নীল ক্ষুর চন্দ্রযান

জমিল সৈয়দ


যেকোনো দুপুরবেলা

ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি; মনে হয় বাতাসে ধাক্কা খেয়ে ছুটছে ভৌতিক ট্রেন
যেকোনো দুপুরবেলা — নিঝুম টানেল ও ব্রিজ… হাওয়ায় ঘূর্ণি উঠে
ঝড় জাগে… আর আশ্চর্য চিলের মতো শূন্যের ঊর্ধ্বে উঠে পাক খেয়ে
নিচে দেখি — কী শান্ত লোকালয় — ময়লা ইস্পাত বেয়ে পৃথিবী চলেছে।

মোরগঝুঁটির মতো চুল, মাঠে মাঠে ওড়ে; সহস্র সমর্থ যুবা কাজে নেমে
ছুটি চায় : এমন শিউরে ওঠা, বিহ্বলতা; বিষ কাঁটাগাছে জড়ায় কাপড়
যেদিকে পড়ছে পা নিজেরই বামন-ছায়ার মুখোমুখি —কাকে আজ
অবাস্তব ব’লে ঘোষণা করবো আমি? মাথার সঠিক উপরে সূর্য এলে
নিজেকে এমন খর্বকায় বেঁটে লাগে, আর ঐ ছায়াকে সরাতে গিয়ে
পিছলে পড়ছি নিচুতে — যেন ওর গায়ে ঠেস দিয়ে কাটাচ্ছি এ জীবন!

হাসে বালিকারা; মানুষের অধঃপাত দেখে একদিন হেসেছিলো ব’লে
রুগ্ন শালিকের ঠ্যাঙে মাঠে নাচে, বিবাহ হবেনা ভেবে নিশ্চিন্তেই থাকে
স্নানে নেমে-যাওয়া ঘন শরীরের দিকে সব ফল ঝুঁকে — পেকে ওঠে আজ,
সব ফল বোঁটা ছিঁড়ে আকাশে উড়ছে আর বীজ ছড়িয়ে যাচ্ছে চারধারে।

যেকোনো দুপুরবেলা — বাতাস উড়িয়ে নেবে এই মরচে-ধরা টয়-ট্রেন
সমস্ত দুপুরবেলা — নীল বা লাল নেই, গাছ ব’লে আলাদা বিভাগও থাকেনা
শুধু ঝাঁ ঝাঁ রোদ পৃথিবীর গোল পিঠ খুঁড়ে গলিত সোনার তাল
নিষ্কাশিত ক’রে আনে, অ্যাসিডে চোবায় আর ক্যারেট হিসেব করে;
‘বলো বলো কী চাই এবার, নাকছাবি, বাজুর বন্ধন?’ আহ্লাদ জাগছে ফের
ফুলে ফেঁপে ভাসছি অদ্ভুত উঁচু পাল হ’য়ে — এ সফরে মাটিতে কি
নামাই যাবেনা?

 

একই রঙের ঘোড়া

ভোর হাওয়ার আগে — কোনো কথা নেই, শব্দ কোরো না; শুধু হাত রেখে
ত্বকের নরম ছোঁও; ঘুমন্ত তরুণী-মায়ের ছড়ানো পায়ের ফাঁকে
ময়ূরভঞ্জের লাল ঘোড়া — ঝাড়া দিচ্ছে গা, আর ব্যথায় ভরে উঠছে আমাদের
স্বপ্নেরা : প্রকৃত স্বপ্ন নয়, মনে হচ্ছে এক সবল স্বাস্থ্যবান প্রাণী
টেনে দিয়ে যাচ্ছে আমাদের যান, তার নিঃশ্বাস থেকে যে ঝড় বেরিয়ে এসেছে
উড়িয়ে নিচ্ছে আমাদের ঘাসের বিছানা, স্প্রিঙের উপরে দোল খেতে খেতে
আকাশও উঠে গেছে দূরান্তের নীলে।

ভোর হওয়ার আগে জাগবেনা কোনো বন, শুঁড়িপথ? দুলবেনা জলের উপরে
পদ্মনাল? স্তনের উপর দিয়ে এলিয়ে থাকা সোনার কুন্দহার —
এই দেশে ঘুমোতে এসেছো? রৌদ্র লাগেনি ব’লে গালে ঘাস-চাপা রঙ
শান্ত ফ্যাকাসে মুখ — চুম্বন লেগে পেকে ওঠে… রক্ত সঞ্চালিত হয়,
নীল শিরা বেয়ে যে স্রোত ছুটছে পৃথিবীময় — সূক্ষ্ম ফুসফুসে এসে
সংকুচিত হয়ে আটকা পড়েছে…

দূর বজরার ক্ষেত — সিঁড়ি কেটে কেটে বীজ বোনা আছে; মুখে কথা নেই ব’লে
বোবা মেয়েরাই প্রকৃত শরীরে সাড়া দ্যায়; এখানে একটু থেমে বিশ্রাম নেবো
জলের সোরাহি তুলে মুখে দিয়ে নিজেরই চেহারা দেখি — অকস্মাৎ ক্ষীণ কণ্ঠ —
বাঁচাও, বাঁচাও…! মরীচিকা-ভ্রমে এ জল নামবেনা গলা দিয়ে, আর্সেনিক মিশে আছে
সরল সবুজ বোন, ঘাগরা উড়িয়ে যাও রাত্রির কোল ঘেঁষে — যেন আনন্দে
ভাসছো মথ, ডানার চটচটে পরাগ ও আঠা — লাগছে আমার মুখে;
যখন চলেছি ভোরে পাকদণ্ডি বেয়ে — একই রঙের ঘোড়া; দুই দিক থেকে
চলেছি দু’জন, মুখোমুখি সহসা সাক্ষাৎ হবে; মাটি ফেটে নির্বাক চোরাবালি
টেনে নেবে ভেতরের ক্কাথে।

 

উঁচু হয়ে উঠছে পৃথিবী

দু’শো বছরের রাত; মত্ত হস্তীর ডাক আজ পৌছুলো কানে এসে,
আয়নার পারা উঠে গেছে — কোনো ছায়া নেই,
নধর হরিণশাবক চোখ মেলে
তার ভয় ফুটিয়ে রেখেছে।
দুলছে হাতির পিঠ; ঝরনার জলে শুঁড় রেখে
কিছু স্রোত তুলে নিলো বুকে;
অনেক জঙ্গল, ঘাস, চোরা শিকারীর বুটে নুয়ে থাকা লজ্জাবতী,
আগে রক্তে মাখামাখি হোক,
জোঁকের গহ্বর থেকে তুলে আনি লাল মাংস,
মাথায় শেকড় ছুঁইয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি হবে।

কার গানে উন্মত্ত হয়ে আছে বনের শকুন?
কার শিঙা বেজে ওঠে! পশুমলে লুকোনো মোহর!
মেঘ এসে ঢেকে দ্যায় সোনার সুতোয় মোড়া অন্তর্বাস;
পিশাচকন্ঠের ডাকে গলা চিরে গেছে,
আগুনের গোলা পাক খেয়ে নিচে নেমে
পোড়ায় পাতার স্তূপ
ভোরবেলা কাঁচা স্রাব — মাখামাখি শ্যাওলা ও বেতকাঁটা,
ওক্‌ দিতে দিতে বাইরে বেরুই,
তখন ঘুমোতে চলেছে রাত্রিচর;
মাথায় পাখির বিষ্ঠা, চুলের পাকানো ঝুরি —
পায়ের গোড়ালি থেকে দাঁড়া বের হয়ে
শুষে নিচ্ছে সবুজ ঘাসের দুধ,
জেগে উঠছি আমি
এড়িয়ে পাতার ছায়া এবার আলোয় জেগে উঠছে ব্রণ্টোসোরাস
শক্ত বর্ম ঢাল আর খড়গ নিয়ে উঁচু হয়ে
উঠছে পৃথিবী
কতো পথ দুলতে দুলতে এগিয়ে চলেছি…

 

নীল ক্ষুর চন্দ্রযান

চলেছে পর্দাঢাকা টমটম; ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ
পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ঝড় তোলে, ধস নেমে আসে পথে,
নাচের আসর ছেড়ে উঁকি মেরে দেখি —
দূরে কালো টিলা, আর, নিচে সরু ফাতনা-র মতো তিরতির ক’রে
নীল ক্ষুর চন্দ্রযান — বেনাবন দু’পাশে সরিয়ে রাস্তা কেটে — এগিয়ে চলেছে।

হাঃ হাঃ, বাজছে ব্যাগপাইপ; নর্তকীর ঘুরন্ত গাউন উঁচুতে উঠতেই
ঝিকিয়ে উঠলো রাত্রিকণা;
তখন গাছের গুঁড়িতে ছুরি গেঁথে — নেমে এলো ইন্ডিয়ান যুবা —
ঠোঁট থেকে কড়া তামাকের গন্ধ ছড়িয়ে বলে : এক্ষুনি খালি ঘর চাই
একফুঁয়ে নেভালো তেলের কূপী, শুধু গাঢ় নৈশ ত্রিস্রোতে
‘জ্যোৎস্না উঠতে আরো এক প্রহর বাকি’ — শোনা গেল;
তখনও পাথরের পাকদণ্ডি বেয়ে শিথিল ধ্বস্ত গাড়ি — এগিয়ে চলেছে।

কিছুক্ষণ তুষারঝড়ে চাপা পড়ে ছিলো দিকচক্রবাল; তারপরে
ফ্যাকাসে হাড়ের রঙে মাথা তুলছে দিগন্তের কঠিন বক্ররেখা,
এতোদূরে বারুদ-ফাটার গন্ধে চাঁদ ওঠে
ডিনামাইটের ফিতে ধ’রে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসে আগুনের ফাঁস
‘পালাও, যতোদূরে পারো চলে যাও’ — চিৎকার ক’রে ছুটি
ব্রিজ থেকে লাফ দিয়ে নেমে যাই — অতল সুড়ঙ্গ পথ,
হ্রদের বহির্দ্বারে এসে খুঁজি বয়া —

এইখানে বন্ধ পথ — এগুনো যাবে না — পর্দাঢাকা টমটম
ভেঙে প’ড়ে আছে, একটি গোল চাকা তখনও শূন্যে বনবন ক’রে ঘোরে
ঘোড়াদুটো সামনের ঠ্যাং তুলে ব্রোঞ্জ মূর্তির মতো স্থির
শুধু পর্দাটা তখনও নড়ছে হাওয়ায় — ভেতরে কেউ ছিলো কিনা
বোঝাও গেল না… অল্প অল্প কাঁপন ভেতরে-ভেতরে —
চন্দ্রযান, কোন্‌ শূন্যে এগিয়ে চলেছো?

 

ভিন্ন দেশ

পা পাল্টে এসে পড়েছি ভিন্ন দেশে, কাঁধ পাল্টে ধ’রে আছি ব্রহ্মাণ্ড —
উল্কাপাতে আর পুড়বো না? কোনো মা আর আমাকে ভাসিয়ে দিতে
পারবে না গঙ্গায়?… এসে পড়ি প্রশস্ত হাওয়ায়, চাঁদে দোল লেগে হয়েছে হলুদ;
গ্রহণ লাগার সময় অন্নভোজন করি — কোনো দোষ নিওনা মেয়েরা
বকুলফুলের মালা সহ্য করিনা আমি, তাই আকাশে তারার মতো
ছড়িয়ে রেখেছি, যদি পারো কণ্ঠে প’রে নিজেকে এয়োতি ব’লে ভেবো।

চুলের ভেতরে বইছে রাত্রি; ঘরে ফিরে কার মুখ দেখবো আয়নায়?
সাপের ঠাণ্ডা ত্বক বিছানায়; টর্চ জ্বেলে দেখেছি পুঁতির মতো লাল চোখ
মুখে সিগারেট নিয়ে কেবলই নিজেকে পুড়িয়ে ছোটো ক্ষুদ্র করি
আগুন সমস্ত খায় শুধু নাভি প’ড়ে থাকে — চাঁপার গন্ধ বইবে রাত্তিরে
বাতাস সমস্ত খায় শুধু খাম থেকে মোহরের ছাপ ভাসাতে পারেনি!
যেদিন প্রথম চিবুকে উকো ঘ’ষে এঁকেছি অক্ষর — চোখ তুলে তাকাতে পারিনি
যদি দেখি ঐ জ্বলন্ত অঙ্গারও নিভে আসছে, তলায় শুকনো ছাই
যদি সমস্ত শরীর নয় — একটি কড়ে আঙুল দাঁতে কেটে রক্ত দিতে হয়।

ঘর পাল্টে এসে পড়েছি এককোণে; আর একটু পিছনে ফিরলেই
গড়িয়ে পড়বো সিঁড়ি থেকে, — তাই আর ঘুমোবো না, দেয়ালে পিঠ ঠেস দিয়ে
ঘুমোবো না, যদি চাঁদ নিভে গেলে নিজের বিকৃত মুখ দেখে কষ্ট হয়;
ছুঁতেও দেবো না আমার বুক, ছায়ার কুণ্ডলী ধ’রে যারা এসে পড়বে বারান্দায়
দেখবে আমি ব’সে নেই মাথা-নিচু; কোথাও বাজনার শব্দ নেই
সন্‌সন্‌ ক’রে বইছে কদমের রেণু… দেখবে, ফাঁকা জলতল পায়ের গোড়ালির
অনেক নিচুতে

 

আনন্দ

জাল নয়, চকচকে আয়না পেতে ধরছি উড়ন্ত পাখি;
ফাঁদ পেতে আজও ধরতে পারি প্রথম-রাত্রির চাঁদ
সুতোয় কাচের গুঁড়ো মাখিয়ে দু’টুকরো করতে পারি এই পৃথিবীকে
শুধু খেলা ব’লে তুচ্ছ করছো এইসব সান্ধ্যশিল্পকর্ম
শুধু বিস্তৃত-হিমের পাশে দাঁড়ানো আমার সিল্যুয়েট দেখে
ভেবেছো জল খেতে নেমেছে শ্বাপদ
আমার আগ্নেয় মূর্তি দেখে ফ্লাইং সসারের কথা তোমাদের মনে আসে
হাতে কাঁচা রক্তের ছোপ দেখে — আজ সন্তানের কাছে
বলো রাক্ষসের উপকাহিনী।

আমি উস্‌কে দিচ্ছি তোমাদের লোক-কবিকে; তারা
বাঁধছে জয়-বিজয় ও শুম্ভ-নিশুম্ভের পালা
নবান্নের দিনে বামন বা স্বার্থপর-দৈত্যের মুখোশ প’রে
ঘুরছি পাড়ায় পাড়ায় :
যখন ভয় ছাড়া আনন্দ জমে না!
কুমারী মেয়েদের চোখে ঠুসে দিচ্ছি স্বপ্ন
তারা ভোরবেলা ঘুমঘোরে দেখছে
বাঘছাল-পরা বর — ধর্মের ষাঁড়ের মতোই অমিত সম্ভোগ-ক্ষমতা;
বনের হিংস্র জন্তুর লাঙুল আছড়ানোর শব্দে
টের পাচ্ছি এখনই প্রসব করবেন ধরিত্রী।

 

চাঁদের উল্টোপিঠে

চাঁদের উল্টোপিঠে ডিঙি ভাসছে; মরা শুশুকের গন্ধ পেয়ে
ভিড় ক’রে আসছে শেয়ালের সিড়িঙ্গে ছায়ারা,
ঘোড়ার নালের আকৃতির ঝিল; পাশেই —
টিভি টাওয়ারের চুড়োয় লাল সিগন্যাল
আকাশের দিকে মুখ তুলে, জ্বলছে নিভছে,
বিপ বিপ বিপ… একটানা অবোধ্য সংকেত
কান খাড়া ক’রে শুনছে জঙ্গল-হরিণীর দল;
জল খেতে যাওয়ার সময়
নিচুপথ নেমে গেছে স্রোতের ভেতরে সোজা।
একবার নেমে গেলে
জলদানবের হাত সম্মান না-খুইয়ে
ফেরা যায় না।

জোয়ার আসার আগে আচম্বিতে ছলাৎ ছলাৎ ক’রে
দুলতে থাকলো শরীর
দড়ি ছিঁড়ে এখনই তাকে টেনে নিয়ে
ফেলে দেবে চোরাবালির জাঁতায়
জলা দেশ, বন্যা এসে সরাসরি ঘরের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে
গায়ের মাটিও ধুয়ে গলে পড়ছে
আর প্রকাশ পাচ্ছে খড়ের কঙ্কাল।
রঙ জ্বলে গিয়ে করুণ হয়ে আছে মুখ, মাথাটা একপাশে ফেরানো
মৃত্যু অবধি যেতে হলো না, তার আগেই হার্পুন বিঁধে
সমুদ্রের ত্বক পর্যন্ত লাল হয়ে উঠলো।

 

জিঘাংসা

আনত মুখ ধ’রে দেখি, নিশ্চুপের সঙ্গে মিশে গেছে হিলিয়াম
বাতাস উষ্ণতর; উজ্জ্বল ছুরিটিও আগুনের চেয়ে বেশিই জ্বলছে
কিরিচের উপর দিয়ে টেনে নেওয়া বুড়ো আঙুল — সে-ই বলবে
কণ্ঠনালি ছিন্ন করার সময় —চোখ বুঁজে এসেছিলো কিনা।

জিঘাংসা মেটানোর সময়, দ্রুত ফাঁকা হয়ে যায় লোকালয়; ডাক্তারের
বাহু আঁকড়ে ধ’রে একগ্লাস ক’রে রক্ত চায় রোগিনীরা
কোনও বেড নেই তবু এ্যাতো লোক রাত্রিকালে শুতে চায় কেন
শ্লীলতাহানির ভয়ে একসঙ্গে একশোজন — দল বেঁধে ব’সে আছে গৃহকোণে।

কদাকার এক হাতবাক্সে, চিঠিপত্রের স্তূপে স্তব্ধ হয়ে আছে পেসমেকার;
খড়ি-ওঠা ছায়া দেখে অনুমান করছি, এইবার ভূগোলক কেটেকুটে
ভাগ করতে বসবে কমান্ডোরা; ছায়ারা যখন দেয়াল টপ্‌কে ওপারের
সেবাশ্রম সঙ্ঘে ঢুকলো, শুরু হলো বোমা, হাত উড়ে যাচ্ছে কামার-কুমোরের।

দেখি, স্নানের জন্য যে জল সরিয়ে রেখেছি — তাতেও ঠিকরে উঠছে
কুকুরের মুখ; আর স্থলদস্যুর হাত এড়িয়ে — ঝপ্‌ ঝপ্‌ ক’রে আগুনে
ঝাঁপ দিচ্ছে বীর নারীরা, প্রতিটি বাড়ির সামনে জ্বলছে ধিকিধিকি চিতা
দগ্ধ শরীর থেকে গয়না গলতে গলতে গড়িয়ে এসেছে পিচের উপর।

ছুরি চালিয়ে নলখাগড়ার বন সাফ করতে করতে, এলাম বাড়ির বাইরে,
পায়ের ঘা থেকে মরারক্ত ফেলতে ফেলতে যাচ্ছি কাছারিতে
ব্রিফকেসে ভর্তি কাটা আঙুল, চশমার খাপে ভরা ওপড়ানো মণি
বাসস্টপে এসে হাত তুলি — বাস নয়, জ্বলন্ত দাবানল এসে পড়ে গায়ে।

 

পোড়ামা-তলা

পতিতাপল্লী ব’লে আজ কিছু নেই, যেসব মেয়েরা একদিন এখানে ছিলো
তারা বলি-র রক্ত চুলে মেখে দেবী হ’য়ে বোধনে নেমেছে
যেভাবেই ডাকি আমরা কতিপয় ক্ষুৎকাতর — কমলে কামিনী কিংবা
পামেলা বর্দে-র নামে — প্রতিবার সাড়া আসে ঠিক একই রকমের;
চারপাশে উঁচু বাড়ি, মাঝে আটচালা, ঠাকুরদালান; হত্যা দিয়ে প’ড়ে আছি
নগ্ন পুজোরী ব’সে ঘণ্টা নাড়ছে, বেলপাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে কোলে তার স্তূপ…
মা, মাগো, এ জগৎসংসার মিছে; মাতালও একটি শিল্পের দাস

এ থান প্রকৃত ভারতীয়; মার্বেলে স্বরূপগঞ্জের এক বিধবা রাঁড়ির নাম
খোদিত আছে, আমাদের পায়ের ধুলোতে তার কলঙ্কদোষ ঘুচে যায়,
মন্দিরের পিঠ থেকে মন্ত্রপূত বটগাছ — কেটেছিলো যে যবন কাঠুরে
ভোররাত্রে মুখে রক্ত উঠে ম’রে গেছে; তারপর আর অবিশ্বাস নেই
শান্ত গোধূলিতে একটি ক্যাকটাস — বিঁধিয়ে রেখেছে লাল অস্তগামী সূর্যের মাথা

আমি একটি একটি পয়সা হাতে নিয়ে ছুঁড়েছি মণ্ডপে! প্রণামী থালায় প’ড়ে
ঝনঝন শব্দ হয়, মহিলারা সচকিত, যেন আর একটি রইস আদ্‌মি-র
জন্ম হলো এইমাত্র; পয়সা অজাতশত্রু, তার কোনো স্পর্শদোষ নেই
রূপোর ঝংকার শুনে খুলে যায় একে একে লোহার দরোজাগুলো
ভেতরে সারি সারি মিথুনমূর্তি ও তাদের অন্ধকারে জ্বলে ওঠা কাম দেখে
সিক্ত পুরাণ ও শ্যাওলার গন্ধ পাই; পৃথিবীতে সত্য-যুগ কুজ্ঝটিকার মতো
সহসাই আসে; শেফালিবালার মিটিমিটি হাসি দেখে আজও বুঝতে পারিস না
বোকা।

 

(পুরনো বানান অপরিবর্তিত)

 

জমিল সৈয়দ ৭০ দশকের এক প্রধান কবি। অজানা কারণে তিনি কবিতা থেকে দূরে আছেন। তাঁর হাতে শুরু হয় পদ্যচর্চা। তাঁর সম্পাদিত এ মাসের কবিতা নামক কবিতাপত্র সমসাময়িক অনেক কবির বীজতলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *