গুচ্ছ কবিতা

ভাস্কর মজুমদার


বর্ধমান

আকাশ যেন কল্কা করা বিধবা শাড়ি।
খুব বয়স্কা কারো, ধরা যাক পান মুখের দিদিমা-
ট্রেনের কামরায় কামরায় যে ভিক্ষা আর
মৃত্যুর অপেক্ষা করেছিল।

আর আকাশের গায়ে?

ঠিক রক্ত নয়, আরেকটু হালকা কোনও ছোপ;
যে ছোপে আমার বমি পায়, যে ছোপে আমার মাথা গম্ভীর
থাকে সাত আটটা দিন।

অসুখ নিজেই যদি পথ্য হয়ে নিরাময় হত,
ওষুধের বদলে রোগ খেতাম বহু। বহু রোগ।

আমি সত্যিই আর রাঙা ছোপের বিধবা শাড়িটাকে
আকাশ ভাবতে পারছি না।
ওকে ভ্যানে তুলে অনেক দূরে নিয়ে যাও। অসভ্যতার দূরে।

দয়া করো।

 

পরজীবী

কৃমিটা খবরের কাগজ থেকে টুপ করে চায়ের কাপে গিয়ে পড়ল।
ও এখন সারাদিন আমার সাথে থাকবে।
কাপ থেকে হাতঘড়ি, তারপর আমার জামা, জামার বোতাম,
চিরুনি আর জুতোর দড়ি।
আমার সাথে কাজে যাবে।
রোদে রোদে ঘুরবে- আমার সেলসের কাজ।
ও যেদিন আমার মাথায় ঢুকে পড়বে আমি সঠিক অর্থে
রাগী হব।

আমায় রাগী হতে হবে। রাগী নাহলে যোগ্যতা আসে না।

 

সামনে পরীক্ষা

তোমাদের বাগান থেকে ভোরবেলা যে ফুল চুরি করে পালায়
ওর নাম সমাজতত্ব।
বারান্দার তারে শাড়ী ব্লাউজ আর ব্রা মেলে যাওয়া অস্তিত্বটা দর্শন বা
আধুনিক ভূগোল।
বাথরুমের মেঝে অ্যাসিড দিয়ে ফি হপ্তা ধুয়ে দিয়ে যাওয়া লোকটা আসলে
উঁচু ক্লাসের পদার্থবিদ্যা।
এতোগুলো বিষয়, গুলিয়ে ফেলো না।
মায়ের চোখের ছানি অপারেশনের আগে সব কিছু এক জায়গায়
করে ফেলো। হাতে টাকা রেখো।
নাহলে পরের প্রজন্মটার সামনে তোমার

উদাহরণ হয়ে ওঠা কঠিন হবে।

 

মৌসুমি ছুটির অব্যয়

ফেলে যাও,
অমন করে যে ফেলে যাও
মুঠোভরা সর্ষেতেল হাসি
কবরে যে ছুটল জল, নকুলদানাও
চিহ্ন ফেলে রেখে আগ্রাসী-
ধরো তাপ।
কাছাকাছি আসা কিছু তাপ,
প্রযুক্তি বিঘ্নিত অশ্রুদ্বয়;
তাতে আরও অভিমানী লাভ?
মৌসুমি ছুটির অব্যয়ে-
আছে জোর।
হেরে থাকা অমানুষী জোর,
নিভু নিভু সোহাগের দায়।
রাত জাগা বিলম্বিত ক্রোড়,
ফাটা আখ্যান আওড়ায়।

 

মহাজাগতিক

দূরান্তের কোনও গ্রহ বা তার কক্ষপথ আমাদের বুকের হাড় হয়ে শীতঘুমে আছে। শীতঘুম বলতে পুনরায় জেগে ওঠার সম্ভাবনা আছে তা কিন্তু নয়। সবসময় না। ব্রম্ভাণ্ডের অন্তত একটা কিছু যে বুকে নিয়ে শুতে যাচ্ছি রোজ তাতেই যেন রাজা লাগে নিজেদের। আর মিঠে স্বপ্ন দেখার আশা। মিঠে স্বপ্ন, ভোরবেলা ঘুম ভাঙলে যা নিয়ে হাসি পাবে খুব।
পাল্টাপালটির সময় আমাদের কিছু অংশ হৃদয় সে গ্রহে থেকে গেছে। সংরক্ষণের কি নিয়ম ওদের আমি তা জানিনা তবে যত্ন করলে পরে সেসব টুকরো থেকে ওরা একদিন সালোকসংশ্লেষ পাবে, চাপা কান্নার জল আর দু চারটে ভালবাসাহীন, কেঠো চুমু।

 

লিপি

টুকে রাখি।
টুকে টুকে রাখি।
কোনও ক্ষোভ নয়,
খাঁচা-হারা, ডানা-ছাঁটা পাখি।

 

সমীক্ষা

একটা স্বপ্ন বিশ্লেষণ করতে অনামী
বিরোধ দরকার।
মানি-প্লান্টের ঝাঁকড়া উপস্থিতি, লোহার রেলিং
আর অতি সাধারন এক টুথপেস্টের গন্ধ
এখনও সে কাজে অপারগ থেকেছে।
এত কঠিন অবয়ব যে আলিঙ্গন করতে জাগে ব্যথা।
বর্ষায় তেজ-কমা মাছির সৌন্দর্যের খোঁজ তাতে অসম্ভবপর নয়।
বুদ্বুদ তো সবই; তবু দু’একটা স্বপ্ন বিশ্লেষণ করতে পারলে
নিজেকে এটুকু স্তোক দেওয়া যেত
সিঁদুরখেলার।

 

সুন্দরী বোমা

কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় একটা বোমা ফাটছে।
ললনা, মেদুর, ভেজা সুন্দরী বোমা—
যার লক্ষ বিভক্তি আমাদের কামুক প্রাপ্তিযোগ।
আন্দামানি স্তন তার,হিমাচলি কেশভার,উজ্জয়নী নাভি যেন রূপান্তরকামী
সারাক্ষণ এই কলকাতাতেই সুযোগ খুঁজছে কখন বিস্ফারিত হবে।
দোকানের শাটার ফাটাবে সে,তার লোলুপ তৃষ্ণা আঁশ মেটাবে সরলা শিশুর
পুষ্টিতন্ত্র ভক্ষণে।
বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সব অনাচারের আস্ফালন যে ওর মধ্যে লেগে।

 

বিশ্রাম

ঘাসের মাথায় যে পা বাবুয়ানি রেখেছ প্রত্যহ
অভিমানী ঘাস তবু বলেনি তার আহতের কথা
সবুজ থাকতে পারা সে জেদই সত্য হোক
কি বা আর আসে যায়,পুরাতন? বেকারের ভাতা?
আরও প্রাচীনের ওষ্ঠ, আরো দাঁত নিঠুর নীলাভ
ঘাসে ঘাসে বঞ্চনা এমন যে প্রকাশিত ফলে তা
রেখেছে বিসর্গ দুঃখে, কে বলে গেল,’তুই দৃঢ় হ!’
আহতের জেদের আর ক্রমাগত প্রবহমানতা।

একই ঘাস তোমার স্নিগ্ধ লোমবুকেও;
সমুদ্র বলে দাও কতদিন বালি বালি এ আবেশে
যতবার মুখ রাখি লজ্জায় রাঙা হওয়া বিধেয়?
বালি আরো জল নিয়ে সবুজাভ ঘাসে গিয়ে মেশে।
অমন লজ্জিত বুক দেখা গেছে ইতিহাসের আগেও
সবুজ ঘাসের মাথে পা না রেখে অল্প শুতে দিও।

 

তুমি

রোদস্নাত ছাদের পাগলামি ঘন দুপুরে
গ্রাম বলতে ঠাহর করতে না পারা গন্ধ

পুকুরের পাথরে পা ঘষে শিথিল হওয়া
এটুকু তো থোকা থোকা জীবনে

থাকতেই হবে এমন ভাগ্য কই আর
মেলে ধরা মুঠোয় যতটা সঞ্চিত থাকে

হাওয়া হয়ে উড়ে যাওয়ার আগে-
হ্যাঁ, সেটুকু হলেও ক্ষতি নেই

তুমি আমার সেটুকু হলেও চলে যেত
ভুবনমোহন হাসি ছুঁড়ে না দিলেও

গচ্ছিত অর্থে থেকে যেত বহুকাল
এ যাপন ও ততধিক যাতনা।

 

কোয়াটার

একশো ছিয়ানব্বইটা চৌখুপি ঘরের মধ্যেও ভাগ আছে—
অফিসারদের কোনওটা, কেরানীদের কিছু আর কোনওটা বা ডি ক্লাসের।
সামনের মাঠটার আকার
পলিতকেশ বছর পঞ্চাশের পুরুষের মত
যিনি গ্যাসের
সমস্যায় আজ বহুদিন ভুগছেন;
মাঠে জায়গায় জায়গায় ঘাস নেই ওরকমই।
বিকেলবেলায় ও মাঠে সকলের ছেলে মেয়ে বিবাদহীন খেলা করে।
শিশুদের মাঝে কোনও ভেদ নেই।
শিশুদের মধ্যে ওসব থাকে না কক্ষনো।
এখানে পুজো হয়,
ভাসানের দিন এয়োস্ত্রীদের মাথা রাঙা হয় সিঁদুরে সিঁদুরে।
তারপর—
উঠতি ছেলেরা নাচতে নাচতে যায় রানীদিঘি অবধি;
নেশা বলতে সিদ্ধি একটু।
গরমের ছুটির সন্ধ্যেবেলায়
ভেতরকার পিচ রাস্তায়
নানা বয়সী লোক জড়ো হয়।
এখনও লোডশেডিং হয় মাঝে মাঝে।
এ কোয়াটারের মেয়েরা সন্ধ্যায় সিরিয়াল দেখে না।
শিউলি,রাধাচূড়া আর কদম গাছে কত যে পাখি বাসা বাঁধে!
অথচ সে কোয়াটার আমরা ছেড়ে এসেছি পনের বছর হল।
বাবা রিটায়ার হওয়ার সাথে সাথে।
ওই কোয়াটারেই বিয়ে হওয়া আমার পিসি-তার ছেলের বিয়ে এই মাস ছয়েক পর।
মায়ের জন্যে হাসপাতাল জাগবার রাত্রে,
আমার মেয়ে হওয়ার দিন,
চাকরি নিয়ে ধুবুলিয়া যে সন্ধ্যায় পৌঁছলাম;
সেসবে আমি আজও কেন সে কোয়াটার শুঁকতে পাই?
সাথে শীতের দুপুরে লুকোচুরি খেলতে গিয়ে আমার দু’গালে টুব্লুদার তিতে চুমু।

 

মৃত্যুর আগে সাতদিন

পরীক্ষিতেরই মত মৃত্যুর আগে সাতদিন।
নির্লিপ্তে কথা বলি আরও স্বাদ আসঙ্গবিলীন।।
ফেলে দেওয়া সুখ যত শোকায় দুপুরবেলা তারে।
কিছু ছোপ অমানুষ, ছোঁয়া কিছু মেরুন বাহারে।।
তুমি ধরে রেখে বলো,’ফুল কি চিরটাকাল তাজা?’
থাকে, যদি তাকে তুমি করে দাও আলসে রাতের মহারাজা।।
তাহলেও সম্পর্কে ঢিলেঢালা খেদ থাকা ভালো।
অভিমান পুরনো শব্দ, ঈর্ষাকে যে অর্থে রাঙালো।।
সে তো শুধু রাঙা নয় দীপালী রঙের কোনো বাজি।
তবে কেন বলে গেল অবেলায় মরতে সে রাজি?
যে ফুলের মৃত্যু নেই, নামপ্রেম থাকে কিছুদিন।
পরীক্ষিতেরই মত মৃত্যুর আগে সাতদিন।।

 

ভাস্কর মজুমদার (জন্ম- ৫ নভেম্বর ১৯৮৫) পেশায় স্কুলশিক্ষক। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর এখনো অবধি প্রকাশিত গ্রন্থ একটি— ‘হেরো আবেগের গুনিতক’ (ধানসিড়ি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *