অসাড়লিপি

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়


শীর্ণ অক্ষর-ঘাস হাতে নিলে গুঁড়ো হয়ে যায়
সামান্য শিথিল শ্বাস
আমরা পালাতে চেয়েছিলাম
এই মঞ্জরিত উচ্ছ্বাসহীনতা থেকে
আরও দূরে লক্ষ্য রাখা জানলা-দুপুর
যেমন আমি দেখেছি আমার সমস্ত চলা জটিলতার দিকে
আমার মাথার ভিতর দিয়ে নেমে আসা শিকড়
তার জট ও ছায়া সমেত আমাকে আক্রমণ করেছে
প্রতিরক্ষা বলে কিছু হয় না এই জনবহুল দেশে
কখন কার নখ আমার মাংসে
আমি দেখি এই শহর তার ঝাঁঝালো অস্তিত্বে
কীভাবে আটকে নিয়েছে পুরনো অভ্যেসের পোস্টার
কতটা একসঙ্গে চলার অর্থ ভারসাম্য?

বুঝতে পারিনি শুধু মুক্তি দিয়ে গেছি
প্রজাতির ইচ্ছে এই আকস্মিকতার পাখি-সন্ধে
— কর্কশের নিজস্ব মিনার!
থ্যাঁতলানো কালোজামে ভরে থাকা অ্যাসফল্ট
কখনও বিদ্রোহ দেখবে না
শুধু এই সন্ধে শতক ও দশক ব্যাপ্ত
পাখি-কর্কশ জমিয়ে তুলবে
এক প্রমিত বাগান যাকে নস্টালজিয়া বলে ডাকা হবে

মরুপ্রতিম শহরে যেভাবে মিলিটারি লরির আয়নায়
দেখা আচমকা মেঘ
যেভাবে বৃষ্টি সম্ভাবনা সত্ত্বেও ব্যালকনিতে বেরনো হল না
শুধু একটাই ইমেইল পড়লাম
আমার স্কুলের বন্ধু প্রভাস
রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় খুন হয়েছে

এখানেই মনে হয় বর্ষার বিকেল, উইলিয়াম কেরি শ্রীরামপুর, বাংলা বাইবেলের নতুন পাঠ ঝালিয়ে নিচ্ছেন। মথি লিখিত সুসমাচার কতটা সুগম ছিল জানা যায় না শুধু আমরা বুঝে নিতে থাকি বিশ্বাস এক রকমের সুগম রাস্তা, সে সুসমাচার রক্তক্ষয় বা ভয় ডেকে আনলেও বিচলন থাকে না, যেমনটাবা ইভ ও সাপ। দ্রৌপদী ও শাড়ি। এইসব অস্থিরতা তাদের প্রার্থনার দিকে ঠেলে দেয়। অথবা স্থির বিশ্বাস তাদের আক্রমণাত্মক করে তোলে যেভাবে রাস্তা পুরসভার প্ল্যানের বাইরেও কিছু পথশিশু বা অনর্থক বেঁচে থাকা কুড়িয়ে নেয়।

সব কেমন পাকিয়ে ওঠে, ধুলো গ্রাম থেকে আসা মিস্ত্রিদের জমায়েতের পাশে আমার সিগারেট, একটা শব্দও বোঝা যাচ্ছে না এমন ভাষায় ক্রমশ একটা স্বপ্নদৃশ্যের বর্ণনামূলক — বৃদ্ধ মার্ক্স, কখনও কি তাঁর মনে হয়েছে তিনি মানবজাতির দুঃখ আরেকটু উশকে দিয়েছেন? আমি তখনও বিশ্বাসের মাপগুলো দেখছি, বৃষ্টিহীন, আমি-উইলিয়াম কেরি, আমি-কার্ল মার্ক্স, আমি-মিস্ত্রি, আমি-কল্পনা-ভাঙা-রোদ…

বিশ্বাস ও ভাঙা কল্পনার মাঝের যে রাস্তা তাতে চলাচল করা মানুষের কোনও দেশ থাকে না। কাল নিজস্ব ভঙ্গুরতায় বাসা করে কারুর বুকে, ভর হয়, চৈত্রের মেলায় তাকে খুঁজে পায় আহত রাজমিস্ত্রির বউ, মানতের সুতোয় বোনা দিন, গনগনে বসন্ত-ধুলোয় মুড়ে বিকেলের কাছে এসে ধরা দেয়, স্পর্শ খসখস শব্দের মোহে এলিয়ে থাকা গোসাপ সমেত আমি বুঝে যাই প্রত্যেক শরীরের একটা কালবৈশাখী আছে

এখানেই লিখে রাখতে হবে আমার গতি ফিরে আসতে হবে এক ভূখণ্ডে এক ভাষা-ভূগোলের খাঁজকাটা মানচিত্রে — তাকে মোটা আঙুল দিয়ে বাড়িয়ে দিতে হবে সীমানা, উশকে দিতে হবে সেই নদী গন্ধের ভোর যে আমাকে হাত গোটানো দর্শকের ভূমিকা থেকে বের করে এনেছিল। যদিও নিশ্চিত এই সময়ে আমি কিছুতেই বলতে পারবো না চিৎকারের তাৎপর্য, যদিও আমার সামনে প্রতিদিন জড়ো হতে থাকে খুঁড়িয়ে চলা জীবনা, যদিও সমগ্রতা বেলচা দিয়ে ট্রাকে তুলে দিতে থাকে শিশুদের মাথা — আর কতটাই বা করতে পারে কবিতা ভেবে হাই তোলা ভাষা-বিকেলের গায়ে একটু করে রেখে দেওয়া থাক আমার জলজ কালির দাগ আর গালাগালি লেখা পুরুষের মুতখানার দেওয়াল

 

তোমাকে ডেকেছিল ওরা
দরজার বাইরে
গড়ির আলোয় বেড়ে উঠেছিল
নমনীয় শিয়ালের পিঠ
বুনো ঘাস
দল — যে শব্দ তোমার খুব প্রিয়
আমরা সবাই দলে আবদ্ধ হতে চেয়েছিলাম
গোষ্ঠীমুক্ত তোমার কপালে ঘাম
শিরদাঁড়ায় নিশ্চিত আরেকপ্রস্থ
রাস্তা হারানো

আমি দূর থেকে হাতের তালুতে
লিখে নিই তারিখ
প্রত্যেক বছর
প্রত্যেক রকমের সরকার

আলোকহীনতার শরীরে জন্ম নিয়েছিল মফস্বল
পরিকল্পনাহীন কিছু শব্দ
আচমকা সামনে কিছু বন্ধু আয়না
মুছে যাওয়া ঘসটানোর দাগ নিয়ে
উড়ে গিয়েছিল পায়রার ঝাঁক
মাটি রঙের পাকানো জন্তু
তার শরীরে চালান করে দিয়েছিল
আমাদের সমস্ত রকম ভোগ
উপভোগ্য সময়ের শেষতম নদীর আওয়াজ

কেমন ছিল গ্রাম থেকে জাহাজে ধরে নিয়ে যাওয়া
ধস্তাধস্তি ছিল কিনা ভাবি
পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা না হবার যে কষ্ট
সেটাও কি ছিল?
পরপর জাহাজে তোলার শব্দ
পরপর বমি পাওয়ার অসাড় পেট

অসাড় ঢেউয়ের চোখ
ভাষায় জড়িয়ে যাওয়া অসাড় জিভ
ক্রমশ খাবারের ওপর জড়িয়ে থাকা অসাড়
চামড়ার নখ ওঠা আঙুলের কালো অসাড়
ধোঁয়া ও বৃষ্টির ফোঁটায় মিশে থাকা
আলো না ঢোকা দিন
সমস্ত অনুভূতির শীর্ষে অসাড়
দৃষ্টিপথের সামনে ঘোলাটে বাতাস
কিছুতেই বলতে না পারা ভাষার নাম — অসাড়
ক্রমশ ফুলে উঠছে দূরতম ঢেউয়ের পেটের মত
কিছুতেই লেখা যাচ্ছে না সূর্য

ক্রমশ উঁচু হয়ে উঠছে সমুদ্রের আদিম, সমস্ত আয়নার সামনে মেলে দেওয়া হয়েছে কাপড় যেন প্রতিবিম্বিত মুখগুলো পালাতে না পারে! এভাবেই আদিমতম, এভাবেই ভোরের ঘুম, রাতের জাগা, এভাবেই গুলিয়ে আসা দিন সপ্তাহ মাস এমনকি ধরা পরা অ্যালবাট্রসও শব্দ করে না এমন সময়! সমস্ত চলাচল নিষ্পলক, অক্ষিগোলকের গায়ে আঁচড় ফুটিয়ে তুলছে শুধু স্বপ্ন — কয়েকটা ফাঁকা বাড়ি, শূন্য জানলায় গাউন পরা স্ত্রীলোক, তার চোখ পেশিবহুল কালো পিঠে স্থির।

এখানে আমার মুখ খুঁজে নেয় কালো রঙের প্রতি তার টান। প্রতিদিন হাতির পিঠের মত দুলে ওঠা দিন, যে কোনও উজ্জ্বল অস্ত্র জ্বলন্ত বাতাস ও আমার মাংস, আমার মৃত মাছের চোখ, কোনও রকমের বুদ্ধির দীপ্তি নেই, শুধু কয়েক শতাব্দির ক্লান্তি আমার শিশু মুখের পাশে ঢোলকলমির ঝোপ গজিয়ে তুলছে।

প্রতিটা সকালে তাকে পরিষ্কার করি
প্রতিটা সকালের পলায়নপর শিয়ালের
রাস্তায় তাকে ফেলে রাখি
কব্জির উপর ক্ষত
জিভ থেকে ভাষা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে বিন্দু-বাদামি
আয়নাই একমাত্র শুশ্রূষা!

পরপর লাফিয়ে নামছে রাস্তা
পরপর ঠিকরে উঠছি আমরা ধুলো-মানুষ
আমাদের রন্ধনশালা ক্রমশ হলুদ আগুন
আমাদের শীর্ণ হাতের আঙুল ক্রমশ শিকড়
শুধু প্যাঁচাদের রাতদীর্ঘ আঁচড়ে
মাংস বিক্ষত হচ্ছে আমাদের
এখানে যতটুকু নিঃশ্বাস তাকেই আয়ু বলে ডাকে সবাই
যতটাই ওপরে যাওয়া যাক
নিচে শুধু ছড়িয়ে পড়ছে এক শতকব্যাপী ঘাস
তাদের পিঠে যে হাওয়া
সমুদ্র থেকে নোনতা নিয়ে এল
তার গায়েও আঁচড় রেখে গেছে
সময় হারানো বাদুড়ের ঘরে ফেরা

যে যুবক আত্মহত্যা ছাড়া কোনও রাস্তা জানে না
যে যুবক ছাল অব্দি ব্লেড চালিয়েও থেমে যায়
পরমুহূর্তেই ছুটে যায় অ্যান্টিসেপটিকে
তাকে আশ্রয় দেবার জন্য শুধু সিগারেটই যথেষ্ট
নিজেকে তাকাতে বলি ইতিহাসে
মাথায় ক্রমশ পেঁচিয়ে যাওয়া
শিকড়ের রাস্তা সতত একার
সন্তান মুখের মায়ায় যে বিকেল বাক্সবন্দি
মৃদু গোধুলির গায়ে
অজস্র নেমপ্লেট ভরা ফাঁকা সব বাড়ি
রাস্তা জুড়ে বৃষ্টি
কুকুরের সন্ত্রস্ত দৌড়

 

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার, পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কারও। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিট সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *