাখিদের রাজা,বাজায় দুন্দুভি, তবে, যুদ্ধ কী অবশ্যম্ভাবী! কিন্তু কেন?

প্রশ্নের ওপারে ঝুরো বরফের শব্দহীন ঝরে যাওয়া শুধু।

শুধু ঝরে যাওয়া, ফুল, রক্ত এমনকি তারার, ঝরে যাওয়া একমাত্র সত্য মনে হয়।

মনে হয় ঝরে যায় প্রতিটি সময়।

যেপথে ফেরার ছিল সেই রাস্তা মুছে দেয় ধুলো, যে ধুলো মাখার ছিল সেই ধুলো বাতাসে হারায়।

সব পথ মুছে দিতে দিতে পদক্ষেপ নির্ঘুম এগোয়,ঘুমের দিকে

যেই ঘুম স্মৃতির মারক সেই কি সহজ – সখ্য?

ভাবি, যে ভাবনার নিঃস্ব সেই মহাঘুম? চেতনার অন্তিমতা? প্রেতিনী – প্রকার?

মানুষ আসলে নিজে মানুষের মৃত ইতিহাস?

অথবা সে মৃত নয়। অথবা সে অন্যত্র কোথাও আঁকা হয়ে থেকে গেল? পুনঃ – প্রবাহের বীজে সেইসব চলাচল ফিরে আসে? শরৎ-এর রোদে অথবা শিশিরে, কোন ভোরে সেসব পায়ের ছাপ থাকে নাকি ভবিতব্য – বোধে?

যদি সবই অর্থহীন বাতাসের জলের খেয়াল তবে এই ক্রমাগত চলার ঘাসেরা ফুল ধরে,কোন বোধে, কোন গুপ্ত টানে?

আমাদের চেতনারা কতটুকু জানে?

জানার সমুদ্র ভাসে দূর, ছায়াপথ ছায়াপথে রমণের সুর ভাসে নিঃসঙ্গ হাওয়ায়,যেখানে হাওয়ারা আর নেই বলে মনে হয় তাকে ইন্দ্রিয় – বেদনে ধরা সম্ভবত অসম্ভব, তবু আলোর ব্যাদানে ব্যাপ্ত গাঢ় শিকারের মতো ছুঁড়ে দেওয়া চলে কল্পবোধ – চিৎ – চঞ্চলতা।

প্রশ্ন আনে প্রশ্ন আর প্রত্নরূপ ঘেঁটে ঘেঁটে ভবিষ্যৎ খোঁজার প্রকার মনে হয় পরিপূর্ণ নয় পুরোপুরি।

পথ কোন নিয়মের আবশ্যিক নির্মিতি মেনে চলে না নিয়ত।

কখনো পথের যাত্রা বাঁক নেয় অতর্কিত টানে, বিশেষত বিষণ্ণতা অঘ্রাণের দানে।

তবে তো যা – কিছু বীক্ষা তার সব পক্ষ নয় ডানা ঈগলের।

আরো কিছু ডাকিনীর জিহ্বার রক্তাভ অনির্ণেয় মহাজাগতিক নর্ম ছাই ঘেঁটে দেখার প্রকারে আলো থাকা অসম্ভবের খেলা নয়।

পেরিয়ে যাওয়ার পরে ফেরে না সময়। তবে কি মুহূর্ত জাগে? মুছে যায়? ফেরা যদি যাবে না তাহলে সময় এগোয় শুধু বাঘের থাবার মতো ঋজু!

বৃক্ষের ভিতরে আরো বৃক্ষ হয়ে মিশে গেলে তবে অশ্রুত আকাশের কান্না শোনা যায়।

আকাশের মেঘে আরো মেঘের জলের মতো মিশে গেলে আকাশের হৃদধ্বনি অনন্য শোনায়।

আরও ঊর্ধ্বে, অনিঃশেষ, সীমার ওপারে কিছু কাব্যময় প্রেত ডাকে প্রেতের অক্ষরে।

চেতনা- প্রদীপ – শিখা জ্ঞানের ওপারে আরো নির্জ্ঞানের আলো হয়ে ঝরে।

 

দূরদৃষ্টি

হেরে যাওয়াগুলো আর হারিয়ে যাওয়াগুলো
হারিয়ে যাওয়াগুলো, আর না- পাওয়াগুলো …

আঙুল পিষে নেয় তালুর নরম।

পিষে নিচ্ছি ঈর্ষার মিশি,গন্ধের তেতো কাম,

বিষ থেকে ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়া মধু।

মধু এমনই গুপ্তটান যার বিস্তারের পরিধি বরাবর হেঁটে যায় ঘৃণা।

অপ্রয়োজন কিম্বা প্রতিযুক্তির শাঁস কুরে কুরে মেড়ে নিচ্ছি সব।

হাজতবাসের এই দিনগুলো একদিন পেরিয়ে যাব দুজন।

একদিন থকথকে কাদার ভিতরে সাদা সাদা কুন্দফুল দেখে চমকে তাকাবে মৃত্যু।

হলুদ বাগানে ফুটে থাকবে সবুজ উল্লাস।

হারিয়ে যাওয়া আর হেরে যাওয়ারা …

সফল সূর্যকে ফেলে, ইচ্ছেমত আলতো বলব, আসি।

ধ্রুবপদ

নিঃস্বতা পরম – প্রাপ্তি। কৃষ্ণ, ঘন কয়লার প্রকার।

কয়লারই ভিতরে হিরে। কী আশ্চর্য! দ্যুতি একাকার।

যা রাক্ষস তাই কৃষ্ণ।কৃষ্ণ অর্থে পাপ- আকর্ষক।

রাক্ষসের নখরে তীক্ষ্ণ সময়ের সন্তপ্ত সড়ক।

নাস্তির গভীরে আলো বর্ণচ্ছটাময়।

সমস্ত মিথ্যার বীজে রীতিমতো সত্য-জন্ম হয়।

মিথ খুঁড়ে অতঃপর তুলে আনি সর।

দুধ নয়,জল নয়, চেতনা-তসর।

মধ্যবর্তিনী

থামা ও চলার মাঝে আরও এক মুহূর্ত রয়েছে।

সে আছে সুতীব্রতর বেঁচে।

স্তব্ধতা অন্য নাম তার।

বাকি যা – যা, ভাঁড় বা ভাঁড়ার
সমস্ত বিবৃত, শুধু ওই স্নিগ্ধতর পাখার নরমে

রাতের শিশিরজল নেমে আসে ক্রমে।

মুছে দেয় নিয়তির মার।

শব্দহীন কথার পাহাড়।

 

প্রসূন মজুমদার, জন্ম ১৯৭৮, পদ্যচর্চার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকদের একজন, ১৯৯৯ এর দামাল দিনে কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়া ছেড়ে জীবনে যোগ দেন। সেই বুনো জীবন এখনও চলছে। পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ তিনটি, অসুখ ও আরোগ্য (২০০৬), অধরে গোখুর-দন্ত (২০১৪), রাত্রিচর বুনোচাঁদ (২০১৬) । পেশায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিদ্যালয় শিক্ষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *