পদ্যচর্চার কথা

অঞ্জলি দাশ


শুভ্র

মনে আছে সেটা পঁচানব্বইএর মার্চ। উত্তর দিনাজপুরএর ইসলামপুর থেকে বাসস্থান তুলে নিয়ে বারুইপুর পৌঁছেছি। ভালো প্রেসের অভাবে এ মাসের কবিতা বন্ধ। অক্ষরের চেহারা নিয়ে খুঁতখুঁতে জমিল অনেক খুঁজে পেতে ইসলামপুরে একটা প্রেস পেলেও, বোঝা গেল সাহিত্য পত্রিকা সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা বা সংস্থান নেই। তারই মধ্যে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সেখান থেকেই কোনোমতে একটা সংখ্যা বার করে জমিল কিছুটা হতাশ হয়েই হাল ছেড়ে দিলো। তরুণ কবিদের কাছ থেকে অনবরত চিঠিপত্র আসে, এ মাসের কবিতা-র খবর চেয়ে। প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে একটা শীর্ণকায় মলাটবিহীন পত্রিকার জন্যে কবিদের এই আকুলতা জমিলকে একই সঙ্গে বিব্রত এবং ম্রিয়মান করে।এমন একটা সময়ে আমরা বারুইপুরে। আশা কলকাতার এত কাছে, প্রেসের সমস্যা হয়তো আর থাকবে না, আবার বেরুবে এ মাসের কবিতা।

একদিন তিনটি প্রায় কৈশোর উত্তীর্ণ টগবগে ছেলে জমিলের সঙ্গে দেখা করতে এলো। ওরা কবিতা লেখে। এ মাসের কবিতায় কখনও লেখেনি। কিন্তু নাম শুনেছে । হয়তো পাতিরামে দু’একটা সংখ্যা দেখেছেও। কবিতা অন্ত প্রাণ, কিন্তু কোনো ধান্দাবাজির ছাপ নেই মুখে, কথাবার্তায়। এ মাসের কবিতা এবং জমিল সৈয়দ-কে নিয়ে মুগ্ধতা আছে। দ্রুত এরা আমাদের কবিতার সংসারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। নিয়মিত আসে, কবিতা শোনায়, ঘন্টার পর ঘন্টা নির্ভেজাল আড্ডা হয়। ওরা জমিলকে বার বার অনুরোধ করতে লাগলো এ মাসের কবিতা আবার বার করার জন্যে। প্রেসের সব ঝামেলা ওরা সামলাবে। ওদের এই আন্তরিক আগ্রহকে স্বাগত জানালেও এ মাসের কবিতার ব্যাপারটা এড়িয়ে গিয়ে জমিল ওদের প্রস্তাব দিল নতুন পত্রিকা করার। ওরা শর্ত দিল প্রথম কয়েকটা সংখ্যা জমিলকে সম্পাদনা করতে হবে।

সেই সূচনা। শুরু হলো পরিকল্পনা। এক দুপুর কাটলো শুধু নামকরণ নিয়ে। প্রত্যেকে একটা করে নাম প্রস্তাব করে । নাকচ হয়ে যায়। কিছুতেই সর্বসম্মত ছাড়পত্র পায় না। শেষপর্যন্ত পদ্যচর্চা নামটা সবার পছন্দ হলো। শর্ত মেনে সম্ভবত প্রথম দুটো সংখ্যা জমিল অতিথি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিলো। পরবর্তী পদ্যচর্চার দায় শুভ্র-শুভঙ্কর-প্রসূন বহন করে চলেছে। সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে মনে হয় একটা শিশুকে জন্মাতে দেখেছি, আজ সে বয়ঃসন্ধি পেরিয়ে অন্তর্জালের মুক্ত পৃথিবীতে পা রাখছে। শুভেচ্ছা।

অঞ্জলিদি

 

অঞ্জলি দাশ (জন্ম ১৯৫৭), কবি, প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে পরীর জীবন (১৯৯১), চিরহরিতের বিষ (১৯৯৯), এই মাস নিশ্চুপ তাঁতের (২০০১), শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০০৯), মুগ্ধ হয়ে থাকি (২০১৭)। পেয়েছেন বীরেন্দ্র পুরস্কার ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কার।  পদ্যচর্চার নামকরণ তাঁরই করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *